আমেরিকাবাসী এক বাংলাদেশি ছাত্রীরে পড়াই আমি। সে ইংরেজী ভাষী হলেও তার মা-বাপ যেহেতু বাংলাভাষী এবং কাজিনরাও বাংলাদেশে থাকে, যোগাযোগের খাতিরে সে নিজেই বাংলা শিখতে চায়। তার মা-বাপও চায় তাদের বাচ্চা যেন বাংলা সাহিত্য, গান, কবিতা এসবের ভিতরে নিজেরে জড়াতে আগ্রহ পায় তার তালিম যেন আমি দিই।
এটা করতে গিয়ে নানান আলোচনা তার লগে করা লাগতেছে। প্রথমত, ভাষা হিসাবে কোনটা বাংলাদেশি বাংলা, কোনগুলা বাংলাদেশি গান, বাংলাদেশি বাংলার বৈচিত্র্যতা ইত্যাদির নানা আলাপ। তো, বাংলার অক্ষর জ্ঞান দেয়ার পরে তার আগ্রহ বুঝে এখন তারে বাংলা গান শুনানোর ভিতর দিয়ে গানের লিরিক্স লেখাই আমি। এভাবে বাংলা শোনা, বোঝা এবং লিখতে পারার ভিতর দিয়ে সে ইজিলি বাংলা গান গুনগুন করতে করতেই বাংলায় অভ্যস্ত হবে বলে আমার মনে হইছে। ট্রাই করতেছি আর কি বাংলার প্রতি যতটুকু দরদ ওর ভিতরে জাগানো যায়।
তো আলোচনাক্রমে, ‘বাছবিচার’ প্রকাশনী থেকে বের হওয়া ‘চিনোয়া আচেবের ইন্টারভিউ’ বইটা থেকে ভাষার প্রশ্নে ওনার বক্তব্যটা আমার মত করেই ওরে বললাম। যে, ওনার ভাষা ছিল ইগবো। ইগবো ভাষার আবার ছয়টা ডায়ালেক্ট ছিল। ভিনদেশী মিশনারীরা সবগুলা ডায়ালেক্ট থেকে মোট ছয়জনরে এক টেবিলে বসায়ে বাইবেল ধরায়ে দিছিল অনুবাদ করতে। একটা সেন্টেন্সের একেক অংশ একেকজনরে জিগেশ করে করে একেকজনের ডায়ালেক্টে একেক অংশ অনুবাদ করে একটা ইগবো মানভাষা তৈয়ার করা হয়। যেটার ফলাফল ছিল খুবই অদ্ভূত। ওই মানভাষায় গান বানানো যায় না। খুবই ভারী একটা ভাষা। এত কষা আর কাঠের মত মরা, একদমই রসহীন লাগে। এইটা ১০০ বছরের চর্চায় একটা কদর পাইছে যদিও এবং ব্যাকরণবিদরা এটারে মানভাষা হিসাবে আগলায়ে রাখার মাধ্যমে কুক্ষিগতও করে রাখছে। ওনার মতে, ডায়ালেক্টরে তার নিজের মত থাকতে দেয়া উচিত। যার যে ডায়ালেক্টে ইচ্ছা লেখবে। সময় গেলে নিজেরাই নিজেদের কোন একটা ডায়ালেক্টরে বেছে নিবে।
অথবা ডায়ালেক্টগুলা নিজেরাই একটা কমন ভাষা খুঁজে নিবে। এটা আমি এড করলাম।
যাইহোক, তারে বললাম, যে, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও অনেকটা এরকম চাপায়ে দেয়ার ব্যাপার ঘটছে। ব্রিটিশরা বাংলাঅঞ্চলের শাসন ক্ষমতা হাতে নেয় যখন তখনও বাংলাভাষার কোন ব্যাকরণ ছিল না, দরকার হয় নি। সাহিত্যও বেশিরভাগ ছিল ওরালফর্মে। ব্রিটিশরা আসার পরে ওরাই ব্যাকরণ তৈয়ার করলো নিজেদের শাসনের সুবিধায়। আর এটা করা হলো কলকাতার বাবুদেরকে নিয়ে। যার ফলে যেই ডায়ালেক্টগুলা অরিজিনালি আছে বাংলাদেশে, ওগুলা মুখে মুখেই থাকলো, আর বলতে পারো, গানে গানেই থাকলো। লিখিত ফর্মে ওইভাবে উঠে আসতে পারলো না। কারণ, ব্রিটিশ সরকার আর কলকাতার বাবুরা মিলে তৈয়ার করলো সংস্কৃতভাষায় মোড়ানো এক প্রমিত বাংলা। (ও, বর্ণমালা আর যুক্তবর্ণ পড়াতে গিয়ে