This entry is part 10 of 20 in the series বাংলাদেশি ফিকশন

সোনাকান্দি হতে মাঝের হাট দূর নয়। কিন্তু বর্ষায় নৌকা ছাড়া গতি নেই। তখন এ-পথটা অতিক্রম করতে গোটা একদিন লেগে যায়। এ-নদী সে-নদী; এ-খাল সে-নালা। স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ পানির আর মাছের, কচুরিপানার আর ধানের; নৌকায় ভরাট গন্ধ ভেজা কাঠের, ডহরের পানির আর খাম্বুরি তামাকের। আকাশের বর্ষাশেষের শ্রান্ত মেঘ নিস্তেজভাবে ঘোরে। হাওয়া নেই। পালশূন্য শ্লথগতি পানসি-ঘাসী-গয়না ও ডিঙির আর তেজের গরম নেই। এত পানি আর দিগন্তপ্রসারী খোলামেলা প্রসারতার মধ্যেও দমবন্ধ-করা ভাব। হঠাৎ কখনো-সখনো একটু হাওয়া যদি আসে চুড়ির মতো মিহিন ঢেউ তুলে পানিতে, বড় ভালো লাগে। দেহ শীতল হয়।

নৌকা আর নদী আর প্রসারতা আর মেঘ কেউ দেখে না। পথটা বাড়ির: এ-বাড়ির পথ বদলায় না। এ-বাড়ির পথ জীবন। কেবল কখনো শ্লথগতি, হাওয়া নেই বলে পাল ওড়ে না; আবার কখনো ঢেউ-ভাঙানো তেজময় গতি, পাল ফুলে থাকে হাওয়া আছে বলে। কখনো ঘুম পায়। কখনো খড়ের বিছানায় শুয়ে ছইয়ের ভেতরে দুলতে-থাকা থলে হুঁকার পানে তাকিয়েই থাকতে হয়। মাঝি ভাবে না, মাঝির ছেলেটা ভাবে না। যে-মেঘ নিস্তেজ সে-মেঘ দেখে না; যে-পানিতে সে-নিস্তেজ মেঘের ছায়া সে-পানি দেখে না। কখনো-সখনো নড়ে বসে কেবল খাম্বুরি তামাক খায় আর তার কড়া গন্ধ ভেসে আসে ছইয়ের ভেতর।

এ-পথ বাড়ির।

আফতাব ভাবে, চার বছর। চার বছর পরে বাড়ি যাচ্ছে। কলাপাতা-ঘেরা আম-জাম-গাছের ধারে, খাল-বিল নালা-ডোবার পাশে শতসহস্র ঘনবসতির মধ্যে বসবাস-করা লোকদের জন্য চার বছর পরে বাড়ি যাওয়াটা বড় কথা। সে-কথা পুঁথির কাহিনীর মতো দেশময় ছড়িয়ে পড়বার মতো অসাধারণ, নাড়ি ছেঁড়ার মতো গায়র-মামুলি।

– আফতাব মিঞা দ্যাশে থাকে না, দ্যাশে আসে না। আফতাব মিঞা চাইর বচ্ছর দ্যাশে থাকে না, দ্যাশে আসে না। শহরে থাকে। হেই বড় শহরে। আফতাব মিঞা গাড়ি-ঘোড়ায় চলে। আফতাব মিঞা সিদ্ধভাত খায়, বরফের মাছ খায়। আফতাব মিঞা রঙে আছে।

খেদু মিঞা দাঁতের মাজন বিক্রি করে ঢং করে বক্তৃতা দিয়ে, হাত সাফাইয়ের ম্যাজিক দেখিয়ে। খেদু মিঞা সে-শহরের খবর রাখে। আফতাব মিঞা হেই শহরে থাকে। চার বচ্ছর আফতাব মিঞা দ্যাশে থাকে না, দ্যাশে আসে না।

– শহরে থাইকা আফতাব মিঞা বাড়িৎ কেবল টেকা পাঠায়। বাড়িৎ আছে নুনা মিঞা, তার বুড়া বাপ। বুড়া জমিজমা দ্যাখে আর বাতের ব্যথায় কঁকায়। চোখে ছানি পড়ছে; কিন্তুক বুড়া মানে না সে-কথা, স্বীকার করে না সে-কথা। মায়ের কবর পুকুরের পাড়ে গাবগাছটার তলে।

