আইনসভায় ইলেকশন।
চারদিকে ক্যানভাসের ধুম পড়েছে। দিন-রাত সভা-সমিতি ও বক্তৃতা চলছে। কর্মী ও ক্যানভাসারদের তাগিদে সবাই অস্থির। যারা বাড়িতে থাকে, তারা বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে, যারা মাঠে কাজ করে তারা মাঠ ছেড়ে ঘরের কোণে আশ্রয় নিচ্ছে।
ছয়আনা ট্যাক্স দেনেওয়ালারা এই প্রথম ভোট দিবার মালিক হয়েছেন। সুতরাং ভোটার অনেক। কিন্তু প্রার্থীও কম নয়। দু’তিনটি থানা মিলে একজন মেম্বর পাঠাবে; কাজেই ক্যানডিডেটের ভিড় হয়েছে খুব বেশি। সাধ্যমত ক্যানভাসও করছে সবাই!
কিন্তু সবার চেয়ে বেশি ক্যানভাস চলছে খানবাহাদুর সাহেবের এবং মুনশি সাহেবের। খানবাহাদুর সাহেব এ অঞ্চলের লোক, কিন্তু সদরে ওকালতি করেন। সদরে দু’তলা ও গায়ে একতলা পাকা ইমারত আছে। তিনি সদরে আঞ্জুমন-ই-ইসলামিয়ার সেক্রেটারি। এই আঞ্জুমনের তরফ থেকেই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। আঞ্জুমনের তরফ থেকে শহরের বহু উকিল-মোক্তার ইশতেহার জারি করেছেন খানবাহাদুর সাহেবের সমর্থনে। এইসব ইশতেহার বস্তা-বস্তা বাড়ি-বাড়ি হাটে-বাজারে ও সভা-সমিতিতে বিলি হচ্ছে।
ঐসব ইশতেহারে অনেক ভাল-ভাল কথা লেখা হয়েছে। কিন্তু পাড়াগাঁয়ের লোক অধিকাংশই উম্মি। ঐসব ইশতেহারের ভাল কথা তারা পড়তে পারে না। বুড়ারা ঐসব ইশতেহারে করে বাজার থেকে মাছ নিয়ে যায়; আর ছোঁড়ারা ঘুড্ডি বানায়।
কিন্তু ক্যানভাসাররা ছাড়বার পাত্র নয়। তারা সভা-সমিতিতে জুম্মার নামাজের জমাতে এবং হাট-বাজারের অলি-গলিতে দাঁড়িয়ে সেইসব ইশতেহার গলার জোরে চিৎকার করে পড়ে শুনায়। সুতরাং পড়তে না জেনেও ভোটাররা ঐসব ইশতেহারের কথাগুলি মোটামুটি মুখস্থ করে ফেলেছে।
কথাগুলি এই: মুসলমানরা রাজ্য-হারা হয়েছে। তারা শিক্ষা-দীক্ষায় অপরাপর লোকের অনেক পিছে পড়ে গিয়েছে। বাণিজ্য ব্যবসাতেও মুসলমানদের স্থান নেই। এ সব ফিরে পেতে হলে এবং ধর্মরক্ষা করতে হলে মুসলমানদের দলবদ্ধ হওয়া দরকার। এই উদ্দেশ্যেই আঞ্জুমন কায়েম করা হয়েছে। খানবাহাদুর সাহেবকে ভোট দিয়ে আঞ্জুমনকে শক্তিশালী করা সকল মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য।
প্রায় সকলেই বুঝেছে কথাগুলো ঠিক। সুতরাং খানবাহাদুর সাহেবকে ভোটও তারা দিত। কিন্তু গোলমাল বাধিয়েছে মুনশি সাব। ইশতেহারের বস্তা তার ছোট এবং কর্মীর সংখ্যা তার কম বটে, কিন্তু মুনশিজী এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। করেন তিনি খন্দকারী পেশা। তার উপর আছে তার একটি পয়ত্রিশ টাকা দামের ঘোড়া! দৌড়ে সে ঘোড়া ঘন্টায় চারি মাইলের কম যায় বটে, কিন্তু মাসের মধ্যে ত্রিশদিন চব্বিশ ঘন্টাই সে পিঠে গদি বহন করতে পারে।
এই ঘোড়া এবং জন বিশ-ত্রিশেক ছেলে-ছোকরা নিয়েই মুনশিজী সারা অঞ্চল মুখরিত করে তুলেছেন। তিনি ইশতেহার ছাপিয়ে বিলি করেছেন; বক্তৃতা করে সভা মাতিয়েছেন।
তার বক্তৃতা ও ইশতেহারের কথাগুলো এই: চাকরি-বাকরি আসল কথা নয়। চাকরি পাবে দু’দশজন বড় লোকে এম.এ. বি.এ. ছেলেপিলে। আসল কথা হল খাজনা ও ঋণ। জমিদার ও মহাজনের জুলুমে দেশের সকল লোক মারা পড়েছে। কৃষক-প্রজারা দিনরাত খেটে জমি থেকে ফসল ফলায়। জমিদার ও বড়লোকেরা সেই ফসলের টাকায় দালান-কোঠা তোলে ও মোটর দৌড়ায়; কৃষক প্রজারা না খেয়ে মরে। তাই মুনশিজীরা প্রজাপার্টি গঠন করেছেন বড়লোকের জুলুম বন্ধ করবেন। অতএব মুনশিজীকে ভোট দেওয়া সকল কৃষক-প্রজারই উচিৎ। উকিল-মোখতারকে ভোট দেওয়া উচিত নয়। কারণ উকিল-মোখতারই জমিদারি জুলুমের হাতিয়ার ।
খানবাহাদুরের লোকেরা দেখল বিপদ। সব লোক মেতে উঠেছে জমিদারি উচ্ছেদের নামে। শুধু ধর্মের কথা আর লোকেরা তেমন শুনছে না।
বলল তারা খানবাহাদুরকে সব কথা। খানবাহাদুর অগত্যা বললেন: তোমরাও চালাও জমিদারি উচ্ছেদের কথা। যা বললে লোকে ভোট দেয় তাই বল।
তাই বলা হয়। আবার ইশতেহার জারি হল: খানবাহাদুর সাহেব আঞ্জুমনও জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ চায়, খাজনা কম করতে চায়, বড়লোকের জুলুম দূর করতে চায়। Continue reading →