…
আর্নেস্ট। এইটাই সত্য। আসলেই: এমন বিরক্তি নিয়া ঘাড় উল্টাইলে কোনো লাভ নাই। কথাটা আসলেই সত্য। আর্টের সোনালী দিনে কোনো আর্ট-ক্রিটিক আছিলো না। ভাস্কর তখন মার্বেল পাথরের ভিত্রে ঘুমায়ে থাকা বিশাল সাদা-গায়ের হার্মিসরে চেঁছে বের করে আনতো। মোম আর সোনার পরত দেওয়ার কারিগররা মূর্তিটারে রং আর টেক্সচার দিতো, আর যখন দুনিয়া তারে দেখতো, পূজা করতো, সরল মনে। বালুর ছাঁচের মধ্যে জ্বলজ্বল করতে থাকা কাঁসা ঢেলে দিতো, আর লাল ধাতুর নদীটা ঠান্ডা হইতে হইতে ছাঁচের বাঁকগুলায় জমে দেবতার গায়ের গড়ন নিতো। এনামেল বা পলিশ করা মণিমুক্তা দিয়া দৃষ্টিহীনরে দৃষ্টি দিতো। বাটালির নিচে কাঠের তুষগুলা হাইসিন্থ ফুলের পাপড়ির মত কোঁকড়ায়ে পড়তো। আর যখন, কোনো মাটির কারুকাজ করা দেওয়ালঅলা মন্দিরের ঢিমা আলোয়, অথবা সূর্যের আলোতে ফর্সা, চারদিকে পিলার দেওয়া নাটমন্দিরে, লেটো দেবীর পোলা তার পদস্থলের উপ্রে দাঁড়ায়তো, পাশদিয়া ἁβρῶς βαίνοντες δια λαμπροτάτον αἰθέρος৩ {আসমানি জাঁকজমকের ভিত্রে খোলা-খুলি হেঁটে যাওয়া (ইউরিপিদেসের মিডিয়া:৮২৫-৩০)} মানুষগুলা তাদের জীবনে নতুন একটা ইন্ফ্লুয়েন্সের সামনাসামনি হওয়ার অনুভূতি পাইতো, আর একটা খোয়াবি ভাব নিয়া, বা অদ্ভুত তাড়াহুড়া করে ওঠা আনন্দের ভাব নিয়া, বাড়ি যাইতো বা রোজকার কাজে, অথবা ঘুরতে ঘুরতে শহরের ফটক দিয়া পরীর-আছর-পড়া মাঠে বাইরাইয়া পড়তো যেইখানে ফেড্রাস তার পাও ধুইতো, আর, হাওয়ায় ফিসফিসায়ে ওঠা লম্বা চিনার আর ফুলফুটা নিশিন্দার তলে ওইখানে ওই নমর ঘাসের উপ্রে শুইয়া, সৌন্দর্যের আশ্চর্য নিয়া ভাবতে শুরু করতো, আর অনভ্যাসের মুগ্ধতায় নিরব হইয়া পড়তো। ওই দিনগুলাতে আর্টিস্ট স্বাধীন আছিলো। নদীর বাঁক থেকে আঙ্গুলে করে চিনা মাটি তুলে নিতো, আর কাঠ বা হাড্ডির ছুট্টু যন্ত্র দিয়া, মাটিটারে এত মনকাড়া সুন্দর সব রূপে গড়ন দিতো যে, মানুষ ওইগুলা মুর্দারারে খেলার জন্য সাথে করে দিয়া দিতো, টানাগ্রার পাশের ওই হলদিয়া টিলার উপ্রের ধুলা ভরা মাজারগুলাতে এখনও আমরা পুতুলগুলা খুঁজে পাই, চুল, ঠোঁট আর লেবাসে হালকা সোনালী আর ফিকা হইয়া পড়া কড়া লালটা এখনও লেগে আছে। নতুন চুনকাম করা দেওয়ালে, উজ্জ্বল সিন্দুর বা দুধ আর জাফ্রান মেশানো রঙ দিয়া, বেগুনী-সাদা ফুলে ফুটফুটা আস্ফদেল মাঠের ভিত্রে দিয়া মেহনতে হয়রান পাও দুইটা টাইনা যাওয়া মানুষটার ছবি আঁকতো, ‘যার চোখের পাতায় পুরাটা ট্রোজান ওয়ার ভর করে আসছে,’ পলিক্সেনা, প্রিয়মের মেয়ে; অথবা আঁকতো অডিসিয়াসরে, বুদ্ধিমান আর চালুমাল অডিসিয়াস, শক্ত দড়ি দিয়া মাস্তুলের সাথে আঁট করে বান্ধা, যাতে কোনো খেসারত ছাড়া মৎসকন্যারার গান শুনতে পারে, অথবা তারে আঁকতো পরিষ্কার পানির নদী আখেরনের পাড় ধরে ঘুরাফেরা করতেছে, যেইখানে মাছের ভুত নুড়ি পাথরের বিছানার উপ্রে ছটফটায়; অথবা আঁকতো ম্যারাথন মাঠে তহবন্দ পরে মিট্রে মাথায় গ্রিকরার সামনে দিয়া পার্সিয়ানরার ছুটে যাওয়া, বা ছোট সাগর সালামানিয়ানে গ্যালি-নৌকায় গ্যালি-নৌকায় পিতলের গুলুইগুলার টক্কর লাগা। রুপার খড়ি বা কয়লা দিয়া চামড়া বা দেবদারু কাঠের উপ্রে আঁকতো। হালকা সাদা আর গোলাপি রঙের টেরাকোটার উপ্রে মোম দিয়া আঁকতো, জলপাইয়ের রস দিয়া মোমরে গলায়ে আর গরম লোহার সেঁকা দিয়া মোমটারে আবার জমায়ে আঁকতো। তার তুলির