– আফতাব মিঞা শহরে থাকে; কিন্তু নুনা মিঞা দ্যাশে থাকে। পোস্টকার্ডে চিঠি ল্যাখে ছেলের কাছে আর ছেলের গল্প করে। আর নুনা মিঞা আফসোস করে। ছেলেডা আসে-আসে বলে, কিন্তু আসে না।

– আফতাব মিঞা কিন্তু কাবেল ছেলে। চাকরি করে আর বই বাঁধানোর দোকান চালায়। তাই আফতাব মিঞা দ্যাশে আসে না। আফতাব মিঞার সময় নাই, ছুটি নাই। আফতাব মিঞা চাকরিও করে ব্যবসাও করে।

দেশের বাড়িতে আর আছে বুবু। মানুষের জীবনে কী হয় বোঝা যায় না। বুবুর বিয়ে হল, বুবু নাইওর এল, বুবু শ্বশুরবাড়ি গেল। বুবুর ঘোমটা খুলল, বুবু সংসার গড়ল আরেক মানুষের ঘরে, বুবুর ছেলে-মেয়ে হল। বুবু মাছ ছাড়াল পুকুরে, আমগাছে আম গুনল। সন্ধ্যার পরেও বুবু কুপি হাতে খড়ম পরে গোয়ালে গরু দেখল, মুরগির খোঁয়াড়ে ঝাপ আছে কি না দেখল। তারপর বুবুর দাড়িওয়ালা স্বামীটা মারা গেল।

– জোতজমি আছিল। সেয়ানা লোকডা। ধড়াস্ কইরা মারা গ্যাল। মস্ত বড় মদ্দ মানুষ, হেই জোয়ান। কাতলার মতো মুখ হা কইরা ধড়াস করি মারা গ্যাল চক্ষের সামনে।

বুবু আর মাছ ছাড়ায় না, আমগাছে আম গোনে না।

-নুনা মিঞার মাইয়া সাদা শাড়ি পরে হিন্দুগো মতো। চোখে ছানিপড়া বুড়া বাপের সংসারডা দ্যাখে। নুনা মিঞার মাইয়ার নাকফুলের গর্তে বাঁশের ছিলার ঢিপি। নুনা মিঞার মাইয়ার চলনে-বলনে আর জান নাই। ছয়ডা পোলা-মাইয়া রাইখা তার স্বামীডা ধড়াস কইরা মারা গ্যাল চক্ষের সামনে।

ছইয়ের তলে কলকি দোলে হুঁকা দোলে আর টোপা দোলে।

আফতাব ভাবে, অনেকদিন সে বুবুকে দেখে নি। বরাবর বুবু তাকে দেখে কাঁদে। ভাবে, চার বছর পরে তাকে দেখে বুবু এবারো কাঁদবে কি?

বুবু কাঁদে। বুবু দুঃখেও কাঁদে, সুখেও কাঁদে। বুকভরা স্নেহ-মমতা যেন, একটু কিছুতে পানি হয়ে উথলে ওঠে। ছেলেবেলায় বুবুকে সে ভয় পেত। যে-মানুষ সুখেও কাঁদে দুঃখেও কাঁদে সে-মানুষকে ভয় পায় বৈকি। এবারো কি বুবু কাঁদবে তাকে দেখে?

-আফতাব মিঞা থাকে রঙে, আফতাব মিঞা থাকে শহরে। গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে, সিদ্ধভাত খায়। দ্যাশে থাকে বুড়া বাপ নুনা মিঞা আর থাকে বেওয়া বইন অছিমন। নুনা মিঞা পটল তুললে কেড়া গো দ্যাখবে তারে, কেডা দ্যাখবে তার ছাওয়াল-পাওয়াল?

