বাংলা তরজমা’র ইন্ট্রো

[মূল লেখা]

আমাদের কালচারের একটা লক্ষ‌্যণীয় বৈশিষ্ট‌্য হইলো বুলশিট। এটা তো সবার জানা কথা। সবাই নিজের মতো কন্ট্রিবিউটও করে বুলশিটে। কিন্তু পুরা ব‌্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নেয়ার প্রতি আমরা বরং বেশি আগ্রহী। বরং বেশির ভাগ লোক ভাবে যে তারা বুলশিটগুলারে আলাদা করে চিনতে পারবে আর এড়ায়েও যাইতে পারবে। ফলে বুলশিটের মতো ব‌্যাপারটা আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে নাই কখনও, পারে নাই আমাদের মনোযোগের বিষয়বস্তু হইতেও।

ফলত, বুলশিট আসলে কী এইটা নিয়া আমাদের নিজস্ব কোনো বোঝাপড়া গড়ে উঠে নাই, কেন কালচারে বুলশিটের পরিমাণ এত বেশি, অথবা কালচারে বুলশিটের মেকানিজমটাই-বা কী। আর কালচারে বুলশিটের মূল‌্য বা অর্থই-বা কী এই ব‌্যাপারটাও কখনও আমাদের এনাফ এটেনশন পায় নাই। একটু অন‌্যভাবে বললে, বুলশিট নিয়া আমাদের নিজস্ব কোনো মতামত বা থিওরি নাই। আমার (হ‌্যারি জি. ফ্রাঙ্কফুর্ট) প্রস্তাব হইলো, বুলশিটের “তাত্ত্বিক বোঝাপড়া”র একটা জায়গা তৈয়ার করা—কিছু প্রাথমিক আর অনুসন্ধানধর্মী দার্শনিক এনালাইসিসের মাধ‌্যমে। এর জন‌্য আমি বুলশিটের কথা-সর্বস্ব কোনো ইউজেস বা ব‌্যবহার ও অপব‌্যবহারের কথা বিবেচনা করব না। আমার সোজাসাপ্টা উদ্দেশ‌্য হইলো বুলশিট কী এবং কোনটা বুলশিট আর কোনটা বুলশিট-না এই ব‌্যাপারটা—অথবা আরেকভাবে বললে, বুলশিটের ধারণা বা কনসেপ্টটার মূল কাঠামোটা মোটামুটিভাবে তুলে ধরা।

বুলশিটের কনসেপ্ট-স্ট্রাকচার বিল্ড-আপ করার জন‌্য কোন কোন শর্ত দরকার ও যথেষ্ট, এই ব‌্যাপারে কোনো পরামর্শ বা অপিনিয়ন ইচ্ছাস্বাধীন হইতেই পারে। প্রথমত, বুলশিট শব্দটা প্রায়ই খুব ঢিলাঢালাভাবে ব‌্যবহার করা হয়—সাধারণত গালি বা নিন্দাসূচক শব্দ হিসেবে, যার আক্ষরিক কোনো অর্থ নাই। দ্বিতীয়ত, বুলশিট ধারণাটা এত বিশাল আর অস্পষ্ট যে এইটারে নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে সুন্দর করে বুঝতে গেলে জোরজবরদস্তি করে বুঝার মত হয়ে যায়। এই বিতর্কে শেষ কথাটা হয়তো বলা যাবে না, তবে কাজ চালানোর মতো কিছু কথা তো বলা সম্ভব-ই। এমনকি দেখা যায় যে, বুলশিট নিয়া সবচাইতে প্রাথমিক আর মৌলিক প্রশ্নগুলার মীমাংসা তো হয়-ই নাই, বরং এখন পর্যন্ত প্রশ্নগুলাই কেউ তোলে নাই।

