(বই থেকে) বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ – কামরুদ্দীন আহমদ (এক) Featured
[কামরুদ্দীন আহমদ (৮ সেপ্টেম্বর ১৯১২ – ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২) তিন পার্টে উনার অটোবায়োগ্রাফি লেখছেন – ‘বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ’ (১ম ও ২য় খন্ড) এবং ‘বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী… আইডিওলজিকালি উনি ‘বাঙালি জাতিয়তাবাদের’ লোক ছিলেন এবং অই জায়গা থিকাই ঘটনাগুলারে দেখছেন, এবং নানান সময়ে নানান হিসি্ট্রকাল ফিগার ও ইভেন্ট নিয়া কমেন্ট করছেন, যেইগুলারে হিসি্ট্রকাল ট্রুথ হিসাবে কন্সিডার না কইরা উনার নিজস্ব পারসপেক্টিভ হিসাবে রিড করতে পারাটাই বেটার…
নিচের অংশগুলা উনার বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ (১ম খন্ড) বইয়ের আশ্বিন, ১৩৮২ এডিশন থিকা নেয়া হইছে…]
আবুল হুসেন

আবুল হুসেন
খাজা সাহেবরাই ঢাকার মুসলমানদের নেতৃত্ব করতেন। বুদ্ধি বা বিদ্যার জন্য নয় – বৃটিশরাজ তাদের সুনজরে দেখতেন বলে। খাজা সাহেবদের মস্ত বড় জমিদারী ছিল কিন্তু ঢাকার রইস বাসিন্দাদের জন্য শিক্ষা-দীক্ষার কোন ব্যবস্থাই তারা করেননি। এর কারণ জানা গেল যখন ১৯২১-২২ সনে আবুল হুসেন এম.এ., এল.এল. খাজা আহসানউল্লাহকে লিখিত তাঁর পিতা নবাব আবদুল গনি সাহেবের একখানা পত্র তার খবরের কাগজে প্রকাশ করেন। এ পত্রখানা তার হাতে পড়ে যখন ঢাকার আবদুল গনি চৌধুরী বঙ্গীয় পরিষদে ওয়াকফ্ আইনের উপর একটি বিল উপস্থিত করার জন্য আবুল হুসেন সাহেবের সাহায্য চান। আবুল হুসেন সাহেব নওয়াব ষ্টেটের ওয়াকফ্ফ জমিদারীগুলোর কাগজপত্র পরীক্ষা করছিলেন, নবাব সাহেব তার পুত্রকে লিখেছিলেন যে, তিনি যেন মনে রাখেন যে ঢাকার কুট্টিরা তাদের প্রজা নয় – অথচ তাদের প্রজার মত ব্যবহার করতে হবে – খানদানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এ সব লোক যদি লেখাপড়া শিখে বাস্তব অবস্থা জানতে পারে তবে খানদানের নেতৃত্বের পরিকল্পনা ছাড়তে হবে। তাদের অন্যভাবে টাকা-পয়সা দিয়ে সময় সময় সাহায্য করতে-কিন্তু স্কুলের ব্যবস্থা না করতে। ঐ চিঠি প্রকাশ হবার পর আবুল হুসেন সাহেবের প্রতি নবাবেরা কেবল বিরূপই হননি তাকে বিপদে ফেলার চেষ্টাও করেছেন। কেবলমাত্র শহরের বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের জন্য অনেকটা বেঁচে গেছেন।
(পেইজ ৩৪)
সুফিয়া কামাল
আমার আজ যার কথা বেশী মনে পড়ছে তিনি হচ্ছেন শায়েস্তাবাদের নবাবজাদা সৈয়দ মোহাম্মদ হুসেন সাহেব। তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। তিনি যখনই বিকেলে সান্ধ্য ভ্রমণে (Evening walk) বেরুতেন তখন তার পরনে থাকত খাকী হাফ-প্যান্ট, সাদা হাফ-সার্ট, মাথায় সোলার হ্যাট, হাতে বেড়াবার লাঠি, সঙ্গে একটি বিলেতি কুকুর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ডিগ্রী তার ছিল না – কিন্তু সে যুগে এমন কোন ইংরেজী সাহিত্যের বই ছিল না যা তিনি পড়েননি, অবশ্যই ওল্ড-ইংলিশ থেকে চসার-ল্যাংল্যান্ড পর্যন্ত ইংরেজী সাহিত্যের যুগটাকে বাদ দিয়ে। প্রত্যেক বইয়েরই নানা ধরনের সংস্করণ তার পাঠাগারে (Library) পাওয়া যেত – বিশেষ করে মরক্কো লেদারের ‘কভার” পাতলা (thin) ইংরেজী কাগজের সংস্করণ তিনি বেশী পছন্দ করতেন। বিকেল বেলা নদীর তীরে বেড়ানো ছাড়া প্রায় সমস্ত দিনই বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতেন। ডিকেন্স ও থেকারের অনেক সুন্দর মরক্কো বাইন্ডিং বই তিনি আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন-সঙ্গে কেমব্রিজ হিস্টরী অব ইংলিস লিটারেচার। শেকস্পিয়ারের পকেট এডিশন আজো অনেকগুলি আমার কাছে আছে।…
নবাবজাদা সাহেবের নিজের সংসার ছিল না, তাই তার ভাই সৈয়দ নেহাল হুসেনকে বিয়ে দিয়ে সংসার সৃষ্টি করলেন – আমার যতদূর মনে পড়ে নেহাল হুসেন তখন আইন পড়ছিল – তার স্ত্রী হয়ে এলেন সুন্দরী, শিক্ষিতা সুফিয়া বেগম – যিনি প্রথম জীবনে কেবল লাজুক বন্ধু, পরে সুফিয়া নেহাল হুসেন হলেন কবি। Continue reading