– গাবগাছের তলে তার মায়ের কবর গাবগাছেরই তলে বুড়ার হইব দাফন।

বুবু বিলাপ করে কাঁদে। দরদরিয়ে চোখের পানি পড়ে, গাল-চোয়াল ভেসে যায় মুখ দিয়ে ব্যথার কথা আর শোকের কথা বেরোয়। যখন শোক-বিলাপ থামে তখন নিশ্বাস পড়ে বড়-বড়। যেন বাঁশবনে দমকা হাওয়া ওঠে থেকে-থেকে।

বুবু কাঁদবে এবার, আরো কাঁদবে। ছেলেমেয়ে নিয়ে বিধবা বুবুর মনে দুঃখ-বেদনার অন্ত নেই। দেশছাড়া ভাইকে পেয়ে বুবু কাঁদবে।

– ভাই গো আমার, কী খাইবার শখ তোমার, কী বানামু তোমার জন্য?

বুবু কাঁদে শুধু, বুবু জানে না। নদীর বাঁকের পরে কী আছে বুবু জানে না। বুবু মুরগির খোঁয়াড়ে ঝাঁপ দিতে জানে, গরুর পেটের ব্যথার দাওয়াই জানে, কিন্তু বুবু জানে না শহরের সোনা ভাইয়ের মনের কথা। বুকের মধ্যে বুবুর দুঃখের দরিয়া, বুবু জানে না নদী কতদূর যায়। বাপ বলে ছানি নাই চোখে। বুবু বলে নাই, ছানি নাই চোখে।

বুবু পিঠা তৈরি করবে।

– আমার ভাই দ্যাশে ফিরছে। আমার কলিজার ভাইটা গো দ্যাশে ফিরছে। বুবু কাঁদবে, তারপর হাসবে। স্বামীর দুঃখ ভুলবে, পুকুরের মাছের দুঃখ আর আমের দুঃখ ভুলবে।

বুবু পিঠা তৈরি করবে নানান রকমের। শহরে-থাকা ভাইটার কী খেতে শখ করে? চিতল পিঠা? কেড়া পিঠা, হাতাই পিঠা?

নদী পথ শেষ হয় না যেন। এ-নদী, সে-নদী এ-খাল সে-নালা। কিন্তু থুতনিটা হাঁটুতে চেপে উবু হয়ে বসে নেই আফতাব। শহরের আফতাব খড়ের বিছানা ঢেলে শুয়ে আছে আর শুয়ে-শুয়ে টোপার দিকে চেয়ে সিগারেট ফুঁকছে। আলস্যভরে প্রশ্ন করে, কী নদী?

– ধ্যামড়া নদী। তারপর কলতা।

ধ্যামড়া নদী, তারপর কলতা। নদী-খাল-নালা বদলায় না; বাড়ির পথ বদলায় না।

যদি বুবু না কাঁদে?

শ্যামলপুরে এক ছিল বাদশা যার ছিল এক ছেলে এক মেয়ে। ছোট ছেলে, বড় মেয়ে। মেয়ে কাঁদে, মেয়ে ধনী লোকের মেয়ে। মেয়ে আদুরে, ঘি-মাছ-দুধ-সরে পোষা মেয়ে। কেঁদে-কেটে মেয়ে পালঙ্গে গিয়ে শোয়, ঝালর-ওয়ালা দুধের মতো সাদা পালঙ্গে। কেঁদে-কেটে তুলতুলে নরম বিছানায় গা-ঢেলে শোয় আর তারপর আর কাঁদে না। আগে কাঁদে আদুরে বলে, বিছানায় গা-ঢেলে শুয়ে আর কাঁদে না ঘি-মাছ-দুধ-সরে পোষা বলে। হাওয়ার জন্য চামর দোলায় ঝি, যে-ঝি বাদশার পা টেপে।

বুবু শুধু কাঁদে; বুবু বোঝে না।

আল্লাহু-আকবর আল্লাহু-আকবর আল্লাহু-আকবর। ভাই সকল তোমরা সবে করহ শ্রবণ, নতুবা কারো নাহি পরিত্রাণ। হের শুন চারিদিকে, দোয়া মাঙ্গ পীর থেকে। শোন ভাই উটের কীর্তির যশ, শুনে দিলে হোক সাহস। খোদার কেরামতির কথা তাই, তোমাদের বলি তাই শুন ভাই, শুন ভাই মন দিয়ে শুন তাই। প্রস্রাব করিলে নিতে হবে ঢেলা, না হলে হাসরের মাঠে বুঝিবে ঠেলা। ফেলি রাখি অন্য কাজ, পাঁচ ওক্ত পড়িবে নামাজ। আর কী বলিব ভাই, মনে করে রেখো তাই, আল্লাহু-আকবর।

