কামাল সিদ্দিকী’র (২২ অক্টোবর ১৯৪৫ – ৩ নভেম্বর ২০২৫) অটোবায়োগ্রাফি “In One Life” এর বাংলায় ট্রান্সলেশন হইয়া “এক জীবনে” নামে ছাপা হইছে, বাজারে প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড পাওয়া যায়। বাংলায় ট্রান্সলেশন করছেন ইলাহী দাদ খান, আর ছাপা হইছে একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি থিকা ২০২৫ সালে।
পাকিস্তানের সরকারি আমলা হিসাবে কামাল সিদ্দিকী’র পয়লা পোস্টিং হয় যশোরের নড়াইল মহকুমায় এসডিও হিসাবে, ১৯৭০-৭১ সালে উনি নড়াইলে ছিলেন; অইখানে উনার আরটিসট এস এম সুলতানের লগে মোলাকাত হয়… তো,সুলতান’কে নিয়া উনি যেই কথাগুলা বলছেন দ্বিতীয় খন্ডের শুরুতে, সেই অংশটা এইখানে ছাপা হইলো…
মানে, কামাল সিদ্দিকী তো একজন আমলা হিসাবে সুলতান’রে দেখছেন, সেই দেখার জায়গাগুলা ইন্টারেস্টিং, ডিফরেন্ট একটা পারসপেক্টিভ তো হাজির করতে পারে, অবশ্যই!
…
প্রথম যখন নড়াইলে আসি তখন সুলতান নামের (এস এম সুলতান, তবে নিকটজনের কাছে পরিচিত লাল মিয়া নামে) মানুষটি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যারা তাকে চিনতেন তারা আমাকে বলেছিলেন, তিনি একজন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী। পৃথিবীর অন্য কোন দেশে বসবাসের সুযোগ পরিত্যাগ করে তিনি নড়াইলে এসে স্থায়ী হয়েছেন। বিয়ে করেননি। কয়েকটি পোষা প্রাণী-ই তার পরিবারের সদস্য।
আমি জানতে পারলাম, তিনি অত্যন্ত সফলভাবে করাচি, লাহোর, ঢাকা, প্যারিস, লন্ডন এবং নিউইয়র্কে একাধিক চিত্র প্রদর্শনী করেছেন। অন্যদিকে আরো শুনলাম, এই অঞ্চলের ভদ্রলোকেরা তাঁর উপর ক্ষুব্ধ। সুলতানের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ তাদের; বাসায় দেশি মদ এবং গাঁজার আয়োজন করে তিনি এই শহরের উঠতি যুবকদের নৈতিক চরিত্রের সর্বনাশ করছেন। তাঁর পেইন্টিংয়ের মডেল জোগাড় করার জন্য তিনি বেশ্যালয়ে যান। সুলতান উদ্ভট পোশাক পরেন। এবং হিপ্পিদের মতো লম্বা চুল রাখেন। আমার আগে এখানে কাজ করতে আসা সিভিল সার্ভেন্টরা তাকে প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তুলেছেন।
এস এম সুলতানের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই একটি বিব্রতকর ঘটনা ঘটে যায়। সুলতান তার বাড়ির ছাদে পায়চারি করছিলেন। এমন সময় তিনি প্রস্রাবের বেগ অনুভব করেন। ছাদ থেকে নামার ইচ্ছা বা মুড কোনটাই বোধ করি তার তখন ছিল না। তাই চারপাশে কে আছে-না আছে তা না দেখেই পাজামা খুলে ছাদ থেকে নিচের রাস্তায় মূত্রত্যাগ করতে শুরু করেন সুলতান। ঠিক ওই সময় ক্লাস ছুটির পর নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের মেয়েরা ঐ রাস্তা ধরে বাড়ি ফিরছিল। পড়বি তো পড়, সেই প্রস্রবণ গিয়ে পড়লো ছাত্রীদের মাথায়। আর যায় কোথায়! শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে মিছিল করে চলে এলো আমার বাসভবনে। তাদের একটিই দাবি, সুলতানকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। তাদের অভিযোগ শুনে আমি আমার পরবর্তী কৌশল ঠিক করে ফেললাম। ওদের দাবির প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করে নেতৃস্থানীয় কয়েকজন