Main menu

গণ-ফ্যাসিজম (Ur-Fascism) – উমবের্তো একো [লাস্ট পার্ট] Featured

ফার্স্ট পার্ট

………..

এইখানে আমরা আমার কথার সেকেন্ড পার্টে আসি। এইখানে একটামাত্র নাজীজম আছে, ফ্রাঙ্কো’র আলট্রা-ক্যাথলিক ফ্যালগানিজমরে আমরা নাজীজম বলতে পারি না, এইটা ধইরা নিয়া যে নাজীজম হইতেছে ফান্ডামেন্টালি প্যাগান, বহুইশ্বরবাদী, আর এন্টি-ক্রিশ্চিয়ান, আর তা নাইলে এইটা নাজীজম না। অন্য দিক দিয়া, আপনি নানানভাবে ফ্যাসিজমের গেইমটা খেলতে পারেন, গেইমের নাম এতে কইরা চেইঞ্জ হয় না। ভিনগেনস্টাইনের মতে, ‘ফ্যাসিজম’র নোটেশন নিয়া যা ঘটে ‘খেলা’র নোটেশন নিয়াও একই ঘটনাই ঘটে। একটা গেইম কম্পিটিটিভ হইতে হবে বা তার বাইরে কিছু, এইখানে একজন বা তার বেশি লোক থাকতে হবে, এইটাতে কিছু পার্টিকুলার স্কিল লাগতে পারে অথবা কিছুই না, এইখানে টাকা-পয়সা জড়িত থাকতে পারে অথবা না। গেইম হইতেছে নানান ধরণের কাজের একটা সিরিজ যেইটা কিছু একটা ‘পারিবারিক মিলের’ জায়গারে ফুটায়া তোলে।

আসেন ধইরা নেই যে এইখানে অনেকগুলা পলিটিক্যাল গ্রুপ আছে। গ্রুপ ১’র হইতেছে কখগ  জিনিসগুলা আছে, গ্রুপ ২ এর খগঘ, আর এইরকম। ২ এর লগে ১ এর দুইটা জায়গাতে মিল আছে। ৩-ও ২’র মতো আর ৪-ও ৩’র মতো একইভাবে দুইটা জায়গাতে। দেখেন ৩-ও ১’র মতন (অদের একটা জায়গাতে মিল আছে গ)। সবচে অদ্ভুত কেইসটা হইলো ৪ এর, অবশ্যই ৩ আর ২ এর লগে মিল আছে কিন্তু ১ এর লগে কোন কারেক্টারে মিল নাই। তারপরেও, মিল কমতে থাকা একটা চলতে-থাকা সিরিজের কারণে ১ আর ৪ এর মাঝখানে একটা ইল্যুশনারি রূপান্তরের কারণে, ৪ আর ১ এর মধ্যে একটা আত্মীয়তা আছে বইলা মনেহয়।


কখগ


খগঘ


গঘঙ


ঘঙচ

‘ফ্যাসিজম’ টার্মটা সবগুলার সাথে ফিট করে কারণ একটা ফ্যাসিস্ট শাসন থিকা একটা বা দুইটা জিনিস বাদ দেয়া যায় আর তারপরেও এইটারে ফ্যাসিস্ট বইলা চিনা যায়। ফ্যাসিজম থিকা সাম্রাজ্যবাদী ডাইমেনশনটা বাদ দেন আপনি পাইবেন ফ্রাঙ্কো বা সালজার’রে; কলোনিয়াল ডাইমেনশনটারে বাদ দেন, আর আপনি পাইবেন বলকান ফ্যাসিজম। ইতালিয়ান ফ্যাসিজমের লগে একটা ড্যাশ দিয়া রেডিক্যাল এন্টি-ক্যাপিটালিজম নেন (যেইটা কখনোই মুসোলিনির ভাল্লাগে নাই), আর আপনি পাইবেন এজরা পাউন্ডরে। কেলটিক মিথোলজি’র কাল্ট আর গ্রেইলের মিস্টিটিজমরে যোগ করেন (যেইটা অফিসিয়াল ফ্যাসিজমের বাইরের ব্যাপার), আর আপনি পাইবেন ফ্যাসিজমের সবচে রেসপেক্টেড গুরু, Julius Evola’ রে।

এইসব কনফিউশনের পরেও, আমি মনে করি একটা লিস্ট করা সম্ভব সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলার যেইগুলারে আমি বলতে চাইতেছি ‘গণ-ফ্যাসিজম’ (Ur-Fascism) বা ‘অমর ফ্যাসিজম’ (eternal Fascism)। এই বৈশিষ্ট্যগুলারে একটা সিস্টেমের মধ্যে রেজিমেন্টেড অবস্থায় পাবো না আমরা; অনেকগুলা পারস্পরিক একচেটিয়াভাবে থাকতে পারে স্বৈরাচারীতা এবং ধর্মান্ধতার মধ্যে। কিন্তু আপনার যা দরকার যখন এইগুলার কোন একটা উপস্থিত থাকবে, তখন বুঝতে পারা যে একটা ফ্যাসিস্ট নীহারিকা জমাট বাঁধতে শুরু করবে।