ঘরের মেয়ের পটলচেরা চোখও ছাপিয়ে আসে অশ্রুতে। – গুরুজনে মানিবে সদা, সম্মুখে না কহিবে কথা। আর প্রস্রাব করিয়া ভাই লইবে ঢেলা। আল্লাহু-আকবর।

বাদশার মেয়ে পালঙ্গে শোয়, না শোনে কথা। যে-ঝি বাদশার পা টেপে, সে-ঝি চামর নাড়ে।

আফতাব মিঞার পেটে জোর নেই সিদ্ধভাত খেয়ে। একটু নুন, একটু মরিচ, একটু মাছ। গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে না। সে রঙে নাই। রনকদার শহরে রঙে নাই।

– ভাই সকল কাতারে দাঁড়াইয়া যান। ভাই সকল, লাইন বাঁধেন, খোদার সামনে কাতার হইয়া দাঁড়াইয়া যান। আসুক হাতি, আসুক বাঘ, আসুক শয়তান। শোনভাই বন্ধুভাই মন দিয়ে শোন, হেনতেন মুখে রা করিবে না কোনো। আর গুরুজনে মানিবে সদা, সম্মুখে না কহিবে কথা। দেখিলাম কী দেখিলাম, শুনিলাম কী শুনিলাম। দেখিলাম শুনিলাম আর পাইলাম খাইলাম। মানিলাম কীর্তি-কুদরত তোমার, লহ লক্ষ কোটি সালাম শোকর। আর গুরুজনে মানিবে সদা, তাতে যেন না হয় অন্যথা।

হঠাৎ একটু হাওয়া আসে পানিতে চুড়ির মতো মিহি ঢেউ তুলে।

বুবু স্বামীর মৃত্যুর পর বিলাপ করে নি। কেঁদেছে নীরবে। ফিরতি পথে নদী দেখে নাই, তীর দেখে নাই, মেঘ দেখে নাই। কোনোদিন দেখে নাই, সেদিনও দেখে নাই! কাদের মুনশির তিন ছেলের এক ছেলে সিতাব জন্ম নিল, বড় হল সেয়ান-জোয়ান। হল তার চওড়া ছাতি, হল তার দীর্ঘ দাড়ি, দিল জন্ম সন্তানসন্ততির। দিয়ে একজন হল লোক, অতিশয় তেজবান। তারপর একদিন অতবড় জোয়ান-মর্দ ধড়াস করে পড়ে মারা গেল। ডাক শুনে দাঁড়াক লোক হাজারে-হাজার লাখে-লাখে কাতারে কাতারে, আর নাই লোক! কিলবিল করা অসংখ্য অগুন্তি লোকের মাঝে আর একটিও লোক নাই।

–কী নদী এটা?

–কলতা। ধ্যামড়ার কলতা, কলতার পর খাল।

আফতাব আবার সিগারেট ফোঁকে। লাট-বেলাটের মতো শুয়ে আছে। শহরের লোক দ্যাশে যায়, সঙ্গে তার টিনের সুটকেস আর একগাছি মর্তমান কলা। হাঁড়িতে মিষ্টি। সুটকেসে বুবুর জন্য কালো পাড়ের দু-খানা শাড়ি, বাপের জন্য লুঙ্গি-কোর্তা, ছেলেমেয়েদের জন্য জামা-পেনসিল-বিস্কুট। শুয়ে-শুয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–কী নদী এটা?

–কলতা।

আফতাব কলতা নদী দেখে না; চোখ তার ছইয়ের দিকে। লাট-বেলাটের মতো সে সিগারেট ফোঁকে।

বুবু কাঁদলে সে কী করবে? সে বলবে,
–বুবু, তোমার জন্য শাড়ি আনছি, দ্যাখবা না?

