সুজাতা (জন্ম ১০ই অগাস্ট ১৯৪৭) হইতেছেন বাংলাদেশের শুরুর দিকের সিনেমার নায়িকা, যিনি রূপবান (১৯৬৫) সিনেমার নায়িকা হিসাবেই বেশি পরিচিত… নিচের অংশটা উনার “চলচ্চিত্রে আমার ৫৫ বছর” (২০২১) বই থিকা নেয়া হইছে…
সালাউদ্দিন সাহেব আমাকে তার ধারাপাত ছবির নায়িকা চরিত্রে মনোনীত করেছিলেন। ধারাপাত শুরু হওয়ার আগে আমরা তেজগাঁ চলে আসলাম কারন তেজগাঁ’তে এফডিসি এবং তেজগাঁ মনিপুরি পাড়ায় সালাউদ্দিন মামা থাকতেন। আমাদের আসা-যাওয়া সুবিধা হবে।
ধারাপাত শুটিংয়ের প্রথম শট আমার মনে আছে। পরিচালক তার বাড়ির সামনে খোলা জায়গায় বেড়ার ঘরের সেট ফেলেছিলেন। ধারাপাত পরিচালক আমজাদ হোসেনের লেখা। আমজাদ ভাই ধারাপাত ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন। শক্তিমান অভিনেতা কাজী খালেক সাহেব ধারাপাত ছবির গুরুত্বপূর্ণ হেডমাস্টারের চরিত্রে রূপদান করেছিলেন। সালাহউদ্দিন মামা আমাকে খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা।
‘পায়ের তলায় নরম ঠেকলো কি?
আস্তে একটু চল না ঠাকুরঝি’
দৃশ্যটা হচ্ছে নায়িকার মনের মানুষ বিদেশে থাকে। সুঅভিনেত্রী নাসিমা আপা হচ্ছে নায়কের বোন তার মানে নায়িকার ঠাকুরঝি (ননদ)। নায়িকা দুষ্টুমী করে অন্ধ সেজে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে এগিয়ে আসবে। আমার কাছে দৃশ্যটা একটু কঠিন লেগেছিল। একে তো কবিতাটি মনে রেখে আবৃত্তি করা তারপর আমি শাড়ি পরতেই পরতাম না। তখন আমি সালোয়ার-কামিজ পরতাম। সালাহউদ্দিন মামার বোন সালেহ মাসি ধারাপাতে হেডমাস্টারের বৌয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। খুব ভালো মহিলা ছিলেন উনি। আমাকে প্রতিদিন শুটিংয়ের আগে শাড়ি পরিয়ে দিতেন। দৃশ্যটি একটি বড়ই গাছের নিচ দিয়ে আমার হাঁটা ছিল। বেশ কয়েকবার রিহার্সেল দিলাম এক টেকেই শর্টটি ওকে হলো। সবাই খুশি, আমি খুশি এবং রোমাঞ্চিত। শর্ট শেষে আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি, সেটের সবাই এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে?
আমি বললাম আমার পায়ে কাঁটা ফুটেছে। প্রডাকশনের একটি ছেলে আমার পায়ের তলা থেকে বেশ বড় একটা কাঁটা বের করে দিল।
সালাহউদ্দিন মামা বললেন, তুমি কাট করলে না কেন?
আমি বললাম, আমার কোনো কষ্ট হয়নি। আমার এই ছবিতে প্রথম শর্ট আমি নিজে কাটতে চাইনি।
…
আমি একাধারে টেলিভিশনে, রেডিওতে, মঞ্চে অভিনয় করে যাচ্ছি। পূর্ব পাকিস্তানে তখন উর্দু ছবির ছড়াছড়ি। উর্দু ছবিতে কাজ করতে হলে উর্দু শিখতে হতো। বাসায় উর্দু শিখার জন্য উর্দু মাস্টার রাখতে হতো। একদিন সালাউদ্দিন মামার ডাক আসলো। আমি আর মা সকাল দশটার সময়ে হাজির হলাম সালাউদ্দিন মামার বাড়ি মণিপুরি পাড়ায়। সালাউদ্দিন মামা আমাদের বললেন, যে রূপবান যাত্রাটা উনি চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করবেন এবং আমাকে রূপবান নাম চরিত্রে অভিনয় করতে হবে।
এখানে বলে রাখি, রূপবান ছবিটি পরিচালক ফজলুল হক ভাই প্রথম শুরু করেছিলেন। সেখানেও আমি রূপবান ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করি। ফজলুল হক ভাই হচ্ছেন চ্যানেল আই মালিক ফরিদুর রেজা সাগরের বাবা। অতি অমায়িক ও ভদ্রলোক ছিলেন। আমাকে বোনটি বোনটি করে ডাকতেন।
মাকে যখন সালাউদ্দিন মামা রূপবানের কথা বললেন, মা তখন সালাউদ্দিন মামাকে বললেন রূপবান ফজলুল ভাইয়ের সাথে চুক্তি করা আছে।সালাউদ্দিন মামা বললেন, সেটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না।
ফজলুল সাহেব রূপবান করবেন না বলে, আমি রূপবানটা করবো। উনি আমাকে রূপবান করার পারমিশন দিয়েছেন।
তবুও মা ফজলুল ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাবা সালাউদ্দিন সাহেব রূপবান ছবিটি বানাবেন। আমার মেয়েকে তার রূপবান চরিত্রে অভিনয় করতে বলছেন, আপনি বলে বইটি করবেন না, এটা কি সত্যি?