যতটুক আমি জানি, এই সাবজেক্টটা নিয়া কোনো কাজ তেমন হয় নাই বললেই চলে। এই বিষয় নিয়া লেখাপত্র আমি তেমন খুঁজে দেখি নাই, এর একটা কারণ হইলো আমি আসলে জানি না খোঁজাখুঁজির কাজটা কেমনে করতে হয়। তবে একটা জায়গা তো নিশ্চিয় আছে যেইখানে আমরা খুঁজে দেখতে পারি—অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি-র অতিরিক্ত খণ্ডে বুলশিট এর একটা এন্ট্রি আছে, এছাড়া ‘bull’ শব্দেরও কিছু রিলেটেড ব‌্যবহার আর টার্মও আছে। ঠিক সময়ে ঐ এন্ট্রিগুলা নিয়াও আমি কথা বলব। ইংরেজি ছাড়া অন‌্য কোনো ভাষার ডিকশনারি খুঁজে দেখি নাই, কারণ অন‌্য ভাষায় বুলশিট বা ‘bull’ কোন শব্দ দিয়া বুঝায় আমি জানি না। আরেকটা ভালো সোর্স হইলো ম‌্যাক্স ব্ল‌্যাক (Max Black)-এর The Prevalence of Humbug বইয়ের নাম-প্রবন্ধ। তবে ‘humbug’ আর ‘bullshit’ কতটা কাছাকাছি অর্থ দেয় আমি ঠিক শিউর না। এইটা তো শিউর যে শব্দ দুইটারে চাইলেই ইচ্ছাস্বাধীন অদলবদল করে ব‌্যবহার করা যাবে না। দুইটা শব্দেরই আলাদা আলাদা ইউজেস আছে, এইটাও পরিষ্কার। কিন্তু এই পার্থক‌্যগুলা, মানে শব্দ দুইটার আলাদা আলাদা ব‌্যবহার, আসলে বেশিরভাগই কায়দা-কানুনের বা কিছু বাক‌্যশৈলি সম্পর্কিত ব‌্যাপারে। তবে আমার মূল ইন্টারেস্টের যে জায়গাটা শব্দগুলার সরাসরি আক্ষরিক অর্থ, এর সাথে ডিফরেন্সগুলার তেমন সম্পর্ক নাই। “বুলশিট” বলার চাইতে “হামবাগ” বলাটা একটু ভদ্র, কম অশালীন। আলোচনার খাতিরে, ধরে নিলাম এই তফাতটা ছাড়া শব্দ দুইটার তেমন সিগনিফিকেন্ট বা বিশেষ কোনো পার্থক‌্য নাই।

Max Black হামবাগের সমার্থক শব্দ হিসেবে balderdash, claptrap, hokum, drivel, buncombe, imposture, আর quackery এই শব্দগুলা সাজেস্ট করছেন। তবে এই প্রাচীনপন্থী শব্দের লিস্ট কোনো কাজের না। কিন্তু Max Black আরো সরাসরি হামবাগের প্রকৃতি বুঝতে চেষ্টা করছিলেন, আর একটা ফর্মাল সংজ্ঞাও খাড়া করছেন:

HUMBUG: deceptive misrepresentation, short of lying, especially by pretentious word or deed, of somebody’s own thoughts, feelings, or attitudes.

বুলশিটের আসল বৈশিষ্ট‌্যগুলা বুঝতে এর কাছাকাছি আরেকটা সংজ্ঞা দেয়া যাইতে পারে। তবে বৈশিষ্ট‌্যগুলারে আলাদা আলাদা ব‌্যাখ‌্যা করার আগে Black-এর দেয়া সংজ্ঞাটারও দুয়েকটা দিক নিয়ে কথা বলব।

