Main menu

ধর্ম্ম ও সমাজ – কাজী মোতাহার হোসেন (১৯২৯) Featured

“শিখা” পত্রিকায় (থার্ড ইয়ারে) ১৯২৯ সালে কাজী মোতাহার হোসেনের এই লেখাটা ছাপা হইছিল।

কাজী মোতাহার হোসেন এবং শিখা-পত্রিকার ব্যাপারে একটা কমন মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং হইতেছে যে, উনারা বাংলাদেশের সেক্যুলার আন্দোলনের লোক ছিলেন। মানে, এইভাবে দেখাটা উনাদের বলাবলির জায়গাটারে ন্যারো কইরা দেখারই একটা ঘটনা। উনারা যেইটা করতে চাইতেছিলেন, ‘আধুনিক-চিন্তা’র লগে এনকাউন্টার করতে রাজি হইছিলেন বাঙালি-মুসলমান পরিচয়ের জায়গা থিকা, যাচাই-বাছাই কইরা এর কট্টুক নেয়া যায়, কট্টুক বাতিল করা যায় – এর একটা চেষ্টা উনাদের মধ্যে ছিল। যেইটা বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল ‘বঙ্গদর্শনে’, একটা ইন্ডিয়ান-থটের জায়গা থিকা ইউরোপিয়ান-থটরে এনকাউন্টার করতে চাইতেছিলেন। 

মুশকিল হইলো, পরে জিনিসটা আর একইরকম থাকে নাই। বাংলাদেশের এখনকার ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারিজমের লগে কাজী মোতাহার হোসেনের এই কথা-বার্তার একটা মেজর ডিফরেন্সের জায়গা হইতেছে, মোতাহার হোসেন ধরে নিতেছেন যে, জ্ঞান-বুদ্ধি এবং ধর্ম সমাজের মানুশের ঘটনা, সমাজের মানুশদের ভিতর দিয়া এইটা তৈরি হইতে হয়, একটা বোঝাপড়ার ভিতর দিয়া চেইঞ্জও হয়। আর এখনকার ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারাজিমের জায়গাতে সমাজের মানুশরা হইতেছে ‘পশ্চাদপদ’ ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন’, এদেরকে ‘মানুশ’ বানাইতে হবে আগে! মোতাহার হোসেনের কোর কনসার্ন হইতেছে সমাজে ব্যক্তি-মানুশের ফ্রিডম, আর এখনকার সেক্যুলারিজম মনে করে ফ্রিডমের যেই জায়গাটা আছে সমাজের মানুশ সেইখানে যাওয়ার জন্য এনাফ ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ হইতে পারতেছে না! 

এখন মনে হইতে পারে, এইরকম জায়গায় যে যাওয়া যায়, এর আলামত তো কাজী মোতাহার হোসেনের লেখাতেই আছে! উনি তো ধর্মরে ব্যক্তির জায়গাতে রাখতে বলছেন, সৌল-সার্চিংয়ের ঘটনা বানাইছেন! আর এইটারে উনার আর্গুমেন্টের একমাত্র পয়েন্ট বানায়া ফেলার কারণেই ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারিজমের জায়গা থিকা দেখাটা সম্ভব হয়। যেইখানে আমরা দেখি যে,  ধর্মের জায়গাতে উনি এইটারে নিছেন একটা ‘অ্যাড-অন’ হিসাবে। উনি বলতেছেন, ধর্ম ব্যক্তির ও সমাজের ফ্রিডমের জায়গায় কোন বাধা না, বরং অতীতে যখনই সমাজে এইরকম বাধাগুলা আসছে ধর্ম আইসা মানুশরে বাঁচাইছে। এখন বরং রিচুয়ালগুলারে ‘ধর্ম’ হিসাবে নেয়ার কারণে এই সমস্যাটা তৈরি হইতেছে। এইটা অবশ্যই সেক্যুলার একটা জায়গারে এক্সপ্লোর করে, কিন্তু ‘বিজ্ঞান-মনস্ক’ সেক্যুলারিজমের জায়গাটাতে আটকায়া থাকার ঘটনা আসলে না।

আমরা মনে করি, শিখা-পত্রিকা বা কাজী মোতাহার হোসেনদের লেখা-পত্র’রে এইরকম ন্যারো সেক্যুলারিজমের জায়গা থিকা দেখার আরো দুইটা কারণ আছে। এক হইতেছে, উনাদের সোশ্যাল-ক্লাস; শিখা-পত্রিকায় যারাই লিখছেন, তারা সবাই ছিলেন ‘উচ্চ-শিক্ষিত’ লোকজন; যদিও নবাব আবদুল লতিফদের “মুসলিম লিটারারি সোসাইটির” চাইতে আলাদা ছিল উনাদের ক্লাস, কিন্তু একই কারণে পুরানা ক্লাস-সিস্টেমের জায়গাতে একটা ডিপার্চারও ছিল সেইটা। কিন্তু ক্লাস হিসাবে এমার্জিং এলিট, এবং বলা যায় ঢাকা শহরের মিডল-ক্লাসের বুনিয়াদ ছিল এই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ‘শিখা’ পত্রিকা। যার ফলে, এই যে চেহারাটা দাঁড়াইছে এখন (বা প্রিসাইজলি ১৯৬০-৯০’র সময়ে) ঢাকার মিডলক্লাসের, সেইটারে অই সময়ের উপর প্রজেকশন করা যায়। 

সেকেন্ড হইলো, যেইটা খুব স্পষ্ট, সেইটা হইতেছে ভাষার গোলামি। এইটা টের পাইবেন, কলকাতা যেহেতু তখনো সেন্টার, অই ভাষা-সাহিত্যের  জায়গা থিকা উনারা বাইর হইতে পারেন নাই, অইটারে স্ট্যান্ডার্ড ধইরা নিয়াই আলাপ করছেন, নত হইছেন, জাস্ট একটা জায়গা-ই চাইছেন মুসলমানদের লাইগা এবং ঢাকার লাইগা যে, ‘মনে রেখো, আমিও ছিলাম!’

তো, কাজী মোতাহার হোসনের এই লেখাটারে অই সময় এবং সময়ের সোশিও-পলিটিক্যাল হিস্ট্রি’টা মাথায় রাইখা পড়লে, উনার লেন-দেনের জায়গাটারে, ব্যালেন্স করতে চাওয়ার ইচ্ছাটারে, আমরা আরো ভালোভাবে খেয়াল করতে পারবো হয়তো।

এডিটর, বাছবিচার  

……………………..