এবং সুলতানের অপকর্মের ভুক্তভোগী কয়েকজনকে চেম্বারে ডেকে বললাম, ‘দেখো, তোমরা আমার সন্তানের মতো। তাই তোমাদের সাথে কোন রাখঢাক করে কথা বলতে চাই না। প্রথমত আমি জানতে চাই, এটি কি তাঁর ইচ্ছাকৃত কোন কাজ নাকি অনিচ্ছাকৃত? এমনও তো হতে পারে এই বৃদ্ধ মানুষটির নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। যদি তাই সত্যি হয়, তাহলে তোমরা কি মনে করো না এই লোকটি তোমাদের কাছ থেকে রাগের বদলে অনুকম্পা পেতে পারে? এছাড়া আমি জানতে পেরেছি যে তিনি কোন সাধারণ মানুষ নন। আমি নিশ্চিত করে জানি, নড়াইল শহরে এই কাজটি যদি অন্য কেউ করতো এবং সেই মানুষটি যদি আমি হতাম তাহলেও শাস্তির মুখোমুখি হতে হতো। যতদূর জেনেছি তিনি একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি এবং ধারণা করা যায় আগামীতে তাঁর এই খ্যাতি আরো বাড়বে। তাই তাকে ক্ষমা করে দেবার জন্য তোমাদেরকে অনুরোধ করবো।’ এরই মধ্যে চা এবং মিষ্টি পরিবেশন করা হয়েছে। ওদের মাঝে উত্তেজনাও হ্রাস পেয়েছে। সুলতানের প্রতি তাদের ক্ষোভ প্রশমিত হওয়ার পর তারা শান্তিপূর্ণ ভাবে বাড়ি ফিরে গেল।
এই নিয়মভাঙা প্রতিভাবান মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী ছিলাম কিন্তু উদ্যোগটি আমার তরফ থেকে নিতে চাইনি। যথাসময়ে সুযোগ এসে গেল।
এক অপরাহ্নে তিনি নিজ উদ্যোগে আমার বাংলোতে এসে হাজির হলেন। দেখে মনে হলো, যেন লম্বা ঢেউ খেলানো চুলের সঙ্গে এক ধরনের মিল রাখতেই তিনি কালো রঙের আলখেল্লা পরেছেন। কিছু না বলেই আমার চেম্বারে ঢুকে গেলেন।
‘আমার নাম সুলতান।’
‘আচ্ছা আসুন, চেয়ারে বসুন, আপনার জন্য কি করতে পারি?’
‘আর সব বাচ্চারা… ছোটন.. ঘোটন, চম্পা, ওরা সবাই না খেয়ে আছে। ঘরে কোন খাবার নেই। আপনি এখানকার এসডিও। আপনি ছাড়া যাবার মতো আমার আর কেউ নেই।’
পরিষ্কার বুঝতে পারলাম তিনি নিজেও সারাদিন কিছু খাননি। পরে জেনেছি এভাবেই তিনি তাঁর সংবেদনশীল সমস্যার বা প্রয়োজনীয় বিষয়ের কথা উত্থাপন করতেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে চা-নাস্তা দেবার জন্য বললাম। বেশিক্ষণ যেন কথা বলতে পারি সেজন্য রাতে আমার সাথে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। সেদিন আমার হাতে সময়ও ছিল। মধ্যরাত পর্যন্ত দুজনে বসে গল্প করলাম। তার সোজাসাপটা কথা বলা এবং অপ্রথাসিদ্ধ আচরণ আমাকে মুগ্ধ করলো। যেমন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আঁকার জন্য তাঁকে গণিকাদের কাছে যেতে হয় কেন? সেদিন তার জবাব ছিল, ‘কী করবো, ভদ্রলোকেরা আমাকে এড়িয়ে চলে। কোনো কলেজের মেয়ে কি আমার পেইন্টিংয়ের মডেল হবে?’
‘তাহলে গাঁজা এবং দেশি মদের আসর?’
‘তরুণরা তাদের ইচ্ছেয় আমার কাছে আসে, আমি কেমন করে তাদেরকে ফিরিয়ে দিই?’ তিনি আমাকে আরও জানান, এনাম আহমেদ চৌধুরী (১৯৬০ ব্যাচের সিএসপি) বসবাসের জন্য তাঁকে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি দিয়েছিলেন। আঁকার সরঞ্জাম কেনার জন্য কিছু টাকাও দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তার বেঁচে থাকার সঙ্গতিও নেই।
কিন্তু যশোরে চিত্র প্রদর্শনী করে যে টাকা পেয়েছিলেন সেই টাকা কোথায় গেল?