পোচগুলা পেনেল, মার্বেল আর লিলেন ক্যানভাসের উপ্রে দিয়া চইলা যাইতে যাইতে সেগুলারে মনকাড়া করে তুলতো; আর জীবন নিজের আপন ছবি দেখে, থমকায়ে যাইতো, রা করার সাহস করতো না। সমস্ত জিন্দেগী, সত্যিই, তার আছিলো, বাজারে বসে থাকা ব্যাপারী থেকে ধরে টিলার উপ্রে চাদ্দর মুড়ি দিয়া শুইয়া থাকা রাখালটা; তেজপাতা গাছের ঝোপে লুকায়ে থাকা নিম্ফ আর দুপুরে বাঁশি বাজানো ফন থেকে নিয়া, দাসরা তাদের তেল চকচকা কাঁধের উপ্রে লম্বা লম্বা সবুজ পর্দাঘেরা পালকিতে করে ময়ুরের পালকের পাংখার বাও দিতে দিতে বয়া নেওয়া রাজা পর্যন্ত সব তার আছিলো। বেটা মানুষ আর বেটি মানুষ, মুখের উপ্রে খুশি বা কষ্ট নিয়া তার সামনে দিয়া চলে যাইতো। সে তাদের দেখতো, আর তাদের গোপন কথাগুলা তার হইয়া যাইতো। ছুরত আর রং দিয়া সে আবার একটা দুনিয়া বানাইতো।
সব রকমের হাতের আর্টেও তার মালিকানা আছিলো। সে ঘুরতে থাকা শানপাত্থরের উপ্রে জওহরটা ধরতো, আর পদ্মনীলাটা এডনিসের বেগুনী পালঙ্ক হইয়া উঠতো, আর গোমেদ পাথরের সাদা আর লালের পরতগুলার ভিত্রে দিয়া আর্টেমিস তার কুত্তার পাল নিয়া দৌড়ায়ে যাইতো। সে স্বর্ণরে পিটায়ে গোলাপ বানাইতো, তারপর গোলাপগুলারে গেঁথে গেঁথে হার বা বাজুবন্ধ। সে স্বর্ণরে পিটায়ে পিটায়ে দিগ্বীজয়ীর মুকুটের জন্য মালা বানাইতো, টিরিয়ান রোবের পামেট বানাইতো, বা রাজবাড়ির মড়ার জন্য মুখোস বানাইতো। রুপার আয়নাটার পিছনে সে নেরেডদের উপ্রে চড়া থেটিসরে খোদাই করতো, অথবা প্রেমে জরজর ফেড্রা আর তার দাসীরে, অথবা পার্সিফোনরে, স্মৃতির জ্বালায় ত্যক্ত, চুলের খোপায় আফিং ফুল গুঁজতেছে। কুমার তার ছাউনির তলে বইতো, আর, নিরব চাকাটা থেইক্যা ফুলের মত করে, গামলাটা তার হাতের নিচে গড়ে উঠতো। গামলার তলাটারে, গলা আর হাতল দুইটারে, সাজাইতো মিষ্টি জলপাইয়ের অথবা কচি অ্যাকান্থাসের পাতা অথবা চোখা চোখা ঢেউ দিয়া। তারপর কালা বা লাল কালিতে পোলাপানের কুস্তি খেলা আঁকতো, অথবা দৌড় খেলা; আজিব সব হেরাল্ডিক ঢাল আর রোদ আটকানের ভিজর-অলা মাথা থেকে পাও পর্যন্ত যুদ্ধের আবরণ পরা নাইট আঁকতো, ঝিনুকের মত রথ থেকে দুই পা উঠানো ঘোড়াগুলার উপর ঝাপায়ে পড়তেছে: আঁকতো বিরাট আয়োজনে খাইতে বসা বা কেরামতি দেখায়তে থাকা দেবতা: আর বিজয় বা বেদনায় কাতরাইতে থাকা নায়ক। মাঝে মাঝে সাদা জমিনে সিন্দুরের দাগ দিয়া দিয়া আঁকতো কাহিল হইয়া আসা জামাই আর তার বৌ, দুই জনরে ঘিরা কামদেব ঘুরঘুর করতেছে— আর আঁকতো কামদেবরে, দোনাতেলোর দেবদূতের মত করে, সোনা দিয়া গিল্টি করা বা আকাশের মত নীল পাখনাঅলা, হাসি মুখে। গামলার বাঁকা জায়গাটাতে তার বন্ধুর নাম লেখতো। ΚΑΛΟΣ ΑΛΚΙΒΙΑΔΗΣ৪ {সুন্দর আলকিবিয়াদেস} বা ΚΑΛΟΣ ΧΑΡΜΙΔΗΣ৫ {সুন্দর খার্মিদিস} তার আমলের গল্পগুলা আমরারে বাখানে। তারপর আবার, চ্যাপটা কাপের ছড়ানো কান্ধার উপ্রে সে ঘুরাফিরা করতে থাকা মাদা হরিণ আঁকতো, অথবা ঘুমায়তে থাকা সিংহ, তার কল্পনা যেমনটা চাইতো। পিচ্চি আতরের বোতলটার গায়ে আফ্রোদিতি তার সাজার ঘরে বসে হাসতো, আর, উদাম গায়ের মেনাডদের সারি নিয়া আঙ্গুরের রসে ভেজা পাওয়ে ডায়নিসাস ওয়াইন-বোতল ঘিরা নাচতো, আরেক দিকে, মশকরার ঢঙে, ফোলা ফোলা মশকের উপ্রে বুড়া সিলেনাস শরীর এলায়ে পড়ে থাকতো, অথবা জাদুর বল্লমটা নাড়াইতো যেইটার আগাটা দেওদার আর আইভি লতার নকশায় পেচানো ছিলো। আর আর্টিস্টরে কাজের মধ্যে রান্দা করার মত কেউ আছিলো না। কোনো দায়সারা বাজে বকা তারে ডিস্টার্ব করে নাই। মতামতের ভয় তার আছিলো না। ইলিসাসের৬ {এথেন্সের একটা ছোট্ট নদী, প্লাতোর ডায়ালগের শান্ত সেটিংয়ে এই নদীর পারের কথা আছে। নদীটার সাথে ফিলোসফিকাল আলাপের একটা যোগাযোগ আছে।