ফজলুল ভাই বললেন, হ্যাঁ মাসিমা আমি রূপবান ছবিটি করছি না। তন্দ্রা সালাউদ্দিন সাহেবের ছবিটি করতে পারে।
আমি আজও জানি না ফজলুল ভাই কেন রূপবান ছবিটি করেননি?
রূপবান কিন্তু একটা আন্দোলনের ছবি। বাংলা চলচ্চিত্রের একটা আন্দোলনের ছবি। যখন পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ছবির ছড়াছড়ি তখন রূপবান ছবিটি আমাদের চলচ্চিত্রে আশীর্বাদ স্বরূপ আবির্ভাব হয়েছিল। প্রতিদিন আমি আর মা সালাউদ্দিন মামার বাড়িতে যেতাম রিহার্সেলের জন্য। রাজার মেয়ে কিভাবে হাঁটবে, কিভাবে বসবে, ডায়লগ পড়া, ড্রেসের মাপ দেয়া। রূপবান লিখেছিলেন সফদর আলী ভূঁইয়া। রূপবান ছবিটি চ্যালেঞ্জিং হিসেবে আমরা সবাই নিয়েছিলাম। সালাউদ্দিন মামা আমাদের সবাইকে বললেন, বাংলা ভাষার জন্য কত ছাত্র প্রাণ দিয়েছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই বলে কত রক্ত দিয়েছে আর আমরা আমাদের চলচ্চিত্রে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু ছবি তৈরি করছি। ধিক্কার আমাদের ধিক্কার দেওয়া উচিত। দেখি আমাদের এই প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হয়।
এই রূপবানে কিন্তু আমার নাম তন্দ্রা থেকে সুজাতা হয়। এর পিছনে একটা কারণ ছিল। আমি চলচ্চিত্রে আসার আগে আর একজন অভিনেত্রী ছিলেন তার নাম ছিল তন্দ্রা বর্মণ। সে পুরানো বলে আমার নামটা চেঞ্জ করা হলো।
রূপবান ছবিটির গল্প হচ্ছে বারো বছরের মেয়ের সাথে বারো দিনের ছেলের বিয়ে দেওয়া হয়। রহিম বাদশার বাবা একাব্বর বাদশার ছেলে-মেয়ে হয় না বলে প্রজারা তাকে আটকুড়ে বলে সম্বোধন করতো। সেই দুঃখে একাব্বর বাদশা রাজত্ব ছেড়ে জঙ্গলে চলে যায়। (একাব্বর বাদশার অভিনয় করেছিলেন সিরাজুল ইসলাম)। জঙ্গলে গিয়ে একাব্বর বাদশা একজন দরবেশের দেখা পায় এবং একাব্বর বাদশার দুঃখের কথা শুনে বলে এই নে এই গোলাপ ফুলটা সাতদিন তোর বৌকে পানিতে চুবিয়ে রোজ রাতে খেতে বলবি, দেখবি তোর বৌ অন্তঃসত্ত্বা হবে। কিন্তু আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যখন তোর ছেলের বারোদিন হবে তখন তার সাথে বারো বছরের মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। নইলে তোর ছেলের অমঙ্গল হবে।
একাব্বর বাদশা ফুলটি নিয়ে তার বেগমকে দেন (বেগমের চরিত্রে অভিনয় করেছিল তন্দ্রা বর্মণ)। সাতদিন ফুলটি পানিতে ডুবিয়ে খাওয়ার পর বেগম অন্তঃসত্ত্বা হয় এবং যথা সময়ে বেগম একটি ছেলে সন্তান প্রসব করেন। নাম রাখে রহিম-আল্লাহর রহমত বলে নাম রাখে রহিম। ছেলে একদিন, দুইদিন হতে থাকে বাদশা সবাইকে চর্তুদিকে পাঠিয়ে দেয় বারো বছরের মেয়ে খোঁজার জন্য, কোথাও বারো বছরের মেয়ে পাওয়া যায় না।
বাবা পাগলের মতো হয়ে ওঠে তার ছেলের বয়স কালকে বারো দিন পূর্ণ হবে। তাই বাদশা পাগল হয়ে ওঠে তার ছেলের অমঙ্গলের কথা ভেবে। রাজদরবার থেকে একজন রাজাকে বলে মহারাজ আপনার দরবারে যে সেনাপতি আছেন তার মেয়ে রূপবানের বয়স কালকে বারো বছর পড়বে। রাজা শুনে সেনাপতিকে ডেকে বলে, সেনাপতি সাহেব আপনার মেয়ে রূপবানের নাকি কালকে বারো বছর পূর্ণ হবে, এ কথা কি সত্যি?
সেনাপতি বলে, হ্যাঁ মহারাজ সত্যি?
তাহলে আমাকে আপনি বলেন নি কেন?