ওরে দেখাইছিলাম, শুধুমাত্র সংস্কৃত শব্দের জন্য কতগুলা আলাদা বর্ণ আর নিয়ম আমাদের শিখতে হয়, যা পুরাই একটা চাপানো ঘটনা, তাও শিখালাম তারে।) যে বাংলা এখানে স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে হাজির। ফলে অরিজিনাল যে মুখের বাংলা, নানান ডায়ালেক্টসহ এখানে আছে, তা ছোট হিসাবে নিজেদের মুখ লুকায় রাখে। অনেকে বাচ্চাদেরকে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা হিসাবে নিজের ডায়ালেক্ট বাদ দিয়ে কেতাবি ওই প্রমিতভাষা শেখায় ছোটবেলা থেকে। ফলে ওরা অরিজিনাল ভাষার লগে আর কানেক্টেড ফিল করে না। একটা আলগা কেতাবী ভাষায় কড়কড়ায়। আর ভাষার জায়গা থেকেই তুমুল এক বিচ্ছিন্নতা বাচ্চার লগে বাচ্চার মা-বাবার ভিতর গেড়ে বসে। নিজের চৌদ্দপুরুষ আর নাই তাদের যাপনে, আলাপে বা কিচ্ছায়। ভাষা বদলের মাধ্যমে এইটা অটো সেট হয়ে গেছে। স্মৃতি ভুলায়ে দেয়া যাইতেছে। শিকড়হীন করা যাইতেছে। সে কখনো শোনেও নি আমরা যে কলোনী ছিলাম এককালে। একটু নড়েচড়েই বসলো এমন আলাপ শুনে।
ওরে বললাম, ইংরেজীর যেরকম নানাদেশে নানারূপ, বাংলারও নানারূপ আছে। তুমি ইন্ডিয়ান বাংলা মুভি আর বাংলাদেশের মুভি পরপর দেখো, জিনিসটা আলাদা করতে পারবা। আমাদের কালচার আর ওদের কালচার আলাদা। আমাদের ভোকাবুলারি আর ওদের ভোকাবুলারি আলাদা। আমাদের এক্সেন্ট আর ওদের এক্সেন্ট আলাদা। এমনকি গান যখন শুনবা দেখবা কত আলাদা তাদের থেকে আমরা। এমনকি বাংলাদেশের ভিতরেও আমরা বৈচিত্র্যময়। সিলেটিরা একরকমে বাংলা বলে, চাঁটগাইয়ারা একরকমে বলে, আবার ঢাকাইয়ারা একরকমে বলে। আবার তিন অঞ্চলের মানুষ যখন একত্র হয় আরেক রকম বাংলা বলে। এটাই বাংলাদেশের বাংলার সৌন্দর্য্য।
তো, বাংলাদেশের বাংলার মূল যেই স্বাদ ওইটার তালাশ করতে করতে ব্রিটিশ পিরিয়ডের আগের যেই লিখিত বাংলা ওইটারেই আমি ক্লাসিক বাংলা হিসাবে ওরে পরিচয় করায়ে দিলাম। ওই বাংলার উত্তরসূরী কারা, গানের ভিতরও খুঁজতেছিলাম।
সেদিন চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলার আয়োজনে আব্দুল গফুর হালীর ৯৮ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের একটা ভিডিও সামনে আসলো চাঁটগাইয়া এক চ্যানেলের মাধ্যমে।
খেয়াল করলাম, প্রোগ্রামে গাওয়া গানগুলা আগেও শুনছি। যেমন , সোনাবন্ধু তুই আমারে করলিরে দিওয়ানা, মনের বাগানে ফুটিলো ফুল রে, ওই লাল কোর্তাঅলা দিলি বড় জ্বালারে পাঞ্জাবীঅলা, বানুরে ও বানু সহ অনেক গান। এগুলা আগে শুনলেও গানগুলার যিনি রচয়িতা, আব্দুল গফুর হালী, ওনার নাম জানা ছিল না। যখন আব্দুল গফুর হালী নামটা জানলাম, ওনারে নিয়ে বিস্তারিত জানার আগ্রহ জাগলো।