পৃথিবীর অগণিত প্রতিষ্ঠানের কোনটিই প্রয়োজন ব্যতিরেকে স্থাপিত হয় নাই। আমাদের ধর্ম ও সমাজও প্রয়োজনের তাড়নায় জন্মলাভ করিয়াছে।

সমাজের প্রয়োজনীয়তা অতি সহজেই চোখে পড়ে। আত্মরক্ষা একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি ক্রমবিকাশবাদের ইহাই মূল সূত্র। যখন কোটি কোটি লোক আত্মরক্ষার জন্য ব্যয় হয়, তখন প্রত্যেকে অন্যের মঙ্গলের দিকে লক্ষ্য না রাখিয়া আপন আপন স্বার্থ সিদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করিলে কি মহামারী কান্ড উপস্থিত হইতে পারে, সে চিত্র স্মরণ করিলেই, সমাজ বন্ধন এবং নীতির আবশ্যকতা পরিস্কার উপলদ্ধি করা যায়। বাস্তবিক জন্মাবধি অন্যের সাহায্য ব্যতিরেকে জীবন ধারণ করা অসম্ভব। সমাজবদ্ধ হইয়া বাস করাকে মানুষের একটা মৌলিক বৃত্তি বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। সমাজের প্রথম অবস্থায়, শারীরিক বলে শ্রেষ্ঠ হইলেই লোকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রাপ্ত হইত, কারণ তখন শারীরিক বলের দ্বারাই অন্যের উপর নিজের ইচ্ছা ও প্রভুত্ব চালানো সম্ভবপর ছিল। কিন্তু অস্ত্র উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বলের অসুবিধা অনেকটা দূর হইয়াছে। তখন বাধ্য হইয়া লোকে সংঘবদ্ধ হইয়া পরস্পরের সুবিধার জন্য কতকগুলি নিয়ম পালন করিতে স্বীকৃত হয়। এই নিয়মগুলিই সামাজিক নিয়ম। পরস্পরে বিশ্বাস, আদান প্রদান, উপকার-প্রত্যুপকার, বিবাহ বন্ধনে পবিত্রতা রক্ষণ, সত্যবাদিতা, ক্ষমা, আত্মসম্মান বোধ প্রভৃতি সদগুণ সামাজিক প্রয়োজন হইতেই উদ্ভূত হইয়াছে। প্রকৃত পক্ষে right is Mightই আদিম নিয়ম। যখন সকলের শক্তি প্রায় সমান হইয়া উঠে, তখন বিজ্ঞেরা Right is might নীতির আদর্শ প্রচার করিতে বাধ্য হন। আজও পৃথিবীতে সমাজে সমাজে বা জাতিতে জাতিতে যে দ্বন্দ্ব ঘটিতেছে, তাহাতে সৰ্ব্বদাই কাৰ্যতঃ চণ্ড-নীতিই অনুসৃত হইতেছে। প্রবল স্বভাবতঃ দুর্বলের উপর অত্যাচার করিলেও সৰ্ব্বদা তাহার মনে ভয় থাকে, দুর্বলেরা সংঘবদ্ধ হইয়া কিম্বা অন্য উপায়ে অধিক প্রবল হইয়া উঠিলে তাহাকে পাল্টা নির্যাতন সহ্য করিতে হইবে। সে যাহা হউক, এই ভয় এবং পরিণাম দর্শিতাই নীতি বা সাধু বুদ্ধির জনক। সুতরাং সামাজিক প্রয়োজন হইতে উদ্ভূত এই নীতি জ্ঞানকে ধর্মের অন্তর্গত বলিয়া নির্দেশ করা যায় না। 

এমন প্রশ্ন হইতে পারে, ধৰ্ম্ম হইতে যদি নীতিকেই বিচ্ছিন্ন করা হয়, তবে ধৰ্ম্মের কি অবশিষ্ট থাকে এবং তাহার প্রয়োজনই বা কি? অবশ্য একরূপ ব্যাপকভাবে ধরিলে যাহার যে স্বভাব সেই তাহার—যেমন আগুনের ধৰ্ম্ম দাহন করা, মস্তিষ্কের ধর্ম চিন্তা করা ইত্যাদি। এ হিসাবে বলিতে হয়, স্বভাবতঃ যাহা ঘটিয়াছে, তাহাই ধৰ্ম্ম অনুসারে ঘটিতেছে—ইহাতে ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা বা তদ্রপ কোনো প্রশ্নই উঠিতে পারে না। কিন্তু ধর্মের প্রচলিত অর্থ ইহা নয়। অনেক সময় বলা হইয়া থাকে, একাগ্র সাধনাই ধর্ম। যে কোনো বিষয় যদি মানুষের মনকে অন্য সমুদয় বিষয় হইতে নিবৃত্ত করিয়া তাহার চিন্তা ও কৰ্ম্মের গতি একমুখী করিতে পারে, তবে সেইটিই তাহার ধৰ্ম্ম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কবির সৌন্দর্য চর্চাই ধৰ্ম্ম, ছাত্রের অধ্যয়নই ধৰ্ম্ম, রাজার প্রজা পালনই ধর্ম্ম ইত্যাদি। কিন্তু ধর্ম্মের প্রকৃত অর্থ ইহাও নহে। তবে ধৰ্ম্ম কি? 

মানুষের মনে অসীম জিজ্ঞাসার উদয় হয়, আমি কে? কোথায় ছিলাম? কোথায় চলিতেছি? কেন চলিতেছি? অমির পরিণাম কি? এ জগতের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি? কোথায় তার বাসস্থান? সমুদয় ধৰ্ম্মের মূলে এই সব জিজ্ঞাসা এবং ইহার উত্তর। এ সমস্ত প্রশ্নের মীমাংসা দর্শন শাস্ত্রের কাজ। এখানে ধৰ্ম্ম ও দর্শন একীভূত হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু পরে ভিতরে দর্শনের অতিরিক্ত আরও কিছু আছে। ধৰ্ম্মের সহিত হৃদয়ের গভীর আশা এবং কোন শক্তিমান নিয়ামক পুরুষের অস্তিত্বে প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকাতেই ইহার দর্শন ভাগ শুধু মনের বিলাস মাত্রে পর্যবসিত না হইয়া প্রাণের স্পর্শে স্পন্দিত হইয়া উঠে। ধর্মের বিশিষ্ট রঙ মিশ্রিত না থাকিলে দর্শন কোনও দিন এত অধিক সমাদৃত হইত কিনা সন্দেহ। মানুষের কোন প্রয়োজনে দর্শনের ভিতর ধৰ্ম্মের বীজ নিহিত থাকে। সেই কথাটিই এখন একটু পরিষ্কার করিয়া বলিতে চেষ্টা করিব। মানুষ যখন বুঝিতে পারে, সে কত ক্ষুদ্র, জগতের নানা ঘটনা ও শক্তি পুঞ্জের সম্মুখে সে সামান্য তৃণের ন্যায় কাতর ও শক্তিহীন, যখন তাহার অন্তরের আকুল বাসনা মুহূর্তে ধূলিসাৎ হইয়া যায়, তাহার সন্তান পরিজন ও প্রিয়াস্পদ মৃত্যু মুখে পতিত হয়—যখন সে প্রবলের অত্যাচারে জরিত হইয়া কাহারও নিকট কোন প্রতিকার পায় না, চারিদিকে কেবলই ছলনা, কৃতঘ্নতা ও নৈরাশ্যের ছায়া দেখিতে পায়, তখন স্বভাবতঃই এক সর্বশক্তিমান, দয়াময় জগৎ কারণে বিশ্বাস এবং পরলোকে তাহার ন্যায়বিচার ও দণ্ড পুরস্কারে আস্থা স্থাপনই তাহার একমাত্র সম্বল হয়। এই সান্ত্বনাটুকু না থাকিলে মানুষের জীবন অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িত।

Continue reading

এডিটোরিয়াল: সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা Featured

পথের পাঁচালী – রক মনু

সারভাইভালের আইডিয়া দুঃখের কেমন সুরত বানাইতে পারে সেইটা বুঝতে আপনেরা সত্যজিতের পথের পাঁচালী খেয়াল করতে পারেন। এইখানে বুঝতে সুবিধা পাইবেন আরো; কারণ, বিভূতি আর সত্যজিতের পথের পাঁচালীর তুলনা করতে পারতেছেন! বিভূতির থিকা সত্যজিৎ যুদা হইয়া যাইতেছেন ঐ সারভাইভালের আইডিয়া দিয়া; কেননা, বিভূতিতে ঐটা আসল সুর না, সত্যজিতে যেমন।

