[সুভাষ দত্ত’র অটোবায়োগ্রাফির একটা অংশ]

‘৭১-এ আমি লারমনি স্ট্রীটে থাকতাম। ২৫ মার্চের রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। সকাল বেলায় জানা গেল ওটা ছিল পাকিস্তানিদের হামলা। তারা বহু লোকজন মেরেছে। ভার্সিটিতে হামলা চালিয়েছে, হত্যা করেছে ড. জি সি দেবকে। তখন আমার মনে পড়ল এই গোবিন্দ দেব আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তখন আমি দিনাজপুর কলেজে পড়তাম। ইউনিভার্সিটিতে, তার বাড়িতে আমার দেখাও হয়েছিল ডঃ জি সি দেবের সঙ্গে। উনি আমাকে দেখে বলেছিলেন, ‘কি সুভাষ? তোমার নাকি এখন খুব নামটাম হয়ে গেছে?’

আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, স্যার। আপনার আশীর্বাদে চলচ্চিত্র জগতে মোটামুটি পরিচিতি লাভ করেছি।

যাহোক, যুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেল। আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ল হিংসা। বিহারীরা পাকিস্তানিদের পক্ষ নিল। খুঁজে খুঁজে বের করতে লাগল কোথায় হিন্দুরা থাকে। কে কি করে। আমার বাসা ছিল ৪নং লারমনি স্ট্রীটে। পাড়ার ছেলেরা অবস্থার ভয়াবহতা টের পেয়ে একদিন বলল, ‘দাদা, আপনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। মিরপুর থেকে বিহারীরা আসছে আপনার বাসার দিকে। আমরা খবর পেয়েছি।

তখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমি তাড়াতাড়ি চলে আসলাম ৩নং ওয়ারী স্ট্রীটে। কিছুক্ষণ পরে খবর এল আমার বাসায় লুটপাট শুরু হয়ে গেছে। বিহারীরা যা কিছু পাচ্ছে সব নিয়ে যাচ্ছে। আমি ভাবলাম, যাক, নিচ্ছে নিক। আমি প্রতিবাদ করি নি, প্রতিরোধও করি নি।

এভাবে কেটে গেল কয়েকটা দিন। তারপর ১ এপ্রিলের দুপুর বেলা একটি খবর এল। সেদিন ঘরে শুয়ে রেডিওতে কম ভল্যুমে শুনছি কোথায় কি হচ্ছে না হচ্ছে সে খবর। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। শুনলাম বুটের শব্দ। তারপরই প্রবল লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল পাকিস্তানি মিলিটারি। দ্রুত আমাদের বাড়িটাকে ঘেরাও করে ফেলল ওরা। তারপর আমাকে, আমার ভাইকে এবং অরুণা গোস্বামী বলে একটি ছেলে ছিল, তবলা বাজাত, এই তিনজনকে নিয়ে বাসার সামনের উঠোনে দাঁড় করাল। আমার পরিবারের সবাই ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিল। ছোট ছেলেটা প্রাচীর টপকে পালিয়ে গিয়েছিল। আমাকে প্রাচীরের সামনে দাঁড় করাল। হাত উঠিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ছয়জন মিলিটারি তাদের বন্দুক উঁচিয়ে রেডি হয়ে থাকল। ক্যাপ্টেনের অর্ডারের অপেক্ষায়। গোটা এলাকা ফাঁকা। বিহারীরা মিলিটারির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই। হঠাৎ এক ক্যাপ্টেন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যায়া নাম হ্যায় তোমারা।’ আমি বললাম, ‘সুভাষ দত্ত।’

ক্যাপ্টেন বলল, ‘তুম সুভাষ দত্ত। তুম ফিলিম মে কাম করতা হ‍্যায়?’

আমি বললাম, ‘জি!’

