Main menu

বাংলা ক্ল্যাসিক। দ্বিজ কানাইয়ের মহুয়া।

এইটা কাহিনিটার পাঁচ নাম্বার ভার্সন।

দ্বিজ কানাই ১৫০০/১৬০০ সালের দিকে এই কাহিনিটা বান্ধেন। গ্রেটার মৈমনসিংহ এলাকায় এইটা গাওয়া হইতো। নেত্রকোণা জেলার সান্দিকোনার মসকা গ্রামের সেখ আসক আলী আর উমেশচন্দ্র দে’র এইটা জানা ছিল। তাদের কাছ থিকা এই কাহিনি সংগ্রহ করছিলেন চন্দ্রকুমার দে, ১৯০০ সালের দিকে। তারপরে এইটা এডিট করছিলেন শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন। ছাপাইছিলেন এবং অনেক প্রচার প্রচারণা করছিলেন। উনার ‘প্রাচীন পল্লীগীতিকা’রে  এখন কাহিনির আকারে লিখতেছি আমি।

শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন ২৪টা অধ্যায়ে ভাগ কইরা আলাদা আলাদা নাম দিছিলেন। আমি নামগুলা চেইঞ্জ করছি, আলাদা কইরা নাম না দিয়া, কাহিনির ভিতর থিকাই নামগুলা নিছি। অধ্যায় বা পার্টগুলাও অল্প একটু বদলাইছি। অনেকগুলা ফুটনোট দিছিলেন উনি, শব্দগুলার কি মানে, সেইগুলা বুঝানোর লাইগা, সেইগুলার অনেক কমাইছি, বেশিরভাগই অদরকারি মনে হইছে আমার। বানানে অনেক যফলা ইউজ করা হইছিল উচ্চারণের কাছাকাছি থাকার লাইগা, তো সেইগুলাও কিছু জায়গায় অদরকারি মনে হইছে আমার। উচ্চারণের কাছাকাছি থাকতে পারাটা লিখিত ফর্মে একটু ঝামেলার জিনিসই, অনেক ক্যারিকেচার করলেও মৈমনসিংহা উচ্চারণ অ্যাচিভ করাটা মেবি টাইফই হবে যারা ধরেন কানাডা আম্রিকায় জন্মানোর পরে বাংলাভাষা শিখছেন।… শব্দের বানানরে উচ্চারণের কাছাকাছি রাখার পরে পরিচিত লিখিত বানানের ব্যাপারে যতোটা কম চেইঞ্জ করা যায়, সেই চেষ্টা করছি।

আর দীনেশচন্দ্র সেন তো একটা অরিজিনাল ফরম্যাটে রাখার ট্রাই করছেন, সেইখানে আমি ফর্মটারেই চেইঞ্জ করছি গ্রসলি। কিন্তু ফর্মের দোহাই দিয়া নতুন শব্দ না ঢুকায়া পুরান যত শব্দ আছিল, বেশিরভাগ সময় সেইগুলাই রাখার ট্রাই করছি। কারণ আমার মনে হইছে, বলা বা পারফর্ম করা যেমন একটা ঘটনা, লেখা বা পড়া একইরকমের ঘটনা না। সুর কইরা পড়াটা বেশিরভাগ সময়ই আরামের। কিন্তু অনেক সময় মনেহয় অভ্যাসের কারণেই বেশি কনসানট্রেশন দিতে হয় সুরটাতে, বা সুরটা মেইন ঘটনা হয়া উঠে, তখন পড়াটা ঝামেলারই হয় কিছুটা। তো, পড়ার জন্য সুরটারে কিছুটা আলগা কইরা কাহিনির মতন বলাটা বেটার না ঠিক, বরং স্মুথ ও রিলেটিভলি সহজ একটা এক্সপেরিয়েন্স দিতে পারে হয়তো। এইভাবে ভাবছি। মানে, একটা জিনিস যখন একটা মিডিয়াম থিকা আরেকটা মিডিয়ামে আসে তখন এমনিতেই ফর্মের কিছুটা চেইঞ্জ হওয়ার কথা। যেই জিনিস আমি বলবো, লেখার সময় হয়তো একইভাবে লিখবো না। তো, বলার জিনিসটারে লিখলে কি রকম হইতে পারে, সেইরকম একটা এক্সপেক্টশন থিকা লেখার জিনিসটারে সাজাইতে চাইছি আমি। 