গুগল ঘেঁটে যতটুকু জানলাম, আব্দুল গফুর হালী (৬ আগস্ট ১৯২৯ – ২১ ডিসেম্বর ২০১৬) ছিলেন একজন বাংলাদেশী গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক। ওনার বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদে। ওনার বাপ আবদুস সোবহান এবং মা গুলতাজ খাতুন। রশিদাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জোয়ারা বিশ্বম্বর চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ে তিনি পড়ালেখা করেন। তবে ক্লাস সিক্সের পরে ওনি একাডেমিক পড়ালেখা করা ক্ষ্যামা দেন। ওনার ভাষ্যমতে, ওইসময় দেশে দূর্ভিক্ষ চলতেছিল। অনাহারে অনেক মানুষের মউত ওনি কাছ থেকে দেখছেন, যা ওনারে ব্যাপকভাবে নাড়া দিছিল।
তো, ওনি কোনদিন হারমোনিয়ামের তালিম না নিলেও ভালোই বাজাতে পারতেন। ছোটবেলা থেকেই ওনি সিনেমাপাগল ছিলেন আর গানের পোকাও ছিলেন। সিনেমার গান গেয়ে বেড়াইতেন সবসময়। ওনাদের এলাকায় বাড়ির উঠানে গানের আসর জমতো। এটা স্বাভাবিক নিয়মেই বসতো। আবার একই এলাকায় বাড়ি ছিল আসকর আলী পন্ডিতের। ছোটবেলা থেকেই তিনি আসকর আলী পণ্ডিতের কাজ দিয়ে অনুপ্রাণিত হন। পরে মওলানা বজলুল করিম কাঞ্চনপুরী, মাওলানা আবদুল হাদি এবং রমেশ শীলের মতো মাইজভান্ডারী সুফি গায়কদের দ্বারাও প্রভাবিত হন। বলা যায়, তিনি ছিলেন গাইতে গাইতে গায়েনের সেরা নজির। যদিও পরিবার থেকে উৎসাহ পান নাই কখনো। গান থেকে সরাতে ওনার বাপে ওনারে বিয়া করায় দিলেও ওনি সংসারমনা ছিলেন না তত, ঠিকই আবার গানের আসরে চলে আসেন।
এমনকি অল্প বয়সেই, তিনি আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্রের অডিশনে প্রথম হন। ১৯৬৩ সাল থেকে ওনার গানগুলা নিয়মিত রেডিওতে সরাসরি প্রচার হইতো। ৭ বছর পরে, তিনি পূর্ব পাকিস্তান রেডিওতে গায়ক-গীতিকার-সুরকার হিসেবে নিবন্ধন করেন। তারপর থেকে তিনি একজন পেশাদার গীতিকার, সুরকার এবং গায়ক হিসাবে তাঁর জীবন পার করছেন। তিনি বাংলাদেশের টেলিভিশন এবং রেডিও চ্যানেলগুলির জন্য নিয়মিত গান লিখতেন এবং সুর করতেন। গানের জগতে শ্যাম-শেফালী ঘোষ জুটির যে জনপ্রিয়তা, ওইটা ওনার গান গাওয়ার পর থেকেই।
এছাড়া ওনি স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও গান শোনায়ে উজ্জীবিত করছেন। এজন্য দুই দুইবার ওনি হামলার শিকার হন। একবার রাজাকারদের হাতে, আরেকবার পাকবাহিনীর হাতে। আহত হয়েও কোনমতে কৌশল করে জানে বেঁচে ফিরেন ওনি।
তিনি চাটগাঁইয়া ভাষায় মাইজভাণ্ডারী, মুর্শিদি, মারফতি প্রভৃতি ধারায় প্রায় দুই হাজারের বেশি গান লেখছেন। ২০১০ সালে তাঁর জীবনী লই প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘মেঠোপথের গান’ বানানো হয়। চাঁটগাইয়া ভাষায় ওনিই প্রথম নাটক লেখছেন। তাঁর গান লই দুইটা বই আছে, ‘তত্ত্ববিধি’ ও ‘জ্ঞানজ্যোতি’।