} কসম, আর্নল্ড কোনো এক জায়গায় কইছিলো, তখন হিগিনবথাম বলতে কিছু আছিলো না। ইলিসাসেস কসম, গিলবার্ট দোস্ত আমার, তখন কোনো আজাইরা আর্ট-কংগ্রেস আছিলো না, যেইটা প্রদেশে প্রদেশে প্রাদেশিকতা ছড়াইতো আর সস্তামিরে কথা কওয়া শিখাইতো। ইলিসাসের কসম আর্ট বিষয়ে কোনো মাথা খায়া ফালানো মেগাজিন আছিলো না, যেইটার মধ্যে মেহনতিরা, তারা যা বুঝে নাই তা নিয়া বকবক করতো। ওই ছোট্ট গড়ানটার নল-খাগড়ার ঝোপে ছাওয়া দুই পাড়ে কোনো হাইস্যকর জার্নালিজম দেমাগ দেখায়ে এক চেটিয়া জাজের আসন দখল করে নাই, যাদের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়ে মাফ চাওয়া উচিত আছলো। গ্রিকরার কোনো আর্ট-ক্রিটিক আছিলো না।
গিলবার্ট। আর্নেস্ট, তুই ভালোই মজার লোক, কিন্তু তোর ভিউগুলা খুবই বাজে রকমের গলদে ভর্তি। আমার দুশ্চিন্তা হইতেছে তুই বেশ অনেক দিন ধরে তোর থেকে বয়স্ক লোকের আলাপ-আলোচনা শুনতেছিস। এই কাজটা সব সময়ই বিপজ্জনক, আর যদি এইটারে অভ্যাস হইয়া যাইতে দেস, তাইলে দেখবি এই অভ্যাস তর সব রকমের আক্কেলি উন্নতির ক্ষেত্রে মারাত্মক হইয়া দাঁড়াইছে। মডার্ন জার্নালিজমের কথা যদি জিগাস, তাইলে এইটারে ডিফেন্ড করা আমার কাম না। এইটা নিজের অস্তিত্বরে, সার্ভাইবাল অব দি ভালগারেস্ট, এই মহান ডারউইনী নীতি দিয়া জাস্টিফাই করে ফেলেছে। আমার কাম হইলো স্রেফ সাহিত্যের সাথে।
আর্নেস্ট। কিন্তু লিটারেচার আর জার্নালিজমের তফাতটা কি?
গিলবার্ট। ওঃ! জার্নালিজম হইলো যেইটা পাড়া যায় না, আর লিটারেচার হইলো যেইটারে পড়া হয় না। এই টুকই। কিন্তু গ্রিকরার কোনো আর্ট-ক্রিটিক আছিলো না, তোর এই কথাটার ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারস, কথাটা খুবই অ্যাবসার্ড। বরং চ সুবিচার করতে হইলে বলতে হইবো গ্রিক জাতটাই আছিলো আর্ট-ক্রিটিকের জাত।
আর্নেস্ট। সত্যিই?
গিলবার্ট। হ, আর্ট-ক্রিটিকের জাত। কিন্তু এইযে এত সুন্দর এক তছবির আঁইকা তুই হেলেনিক আর্টিস্ট আর তার যুগের ইন্টেলেকচুয়াল স্পিরিটের মধ্যে এক আজগুবি সম্বন্ধ দেখাইলি এইটারে আমার নষ্ট করতে মন চাইতেছে না। যেই ঘটনা কোনো দিন ঘটে নাই ওইটার ঠিক ঠিক বিবরণ দেওয়া খালি একজন ইতিহাসবিদেরই আসল কাম না, বরং প্রত্যেকটা এলেমঅলা আর কালচার্ড লোকের অলঙ্ঘনীয় অধিকার। আর তার চেয়ে কম মনে চাইতেছে ওস্তাদি ঢঙে কথা কইতে। ওস্তাদিআনা ঢঙে কথা-বার্তা বলা এক হইলে মূর্খের শখের কাজ আর নাইলে মগজের দিক দিয়া বেকার লোকের চাকরি। আর, আত্মোন্নিতিমূলক আলোচনা বলতে যা বুঝায় ওইটা স্রেফ একটা আহাম্মকি কায়দা, যেই কায়দা দিয়া আরও বড় আহাম্মক সমাজপ্রেমীগুলা সমাজের ক্রিমিনাল ক্লাসের ন্যায্য জাত দুশমনিরে আনাড়ি হাতে সমাধান করার চেষ্টা করে। নাঃ: চল, তরে দ্ভোজাকের কোনো পাগলা রক্ত-রঙা কিছু বাজায়া শুনাই। টেপেস্ট্রির মলিন মুখগুলা আমরার দিকে চায়া মুচকি মুচকি হাসতেছে, আর দেখ আমার কাঁসার নার্গিস ফুলগুলা ঘুমে গুটিশুটি হইয়া আছে। এখন কোনো কিছু নিয়া গম্ভীর আলাপ করতে কইস না। এমনিতেই সারাক্ষণ খেয়ালে থাকে, আমরা এমন এক যুগে আইসা জন্মাইছি যেইখানে একমাত্র পাংসা জিনিসরেই সিরিয়াসলি নেওয়া হয়, আর সারাক্ষণ লোকে আমারে না-ভুল বোঝার আতঙ্কে থাকি। তরে কাজের কথা শেখামু আমারে এমন জায়গায় নামায়ে নিস না। শিক্ষা সুখ্যাত করার মত একটা জিনিস ঠিক, কিন্তু সময়ে সময়ে এই কথাও মাথায় রাখা দরকার যে, জানার মত কোনো এলেমই শেখানো সম্ভব না। দেখ্, জানলার পর্দাগুলার ফাঁক দিয়া চান্দটারে পিটানো রুপার চাকতির মত দেখা যাইতেছে। গিল্টি করা মৌমাছির মত তারাগুলা চান্দের চাইর দিকে ঝাঁক বাঁধতেছে। আকাশটা একটা শক্ত ফাঁপা নীলমণি। ল, আজকা রাত্রে বাইরে যাই। চিন্তা ভাবনা করা খুবই মজার, কিন্তু এডভেঞ্চারে তার চেয়েও আরো বেশি মজা। কে জানে, এমনও তো হইতে পারে বহেমিয়ার রাজকুমার ফ্লোরিজেলের লগে দেখা হইয়া গেল, আর কিউবান সুন্দরীরে হয়তো কইতে শুনতে পামু, সে আসলে তারে যেমন দেখা যায় তেমন না?
আর্নেস্ট। তুই জঘন্য রকমের খামখেয়ালি। আমি তরে এই বিষয়ে আলাপ করার জন্য জোরাজুরি করমুই। তুই কইলি গ্রিকরা পুরা জাতটাই আর্ট-ক্রিটিকের জাত। কি আর্ট-ক্রিটিসিজম তারা আমরার জন্য রাইখা গেছে?
গিলবার্ট। মাই ডিয়ার আর্নেস্ট, যদি এক টুকরা আর্ট-ক্রিটিসিজমও হেলেনিক বা হেলেনিস্টিক আমল থেকে আমার যুগ পর্যন্ত না আইসা থাকে, তার পরেও গ্রিকরা যে আর্ট-ক্রিটিকের জাত আছিলো এই কথাটা কোনো অংশে মিছা হইয়া যাইবো না, কারণ তারা যেমন অন্যান্য সব কিছুর ক্রিটিসিজম আবিষ্কার করে গেছে তেমন আর্টের ক্রিটিসিজমও তাদেরই আবিষ্কার। কারণ, দিন শেষে দেখতে গেলে গ্রিকরার কাছে আমরার সবচেয়ে বড় ঋণ কোনটা? এক কথায় ক্রিটিকাল আন্দাজ বা মন। আর, এই যেই আন্দাজটারে তারা ধর্ম আর বিজ্ঞান, নীতি আর অধিবিদ্যা, রাজনীতি আর শিক্ষার প্রশ্নে খাটাইছে ওইটারে আর্টের ক্ষেত্রেও খাটাইছে, আর, সত্যি বলতে, আমরারে আর্টের মধ্যে সবচেয়ে উঁচা দরজার দুইটা আর্টের ক্রিটিসিজমের পদ্ধতি দিয়া গেছে, এই দুনিয়ার দেখা সবচেয়ে নিখুঁত পদ্ধতি।
আর্নেস্ট। কিন্তু সবচেয়ে উঁচা দরজার আর্ট কোন দুইটা?
গিলবার্ট। জীবন আর সাহিত্য, জীবন আর জীবনরে নিখুঁত ভাবে ফুটায়ে তোলা। প্রথমটার যেই নীতিগুলা গ্রিকরা ঠিক করে গেছে, ওইগুলারে আমরার নিজেরার এত এত মিথ্যা আইডিয়ায় ঝাপসা এই যুগে হয়তো বাস্তবে কাজে লাগাইতে পারমু না। কিন্তু পরেরটার নীতিগুলা, তারা যেমন রেখে গেছে, এত সূক্ষ্ম যে অনেক ক্ষেত্রে ভাসাভাসাই বুঝতে পারি শুধু্। যেইটা মানুষরে তার অগুনতি রকম-ফের সহ তুলে ধরতে পারে ওইটাই হইলো সবচেয়ে পার্ফেক্ট আর্ট, এটা বুঝতে পেরে তারা ভাষার ক্রিটিসিজমরে, খালি মেটেরিয়ালের দিক দিয়া হিসাব করলেও, এমন একটা পর্যায়ে নিয়া গেছে যেইখানে আমরা, আমরার যুক্তি বা ইমোশনাল জোর বোঝানের জন্য এক্সেন্ট ব্যবহারের সিস্টেম দিয়া যাইতে পারমুই না ধরে নেওয়া যায়; যেমন ধর্, গদ্যে মাত্রার চলনরে তারা, আধুনিক মিউজিশিয়ানরা হার্মোনি আর কাউন্টারপয়েন্টরে যেইভাবে বৈজ্ঞানিক চোখে গবেষণা করে, বলা বাহুল্য, তার চেয়েও বেশি মনোযোগী এস্থেটিক ঝোঁক নিয়া গবেষণা করে গেছে। এই বিষয়েও তারা সঠিক আছিলো, যেমন আছিলো আর সব ব্যাপারেও। ছাপাখানার চল শুরু হওয়া, আর এই দেশের নিম্ন আর মধ্যম শ্রেণীর লোকরার মধ্যে পড়ার মারাত্মক অভ্যাস গড়ে ওঠার পর থেকে, সাহিত্য দিনকে দিন চোখের ভালো লাগার দিকে