This entry is part 8 of 20 in the series বাংলাদেশি ফিকশন

আইনসভায় ইলেকশন।
চারদিকে ক্যানভাসের ধুম পড়েছে। দিন-রাত সভা-সমিতি ও বক্তৃতা চলছে। কর্মী ও ক্যানভাসারদের তাগিদে সবাই অস্থির। যারা বাড়িতে থাকে, তারা বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, যারা মাঠে কাজ করে তারা মাঠ ছেড়ে ঘরের কোণে আশ্রয় নিচ্ছে।

ছয়আনা ট্যাক্স দেনেওয়ালারা এই প্রথম ভোট দিবার মালিক হয়েছেন। সুতরাং ভোটার অনেক। কিন্তু প্রার্থীও কম নয়। দু’তিনটি থানা মিলে একজন মেম্বর পাঠাবে; কাজেই ক্যানডিডেটের ভিড় হয়েছে খুব বেশি। সাধ্যমত ক্যানভাসও করছে সবাই!

কিন্তু সবার চেয়ে বেশি ক্যানভাস চলছে খানবাহাদুর সাহেবের এবং মুনশি সাহেবের। খানবাহাদুর সাহেব এ অঞ্চলের লোক, কিন্তু সদরে ওকালতি করেন। সদরে দু’তলা ও গায়ে একতলা পাকা ইমারত আছে। তিনি সদরে আঞ্জুমন-ই-ইসলামিয়ার সেক্রেটারি। এই আঞ্জুমনের তরফ থেকেই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। আঞ্জুমনের তরফ থেকে শহরের বহু উকিল-মোক্তার ইশতেহার জারি করেছেন খানবাহাদুর সাহেবের সমর্থনে। এইসব ইশতেহার বস্তা-বস্তা বাড়ি-বাড়ি হাটে-বাজারে ও সভা-সমিতিতে বিলি হচ্ছে।
ঐসব ইশতেহারে অনেক ভাল-ভাল কথা লেখা হয়েছে। কিন্তু পাড়াগাঁয়ের লোক অধিকাংশই উম্মি। ঐসব ইশতেহারের ভাল কথা তারা পড়তে পারে না। বুড়ারা ঐসব ইশতেহারে করে বাজার থেকে মাছ নিয়ে যায়; আর ছোঁড়ারা ঘুড্ডি বানায়।

কিন্তু ক্যানভাসাররা ছাড়বার পাত্র নয়। তারা সভা-সমিতিতে জুম্মার নামাজের জমাতে এবং হাট-বাজারের অলি-গলিতে দাঁড়িয়ে সেইসব ইশতেহার গলার জোরে চিৎকার করে পড়ে শুনায়। সুতরাং পড়তে না জেনেও ভোটাররা ঐসব ইশতেহারের কথাগুলি মোটামুটি মুখস্থ করে ফেলেছে।

কথাগুলি এই: মুসলমানরা রাজ্য-হারা হয়েছে। তারা শিক্ষা-দীক্ষায় অপরাপর লোকের অনেক পিছে পড়ে গিয়েছে। বাণিজ্য ব্যবসাতেও মুসলমানদের স্থান নেই। এ সব ফিরে পেতে হলে এবং ধর্মরক্ষা করতে হলে মুসলমানদের দলবদ্ধ হওয়া দরকার। এই উদ্দেশ্যেই আঞ্জুমন কায়েম করা হয়েছে। খানবাহাদুর সাহেবকে ভোট দিয়ে আঞ্জুমনকে শক্তিশালী করা সকল মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য।

প্রায় সকলেই বুঝেছে কথাগুলো ঠিক। সুতরাং খানবাহাদুর সাহেবকে ভোটও তারা দিত। কিন্তু গোলমাল বাধিয়েছে মুনশি সাব। ইশতেহারের বস্তা তার ছোট এবং কর্মীর সংখ্যা তার কম বটে, কিন্তু মুনশিজী এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। করেন তিনি খন্দকারী পেশা। তার উপর আছে তার একটি পয়ত্রিশ টাকা দামের ঘোড়া! দৌড়ে সে ঘোড়া ঘন্টায় চারি মাইলের কম যায় বটে, কিন্তু মাসের মধ্যে ত্রিশদিন চব্বিশ ঘন্টাই সে পিঠে গদি বহন করতে পারে।