১. গণ-ফ্যাসিজমের পয়লা বৈশিষ্ট্য হইতেছে ঐহিত্য পূজা। ট্রাডশনালিজম হইতেছে ফ্যাসিজমের চাইতেও পুরানা। এইটা খালি সনাতন ক্যাথলিক কাউন্টার রেভিউলেশনারি চিন্তা না যেইটা ফরাসি বিপ্লবের পরে আসছিল, বরং এইটা হেলেনিক পিরিয়ডের শেষের দিকের কথা গ্রীক ক্ল্যাসিক্যাল রেশনালিজমের রি-অ্যাকশনে জন্মাইছিল।

ভূমধ্যসাগরের অববাহিকায়, নানান ধর্মের লোকজন (সবাইরে রোমান প্যানথনে তেমন খেয়াল না কইরাই নেয়া হইছিল) হিউম্যান হিস্ট্রির যেন একটা মুক্তির দিশা পাইতেছে, এইরকম একটা স্বপ্নের মধ্যে ছিল। এই মুক্তির দিশা অনেক দিন ধইরা লুকায়া রাখা ছিল একটা ভাষার পর্দার আড়ালে, যা এখন আমরা ভুলে গেছি। এইটা পাহারা দেয়া ছিল মিশরিয়ান হায়রোগ্লাফিকস, কেলটিক রানস, আর ধার্মিক লেখালেখিগুলা দিয়া, যেইটা এখনো অজানা, এশিয়াটিক ধর্মগুলা নিয়া।

এই নতুন কালচারটা ছিল সিনক্রেটিক । ‘সিনক্রেটিসিজম’ মানে অইটা না, যেইটা ডিকশনারিগুলা বলে যে, নানান ধরণের বিশ্বাস বা প্রাকটিসের কম্বিনেশন। এইরকমের একটা কম্বিনেশনরে অবশ্যই সব ধরণের কন্ট্রাডিকশনরে সহ্য করতে হবে। সব অরিজিনাল মেসেজেই উইজডমের একটা দানা থাকে, আর যখন মনেহয় অরা নানান ধরণের বেখাপ্পা জিনিস নিয়া কথা কইতেছে মনেহয় অরা সবকিছুতেই ইঙ্গিত দিতেছে, রূপকের ভিতর দিয়া, কোন একটা অরিজিনাল সত্যের।

এর ফলশ্রুতিতে, এইখানে জানা-বোঝার কোন অগ্রগতি হইতে পারে না। সত্য’টা একবার এবং সবসময়ের জন্য ঘোষণা করা হয়া গেছে, আর এখন যেইটা করতে পারি আমরা এর অস্পষ্ট মেসেজটারে ব্যাখ্যা কইরা যাইতে পারি। সবগুলা ফ্যাসিস্ট মুভমেন্টের সিলেবাসের দিকে যদি তাকান, আপনি প্রধান ট্রাডিশন্যালিস্ট থিঙ্কারদেরকে পাইবেন।  নাজী জ্ঞানকান্ড ভরা ছিল ঐতিহ্যপূর্ণ, সিনক্রিয়েটিক, আর অকাল্ট জিনিসপত্র দিয়া। নতুন ইতালিয়ান ডানপন্থীদের সবচে ইম্পর্টেন্ট থিওরিস্ট, Julius Evola, গ্রেইলের (Grail) লগে জীয়নের প্রবীণদের আদিলেখাগুলারে, আর এলকেমির লগে হোলি রোমান এম্পায়াররে মিলাইছেন। আসল কথা হইতেছে, এর মুক্তমণা অবস্থাটা দেখানোর লাইগা, ইতালিয়ান ডানপন্থীদের একটা অংশ এর সিলেবাসরে চওড়া করছে  De Maistre, Guenon আর Gramsci’রে একসাথে রাখার ভিতর দিয়া, সিনক্রোটিসজমের চটকদার প্রমাণ হিসাবে।

আপনি যদি আম্রিকান বইয়ের দোকানগুলাতে নিউ এইজ সেকশনে ব্রাউজ করেন, আপনি সেইখানে সেন্ট অগাস্টিনরে পাইবেন, যিনি, আমার জানামতে, একজন ফ্যাসিস্ট ছিলেন না। কিন্তু Saint Augustine Stonehenge’রে অই একলগে রাখাটা হইতেছে গণ-ফ্যাসিজমের (Ur-Fascism) এখনকার একটা লক্ষণ।

Continue reading

গণ-ফ্যাসিজম (Ur-Fascism) – উমবের্তো একো [ফার্স্ট পার্ট] Featured

[১৯৯৭ সালে ইতালিয়ান ভাষায় লেখাটা ফার্স্ট পাবলিশ হইছিল, পরে ২০১১ সালে ইংলিশে ট্রান্সলেট করা হয়। ইতালিয়ান থিকা ইংলিশে ট্রান্সলেট করছেন Alastair McEwen.]

১৯৪২ সালে, যখন আমার বয়স দশ বছর, Ludi Juveniles -এ আমি ফার্স্ট প্রাইজ জিতছিলাম, যেইটা ছিল সব কিশোর ফ্যাসিস্টদের জন্য বাধ্যতামূলক একটা ওপেন কম্পিটিশন – যেইটারে বলা যায়, সব কিশোর ইতালিয়ানদের জিনিস। ‘মুসোলিনির সম্মানের জন্য আর ইতালির অমর মঞ্জিলের জন্য আমাদের কি মইরা যাওয়া উচিত হবে?’ – এই বিষয়ের উপরে রেটরিকে ভরা জবরদস্ত একটা রেসপন্স লিখছিলাম। আমার উত্তর ছিল হ্যাঁ-সূচক। আমি একটা চালাক বাচ্চা ছিলাম।