তবে মোস্টলি যেই ঘটনাটা ঘটছে, শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন এইটারে একটা ‘আঞ্চলিক সাহিত্য’ হিসাবে রিড করছেন, যারে তিনি রক্ষা করতেছেন বা উদ্ধার করছেন, যেইটা আমাদের বাংলা সাহিত্যে স্থান পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আমি এইরকম মার্জিনাল জায়গা থিকা দেখি নাই। এইটা গ্রাম্য, আঞ্চলিক কোন জিনিস না, বরং এইটাই বাংলা সাহিত্য, মেইনস্ট্রিম ঘটনা। এইটারে বাংলা ভাষা, বাংলা ক্ল্যাসিক হিসাবে আমি পড়ছি আর পড়ার সাজেশন দিতেছি।

 

ই.হা.
ডিসেম্বর, ২০১৯ – জানুয়ারি, ২০২০

 

…………………………………………………………

নমশুদ্রের বাহ্মণ দ্বিজ কানাই নামক কবি ৩০০ বৎসর পূর্বে এই গান রচনা করেন। প্রবাদ এই, দ্বিজ কানাই নমশূদ্র-সমাজের অতিহীনকূল-জাতা এক সুন্দরীর প্রেমে মত্ত হইয়া বহু কষ্ট সহিয়াছিলেন, এজন্যই ‘নদের চাদ’ ও ‘মহুয়া’র কাহিনীতে তিনি এস প্রাণঢালা সরলতা প্রদান করিতে পারিয়াছিলেন। নদের চাদ ও মহুয়ার গান একসময় পূর্ব-মৈমনসিংহের ঘরে ঘরে গীত ও অভিনীত হইত। কিন্তু উত্তরকালে ব্রাহ্মণ্য-ধৰ্ম্মের কঠোর শাসনে এই গীতিবর্ণিত প্রেম দুর্নীতি বালয়া প্রচারিত হয়, এবং হিন্দুরা এই গানের উৎসাহ দিতে বিরত হন।…

গীতিবর্ণিত ঘটনার স্থান নেত্রকোণার নিকটবর্তী। খালিয়াজুরি থানার নিকট-রহমৎপুর হইতে ১৫ মাইল উত্তরে। “তলার হাওর” নামক বিস্তৃত হাওর’–ইহারই পূৰ্বে বামনকান্দি, বাইদার দীঘি, ঠাকুরবাড়ীর ভিটা, উলুয়াকান্দি প্রভৃতি স্থান এখন জনমানবশূন্য হইয়া রাজকুমার ও মহুয়ার স্মৃতি বহন করিতেছে। এখন তথায় কতকগুলি ভিটামাত্র পড়িয়া আছে। কিন্তু নিকটবর্তী গ্রামসমূহে এই প্রণয়িযুগ্মের বিষয় লইয়া নানা কিংবদন্তী এখনও লোকের মুখে মুখে চলিয়া আসিতেছে। যে কাঞ্চনপুর হইতে “হোমরা” বেদে মহুয়াকে চুরি করিয়া লইয়া যায়—তাহা ধনু নদীর তীরে অবস্থিত ছিল।

নেত্রকোণার অন্তর্গত সান্দিকোনা পোষ্টাফিসের অধীন মসকা ও গোরালী নামক দুইটি গ্রাম আছে—মসকা গ্রামের সেক আসক আলী ও উমেশচন্দ্র দে এবং গোরালীর নসুসেকের নিকট হইতে এই গানের অনেকাংশ সংগৃহীত হয়। ১৯১২ খৃষ্টাব্দের ৯ই মার্চ আমি চন্দ্রকুমারের নিকট হইতে এই গাথা। পাইয়াছি। চন্দ্রকুমার দে যেভাবে গীতিটি পাঠাইয়াছিলেন, তাহাতে… গোড়ার গান শেষ আর শেষের গান গোড়ায় এই ভাবে গীতিকাটি উলট-পালট ছিল, আমি যথাসাধ্য এই কবিতাগুলি পুনঃ পুনঃ পড়িয়া পাঠ ঠিক করিয়া লইয়াছি।