সত্যজিতের সিনেমার নাম বরং হওয়া উচিত আর কিছু, বিভূতির পথের বদলে সত্যজিৎ দেখাইতেছেন–এক জায়গা থিকা আরেক জায়গায় যাওয়া, যাওয়াটাই দেখাইতেছেন, সারভাইভালের দরকারে। বিভূতির ফিকশনে জিন্দেগি বা লাইফ একটা সফর, সেই সফরের রাস্তার গপ্পো মারতেছেন উনি, সত্যজিতের জিন্দেগি বা লাইফ মানে টিকে থাকা, সফর সেইখানে টিকে থাকার বা সারভাইভালের দরকারে করতে হয় কখনো, আরাম হইলে সেইখানে শিকড় গজাও। বিভূতিতে পথ/রাস্তার শুরু আরো আগে কোথাও, রাস্তা খতম হয় না কখনো, পথের কোন একটা স্পটে কতখন থাকা মানে বিশ্রাম/খান্তি, খুবই টেম্পোরাল–দুই দিনের ঠিকানা। সত্যজিতে রাস্তার শুরু অপু-দুর্গার বাপের বাড়ি, রাস্তায় নামতে হইতেছে কারণ–সারভাইভ করা যাইতেছেন না, রাস্তা খতম হইতেছে কলোনিয়াল মডার্ন শহরে।

সত্যজিতের সারভাইভাল ন্যারেটিভে সনাতন/পুরানা বামুন আর ভাত পাইতেছে না পুরানা সিস্টেমে, আগে যেইখানে ভাতের উপরি ইটও পাইছিল, সেই ইটেই দালান হইছিল। সেই দিন আর নাই। দালান ভাঙছে, ভাতই জোটে না, দালান মেরামত করবে কেমনে! সেই দালান এখন সাপেরা দখলে নিতেছে, সর্বজয়ারা হারতেছে এইবার! সর্বজয়ার অর্থ আদতে এইখানে সব সইতে পারা, সইয়া যাওয়াই যেন জয় করা :)।

সাপের তুলনায় আনফিট তারা, ফিটনেস পরমাণ করতেই যেন দুর্গা চুরি করে, কিন্তু ভোগ করতে পারে না, আসলে আনফিট, তাই মরে।

টিকতে পারে না তারা, সফরে নামতে বাধ্য হয়, নামে। কলোনিয়াল মডার্ন শহরে বরং ধর্মের রমরমা ব্যবসা, বাজারে এই মাল ভালো বিকায়, সেইখানে যাইতেছে বামুন। আর পোলারে পড়াইতে হবে কলোনিয়াল পড়া, সে যেন পারে পৈতা ছাড়াই ভাত জোটাইতে।

বিভূতির সফরের রাস্তার গপ্পো এইভাবে সত্যজিতে হইয়া ওঠে ইউরোপের কাছে ইন্ডিয়ার হারের দলিল, বিভূতির পথের পাঁচালী সত্যজিতের মুন্সিয়ানায় হইয়া ওঠে মডার্নাইজশন জাস্টিফাই করার প্রোপাগান্ডা লিফলেট। বিভূতির সফরের দুঃখ সত্যজিতে হইলো নিজেরে ইনফিরিয়র হিসাবে জানার ডিপ্রেশন। সত্যজিতের পথে গাড়িতে যাইতে থাকা দুঃখী মুখগুলা মডার্ন অডিয়েন্সকে তাই অতোটা ছুইয়া যায়।

/২০১৮

Continue reading

বই: চিনোয়া আচেবে’র ইন্টারভিউ Featured

এই বইটাসহ ইন্টারভিউ সিরিজের অন্য বইগুলা কিনতে ফেসবুকে পেইজে নক করেন!

https://cutt.ly/Kbkxqz6
…………………….

অনুবাদকের খুচরা আলাপ

আমি খেয়াল কইরা দেখছি যে, কাউরে নিয়া, বিশেষ কইরা কবি সাহিত্যিকদের নিয়া লিখতে গেলেই তাদের জন্মসাল দিয়া লেখা শুরু করার একটা মার্শাল ল’র মতন ব্যাপার আছে। যাই হোক, চিনুয়া আচেবের ইন্টারভিউয়ের অনুবাদ নিয়া দু-চারটা খচুরা আলাপ পাড়তে গিয়া সেইটা মানব না ভাবছিলাম কিন্তু তা আর হইল না, কারণ তার জন্মসালটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩০ সালে, মানে তার জন্মের সময় নাইজেরিয়া ছিল পরাধীন একটা দেশ। ইংল্যান্ডের একটা কলোনি ছিল তারা। দক্ষিণ-পূর্ব নাইজেরিয়ার ওগিদিতে জন্মানো আচেবে ছিলেন ইগবো গোত্রের লোক। তার পূর্বপুরুষেরা বাপ-দাদাদের ধর্ম ছাইড়া খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করছিলেন বহু আগেই। ফলে খ্রিস্টান পরিবারেই তার বাইড়া ওঠা। যদিও ইন্টারভিউটাতে তার বা তার পরিবারের এই জার্নি নিয়া খবু একটা আলাপ নাই। শুধু একটা জায়গায় আছে যে, তার বাবা যাজক হিসাবে নাইজেরিয়ায় নানান জায়গায় তাদের নিয়া ঘুরে বেড়াইছেন বহু বছর।

আচেবে ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় ভালো ছিলেন। ফলে স্কুল-কলেজ শেষে তিনি স্কলারশিপে ডাক্তারি পড়ারও সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু তা না পইড়া উনি বিখ্যাত ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন বইলা ঠিক করেন। ফলে স্কলারশিপটা মাঠে মারা যায়।

নাইজেরিয়ার ইতিহাসে ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব আমাদের দেশের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই। আচেবের থেকে বয়সে চার বছরের ছোট ওলে সোয়িংকাও ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র, যিনি পরে গিয়া নোবেল প্রাইজ পাইছিলেন। আসলে নাইজেরিয়ার স্বাধীনতার পেছনে এই জায়গার অনেক অবদান আছে।

তো যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই আচেবের লেখালেখি শুরু। ঔপনিবেশিক শাসনে বাইড়া ওঠা আর দশটা শিক্ষিত পোলাপানের মতো আচেবেও নিজের দেশ-জাতি-ভাষা নিয়া ধীরে ধীরে সচেতন হইয়া উঠতে শুরু করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হইল উনার সব লেখালেখির ইংরেজিতে।

সেইটা কেমনে হইল এইটার একটা মজার ব্যাখ্যাও এই ইন্টারভিউটায় আছে। খ্রিস্টান মিশনারিরা কেমনে উইড়া আইসা জুইড়া বইসা তাদের ভাষাটার দফারফা কইরা দিছিল, তা ওই জায়গাটা পড়লেই টের পাওয়া যায়। আর এগুলা যে সাম্রা জ্যবাদী আগ্রাসনের চিরাচরিত অভ্যাস তা আচেবে ঠিকই জানতেন। এগুলার পাশাপাশি জীবনের নানান কিসিমের তিতা অভিজ্ঞতা, কলোনিয়াল নাক উঁচা ভাবসাব, বর্ণবাদ ইত্যাদি তো আছেই।