সেনাপতি বলে, হুজুর, মেয়ের বাবা হয়ে আমি কি করে মেয়েকে আগুনে ফেলে দিই?
রাজা রেগে গিয়ে বলে, কালকেই আপনার মেয়েকে নিয়ে আসবেন, আমার ছেলের সাথে আপনার মেয়ের বিবাহ হবে। সেনাপতি রাজি না হওয়াতে রাজা জল্লাদকে বলে সেনাপতির গর্দান নিতে। এই খবর পেয়ে রূপবান দৌড়ে এসে তার বাবাকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে গান গায়।
মেরো না মেরো না
জল্লাদ রে
ও জল্লাদ মেরো না
আমার বাবারে
আমার জল্লাদ, জল্লাদ রে।
রাজা বলে, মা রূপবান, তুমি যদি আমার বারো দিনের ছেলেকে বিয়ে না করো তবে তোমার বাবাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। রাজার কথায় রূপবান রাজি হয়ে বাবাকে মুক্ত করে। এবং পরের দিন বারো দিনের রহিমের সাথে বারো বছরের রূপবানের বিয়ে হয়ে যায়। এবং বারো দিনের শিশুকে নিয়ে রূপবান জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দেয়।
জঙ্গলের অংশটুকু চিত্রায়িত হয়েছিল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। সালাউদ্দিন মামা রূপবানের ইউনিট নিয়ে ট্রেনে চললেন- যেমন ক্যামেরাম্যান সামাদ ভাই, মেকাপম্যান আকবর মামা, প্রডাকশান ম্যানেজার ও লেখক সফদর আলি ভুঁইয়া, এডিটর বশির ভাই, আমি, আমার মা, চন্দনা (তাজেল), ক্যামেরার সহকারী, রহিম বাদশা বারো দিনের শিশুর চরিত্রে অভিনয় করেছিল আমার সেজো বোনের মেয়ে কেবা। তখন তার বয়স ছিল পাঁচ কি ছয় মাস আর বারো দিনের রহিম বাদশা করেছিল ঐ বোনের বড় ছেলে বাপী আর রহিম বাদশা করেছিল আঠারো বছরের ছেলে নাম তার মনসুর। চৌষট্টি সালে ছবিটির শুটিং শুরু হয় আর মুক্তি পায় পঁয়ষট্টি সালে ডিসেম্বরের তিন তারিখ কি চার তারিখ। তারপর আনোয়ার ভাই, এনাম আহমেদ, রহিমা খালা, ড্রেসম্যান মন্টু পরদেশী, জনপ্রিয় শিল্পী ও পরিচালক সুভাষ দত্ত।
ফেঞ্চুগঞ্জে আমরা সবাই পৌঁছুলাম। এই প্রথম শুটিংয়ের জন্য ঢাকার বাইরে আসলাম। মনের মধ্যে খুব খুশি খুশি ভাব। সালাউদ্দিন মামা তার খালাতো ভাইয়ের বাংলোতে আমাদের তুললেন। তার ভাই ছিলেন চা-বাগানের ম্যানেজার। অমায়িক মানুষ ছিলেন ভদ্রলোক। প্রথম দিন মেকআপ করে সবাই তৈরি হয়ে যাত্রার জন্য রওয়ানা দেবো তখন ক্যামেরাম্যান সামাদ ভাইয়ের এ্যাসিসটেন্ট এসে বলল, ক্যামেরা খারাপ, কি করা যায়? আমরা সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসলাম, এখন কি হবে? সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম সালাউদ্দিন মামাকে দেখে। উনার মধ্যে কোনো টেনশন কাজ করলো না। উনি বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। উনি ক্যামেরাম্যানকে বললেন, সামাদ সাহেব আপনি আপনার সহকারীকে বলুন ঢাকায় গিয়ে ক্যামেরাটা বদলিয়ে নিয়ে আসবে।
সামাদ ভাই বললেন, যেতে আসতে তো চার-পাঁচ দিন লাগবে। তার উপর যদি অন্য ক্যামেরাগুলি অন্য পার্টিকে দিয়ে থাকে তাহলে? আর তাছাড়া ক্যামেরা নিয়ে যেতে, আসতে অন্তত চার-পাঁচ দিন লাগবেই ।সালাউদ্দিন মামা বললেন, লাগুক। কোনো অসুবিধা নাই। আমি ইউনিট নিয়ে ক্যামেরার জন্য অপেক্ষা করবো। সামাদ ভাই বললেন, ঠিক আছে আমি কাল সকালেই আমার এ্যাসিসটেন্টকে পাঠিয়ে দেবো।
সময়টা তখন হবে ৬৪ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বর। কারণ তখন বেশ শীত শীতভাব ছিল।চৌষট্টি সালে তখন রাস্তাঘাট তেমন ভালো ছিল না। যাওয়া-আসার ব্যবস্থাও তেমন সুবিধার ছিল না। পরের দিন ক্যামেরা নিয়ে ক্যামেরার সহকারী ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো। আমাদের সবার মন খারাপ শুটিং হবে না বলে আর প্রযোজকের কত খরচ বেড়ে যাবে। প্রযোজক ছিলেন স্বয়ং সালাউদ্দিন মামা।
আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খাই। সিলেট ফাইজার ফ্যাক্টরী বাংলোতে থাকি, বাংলোতে আমরা শিল্পী আর পরিচালক এডিটর বশির ভাই, সামাদ ভাই, সিরাজ ভাই, আনোয়ার ভাই, এনাম মামা, রহিমা খালা, বড় রহিম বাদশা, বারো বছরের রহিম বাদশা আমার মেজো বোনের বড় ছেলে বাপী, মা, চন্দনা (তাজেল) আমি বাংলোতে থাকতাম, পাশেই একটা বাড়ি ভাড়া করে তাতে ক্যামেরা সহকারী, মেকআপম্যান ও তার সহকারীদ্বয়, ড্রেসম্যান তার সহকারীদ্বয়, বাবুর্চি তার সহকারীদ্বয় আর প্রডাকশান ম্যানেজার সফদার আলী ভূঁইয়া এবং তার আন্ডারে চার-পাঁচজন ছেলে যারা ইউনিটের সবাইকে খাওয়া, চা-নাস্তা এবং টুকটাক কাজ করে দেবে। বাংলোটা বিরাট জায়গা নিয়ে তৈরি। আমরা সকালে নাস্তা খেয়ে বাংলোতে দোলনা, ব্যাডমিনটন খেলতাম। আমরা প্রায় এক মাসের উপর সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জে ছিলাম কিন্তু আশেপাশের লোকজনের সাথে সেরকম ভাব হয়নি। তখন এতো জনসংখ্যা ছিল না আর তখন শ্রেণি বিভাগের কাজ করতো (আমার মনে হয়)। আমরা যে বাংলোতে উঠেছিলাম আশেপাশে যারা থাকতো তার বেশির ভাগ শ্রমিক। তারা মনে করতো আমরা বড়লোক, অফিসার গোছের লোক। দুই চারজন মেয়ের সাথে ভাব করার চেষ্টা করেছি। তাদের সাথে কথা বলতেই তার মা এসে তাদেরকে নিয়ে যায়। আমরা শুটিং করতে গিয়েছিলাম তা তখন কেউ জানতো না আর শুটিং সম্পর্কে ওখানকার কেউ বুঝতোই না।
আমরা বসে বসে খাচ্ছি আর ঘুমাচ্ছি। ঢাকা থেকে খবর আসলো কোনো ক্যামেরাই নেই। তখন এফডিসি খুব ব্যস্ত থাকতো। একটাই মাত্র ফ্লোর ছিল যা এক দুই মাস থাকতেই দরখাস্ত দিয়ে বুক করতে হতো। প্রতি শুক্রবারে একটা দুইটা ছবি মুক্তি পেতো তার সাথে ছিল ভারতীয় ছবি, পাকিস্তানি ছবি, ইংরেজি ছবি। তখন সিনেমা হলও বুকিং দিতে হতো অনেক আগে থেকে।
প্রায় দশ বারো দিন পর ক্যামেরা নিয়ে আসা হলো। আমরা সবাই খুশি, শুটিং আরম্ভ হবে। রাতে আমরা সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম, সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে মেকআপ নিলাম তারপর সালাউদ্দিন মামা আমাকে কি করতে হবে সেই দৃশ্যটা বুঝাতে লাগলেন। সুজাতা আজকের দৃশ্যটা চিত্রায়িত হবে যে তুমি তোমার বারো দিনের স্বামীকে নিয়ে বনবাসে এসেছো একা গভীর জঙ্গলে। সেই জঙ্গল দিয়ে তুমি তোমার স্বামীকে কোলে নিয়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছ।
আমরা সবাই তৈরি হয়ে গাড়িতে উঠলাম, গাড়িটি ছিল বাস। আগেকার বাস সামনের দিকে নাক বের করা। মা বাসটির নাম দিয়েছিলেন মুড়ির টিন। পাহাড়ি রাস্তা, এবড়ো-থেবড়ো সাংঘাতিক ঝাঁকি দিতে দিতে আমাদের নিয়ে চললো গন্তব্য পথের দিকে। আমরা কোনোদিন বাসে যেতাম লোকেশানে আবার কোনোদিন ট্রাকে যেতাম। আমরা লোকেশানে পৌঁছুলে সবাই আবার নিজেদেরকে ঠিকঠাক করে জঙ্গলের সরু পথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। প্রথম দিন আমার একাই শুটিং ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর সামাদ ভাই বললেন, আমাদের সবাইকে থামতে। সামনে ঘন জঙ্গল, আমরা সবাই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার কি হয়েছে? সামাদ ভাই বললেন বাঘের গায়ের গন্ধ পাচ্ছি।