deceptive misrepresentation (প্রতারণার উদ্দেশ‌্যে ভুলভাবে উপস্থাপন): কথাটা একটু বাড়তি কথার মত শোনাইতে পারে। কোনো সন্দেহ নাই Black আসলে বলতে চাইছেন যে humbug আসলে স্বভাবতই মানুষরে প্রতারিত বা ধোঁকা দেয়ার জন‌্যই ডিজাইন করা। মানে হামবাগের ধোঁকা বা ফাঁকি দেয়ার যে কৌশলটা এইটা এমনিতেই কিংবা অসতর্কতায় ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা না। এমনেও বলা যায়, খুব ভেবে-চিন্তেই নিজেরে বা নিজের কথারে ভুলভাবে প্রেজেন্ট করাই এটার কাজ। এখন যদি বিষয়বস্তুর খাতিরেই বলি, ধোঁকা বা ফাঁকি দেয়াটাই যদি হয় হামবাগের পয়লা নম্বুরি চরিত্র, তাইলে কোনো কথা হামবাগ কিনা তা অন্তত সিকিভাগ হইলেও নির্ভর করে যে ব‌্যক্তি এটা বলতেছে তার মনের অবস্থা বা উদ্দেশ‌্যের উপর। এজন‌্য হামবাগ-কে শুধু ব‌্যক্তির কথা দিয়া বিচার করলে কিছুই বোঝা যাবে না। কথাটার আসল মানে কী এটা জানাও যথেষ্ট না; বরং বক্তা কোন মানসিকতা নিয়া কথাটা বলছেন, এটা জানা জরুরি। এই দিক বিবেচনায় নিলে হামবাগ অনেকটা মিথ‌্যার মতোই। মানে মিথ‌্যারে শুধু তো আমরা এইজন‌্যই মিথ‌্যা বলি না যে কথাটা সত‌্য না। বরং মিথ‌্যা এইজন‌্য বলি যে কারণ যে মানুষ মিথ‌্যাটা বলতেছে সে আসলে আপনারে ভুল বোঝাতে বা ধোঁকা দিতে চায়তেছে। মানে একটা মিথ‌্যার প্রধান ফিকিরই হইলো প্রতারণা করা।

এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে। বক্তার বিশ্বাস বা প্রতারণা করার মতলব ছাড়াও কি হামবাগ অথবা মিথ‌্যার আরো কোনো বৈশিষ্ট‌্য বা চরিত্র আছে? নাকি বক্তার মনে যদি প্রতারণার ইচ্ছা বা এমন নির্দিষ্ট ধরনের উদ্দেশ‌্য থাকে, তাইলে কি যে কোনো কথাই হামবাগ অথবা মিথ‌্যা হয়া যাবে?

কোনো একটা কথা মিথ‌্যা কিনা এই ব‌্যাপারে কিছু মত আছে। একটা মত বলে, একটা কথা যদি আসলেই মিথ‌্যা না হয় তাইলে কথাটারে মিথ‌্যা বলা যাবে না। আবার আরেকটা মত বলতেছে, সত‌্য কথা বলেও একজন মানুষ মিথ‌্যা কথা বলতে পারে, যদি সে নিজে বিশ্বাস করে যে কথাটা মিথ‌্যা আর কথাটা দিয়া যদি সে অন‌্যরে ভুজুংভাজুং বুঝ দিতে চায় অথবা ঠকায়তে চায়।

তাইলে humbug আর bullshit-এর বেলায়ও কি একই কথা খাটবে? মানে যেকোনো কথাই কি তাইলে humbug বা bullshit হইতে পারে, যদি বক্তার মনের মধ‌্যে সেই রকম কোনো মতলব থাকে? নাকি কথাটার নিজের মধ্যেও আলাদা কোনো গুণ বা লক্ষণ থাকা দরকার?