ঔপনিবেশিক লুটতরাজ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর পোস্ট কলোনিয়াল যুগে নিজেদের পুটকি মারামারির দিক দিয়া আফ্রিকা আর ইন্ডিয়ান উপমহাদেশের মারাত্মক মিল। এই দুইটা জায়গাতেই ওই দুই সময়ে দুর্দান্ত সব সাহিত্যিকদের দেখা পাওয়া গেছিল। আচেবেও তেমনি একজন। ইনারা আসলে একটা বিশাল স্কেলের আগ্রাসনের বাইপ্রোডাক্ট।

আধুিনক আফিকান সাহিত্যের প্রথম দিককার মায়েস্ত্রোদের মতো আচেবের লেখাও মলূ ত নিজেদের শিকড়ের দিকে ফোকাসড। হাজার হাজার বছরের পুরান আফ্রিকান রূপকথা, প্রবাদ-প্রবচন, পুরুষের মতো বা কখনো কখনো পুরুষের চাইতেও শক্তিশালী নারীই তার অধিকাংশ লেখার নিউক্লিয়াস। থিংস ফল অ্যাপার্ট তার প্রথম বিখ্যাত কাজ। তবে এতটা শিকড় সচেতন হইয়াও তিনি যে এলিয়টরে এড়াইতে পারেন নাই, তা উপন্যাসটার নাম দেখলেই টের পাওয়া যায়। আর এইটার ব্যাখ্যাও আচেবে এই ইন্টারভিউয়ে দিছেন। তবে এইটাও ঠিক যে, ধার করা নাম হইলেও তা উপন্যাসটার গায়ে দাগ লাগাইতে পারে নাই এতটুকু।

এই ইন্টারভিউয়ে আচেবের জীবনের একটা মহাগুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিয়া কোনো প্রশ্ন নাই। তা হইল বায়াফ্রা। ১৯৬৭ সালে নাইজেরিয়ায় বায়াফ্রা নামের একটা অ ল নিজেদের স্বাধীন বইলা ঘোষণা করে। আচেবে তাদের সমর্থন জানান। তিন বছর মারামারি-কাটাকাটি চলার পর নাইজেরিয়া সরকার আবার অ লটা নিজেদের দখলে নিয়া নেয়। এতদিন শাসন-শোষণে কাটানো একটা দেশের বুদ্ধিজীবী হইয়াও এরকম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেয়াটা কিন্তু যা তা কথা না! আচেবের এই জিনিসটা আমার ভাল্লাগছে। আর এই সিদ্ধান্তটা যে তার ক্যারিয়ারেরও ক্ষতি করছিল তাও একটু মাথা খেলাইলেই বোঝা যায়।

মানুষ হিসাবে যে তিনি যথেষ্ট ঠোঁটকাটা ছিলেন তা জোসেফ কনরাডের লেখা নিয়া করা তার অ্যান ইমেজ অফ আফ্রিকা: রেসিজম ইন কনরাড’স ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’ শিরোনামের সমালোচনা পড়লেই বোঝা যায়। ফলে বেশ কয়েকটা জোশ উপন্যাস লেখেও তার কপালে নোবেল জোটে নাই। অথচ ওলে সোয়িংকা পাইছিলেন ঠিকই। বিতর্ক করার জন্যে বলতেছি না, তবে ২০১৩-তে আচেবে যখন মারা যান, তখন আফ্রিকায় তার নোবেল না পাওয়া নিয়া অনেক কথা উঠছিল। আর বলতে দ্বিধা নাই যে, আচেবের সেই নামকাওয়াস্তে সমর্থকেরা ব্যাপারটারে আসলেই নোংরামির পর্যায়ে নিয়া যান। তো তখন সোয়িংকা দ্য গার্ডিয়ান-এ দেয়া একটা সাক্ষাৎকারে এই নোংরামি নিয়া অনেক কথা বলছিলেন। তবে এও বলছিলেন যে, বায়াফ্রা প্রশ্নে আচেবের অবস্থান একেবারেই পছন্দ না তার। এইটা নিয়া আচেবের লেখা বই দেয়ার ওয়াজ অ্যা কান্ট্রি : অ্যা পারসোনাল হিস্ট্রি অফ বায়াফ্রা বিষয়ে তিনি বলছিলেন যে, এরকম একটা বই যেন আমার কোনোদিন না লেখা লাগে!

শেষ জীবনে আইসা আচেবে একটা খারাপ ধরনের গাড়ি দুর্ঘটনায় পইড়া মারাত্মক জখম হন। অপারেশন করা হয় তার শরীরে। বেঁচে গেলেও হুইল চেয়ারের জীবন মাইনা নিতে হয় তাকে। এরকম কিছুনা হইলে হয়তো জগতে আরও অনেকদিন পাওয়া যাইত তারে। যদিও আয়ুহিসাবে ৮২ বছর খুব একটা কম না!

তানভীর হোসেন
………………………………….


ইন্টারভিউয়ার :
আচেবে পরিবারের একজন হিসাবে ইগবো গ্রামে আপনার বাইরা ওঠা ও লেখাপড়া নিয়া কিছু বলেন; এমন কিছু কি ছিল সেই সময়, যা পরে আপনারে লেখালেখির দিকে ঠেলে দিছে?

চিনুয়া আচেবে : আমার মনেহয়, যেই জিনিসটা আমাকে এইখানে নিয়া আসছিল সেইটা হইতেছে গল্পের ব্যাপারে আমার আগ্রহ। এটাই হয়তো পরে গিয়া আমারে লেখালেখির দিকে ঠেলে দিছে। গল্প লেখা নিয়া তখন কোনো আগ্রহ ছিল না। তখন তা থাকার কথাও না, কারণ ওই বয়সে গল্প লেখা কঠিন। ফলে কেউ তা ভাবেও না। কিন্তু আমি জানতাম যে, আমি গল্প ভালোবাসি। আমাদের বাসায় বিশেষ করে আম্মা আর বড় বোনদের কাছে শোনা গল্পগুলা, যেমন ধরেন সেই কচ্ছপের গল্পটা। এইরকম যখন যারে পাইতাম, তার কাছেই গল্প শুনতাম। ধরেন আমার বাবার কাছে লোকজন আসছে, আলাপ করতেছে, আর আমি আশপাশে ঘুরঘুর করতেছি, তাদের গল্পগুজব শুনতেছি, এইরকম আর কি। স্কুলে থাকতে যেসব গল্প পড়া লাগত, সেগুলাও ভালো লাগত খুব।

একটুঅন্যরকম গল্প ছিল অবশ্য সেগুলা; তা ভালো লাগতো। নাইজেরিয়ার যে  অঞ্চলে আমরা থাকতাম, সেখানকার সবাই আবার অনেক আগে থেকেই খ্রিস্টান ধর্মে কনভার্ট হইছিলেন। আমার বাবা তো ধর্মগুরুও ছিলেন। ইগবোল্যান্ডের বিভিন্ন অ লে প্রায় ৩৫ বছর গসপেলের উনার বাণী প্রচার কইরা বেড়াইছেন। উনার ছয় সন্তানের মধ্যে আমি পাঁচ নাম্বার। আমি বড় হইতে না হইতেই বাবা অবসরে যান এবং পরিবার নিয়া নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। স্কুলে পড়তে শেখার পরপরই নানান মানুষ, নানান দেশের গল্প পড়তে শুরু করি। যে জিনিসগুলা আমারে মুগ্ধ করে, সেগুলা নিয়া একবার একটা প্রবন্ধ লিখছিলাম। অদ্ভুত সব ব্যাপারস্যাপার আর কি! যেমন ধরেন আফ্রিকার এক জাদুকরের কথা, যিনি একটা প্রদীপ খুঁজতে চীন চইলা গেছিলেন। এগুলা আমারে খুব টানে, কারণ এই কাহিনিগুলা এত দূরের সব জিনিস নিয়া যে, অবাস্তব লাগে।

