আমীর খুসরো’র ছাপ তিলাক Featured
হজরত আমীর খুসরো রহ. এমন কিছু বিষয়ের প্রবক্তা, যেগুলোর যে কোনও একটির আবিষ্কার-ই যে কাউকে বিখ্যাত ও অমর করে রাখতে সক্ষম। তিনি যে যে বিষয়ের প্রবক্তা:
১. সেতারের বর্তমান রূপ।
২. তবলার বর্তমান রূপ।
৩. অনেক রাগের জনক।
৪. কাওয়ালি।
ফারসি ও হিন্দাভি উভয় ভাষায় তিনি বিপুল পরিমাণ কবিতা, গজল ও গান রেখে গেছেন।
যে গানটি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি সেটি হলো, ‘ছাপ তিলাক’। সুফি তত্ত্বে এই ধরনের গানকে বলা হয় ‘কালাম’।
কালামটি হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া রা. এর দরগাহের সামা মজলিস তথা কাওয়ালি বৈঠকের জন্য রচিত।
কালামটি রচিত হয়েছে ৭০০ বছর আগে।
বলা হয়ে থাকে যে, আমীর খুসরো প্রথমবার নিজামুদ্দীন আউলিয়ার মজলিসে এসে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে সেই রাতেই এই গানটি রচনা করেন। এই বর্ণনাটি মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ।
যেখানে তিনি হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়াকে প্রিয়তম হিসেবে এবং নিজেকে তাঁর ভক্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন।
কালামটির গভীর অর্থ নিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয়, এটি মূলত একটি বিচ্ছেদ বা দূরত্বের প্রেক্ষাপটে লেখা। গুরু থেকে শিষ্যের আত্মিক দূরত্বের যন্ত্রণা এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা-ই এখানে মূল বিষয়বস্তু। অর্থগুলো বোঝা গেলে আরও ভালোভাবে এর আবেগ ও আবেদনটা বোঝা যাবে।
অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করছি।
…
ছাপ তিলাক সাব ছিনি রে মোসে ন্যায়না মিলায়কে
তুমি একবার চোখ মিলিয়ে আমার সব কেড়ে নিয়েছো। ‘ছাপ’ হল সিলমোহর। যা সরকারি বা ধর্মীয় পরিচয়চিহ্ন। আবার মুসলমানের কপালে নামাজের চিহ্ন। আর, ‘তিলক’ হলো, কপালের টিপ, হিন্দু ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের চিহ্ন। অর্থাৎ, শুধু দৃষ্টিসংযোগে আমার যাবতীয় পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে গেল। যা আমি ছিলাম। আমার ধর্ম, আমার বর্ণ, আমার সামাজিক মর্যাদা, সব এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে পড়ল। ছাপ ও তিলক, এই দু’টি ভিন্ন ধর্মের পরিচয়চিহ্ন একসাথে উল্লেখ করাটা ইন্টারেস্টিং। খুসরো বলছেন না যে শুধু হিন্দুর তিলক বা শুধু মুসলিমের ছাপ গেছে, দুটোই গেছে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিভাজনের যে কাঠামো সমাজ তৈরি করে, প্রেমের সামনে সেই কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সুফি দর্শনে ফানা হলো আত্মবিলোপ। যা, সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থা। নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে ঐশ্বরিক সত্তায় মিলিত হওয়া। এই লাইনে সেই ফানার মুহূর্তটি আছে। শুধু চোখের মিলনে, পরিচয়ের সমস্ত আবরণ খুলে পড়ে গেছে।
আমরা যাকে ‘আত্মপরিচয়’ বলি, সেটি মূলত একটি নির্মাণ। সমাজ, পরিবার, ধর্ম, শ্রেণী মিলিয়ে তৈরি। গভীর প্রেম বা তীব্র আবেগের মুখোমুখি হলে এই নির্মাণটি সাময়িকভাবে ভেঙে যায়। মনোবিশ্লেষণের ভাষায় এটি ‘ego dissolution’। যেখানে নিজের সীমারেখা আর থাকে না। যারা প্রেমে পড়েছেন সকলেই জানেন, কারো চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হয় ‘আমি আর আমি নেই’। আমার পূর্বের সত্তার মৃত্যু ঘটেছে। এর মানে হলো, সেই মুহুর্তে এক নতুন আমি’র জন্ম হলো, এবং আমার পুরনো যে ‘আমি’, তাকে হত্যা করেছে আমার প্রেমিক বা প্রেমিকা। সেই মুহুর্তে নতুন আমার জন্ম। এজন্যই হিন্দাভি বা উর্দু সাহিত্যে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে বলা হয় ‘ক্বাতিল’ বা হত্যাকারী। সেই মুহূর্তে সমস্ত পরিচয়, ইমেজ, আইডেন্টিটি, সব বিগলিত হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে এত বড় রূপান্তর ঘটানো, এটাই খুসরোর কবিত্বের শক্তি। গোটা একটি দার্শনিক সংকট তিনি একটি মাত্র দৃশ্যে তুলে ধরেছেন। কেবল দু’টো চোখের মিলন। Continue reading