Short of lying (প্রায়প্রায় মিথ্যা): এইটাও একটা পয়েন্ট হইতে পারে যে যখন হামবাগকে “মিথ‌্যার কাছাকাছি” বা “মিথ‌্যার মতোই কিছু একটা” বলা হয়, এর মানে—হামবাগে মিথ‌্যারও কিছু চরিত্র আছে, কিন্তু সবগুলা নাই। তবে এইটাই পুরা কথা না। কারণ, ভাষার সব রকমের ব‌্যবহারেই, ব‌্যতিক্রমগুলা ছাড়া, মিথ‌্যার কিছু না কিছু স্বভাব থাকেই। সবগুলা না, কিছু কিছু। যদি আর কিছু না-ও থাকে, তাইলে অন্তত এইটা তো স্পষ্ট যে এইটাও ভাষারই একটা ব‌্যবহার। এখন কেউ যদি বলে যে ভাষার প্রতিটা ব‌্যবহারই (usages) “মিথ‌্যার মতোই কিছু একটা”, তাইলে তো আর এইটা ঠিক কথা হবে না। Black-এর এই কথাটা শুনলে মনে হয়, যেন তিনি একটা ধারাবাহিকতা (continuum)-র কথা বলতেছেন। এই ধারাবাহিকতার একটা নির্দিষ্ট অংশে মিথ‌্যার অবস্থান আর শুরুর দিকের অংশে অবস্থান হামবাগের। তাইলে প্রশ্ন উঠে, এই কন্টিনিউয়াম বা ধারাটা আসলে কেমন? এমন কোন জায়গায় আমরা হামবাগকে আগে খুঁজে পাই, আর হামবাগের পরে পাই মিথ‌্যারে? মিথ‌্যা আর হামবাগ দুইটাই আসলে মিস-রিপ্রেজেন্টেশনের আলাদা আলাদা কায়দা। কিন্তু প্রথম দেখায় বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা না যাইতেও পারে। তবে এদের মধ‌্যে পার্থক‌্যটারে “মাত্রার পার্থক‌্য” (degree in difference) দিয়ে বোঝা যায়।

Especially by pretentious word or deed (বিশেষত ভাণ্ডামি বা ভানপূর্ণ কথাবার্তা বা জ্ঞানগর্ভতার ভান বা আচরণের মাধ‌্যমে): এখানে দুইটা পয়েন্ট নোটিশ করতে হবে। প্রথমত, Black হামবাগকে কেবল কথার একটা ধরন বা ক‌্যাটাগরি হিসেবে বিবেচনা করেন নাই, বরং কাজের ধরন হিসেবেও দেখছেন। মানে, হামবাগ শুধু কথা দিয়া না, কাজের মাধ‌্যমেও ঘটানো যায়। দ্বিতীয়ত, তিনি “especially” (বিশেষত) শব্দটা ব‌্যবহার করছেন। এর মানে, Black মনে করেন না যে ভান বা ছলচাতুরি (pretentiousness) humbug এর একমাত্র বৈশিষ্ট‌্য। নিঃসন্দেহে, অনেক হামবাগ আসলে ছলচাতুরি-ই। আর “pretentious bullshit” তো এখন মুখের কথাই হয়ে গেছে। তবে আমার মনে হয়, বুলশিটের মা‌ধ‌্যমে যখন ছলচাতুরি করা হয়, তখন এইটা ঘটে কারণ বক্তা-ই আসলে ছলচাতুরি করতে চাইতেছেন, এইটা বুলশিটের মূল স্ট্রাকচারের অংশ বলে না। অর্থাৎ, কেউ ভান-ভণিতা বা ছলচাতুরি করে কথা বললেই তার কথা বুলশিট হয়ে যাবে না। তবে এইটাও সত‌্য যে, এই ছলচাতুরি করার মতলব-ই একজনরে বুলশিট বলতে বাধ‌্য করে। কিন্তু এরজন‌্য যদি এটা ধরে নেয়া হয় যে, বুলশিট সবসময় ভান-ভণিতা বা ছলচাতুরির-ই রেজাল্ট, বা ছলচাতুরি করাই এর ফিকির, তাইলে ভুল ভাবা হবে।