এরপর আরেকটুবড় হয়ে যখন অ্যাডভেঞ্চার পড়া শুরু করি, তখন কেন জানি না আমি কেবল সেসব গল্পে বলা অসভ্য জংলিদের সামনাসামনি হওয়া নামকাওয়াস্তে ভালো ভালো সাদা মানুষদের পক্ষই নিতাম। কত ভদ্র-সভ্য তারা! কী অসাধারণ। সমঝদার। বাকিরা তাদের নখেরও যোগ্য না, তারা ছাড়া সবাই কুৎসিত, মাথামোটা। আর এসব পইড়াই আমি বুঝতে পারি যে, আপনের নিজেরও একটা গল্প থাকা দরকার, তা না হইলে খবর আছে। কথায় আছে, সিংহের নিজের গল্প বলার যদি কেউ না থাকে তাইলে শিকারের যাবতীয় গল্প হবে শিকারির ভালোমানুষি নিয়া। এই জিনিসটা আমি বুঝছি অনেক পরে। একবার যখন বুঝতে পারলাম যে আমি লেখক হবো, তখনই টের পাইলাম যে আমার সেই গল্পকার হইতে হবে, ওই সিংহদের গল্পকার আর কি। এইটা একজনের কাম না। কিন্তু তারপরও কাজটা আমাদের করতেই হবে যেন শিকারের গল্পগুলায় শিকারের যন্ত্রণার গ্লানি, সাহসিকতার পাশাপাশি সিংহদের কথাটাও থাকে। Continue reading

হুমায়ুন আজাদ এবং কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগ Featured

সাহিত্যে অথবা একাডেমিয়ায় কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগ নতুন কোন ঘটনা নয়। খ্যাতির মোহে যেমন অনেক বড় বড় কুতুব কুম্ভীলকবৃত্তিতে হাত মকশো করেন, তেমনি কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দেখে নেয়ারও একটি প্রবণতা রয়েছে। অর্থাৎ কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগেরও অনেক সময় রাজনৈতিক মাত্রা বিদ্যমান থাকে।

হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে আনা কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগ অনেকগুলো হলেও আমি মূলত আমার পাঠ অভিজ্ঞতার মধ্যে যেই লেখাগুলো রয়েছে সেগুলোর দিকেই দৃষ্টি দিব। এই কারনে বাংলা একাডেমী এককালে প্রকাশিত তার বইটি সম্পর্কে আমি বিশেষ মন্তব্য করছি না। কারন সেই বইটি এবং যে বই থেকে চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তার কোনটিই আমি পড়িনি। পশ্চিমবঙ্গের যে অধ্যাপক অভিযোগ এনে প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেই অধ্যাপকের কোন লেখার সাথেও আমি পরিচিত নই।

তার সেই প্রবন্ধটিও আমি পড়ি নাই। কিন্তু দুইটি যাচাইযোগ্য কথা এই সম্পর্কে বলা হয়েছে। প্রথমত বলা হয়েছে বাংলা একাডেমী বইটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করেছিল। দ্বিতীয়ত পশ্চিমবঙ্গের অধ্যাপকের প্রকাশিত প্রবন্ধটি কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল সেটিও বলা হয়েছে। এই দুইটি বিষয় যাচাই করা সম্ভব। সুতরাং কোন সিদ্ধান্তে আসতে হলে এই দুটি তথ্য যাচাই করাই যথেষ্ট। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে এই অভিযোগটি মিথ্যা হবার সম্ভাবনা কম। একটি প্রকাশনীর বাজার থেকে বই তুলে নেওয়া খুবই দৃশ্যমান একটি ঘটনা। কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগ করার চেষ্টা করে থাকে তাহলে এইভাবে গল্প ফাদার সম্ভাবনা কম।

আমার কথাবার্তা প্রধানত “নারী” এবং “আমার অবিশ্বাস” এ সীমাবদ্ধ থাকবে। এর কারন এই বইদুইটি এবং যে বইগুলো থেকে এগুলোকে চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয় সেই বইগুলো আমার পড়া আছে।

নারী দিয়েই শুরু করা যাক।

আহমদ ছফার একটি বক্তব্য আছে যেখানে তিনি বোঝাতে চাইছেন “নারী” বোভেয়ারের “সেকেণ্ড সেক্স” এর নকল। এর চেয়ে ভুল কথা আসলে কিছুই হতে পারে না। বোভোয়ার ছিলেন সার্ত্রের যুগের মানুষ। অস্তিত্ববাদ দ্বারা প্রভাবিত। তিনি সেকেণ্ড সেক্স লিখেছেনও ঐ যুগে। তিনি প্রধানত প্রথম যুগের নারীবাদী তাত্ত্বিকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। প্রথমযুগের নারীবাদী তাত্ত্বিকদের সাথে ফ্রয়েডিয়ান মনোবিশ্লেষকদের দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল না। সেকেণ্ড সেক্সও এই লাইনে লেখা। এই কারণে সেকেণ্ড সেক্স মূলত দার্শনিক। সমাজতন্ত্র দ্বারা বেশ খানিকটা প্রভাবিত। নারীর যৌনস্বাধীনতা সম্পর্কিত বয়ান সেকারণেই তুলনামূলকভাবে কম।

অন্যদিকে সেকেণ্ড ওয়েভ নারীবাদের মূল জায়গাটাই ছিল নারীর যৌন স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তারা মনে করতেন এর মাধ্যমেই পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফাটল ধরবে এবং নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।

তাদের ডিসকোর্সে তাই “ক্লিটোরিস” এর অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। তারা অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মাস্টারস এবং জনসন এর মত অন্যান্য সেক্সোলজিস্ট এর গবেষণা থেকে তথ্য আহরণ করে দেখিয়ে দেন নারীর যৌনতার কেন্দ্র হচ্ছে ক্লিটোরিস। যেহেতু ক্লিটোরিস এর মাধ্যমে পুলক পাওয়ার জন্যে ইন্টারকোর্স বাধ্যতামূলক নয়, সেই কারনে তারা নারীকে যৌনতার ক্ষেত্রে স্বাধীন দাবী করেন।

যারা “নারী” পড়েছেন, তারা অবশ্যই খেয়াল করেছেন, হুমায়ুন আজাদও একই লাইনেই কথাবার্তা বলেছেন।

হুমায়ুন আজাদ মূলত সেকেণ্ড ওয়েভ ফেমিনিস্টদের লেখালিখি থেকেই তার মুল রসদ জোগাড় করেছেন। এদের মধ্যে অবশ্যই মিলেট অন্যতম প্রধান। কিন্তু “নারী” বইটি এদের কারও কোন বইয়েরই হুবুহু নকল নয়। তবে এখানে নতুন তেমন কিছু নেই। বিশেষত তিনি সেকেণ্ড ওয়েভ ফেমিনিস্টদের ঠিকঠাক সাইট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি যদিও বইশেষে একটা গ্রন্থতালিকা দিয়েছেন, কিন্তু মূল লেখায় বিশেষ সাইটেশন নেই। কিছু সাইটেশন আছে রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমের লেখা থেকে। কিন্তু তার বই যে মূল অংশ অর্থাৎ সেকেণ্ড ওয়েভ ফেমিনিস্টদের কাজকর্মের কমেন্টারি, সেখানে তার সাইটেশনের ব্যর্থতা আসলেই দুঃখজনক। পশ্চিমা স্কলারশীপের স্ট্যাণ্ডার্ডে তার বিরুদ্ধে প্লেগারিজমের অভিযোগ আসত। কারণ ভূমিকা এবং গ্রন্থতালিকায় বইয়ের নাম উল্লেখ করা স্কলারলি বইপত্র-আর্টিকেলের জন্যে যথেষ্ট নয়। কোন মতামতগুলো লেখকের নিজের আর কোনগুলো তিনি অন্যদের থেকে নিয়েছেন, এর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করার দায় লেখকের আছে। Continue reading

