কবরস্থানের ভিতর
কবরস্থানের ভিতর যেই চারাগাছগুলি জন্মায়
তারা মৃতদের রুহের কিছু হিসসা পায় বোধহয়
যখন অনেক পুরানা কবরস্থানে
দুনিয়াবি দেহগুলার মাঝে নিজেকে দাঁড় করাই
আমাকে লক্ষ্য করে কারা টগর ছুঁড়ে দেয়
কোন শতকের ঘ্রাণ স্পর্শ করে যায়
শরীর কিছুই তার অনুভব করে না
মৃতদেরকে পাহারা দিয়ে রাখে
যে বুড়া কয়টা লোক
আরও আছে যারা কবর খুড়ে
যারা খোদাই করে ফলক
তারাও একই সুগন্ধি বহন করে
আমার শরীরে আতরের ঘ্রাণ শুঁকে
আজকে বলে দাও
আমি কোন কবর থেকে আসছি
আমি মাটির অই শিকড়ের কাছাকাছি গেড়ে বসে আছি কিনা
নাকি পুড়ে যাওয়া লাশ বয়ে নিয়ে আসি
সকল সুন্দর ছড়ায়ে থাকা পথ দিয়ে
কোনো ভালোই ত লাগে না ভালো
যখন দিল ঘিরা থাকে সীমাহীন আন্ধারে!
(অক্টোবর ২০২৫)
বৈশাখে বৃষ্টিদিন
হাহা বৈশাখ—এই উজালা ধূপের দিনে
বৃষ্টির ফোটাগুলি অন্তর ফুঁড়ে ঢুকলো
আমাদের মনে পুনরায় পিরিতির ভাব
ধরলো এ মৌসুমে এমন আনন্দ যেন
আর কিছু নাই আল্লার দুনিয়ায়!
সারা দিন ঝড়, তার পানি খায়ে খায়ে
নরম হচ্ছে মাটি আর আমার দিল
যত সাবধানে আজ হাঁটো না কেন
পায়ের ছাপে তার গভীর ক্ষত তৈরি
তুমি আটকাতে পারতেছ না
সে জখমও ভরে উঠতেছে ঢলের পানিতে
তোমার হাঁটার পথে নতুন জান আসা
রঙিলা ফুল, সবুজ কিশোর পাতা
আর কাচামিঠা ফলন্ত মুকুলগুলি
নাচতে নাচতে তোমাকে সেলাম করে
মেঘগুলি নিজেদের মধ্যে যত ঢুকে পড়ে
তত দ্রুত বাজ পড়ার ভয়ে দৌড়ে পালাও
রেখে যাও তোমার প্রতি আমার শিল্পিত নজর
(মে ২০২৬)
অভয় মিত্র ঘাটে
এমন চালচুলাহীন দিনে
বসে কর্ণফুলির পাড়ে
তুমি আসছো যাচ্ছো দেখি
সকল নৌকা পারাপারে
নেমে আচার সদাই করো
দাঁতে দাঁত লেগে যায় টকে
ঘাটে তোমার মতোই কেউ
ভাবি, চিনবো নাকি তাকেও?
এমন পোষ্য বিড়াল তুমি
ঘুমাও আমার বুকের পাশে
শহর প্রান্তে নদীর শরীর
যেমন আরাম করে ভাসে!
এমত সওদাগরি হাওয়ায়
তোমার পিছে হাঁটি, যাতে
বিকাল এই খেয়ালেই কাটে
আবার ভাবতে বসি, রাতে..
(অক্টোবর ২০২৩)
জানবিবি’তে
ঘুরে ঘুরে আসে উল-পশমের বাহারি সদাই
তোমাকে মানকি টুপি কিনে দিয়ে
আমি যে চলে যাবো তোশকের তলে
তুমি একা একাই গিয়ে জানবিবি
নিয়ে আসো মায়ের শরীরের ওম!
বিদেশি পাখি এসে ঘর করে সই
নিজের বাড়ির মতো খুঁজে পাবো
কই আর মাছ-মাংসের স্বাদ!
শয়ে শয়ে লোকের সরাইখানা এখানে
হাঁসের ডিমের মতো জড়ো হয়ে থেকে
তারা কোথাও কয়লায় পুড়াচ্ছে মুরগি
বন্ধুরা আসে শাদা মেঘ থেকে
আরও গভীর রহস্য থেকে মেয়েরা
আমাদের পোশাক বদলানোর এই সুযোগ
আমরা কুয়াশার ভিতরে হারায়ে না ফালাই!