ঝুঁকতেছে, আর কানের ভালো লাগার থেকে দূরে সরে যাইতেছে, আসলে যেই ইন্দ্রীয়র কাছে, পিউর আর্টের জায়গা থেকে দেখলে, ভালো লাগার চেষ্টা করার কথা আছিলো, ভালো লাগা না-লাগার কানুনের ভিত্রে থাকার কথা আছিলো। এমন কি ইদানীং, আমরার ইংরেজি গদ্যছন্দের সবচেয়ে পারদর্শী গুরু মি. পাটের এর কাজগুলারেও পুরাটার বিচারে এক ছত্র গানের চেয়ে এক টুকরা মোজাইকই বেশি মনে হয়, আর এইখানে ওইখানে মনে হয় যেন একটা অভাব আছে, সত্যিকারে শব্দের ছন্দঅলা চঞ্চল জীবন আর এমন ছন্দময় জীবন ভাবের যেই মিহি স্বাধীনতা আর জাঁকজমকরে সম্ভব করে ওইটার অভাব। সত্যি বলতে কি, আমরা লেখালেখিরে একটা রচণা লেখার গৎবান্ধা পদ্ধতি বানায়ে ফেলছি, আর এরে জমকালো ডিজাইনের নকশার মত ট্রিট করছি। আর অপর দিকে, গ্রিকরা লেখাজোখারে স্রেফ ঘটনা-বিত্তান্ত টুকে রাখার একটা উপায় হিসাবে দেখতো। তাদের কাছে পরখ করার একমাত্র পদ্ধতি আছিলো মুখের কাথারে মাত্রা আর ঝংকারে বিচার করা। গলা আছিলো মাধ্যম, আর কান আছিলো ক্রিটিক। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কাহিনিগুলাতে হোমাররে অন্ধ কওয়াটা আসলে ক্রিটিকাল আমলের তৈরি একটা আর্টিস্টিক মিথ, যাতে আমরারে মনে করায়ে দিতে পারে, মহান কবি সব সময় চামড়ার চোখ দিয়া দেখার চেয়ে মনের চোখ দিয়া বেশি দেখা একজন দর্শকই স্রেফ না, বরং একজন সত্যিকার গায়কও, যিনি নিজের গানগুলারে মিউজিক দিয়া তৈরি করেন, প্রত্যেকটা লাইনরে বারে বারে নিজেরে শুনাইতে থাকেন যতক্ষণ গানের সুরের গোপন কথাটা তার কাছে ধরা না পড়ে, অন্ধারে বসে আলোর পাখনাঅলা শব্দ জপ করেন। আসলেই, বাস্তবে যা-ই হইয়া থাক, তার অন্ধত্বের কাছে, করণে হিসাবে না হোউক উপলক্ষে হিসাবে, ইংল্যান্ডের মহাকবি তার শেষে জীবনের কবিতাগুলার শাহী চাল আর আওয়াজের জাঁকজমকের জন্য ঋণী। মিল্টন যখন আর লেখার অবস্থায় নাই, তখন গাইতে শুরু করছিলেন। কোন্ লোক কমুসের ছন্দের মাত্রাগুলার লগে স্যামসন অ্যাগনিস্টেস, বা প্যারাডাইজ লস্টের সাথে রিগেইন্ডের মাত্র মিলায়তে পারবো? মিলটন যখন আন্ধা হইয়া গেছিলেন তখন শুধুমাত্র গলা দিয়া কম্পোজ করছেন, সবার যেমনে কম্পোজ করা উচিত, আর শুরুর জীবনের পাইপ বা নলের বাঁশিটা তখন শেষ জীবনে গিয়া বহু চাবিঅলা ভারী-চালের অর্গান হইয়া উঠছে যেইটার জমকালো ঝংকারের মিউজিক হোমারিক শ্লোকের চঞ্চলা ভাবটা নিয়া না থাকলেও, সবগুলা শাহী ভাব পাওয়া যায়, প্রত্যেকটা যুগের ভিতর দিয়া চলে গিয়াও, অর্গানটা যুগগুলারে ছাড়ায়ে গেছে, তার ফর্মে অমর হইয়া আমরার মধ্যে চিরকালের জন্য বাস করতেছে, এইটা ইংরেজি সাহিত্যের একমাত্র ওয়ারিশ যেইটা কোনোদিন নষ্ট হইব না। হ: লেখালেখি লেখকরার বহুত ক্ষতি করছে। আমরার আবার গলা আওয়াজের কাছে ফিরা যাওয়া দরকার। ওইটারই আমরার যাচাই করার হাতিয়ার হওয়া উচিত, তাইলে হয়তো বা গ্রিক আর্ট-ক্রিটিসিজমের চিকন চিকন ব্যাপারের দুয়েকটা ধরতে পারমু।