খুব নিরীহ স্বরে সুলতান আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘আমার কাজ দেখভাল করার জন্য যে সচিব ছিল সে আমাকে একটি কানাকড়িও দেয়নি। শুধু বিদেশ থেকে আমদানিকৃত দুই বোতল হুইস্কি দিয়েছিল।’
‘সেই লোকটির পরিচয় কি আমি জানতে পারি?’
‘তার নাম মতিউর রহমান। আপনি চিনতে পারেন। যে লোকটি আমাকে আপনার অফিসে নিয়ে এলো সেই লোকটিই সচিব হিসেবে কাজ করেছে। সে পাটরির কাজও করে। বিদেয় নেবার আগে আপাততঃ চলার জন্য আমি আমার পকেট থেকে তাকে কিছু টাকা দিলাম। একই সাথে ভবিষ্যতে তাঁর জন্য কিছু স্থায়ী ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দিলাম। কাজটি আমার জন্য সহজ ছিল না। সৌভাগ্যবশতঃ মহকুমা আর্টস কাউন্সিল ফান্ডে পঁচিশ হাজার টাকা জমা রয়েছে। আমি নিজেই এই অর্থের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং টাকাটা স্থানীয় ইউনাইটেড ব্যাংকে জমা রাখা আছে। তবে আইন না ভেঙে সুলতানের জন্য এই টাকা থেকে খরচ করা সম্ভব নয়। অফিসের সহকারীরা সতর্ক করে বললো এই তহবিল থেকে নিয়ম না মেনে টাকা তুললে সেটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে গণ্য হবে এবং এজন্য আমি বড়সড় বিপদে পড়ে যেতে পারি।
কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। এই টাকা তো আমার জন্য নিচ্ছি না, সুলতান অনাহারে মারা যাবে আর আমি এসব নিয়ম-কানুন পকেটে নিয়ে ঘুরবো, তা হতে পারে না। যাহোক, এই খাত থেকে অর্থ ব্যয় করার আগে আমি সুলতানের বাড়িতে গিয়ে সুলতানের চাহিদার একটি প্রাক্কলন তৈরি করলাম। সেই মতো আমার অফিসের সামি নামে এক সহকারীকে দায়িত্ব দিলাম সুলতানের আঁকার রঙ এবং অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের। আরও ঠিক করলাম যে তাঁর ব্যক্তিগত খরচের জন্য মাসে সাতশো পঞ্চাশ টাকা করে দেয়া হবে। সুলতান খুব খুশি। বললেন, ‘এখন দেখবেন আমার আঁকা ছবিগুলো কত তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলতে পারি। আপনি এখানে থাকতে থাকতেই আমার নতুন ছবিগুলো নিয়ে একটি চিত্র প্রদর্শনীও করে ফেলবো।’
‘কিন্তু সেটি লাভজনক হবে যদি আপনি আপনার সচিবকে বাদ দেন। আপনার কাছ থেকে শুনে যা বুঝলাম তাতে মনে হয় সে আর্থিক বিষয়ে সৎ নয়।’ কিন্তু সুলতানের হৃদয়ে এমন অপার ভালোবাসা যে ঠকে যাওয়ার পরেও সেই লোকটিকে পরিত্যাগ করবে না। আর সেই সুযোগে সেই ব্যক্তিটি তাকে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করেই চলেছে।
১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়া অবধি আমার প্রচলিত ব্যবস্থা বহাল ছিল। সুলতান তাঁর কাজে থিতু হবার পর আমি মাঝে মধ্যে তার ওখানে যেতাম। লক্ষ্য করে দেখলাম এই পর্যায়ে তার ছবির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো নারীর শরীর। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর তার মধ্যে অবশ্যই নারীর শরীর অন্তর্ভুক্ত। আবার একই সঙ্গে নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে নারীকে চিত্রকলার প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে ব্যবহার করা আমি পছন্দ করি না।