এই ঘোড়া এবং জন বিশ-ত্রিশেক ছেলে-ছোকরা নিয়েই মুনশিজী সারা অঞ্চল মুখরিত করে তুলেছেন। তিনি ইশতেহার ছাপিয়ে বিলি করেছেন; বক্তৃতা করে সভা মাতিয়েছেন।

তার বক্তৃতা ও ইশতেহারের কথাগুলো এই: চাকরি-বাকরি আসল কথা নয়। চাকরি পাবে দু’দশজন বড় লোকে এম.এ. বি.এ. ছেলেপিলে। আসল কথা হল খাজনা ও ঋণ। জমিদার ও মহাজনের জুলুমে দেশের সকল লোক মারা পড়েছে। কৃষক-প্রজারা দিনরাত খেটে জমি থেকে ফসল ফলায়। জমিদার ও বড়লোকেরা সেই ফসলের টাকায় দালান-কোঠা তোলে ও মোটর দৌড়ায়; কৃষক প্রজারা না খেয়ে মরে। তাই মুনশিজীরা প্রজাপার্টি গঠন করেছেন বড়লোকের জুলুম বন্ধ করবেন। অতএব মুনশিজীকে ভোট দেওয়া সকল কৃষক-প্রজারই উচিৎ। উকিল-মোখতারকে ভোট দেওয়া উচিত নয়। কারণ উকিল-মোখতারই জমিদারি জুলুমের হাতিয়ার ।

খানবাহাদুরের লোকেরা দেখল বিপদ। সব লোক মেতে উঠেছে জমিদারি উচ্ছেদের নামে। শুধু ধর্মের কথা আর লোকেরা তেমন শুনছে না।

বলল তারা খানবাহাদুরকে সব কথা। খানবাহাদুর অগত্যা বললেন: তোমরাও চালাও জমিদারি উচ্ছেদের কথা। যা বললে লোকে ভোট দেয় তাই বল।

তাই বলা হয়। আবার ইশতেহার জারি হল: খানবাহাদুর সাহেব আঞ্জুমনও জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ চায়, খাজনা কম করতে চায়, বড়লোকের জুলুম দূর করতে চায়।

মুনশিজী পাল্টা ইশতেহার জারি করলেন: খানবাহাদুরের এসব কথা ধাপ্পাবাজি। তিনি নিজে বড় লোক। জমিদারের ওকিল। তাদের আঞ্জুমনের মেম্বররা সবাই তাই। ওরা উচ্ছেদ করবেন জমিদারি? করবেন যদি, তবে আগে বলেননি কেন?

ভোটাররা খানবাহাদুরকে বিশ্বাস করল না। তার চালাকি মুনশিজী তুখোর বক্তৃতা করে বুঝিয়ে দিলেন সবাইকে। চারদিকে সারা পড়ে গেল; গরিব লোকেরা ভোটাধিকার পেয়েছে, এইবার আইনসভা হতে বড়লোক তারাও।

ভোটের দিন ভোটাররা খানবাহাদুরের মোটরে চড়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে মুনশিজীর বাক্সে ভোটের কাগজ ফেলে খানবাহাদুরের পানবিড়ি কতক খেয়ে কতক পকেটে নিয়ে বাড়ি ফিরল।
যথাসময়ে ভোট গণনা হল। খানবাহাদুর পেয়েছেন দু’হাজার আর মুনশিজী পেয়েছেন তের হাজার। মুনশিজী যথারীতি নির্বাচিত হলেন বলে ঘোষণা করা হল।
সমবেত জনতা জয়ধ্বনি করল: ‘জমিদারি ধ্বংস হোক’; ‘কৃষক প্রজার জয় হোক’;
‘লাঙ্গল যার মাটি তার’
‘জয় মুনশিজী কি জয়’।।


যথাসময়ে মুনশিজী আইনসভায় হাজিরা দিতে কলকাতাভিমুখে রওয়ানা হলেন। রেলস্টেশনে কৃষক-প্রজারা জমায়েত হয়ে জয়ধ্বনি করে তাকে বিদায় দিল। আশে-পাশের জমিদার-কাছারি কাঁপিয়ে আসমানে ধ্বনিত হল: জমিদারি ধ্বংস হোক!