বুবু তখন আরো কাঁদবে। কাঁদবে-তো কাঁদবে সে কী করবে। বলার কিছু নাই, করার কিছু নাই।

–গুরুজনে মানিবে সদা, সম্মুখে না কহিবে কথা।

বুবু কাঁদে শুধু, বুবু বোঝে না।

–বুবু, তোমার জন্য শাড়ি আনছি। দ্যাখবা না?

–মনে আছে বুবু, একদিন তুমি কাঁদছিলা ভয়ে? তুমি দুঃখে কাঁদ বুবু, কিন্তু ভয়ে ঐ দিনই কাঁদছিলা। ভূতের ভয়ে না, বাঘের ভয়ে না। মনে আছে? বেলতলায় গেছিলা। হঠাৎ একটা বেল পড়ল। খোদার রহমত, পড়ল মাথায় না, শরীরে না। পড়ল পায়ের কাছে। যে-বেল শরীরে না পইড়া পায়ের কাছে পড়ল, যে-বেল তোমার কোনোই ক্ষতি করে নাই, সেই বেলের ভয়ে তুমি কাইন্দা দিছিলা। কাঁইতে-কাঁইতে কাঁদলা তুমি গো বুবু। সে কী কান্দন তোমার!

ছই থেকে টোপা দোলে, থলে হুঁকা দোলে। বেলের কথা মনে হয়। হোক। অর্থহীন কথা। লোকে দেহে আঘাত পেয়ে কাঁদে, মৃত্যুতে কাঁদে, সুখে কাঁদে, সহবাসে কাঁদে, উটের কীর্তি দেখেও কাঁদে। শাক-ভাত খাঁই, উট দেখি না। উটের কীর্তির কথা শুনে কাঁদি। দেখিলাম শুনিলাম আর পাইলাম খাইলাম। মানিলাম কীর্তি-কুদরত তোমার, লহ লক্ষ কোটি সালাম শোকর। আল্লাহু-আকবর।

বেশুমার লোক। কিন্তু আর লোক নাই।

বুবু কাঁদলে তার বলার কিছুই নাই।

–আফতাব মিঞা দ্যাশে থাকে না দ্যাশে আসে না। শহরে থাইকা আফতাব মিঞা চাকরি করে, ব্যবসা করে। আফতাব মিঞা পয়সা করে, গাড়ি-ঘোড়ায় চলে আর রনকদার শহরে রং করে। বাপ নুনা মিঞা দ্যাশে নুলা হইয়া থাকে। চোখে ছানি, সারা গতরে মরণব্যথা। গাবগাছের তলে বুড়ি কেবল শান্তিতে ঘুমায়। বুড়া গো বুড়া, তোমার মধ্যে আর গাবগাছের মধ্যে ফারাকডা কত?

–টেকা পাঠায়। মানিওডার কইরা টেকা পাঠায়।

–আরো টাকা চাই। জমি বন্ধক হল, মান-সম্মান গেল। ও টাকায় হবে না, আরো চাই। ও টাকায় কী হবে? কত হাতি গেল তল। কাবেল ছেলের শহরে ধুম ব্যবসা। এত পয়সা যে হিসেব নেই। রং করেও কত পয়সা থাকে। ছেলে বলে, দোয়া-সালাম পর আরজ এই যে, ব্যবসা চলিতেছে না, বাকি দেনা অনেক। বন্ধকী জমি ছাড়াইবার মতো টাকা হাতে নাই। কুশলে আছি। ছেলে আসেও না। আসে-আসে করে, কিন্তু আসে না। বলে, দোয়া-সালাম পর আরজ এই যে, আপিসের ছুটির সময় বই-বান্ধানীর কারবার দেখিতে হইবে, নচেৎ বিশেষ ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা আছে।

অছিমনকে কে খাওয়ায়? অছিমনের ছেলেমেয়েদের কে খাওয়ায়? নুনা মিঞা বোঝে না। নুনা মিঞা ছেলের ওপর রাগ করে, কিন্তু বোঝে না।

বুবু কাঁদে, কিন্তু বোঝে না।

কেঁদে-কেটে যে-বাদশাহ্জাদী ঝালর-দেয়া পালঙ্গে গিয়ে শুয়ে আর কাঁদে না।

ঘি-মাছ-দুধ-সরে পোষা শরীর। আল্লাহু-আকবর।

–কে আছে আপনার দেশে?