তারপরে ১৯৪৩ সালে আমি ‘ফ্রিডম’র মানে আবিষ্কার করলাম। আমি এই ভাষণের শেষের দিকে অই গল্পটা বলবো। অই সময়ে ‘ফ্রিডম’ মানে ‘স্বাধীনতা’ ছিল না।

আমি আমার জীবনের শুরুর দিকে দুই বছর এসএস, ফ্যাসিস্ট আর রেজিসট্যন্স যোদ্ধাদের দিয়া ঘেরা ছিলাম, যারা সারাক্ষণ একদল আরেকদলের দিকে গুলি ছুঁড়তেছিল, আর আমি শিখছিলাম কেমনে বুলেট থিকা বাঁইচা থাকতে হয়। খারাপ ট্রেনিং ছিল না সেইটা।

১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে পাটিজানরা মিলান দখল কইরা নিলো। দুইদিন পরে অরা ছোট শহরটাতে চইলা আসলে যেইখানে আমি থাকতাম। একটা আনন্দের মুহূর্ত ছিল সেইটা। মেইন স্কয়ারে লোকজনের ভীড়, সবাই গান গাইতেছিল আর পতাকা উড়াইতেছিল, চিল্লায়া মিমো’রে ডাকতেছিল, যে ছিল লোকাল রেজিসট্যান্স মুভমেন্টের লিডার। কারাবিনিয়ারির (ইতালিয়ান মিলিটারি পুলিশ ফোর্সের) একজন ফর্মার সার্জেন্ট হিসাবে বাগডোলিও’র (পিয়েত্রো বাগডোলিও, সামরিক নেতা ও ইতালিয়ান এন্টি-ফ্যাসিস্ট সময়ের প্রাইম মিনিস্টার) ফলোয়ারদের সাথে অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন মিমো এবং শুরুর দিকের একটা লড়াইয়ে উনার একটা ঠ্যাং হারাইছিলেন। উনি টাউনহলের বারান্দাতে আইসা দাঁড়াইলেন, মলিন; এক হাত দিয়া উনি লোকজনরে থামানোর চেষ্টা করতেছিলেন। উনার বক্তৃতা শুরু করার জন্য আমি অপেক্ষা করতেছিলাম, আমার ছোটবেলা আমি কাটাইছি মুসোলিনির মহান ঐতিহাসিক ভাষণগুলা শুইনা, যার ইর্ম্পটেন্ট অংশগুলা স্কুলে আমাদেরকে মুখস্ত করতে হইতো। সবকিছু চুপচাপ। মিমোর ভয়েস ছিল ফ্যাঁসফ্যাঁসে, তারে শোনাই যাইতেছিল না। সে কইলো: “নাগরিকরা, বন্ধুরা। এতোদিনের যন্ত্রণাময় বলিদানের পরে… এইখানে আসছি আমরা। সম্মান জানাই তাদের প্রতি যারা ফ্রিডমের জন্য মারা গেছেন।’ এইটুকই ছিল এইটা। উনি ভিতরে চইলা গেলেন। লোকজন একটা চিল্লানি দিল, পার্টিজানরা অদের অস্ত্রগুলা উঁচায়া ধরলো আর উপরের দিকে গুলি করলো উৎসবের মতন। আমরা বাচ্চারা শেলগুলা কালেক্ট করার লাইগা দৌড়াদৌড়ি শুরু কইরা দিলাম, মূল্যবান জমানোর জিনিস এইগুলা, কিন্তু আমি এইটাও জানছিলাম, কথা বলার স্বাধীনতার মানে হইতেছে রেটরিক থিকা স্বাধীনতা পাওয়া।

কয়েকদিন পরে আমি ফার্স্ট আম্রিকান সৈন্য দেখলাম। যেই ফার্স্ট ইয়াংকি’রে আমি দেখছিলাম সে ছিল একজন কালা আদমী, জোসেফ, যে আমারে Dick Tracy আর L’il Abner’র আজব দুনিয়ার সাথে পরিচিত করাইছিল। অর কমিকসগুলা ছিল রঙিন আর গন্ধ ছিল ভালো।

অফিসারদের একজন (একজন মেজর বা ক্যাপ্টেন মাডি) একটা ভিলা’তে থাকতেছিল যেইটার মালিক ছিল আমার দুইজন ক্লাসমেটের ফ্যামিলি। এইটা ছিল আমার বাড়ির বাইরে আরেকটা বাড়ি, বাগানের মধ্যে ক্যাপ্টেন মাডি’র চারপাশে কিছু মহিলারা ভীড় কইরা থাকতো, ভুলভাল ফ্রেঞ্চে কথা কইতো। ক্যাপ্টেন মাডি ছিলেন একজন শিক্ষিত মানুশ এবং কিছু ফ্রেঞ্চ জানতেন। তো, আম্রিকান মুক্তিদাতাদের ব্যাপারে আমার ফার্স্ট ইমেজ ছিল, অইসব কালা শার্টগুলা বা ফ্যাকাশে চেহারাগুলার বাইরে, একজন ভদ্র কালা লোক যে হলুদ সবুজ ইউনিফর্মে বলতেছে: ‘Oui, merci beaucoup, Madame, moi aussi j’aime le champagne…’ আনফরচুনেটলি অইখানে কোন শ্যাম্পেন ছিল না, কিন্তু ক্যাপ্টেন মাডি আমারে ফার্স্ট চুইংগাম দিছিলেন আর আমি সারাদিন অইটা চাবাইতাম। রাতের বেলা আমি গামটারে একটা গ্লাসের পানিতে রাইখা দিতাম যাতে পরের দিন অইটা ফ্রেশ থাকে।