কিছুদিন পরে মুনশিজী ফিরে এলেন। তিনি তহবন্দ পরে গিয়েছিলেন, শেরওয়ানি পরে এলেন। পায়ে হেঁটে স্টেশনে গিয়েছিলেন ঘোড়ার গাড়ি চড়ে ফিরে এলেন। সব দিকেই খবরাখবর ভাল। কিন্ত্বু জমিদারি উচ্ছেদ হয়নি। খাজনাও কমেনি।

প্রজারা সব মুনশিজীর কাছে পুছ করল হাল-হকিকত। মুনশিজী বললেন: কোন ভাবনা নেই। জমিদারি উচ্ছেদের আয়োজন ঠিক-ঠাক ।

খাতেরজমা হয়ে সবাই বাড়ি ফিরল।

গেল অনেক দিন। মুনশিজী কলকাতা গেলেন অনেক বার। ফিরেও এলেন বহুবার। কিন্তু না কমল খাজনা, না উঠল জমিদারি। ইতিমধ্যে মুনশিজীর বাড়ির ছেলে-পিলেদের ভাল-ভাল নতুন ধরনের কাপড়-চোপড় পরতে দেখা গেল। মেয়েদের মুখে শোনা গেল মুনশিজীর বিবির ভাগ্যেও নতুন জুতা-জামা ও শাড়ি-গহনা জুটেছে কিছু।

আস্তে-আস্তে কানকথা চলতে লাগল। গায়ের পড়ুয়া ছেলে-পিলেরা বলতে লাগল: তাদের পাঠশালার মাস্টাররা নাকি বলছেন: আইনসভার মেম্বররা হাজার টাকা করে নিজেদের মাইনে বরাদ্দ করেছেন। সাপ্তাহিক খবরের কাগজে উঠেছে এসব কথা।

গাঁয়ের লোক ভাবল: হবেও বা। মুনশিজীর চেহারা দেখে তাই ত মনে হয়।

এক দুই করে জনকতক লোক কথাটা পেড়েই ফেলল মুনশিজীর নিকট ।

মুনশিজী ত চটেই টং। খবরের কাগজের কথা ছেড়ে দাও। খবরের কাগজওয়ালা বেটারা কারো ভাল দেখতে পারে না। বছর দিঘালি বাড়ি ঘর ছেড়ে বিদেশে পড়ে-পড়ে প্রজার মঙ্গলের জন্য খাটব; আর তার জন্য খাওয়া-খোরাকি বাবদ দু’দশটা টাকা নিতে পারব না? তবে কি আমরা হাওয়া খেয়ে থাকব? যত সব ইয়ে—। কলকাতা এমন জায়গা যেখানে পানি পর্যস্ত কিনে খেতে হয়।

সকলে বুঝল সত্যই ত। কলকাতায় ত আর মুনশিজীর ঘরগেরস্থালি নেই। মাইনে নেবে না ত চলবে কি করে? বিশেষত পানিটাও যখন কিনে খেতে হয়।

গেল কয়েক বছর। জমিদারি উঠল না। খাজনার চাপ বেড়েই চলল। বহু প্রজার ভিটা-বাড়ি উচ্ছন্ন হল। তারা এল মুনশিজীর কাছে।
মুনশিজী বললেন: চেষ্টার তো তিনি কম করছেন না। বড় কাজ। সময় একটু লাগবেই তো। এ তো আর দা-ছেনির আছাড়ি নয় যে টান মারলেই খসে যাবে! একা লোক তিনি ক’দিক সামলাবেন ।

কৃষক-প্রজারা বুঝল: তাদের ব্যস্ততা কত অন্যায়। তারা সবুর করল কাজেই।

হঠাৎ দেখা গেল মুনশিজীর জমি-জমা বেড়ে গিয়াছে। বাকি খাজনার দায়ে যেসব জমি এতদিন কোন প্রজাপত্তন হয়নি। সে সব জমি তাই এতদিন পতিত পড়েছিল। শোনা গেল মুনশিজী স্বয়ং সে পত্তন নিয়েছেন।

যাদের জমি তারা গিয়ে কেঁদে পড়ল মুনশিজীর কাছে।

তিনি বললেন: ওদের ভালোর জন্যই মুনশিজী এ কাজ করেছেন। মুনশিজী না নিলে প্রজার দুশমন কেউ ওসব জমি নিয়ে নিত—তাতে প্রজারা জমি ছাড়া হত। মুনশিজী নেওয়াতে জমি প্রজাদের নিজেদেরই থাকল। অথচ খাজনা দেবার দায় আর ওদের রইল না! সেটা এর পর মুনশিজীই চালাবেন। ওরা জমি চাষ করে মুনশিজীকে শুধু অর্ধেক ফসল দিবে। জমিদারি উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই চলবে। তারপর যার জমি তাকেই ফেরত দেওয়া হবে। এমন সুন্দর ব্যবস্থা আর কেউ করত? শুধু মুনশিজীর দয়ার শরীর বলে!