তখন ওদের মধ্যে যারা বন্দুক উঁচিয়ে ছিল তাদেরকে ইশারা করল। ওরা বন্দুক নামিয়ে ফেলল। তারপর একটি গাড়ি ডাকল। গাড়িটিতে আমাদের উঠতে বলল, ‘আমরা উঠলাম। সবাই ভাবল বাইরে নিয়ে গিয়ে আমাদের মেরে ফেলবে।

তখন এই গাড়িটি বনগ্রাম, নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড হয়ে গভর্নর হাউজে ঢুকল। গভর্নর হাউজে একটি বিশেষ কক্ষে আমাদেরকে রাখা হলো। এ রকম বহু লোককে এনে এখানে রাখা হয়েছে। এদের সবার ধারণা সন্ধ্যার পরে সবাইকে মেরে ফেলা হবে। তখন একজন এসে ডাকল, ‘সুভাষ দত্ত কৌন হ্যায়? ও বাহার নিকালো। আমি তখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে এলাম। আমি ভাবলাম কোথায় নিয়ে যায়। কিন্তু না দেখলাম ওখানেই একটা রুমে টেবিলের সামনে এনে দাঁড় করাল। তখন একজন আমাকে বলছে, ‘তোমহারা মালুম হ্যায় ইহাছে কোন মন্দির মে ইন্ডিয়ামে খবর যাতা?’
আমি বললাম, নেহি।
‘তুম তো হিন্দু হ্যায়?’
আমি বললাম, জ্বি।’
‘মন্দির মে মে নেহি যাতা হ্যায়?’
‘নেহি। হাম মন্দির মে নেহি যাতা হ্যায়।’
‘ত তুম ক্যায়সা হিন্দু হ্যায়?’
আমি বললাম, ‘হাম রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবকা ফলোয়ার হ্যায়। হামরা মন্দির মে নেহি জানা। হামরা ঘরমে কাম হো যায়।’
তখন ওরা বলে ঠিক হ্যায়। তুম উধার যাও।

এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরে বলছে সুভাষ দত্তের সাথে যত লোক সবাইকে বাইরে বের কর। তখন আমরা কান্না শুরু করে দিলাম। কারণ আমরা বাইরে গুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। এর মধ্যে পরিচিত লোক যারা আছে তাদেরকে বললাম, ভাই আসি। হয়তো এই শেষ দেখা। বাইরে যখন বের হলাম, আগের সেই ক্যাপ্টেনটা দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে আমাকে বলল-শুন ইধার আও। তখন আমাকে যে সুন্দর কথাটা বলল- সেই কথাটিই পরবর্তীতে আমি ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবিতে লাগিয়েছিলাম। আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছিল।

আমাকে বলছে-লুক মি সুভাষ দত্তা ইউ আর অ্যান আর্টিস্ট। ইউ আর নট অনলি অ্যান আর্টিস্ট। ইউ আর এ গুড আর্টিস্ট। সো হাম তোমকো ছোড় দিয়া। যাও। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এদিকে কারফিউ লেগে গেছে। তখন আমি ভাবলাম ছোড় দিয়া মানে এখন রাস্তায় বের হলে হয়তো ওরাই গুলি করে মেরে ফেলবে। তখন আমার সমস্ত শরীর কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল পা বুঝি মাটি থেকে সরে যাচ্ছে। তখন সেই কম্পিত শরীর নিয়েই আস্তে আস্তে রওয়ানা হয়েছি বঙ্গ ভবনের গেটের দিকে। তখন আবার ক্যাপ্টেন বললেন, ঠ্যারো! আমি তখন আরো ভয় পেয়ে গেলাম। উনি একটু ইশারা করলেন একটা জীপ আসল। আমাকে বলল- তুম জীপমে ব্যয়ঠো। আমি জীপে উঠে নিচে বসেছি। তখন উনি বললেন সীটমে ব্যয়ঠো। কারণ আমাদের যখন নিয়ে আসে তখন নিচে বসিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি ভাবলাম যদি সীটে বসলে কোনো অপরাধ হয়। তখন সীটে বসলাম ড্রাইভারের পাশে। উনি করলেন কি আমার পাশে এসে বসলেন। বললেন কিধার সে যানে হোগা তুম ড্রাইভারকো বোলনা। আমি তখন রাস্তা দেখিয়ে আমার বাসায় আসলাম। দরজা ভাঙা। কারণ ওরা দরজা ভেঙে ঢুকেছিল। ভেতরে কান্নাকাটি চলছে তখনো। ওরা ভেবেছে এবার বুঝি ওদেরকে শেষ করতে এসেছে। তখন আমি ঘরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে বললাম আমাদেরকে উনি ছেড়ে দিয়েছেন। আমাদের কোনো ভয় নেই। তখন ক্যাপ্টেন বললেন সুভাষ দত্ত হাম যা রাহা হ্যায়। আবার কুচ হোগা-জরুরত পরেগা হামকো খবর দেনা। আমি বললাম, ঠিক হ্যায়। তখন বললাম-আব কুছ পিজিয়ে, কুছ খাইয়ে। উনি বললেন, নেহি। হাম যাতা হ্যায়।