সামাদ ভাই আমাদের গাইড হিসাবে কাজ করছেন। কারণ সামাদ ভাইয়ের দেশ সিলেটে ছিল। যার জন্য লোকশান সম্পর্কে সামাদ ভাইয়ের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া ওখানকার রাস্তা-ঘাট যারা ভালো মতো চেনে তাদের দুজনাকে সালাউদ্দিন মামা রেখেছিলেন।
বাঘের কথা শুনে আমাদের সবার মুখ মলিন হয়ে গেল বিশেষ করে আমার। সবাই আমাকে মাঝখানে রেখে হাঁটা শুরু করলো। কী ভয়ানক জঙ্গল। লোক দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে রাস্তা করা হলো। লম্বা লম্বা গাছে লোক চড়িয়ে গাছের ডাল কাটা হলো যেন সূর্যের আলো প্রবেশ করে এবং রিফলেক্টর দিয়ে আমার মুখে আলো ফেলা যায়। শর্ট রেডি পরিচালক বললেন আমার কোলে বাচ্চা দিতে। অতো জঙ্গলে তো বাচ্চা নিয়ে যাওয়া কিন্তু ড্রেসম্যান পুতুল আনতে ভুলে গেছে। এখন কি করা যাবে? মামা তো যাবে না। তাই পরিচালক ড্রেসম্যানকে বলেছিল একটি পুতুল আনতে। ভীষণ রেগে গেলেন। সবাই চিন্তা করছে কী করা যাবে। তখন এমন ছিল না যে এক দেড় মাইল গেলে পুতুল পাওয়া যাবে। এখনকার দিনে তো এই সমস্যা কোনো সমস্যাই না। সবাই মিলে বুদ্ধি করলাম মোটা-কাপড় লম্বা করে গোল করে পুতুলের মতো করা হলো এবং কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো যেন বুঝা যায় কোলে একটা ছোট বাচ্চা। শট শুরু হলো গান দিয়ে। জঙ্গলে ঝর্ণা পানি বয়ে যাচ্ছে আমি সেই ঝর্ণার পানি দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি আর গান করছি-
“আমার নিদারুণ শ্যাম
তোমায় নিয়ে বনে আসিলাম।”
গানটি গেয়েছিলেন নীনা হামিদ আর সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সত্য সাহা।
দুপুরে আমাদের খাবার ছিল পাউরুটি, কলা আর মিষ্টি। কারণ আমরা যেখানে শুটিং করি সেখানে ভাত নিয়ে যাওয়া খুবই অসুবিধা। কিন্তু পরবর্তীতে এই অসুবিধাকে সুবিধাতে পরিণত করেছিলেন পরিচালক আর তার খালাত ভাই ফ্যাক্টরীর ম্যানেজার (এখন নামটা মনে নেই)। তারপর শুটিংয়ে আমরা ভাত পেতাম, অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন পরিচালক সালাউদ্দিন মামা।
প্রতিদিন শুটিং হতে লাগলো। সবাই ফাঁকে ফাঁকে দুই একদিন বিশ্রাম পায়। আমার প্রতিদিন শুটিং থাকে। আমরা একবার শুটিংয়ের জন্য খাসিয়া পাহাড়ে গেলাম। সেখানকার খাসিয়াদের জীবনযাত্রা অদ্ভুত। খাসিয়া পাহাড়টা উঁচু প্রায় বাড়ি চার তলা-পাঁচ তলা সমান। পাহাড়ে ওঠার জন্য মাটির ছোট ছোট সিঁড়ি তৈরি করা যা খাসিয়ারা চার-পাঁচ জন পরিবার মিলে তৈরি করেছে। খাসিয়ার রাজার সাথে পরিচয় হলো। তখন তো আমি ছোট ছিলাম তাই মনে করেছিলাম রাজা যখন তখন নিশ্চয়ই জরির জামা জরির মুকুট থাকবে। কিন্তু যখন খাসিয়ার রাজার সাথে পরিচয় হলো দেখলাম সাদাসিধা একটা মানুষ, মুখটা একটু চাকমার মতো, গায়ে একটা সাদা ফতুয়া আর পরনে একটি খাটো ধুতি হাঁটুর উপর তুলে পরা। আমাদের সাথে কথা বললো। রূপবানের গল্প শুনে হাসলো। আমার মনে হলো ওরা কোনোদিন সিনেমা দেখেছে কিনা সন্দেহ। খাসিয়া মেয়েরা সংসারের সমস্ত কাজ করে যেমন, রান্না করা, পাহাড়ের নিচ থেকে পানি আনা, লাকড়ি আনা, মাছের শুঁটকি করা, জুম চাষ করা, আর খাসিয়ার ছেলেরা বাচ্চাদের দেখাশোনা করে-এইটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। পাহাড়ে জুম চাষ করে মেয়েরা। খাসিয়াদের উপার্জনের উৎস পান, সুপারী, শুঁটকি মাছ। এগুলি থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে তারা সংসার চালায়। আমি যখন ওদের সাথে গল্প করছি, তখন দেখলাম এ কাজ মেয়ে ভিক্ষা করতে আসলে, তাকে পান, সুপারী দেওয়া হলো। আমি বললাম, ভিক্ষা চাইতে এসেছে পান, সুপারী দিল কেন?