তখন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পেরিয়ে এসেছি। সাধারণ মেহনতি মানুষের জীবন ও সংগ্রামের বিষয়ে মনে মনে খুব উৎসাহী। তাই সুলতানকে তাঁর ছবির প্রতিপাদ্য পরিবর্তন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই কাজটি করতে বেশ সময় লেগেছিল। সুলতান আমার ধারণাটি নিজের ভেতরে নিতে পেরেছিলেন। তিনি নিজে দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি। সুলতান তার মাকে হারিয়েছেন অল্প বয়সে। তাঁর শৈশব, পিতামাতা, পরিবার ও তাঁদের জীবন সংগ্রাম, তাঁর বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়ানো, এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের সাথে তাঁর পরিচিতির বিষয়ে জানতে চাইতাম এবং এই প্রক্রিয়ায় তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে সময় লাগলো না। সুলতানের ছবিতে যখন সাধারণ মানুষের সংগ্রামের চিত্র দেখি তখন গর্বে আমার বুক ভরে উঠে। জয়নুল আবেদিনের ছবিতে দেখা রোগাটে, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত, অসহায় মানুষ এরা নয়। সুলতানের ছবির চরিত্ররা শক্তিশালী, সাহসী এবং অমৃতের সন্তান যাঁরা তাঁদের হারকিউলিয়ান শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে পরিবর্তন করে ফেলতে চায়।
…
সুলতানের সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে। তাঁর সচিব মতিউর রহমানসহ তিনি একদিন আমাদের ঢাকার কলাবাগানের বাড়িতে এসে উপস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার শোচনীয় অবস্থা বর্ণনা করে জানালেন কীভাবে গ্রামাঞ্চলে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং এই সময় কীভাবে তাঁর কিছু মূল্যবান চিত্রকর্ম হারিয়ে গেছে। কিন্তু আগের মতোই তিনি এক অদম্য মানুষ। ঢাকায় জাতীয় আর্ট গ্যালারিতে তিনি একটি চিত্র প্রদর্শনী করতে আগ্রহী। সেই বিষয়ে আমার কাছে সহায়তাও চাইলেন। ঘটনাক্রমে আমি তখন দেশের সংস্কৃতি বিষয় দেখাশোনা করার দায়িত্বে নিয়োজিত। আমার কর্মস্থল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু আমি সোজাসাপটা বলে দিলাম যতো চিত্রকর্মই বিক্রি হোক না কেনো তাঁর চারদিক ঘিরে রাখা হাঙ্গরদের কারণে তিনি আবারো ক্ষুধা-দারিদ্র্যে নিপতিত হবেন। আমার সেদিনের কথাটা নিশ্চিতভাবেই সেই মতিউর রহমানের পছন্দ হয়নি।
আমার সেই আশংকা কিন্তু সত্য হয়েছিল। মতিউর রহমান শিল্পীকে শোষণ করে করে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলেছিল। সোনারগাঁওয়ের একটি বাড়িতে রাখা সুলতানের কিছু চিত্রকর্ম হারিয়ে গেল। আমি নিশ্চিত সেই মতিউর রহমানরাই মূল্যবান ছবিগুলো সরিয়েছিল।
১৯৭৩ এর সেপ্টেম্বরে লন্ডন যাবার আগে সুলতান আরেকবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। টাকা-পয়সা নেই, চিকিৎসা করাতে হবে। আমি নিজের পকেট থেকে তাকে একশো টাকার বেশি দিতে পারিনি। তবে অন্য অনেককে অনুরোধ করেছিলাম সেই প্রতিভাবান শিল্পীর প্রতি দৃষ্টি দেয়ার জন্য। তাঁর চিকিৎসার জন্য আমি আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার বন্ধু বিনা পয়সায় তার চিকিৎসা করেছিলেন।
…
প্রেসিডেন্ট এরশাদের জমানায় তাঁকে তেমন দেখতে পাইনি। তবে অসাধু ব্যবসায়ী এবং লোভাতুর আমলারা যে তার চিত্রকর্ম প্রায় বিনা পয়সায় তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছিলো তা অনেকবারই শুনেছি। সুলতানকে ফাঁকি দিয়ে তাঁর চিত্রকর্ম বাগিয়ে নেবার কাজে কিছু পশ্চিমা কূটনীতিকও জড়িত ছিল। শুনলাম একজন ব্যবসায়ী তাকে তার বাড়িতে আতিথ্য দেয়, নিয়মিত মদ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য সরবরাহ করে এবং সেই সুযোগে অত্যন্ত মূল্যবান চিত্রকর্ম এবং দেয়ালচিত্র হাতিয়ে নেয়। আরেকজন তাঁর জীবনী লেখার নাম করে তাকে নানা ভাবে শোষণ করে।