আধুনিকতার ‘বিপন্ন বিস্ময়’: একটি মার্কসবাদী-পোস্টমর্ডান আলাপচারিতা Featured

পিয়াস করিম এই লেখাটায় মার্কসবাদের জায়গা থিকা পোস্টমর্ডানিজমরে কতোটা নেয়া যায় এবং কিভাবে নেয়া এই বিষয়ে আলাপ করছেন এইটা ধইরা নিয়া যে মার্কসবাদ হইতেছে আধুনিকতার পেরিফিরি’র ভিতর থিকাই আধুনিকতার ক্রিটিসিজম আর পোস্টমর্ডানিজমের কাজই হইলো আধুনিকতার বেসিসগুলারেই আউলাইয়া দেয়া; যেহেতু পোস্টমর্ডানিস্টদের প্রশ্নগুলা ভ্যালিড এই কারণে মার্কসবাদেরও বেইসগুলারে রিডিফাইন করা লাগে, আপডেটেড হওয়ার দরকার পড়ে এবং এই জায়গাতে পিয়াস করিম অ্যাজ আ্যা মার্কসিস্ট অ্যাকোমোডেটিভ হইতে চান; মার্ক্সসিজম এবং পোস্টমর্ডানিজমের ইন্টার-অ্যাকশনের স্পেসগুলারে ওপেন করতে চান।

এই লেখাটা এর আগে ছাপা হইছিল ‘প্রতিপাঠ: উত্তরআধুনিকতা’ (পৃষ্টা ১০৯ – ১৩০) নামের একটা সংকলনে। আর স্ক্যানকপিটা মৃদুল শাওনের মারফতে উনার কাছ থিকা নিছিলাম আমরা আপলোড করার জন্য।

– ই.হা.

 

এক.

পোস্টমর্ডানিজমের বিস্তৃত ব্যাখ্যান এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এর পরিসর আরো সীমিত, আরো সুনির্দিষ্টভাবে রাজনীতিমনস্ক। আমি একজন মার্কসবাদী। মার্কসবাদের কাছে আমার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। একজন মার্কসবাদী হিসেবে আমি পোস্টমর্ডানিজমের টেক্সট পাঠ করি, তাড়িত হই, আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কাছে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো বুঝে নেয়ার চেষ্টা করি। পোস্টমর্ডানিজমের সাথে আমি আমার মার্কসবাদের আলাপচারিতার একটি স্পেস তৈরি করি। পোস্টমর্ডানিজমকে কখনো ধারণ করি আমি আমার ডিসকোর্সে, কখনো সংশয়ী হই, কখনো অবিশ্বাসে, দ্বিমতে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠি। কিন্তু শেষ অব্দি এই কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার উপায় থাকে না।

একজন মার্কসবাদী হিসেবে, একই সাথে বৈশ্বিক ধনতন্ত্রের ক্ষেত্রে ও প্রান্তে অবস্থিত একজন মানুষ হিসেবে আমাকে আধুনিকতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আধুনিকতাকে আমি উপলদ্ধি করি কখনো স্পষ্টাস্পষ্টি, কখনো ধূসর, কিছুটা আলোআঁধারি অবয়বে। মার্কসে আমি অর্জন করি আধুনিকতার অন্তর্নিহিত বিপন্ন সংকটটির এ অব্দি সবচেয়ে ঋজু তীক্ষ্ণ পাঠ। য়ুরোপীয় বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে আমি যখন লেট ক্যাপিটালিজমকে দেখি, ধনতন্ত্রের অদৃষ্টপূর্ব বৈশ্বিক সংহতকরণ দেখি, আমাদের চেতনার অভ্যন্তরে, আরো ভেতরে আমাদের অবচেতনায় ধনতন্ত্রের শক্ত হয়ে ওঠা, দীর্ঘ হয়ে ওঠা অনুপ্রবেশ টের পাই, আমার অস্তিত্বের খুব কাছাকাছি পুরুষতান্ত্রিক ধর্ষণের চিৎকার শুনি, আমার বাদামি চামড়া যখন শ্বেতবর্ণ ঘৃণার আগুনে ঝলসে ওঠে, আমার বাদামি/কৃষ্ণ শরীরের বিপরীতে- আধুনিকতা সম্পর্কে আমার তখন ক্রগাগত, ক্লান্তিহীন, রক্তাপ্লুত বোধের জন্ম হতে থাকে। এই মানুষ আমি, রাজনীতির কাছে দায়বদ্ধ, এই মার্কসবাদী-আধুনিকতা থেকে উত্তরণের প্রাক্সিস/ন্যারেটিভ এ আমাকে অংশ নিতেই হয়। পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে আমার আগ্রহের এই হচ্ছে জেনেসিস।

এই আগ্রহের কারণেই আমাকে কতগুলো প্রশ্ন দাঁড় করাতে হয়। আধুনিকতার এবং উত্তরআধুনিকতার সংকট পোস্টমর্ডানিস্টরা যেভাবে চিহ্নিত করেছেন তা আমার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে তৃপ্ত করছে কী? আমার রাজনীতি জীবনকে যেমন আমূল পাল্টে দিতে চায়, এই পাল্টে দেবার পদ্ধতিতে পোস্টমর্ডানিজমের শক্তিটি কোথায়? এর দুর্বলতাগুলোই বা কী? মার্কসবাদের সাথে পোষ্টমডার্নিজমের কথোপকথনের একটি ভঙ্গি বা পদ্ধতি আমি কী করে তৈরি করে নিতে পারি? Continue reading

আল শাহারিয়ার জিদনী’র কবিতা

প্রেফারেন্স ।। যেসব বৃষ্টি মেঘ হয়ে পরে বৃষ্টি হয়েছিল ফের ।। পানি ।।  পতনবোধ ।।  সার্কাস ।।  ইভ, তোমার কাছে যাই! ।।  নরক ।।

…………………………….

 

প্রেফারেন্স

আমরা দু’জন দুইটা ভিন্ন অসুখ নিয়া বাঁইচা আছি
আমাদের তাই বিছানা আর ঘুম দরকার আলাদা,
আমাদের দরকার আলাদা চামচ-গ্লাস-গামছা।

আলাদা আলাদা জীবাণু নিয়ে বাঁইচা আছি আমরা
বাঁইচা আছি পৃথক গানের স্বাদ আর পোষা প্রাণীর প্রেফারেন্স নিয়া
আমাদের আরও আলাদা করে দেয় নিজস্ব মৃত্যুর চাহিদা।

দুইটা ভিন্ন অসুখে আমরা ভিন্ন ভিন্ন বিছানায় শুইয়া আছি
আমি ভাবতেছি আগুন তুমি ভাবতেছো
ব্যাপারটা আরো সহজ করার কথা!
তুমি চাইতেছো আমরা যেন সমুদ্রে গিয়ে মরি!
তবে এতো ভিন্নতার মাঝেও আমাদের যে মিল হইছে একটুখানি –
তা হইলো আমরা একটু ভিন্নভাবে মরতে চাই।
এতো মেইনস্ট্রিম মৃত্যু আমাদের ভালো লাগেনা।

 

যেসব বৃষ্টি মেঘ হয়ে পরে বৃষ্টি হয়েছিল ফের

তবে এইটুকু জানি বিজলীতে,
আম্মার মুখের জর্দা
ঘ্রাণের আয়াতুল কুরসিতে,
তখনও বৃষ্টি পেলে,
উড়ে যাওয়া আমপাতা,
মুকুল আর বুলবুলির ঘ্রাণ,
চমক লাগানো ঝিরিঝিরি এস্রাজ,
কেমন এনে দিতো বিরহিত সুর
আমাদের রোমান বারান্দায়।

আরো কালো – হলে হোক ঝড়!
কড়াইয়ের কোন ডাল,
ফাঁকি দিয়ে ফেরেস্তার চোখ,
ইচ্ছে করলে বেকায়দায়
ফেলুক ট্রাফিক, সন্ধ্যার!
জানি ডুবে গেছে সূর্য
শেয়ালপাদ্রীরা সব- ঘরে ফিরে যাক।
ডুবতে থাকা স্থলজ আস্ফালন এই!
তুমি শোনাও পুরাতন দিনের মতো আম্মা
তোমার জর্দা ঘ্রাণের আয়াতুল কুরসিটা
বৃষ্টিটা থেমে যাবার আগেই!

 

পানি

এইভাবে কি উইড়া যাওয়া যায় পাখি?
তোমার পানির মতো মনরে আগে মেঘ বানাও

বুকভর্তি পানি নিয়া কেউ কি উড়ে?
দেখছো কখনো তুমি?

আর প্রেম যখন আসবে সবকিছু ভাঙতে
কই তুমি যাবা আর উইড়া তখন?
খালি উড়বা আর ডানা ছিড়ে বের হইবে রক্ত

এজন্যই কি কিছু মানুষ পাখি হইতে চায়;
আর কেউ কেউ হইতে চায় গাছ?

যেনো উড়তে থাকা পাখিরা একটু
গিয়া বসবে ডালে
মুইছা নিবে ক্ষত, রক্তের দাগ
তারপর উড়বে আবার

আর পেছনে একটা কড়ই গাছ
স্রেফ দাড়ায়ে থাকবে
এক হাজার বছর।।

Continue reading

আমার গান কি সাহিত্য? – বব ডিলান

[বব ডিলান মিউজিক্যায়ারজ পারসন অফ দ্য ইয়ার ২০১৫ এওয়ার্ড পাওয়ার পর ত্রিশ মিনিটের এই ভাষনটা দেন। ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলস কমিউনিটি সেন্টারে।  ভাষনটাতে উনার পুরা মিউজিক ক্যারিয়ার নিয়া ইন্টারেস্টিং আর কন্ট্রোভার্সাল বেশ কিছু কথাই বলেন। উনার এত এত সাপোর্টার আর যারা যারা কিনা উনার গানকে পুরা দুনিয়ায় ছড়ায়া দিছিলেন তাদেরকে থ্যাংকস জানানোর পাশাপাশি যারা উনার গান নিয়া বিভিন্ন টাইমে আজেবাজে কথা বলছিলেন তাদেরকে উনার তেরছা কথাবার্তা দিয়া এক হাত দেইখা নেন।]

আমার গানরে যে এইভাবে অনার করা হইতেছে এজন্য আমি খুশি। কিন্তু আপনারা কম-বেশি জানেনই এইটা এত সহজে হয় নাই। এইটা বিশাল লম্বা একটা জার্নি আছিল আর এর পিছনে বহুত মেহনতও করতে হইছে। এই যে আমার গানগুলা, এগুলা একেকটা রুহানি গল্পের মতই, অনেকটা শেইকস্পিয়ার বাইড়া উঠার সময় যে খোয়াবের ভিতর দিয়া গেছিল ওইরকমই। আপনেরা নিশ্চয় বুঝতেছেন কেন আমারে এত বছর আগের কথা বলতে হইতেছে। গানগুলা তখন যেমন দলছুট টাইপের আছিল এখন আইসা শুনলেও দলছুট টাইপেরই মনে হবে আপনার। গানগুলার ভিত কিন্তু মজবুতই আছিল।

এতটুকু পথ পাড়ি দিয়া আইসা আমাকে কিছু মানুষের নাম নিতেই হয়। কলম্বিয়া রেকর্ডের ট্যালেন্ট হান্টার জন হ্যামন্ডের (John Hammond) নাম নিতেই হবে। উনি আমার সাথে যখন চুক্তি করেন তখন আমারে কেউই চিনতো না। এনাফ ভরসা না থাকলে এই কাজ পসিবল না, আর এইটা করতে গিয়া উনাকে অনেকে তাচ্ছিল্যও করছিলেন, কিন্তু উনার জায়গায় উনি স্ট্রেইট আর সাহসী আছিলেন। এইজন্য আমি উনার কাছে আজীবন গ্রেটফুল। আমার আগে লাস্ট উনি এরেথা ফ্রাংকলিন (Aretha Franklin)রে খুঁইজা বাইর করেন, আর এরও আগে কাউন্ট বেসি (Count Basie), বিলি হলিডে (Billie Holiday) সহ উনার খুঁইজা বাইর করা আরো আরো আর্টিস্টরা তো আছেনই। এরা সবাই নন-কমার্শিয়াল আর্টিস্ট আছিলেন।

জন চলতি ট্রেন্ডে গা ভাসাইতেন না, আর আমি তো একেবারেই নন-কমার্শিয়াল আছিলাম বাট উনি আমাকে ছাইড়া যান নাই। উনার আমার ট্যালেন্টের উপর আস্থা আছিল আর এইটার কারণেই উনি আমার সাথে আছিলেন। উনারে খালি থ্যাংকস দিলে কমই হয় আসলে।

ল্যু লেভি (Lou Levy) তখন লিডস মিউজিক চালাইতেন, উনারা আমার প্রথম দিককার গানগুলা বাইর করছিলেন, কিন্তু উনাদের সাথে আমি বেশি দিন আছিলাম না, লেভি নিজেই এইটারে অনেকদূর টাইনা নিছিলেন। উনি আমারে ওই মিউজিক কোম্পানির সাথে চুক্তি করান এবং বেশ কিছু গান রেকর্ড করেন আর আমি ওই গানগুলা জাস্ট টেপ রেকর্ডারেই গাইছিলাম। উনি আমারে ডাইরেক্ট বলছিলেন যে, আমি যেই গানগুলা করতেছিলাম এইরকম কিছু আগে কখনো হয় নাই, তার মানে দাঁড়ায় হয় আমি আমার টাইম থিকা আগেই জন্মাই গেছি নাইলে আমার টাইমরে আমিই রিপ্রেজেন্ট করতেছি, এবং আমি যদি উনারে তখন “Stardust” এর মতন গান দিতাম উনি হয়ত মানাই কইরা দিতেন এই বইলা যে এসব গান তো বহুত আগেই গাওয়া হইয়া গেছে অলরেডি।