ওদের মধ্যে একজন বলল, আমরা পান, সুপারী ভিক্ষা দিই। কি আশ্চর্য তাই না? আমরা যতদিন সিলেটে রূপবানের শুটিং করেছি, আমাদের অনেক কষ্ট হলেও আমরা বেশ আনন্দের মধ্যে ছিলাম। সিলেটে প্রচুর জোঁক। সেই জোঁকের ভয়ে আমরা সব সময়ে ভীত থাকতাম।
শুটিং শেষ হলো আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেবার জন্য সব গোছগাছ করলাম রাতের বেলায় পরের দিন আমরা স্টেশনে আসলাম, এসে শুনি ট্রেন এক ঘণ্টা দেরিতে আসবে। এর মধ্যে রূপবানের শুটিং সম্পর্কে এদিক-সেদিকের মানুষেরা মোটামুটি জেনে গেছে। স্টেশন মাস্টার আমাদের দেখে সালাউদ্দিন মামাকে বললেন ট্রেন দেরিতে আসবে, মেয়েদের ওয়েটিংরুমে না বসিয়ে ভিতরে আমার রুম আছে সেখানে বসান।
আমরা স্টেশন মাস্টারের কথা মতো ভিতরে গিয়ে তার রুমে বসলাম। আমি, মা, চন্দনা, আমার ভাগিনা বাপী মনসুর (বড় রহিম বাদশা) সালাউদ্দিন মামা আর বশির ভাই।
কিছুক্ষণ ঘরের বাইরে মেয়েদের হালকা গলার আওয়াজ শুনতে পাই। আমরা সবাই কৌতূহলী হয়ে ঘরের দরজার দিকে তাকাই। বশির ভাই উঠে দরজার দিকে কি ব্যাপার তা দেখতে, একটু পর এসে মাকে বলে মাসিমা ওরা রূপবানকে দেখতে এসেছে। তারা রূপবানকে স্বামী ভক্ত দেবী হিসাবে জানে।
আমি যখন এই স্মৃতিগুলি লিখছি আমি বলতে পারি আমার এই লেখা কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু এটা সত্যি, সত্যি, সত্যি-তিন সত্যি। মা বশির ভাইকে বললেন ওদেরকে ভিতরে নিয়ে এসো বাবা।
বশির ভাই বাইরে গিয়ে উনাদেরকে নিয়ে আসলো। উনারা ভিতরে আসলেন, আমরা দেখলাম সব মহিলা। সধবা হিন্দু মহিলা। বয়স সবার পঁচিশ-এর ভিতর সবার কপালে সিঁদুরের টিপ সিঁথিতে সিঁদুর হাতে শাখা আমার চেয়ে সবাই বয়সে বড়। আমি খাটের উপরে পা তুলে হাঁটু মুড়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলাম। মেয়েগুলি ভিতরে আমার খাটের কাছে এসে আমাকে খাটের সামনের দিকে বসতে বলল। আমি তাদের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখি কারোর হাতে ফুলের মালা, কারো হাতে রেকাবিতে দূর্বা, ধান, প্রদীপ আর একজনের হাতে সন্দেশের থালা। মা আমাকে এগিয়ে এসে বসতে বলল, আমার খুব লজ্জা লাগছিল আর আশ্চর্য হয়ে তাদের কাজ কারবার দেখছিলাম।
তারা প্রথমে ধুপচি আর প্রদীপ দিয়ে আরাধনা করলো। আমি এইসব দেখে সরে আসতে নিলে মা চোখের ইশারায় চুপচাপ বসে থাকতে বলল। আমি নাচার বান্দার মতো চুপচাপ বসে থাকিলাম, আমার মাথায় দূর্বা, ধান দিয়ে আশীর্বাদ করলো। আমার কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর নাই দেখে সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে আমাকে সন্দেশ খাওয়ালো। তারপর আমার পায়ে হাত দিয়ে বলল, আমরা সতীর সাক্ষাত এবং সতীর আশীর্বাদ নিয়ে যাচ্ছি। রীতিমতো আমাকে পূজা করে তারপর তারা গেল।
ওরা চলে যাবার পর সবাই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে ছবি হিট, ছবি হিট, ছবি হিট। মা সাথে সাথে দুই হাত জোড় করে ভগবানের উদ্দেশে প্রণাম করলেন। আমার সব ছবি হিট করার পিছনে মায়ের আশীর্বাদ ছিল। আমার খুব ভালো লেগেছিল যে মেয়েগুলি আমাকে (রূপবান) সম্মান ও ভক্তি দেখালো। আমার মনে হয় এতো ভক্তি, ভালোবাসা কম শিল্পী পেয়েছেন।
ট্রেন আসলো, আমরা সবাই ট্রেনে উঠে বসলাম, কিছুক্ষণ পর রেলগার্ড হুইসেল দিল। সবুজ পতাকা উড়ালো ট্রেন ছাড়বার জন্য। আমরা সিলেটের জঙ্গল, ঝর্ণা, খাসিয়া, খাসিয়া পাহাড় ও মানুষের ভক্তি ও ভালোবাস নিয়ে ঢাকার দিকে রওয়ানা দিলাম।
ঢাকায় নেমে সালাউদ্দিন মামা মাকে বললেন, এখন আর কয়দিন শুটিং না। আপনারা চার-পাঁচ দিন বিশ্রাম নিন। তারপর শুটিং শুরু হওয়ার আগে জানিয়ে দেবো। সুজাতার উপর খুব খাটুনি গেছে। বেচারী কোনোদিন বিশ্রাম পায়নি। আমি শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে রেডিওতে নাটক করতাম, মঞ্চে নাটক করতাম আবার টেলিভিশনেও নাটক করতাম।