ভদ্রলোক চলে গেলেন। তারপর হলো কি-আমি বাইরে বের হচ্ছি না। ঠিক দু’দিন পর মোহাম্মদপুর থেকে বিহারীরা এসে আবার হামলা চালাল আমাদের বাসায়।

বিহারীদের হামলা চালাবার খবর আগেভাগে পেয়ে গিয়েছিলাম বলে রক্ষা। আমরা তাড়াতাড়ি ২৬নং ওয়ারীতে চলে গেলাম। সেখানে একটা গোয়ালঘরে আমাকে রাত কাটাতে হয়েছে। বিহারীরা পরে এসে ফিরে গেছে। ওরা লুঠতরাজ করতে এসেছিল। আমাকে পায় নি। আমার তখন ক্যাপ্টেনের কথা মনে পড়ে গেল। সে বলেছিল, ‘কোনো কিছু হলে আমাকে খবর দিও। আই উইল হেল্প ইউ।’ আমি সেই অরুণ গোস্বামীকে গভর্নর হাউজে পাঠালাম মানে বঙ্গ ভবনে। ওকে বললাম, ‘ভাই, যাও তো, ক্যাপ্টেনকে গিয়ে বলে এসো সুভাষ দত্ত বিপদে পড়েছে। আপনাকে স্মরণ করেছে।’

অরুণ গভর্নর হাউজে গিয়ে ক্যাপ্টেনকে পায় নি। তবে রিপোর্ট করে এসেছে। ভদ্রলোক ওর রিপোর্ট পেয়ে আমার সাথে দেখা করতে এল। বলল, ‘কেয়া বাত হ্যায়?’ আমি বললাম, ‘এইসা এইসা বাত হ্যায়। হামকো মারনে আয়া থা। হাম ডরকে মর তো চলা যায়া থা।’

ক্যাপ্টেন তখন বলল, ‘ইধার আরও। হামারা সাথ আও।’

পাড়ার লোক যারা ছিল তাদেরকে সে ডাকল। ডেকে বলল, দেখো, ‘ইয়ে সুভাষ দত্ত ইহা রাহা। আগার ইসকা কুছ হুয়া হাম সবকো গোলি কর দুঙ্গা অউর জ্বালা দুঙ্গা। এই কথা বলে চলে গেল ক্যাপ্টেন জিপে করে।

তখন হলো কি আমি পাড়ার হিরো বনে গেলাম। হিরো হয়ে গেলাম এভাবে যে, পাড়ার লোকেরা বলতে লাগল, আরে, পুরা কওম আপকা খেদমত করতা হ্যায়, হামলোগ কেয়া হ্যায়। আপ কেয়া কেয়া করনে চাহিয়ে বলিয়ে। কেয়া খেদমত কর সাকতাহু।’ আমি বললাম, ‘কোনো খেদমত করতে হবে না। তোমরা আমাকে রেশন, এনে দেবে। বাজার এনে দেবে। আমি বেরুব না।