তো উনি আমারে বললেন যে আমি যদি সত্যিই আমার টাইমের আগেই জন্মায়া যাই, আর এইটার ব্যাপারে ওইভাবে উনি শিউরও আছিলেন না তখন, এরকম কিছু যদি আসলেই ঘটতে যাইতেছে আর এইটা যদি ট্রু হয়, পাবলিক এই গানগুলা নিতে হয়তো আরো তিন থিকা পাঁচ বছরও লাইগা যাইতে পারে, আমারে এইজন্য তৈরি থাকতে বললেন উনি। আর সত্যি সত্যি হইলোও তাই। কিন্তু মুসিবত হইল যে, পাবলিক যখন গানগুলা নিতে পারলো আমি তখন আরো তিন থিকা পাঁচ বছর আগাইয়া গেলাম, যার ফলে একটা ঝামেলাই হইল আসলে। কিন্তু উনি আমারে সাহস দিয়াই গেলেন, উনি আমারে মাপতে চাইলেন না, আর এরজন্য আমি উনারে সবসময় মনে রাখি।

উনার পরে যে মিউজিক কোম্পানি আমার সাথে চুক্তি করে সেইটা হল আর্টি মোগালের উইটমার্ক মিউজিক, এবং উনি আমারে যে যাই বলুক না কেন গান লিইখা যাইতে বললেন, আমার কাছে ভাল লাগলেই হইল। তো, উনিও আমারে ব্যাকাপ দিছিলেন, আর বিনিময়ে উনারে আমি কী দিচ্ছি না দিচ্ছি এইটা নিয়া উনি ভাবতেনও না। এর আগে আমি নিজেরে কোনভাবেই গীতিকার বইলা ভাইবা উঠতে পারতাম না। আমি উনার কাছে, উনার ওই বিহেইভের কাছে আজীবন গ্রেটফুল হয়া থাকবো।

পুরান কিছু আর্টিস্টের নামও আমি নিতে চাই যারা একদম বলতে গেলে শুরুর দিকেই চোখ বন্ধ কইরা আমার গান রেকর্ড করছিলেন। ওই গানগুলা জাস্ট উনাদের ভাল লাগছে বইলাই এসব গান রেকর্ড করেন উনারা। পিটার, পল আর ম্যারি এরা গ্রুপ করার আগ থিকাই সবাইরে আলাদা কইরা আমি চিনতাম, তাদেরকেও আমি থ্যাংকস দিতে চাই। আরেকজন আমার লেখা গান গাইবে এইটা ভাইবা কখনো গান লিখবো এইটা চিন্তা করি নাই কিন্তু সেটা শুরু হইলেও বেশিদিন আগায় নাই, অন্তত এর চাইতে বড় একটা গ্রুপের জন্য গান আর লেখি নাই পরে।

উনারা আমার একটা গান হারায়া যাওয়ার আগে ওই গানটা আবার নিজেরা রেকর্ড করছিলেন, পরে ওইটা হিউজ মার্কেট পাইছিল তখন। আমি আমার লেখা গানটারে যে জায়গায় নিতে পারি নাই তারা বেশ ভাল কইরাই সেটা পারছিল। এরপর থিকা কমপক্ষে একশ জন একশ জায়গা থিকা ওই গানটা বাইর করছিল, কিন্তু আমার মনে হয় উনারা যদি ফার্স্টে এইটা বাইর না করতেন, অন্যরাও সেটা করতেন না। উনারা আমার জন্য একটা দরজা খুইলা দিলেন জাস্ট।

The Byrds, the Turtles, Sonny & Cher- ইনারা আমার কিছু গানরে সেরা দশের ভিত্রে নিয়া আসতে পারছিলেন কিন্তু আমি তো আসলে পপুলার গান লেখতে চাই নাই, আমি মোটেই ওইরকম কিছু হইতে চাই নাই, কিন্তু যা হইছে ভালই তো হইছে। তাদের ওই গানগুলা যদিও কমার্শিয়াল ঢংয়ে গাওয়া হইছিল, কিন্তু আমার এইটা তেমন গায়ে লাগে নাই কারণ পঞ্চাশ বছর পরে আইসা তো সে গানগুলা ঠিকই কমার্শিয়াল ব্যাসিসেই ইউজ হচ্ছে। তো উনারা গাইছেন ভালই হইছে, উনারা গাইছেন আমি খুশিই হইছি।

পার্ভিস স্টেইপেলস (Pervis Staples) আর স্টেইপল সিংগার (Staples Singer) – উনারা যত দিন স্ট্যাক্সে আছিলেন ইপিক আছিলেন আর উনারা আমার কাছে সবসময়কার সেরাদের ভিত্রে একজন হইয়া থাকবেন সবসময়। বাষট্টি-তিষট্টির দিকে উনাদের সাথে আমার দেখা হইছিল। উনারা আমার গান লাইভ শুনছিলেন এবং তিন কি চারটা গান পার্ভিস রেকর্ডও করতে চাইছিলেন এবং স্টেইপল সিংগারদের নিয়া করছিলেনও। উনাদের মতন আর্টিস্টরাই আমার গানগুলা রেকর্ড করুক সেটা আমি চাইছিলাম সবসময়।

নিনা সিমোন (Nina Simone), নিউইয়র্ক সিটির ভিলেজ গেইট নাইটক্লাবে উনার সাথে প্রায়ই আমি দেখা করতে যাই। এই ধরনের আর্টিস্টদেরই আমি খুঁইজা বেড়াইতাম। উনি আমার কিছু গান রেকর্ড করছিলেন যেগুলা উনি আমারে [পরের অংশ শুনা যায় নাই]। উনি চমৎকার আর্টিস্ট যেমন আছিলেন, ভাল পিয়ানোও বাজাইতেন, আবার সিঙ্গারও আছিলেন। বেশ স্ট্রং উইম্যান উনি, যা বলতেন ডাইরেক্ট বলতেন। আমার সব কিছু মাইনা নিয়াই উনি আমার গানগুলা রেকর্ড করছিলেন।

ও আচ্ছা, আমি জিমি হেন্ড্রিক্স (Jimi Hendrix)কেও ভুলতে পারবো না। জিমি হেন্ড্রিক্স যখন Jimmy James and the blue flames বা এই টাইপের একটা ব্যান্ডে কাজ করতেন তখন আমার সাথে তার দেখা হয়। জিমি গান টান গাইতেন না। গিটার বাজাইতেন। আমার যে গানগুলা অন্যরা পাত্তা দিত না উনি ওই গানগুলাই বাইছা নিলেন আর এগুলারে ফুলায়া ফাঁপায়া পুরা এলাকা করলেন এবং এগুলা তো এখন একেকটা ক্লাসিক হইয়া গেছে। আমাকে জিমিরে থ্যাংকস বলতেই হয়। উনি এখানে উপস্থিত থাকলে আমার ভালই লাগতো।

জনি ক্যাশ (Johnny Cash) তেষট্টি সালের আগে পরে আমার কিছু গান রেকর্ড করছিলেন, তখন উনি দেখতে একদম ম্যাড়া টাইপের আছিলেন। উনি গানের পিছে মেলা দিন খাটছেন, বেশ হার্ড ওয়ার্ক বলা যায়, তো, উনি কিন্তু আমার কাছে একজন আগাগোড়া হিরো হইয়াই আছিলেন। আমি যখন উঠতি বয়সি তখন উনার এত এত গান শুনতাম। আমার নিজের গুলার চাইতেও উনাদের গানগুলা আমি বেশি ভাল কইরা বুঝতে পারতাম। ওই যে Big River, I Walk the Line গান দুইটা। Continue reading

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য