রূপবান শুটিং করার পর এফডিসিতে ঢুকলেই অনেক পরিচালক বলতো এই যে যাত্রার নায়িকা আসলো। তাদের নাম এখানে লিখতে চাই না কারণ আমি চাই তাদের আত্মা কষ্ট না পাক। নিঃশব্দে এফডিসিতে ঢুকতাম আর নিঃশব্দে কাজ করে বেরিয়ে আসতাম। মা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে আমি যদি রূপবানের পর কোনো ছবি না পাই।
রূপবানের শেষ দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছিল মিরপুর বারো নম্বর। তখন বারো নম্বর ছিল আম-কাঁঠালের বাগান আর ঝোপঝাড়ে ভর্তি। আর এখন বড়, বড় বিল্ডিং, রাস্তা-ঘাট। আমি যখন মিরপুরে যাই তখন চৌষট্টি সালের মিরপুর খুঁজে পাই না। কিন্তু আমার স্মৃতিতে সেই আগের মিরপুর জীবিত আছে। মিরপুরে অনেক ছবির শুটিং হতো। এফডিসির ফ্লোর পাওয়া গেল না বলে রূপবানের পরিচালক নবাবপুর একটি বাড়ির ছাদে বাদশা একাব্বরের সেট ফেলেন। আমরা রূপবানের শুটিং খুব কষ্ট করে করেছি। আমি তো এখানে লিখতে ভুলেই গেছি, রূপবানের একটা গান রহিম যখন তাজেলের প্রেমে পড়েছে। তখন রূপবান জানতে পেরে মনের দুঃখে বিরহের গান গায়। সেই গানটি সিলেটের জাফলংয়ে চিত্রায়িত হয়েছিল। লোকেশনটি ছিল এমন মধুর এতো সুন্দর যেমন সামনে পাহাড় অনেক উঁচু, সেখান থেকে ঝর্ণা নেমে এসে নিচে আছাড় খেয়ে পড়ছে, সেই আওয়াজটা জলতরঙ্গের মতো আওয়াজ তুলছে আর ঝরনার পাশেই এক রাখাল বাঁশিতে সুর তুলে মহিষ চড়াচ্ছে। আর আমাদের চারিপাশে সবুজের বাহার। পাহাড়ি ফুল বেগুনি আর ছোট, ছোট লাল রংঙের ফুল কি মাধুর্য্য। এইসব দেখে আল্লাহর প্রশংসা না করে পারা যায় না। আপন মনে আল্লাহর দরবারে মাথা নিচু হয়ে আসে।
আমরা সবাই শুটিং শেষ করলাম। ডাবিং শেষ করলাম, নেপথ্য মিউজিক শেষ হলো। সব শেষ এখন রূপবান মুক্তির দিন গুনছে। আমরা সবাই উত্তেজিত কি হবে এই নিয়ে। আমরা যখন একসাথে হই আমরা আলোচনা করি যদি রূপবান সিনেমা হলে না চলে তাহলে আমরা এফডিসিতে মুখ দেখাতে পারবো না।
মা প্রতিদিন ভগবানকে ডাকেন। আর কোনো সাধুর দেখা পেলে রূপবানের কথা বলেন,
– বাবা আমার মেয়ের হাত দেখে বলুন তো রূপবান কি জনসাধারণ দেখবে?
সাধু বাবা বলেছিলেন, দেখবি বইটা খুব ভালো মতো চলবে।
এই সাধু বাবার দেখা পেয়েছিলাম রূপবান করতে গিয়ে জঙ্গলে। তখন মায়ের এই সাধুর উপর একটা ভক্তি জন্মেছিল এবং সাধুকে বলেছিলেন বাবা আপনি যখন ঢাকায় যাবেন আমার বাসায় উঠবেন। সাধু ঢাকায় এসেছিলেন এবং আমাদের বাড়িতে এক রাত ছিলেন। তখনও বলেছিলেন দেখবি তোর এই ছোট মেয়েটা চিত্র জগতে অনেক নাম করবে।
সেই শুভক্ষণ আমার জীবনে এলো, রূপবান চৌষট্টি সালে ডিসেম্বরে মুক্তি পেলো। মুক্তি পাওয়ার পর ছবিঘরে মানুষের ঢল নামলো। এতো ব্যবসা সফল ছবি-মনে হয় আজ পর্যন্ত কোনো ছবির এতো ব্যবসা হয়নি। আল্লাহ আমাকে রাতারাতি সফলতার শিখরে বসালেন। আমি সব সময়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি। তারপর আমার মা, কিনা কষ্ট করেছেন আমার জন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁর সম্মান আমি রাখতে পারি নাই। তাঁর অমতে, তাঁর বিরুদ্ধে আমি আজিম সাহেবকে বিয়ে করেছিলাম। অবশ্য পরে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়।
রূপবান মুক্তি পাওয়ার পর আমার হাতে একটার পর একটা ছবি আসতে থাকে। সবগুলি ছবির কথাবার্তা মা বলতেন আমি শুধু অভিনয় করতাম। রূপবান মুক্তি পাওয়ার পর অনেক ভক্ত আমাদের বাসায় আসতো আমাকে দেখতে।
রূপবানের পর উর্দু ছবি আমাদের পূর্ব বাংলা থেকে বিদায় নিল, ভারতীয় ছবি বিদায় নিল শুধু ইংরেজি ছবি গুলিস্তান সিনেমা হলের উপরে ছিল নাম ছিল নাজ সেই প্রেক্ষাগৃহে চলতো। সব পরিচালক উর্দু ছবি বাদ দিয়ে লোকগাথা ছবি শুরু করলো। বায়ান্নো সালের পর আর একবার পূর্ব ‘পাকিস্তানের বাঙালি জেগে উঠলো, সোচ্চার হলো। আমরা বাঙালি আমরা কেন উর্দু ছবি বানাবো? কেন আমরা উর্দু ছবি দেখবো?