এই গানের মোট ৭৫৫ ছত্র পাওয়া গিয়াছে, আমি তাহা ২৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত করিয়া লইয়াছি।

 

শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন
১৯২৩

 

…………………………………………………………

 

কিবা গান গাইবাম আমি

পূবেতে বন্দনা করলাম পূবের ভানুশ্বর।
এক দিকে উদয়রে ভানু চৌদিকে পশরৎ|

দক্ষিণে বন্দনা গো করলাম ক্ষীর নদী সাগর।
যেখানে বানিজজি করে চান্দ সদাগর॥

উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাস পর্বত।
যেখানে পড়িয়া গো আছে আলীর মালামের পাথুথর॥

পশ্চিমে বন্দনা গো করলাম মক্কা এন স্থান।
উরদিশে বাড়ায় ছেলাম মমিন মুসলমান ॥

সভা কইরা বইছ ভাইরে ইন্দু মুসলমান।
সভার চরণে আমি জানাইলাম ছেলাম ॥

চাইর কুনান্ট পিরথিমি গো বইন্ধ্যা মন করলাম স্থির।
সুন্দর বন মুকামে বন্দলাম গাজী জিন্দাপীর॥

আসমানে জমিনে বন্দলাম চান্দে আর সুরুয।
আলাম-কালাম বন্দুম কিতাব আর কুরাণ॥

কিবা গান গাইবাম আমি বন্দনা করলাম ইতি।
উস্তাদের চরণ বন্দলাম করিয়া মিন্নতি॥

 

. মহুয়া সুন্দরী

এইখান থিকা উত্তরের পথে যাইতে থাকলে ছয় মাস পরে পড়বো গারো পাহাড়। তারও উত্তরে আছে হিমানী পরবত। সেই পরবতের পারে আছে সাত সমুদ্দুর। সেইখানে এক বন, যেইখানে চান্দ নাই, সুরুয় নাই। কিছুই দেখা যায় না। বাঘ ভালুক বাস করে। মাইন্‌সের কোন লরাচরা নাই।

সেই বনে থাকতো হুমরা বাইদ্দা। এই কাহিনি হুমরা বাইদ্দার।

বেটা আছিল ডাকাইত, ডাকাইতের সদ্দার। মাইনকা নামে তার এক ছুড ভাই আছিল। নানান দেশ ঘুরত অরা। ঘুরতে ঘুরতে একদিন ধনু নদীর পারে যাইয়া উপস্থিত হইল। গেরামের নাম কাঞ্চনপুর। সেইখান বসতি ছিল এক বরাম্মনের। তার ছিল ছয় মাসের শিশু কইন্যা। নিশাকালে হুমরা তারে করল চুরী। চুরী কইরা দেশ ছাইরা গেল।

ছয় মাসের শিশু কন্যা বচ্ছরের হৈল। পিঞ্জরে রাখিয়া পঙ্খী যেমনে পালে, সেইরকম যতন কইরা তারে পালতে লাগলো হুমরা বাইদ্দা। এক দুই তিন কইরা ১৬ বছর হৈল। অনেক যতন কইরা তারে সাপের খেলা শিখাইলো। সাপের মাথার মণি জ্বলা দেখলে যেমন মানুশ পাগল হয়, বাইদ্দার মেয়েরে দেখলে এইরকম পাগল হওয়ার দশা হয়।

বাইদ্দা বাইদ্দা করে লোকে বাইদ্দা কেমন জনা।
আন্দাইর ঘরে থুইলে কন্যা জ্বলে কাঞ্চা সোনা॥