গাঁয়ের লোক বুঝল: ব্যবস্থা মন্দ নয়। জমিদারের হাত থেকে ত জমিগুলো উদ্ধার হল! মুনশিজী ত নিজের লোক তিনি নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দেবেন।

গেল আরো কয়েক বছর!

একদিন সকালে গায়ে রাজমিস্ত্রি দেখা গেল। মুনশিজীর জমির উপর ইটের পাঁজা পোড়ানো হলো। কাঠ-বাঁশ লোহা-লক্কর এল গাড়ি বোঝাই হয়ে।

মুনশিজীর নয়া জমিতে দালান উঠল। ঘাট-বাঁধা পুকুর হলো। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা থেকে রাস্তা গেল মুনশিজীর বাড়ি তক।

গাঁয়ের লোক কাতার করে তামাশা দেখল। বাড়ি তৈরি শেষ হলে যথাসময়ে ধূমধামের সঙ্গে মিলাদ শরীফ পড়িয়ে মুনশিজী নয়া দালানে উঠে গেলেন।

শহর থেকে অনেক ভদ্রলোক গৃহ-প্রবেশ-উৎসবে যোগ দিলেন ।

সকলে মুনশিজীর নয়া বাড়ির তারিফ করলেন! পাড়াগাঁয়ে এমন সুন্দর বাড়ি আর দেখা যায় না।

উৎসব শেষে গাঁয়ের লোকের হুঁশ হলো। এক মুখ দু’মুখ হতে হতে নানা কথা রাষ্ট্র হয়ে গেল। শেষে মুনশিজীকে বলাই হল। কোথায় জমিদার ও বড়লোক ধ্বংস করে চাষীদের উন্নতি করবেন, তা না নিজেই দালানওয়ালা বড়লোক হয়ে গেলেন মুনশিজী?

মুনশিজী বললেন: এই ত উম্মি লোকের নাদানি। শুনলে ত তোমরা শহরের ভদ্রলোকদের কথা: পাড়াগাঁয়ে সুন্দর বাড়ি-ঘর না হলে পাড়াগার উন্নতি হবে কোথা থেকে? রাস্তা-ঘাট না হলে লোকে চলা-ফিরা করবে কিসে? আমি ত গায়েরই লোক। আমার উন্নতিতে গায়েরই উন্নতি। একজন দু’জন করেই ত উন্নতি করতে হবে; সবাই কি একসঙ্গে বড় হয়? তোমাদের ছেলে-পেলে কি সবাই এক সমান বড়? হাতের পাচ আঙ্গুল কি সমান? আমি ইট পুড়িয়েছি, তোমাদেরও ত কাজে লাগতে পারে।

সবাই বুঝল: ঠিক কথাই ত। অনেকেই মুনশিজীর পাঁজা থেকে ভগ্নাবশিষ্ট দু’চারখানা ইট নিয়ে গেল। কেউ বা তা দিয়ে ঘরের সিঁড়ি তৈরি করল। আর কেউ-কেউ চৌকিরপায়ার নিচে ইট দিল।

এইভাবে মুনশিজীর দৌলতে ইটের মুখ দেখে অনেকে চুপ করে গেল। আস্তে-আস্তে মুনশিজীর বিরুদ্ধে আলোচনা কমে গেল।

সেবার অজন্মা হয়েছে। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। জিনিস-পত্রের দাম বেড়ে গিয়েছে। খোরাকীর অভাবে অনেক লোক মারা যাচ্ছে। প্রজারা খাজনা দিতে পারছে না।
জমিদারের আমলা-ফয়লা পাইক-পিয়াদরা খাজনার তাগিদে সারা গাঁ তচনচ করে ফেলল। ভয় দেখাল খাজনা না দিলে জমিদারি হয় কোর্ট-অব-ওয়ার্ডে যাবে, নয় সদর খাজনার দায়ে নিলাম হবে। বুঝবে তখন প্রজারা বছরে ক’দিন যায়! এমন দয়ালু জমিদার আর পাবে না। অন্য জমিদার এসে প্রজার হাড় পিষে ফেলবে ।