ওরা তাই করল। বিহারীরা ছিল। ওরা রেশন এনে দিত, বাজার করে দিত।

এভাবে পুরো এপ্রিল চলে গেল। মে-র মাঝামাঝি চলে এলো। একদিন সেই ক্যাপ্টেন আমাকে খবর দিল যে তুমি ইন্ডিয়ায় পালিয়ে যাও। তোমাকে আর রাখতে পারছি না। কারণ তোমার নামে ‘রেড মার্ক’ আছে।

আমার বাসার পাশে একজন ইন্সপেক্টর ছিলেন। তিনিও আমাকে বললেন, ‘আপনার চলে যাওয়াই ভালো।’

সেদিন ছিল ১৫ মে। মিলাদুন্নবির রাত ছিল বোধহয়। হয়তো নবি করিম (সাঃ) এর ইচ্ছাতেই সব হয়েছে। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই হয়েছে সব। আমি করলাম কি মোচটা কেটে ফেললাম। আমার আগে ঘন, কালো গোফ ছিল। একটা ছেঁড়া জামা পরলাম, শ্যাম্পু করে ফেললাম চুল। তারপর ফ্যামিলিকে ২৬নং ওয়ারি স্ট্রীটের ওপর তলায় রেখে আমি সেই ভোরবেলা হাটখোলা এসে একটা স্কতার নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম দাউদ কান্দির দিকে। চৌদ্দগ্রামের কাছে এসে ধরা পড়ে গেলাম একটা ছেলের কাছে। সে বলল, ‘আপনাকে চেনা লাগছে। আপনি তো সুভাষ দত্ত?

আমি বললাম, ‘না। আমি তার ভাই।’

ছেলেটি ছিল খুব চালাক। আওয়ামী লীগ সাপোর্ট করত। সে বলল, ‘আপনাকে আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি। আপনার কোনো ভয় নেই। আমার বাসায় আসেন। আমার বাসায় এই মুহূর্তে কিছু লোক আছে মিলিটারি ছদ্ম বেশে। তারা পাকিস্তান থেকে এসেছে।

আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম যাব কি যাব না ভেবে। শেষে মনকে প্রবোধ দিলাম এতো খুবই ছোট একটি ছেলে। এ নিশ্চয়ই আমার কোনো ক্ষতি করবে না।

তো গেলাম ছেলেটার বাসায়। দেখলাম না ঠিকই আছে। পাকিস্তান থেকে কিছু লোক এসেছে। ভোরের বেলা বর্ডার ক্রস করে চলে যাবে। ছেলেটা সাহায্য করবে। আমরা সেই সুযোগটা নিলাম। ভোর বেলায় আখাউড়া বর্ডার হয়ে আগরতলা পার হয়ে গেলাম। আগরতলা যখন গেলাম সেখানে ঢাকার অনেক বন্ধু-বান্ধব, রেডিও-টিভি-সিনেমার কলা-কৌশলীদের দেখলাম। তারা আমাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। কারণ ওরা শুনেছে পাকিস্তানিরা আমাকে মেরে ফেলেছে।

আমি বললাম, হ্যাঁ। এরকম একটা খবর বেরিয়েছিল। ছেলেটাকে বললাম, যদি কোনোদিন দেশে ফিরতে পারি আমার সাথে দেখা করো। তোমার কোনো উপকার হয় আমি তা করব।

ছেলেটাকে আরো বললাম, ‘ঢাকা গিয়ে ২৬নং ওয়ারী স্ট্রীটে আমার ফ্যামিলিকে বলো তুমি আমাকে ভালোভাবে বর্ডার ক্রস করিয়ে দিয়েছ।’