হাটিয়া না যাইতে কইন্যার পায়ে পরে চুল।
মুখেতে ফুট্টা উঠে কনক চাম্পার ফুল॥

আগল ডাগল আখিরে আসমানের তারা।
তিলেক মাত্র দেখলে কইন্যা না যায় পাশুরা॥

বাইদ্দার কইন্যার রূপে ভাইরে মুনীর টলে মন।
এই কইন্যা লইয়া বাইদ্দা ভরমে তিরভুবন॥

পাইয়া সুন্দরী কইন্যা হুমরা বাইদ্দার নারী।
ভাবা চিন্তা নাম রাখল “মহুয়া সুন্দরী” ।

পুরাটা

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone

কোহেনের কবিতা

লিওনার্দ কোহেনরে আমরা গায়ক হিসাবেই চিনি, যিনি সুন্দর লিরিকসও লিখছেন। কিন্তু উনি নভেলও লিখছিলেন, কবিতাও। বেশ কয়েকটা কবিতার বই আছে উনার।

কবিতাতে উনি উনার গানের লিরিকসের চাইতে আরো অনেক বেশি ওয়াইল্ড, প্যাশোনেটের পাশাপাশি। একটা মুচকি মুচিক হাসির কিছু ঘটনাও আছে। সাফারিংস। কিছু দেখতে চাওয়া আর কষ্ট হইলেও মাইনা নেয়ার একটা ট্রাই করা।

তো, মেইনলি উনার দুইটা কবিতার বই থিকা এই কবিতাগুলা তরজমা করা। একটা হইতেছে উনার “সিলেক্টেড পোয়েমস : ১৯৫৬ – ১৯৬৮“, এই বইয়ের কবিতাগুলা তরজমা করছিলাম ২০১৭ সালের দিকে। আর পরে ২০১৯ সালে উনার “দ্য এনার্জি অভ স্লেভস“ এর কিছু কবিতাও তরজমা করি। এইখানে দুইটা পার্টে দুইটা বইয়ের কিছু কবিতাগুলা রাখা হইলো।

 

ই. হা.

………………………………………………………………………………………..

১.

দ্য এনার্জি অফ স্লেভস

সব মানুষেরা আনন্দ দেয় তোমারে

যদি তুমি কখনো পড় এইটা
অই মানুষটার কথা ভাইবো, যে এইটা লিখতেছে

তোমার হয়া সে এই দুনিয়াটারে ঘৃণা করতো

 

দ্য এনার্জি অফ স্লেভস

প্রেম হইতেছে একটা আগুন
এইটা পুড়ায় সবাইরে
এইটা বিকৃত করে সবাইরে
এইটা হইতেছে দুনিয়া’টার ছুঁতা
বিশ্রী হওয়ার লাইগা

 

দ্য এনার্জি অভ স্লেভস

সব মানুষেরই
আছে বিট্রে করার একটা তরিকা
এই যে রেভিউলেশন
এইটা হইতেছে আমার

 

দ্য এনার্জি অভ স্লেভস

আমার ঘৃণার কোন শেষ নাই
যদি না তুমি জড়ায়া ধইরা রাখো আমারে
যতো আজবই লাগুক
আমি হইতেছি জোয়ান অফ আর্কের ভূত
আর হইতেছি ত্যক্ত বিরক্ত
স্বরগুলার কনসিকোয়েন্স
আমারে শক্ত কইরা জড়ায়া ধরো
তা নাইলে আমি ঘামতেই থাকবো
যেইখানে আমি ছিলাম

 

দ্য এনার্জি অভ স্লেভস

আমি মারা যাইতেছি
কারণ তুমি আমার লাইগা
মরো নাই
আর এই দুনিয়া
এখনো তোমারে ভালোবাসে

আমি এইটা লিখতেছি কারণ আমি জানি
যে তোমার চুমা
জন্মায় অন্ধ হয়া
গানগুলার উপরে, যারা তোমারে ছুঁইয়া যায়