প্রজারা ভয় পেল। কিন্তু খাজনা দেবার শক্তি তাদের ছিল না। হাড়েও তাদের কিছু ছিল না। কাজেই হাড়পেষার আশঙ্কায় তাদের আঁৎকে উঠতে দেখা গেল না। তাছাড়া মুনশিজীত রয়েছেন। তিনি ত জমিদারি উচ্ছেদই করে দিচ্ছেন। এ জমিদারের জমিদারি নিলাম হয়ে অন্য জমিদার আসবার সময় পাচ্ছে কোথায়: তার আগেই ত যাবে জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে।

মুনশিজীকে পুছ করা হল। তিনি ভরসা দিলেন। আর বেশি দিন লাগবে না। তিনি বিল পেশ করেছেন। সিলেক্ট কমিটি বসেছে। আর বেশি দেরি নেই।

সকলে সোয়াস্তি পেল। যারা হাল-গরু ও ঘটি-বাটি বিক্রি করে খাজনা দিতে যাচ্ছিল, তারা বিরত হল।

জমিদারের লোকজন বহু উৎপাত চিৎকার ও হট্টগোল করে খালি হাতে ফিরে গেল।

সাঁজ আইনে জমিদারি নিলাম হয়ে গেল।

ভাগ্যিস নিলামের দিন মুনশিজী সদরে হাজির ছিলেন। তিনিই নিলামে সে জমিদারি খরিদ করে নিলেন! নইলে অন্য জমিদারের হাতে পড়লে প্রজাদের আর রক্ষা ছিল না।

তার বাদে যথাসময়ে আদালত হতে নাজির এসে মুনশিজীকে জমিদারিতে দখল দিয়ে গেল। মুনশিজীও খাজনার তাগাদায় প্রজাদের উপর নোটিশ করতে লাগলেন। তখন প্রজার দল বেঁধে হুনশিজীর কাছে এসে বলল: এ কি রকম হল মুনশিজী? জমিদারি উচ্ছেদ করতে গিয়ে আপনি নিজেই জমিদার হয়ে বসলেন?

মুশিজী হেসে বললেন: এই ত তোমরা উম্মি লোক কিছু বুঝতে পারছ না। জমিদারিটা অপরে নিয়ে গেলে কি তোমাদের ভাল হত? তোমরা খাজনা যা দিতে, তা ভিন গায়ের লোকে নিয়ে যেত। এখন তোমরা খাজনা দিবে, সব তোমাদের গায়েই ত থেকে যাবে। আপদ-বিপদে হাত বাড়ালেই পাবে। আগে জমিদারিটা অপরের হাতে ছিল কাজেই ওটা উচ্ছেদ করা কঠিন ছিল! এখন নিজের হাতে নিয়েছি, যখন ইচ্ছে তখন উচ্ছেদ করতে পারব। আমার প্রথম ধাক্কায় জমিদারি উচ্ছেদ হয়নি বটে, কিন্তু জমিদার ত উচ্ছেদ হয়েছে। একবারের চেষ্টায় এর বেশি আর কি করা যায়?

প্রজারা ভাবতে লাগল।

মুনশিজী বলতে লাগলেন: এ যাত্রায় জমিদারি উচ্ছেদ করতে পারিনি বটে, কিন্তু জমিদারকে কাবু করে ফেলেছি; ওর বুকে চড়ে বসেছি; জমিদারি দখল করেছি। তোমরা প্রজা। আমি তোমাদের প্রতিনিধি। আমার জমিদারি দখল করা মানেই প্রজার জমিদারি দখল করা। এও এক রকম জমিদারি উচ্ছেদ বৈকি? প্রথম চেষ্টায় আমি এতখানি করেছি। আবার যদি আমায় ভোট দাও, তবে বাকিটাও সাবাড় করে ফেলব।

সকলে বুঝল: কথাটা মিথ্যা নয়। মুনশিজী ঠিকই বলেছেন: আয়েন্দাতেও তাকেই ভোট দিতে হবে।

১লা পৌষ ১৩৫১

Series Navigation<< গো-দেওতা কা দেশ – আবুল মনসুর আহমেদনেড়ে – সৈয়দ মুজতবা আলী >>