–বুড়ো বাপ আছে। আর বিধবা বইন আছে। আপনার কে আছে?

–ভাইবোন একগণ্ডা। বাপজান দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। সে-ঘরে পাঁচটা ছেলেমেয়ে। চাচা অসুখের ভান করে রাতদিন শুয়ে থাকে। কারো কিছু নাই। আমি পারি না। আমারও-তো ছেলেমেয়ে আছে, বউ আছে। কিন্তু খোদার হুকুম। আল্লাহু-আকবর।

তারপর হঠাৎ তার চোখ চকচক করে।

–বিধবা বোনকে আবার বিয়ে দেন না কেন?

–বড় বোন। ছ-টি ছেলেমেয়ে আছে।

বুবু, তোমার নিকট হতে পুকুরের পাড়ে গাবগাছটা অনেক দূর।

–দোয়া-সালাম পর আরজ এই যে, আগামী জুম্মাবাদ আমি দেশে পৌঁছাইব আপনার কদমবুছি করিতে।

আজ তাই এ-নদী সে-নদী এ-খাল সে-খাল দিয়ে খড়ের বিছানায় শুয়ে আফতাব মিঞা বাড়ি যায়। মাঝি কথা কয় না, তার ছেলে কথা কয় না। আকাশে নদীতে হাওয়া নাই।

–বুবু তোমার মনে কতই-বা দুঃখ? এক হাঁটু পানি, বুক উঁচু পানি, বিল-ভরা পানির মতো? টিনের সুটকেসে বুবুর একজোড়া শাড়ি আছে। মিহিন জমিন, সুন্দর কালো পাড়। বিধবা মানুষ, রংদার পাড় তোমাকে মানাবে না। কিন্তু আবার পাড়হীন শাড়ি পরাও ঠিক না। মুসলমান বিধবারা পাড়হীন শাড়ি পরে না।

–তোমার জন্য বুবু মিলের লেবেল-সমেত দু-খানা শাড়ি এনেছি। পেয়ে তুমি খুশি হবে। তখন যদি আরো কাঁদ, সে-কান্না হবে সুখের। তখন কেঁদে দিল ঠাণ্ডা হবে। উত্তপ্ত গ্রীষ্মে যেমন শীতল পানি খেয়ে দিল ঠাণ্ডা হয়। ও-কিছু না। শাড়িজোড়াটা দেখে তোমার আনন্দ হবে। তুমি স্বামীর শোক ভুলবে। তোমার মনে হবে খোদার স্নেহ-মমতা সিঞ্চিত দুনিয়ায় সত্যি কোনো দুঃখ নেই, কোনো ভাবনা নেই। জমি বন্ধক পড়ুক, স্বামী মারা যাক তোমাকে ফেলে আর দুটি সন্তানসন্ততি রেখে, বুড়ো বাপ যাক শুতে গাবগাছের তলে।

দেখিলাম শুনিলাম পাইলাম খাইলাম; মানিলাম কীর্তি-কুদরত তোমার, লহ লক্ষ-কোটি সালাম শোকর।

বুবু তুমি এত কাঁদ কেন? তোমার দাড়িওয়ালা জোয়ান-মর্দ স্বামীটা তোমারে আদর করত?

সন্ধ্যা হয়-হয়। খাল দিয়ে নৌকা চলে। ঘাট কোথায়? মাঝির ছেলে লগি ঠেলে। কূল ভেসে গেছে, কূলের গাছগুলো পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। এ-বার গলা বাড়িয়ে আফতাব দেখে।