রূপবান গ্রামে যে সব সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছে সে সব হলে কোনোটায় ছয় মাস, কোনোটায় দুই মাস, কোনোটায় তিন মাস চলেছে। এইভাবে আমার মনে হয় দুই-তিন বছর সমগ্র বাংলাদেশে রূপবান ঘুরেছে। রূপবান এমন একটি ছবি যা গ্রামের মেয়েদের প্রেক্ষাগৃহে এসে ছবি দেখার অভ্যাস করেছে।
একদিন সালাউদ্দিন মামা আমাদের ডেকে পাঠালেন কি খবর?
মামা বললেন- তোমাদের একটা কথা বলতে ডেকেছি।
আমি বললাম, কি মামা?
মামা বললেন, সুজাতা তোমার মনে আছে সিলেটে রূপবান শুটিংয়ের সময় তুমি যে একটি বাঁশ ধরে গান গেয়েছিলে-
দুঃখ যে মনের মাঝে হানিল আমায়। তারে নি, ভালো রাখিবে খোদায়…
আমি বললাম, হ্যাঁ মনে আছে। তা বাঁশটার আবার কি হলো মামা?
সালাউদ্দিন মামা বললেন, সেই বাঁশটা নিলামে ষাট টাকা দিয়ে বিক্রি হয়েছে।
আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম এক আনা, দুই আনার জিনিস ষাট টাকা দিয়ে কিনেছে। সে কে? কেমন রূপবান ভক্ত?
সেই লোকটার সাথে শিল্পকলা একাডেমিতে দেখা হয়েছিল একটা ফাংশানে। ফাংশানের শেষে আমি গল্প করছিলাম। পিছন থেকে সুজাতা আপা বলে কে যেন ডাকলো, আমি পিছনে ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখি একজন বয়স্ক লোক আমাকে সালাম দিয়ে বলল, আপা আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনার মনে আছে রূপবান ছবিতে সিলেটের পাহাড়ের উপর একটা বাঁশ ধরে আপনি কেঁদে কেঁদে গান করেছিলেন।
আমি বললাম, হ্যাঁ, আপনি রূপবান দেখেছেন?
লোকটি বলল, দেখিনি মানে কতবার দেখেছি আমার মনে নেই। আর সেই বাঁশটা আমি নিলামে কিনেছি। চৌষট্টি সালের ছয়শত টাকা মানে এখন অনেক টাকা হবে।
আমি বললাম বাঁশটা কি চুলার ভিতর দিয়েছেন।
কথাগুলো হাসতে হাসতে বললাম, ভদ্রলোক আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, কি বলেন! আমি ওটা যত্নসহকারে রেখে দিয়েছি।
একবার কথাগুলি ভাবুন আজ থেকে চুয়ান্নো বছর আগের কথা। এতোদিন বাঁশটি যত্নসহকারে রেখেছেন। একটা বই কতটা জনপ্রিয় হলে মানুষ এই সব ঘটনা ঘটায়। আমার জীবনে কত বড় পাওয়া তা বলে বুঝাতে পারবো না।
রূপবান কিন্তু ভাষা আন্দোলনের একটি অংশীদার। রূপবান যখন গ্রামে-গঞ্জে চলে, তখন গ্রামে-গঞ্জের মেয়ে-বউরা প্রেক্ষাগৃহে আসা শুরু করে এটাও কিন্তু চলচ্চিত্রের একটা বিশেষ দিক। কিন্তু এই রূপবান এখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায় নাই।
রূপবান একটি বাঙালি নারীর চ্যালেঞ্জিং চরিত্র, রূপবান একটি স্বামীভক্ত সতী নারীর চরিত্র। রূপবান বাংলা চলচ্চিত্রের একজন আন্দোলনকারী নারী চরিত্র।
আমি অপেক্ষায় থাকবো কবে রূপবানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।
বাছবিচার
Latest posts by বাছবিচার (see all)
- রূপবানের পর উর্দু ছবি, ইনডিয়ান ছবি আমাদের পূর্ব বাংলা থেকে বিদায় নিল: সুজাতা - August 28, 2026
- আমার স্মৃতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্মেষ: নাজির আহমাদ - August 14, 2026
- (বই থেকে) বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ – কামরুদ্দীন আহমদ (এক) - March 14, 2026