Misrepresentation … of somebody’s own thoughts, feelings, or attitudes: বলা হয়তেছে, হামবাগের মাধ‌্যমে মানুষ আসলে নিজেরেই ভুলভাবে প্রেজেন্ট করে। এইটা একটা জরুরি পয়েন্ট। শুরুতেই একটা কথা বলা যায়, যখন কেউ ইচ্ছা করেই কোনোকিছুরে ভুলভাবে প্রেজেন্ট করে বা তুলে ধরে, তখন সে অবশ‌্যই সেই সময়ে নিজের মনের অবস্থাটাকেও ভুলভাবে ট্রান্সলেট করে। এমনও হইতে পারে, কেউ শুধু নিজের মনের অবস্থাটারেই ভুলভাবে প্রেজেন্ট করতেছে। যেমন, সে যে ভানটা করতেছে এইটা আসলে তার মনের মধ‌্যে নাই-ই। কিন্তু ধরেন, কেউ একজন একটা কিছুকে ভুলভাবে তুলে ধরতেছে—এইটা মিথ‌্যা বলে বা অন‌্য যেকোনোভাবেই করতে পারে। এইটা করতে হইলে তারে অন্তত একসাথে দুইটা জিনিসরে ভুলভাবে প্রেজেন্ট করতে হবে। প্রথমত, সে যে বিষয়ে কথা বলতেছে, এইটারে। আর এই কাজটা করতে গিয়া সে নিজের মনের অবস্থাটারেও ভুলভাবে প্রেজেন্ট করা থেকে নিজেরে আটকায়ে রাখতে পারে না। সহজ কথায় যদি বলি, কাউরে ঠকানো মানে শুধু বাইরের জিনিস নিয়াই ভুল বা মিথ‌্যা বলা না, নিজের মনের অবস্থারেও ভুলভাবে প্রেজেন্ট করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ তার পকেটে কত টাকা আছে সেইটা নিয়ে মিথ‌্যা বলতেছে। তখন সে শুধু পকেটে কত টাকা আছে এইটা নিয়েই মিথ‌্যা তথ‌্য দিতেছে না, বরং এইটাও বোঝায় যে সে নিজে তার বলা মিথ‌্যাটারে সত‌্য বলে বিশ্বাস করে। মিথ‌্যাটা যদি ঠিকঠাক কাজ করে, তাইলে যারে ঠকানো হয়তেছে সে দুইভাবে ঠকে—একবার পকেটে কত টাকা আছে এইটা নিয়া বলা ভুলভাল তথ‌্য বিশ্বাস করে, আরেকবার বক্তা নিজে বিশ্বাস করে বলেই এমন কথা বলছে এইটা বিশ্বাস করে।

এখন, এইটাও মনে হয় না যে Black চান, হামবাগে সবসময়ই শুধু বক্তার মনের ভাব বা নিয়তটারেই মূল বিষয় (referent) হিসেবে তুলে ধরুক। আসলে, হামবাগের বিষয়বস্তু যা কিছু হইতে পারে। এইটা নিয়া কোনো নিষেধ নাই। সম্ভবত Black যা বলতে চান তা হইলো, হামবাগের একমাত্র মতলব এই না যে, যে বিষয় নিয়া আলাপ চলতেছে ঐ বিষয়ে মানুষরে উল্টাপাল্টা বুঝানি। বরং এর আসল মতলব হইলো, বক্তার মনের আসল নিয়তটারে লুকায়ে রেখে শ্রোতারে কিছু একটা দিয়া বুঝ দেয়া। মানে শ্রোতার মনে একটা ভুলভাল ধারণা তৈয়ার করে দেয়া আরকি। সাদা কথায়, কোনো আলাপ বা বিষয়বস্তু হামবাগ হইলে এর মাকসাদই থাকে শ্রোতারে বক্তার নিয়ত নিয়া একটা ভাঁওতা দেয়া। এই ভাঁওতা দেওয়াটাই হইলো হামবাগের একমাত্র মাকসাদ ও শান।