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, এমনটা করবার জো নাই। এক এক সময় যখন কোনো এক প্যারা গদ্য লেইখা ভাবি ভুল-ভ্রান্তি থেকে পুরাপুরি পরিষ্কার রাখার মত যথেষ্ট যত্ন নিতে পারছি, তখন একটা ডর মাথায় ঢুকে যায়, আমি হয়তো trochaic আর tribrachic চলন ব্যবহার করে ফেলার মত নামর্দি কুকামের দোষে দোষী হইয়া গেছি, যেই অপরাধের কারণে অগাস্তান আমলের কোনো এক জানিস্ত ক্রিটিক বুদ্ধিমান তবে কিছুটা প্যারাডক্সিকাল হেগেসিয়াসরে সবচেয়ে কড়া ভাষায় এবং উচিত তিরস্কারই করছিলো। ভাবলে আমার হাত-পাও ঠান্ডা হইয়া আসে, আর চিন্তা করি ওই মনকাড়া লেখকের কথা, যে একবার আমরার সমাজের আনকোরা অংশটার দিকে বেপরোয়া দয়া দেখায়তে গিয়া, জীবনের চাইর ভাগের তিন ভাগই হইলো ভালা কাম, এমন এক হায়াওয়ানি আকিদা এলান করে উঠছিলো, তার সুখ্যাত পাওয়ার মত গদ্যটা একদিন pæonগুলা৭ {pæon হইলো লাতিন আর গ্রিক কবিতার এক ধরনের ছন্দের পদ। এক এক পদে চারটা অক্ষর থাকে, এর মধ্যে একটা গুরু অক্ষর আর বাকিগুলা লঘু অক্ষর হয়।} ভুল অক্ষরে সাজানো হইছে এইটা বুঝতে পেরে ফানা হইয়া যাইবো।
আর্নেস্ট। ধুর! এখন তুই ফাতরামি শুরু করছস।
গিলবার্ট। কোনো একজনরে, গ্রিকরার কোনো আর্টি-ক্রিটিক আছিলো না, এমন একটা কথা সিরিয়াসলি বলার পরে ফাতরামি না করে ক্যাম্নে থাকবো? গ্রিকরার ক্রিয়েটিভ বুদ্ধির সবটা ক্রিটিসিজমের মধ্যেই খরচ হইয়া গেছে, এমন কথা শুনলেও না হয় মানতে পারতাম, কিন্তু যেই জাতির কাছে আমরা খোদ ক্রিটিকাল মনের জন্য ঋণী ওই জাতি ক্রিটিসাইজ করে নাই এমন একটা কথা ক্যাম্নে মানি। তুই আবার আমার কাছে প্লাতো থেকে প্লটোনিয়াস পর্যন্ত গ্রিক আর্ট ক্রিটিসিজমের ফিরিস্তি চাইতে আসিস না। ওই ফিরিস্তি আওড়ানোর পক্ষে আজকার রাইতটা বেশিই সুন্দর, আর চান্দটা, ও যদি আমরার কথা শুনতে পায় তাইলে তার মুখে অলরেডি যত কলঙ্ক আছে তার উপ্রে আরও কালি মেখে নিব। বরং একটা মাত্র এস্থেটিক ক্রিটিসিজমের পার্ফেক্ট উদাহরণের কথা চিন্তা কর, এরিস্টটলের কাব্যশাস্ত্র। বইটা গড়নের দিক দিয়া পার্ফেক্ট না, কারণ আধ-আধ করে লেখা, যেন মনে হয় কোনো আর্ট লেকচারের জন্য টুকে রাখা কতগুলা নোটরে এক করা হইছে, অথবা একটা বড় বই হইতো হইলে এমন টুকরা টুকরা লেখা, কিন্তু ভাব আর বিষয় আলোচনার দিক দিয়া পরম রকমের নিখুঁত। আর্টের নৈতিক প্রভাব, কালচারের ক্ষেত্রে আর্টের গুরুত্ব, চরিত্র তৈরিতে আর্টের অবদান এই সব প্রশ্নের সমাধান প্লাতো একবারে কেয়ামতের আগ পর্যন্তর জন্য দিয়া দিছে; কিন্তু এরিস্টটলের বইয়ে আর্টরে নৈতিকতার জায়গা থেকে ট্রিট করার বদলে বিশুদ্ধ এস্থেটিক জায়গা থেকে ট্রিট করা দেখতে পাই। এইটা সত্য যে, প্লাতো একেবারেই আর্টিস্টিক অনেক সাব্জেক্ট নিয়াও কাজকারবার করছে, যেমন একটা আর্টের কাজে মধ্যে একতা থাকার গুরুত্ব, মিল আর সংগতি থাকার জরুরত, বাইরের চেহারার এস্থেটিক দাম, ভিজিবল আর্টগুলার লগে বাহিরি দুনিয়ার সম্পর্ক, আর ফিকশনের লগে ফ্যাক্টের সম্পর্ক ইত্যাদি। সে-ই হয়তো সবার আগে মানুষের রুহুর মধ্যে ওই পিপাসাটারে নাড়ায়া তুলছে যেইটারে এখনও আমরা মিটাইতে পারি নাই, হকিকত আর সৌন্দর্যের সম্পর্ক জানার পিপাসা, জগত সংসারের নৈতিক আর আক্কেলি শৃঙ্খলার মধ্যে সৌন্দর্যের অবস্থান জানার পিপাসা। সে যেম্নে করে আইডয়ালিজম আর রিয়ালিজমের মছলাগুলারে অধিবিদ্যার জগতে অ্যাবস্ট্রাক্ট জিনিস-পত্রের ভিত্রে সাজায়ছে, ওইভাবে অনেকের কাছে শুকনা, কোনো ফল পাওয়া আশা করা যায় না, মনে হইতে পারে, কিন্তু ওইগুলারে ওইখান থেকে সরায়ে আর্টের জগতে নিয়া আয়, আর দেখবি এখনও কত সরস আর অর্থে ভরা। এমনও হইতে পারে প্লাতোর আসলে সৌন্দর্যের ক্রিটিক হিসাবে জীবন কাটানোর কথা আছিলো, তার বিচার-ভাবনা করার গণ্ডিটার নাম বদলায়ে দিয়া আমরা