অবশ্য বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান তাঁরে ও তাঁর কাজরে পাত্তা না দিলেও দেশের বাইরে প্রচুর কাজ হইছে ওনারে লই। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গান নিয়ে গবেষণা করছেন একদল গবেষক। জার্মান ভাষায় তাঁরে লই নির্মিত হইছে তথ্যচিত্র। জার্মানির হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবর্ষ-বিষয়ক দর্শন শাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক হানস হার্ডার ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে আসছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন। পরে শিল্পী কল্যাণী ঘোষের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় আবদুল গফুর হালীর সঙ্গে। ২০০৪ সালে অধ্যাপক হান্স হার্ডার আবদুল গফুর হালীর ৭৬টি গান জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ‘ডর ফেরুখটে গফুর স্প্রিখট’ বা ‘পাগলা গফুর বলে’ শিরোনামে গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করছেন। হার্ডার আবদুল গফুর হালী সম্পর্কে লেখেন, “আবদুল গফুর হালীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি বা উপাধি না থাকলেও নিজের চেষ্টায় তিনি অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী হতে সক্ষম হইছেন। তিনি নিজেরে শুধু বাংলা সাহিত্যের দিকে সরাসরি ধাবিত করেননি, সুর ও আধ্যাত্মবাদেও নিজেরে বিলায়ে দিছেন।।”
২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চার বছর সময়ে সুফি মিজান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আবদুল গফুর হালীর ৩০০ গানের স্বরলিপিসহ তিনটি গীতিকাব্য ‘সুরের বন্ধন, শিকড়, দিওয়ানে মাইজভান্ডারি’ ও ‘আবদুল গফুর হালীর চাটগাঁইয়া নাটক সমগ্র’ প্রকাশিত হইছে। চট্টগ্রামের গানের ইতিহাসে কেবল গফুর হালীর গানেরই স্বরলিপিসহ গীতিকাব্য প্রকাশিত হইছে। আবদুল গফুর হালীর গানের সংরক্ষণ ও প্রচারে ইতিমধ্যে আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হইছে।
কয়েকবার একুশে পদকের জন্য ওনার নাম তালিকায় উঠে আসলেও ওনি কিন্তু একুশে পদক পান নাই। তবে বেশ কয়েকটা জাতীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার পাইছেন।
২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের মাউন্টেন হাসপাতালে ফুসফুসের ক্যানসার ও বার্ধক্যজনিত নানা রোগের দরুণ আব্দুল গফুর হালী মারা যান।
এই ছিল আব্দুল গফুর হালীর জীবনকাহিনী। তার বাইরে ওনারে জানতে ইউটিউবে ওনার কিছু কিছু কথাবার্তা পাইলাম, একত্র করলাম যতটুকু বুচ্ছি।
আব্দুল গফুর হালী সারাজীবন চাঁটগাইয়া ভাষাতেই গান বানছেন। তবে কিছু গান বানছেন এমন ভাষায় যাতে অন্য অঞ্চলের লোকে বুঝতে পারে। খেয়াল করলে দেখা যায়, ওইটা প্রমিত না মোটেও, সবাই বুঝতে পারবে এমন একটা বাংলা।
চাঁটগার বাইরে এই বাংলায় ওনি লেখা শুরু করেন মূলত কবিয়াল রমেশ শীল মাইজভান্ডারীর মৃত্যুর পরে। ওনার মুখেই রমেশ শীলের নাম শুনলাম প্রথম। রমেশ শীলের জায়গাটা ফাঁকা থাকুক ওনি চান নাই।