এইভাবে Black-রে রিড করলে হামবাগ মানে হইলো সরাসরি মিথ‌্যা না, বরং মিথ‌্যার কাছাকাছি কিছু একটা (short of lying)—এই কথাটার একটা ব‌্যাখ‌্যা পাওন যায়। ধরেন যে আমার পকেটে কত টাকা আছে এইটা নিয়া আমি আপনারে মিথ‌্যা বললাম। এতে কিন্তু আমি সরাসরি আমার বিশ্বাস বা চিন্তা নিয়া কিছুই বললাম না। ফলে কেউ তো বলতেই পারে, আমি যদিও মিথ‌্যাটা বলার সময় আমার মনের মধ্যে আসলে কী চলতেছে সেইটা ভুলভাবে তুলে ধরছি, তবু তো এইটা সেই অর্থে মিথ‌্যা না। কারণ, আমি তো ডিরেক্ট আমার মনের অবস্থা নিয়া কোনো স্টেটমেন্ট দেই নাই। আমি শুধু বলছি, আমার পকেটে বিশ ডলার আছে। এই স্টেটমেন্টের কোথাও তো ডিরেক্টলি বলা নাই যে আমি যেটা বললাম এইটা বিশ্বাস করি। অন‌্যভাবে চিন্তা করে দেখলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। “আমার পকেটে বিশ ডলার আছে” এই কথাটা বলে আমার মনের বর্তমান অবস্থা নিয়া একটা জাজমেন্টে পৌঁছানোর জন‌্য আপনারে একটা রিজনেবল ক্লু দিলাম। বিশেষত, এই ক্লু-টা দিয়া বলতে চাইতেছি যে আপনিও বিশ্বাস করে নেন বা ধরে নেন যে আমার পকেটে যে বিশ ডলার আছে এই ব‌্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নাই। এখন, যেহেতু এই ধরে নেয়াটা আসলে ভুল, ফলে আমি মিথ‌্যা বলে আপনারে আমার মনের অবস্থা (state of mind) নিয়াও ভুলভাল বুঝাইলাম। তবে আমি কিন্তু ডিরেক্টলি কোনো মিথ‌্যা এইখানে বলি নাই। এইভাবেও দেখা যায় আসলে, যদি বলি, আমি নিজের মনের অবস্থাটারে এমনভাবে তুলে ধরছি যেইটা আসলে ডিরেক্টলি মিথ‌্যা না, বরং মিথ‌্যার মতো বা কাছাকাছি কিছু একটা তাইলে একটুও বেখাপ্পা লাগব না। (মানে মিথ‌্যা না বলেও মিথ‌্যা বলার উদ্দেশ‌্য হাসিল করে নেয়ার একটা ওয়ে আরকি!)

কিছু সিমিলার সিচুয়েশনের কথা বিবেচনা করলে, হামবাগ নিয়া Black-এর আলাপটা বুঝতে পারা যায়। ধরেন, জুলাইয়ের চার তারিখ খুব উচ্চবাচ‌্য করে এক বক্তারে বলতে শুনলেন, “আমাদের মহান ও আশীর্বাদপুষ্ট দেশ, এবং এর জাতির পিতারা খোদা তা’য়ালার অশেষ রহমতে মানবজাতির জন‌্য এক নতুন যুগের সূচনা করছিলেন।” এইটা তো একটা হামবাগ কোনো সন্দেহ নাই। Black-এর ব‌্যাখ‌্যা বলে, বক্তা তো এইখানে কোনো মিথ‌্যা বলতেছেন না। বক্তার কথাগুলা তখনই মিথ‌্যা হইতো, যদি তার ইনটেনশনই হইতো যে শ্রোতাদের এমন কিছু বিশ্বাস করানো, যেগুলারে তিনি নিজে মিথ‌্যা বলে বিশ্বাস করেন। যেমন দেশ সত‌্যিই মহান কি-না, ব্লেসড কি-না, এর জাতির পিতারা কি আসলেই ঈশ্বরের সুনজরপ্রাপ্ত কিনা, কিংবা সত‌্য সত‌্যই কি তারা মানবজাতির জন‌্য নতুন কিছু শুরু করছিলেন কি-না। এইগুলা। কিন্তু জাতির পিতাদের নিয়া শ্রোতারা কী ভাবতাছেন, কিংবা দেশের ইতিহাসে ঈশ্বরের ভূমিকাটাই-বা কী—এই বিষয়গুলা নিয়া শ্রোতাদের মতামতের তো দামই নাই বক্তার কাছে। অন্তত এ বিষয়গুলা নিয়া মানুষের কী মতামত বা ধারণা এইটা তো বক্তার বক্তব‌্য দেয়ার কোনো কারণ বা উদ্দেশ‌্য না।