পানিতে সামান্য স্রোতের ধার। কচুরিপানা, শক্ত-সতেজ কচুরিপানা ভেসে যায়।

এই যে কচুরিপানা বুবু, এই কচুরিপানার কথা ভাব। এই কচুরিপানার মূল নাই, শিকড় নাই জমিতে। এই কচুরিপানা ভেসে যায় আপন মনে। তার দুঃখ নাই, ভাবনা নাই, চিন্তা নাই। কত নদী কত খাল কত নালা আর কত কচুরিপানা। তুমি জান বুবু গরুর কথা। গরুকে কচুরিপানা খেতে দিতে নাই। বন্যার সময় গরু ঘাস-বিচালি খেতে না পেয়ে পানিতে দাঁড়িয়ে পেটের দায়ে কচুরিপানা খায়। জানে না কচুরিপানা খাওয়া তার নিষেধ। কিন্তু কচুরিপানা নির্ভাবনায় ভেসে চলে। তার ভাবনা নাই, চিন্তা নাই, দুঃখ নাই। দেখ দেখ, কচুরিপানা দেখ।

কত তোমার দুঃখ বুবু?

তুমি থাকবে বুবু, বুড়াবাপ যাবে গাবগাছের তলে। তুমি থাকবে সন্তানসন্ততি নিয়ে। তারা লায়েক হবে। তোমার স্বামীর মতো ছেলেগুলো জোয়ান-মর্দ হবে। কী ভাবনা তোমার?

– আমার সোনামানিক ভাইটা গো দ্যাশে ফিরছে, আমার কলিজার ভাইটা গো দ্যাশে আসছে। আমার জানের ভাইটা সহিসালামতে ফিরছে। ফকির খাওয়াও, দান খয়রাত কর। আমার আবার দুঃখ কী? সোনামানিক ভাইটা শহরে চাকরি করে, ব্যবসা করে। টাকার অভাব

কী? খোদা পরম দয়াময়, রহমানুর রহিম।

–সালাম আদাব হাজার-হাজার খেদমতে পৌঁছে; পর আরজ এই যে, কারবার করি বলিয়াই কারবার সম্পূর্ণ আমার নহে। ইহাতে আমার মূলগত দাবি মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। আয় বিশেষ হয় না। কারবার একবার দাঁড়াইয়া গেলে মুনাফার সম্ভাবনা আছে। বিশেষ আর কী।

কুশলে আছি। আরজ ইতি। ফিদবদী শেখ আফতাবউদ্দিন।

বুবু, তোমার সোনামানিক ভাইটি তোমার জন্য একজোড়া কালো পাড়ের শাড়ি এনেছে। তারপর তুমি বুক ভরে কাঁদ বুবু, বুক ভাসিয়ে কাঁদ। কোনো ওজর আপত্তি থাকবে না।

তাছাড়া তোমার-তো আর ভয় নাই বুবু। জীবনে একবারই ভয় পেয়েছিলে। বেলতলায় বেল যখন তোমার পায়ের কাছে পড়েছিল। আর কিছুতেই তুমি ভয় পাবে না। ভয় হল সবকিছুর গোড়া। বাঘ কিছু করে না; কিন্তু বাঘের ভয়েই মানুষ মরে।

–এক কাতারে দাঁড়াইয়া যান, ভাই সকল, আসুক হাতি, আসুক বাঘ, আসুক শয়তান।

আল্লাহু-আকবর।

শ্যামলপুরের বাদশার ছেলের কী হল আর কীই-বা হল তার মেয়ের যে দুধের মতো সাদা ঝালরওয়ালা পালঙ্গে শুয়ে আর কাঁদত না?

ছেলেটা মণিমাণিক্যখচিত অত্যাশ্চর্য লেবাস পরে শাদি করল, রাজত্ব করল, তারপর মরে গেল। গুম্বজওয়ালা সুদৃশ্য একটি ইমারত উঠল তার কবরের ওপর। আর মৃত্যুর দিনে এক সহস্র কবুতর ছাড়া হল। শাহজাদীরও শাদি হল আর স্বামীর ঘরে গোসা-ঘর পেল। শোয়ার ঘরে আর গোসা-ঘরে দিন কাটিয়ে সেও মরল। সেদিন এক সহস্র লোক দিনমোহর পেল।

বুড়ো বাপ নুনা মিঞা বোঝে না, বুবুও বোঝে না। একজন রাগে, আরেকজন কাঁদে।

রেগো না; তোমার জন্য লুঙ্গি আর কোর্তা এনেছি। কেঁদো না; তোমার জন্য একজোড়া কালো পেড়ে শাড়ি এনেছি।