এসএটিভিতে ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা হারায়ে যাচ্ছে কি না’ এরকম শিরোনামে একটা টকশোতে দেখি, ওনি চাঁটগাইয়ারে আঞ্চলিক ভাষা কইতেও রাজি ছিলেন না। এমনকি চাঁটগাইয়া ভাষাভাষির বাইরে কারো লগে কথা কইতে গেলেও ওনার কথায় চাঁটগাইয়া চলে আসতো। ওনি ঘরে বাইরে চাঁটগাইয়াই বলতেন। চট্টগ্রামের বাইরের কেউ আসলেই কেবল তার কাছাকাছি ভাষায় মাততেন, ঐ লোকের বুঝার সুবিধায়।
ইন্ডিয়ান প্রভাব থেকে নিজেদের ভাষা ও যাপনরে বাঁচাইতে ওনি পদ্মাবতীর মত আরো যা আছে আমাদের অঞ্চলের ক্লাসিক, সেসব নিয়ে নাটক সিনেমা বানাইতে বলেন। সরকারী উদ্যোগ, গবেষণা ও প্রণোদনার আলাপও তুললেন। এবং আমাদের মিডিয়ার কাছে বাংলার মাটি ও মুখ থেকে উঠে আসা ভাষা এবং কালচার যে অবহেলার শিকার হয়ে আসছে সবসময়, এমনকি বাংলার ক্লাসিক সাহিত্যও যে এখনো দূরের ঘটনা হয়ে আছে, সেসব নিয়েও ব্যাপকভাবে অভিযোগ করেন। ওনি হয়ত আরো অনেক কিছুই বলতে চাইছেন, টাইমই দেয়া হয় নাই ওনারে। ওনার কথা যেন তেমন গায়েই মাখলেন না প্রমিতভাষী হোস্ট। তাও যতটুকু বলতে পারছেন, নিজের মাতৃভাষার চর্চা জারি রাখতে বলছেন। চাঁটগাইয়া ভাষা হারায় যাওয়ার প্রসঙ্গে ওনার মত ছিল এমন, সময়ের লগে লগে আব্দুল হালী যেমন কোর্তা ছেড়ে পাঞ্জাবী পরা ধরছেন, ভাষারও এমন স্বাভাবিক বদল তিনি মানতে চাইছেন। ওনার কথা হলো, চর্চায় থাকা কোন ভাষাই হারায় না, যেমন আব্দুল গফুর হালীও কোর্তা ছেড়ে পাঞ্জাবী পরাতে হারায়ে যান নাই। আব্দুল গফুর হালী আব্দুল গফুর হালীই আছেন, আর চাঁটগাইয়া ভাষাও আছে তেমন।
ওনি কৈশোর থেকেই নিজের মাতৃভাষায় গান বানতে শুরু করছিলেন। আসকর আলী পন্ডিত দ্বারা যেহেতু ব্যাপকভাবে প্রভাবিত আছিলেন, আসকর আলী পন্ডিতের মাজারের সামনে দাঁড়ায়েই বলতেছিলেন, সবাই ওনাদের গান গায়, গান গেয়ে বিখ্যাত হয়, কিন্তু গান যাঁর তাঁর নামটাও কেউ নিতে চায় না, এটা ঠিক না। মাজারের দিকে ইঙ্গিত করে গলার স্বর একটু নরম করেই বললেন, আসকর আলী পন্ডিত ত আর টাকা চাইতেছেন না। আবার গানের কথারে যারা বিকৃত করে তাদেরকে মাথায় রেখে ওনি বলেন, কেউ চাইলে গান ত গাইতেই পারে, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করে যুগোপোযোগি করতে পারে কিন্তু মূল যে গান আর সুর ওইটা যেন হারায় না যায় সেটার প্রতি দরদী থাকতে বলেন।