মে মাসে আমরা শুনলাম যে যুদ্ধ শেষ হইছে। শান্তি আমারে একটা কিউরিয়াস ফিলিংস দিল। একজন কিশোর ইতালিয়ান হিসাবে আমারে বলা হইছিল যে, সবসময় যুদ্ধের ভিতরে থাকাটা হইতেছে নরমাল ঘটনা। এর পরের কয়েকমাসে আমি টের পাইলাম যে, রেজিসট্যান্স একটা লোকাল ফেনোমেনা ছিল না বরং ছিল একটা ইউরোপিয়ান ঘটনা। ‘reseau’ ‘maquis’ ‘armee secrete’ ‘Rote Kapella,’ আর ‘Warsaw ghetto’র মত একসাইটিং নতুন শব্দগুলা আমি শিখলাম। হলোকাস্টের প্রথম ছবিগুলা আমি দেখলাম আর এই শব্দটা কি মিন করে সেইটা জানার আগেই আমি এইটা শিখলাম। আমি বুঝতে পারলাম এইটা হইতেছে সেই জিনিস যা থিকা আজাদ হইছি আমরা।

আজকে ইতালিতে অনেকে প্রশ্ন করে যে যুদ্ধের ঘটনাটাতে রেজিসট্যান্সের কোন রিয়েল ইমপ্যাক্ট আছে কিনা। আমার জেনারেশনের লোকজনের জন্য এই প্রশ্নটা ইরিলিভেন্ট: আমরা সাথে সাথেই বুঝতে পারছিলাম রেজিসট্যান্সের নৈতিক আর সাইকোলজিক্যাল সিগনিফিকেন্সটা। এইটা গর্ব করার মতো একটা ব্যাপার যে, আজাদ হওয়ার লাইগা আমরা ইউরোপিয়ানরা প্যাসিভলি অপেক্ষা কইরা ছিলাম না। আমি মনে করি যে, ইয়াং আম্রিকানরা যারা আমাদের আজাদি’র জন্য রক্ত দিছিল, তাদের এই জানাটা অহেতুক ছিল না যে, লাইনগুলার অইপারে ইউরোপিয়ানরাও আছে যারা এই ঋণ শোধ করতেছে।

এখন অনেক ইতালিয়ানরা বলে যে, রেজিসট্যান্স হইতেছে একটা কমিউনিস্ট মিথ্যা। এইটা সত্যি কথা, কমিউনিস্টরা রেজিসট্যন্সরে এক্সপ্লয়েট করছিল যেন এইটা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি, যেহেতু তারা এইটাতে একটা প্রাইমারি রোলে ছিল; কিন্তু আমি মনে করতে পারি পার্টিজান’রা নানান রকমের রুমাল বাঁধছিলো নিজেদের মাথায়।

রেডিও’তে কান পাইতা, আমি রাতগুলা পার করতাম – জানালাগুলা বন্ধ রাইখা, ব্ল্যাক-আউটের কারণে রেডিও’র চারপাশটারে মনে হইতো দ্যুতির মতো – পার্টিজানদের জন্য রেডিও লন্ডন থিকা ব্রডকাস্ট করা মেসেজগুলা আমরা শুনতাম। অইগুলা একইসাথে ছিল সংকেতময় এবং কাব্যিক (‘তবুও সূর্য উঠে,’ ‘তবুও গোলাপ ফুটে’), আর বেশিরভাগই ছিল ‘ফ্রাঞ্চির জন্য মেসেজ।’ কেউ একবার আমারে ফিসফিস কইরা বলছিল যে, ফ্রাঞ্চি হইতেছে নর্থ ইতালির গোপন গ্রুপগুলার একজন পাওয়ারফুল লিডার, যার অনেক সাহসের কাহিনি ছিল। ফ্রাঞ্চি (যার আসল নাম হইতেছে Edgardo Sogno) ছিলেন একজন রাজতন্ত্রী, এইরকমের কঠিন এন্টি-কমিউনিস্ট যে যুদ্ধের পরে উনি একস্ট্রিম ডান-পন্থী দলে যোগ দিছিলেন আর একটা রক্ষণশীল ক্যু’র সহযোগী হিসাবে দোষী হইছিলেন। কিন্তু এতে কি যায় আসে? Sogno এখনো আমার ছোটবেলার স্বপ্ন।* (এইটা একটা শব্দের খেলা: ইতালিয়ান ভাষায়, Sogno মানে স্বপ্ন।) আজাদী হইতেছে একটা কমন অঙ্গীকার যেইটা নানান রংয়ের আলাদা লোকজন একসাথে হাসিল করে। Continue reading

লাবিব ওয়াহিদের কবিতা (২০২১) Featured

স্মৃতির কর্নিয়ায়

স্মৃতির কর্নিয়ায় মারকাজ মসজিদের
মোজাইক করা ফ্লোর –

কাঁপে ফর্সা রোদে

শিশুরা ছুটে গিয়ে
মুরুব্বির গায়ে বাড়ি খাইতে গিয়া
শেষ মুহূর্তে ব্রেক করতে পারার
মতো মনে হয় –

গোটা লাইফটারে

 