(ডিসেম্বর ২০২৫)
আলস্য
কতগুলা সেজদা জমে যাচ্ছে
কত বর্ষাকাল—শুকনা চোখের ভিতরে পাথর
কারা যেন ঘোড়ায় চড়ে আসে
আর সারা গায়ে ছিটায়ে যায়
লবণের দ্রবণের মতো ঘুম
রাশি রাশি না পড়া বইয়ের মাঝখানে ঘুমাচ্ছি
বন্ধুরা খুঁজতেছে, পাচ্ছে না আমাকে
(অক্টোবর ২০২৩)
লাল জুলাই
আমাদের প্রতিরোধ, কেবল রক্ত ঢালতে থাকা
অতীত ঘেটে দেখি, শুধু বিদ্রোহের কাহিনি
আর দেখি রক্তের দাগে ভরে যাওয়া মসনদ
আরও কত রক্তের ভিতরে গিয়ে ধ্বংস হয়
আজকে হাসিনার কালো জিহবায়
সাপের ফোঁসফাঁসের মতো, আর
পিশাচ-দানব নামার মতো অন্ধকার—
তাতে আমার ভাইদের খুনের আস্বাদ লেগে আছে
এত রক্ত আগে, বাংলার দেশে কেউ পান করে নাই
ইতিহাস থেকে জড়ো হওয়া বিদ্রোহী যত রুহ
আমাদের কলিজায় সওয়ার হয়
আমরা মরতে মরতে অগ্রসর হবো শুধু
আমাদের হাতিয়ার, এই ছড়াইতে থাকা রক্ত
এই রক্তের ছলকে আজ আসমান লাল
লাল বাংলার মাটি
আশুরার তাজিয়া মিছিল আসে
এই মাটি কারবালা হোসাইনের
আসো কাতার বান্ধি, দাঁড়াই
যেন আমাদের শহিদরা—
যাদের সংখ্যাও কবরস্থ করা হইছে—
আসমান থেকে মার্চ করতে করতে
নেমে আসতে পারে এই লাল জমিনে।
(জুলাই ২০২৪)
ফানা
আমাদের ইতিহাস হবে শহীদদের জন্য লেখা গান
আমি যে নিজের জিন্দেগির পিছে ছুটতেছি
আর আমার পিরিতির কথা ভাবতেছি যেই জমিনে
তাতে আপন রক্তের খুশবু রেখে গেছে যারা
তাদের জন্য এই সবুজ জনপদের
সমস্ত প্রান্তে সফর করবো
পূর্ব বাংলার মহল্লাগুলাকে চিহ্নিত করবো তাদের নামে
ফারুক শান্তের জন্য লেখা থাকবে
আমার লালখান বাজার
বড় দীঘির পার আলো করে থাকবে
জামালের, ইউসুফের চিহ্ন
সন্দ্বীপে সাইমন শুধু তার মায়ের কাছেই যাবে
আর নুর মোস্তফার পরিচয় জানাবো সমগ্র দুনিয়ায়
যেই মাটিতে চোখের রক্ত গড়ায়ে দেয় মোর্শেদ
তার কোনো এক কণা থেকেই জন্ম নিচ্ছি আমি
এই লাল অস্তিত্বে মিশে গিয়ে আমার অবয়ব
ততদিনে না ফানা হয়ে যায়!
(জুলাই ২০২৫)
সন্ধান
একই লুপের ভিতর কয়েকশো চক্কর দিই
কখনও ঘুমের ঘোর, কোনো বেলা তৎপর
এমনই স্বভাবজাত তোমাকে খুঁজি
যেন সব দৃশ্য, শব্দের পাশে
নিজেকে লুকায়ে রেখে তুমি
আমার তামাশা দেখে ব্যাঙ্গ করতেছ
জ্যামিতির মাপে আঁকা গোল, তার রেখা
ধরে ধরে হেঁটে যাওয়া শরীর না-দেখা
তার সীমানা সমান আমার এই দিল
বলি তুমি তার বিন্দু হও
একই লুপের ভিতর কয়েকশো চক্কর দিই
আমার এই ঘুরতে থাকায় তোমার যে কী আনন্দ!
(এপ্রিল ২০২৬)
কাবার নিকটে
এখন রাত দুইটা বেজে ষোলো। খোদার হিসাবে জিলহজ আট, তাহাজ্জুদের অক্ত।
এই বৃষ্টির দিনে চট্টগ্রামের পোয়েটিক বাতাস মক্কার দিকে যাচ্ছে। আর আমাদের হৃদয় ছিঁড়ে নিচ্ছে কাবার কাছে। তোমাকে কীইবা পাঠাবো মাবুদ, ভণিতা ছাড়া?
তোমাকে চাইতে গেলে আল্লা, আমার ত অন্ধ হওয়া লাগবে
পিরিতিদের দেখবো না, হায়রে কী জিন্দেগি
কী এশক দিলা আমাকে তুমি খোদা
আমার নামাজ আমার সেজদাগুলাও আজ কবিতাতাড়িত
আমি কালো গেলাফের উপর শায়েরি লিখতে চাই
এতো এতো স্তুতি গাইবো যেন নক্ষত্রের বৃত্তান্ত লিখতে বসছি
যেন সমুদ্রের পারেই আছি কোনো। আমার চেহারা—নাক আর কপাল নরম ঝুরঝুরা বালুতে চেপে ধরছি। এতো দীর্ঘ সেজদা যে সমস্ত শরীরে ফেনায়িত ঢেউ এসে পৌছায়।
আজকে আম্মুর বিছানার দিক ছুটে যাই কোনো কারণ ছাড়াই। আম্মু ত কাবায় এখন, শাদা তুলার ভিতর, আমাকে দোয়া দিচ্ছে। আর এখানে আমি কাটা মোরগের মতো তড়পাই। পিঁপড়ার চলার মতো সারিবদ্ধ অস্থিরতা তোমার দিকে, আমার হৃদয়কে জখম করে।
তোমাকে আচমকা হারায়ে ফেলা ছাড়া আর কোনো ভয় নাই
এই রাতের তীব্রতা, একাকিত্ব, গন্ধ, কান্না সব তোমার জন্য।
(জুন ২০২৩)
সুলাইম মাহমুদ
Latest posts by সুলাইম মাহমুদ (see all)
- সুলাইম মাহমুদের কবিতা - September 8, 2026