তো, বিভিন্ন আলাপে যা দেখলাম, আব্দুল গফুর হালী খুবই হাসিখুশি, সরল মনের একজন রসিক মানুষ আছিলেন। প্রেমের গান প্রসঙ্গে ওনার কোন প্রেমের মানুষ আছে কি না জানতে চাইলে ওনি হো হো করে হেসে ওঠেন। ওনি বলেন, প্রেম ছাড়া মানুষ মরা কাষ্ঠের সমান। আর ওনার ভিতরে যেই প্রেম এইটা যৌবনের প্রেম ত আছেই, লগে খোদার প্রেমরেই বেশি অনুভবের কথা বললেন। ওনার কাছে গান ইবাদতের মত, আল্লারে পাওয়ার রাস্তা। ওনি ওনার বউরেও এইটা বলে বলেই গানের ব্যাপারে ওনার বাঁধা কাটান। ভাবের জায়গা থেকে বলতেছিলেন, কোন ব্যক্তি মানুসের প্রেম না বরং চট্টগ্রামের যে পাহাড় আর সবুজেঘেরা প্রকৃতি এটাই ওনারে গান লেখায়ে নেয়। একপ্রকার বাধ্য করে। কথাপ্রসঙ্গে ওনি মাওলানা রুমির এলহাম বিষয়ক আলাপও টানেন।
মানুষের হাসি কান্না, গিরস্তের বউ, নৌকা, সাম্পান, মাঝিমাল্লা, এগুলাই ওনার গানের থিম ছিল। ওনার গানের সুর আর কথা উৎসবমুখর বাংলারেই রিপ্রেজেন্ট করে। দুঃখের কথা বললেও সেখানে দুঃখ ব্যক্তিরে উপচায়ে বড় হয়ে উঠে না। ব্যক্তিই বড় থাকে, আর অঙ্গাঅঙ্গিভাবে থাকে প্রেম ও কাম, লগে বাস্তবের যে জমিন তার লগে ঘনরিশতা, এই প্রেমের লগে কামের উপস্থিতি বাংলাদেশী বাংলা গানেরই একটা সাইন।
কয়েকটা গান আপনারাও পড়েন। পরিচিতই। তাও একটু খেয়াল করেন।
…
সোনাবন্ধু
~
সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি রে দিওয়ানা
মনে তো মানে না দিলে তো বুঝে না
সোনাবন্ধুর এমনই গুন জল দিলে নিভেনা আগুন
কী দিয়ে নিভাবো আগুন আমায় একটু বলো না
সোনাবন্ধুর মুখের হাসি যেন পূর্ণিমা শশী
হাসিতে হইলাম পাগল ঘরে থাকতে দিলা না
সোনাবন্ধুর প্রেমের তরী চালাই তারে কেমন করি
পাল তুলিয়া বইসা রইলাম মাঝির দেখা পাইলাম না
…
ঐ লাল কুর্তাওয়ালা
~
রসিক দিলকা জ্বালা
ঐ লাল কুর্তাওয়ালা
দিলি বড় জ্বালারে
পাঞ্জাবী ওয়ালা।
বাবরি কাটা তার চুলের বাহার
মুছকি হাসি হাসি মুখটা যে তার
বন্দু যদি আমার ভ্রমর হইতো
মনেরি বাগানে সে যে মধু খাইতো
খেলতো প্রেমের খেলা
ঐ লাল কুর্তাওয়ালা
দিলি বড় জ্বালারে
পাঞ্জাবী ওয়ালা
মাইনষে বলে তারে কালারে কালা
আমারি কাছে লাগে কতো যে ভালা
কালা গলার মালা
ঐ লাল কুর্তাওয়ালা
দিলি বড় জ্বালারে
পাঞ্জাবী ওয়ালা
রসিক দিলকা জ্বালা,
ঐ লাল কুর্তাওয়ালা
দিলি বড় জ্বালারে
পাঞ্জাবী ওয়ালা
…
মনের বাগানে ফুটিল ফুল রে
~
মনের বাগানে ফুটিলো ফুলরে
রসিক ভ্রমর আইলো না
ফুলের মধু খাইলো না
পিরিতেরো এতো জ্বালা,
বন্দুয়া না জানেরে
বনেরো পাখি যদি হইতাম,
উড়িয়া যাইতাম কাছেরে।
প্রেমিক ছাড়া মনেরো কথারে
সকলেতো বুঝে না
ফুলের মধু খাইলো না
মাঝি থাকিলে কূলেতে বসিয়া
ভাটায় নৌকা চলে না
প্রেমের সাগরে মাঝি না থাকিলে
একলা জীবন কাটেনা।
নারীর যৌবন জোয়ারের পানিরে
আজ আছে কাল থাকে না
চির জীবন থাকে না
মনের বাগানে ফুটিলো ফুলরে
রসিক ভ্রমর আইলো না
ফুলের মধু খাইলো না
…
বাইন দুয়ার দি ন আইশশো তুঁই
~
বাইন দুয়ার দি নো আইশশো তুঁই নিশীরও কালে
মা বাপেরে লাগাই দিবো মাইনষে দেখিলে. …
তুই হইলা সোনার পিঞ্জর ময়না পাখি আঁই
মনে হয় দিনে রাইতে তোঁয়ার ভিতর থাই
ধন মন কিছু নো চাই তোঁয়ারে পাইলে..