নতুন একটা দর্শন খুঁজে পামু হয়তো। কিন্তু অ্যারিস্টটলও গ্যোতের মতন আর্টরে প্রধানত বাস্তব রূপগুলাতে ধরে নিয়া কাজ-কারবার করছে, যেমন ট্রেজিডির কথাই ধর্, আর যেই মালমশলা ব্যবহার করে ট্রেজিডি বানানো হয়, মানে ভাষা, বিষয়-বস্তু, মানে জীবন, যেই কায়দায় চাল-চলন করে, মানে একশন, যেই পরিস্থিতির মধ্যে ট্রেজিডি নিজেরে মেলায়ে ধরে, মানে মঞ্চে উপস্থাপন, এর যুক্তির কাঠামো, মানে প্লট, আর ফাইনাল এস্থেটিক আবেদন, যেইটা করুণা আর মুগ্ধতার জজবা দিয়া সৌন্দর্যের বোধের কাছে ধরা দেয় ওইগুলার কথা ধর্। প্রকৃতিরে যেমনে পাক আর রুহানি করারে এরিস্টটল বলছিলো κάθαρσις,৮ {কাথার্সিস, পরিশুদ্ধি} ওইটা গ্যোতের দেখা মতে, মূলত এস্থেটিক, লেসিংয়ের কল্পনা মতে, নৈতিক না। আর্টের কাজ হইলো সৃষ্টি করা, এই চিন্তাধারা মনের মধ্যে নিয়া এরিস্টটল নিজে চিন্তাধারাটারে বিচার-আচার করার জন্য, এর শিকড় খুঁজে বাইরা করার জন্য, এইটা ক্যাম্নে তৈরি হইয়া উঠে দেখার জন্য নেমে গেছে । আর একজন সাইকোলজিস্ট আর ফিজিওলজিস্ট হিসাবে, তার জানা আছে কোনো কাজের সুস্বাস্থ নির্ভর করে বল বা শক্তির উপ্রে। কোনো জজবা ধারণ করার ক্ষমতা থাকার পরেও ওইটারে বাস্তবে রূপ না দেওয়া মানে হইলো নিজেরে অপূর্ণ আর আটক করে রাখা। জীবনের যেই নকলি জাঁকজমকরে ট্রেজিডি নিজের মধ্যে ধারণ করে ওইটা প্রচুর ‘নাজুক জিনিস’ থেকে বুকটারে হালকা করে, আর আবেগরে অভ্যাস করানোর জন্য উঁচা দরের লায়েক লায়েক বিষয়াদি সামনে রাইখা মানুষরে তাজকিয়াত [আত্মশুদ্ধি] আর রুহানিয়াতের রাস্তা করে দেয়; না, খালি রুহানিয়াতেই নিয়া যায় না, বরং নতুন নতুন অনুভূতির সাথে মোলাকাত করায়ে দেয় যেইগুলার সাথে হয়তো তার কোনো দিন জানাশোনা হইতোই না, দীক্ষার অনুষ্ঠানের লগে μονόχρονος ἡδονή৯ {এক মুহূর্তের মজা} শব্দটার, আমার কাছে মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা আঁতাত আছে, আর যদি না থেকে থাকে, এক একবার যেমন কল্পনা করতে লোভ হয়, তাইলে এইখানে শব্দটার একমাত্র সত্যিকার অর্থ। কথাগুলা অবশ্যই বইটার স্রেফ একটা আউটলাইন মাত্র। কিন্তু দেখলি তো, বইটা এস্থেটিক ক্রিটিসিজমের কত নিখুঁত একটা নমুনা। কোনো গ্রিক বাদে আর কেই বা আর্টের এত ভালো বিশ্লেষণ করতে পারতো? বইটা পড়ার পরে, কারো সন্দেহ থাকে না, আলেকজান্দ্রিয়া কত গভীরভাবে আর্ট-ক্রিটিসিজমে ডুবে আছিলো, আর তখনকার আর্টিস্টিক মেজাজ স্টাইল আর কায়দার সব ধরনের প্রশ্ন নিয়া কত গভীর তদন্ত করে গেছে, পেইন্টিংয়ের বাঘা বাঘা একাডেমিক গোষ্ঠিগুলা নিয়া আলোচনার করছে, যেমন ধর্, সিসিয়নের গোষ্ঠিটার কথা, যেইটা আগিলা দিনের গৌরবের রীতিটারে বাঁচায়ে রাখার চেষ্টা করতেছিলো, অথবা ধর্ রিয়ালিস্টিক আর ইপ্রেশনিস্ট গোষ্ঠিগুলার কথা, যেইগুলা বাস্তব জীবনরে আর্টের মধ্যে ধরবার চেষ্টা করতো, পোর্ট্রেচারের আদর্শ উপাদানগুলা কি কি, অথবা তাদের মতন এমন মডার্ন একটা যুগে মহাকাব্যিক রীতির আর্টিস্টিক মূল্য কেমন, অথবা আর্টিস্টের জন্য কোন বিষয়-বস্তু সবচেয়ে উপযুক্ত এই সব বিষয়ে আলাপ করছে। এমন কি, আমার তো সন্দেহ হয়, তখনকার আনা-আর্টিস্টিক মেজাজঅলারাও সাহিত্য আর আর্টের মধ্যে নাক-গলানোতে ব্যস্ত আছিলো, কারণ ওই সময়ে নকলনবিশি [প্লেজিয়ারিজম] এর অভিযোগের কোনো কমতি পাওয়া যায় না, আর এই ধরনের অভিযোগ এক হইলে কিছু করার