একইরকম দুপুরগুলা

ইলেকটিক পাংখার মতন
পাংখা হইয়া মন
ঘুইরা ঘুইরা একই সার্কেলেই
রঙ্গ তামশা করে নিজেরই লগে

বাদামের মতন
এই গরম দুপুর

বারান্দা দিয়া নিচে চাইয়া দেখতাছি
রিকশাঅলা তার খালি রিকশা
বাইয়া নিতাছে স্লোলি
তারে ডাক দিলো কেউ
“এই খালি” কইয়া

ছোটকালে আমরা ভাবসিলাম
“খালি” মনে হয় রিকশার কোনো সিনোনিম

কারেন্ট চইলা গেলে
ধীরে ধীরে পাংখার থামতে লাগার সাথে
থামতে থাকে এমপিথ্রির পাতাগুলির লড়াচড়া

আম্রিকার স্বাধীনতার ইতিহাস
শেষ হইবার আগেই
টেবিলে ভাত বাড়া হয়

মনে হয় একইরকম রইয়া গেছে এই দুপুরগুলা
কিন্তু এখন, কাঠের স্কেল হাতে লইয়া
আম্মা আর আসে না পড়া শিখাইতে

 


সবকিছু 

শিঙায় ফুঁক দেয়ার পরেই
স্লো মোশানে সবকিছু
তুলার মতো উইড়া যাবে

আমি দেখতে যেন পারি
পরিপুন্ন কোমলতায় –

সেইসব
ডালভাঙা ঘুঘুদের সুরগুলা
কেমন কইরা ছিড়া যাইতেছে

কেমন কইরা সমস্ত সূত্র
শেষমেশ জানাইতেছে
তাহাদের বিত্তান্ত –

বলতেছে তারা
কেমন কইরা প্রতিটা মোমেন্টে
তারা নিজেদের
অ্যাবসেন্সের ভিতর চিৎকার করে
যেমন
আমিও
একটা ইনভিজিবল –

খালি
চিৎকার কইরা গেছি
তোমার কানে

Continue reading

সোনালি কাবিনের আগের ও পরের আল মাহমুদ ঠিক কতটা আলাদা?

আল মাহমুদের জন্মদিনে একটা ঘটনা মনে পড়ল।

একটা পোস্টের স্ক্রিনশট দিলাম। (লেখার শেষে আছে।) এই পোস্টটা গত ফেব্রুয়ারি মাসের। আল মাহমুদের তিনটা লাইনরে পোস্টদাতা বলছেন ‘ঘেন্নার প্রতীক’; বা এন্টি সেমেটিক। এরপর আল্লাহর বান্দা বলতেছেন যে, আল মাহমুদের এইসব কবিতা পইড়া ভাবাই মুশকিল যে, উনি ‘সোনালি কাবিন’ নামে একটা বই লেখছিলেন। এখন মজার ঘটনা এই যে, খোদ ওই ‘এন্টি সেমেটিক’ লাইনগুলাই ‘সোনালি কাবিন’ বইয়ের৷

এই আল্লাহর বান্দারা প্রায়ই ‘সোনালি কাবিন’র অত্যুচ্চ প্রশংসা করেন, কয়টা সমাজতান্ত্রিক লাইনের জন্য। ‘সোনালি কাবিন’র আগে আর পরে, এইভাবে ভাগ করেন আল মাহমুদরে। কিন্তু, তাতে কি লাভ হয় কোন? আমার মতে, বিশেষ লাভ হয় না। ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যের বা আল মাহমুদের নিজের, কোন একরৈখিক ইডিওলজিতাড়িত কাব্যবিশ্বাস ছিল কি কোনকালে? সন্দেহ হয়।

‘সোনালি কাবিন’র কথাই ধরা যাক। আমার তো মনে হয় মাঝেমধ্যে যে, সমাজতন্ত্র বলি বা ইসলামতন্ত্র, এসব নিয়া আল মাহমুদের মিশ্রচিন্তাটা কেমন ছিল, এই বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে, তারই সরল ও স্বার্থক চিত্র হইল ‘সোনালি কাবিন’। ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ সম্ভবত বাঙলা ভাষার প্রথম কবিতা, যেখানে একটা পুরা কোরআনের আয়াত ব্যবহৃত হইছে৷ ব্যাপকভাবে পাঠকপ্রিয় এই কবিতাটা ‘সোনালি কাবিন’ বইয়ের। ‘কেবল আমার পদতলে’ কবিতায় দেখি, ‘সদোমের সিংহদরজায় কেবল লুতের মত অনিদ্রায়’ থাকতে চাইছেন এই কবি। ‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছেও আছে এই ধরনের লাইন। সমাজতন্ত্র আর বাঙালির কৌম জাতিবাদরে কাছাকাছি আনতে চাওয়া কবি, এই সনেটগুচ্ছের লাস্ট সনেটে, মানুশের যাপিত জীবনের ধর্মরেও অবলম্বন করছেন নিপুণ স্বরে ও সুরে। এই কবিতায় সরাসরি কোরআনের বাকরীতি ইউজ করছেন তিনি; পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে, আমি পুরাটা তুইলা দিলাম:

১৪.
বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই
দোহাই মাছ-মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর
লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই
হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর।
কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক
কোনদিন করি তবে হয়ো তুমি বিদ্যুতের ফলা
এ বক্ষ বিদীর্ণ করে নামে যেন তোমার তালাক
নাদানের রোজগারে না উঠিও আমিষের নলা।
রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী পাখির ছতরে
শিষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাঙে ছল ছল
আমার চুম্বনরাশি ক্রমাগত তোমার গতরে
ঢেলে দেব চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল
এর ব্যতিক্রমে বানু এ মস্তকে নামুক লানৎ
ভাষার শপথ আর প্রেমময় কাব্যের শপথ।

‘সোনালি কাবিন’ সনেটগুচ্ছের ১৪-সংখ্যক সনেটটা শব্দ, বাকরীতি ও ম্যাটাফোরের দিক থিকা অন্যান্য সনেটগুলার চাইতে বেশ আলাদা। অন্য সনেটগুলায় ভাষার ক্ষেত্রে গুরু আর চণ্ডালি ভাষার মিকচার; বাঙলার আদি ইতিহাস থিকা উইঠা আসা প্রাকৃত ও আর্য মাইথলজির ব্যবহার, সমাজতন্ত্রের কিছু আলাপ, এইসব আছে। তবে ১৪ সংখ্যক সনেটটা ভিন্ন। এই এক সনেটে একসাথে যতগুলা আরবি-ফারসিজাত শব্দ ব্যবহৃত হইছে, আর কোন সনেটে এরকম হয় নাই। সনেটগুলায় আল মাহমুদ তার প্রেমিকারে কিছু ইউনিক শব্দ ও বিশেষণে সম্বোধন করছেন৷ যেমন: হরিণী, সখি, নারী (সনেট-১); পানোখী, কলাবতী (সনেট-২); হংসিনী, অষ্টাদশী (সনেট-৩); সুন্দরী, বন্য বালিকা, বধূ (সনেট-৪); বালা, শবরী, পক্ষিণী, মেয়ে (সনেট-৫); নারী (সনেট-৬); কাতরা, অবলা, চঞ্চলা (সনেট-৭); সতী, বেহুলা, কন্যা (সনেট-৮); মানিনী, শ্যামাঙ্গী (সনেট-৯); প্রিয়তমা, সাহসিনী, নারী, সুকণ্ঠি (সনেট-১০); মেয়ে, সুশীলা, বিহ্বলা (সনেট-১১); ভদ্রে (সনেট-১২); রুপবতী, দেখনহাসি, মহিয়সী, কন্যা (সনেট-১৩)।
Continue reading

তরুণের সাধনা – কাজী নজরুল ইসলাম

১৯২০ এর দশকে কাজী নজরুল ইসলাম তিনটা নন-ফিকশন (মানে, প্রবন্ধের) বই ছাপাইছিলেন – যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী আর রুদ্র-মঙ্গল, উনার তিনটা বই-ই তখনকার ব্রিটিশ সরকার ‘বাজেয়াপ্ত’ করছিল। উনার নিচের এই লেখাটা “রুদ্র-মঙ্গল” বইয়ে ছাপা হইছিল।

এখনকার সময় উনার এই লেখাটারে খুবই ইনোসেন্ট মনে হইতে পারে। মনে হইতে পারে, উনি ইয়াং পিপলদেরকে ফুঁসলাইতেছেন, কিন্তু কি জন্য ফুঁসলাইতেছেন সেইটা এই সময়ে আইসা অস্পষ্ট একটা জিনিস হইলেও, যেইটা নজরুলের ব্যাপারে আলাপে সবসময় এড়াইয়া যাওয়া হয় সেইটা হইতেছে, উনি কখনোই কোন অথরিটি’রে মাইনা নেন নাই। এইটা উনার কোর ইন্টেলেকচুয়ালিটি, এইটা ছিল উনার সাহিত্যিক এক্টিভিজম। উনার প্রায় প্রতিটা লেখাতেই এই অথরিটি-বিরোধী ভয়েস’টা পাইবেন, যেইটা আমাদের সময়ে সবচে বেশি মিসিং জিনিস। 

তো, এই জায়গা থিকা আমরা মনে করি, কাজী নজরুল ইসলামের লেখার রিলিভেন্স এখনো আছে, এবং তার লেখা আমাদের নতুন কইরা পইড়া দেখা দরকার। এই লেখাটা তার অনেকগুলা লেখার একটা হিসাবে আমরা রিকগনাইজ করতে চাইতেছি এইখানে।   

 

…………..

আমার প্রিয় তরুণ ভ্রাতৃগণ !

আপনারা কি ভাবিয়া আমার ন্যায় ক্ষুদ্র ব্যক্তিকে আপনাদের সভাপতি নির্বাচন করিয়াছেন, জানি না। দেশের, জাতির ঘনঘোর-ঘোর দুর্দিনে দেশের জাতির শক্তিমজ্জা-প্রাণস্বরূপ তরুণদের যাত্রা পথের দিশারী হইবার স্পর্ধা বা যোগ্যতা আমরা কোনদিন ছিল না, আজও নাই। আমি দেশকর্মী—দেশনেতা নই, যদিও দেশের প্রতি আমার মমত্ববোধ কোন স্বদেশপ্রেমিকের অপেক্ষা কম নয়। রাজ-লাঞ্ছনা ও ত্যাগ স্বীকারের মাপকাঠি দিয়া মাপিলে হয়ত আমি তাঁহাদের কাছে খর্ব Pigmy বলিয়া অনুমিত হইব। তবু দেশের জন্য অন্তত এইটুকু ত্যাগ স্বীকার করিয়াছি যে, মঙ্গল করিতে না পারিলেও অমঙ্গল-চিন্তা কোনদিন করি নাই, যাঁহারা দেশের কাজ করেন তাঁহাদের পথে প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়াই নাই। রাজ-লাঞ্ছনার চন্দন-তিলক কোনদিন আমারও ললাটে ধারণ করিবার সৌভাগ্য হইয়াছিল, কিন্তু তাহা আজ মুছিয়া গিয়াছে। আজ তাহা লইয়া গৌরব করিবার অধিকার আমার নাই।