ছেলেটা ঠিক তাই করেছে। এসে খবরটা আমার পরিবারকে দিয়েছে। এবং অত্যন্ত সাহসের সাথে কাজও করেছে। ওদেরকে নিয়ে চলে এসেছে। বলেছে, ‘চলেন, দাদাকে পার করে দিয়ে এসেছি। আপনাদেরকেও পার করে দেব।’

ছেলেটা আমার পরিবারকে তারপর আগরতলা বর্ডার পার করে দিয়ে এসেছে। অথচ আমি তাকে এসব কিছুই বলতে বলিনি।

যেদিন মিউজিসিয়ান সুবল দত্ত আমাকে বলল ‘দাদা, বৌদিরা সব এসে গেছে।’ আমি সেদিন ওর কথা বিশ্বাস করতে পারি নি। বলেছি, দূর, ঠাট্টা করার জায়গা পাও না তুমি। আমি এদিকে দুঃখে মরছি। আর তুমি আমার সাথে ঠাট্টা করছ।’

সুবল বলে, ‘দাদা, আমি আপনার সাথে ঠাট্টা করব? আমি সত্যি বৌদি আর বাচ্চাদেরকে দেখে এলাম। ওরা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।’ আমি ছুটে গেলাম। ওদের দেখে চোখ ফেটে কান্না বেরিয়ে এল। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম।

এর দুই দিন পরে আমরা চলে গেলাম শিলগুড়িতে। ওখানে আমাদের আত্মীয় আছে, বোন আছে। আমার ইমিডিয়েট ছোট বোন। তার হাজব্যান্ডও আছে।

ওখানে আশ্রয় নিলাম। তারপর চিন্তা হলো বাবা-মাকে নিয়ে। তারা বগুড়ায় ছিলেন। তারা কি করে আসবেন? তারা কি করে জানবেন আমার কথা? তারা রেডিওতে শুনেছেন আমাকে মেরে ফেলেছে। অনেক আত্মীয়-স্বজন, যারা ইন্ডিয়াতে ছিল, তাদের অনেকে খবরটা শুনে আমার শ্রদ্ধাও করে ফেলেছে। আমাকে পরে দেখে তারা অবাক। বলল, কি আশ্চর্য! শুনলাম তোমাকে মেরে ফেলেছে। এজন্য আমরা অশৌচ পালন করছি।

আমি বললাম, না। আমাকে ওরা ছেড়ে দিয়েছে।

ওখানে একটা বাসা ভাড়া নিলাম। সেখানে পরিবার থাকল। আমি ভাবলাম, শিলিগুড়ি থেকে কি করব। বরং কলকাতা যাই। তারপর কলকাতা চলে এলাম।

আমার মাসিমা থাকতেন, বালিগঞ্জে। সেখানে আশ্রয় নিলাম। তারপর খোঁজ-খবর নিতে শুরু করলাম কোথায় কে, কিভাবে আছে। দেশের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য আমাকে কিছু করতে হবে।

এরপর জড়িত হলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে। সেখানে আমাদের দেশের শিল্পী এবং কলাকুশলী যাঁরা ছিলেন তাদের সহযোগিতায় নাটক, একাঙ্কিকা ইত্যাদি শুরু করে দিলাম। স্টেজে নাটক করেছি আমরা। মহা জাতিসদনে অভিনয়ও করেছি। বেতার নাটকেও নিয়মিত অভিনয় করেছি। তবে এখন সে সব নাটকের কথা তেমন মনে নেই। এখানে যাঁরা কাজ করেছেন সবাই দেশের জন্যেই করেছেন।

ইতিমধ্যে খবর পেলাম বাবা-মা নিরাপদে বর্ডার ক্রস করে শিলিগুড়িতে এসে গেছেন। খুব ভালো লাগল। খুব নিশ্চিন্তবোধ করলাম।