মারহাবা, মারহাবা, মারহাবা।

ঐ যে ঘাট, ঐ যে বট, ঐ যে সিঁড়ি।

স্যাঁতস্যাঁত করে পাতাপড়া পানির গন্ধ।

একটি দীর্ঘ লোক লণ্ঠন হাতে এগিয়ে আসে। ছানিপড়া চোখ চকচক করে।

যাও, কদমবুছি কর, মাথা হেঁট করে থাক। কোথায় গাবগাছ? গাবগাছ নাই, নাই পুকুর, নাই কিছু। চোখ চকচক করে। লণ্ঠনের আলোতে চোখ চকচক করে। অতিশয় চকচক করে। রেগো না।

–দ্যাশে ফিরছে গো দ্যাশে ফিরছে; রাজ্য জয় কইরা নুনা মিঞার কাবেল ছেলে আফতাব মিঞা দ্যাশে ফিরছে।

টাকা আনি নি। টাকা নেই। কারবারে পয়সা নেই। শুধু খাটনি। থাক জমি বন্ধক পড়ে। একদিন সুবিধে হবে, একদিন সুযোগ হবে, সুদিন হবে। তখন বন্ধকী জমি ছাড়া পাবে। রেগো না; লুঙ্গি আর কোর্তা এনেছি তোমার জন্য। একটু পরে দেখাব। এসেই-তো সুটকেস খোলা যায় না। থাক না ফুল-তোলা সুটকেসটা অন্ধকারে পড়ে। আমি মাথা নত করে শুনি, কথা কই। তুমি প্রশ্ন কর, আমি প্রশ্ন করি। তুমি জবাব দেও, আমি জবাব দেই। পেটের ছেলে আর কত করতে পারে? ছেলের জন্ম দিয়ে বাপ আর কত করতে পারে?

চোখ কিন্তু চকচক করে।

হঠাৎ নুনা মিঞা কেমন করে বলে,
–তোমার কাছে কইতে আর লজ্জা নাই। আমার চোখে যেমুন ছানি পড়ছে! দ্যাখতে পাই না ভালো।

–নুনা মিঞার সাধের ছাওয়াল দ্যাশে ফিরছে চার বছর পরে কিন্তু বুড়া দ্যাখতে না পায় তার ছাওয়ালরে।

চোখ চকচক করে।

নুনা মিঞা রাগে না আর। বুড়া রাগে না।

নুনা মিঞার চোখ চকচক করে। নুনা মিঞা কাঁদে।

–ছাওয়ালরে দেইখা নুনা মিঞা কাঁদে রে, নুনা মিঞা কাঁদে।

–আর নুনা মিঞার মাইয়া অছিমনের চলনে-বলনে আর তেজ নাই।

আফতাবের কেমন সঙ্কোচ হয়। সে বুবুর পানে তাকায় একটু, কিন্তু আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়। ঘরের মধ্যে ছাতের খুঁটি ধরে বুবু দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে।

–সোনা ভাইরে পাইয়া অছিমন আর কী করে, থ হইয়া দাঁড়াইয়া থাকে। মাথায় ঘোমটা, চক্ষে নাই পানি।

বুবু কাঁদে না। বুবু গোয়ালঘরে কাঁদে না, চুলার আগুনের পাশে কাঁদে না, ঘাটে কাঁদে না, ঘরে কাঁদে না। তেজ নাই চলনে-বলনে, বুবু কাঁদেও না। সোনা ভাইটা দেশে ফিরেছে, বুবু কাঁদে না। শাড়ি দেখে বুবু। বুবু শাড়ি দেখে, কাঁদে না। বুবু নীরবে শাড়ির জমিন দেখে হাত নিচে রেখে, বুবু কাঁদে না।

যে-বুবু কাঁদত, সুখেও কাঁদত দুঃখেও কাঁদত, সে-বুবু কাঁদে না।

পৌষ ১৩৬১ ডিসেম্বর ১৯৫৪

Series Navigation<< নেড়ে – সৈয়দ মুজতবা আলীশাহেদ আলীর গল্প – ঐ যে নীল আকাশ >>