আমি চাই নাই একটা পারপাস হইতে
তোমার লাইফে
আমি চাইছি হারায়া যাইতে
তোমার চিন্তাগুলার ভিতরে
যেমন তুমি শোনো নিউইয়র্ক সিটিরে
যখন তুমি ঘুমায়া যাও

 

পুরাটা

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone

পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ।। সৈয়দ মুজতবা আলী।। কিস্তি ২ ।।

।।

…………………………………

ভাষা তো পাওয়ারের লগে রিলেটেড একটা ঘটনা। ব্রিটিশ আমলে ইংলিশ যে সরকারি দফতরের ভাষা আছিল, সেইটা তো পাওয়ারের কারণেই। তো, ব্রিটিশরা যখন নাই তখন তো আরেকটা ভাষার দরকার।

ইন্ডিয়া চাইলো, হিন্দি ভাষারে এস্টাবলিশ করতে, না পাইরা ইংলিশটারে রাইখা দিয়া হিন্দিরেও প্রমোট করলো। এখন ইন্ডিয়াতে যতদিন হিন্দি চালু আছে ততদিন দিল্লীতে নর্থ ইন্ডিয়ানদের পাওয়ার কমার কোন কারণ আসলে নাই। (খালি ভাষাই না, ভাষার ভিতরে অ্যাকসেন্ট আর ডায়ালেক্টের ব্যাপারও আছে, কুষ্টিয়া-খুলনার দিকের কথারে যত বাংলা লাগে, সিলেট-চিটাগাংয়ের ডায়ালেক্টরে তো এতোটা লাগে না। এইরকমের ব্যাপারগুলা আছে।) আর এই পাওয়ারের কারণেই দেখবেন, পশ্চিমবঙ্গের সোকল্ড শিক্ষিত লোকজন হিন্দিরে যতোটা হেইট করেন, ইংলিশরে এতোটা না। কারণ উনারা ইংলিশ তো জানেন কিছুটা কলোনিয়াল আমল থিকা, কিন্তু নতুন কইরা হিন্দি শিখাটা তো পসিবল না! বা ইংরেজদের নিজেদের মালিক বইলা মানতে যতোটা রাজি আছিলেন, সেই জায়গায় অন্য নেটিভ ইন্ডিয়ানদের মালিক বইলা ভাবাটাও মুশকিলেরই হওয়ার কথা।…

পাকিস্তানেও একইরকমের সিচুয়েশনই ছিল, ইংলিশের জায়গায় কোনটা আসবো, এই কোশ্চেনটা উঠছিল। রাষ্ট্র যেহেতু সেন্ট্রালাইজড একটা জিনিস, একক একটা জিনিস তো থাকা লাগবে। মানে, ইংলিশের বিপরীতে আরেকটা অপশনের কথাই উঠছিল। 

জিন্নাহ কিন্তু ইংলিশেই কইছিলেন – উর্দু’রে স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ করার কথা; উর্দুতে কন নাই। আর যেই স্টুডেন্ট এইটার প্রতিবাদ করছিলো, সে কিন্তু ‘না’ কয় নাই; ‘নো’-ই কইছিলো! ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না? যেই দুইটা ভাষা’র লাইগা ফাইটটা চলতেছে, সেই দুইটাই নাই; এইটা নিয়া কথা হইতেছে অন্য আরেকটা ভাষাতেই।

জিন্নাহ আসলে ইংরেজি জানা লোকদেরকেই শুনাইতে চাইতেছিলেন (উনার উর্দু না বলতে পারা’র কথা মনে রাইখাই বলতেছি)। যারা খালি বাংলা জানে, ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়া উনারা কিছু কইতে পারবে এইরকম গণতন্ত্রে উনি বিলিভই করেন নাই আসলে। যিনি রিভোল্ট করলেন, উনিও জিন্নাহরে জানাইতে চাইছিলেন, বাংলা তো আমরা জানি, ইংরেজির ভিতর দিয়াই। উনি জিন্নাহরে প্রটেস্টই করছেন, অথরিটি’টারে যে উনি চিনেন এইটা জানাইছেন।