আমার বলিতে দ্বিধা নাই যে, আমি আজ তাহাদেরই দলে যাঁহারা কর্মী নন—ধ্যানী। যাঁহারা মানব জাতির কল্যাণ সাধন করেন সেবা দিয়া, কর্ম দিয়া তাঁহারা মহৎ ; কিন্তু সেই মহৎ হইবার প্রেরণা যাহারা জোগান, তাঁহারা মহৎ যদি না-ই হন অন্তত ক্ষুদ্র নন। ইহারা থাকেন শক্তির পেছনে রুধির ধারার মত গোপন, ফুলের মাঝে মাটির মমতা-রসের মত অলক্ষ্যে। আমি কবি। বনের পাখির মত স্বভাব আমার গান করায়। কাহারও ভালো লাগিলেও গাই, ভালো না লাগিলেও গাহিয়া যাই। বায়স-ফিঙে যখন বেচারা গানের পাখিকে তাড়া করে, তীক্ষ্ণ চঞ্চু দ্বারা আঘাত করে, তখনও সে এক গাছ হইতে উড়িয়া আর এক গাছে গিয়া গান ধরে। তাহার হাসিতে গান, তাহার কান্নায় গান। সে গান করে আপনার মনের আনন্দে, যদি তাহাতে কাহারও অলস-তন্দ্রা মোহ-নিদ্রা টুটিয়া যায়, তাহা একান্ত দৈব। যৌবনের সীমা পরিক্রমণ আজও আমার শেষ হয় নাই, কাজেই আমি যে গান গাহি তাহা যৌবনের গান। তারুণ্যের ভরা-ভাদরে যদি আমার গান জোয়ার আনিয়া থাকে তাহা আমার অগোচরে। যে চাঁদ সাগরে জোয়ার জাগায় সে হয়ত তাহার শক্তির সম্বন্ধে আজও না-ওয়াকিফ।…

আমি বক্তাও নহি। আমি কম-বক্তার দলে। বক্তৃতায় যাঁহারা দ্বিগ্বিজয়ী—বখতিয়ার খিলজি, তাঁহাদের বাক্যে সৈন্য-সামন্ত অত দ্রুত বেগে কোথা হইতে কেমন করিয়া আসে বলিতে পারি না। তাহা দেখিয়া লক্ষ্মণ সেন অপেক্ষাও আমরা বেশি অভিভূত হইয়া পড়ি। তাঁহাদের বাণী আসে বৃষ্টিধারার মত অবিরল ধারায়। আমাদের—কবিদের বাণী বহে ক্ষীণ ঝর্ণাধারার মত। ছন্দের দুকূল প্রাণপণে আঁকড়িয়া ধরিয়া সে সঙ্গীত গুঞ্জন করিতে বহিয়া যায়। পদ্মা-ভগীরথীর মত খরস্রোতা যাঁহাদের বাণী আমি তাঁহাদের বহু পশ্চাতে।

আমার একমাত্র সম্বল, আপনাদের – তরুণদের প্রতি আমার অপরিসীম ভালবাসা, প্রাণের টান। তারুণ্যকে—যৌবনকে—আমি যেদিন হইতে গান গাহিতে শিখিয়াছি সেই দিন হইতে বারে বারে সালাম করিয়াছি, তাজিম করিয়াছি, সশ্রদ্ধ নমস্কার নিবেদন করিয়াছি। গানে কবিতায় আমার সকল শক্তি দিয়া তাহারই জয় ঘোষণা করিয়াছি, স্তব রচনা করিয়াছি। জবাকুসুমসঙ্কাশ তরুণ অরুণকে দেখিয়া প্রথম মানব যেমন করিয়া সশ্রদ্ধ নমস্কার করিয়াছিলেন, আমার প্রথম জাগরণ-প্রভাতে তেমনি সশ্রদ্ধ বিস্ময়। লইয়া যৌবনকে অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছি, তাহার স্তব-গান গাহিয়াছি। তরুণ অরুণের মতই যে তারুণ্য তিমির বিদারী সে যে আলোর দেবতা, রঙের খেলা খেলিতে খেলিতে তাহার উদয়, রঙ ছড়াইতে ছড়াইতে তাহার অস্ত, যৌবন-সূর্য যথায় অস্তমিত দুঃখের তিমির-কুন্তলা নিশীথিনীর সেই ত লীলাভূমি।

আমি যৌবনের পূজারী কবি বলিয়াই যদি আমায় আপনারা আপনাদের মালার মধ্যমণি করিয়া থাকেন, তাহা হইলে আমার অভিযোগ করিবার কিছুই নাই। আপনাদের এই মহাদান আমি সানন্দে শির নত করিয়া গ্রহণ করিলাম। আপনাদের দলপতি হইয়া নয়, আপনাদের দলভুক্ত হইয়া, সহযাত্রী হইয়া। আমাদের দলে কেহ দলপতি নাই; আজ আমার শত দিক হইতে শত শত তরুণ মিলিয়া তারুণ্যের শতদশ ফুটাইয়া তুলিয়াছি। আমরা সকলে মিলিয়া এক সিদ্ধি, এক ধ্যানের মৃণাল ধরিয়া বিকশিত হইতে চাই ।

আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া সর্বপ্রথম অভাব অনুভব করিতেছি আমাদের মহানুভব নেতা—বাংলার তরুণ মুসলিমের সর্বপ্রথম অগ্রদূত, তারুণ্যের নিশান-বর্দার মৌলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের। সিরাজগঞ্জের শিরাজীর সাথে বাংলার শিরাজ বাঙলার প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে ৷ যাঁহার অনল-প্রবাহ-সম বাণীর গৈরিক নিঃস্রাব জ্বালাময়ী ধারা-মেঘ-নীরন্ধ্র গগনে অপরিমাণ জ্যোতি সঞ্চার করিয়াছিল, নিদ্রাতুরা বঙ্গদেশ উন্মাদ আবেগ লইয়া মাতিয়া উঠিয়াছিল, “অনল-প্রবাহের” সেই অমর কবির কণ্ঠস্বর বাণীকুঞ্জে আর শুনিতে পাইব না। বেহেশতের বুলবুলি বেহেশতে উড়িয়া গিয়াছে। জাতির কওমের, দেশের যে মহাক্ষতি হইয়াছে, আমি শুধু তাহার কথাই বলিতেছি না, আমি বলিতেছি, আমার একার বেদনার ক্ষতির কাহিনী। আমি তখন প্রথম কাব্য-কাননে ভয়ে ভয়ে পা টিপিয়া টিপিয়া প্রবেশ করিয়াছি—ফিঙে-বায়স, বাজপাখির ভয়ে ভীরু পাখির মত কণ্ঠ ছাড়িয়া গাহিবারও দুঃসাহস সঞ্চয় করিতে পারি নাই, নখচঞ্চুর আঘাতও যে না খাইয়াছি এমন নয়—এমনি ভীতির দুর্দিনে মনি-অর্ডারে আমার নামে দশটি টাকা আসিয়া হাজির। কুপনে শিরাজী সাহেবের হাতে লেখা : “তোমার লেখা পড়িয়া খুশি হইয়া দশটি টাকা পাঠাইলাম। ফিরাইয়া দিও না ব্যথা পাইব। আমার থাকিলে দশ হাজার টাকা পাঠাইতাম।” চোখের জলে স্নেহসুধা-সিক্ত ঐ কয় পঙক্তি লেখা বারে বারে পড়িলাম। টাকা দশটি লইয়া মাথায় ঠেকাইলাম। তখনো আমি তাঁহাকে দেখি নাই। কাঙাল ভক্তের মত দূর হইতেই তাঁহার লেখা পড়িয়াছি, মুখস্থ করিয়াছি, শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছি। সেইদিন প্রথম মানস-নেত্রে কবির স্নেহ-উজ্জ্বল মূর্তি মনে মনে রচনা করিলাম, গলায় পায়ে ফুলের মালা পরাইলাম। তাহার পর ফরিদপুর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কনফারেন্সে তাঁহার জ্যোতিঃ বিমণ্ডিত মূর্তি দেখিলাম। দুই হাতে তাঁহার পায়ের তলায় ধূলি কুড়াইয়া মাথায় মুখে মাখিলাম। তিনি আমায় একেবারে বুকের ভিতর টানিয়া লইলেন, নিজে হাতে করিয়া মিষ্টি খাওয়াইয়া দিতে লাগিলেন। যেন বহুকাল পরে পিতা তাহার হারানো পুত্রকে ফিরাইয়া পাইয়াছেন। আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া বাঙলার সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি মনস্বী দেশ-প্রেমিকের কথাই বারে বারে মনে হইতেছে। এ যেন হজ্জ করিতে আসিয়া কাবা-শরিফ না দেখিয়া ফিরিয়া যাওয়া। তাঁহার রুহ মোবারক হয়ত আজ এই সভায় আমাদের ঘিরিয়া রহিয়াছে। তাঁহারই প্রেরণায় হয়ত আজ আমরা তরুণেরা এই যৌবনের আরাফাত ময়দানে আসিয়া মিলিত হইয়াছি। আজ তাঁহার উদ্দেশ্যে আমার অন্তরের অন্তরতম প্রদেশ হইতে শ্রদ্ধা তসলিম নিবেদন করিতেছি, তাঁহার দোওয়া ভিক্ষা করিতেছি।

আপনারা যে অপূর্ব অভিনন্দন আমায় দিয়াছেন, তাহার ভারে আমার শির নত হইয়া গিয়াছে, আমার অন্তরের ঘট আপনাদের প্রীতির সলিলে কানায় কানায় পুরিয়া উঠিয়াছে। সেই পূর্ণ ঘটে আর শ্রদ্ধা প্রতি-নিবেদনের ভাষা ফুটিতেছে না। আমার পরিপূর্ণ অন্তরের বাকহীন শ্রদ্ধা-প্রীতি-সালাম আপনারা গ্রহণ করুন। আমি উপদেশের শিলাবৃষ্টি করিতে আসি নাই। প্রয়োজনের অনুরোধে যাহা না বলিলে নয়, শুধু সেইটুকু বলিয়াই আমি ক্ষান্ত হইব। Continue reading

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য