মা বাপেরে লাগাই দিবো
মাইনষে দেখিলে. …
তুঁই আর আন্ধার ঘরের পূন্ন মাসি চান
তিলিক মাত্র না দেখিলে বাঁচে না পরান …
অকালে ঝড়িবো ফুল মধু শুকাইলে
মা বাপেরে লাগাই দিবো মাইনষে দেখিলে. …
সারা জনম ওরে বন্ধু রাইখো এ আদর
বানাইলা যখন তোমার পিরিতির কাতর
এ জীবনে নইলে মিলন হইব শেষকালে
মা বাপেরে লাগাই দিবো মাইনশে দেখিলে. .
বাইন দুয়ার দি নো আইশশো তুই নিশিরো কালে
মা বাপেরে লাগাই দিবো মাইনষে দেখিলে. …
…
ওনি একটা নারী স্বরেই যেন গানগুলা লেখছেন। যে পিরীতি ও কামে জরজর। যেমন: লালকোর্তা বা পাঞ্জাবীঅলার বাবরীচুলের প্রেমে পড়ে ওনি গান গাইতেছেন। তারপর ‘মনেরও বাগানে ফুটিল ফুলরে রসিক ভ্রমর আইলো না’, এখানে রসিক ভ্রমরের অপেক্ষা করতেছেন ফুল হয়ে।
আবার, কালার প্রেমে মজে ওনি বলতেছেন, কালা গলার মালা। এই কথা সবাই না মানলেও এই গান শুনলে কালা রঙের যেকারোরই একটা সুখবোধ হয়, কালারে ওনি গলার মালা বলায়, আবার রাধার কৃষ্ণরেও স্মরণে আসে।
ওনার মাইজভান্ডারী গানের একটা লাইন আছে এমন,
“লালনের যেই জাত ছিল, আমিও সেই জাতি।
আমারভাবে আমি জ্বলি, কার কী হয় ক্ষতি।”
মানে, ওনি লালনরে চিনতেন না শুধু, নিজেরেও লালনের লগে মিলায়ে হাজির করছেন। গানের শুরুটা হয় আল্লাহ ও রাসূলের লগে নিজেরে একাত্ম করার ভিতর দিয়ে।
তারপর,
“আর কতদিন খেলবি খেলা, মরণ কি তোর হবে না?”