মজার ব্যাপার হইলো, “অরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়…” গানটা নিয়া; ‘কাইড়া’, কি রকম অদ্ভূত বাংলা! লিখতে গেলেও ফানি লাগে না একটু, ব্যাপারটা! এই বাংলা-ভাষা ভাষা আন্দোলনের ‘নো’ বেঙ্গলিরা চাইছিলেন বইলা মনে হয় না। এইখানে পাওয়ারের ঘটনাটা আরো ক্লিয়ার হওয়ার কথা আসলে। 

তো, সৈয়দ মুজতবা আলী তার আর্গুমেন্টের ভিতরে বারবার ভাষা কেমনে অন্য সব সোশিওপলিটিক্যাল জায়গাগুলাতে দখলের জায়গাগুলা জারি রাখে, সেই জায়গাগুলারে খোলাসা করতেছিলেন।  এই জায়গা থিকা দেখতে গেলেও, এইটা ইন্টারেস্টিং একটা লেখা। 

ই. হা.

…………………………………

ইংরেজও ‘ভদ্রলোক’ ও ‘ছোটলোকের ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা করে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। ইংরেজ কৃষি রিপোর্ট বের করত ইংরেজি ভাষায় এবং চাষাভুষাদের শেখাত বাংলা! বোধ হয় ভাবত বাঙলি ‘মাছিমারা’ কেরানী যখন ইংরেজি  না জেনেও ইংরেজি দলিলপত্র নকল করতে পারে তখন ইংরেজি অনভিজ্ঞ চাষাই বা ইংরেজিতে লেখা কৃষি রিপোর্ট, আবহাওয়ার খবরাখবর পড়তে পার, না কেন? এই পাগলামি নিয়ে যে আমরা কত ঠাট্টা-মস্করা করেছি সেকথা হয়তো উর্দুওয়ালারা ভুলে গিয়েছেন কিন্তু আমরা ভুলি নি। তাই শুধাই, এবার কি আমাদের পালা? এখন আমরা কৃষি-রিপোর্ট, বাজার দর, আবহাওয়ার খবরাখবর বের করব। উর্দুতে আর চাষীদের শেখাব বাংলা! খবর শুনে ইংরেজ লণ্ডনে বসে যে অট্টহাসি ছাড়বে আমরা সিলেটে বসে তার শব্দ শুনতে পাব।

উর্দুওয়ালারা বলবেন, ‘ক্ষেপেছ? আমরা উর্দু কৃষি রিপোর্ট বাংলাতে অনুবাদ করে চাষার বাড়ীতে পাঠাব।’

উত্তরে আমরা শুধাই সে অনুবাদটি করবেন কে? কৃষি রিপোর্টের অনুবাদ করা তো পাঠশালা-পাসের বাংলা বিদ্যে দিয়ে হয় না। অতএব বাংলা শেখানোর জন্য। হাইস্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতে হবে। অর্থাৎ আমাদের সকলকে স্কুল। কলেজে বাংলা উর্দু দুই-ই বেশ ভালো করে শিখতে হবে (কৃষি রিপোর্ট ছাড়া উর্দুতে লেখা অন্যান্য সৎসাহিত্যও তাে বাংলাতে তর্জমা করতে হবে); ফলে দুই কুলই যাবে, যেমন ইংরেজ আমলে গিয়েছিল—না শিখেছিলাম, বাংলা লিখতে, না পেরেছিলাম ইংরেজি ঝাড়তে।

ইংলণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানীতে যে উচ্চশিক্ষার এত ছড়াছড়ি, সেখানেও দশ হাজারের মধ্যে একটি ছেলে পাওয়া যায় না যে দুটো ভাষায় সড়গড় লিখতে পারে। আরব, মিশরের আলিম-ফাজিলগণও এক আরবী ছাড়া দ্বিতীয় ভাষা জানেন না।

না হয় সব কিছুই হল কিন্তু তবু মনে হয়, এ বড় অদ্ভুত পরিস্থিতি—যে রিপাের্ট পড়নেওয়ালার শতকরা ৯৯ জন জানে বাংলা সে রিপাের্টের মূল লেখা হবে উর্দুতে! ব্যবস্থাটা কতদূর বদখত বেতালা তার একটা উপমা দিলে আমার বক্তব্য খোলাসা হবে: যেহেতু পূর্ব পাকিস্থানে উপস্থিত শ’খানেক রুটি-খানেওয়ালা পাঞ্জাবী আছেন অতএব তাবৎ দেশে ধানচাষ বন্ধ করে গম ফলাও! তা সে আলবাধা, জলে-টৈ-টম্বুর ধানক্ষেতে গম ফলুক আর নাই ফলুক!