যতদূর মনে পড়ে, ১৯৮৪ এর ডিসেম্বরে নড়াইল থেকে একজন যুবক আমার সাথে দেখা করতে এলো। সুলতানের স্বাধীনতা পদক বা কোন জাতীয় পদক পাবার বিষয়ে কথা বলার জন্য। আমি কোথাও এই বিষয়ে কথা বলতে পারি কিনা? আমি জানতাম না যে সুলতান তখনো পর্যন্ত স্বাধীনতা পদক পাননি। জানতে চাইলাম সুলতান তাকে এখানে পাঠিয়েছে কি না? সে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললো ‘না কখনোই না। আমি এসেছি কারণ আমি মনে করি তাঁকে জাতীয় পদকে ভূষিত করা আমাদের দায়িত্ব।’
জবাবে বললাম, এরশাদের দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রকাঠামোতে আমার তেমন প্রভাব নেই। তবে চেষ্টা করবো। আমি আমার পরিচিত প্রভাবশালী আমলাদের (কবি ইমরান নূর ওরফে মনযূর উল করিম, ওবায়েদুল্লাহ খান প্রমুখ) মাধ্যমে তাকে পুরস্কার দেয়ার বিষয়ে চেষ্টা করি। পরবর্তীকালে সুলতান স্বাধীনতা পুরস্কার পান।
…
সুলতানের সঙ্গে আমার শেষবারের মতো দেখা হয় ১৯৯৩ সালে। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব। তার যা স্বভাব, না বলে কয়ে হঠাৎ করেই আমার অফিসে এসে হাজির। সাথে ছিল একজন মধ্যবয়সী হিন্দু ভদ্রমহিলা, যিনি তাঁর দেখভাল করেন। সুলতানের বয়স তখন সত্তর এবং শরীরে নানা অসুখ বাসা বেঁধেছে। এজমায় অবস্থা খারাপ, হৃদযন্ত্রেও সমস্যা রয়েছে। এবার তার আবদার, নড়াইলের দরিদ্র শিশুদের জন্য শিশু নিকেতন গড়ার কাজে আমাকে সহায়তা করতে হবে। আমি তাকে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি সুলতানের শিশুসুলভ সরলতা এবং নম্র স্বভাবে মুগ্ধ হলেন। তিনি ঠাট্টার সুরে আমাকে বললেন, ‘আপনার বন্ধু যখন, তখন তাকে তো একটু ভালো পরিমাণে সহায়তা দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে তাঁর কল্যাণ তহবিল থেকে শিশু নিকেতনের জন্য কাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দিলাম।
সুলতান যখন আমার রুমে বসে অপেক্ষা করছেন, তখন বৃক্ষরোপণ বিষয়ে প্রণীতব্য ম্যানুয়ালের বিষয়ে আমার এক সহলেখকের সাথে ফোনে কথা বলছিলাম। সুলতান তা শুনে আমাকে বললো, ‘কামাল, আপনি আমার এতো ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ, কিন্তু কখনো আমার কাছ থেকে আমার পেইন্টিং নিতে চাননি। আমি কি আপনার ম্যানুয়ালে ব্যবহারের জন্য আমার আঁকা একটি ছবি দিতে পারি? চিন্তা করবেন না, আমার আঁকা ছবিটি আপনার ম্যানুয়ালের বিষয়বস্তুর সাথে ভালো ভাবে যাবে।’ তার কথা আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে গেল। কিছুদিন বাদে তিনি আম্রকাননের একটি চমৎকার ছবি আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসাবে মূল ছবিটি আমার বাসায় সংরক্ষণ করেছি। এই ছবির সংযোজন ম্যানুয়ালটিকে একটি আলাদা গৌরব দিয়েছিল।
…
১৯৯৫ সালে ম্যানিলাতে বসে শুনলাম, এস এম সুলতান চিরবিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। [এস এম সুলতান মারা যান ১০ অক্টোবর ১৯৯৪, যশোরে।]
বাছবিচার
Latest posts by বাছবিচার (see all)
- সুলতান – কামাল সিদ্দিকী - September 28, 2026
- ফিকশন: গ্রীন রোড – আবদুল মান্নান সৈয়দ - September 5, 2026
- কামরুদ্দীন আহমদের বয়ানে ১৯৫৪ সালের ইলেকশন - September 2, 2026