“কাষ্ঠের উপর চামড়া দিয়া কে বানাইলো ঢোল
সেই ঢোলেরে কে শিখাইলো আল্লা আল্লা বোল”
“নাইওরী নাইয়র হলো শেষ, এইবার চলো নিজের দেশ”
এইখানে বাংলার ঢোল কথা কইতেছে আল্লা বলে। যেই ঢোল হিন্দুয়ানীর চিহ্ন অনেকের কাছে, সেখানে ওনি ঢোলের আওয়াজে আল্লার নাম শুনতেছেন।
আবার নাইওরী নিয়ে যেই গান, বাংলার নারীদের নাইয়র যাওয়ার যেই ছবি চোখে ভেসে ওঠে এটা এত নিজস্ব আমাদের, এই ছবিরে ওনি পরলোকের লগে মিলান, নাইয়র হলো ইহজগত, আর নারীর শশুরবাড়ি পরকালের ইশারা হিসাবে হাজির।
আবার এই আধ্যাত্মিক লাইনের গানগুলার ভাষাও দেখেন, চাঁটগাইয়া না কিন্তু। প্রমিতও না। ওনার মাইজভান্ডারী গান আরো অনেক আছে এমন, যেগুলাতে ওনি নিজের অঞ্চলের গন্ডি উৎরায়ে আরো অনেকের কাছে ভাষার সরল ভঙ্গিমা নিয়ে হাজির হইছেন। এমন হইতে পারে ওনাদের মাইজভান্ডারী ছ্যামাতেই হয়ত দূর দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসতো। যাদের সাথে মাতামাতির ভঙ্গিমাই ছিল এমন সরল ভাষায়।
খেয়াল করলাম, ওনার এইসব গানের সুরও কিন্তু চাঁটগাইয়া গানের সুরের মতই রসোদ্দীপক, আমেজেমুখর। ওনার চাঁটগাইয়া ভাষার চর্চা ছাড়া আমরা এই সুর কিভাবে পাইতাম?
কষা প্রমিতে যদি ওনি বড় হইতেন বা যদি সারাজীবন ওনি চাঁটগার বাইরে যে বাংলায় মাততেন ওই ভাষাতেই গানচর্চা করতেন ওনার ভিতরে এত চমৎকার সুর কতটা আসতো?
ভাষার কাজ হইলো যোগাযোগ। যে কারো মাতৃভাষার ভিত যদি শক্ত হয়, সে যেকোন ভাষাই সহজে রপ্ত করতে পারবে, নিজেরে কানেক্ট করতে পারবে। কিন্তু যেখানে কষা প্রমিত নিজেই কোন অরিজিনাল ভাষা না, একটা কেতাবী ভাষা, সেই ভাষায় নিজের ভাবরে কতটা আঁটানো সম্ভব? এই ভাষায় বড় হওয়া অনেকেই সাহিত্যে আসছে, কিন্তু ভাষার বাঁকবদলের দিনে ওরা আসি আর থই পাইতেছে না, ছ্যারাই ব্যারাই দিতেছে। এইটা থেকে বাঁচতে আমার মনে হয়, আমাদের যেকারোরই নিজেদের ডায়ালেক্টেই নিজেদেরকে পোক্ত করা লাগবে। তারপরে হয়ত আমাদের কমন বাংলার দিকে নিজেরে সামিল করার যে জার্নি ওইটা সুগম হবে। একজন আব্দুল গফর হালীর মত।
আব্দুল গফুর হালী বলেন, কোন জার্মান পন্ডিত এসে ওনার গান নিয়ে রিসার্চ করবে তার জন্যে কিন্তু ওনি লেখেন নাই (রিসার্চ যিনি করলেন তার প্রতি যথেষ্ট আন্তরিকতা নিয়েই ওনি এটা বললেন)। লোকদেখানো ব্যাপার বা বাহবা পাওয়ার জন্যও ওনি লেখেন নাই। ওনি গান লেখছেন নিজের দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য আর অবশ্যই নিজের জন্য। ওনার গানে যদি কেউ রিসার্চ করার মত কিছু পেয়ে থাকে, তবে দেশের ভিতরের কেউ বা বিদেশের কেউ রিসার্চ করতে চাইলে অবশ্যই ওয়েলকাম জানাইছেন ওনি।
আমাদের ভাষার চেহারা নির্মাণে একজন আব্দুল গফুর হালীর অবদান নিয়ে গবেষণা জরুরী। আমরা আমাদের রিয়েল দেশের আইকনদেরকে নিয়ে যত কথা বলব তত ভাষার চেহারা পষ্ট হয়ে ধরা দিবে সবার কাছে।
ফুল্লরা
Latest posts by ফুল্লরা (see all)
- আব্দুল গফুর হালী ও ভাষার চেহারা - August 19, 2026
- মায়া এঞ্জেলোর কবিতা - August 19, 2025
- কবিতার বই থেকে কবিতা: দুই আনা সফর - July 3, 2024