হেডম নাই এমন লোকগুলার পাতলা রক্তছাড়া ঠোঁট দিয়া বাইরাইতো, আর নাইলে এমন লোকের বেঢপ মুখ দিয়া বাইরতো যেগুলার নিজের ত কিছু আছিলোই না, বরং তাদের আর্ট অন্য আরেকজনে চুরি করে নিছে এই বিলাপ করে নাম কামানোর স্বপ্ন দেখতো। আর তরে আশ্বাস দিতাছি, মাই ডিয়ার আর্নেস্ট, এখনকার দিনে লোকজন পেইন্টাররারে নিয়া যত বকবক করে গ্রিকরারও একই পরিমাণে করে গেছে, তারাও প্রাইভেট ভিউ আর চার-আনি এক্সিবিশনের আয়োজন করতো, তাদেরও চারু ও কারুকলা সমিতি আছিলো, তাদের মধ্যেও প্রি-রাফায়েলাইট আন্দোলন হইছে, রিয়ালিজমের দিকে আগানোর আন্দোলন হইছে, তারাও আর্ট নিয়া লেকচার দিতো, প্রবন্ধ লেখতো, আর্ট হিস্টোরিয়ান পয়দা করতো, প্রত্নতত্ববিদ পয়দা করতো, আর বাদ বাকি যত যা আছে। আরে, এমন কি, যাত্রা দলের ম্যানেজাররাও লগে করে নিজেরার নাটক ক্রিটিক নিয়া যাত্রায় বাইরাইতো, ফলাও করে সুখ্যাত করার জন্য তাদের মোটা অংকের মাইনেও দিতো। বলতে গেলে, আমরার জীবনে মডার্ন বলতে যা কিছু আছে সব কিছুর জন্য আমরা গ্রিকরার কাছে ঋণী। যতকিছু সামনে আগানোর বদলে পিছায়ে নিয়া গেছে সব মধ্যযুগের দোষ। আর্ট-ক্রিটিসিজমের পুরা সিস্টেমটা আমরারে দিছেই মূলত গ্রিকরা, আর তাদের ক্রিটিকাল মেজাজ কত মিহি আছিলো এইটা একটা ব্যাপার দেখেই বোঝা যায় যে, তারা সবচেয়ে বেশি যত্ন নিয়া যেই জিনিসটারে ক্রিটিসাইজ করছে ওইটা হইলো, আগেই বলছি, ভাষা। কারণ, পেইন্টার বা ভাস্কর যেইসব মালমশলা ব্যবহার করে শিল্প বানাইতো ওইগুলা কথার সামনে কিছুই না। কথার মধ্যে স্রেফ বেহালা আর বীণার মিষ্টি সুর, ভেনিশিয়ান আর স্পেনিয়ার্ডের ক্যানভাসরে আমরার কাছে মনকাড়া করে তোলা জমকালো চোখ ধাঁধানো রঙ, আর মার্বেল আর ব্রোঞ্জের মধ্যে ধরা দেয় এমন গতরের ধরাছোঁয়ার মত রূপই না, সাথে চিন্তা-চেতনা, জজবা, আর রুহানিয়াতও আছে, সত্যি বলতে এগুলা একমাত্র কথারই আছে। গ্রিকরা খালি যদি ভাষা ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুর ক্রিটিসিজম নাও করে যাইতো, তবুও তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর্ট-ক্রিটিক হইয়া থাকতো। কারণ সবচেয়ে উঁচা দরজার আর্টের নীতিগুলা জানা মানে পুরা আর্টের নীতিই জেনে ফেলা। কিন্তু দেখতেছি চান্দটা মরার মেঘের পেছনে ঢেকে যাইতেছে। ভাইসা যাওয়া পাংসা তামা রঙের কেশরের ভিত্রে সিংহর চোখের মতন চমকায়তেছে। তার ভয় হইতেছে আমি তোরে লুসিয়ান আর লংগিনাসের কথা, কুইংটিলিয়ান আর ডাইয়োনিসাসের কথা, প্লিনি আর ফ্রোন্তো আর পাউসানিয়াসের কথা, পুরাণা আমলে যত মানুষ আর্টের ব্যাপারে লেখালেখি করছে বা লেকচার দিছে সবার কথা কমু। তার ডরানোর কারণ নাই। ফ্যাক্টের টিমটিমা আলোর মনমরা গর্তের ভিত্রে ঘুরতে ঘুরতে আমি কাহিল। আরেকটা সিগারেটের বেহেশতি οἶνοψ πόντος১০ {ওয়াইন-চোখের গভীর সমুদ্র, হোমারের লেখায় এই এপিথেট পাওয়া যায়।} বাদে আর কোনো কিছু খোঁজার মত আমার মধ্যে কোনো শক্তি বাকি নাই। সিগারেটের মধ্যে মানুষরে অতৃপ্ত রাখতে পারার জাদু অন্তত আছে।
(টু বি কন্টিনিউ…)
মুহাম্মদ আলী মুজাহিদ
Latest posts by মুহাম্মদ আলী মুজাহিদ (see all)
- আর্টিস্ট হিসাবে ক্রিটিক (২) – অস্কার ওয়াইল্ড - September 17, 2025
- আর্টিস্ট হিসাবে ক্রিটিক (১) – অস্কার ওয়াইল্ড - August 18, 2025
- এইটা একটা পাইপ না – মিশেল ফুকো (১) - April 15, 2025