এভাবে কষ্টেসৃষ্টে দিন কেটে যেতে লাগল। এর মধ্যে মৃণাল সেনের কলকাতা ‘৭১ নামের একটি ছবিতে কাজ করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। আরেকটা ছবি ছিল সুখেন দাসের। ওই ছবিটাতেও অভিনয় করার একটা সুযোগ এল। তাতে সামান্য কিছু পয়সা পেলাম। মৃণাল সেনের ছবিতেও কিছু পয়সা পেলাম। এ দিয়েই মোটামুটি চলতে লাগলাম। খুব কষ্টে চলতে হত। কাজের জায়গায় হেঁটে যেতাম। শিলিগুড়িতেও পয়সা পাঠাতে হত। কারণ পরিবার থাকত ওখানে।

হাসান ইমামসহ আরো যাঁরা ওখানে ছিলেন তারাও আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন। কম্বল দিয়েছেন, মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেছেন।

স্বাধীনতার জন্য যে যার যোগ্যতা মতো স্ব স্ব ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। কেউ রণক্ষেত্রে, কেউ বেতারে, কেউ সংবাদপত্রে। নানাভাবে সবাই দেশের জন্য কাজ করেছে।

এভাবে দেখতে-দেখতে ১৬ ডিসেম্বর এসে গেল। আমি দেশ ত্যাগ করেছিলাম মে মাসের শেষের দিকে। কলকাতায় যখন ছিলাম, একবার বোম্বেও গিয়েছিলাম। চেষ্টা করে লাইনঘাট করে এসেছি। সেই সুনীল সেন, যার আশ্রমে আমি সবাইকে রান্না করে খাইয়েছি, তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। তিনি ততদিনে বিয়েশাদী করে ছেলের বাবা হয়েছেন, সুখে ঘর সংসার করছেন। তাকে জিজ্ঞেস করেছি আমাকে চিনতে পেরেছেন কিনা। বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে চিনতে কষ্ট হয় না। তুমি আগের মতোই আছ।

বম্বে গিয়ে হৃষীকেশ মুখার্জীর সাথে দেখা করেছি। উনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন সহযোগিতা করার। ভেবেছি যদি কোনোদিন দেশে ফিরতে না পারি তা হলে এখানেই কিছু একটা করতে তো হবে। যদি বোম্বেতে কিছু করা যায়।

ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হবার পরে ফিরে এলাম আবার পুরানো আস্তানায়। ৩নং ওয়ারীতে ওঠা হলো না। ২৬ নম্বরে যারা আশ্রয় দিয়েছিল তারা আমাকে ঠাঁই দিয়েছিল। পরে স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে আস্তে আস্তে আমি ঢাকা নিয়ে এসেছি।

‘৭১ গেল। এল ১৯৭২ সাল। এ বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে বাংলাদেশে এলেন সত্যজিৎ রায়। ওনার সাথে আমার আগেই পরিচয় ছিল। কলকাতায় তার বাড়িতেও গিয়েছি। উনি মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। ওনার পূর্বপুরুষরা তো এক সময় কিশোরগঞ্জের এদিকে ময়মনসিংহে থাকতেন।

সত্যজিৎ রায় যে বার ঢাকা এলেন, আমি সেবার ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ ছবির স্ক্রিপ্ট করে ফেলেছি। ফিনান্সিয়ারও রেডি হয়ে গেছে। সত্যজিৎ রায়কে স্ক্রিপ্ট দেখাতে গেলাম। বললাম, ‘একটু দেখবেন?’

উনি বললেন, ‘না। আমি অন্যের স্ক্রিপ্ট করেও দেই না। যারটা তারই করা ভালো। পরিচালক নিজের স্ক্রিপ্ট নিজেই করবে। সে অন্যকে দেখাবে না।’

সত্যজিৎ রায়ের এ কথাটা খুবই ভালো লাগল। এরপর ছবিটি তৈরি করলাম। ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’তে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অনেক কিছুই স্থান পেয়েছে।