উর্দুওয়ালারা তবু বলবেন, ‘সব না হয় মানলুম, কিন্তু একথা তো তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না যে কেন্দ্রের ভাষা যে উর্দু সে সম্বন্ধে পাকাপাকি ফৈসালা হয়ে গিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের লোক যদি উর্দু না শেখে তবে করাচীর কেন্দ্রীয় পরিষদে তারা গাকগাক করে বক্ততা বাড়বেনই বা কি প্রকারে, এবং আমাদের ছেলেছোকরারা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ডাঙর ডাঙর নোকারি বা করবে কি প্রকারে?

বক্ততা দেওয়া সম্বন্ধে আমাদের বক্তব্য এই যে, আমরা যত ছেলেবেলা থেকে যত উত্তম উদুই শিখি না কেন, উর্দু যাদের মাতৃভাষা তাদের সঙ্গে আমরা কস্মিনকালেও পাল্লা দিয়ে পেরে উঠব না। আমাদের উচ্চারণ নিয়ে উর্দু-ভাষীগণ হাসিঠাট্টা করবেই এবং সকলেই জানেন উচ্চারণের মস্করাভেংচানি করে মানুষকে সভাস্থলে যত ঘায়েল করা যায় অন্য কিছুতেই ততটা সুবিধে হয় না। অবশ্য যাদের গুরদা-কলিজা লোহার তৈরী তারা এ সব নীচ ফন্দি-ফিকিরে ঘায়েল হবেন না কিন্তু বেশীরভাগ লোকই আপন উচ্চারণের কমজোরী বেশ সচেতন থাকবেন, বিশেষত যখন সকলেই জানেন যে প্রথম বহু বৎসর ধরে উত্তম উচ্চারণ শেখবার জন্য ভালো শিক্ষক আমরা যোগাড় করতে পারব না, এবং একথাও বিলক্ষণ জানি যে একবার। খারাপ উচ্চারণ দিয়ে বিদ্যাভ্যাস আরম্ভ করলে অপেক্ষাকৃত বেশী বয়সে সে জখমী উচ্চারণ আর মেরামত করা যায় না। দৃষ্টান্তের জন্য বেশী দূর যেতে হবে না। পূর্ববঙ্গের উর্দু ভাষাভাষী মৌলবী সাহেবদের উচ্চারণের প্রতি একটু মনোযোগ দিলেই তাদের উচ্চারণের দৈন্য ধরা পড়ে। সে উচ্চারণ দিয়ে পূর্ব বাংলায় ‘ওয়াজ দেওয়া চলে কিন্তু যাদের মাতৃভাষা উর্দু তাদের মজলিসে মুখ খোলা যায় না। এমন কি দেওবন্দ রামপুর ফের্তা কোনো কোনো মৌলবী সাহেবকে উচ্চারণ বাবতে শরমিন্দা হতে দেখেছি, অথচ বহুক্ষেত্রে নিশ্চয় জানি যে এদের শাস্ত্রজ্ঞান দেওবন্দরামপুরের মৌলানাদের সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে। কিন্তু এরা নিরুপায়, ছেলেবেলা ভুল উচ্চারণ শিখেছিলেন, এখনো তার খেসারতি ঢালছেন।

কিন্তু কি প্রয়োজন জান পানি করে ছেলেবেলা থেকে উর্দু উচ্চারণে পয়লানম্বরী হওয়ায়? অন্য পন্থা কি নেই?

পুরাটা

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.