একটা বিষয় তো ক্লিয়ার যে চৌঠা জুলাইয়ের বক্তার কথাগুলা যে হামবাগ এইটার মূল কারণ তা না যে বক্তা তার কথাগুলারে মিথ‌্যা বলে বিশ্বাস করেন। বরং Black-এর বিচার বলে, আসল কাহিনী হইলো বক্তা এই আলাপগুলার থ্রু-তে শ্রোতাদের কাছে নিজের একটা বিশেষ ইমপ্রেশন তৈরি করে চান। সে তো ভুলভাল কথা বলে আমেরিকার ইতিহাসের ব‌্যাপারে কাউরে ধোঁকা দিতে চাইতেছেন না। বক্তার কাছে আসলে যে বিষয়টা সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হইলো, নিজের দেশ বা জাতির পিতাদের নিয়া না, বরং শ্রোতারা আসলে “তারে” নিয়া কী ভাবতাছে। বক্তার একমাত্র মাকসাদ হইলো তিনি চান শ্রোতারা তারে খুব চিন্তক একজন মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করুক, শ্রোতাদের মনে এমন একটা ধারণা তৈরি হোক যে বক্তা তো আসলে খুব ইন্টেলেকচুয়াল, তিনি খুব দেশপ্রেমিক একজন মানুষ, দেশ, জাতি ও ইতিহাস নিয়া তিনি খুব জ্ঞান রাখেন, ভাবেন। আবার ধর্ম-কেও তিনি খুব এপ্রিশিয়েট করেন। দেশের গ্রেটনেস নিয়াও তিনি খুবই সেনসেটিভ। ইতিহাসের প্রতি তার যে ভক্তি সেইটা আসলে খোদারে সামনে রাইখাই ইত‌্যাদি, ব্লা ব্লা।

হামবাগ নিয়া Black-এর দেয়া ডেফিনেশনটা কিছু পরিচিত উদাহরণ বা পরিস্থিতির সাথে বেশ ভালোভাবেই খাপ খাওয়ায়ে যায়। তবু আমার মনে হয় না যে Black-এর ডেফিনেশনটা বুলশিটের আসল স্বভাবটারে ঠিকঠাকভাবে ধরতে পারছে। এইটা ঠিক যে, হামবাগ নিয়া যে কথাটা বলি, বুলশিটের ক্ষেত্রেও একই কথাটা বলতে পারি—দুইটাই মিথ‌্যার কাছাকাছি একটা কিছু, সরাসরি মিথ‌্যা না, আর হামবাগ বা বুলশিট যারা বলে বা করে তারা আসলে ইনটেনশনালি নিজেরে এমনভাবে রিপ্রেজেন্ট করে যাতে মানুষজনরে ধোঁকা দেওন যায়। কিন্তু এই দুইটা দিক নিয়া Black যে ব‌্যাখ‌্যা দিছেন, সেইটা আসল জাগায় ঠিকঠাক ফিট খায় না।

(টু বি কন্টিনিউ…)

The following two tabs change content below.
Avatar photo

শাদাব হাসিন

পুরা নাম শাদাব হাসিন আবরার আহবাব। পরিচিত মানুশরা কেবল শাদাব হাসিন বলেই ডাকেন। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা সবকিছু কিশোরগঞ্জ শহরেই। বর্তমানে ইউনিভার্সিটি ফ্রেশার, সাবজেক্ট ম‌্যাথমেটিক্স।