[মার্চ ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি থিকা “স্যার সৈয়দ আহমদের (১৮১৭ – ১৮৯৮) রচনাবলী” নামে একটা বই ছাপানো হয়, যেইখানে উনার ৯টা লেখা অনুবাদ করেন মুজীবুর রহমান। এই লেখাটা অই বই থিকা নেয়া হইছে।]

কতকগুলি কুকুর যখন কোন স্থানে একত্র হয়, তখন প্রথমতঃ ভ্রু-কুঞ্চিত করে একটি অপরটির দিকে বিষদৃষ্টিতে চোখ পাকাতে পাকাতে তাকাতে শুরু করে। তারপর থুত্‌নী থেকে একটু একটু করে গর্জনের শব্দ বের হতে থাকে। তারপর চোয়াল একটুখানি ফাঁক হয়ে যায়, এবং দাঁত দেখা যেতে থাকে। ইতিমধ্যেই কণ্ঠনালী থেকেও শব্দ বের হওয়া শুরু হয়। তারপর গর্দানের লম্বা লোমগুলি খাড়া হয়ে কান পর্যন্ত মিশে যায় — নাক বক্র করে উপরে তুলে নেয়। চোয়াল পর্যন্ত দাঁত বেরিয়ে আসে। মুখ থেকে লালা বের হতে থাকে। তারপর বিকট আওয়াজ করে উঠে খাড়া হয়। অতঃপর একটির উপর অপরটি ঝাপিয়ে পড়ে। এই ভাবে একটির হাত অপরটির গলায়, অপরটির ঠ্যাং প্রথমটির কোমরে, একটির কান অপরটির মুখে। এই ভাবে একে অপরকে কামড়িয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত যে যেখানে পারে, সেখানেই কামড়ে ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করে। অবশেষে দুর্বলটি এক নিঃশ্বাসে পলায়ন করে জান বাঁচায়।

অসভ্য মানুষের মজলিশেও কোন বিষয়ে বিতর্ক বা বাদানুবাদ হলে এমনি অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রথম দিকে শান্ত, নিরীহ, ভদ্রজনের মতো সকলে মিলে-মিশে একস্থানে উপবেশন করে। তারপর চাপাস্বরে কথাবার্তা শুরু হয়। একজনে কোন কথা বললে, অপরজন বাধা দিয়ে বলেঃ আহা, এরূপ নয়, এইরূপ। তখন প্রথম জন বলেঃ আরে তুমি কি জান? দ্বিতীয় জন বলেঃ তুমিই বা কি জান? উভয়ের মধ্যেই বিষ-দৃষ্টি বিনিময় হতে থাকে। ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে যায়। চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। চক্ষুদ্বয় রক্তবর্ণ ধারণ করে। দাঁত বের হয়ে পড়ে। কথার সাথে থুথু উড়তে থাকে। গলা পর্যন্ত কাশ উঠে আসে। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র হয়ে যায়। রগ ফুলে ওঠে। চোখ, নাক, ভুরু—ও হাত বিভিন্ন রকমে নড়াচড়া করতে থাকে। মুখ থেকে কর্কশ আওয়াজ বের হতে থাকে। আস্তিন গুটানো হয়, হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। তারপর একজনের গর্দান অপরজনের হাতের মধ্যে, অপরজনের দাড়ি প্রথম জনের মুঠার মধ্যে। ধ্বস্তাধ্বস্তি প্রবল আকার ধারণ করে। ইতিমধ্যে কেউ যদি মাঝে পড়ে ছাড়িয়ে দেয়, তা’হলে গর্জন করতে করতে একজন একদিকে অপরজন অন্যদিকে চলে যায়। আর যদি মধ্যস্থতা করার কেউ না থাকে, তা’হলে দুর্বলজন পাততাড়ি গুটিয়ে কাপড় নেড়ে মাথা দুলিয়ে নিজের পথ ধরে।

মানুষ যতই বেশী সভ্য হয়ে ওঠে, ততই তাদের মধ্যে বাদানুবাদ ও তর্কবিতর্ক হ্রাস পেতে থাকে। কোথায়ও সামান্য একটু বসচা হয়েই শেষ যায়। কখনো বা মৌখিক বাদানুবাদ বা তুই, তুমি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। আবার কখনো এমন হয় যে, বিষদৃষ্টি বিনিময়, নাকি গর্জন এবং ঘন ঘন শ্বাস নেওয়ার পর্যায় পর্যন্ত উঠেই ভালয় ভালয় সমাপ্তি ঘটে যায়। তবে এর সবগুলি অবস্থার মধ্যেই কিছু না কিছু কুকুরের স্বভাবের প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। সুতরাং, নিজের বন্ধু-বান্ধবের সাথে কুকুরের ন্যায় বসচা ও বাদানুবাদ করা থেকে মানুষের বিরত থাকাই কর্তব্য। কারণ, মানুষের পক্ষে তা সমীচীন নয়।

মানুষের মধ্যে মতনৈক্য অবশ্যই হতে পারে, আর মতামত যাচাইয়ের কষ্টিপাথরও তর্কবিতর্ক ও আলোচনা। আর সত্য বলতে কি, তর্ক-বিতর্কহীন, নিষ্প্রাণ তথা সমালোচনাহীন বন্ধু-বান্ধবের মজলিশই পানসে। তবে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা—যাই করা হোক না কেন, ভদ্রতা, শীলতা, ভালবাসা ও বন্ধুত্ব, এসব কিছুতেই পরিত্যাগ করা উচিত নয়।

হে, আমার প্রিয় দেশবাসী! যখন তোমরা কারো বিরুদ্ধে কোন কথা বলতে চাও, কিংবা কারো কোন কথা খণ্ডন করতে ইচ্ছে কর, তা’হলে ভদ্রতা ও বিনম্র ভাবেই তা করো — নম্রতা ও ভদ্রতাকে পরিত্যাগ করো না। যদি একই বৈঠকে সামনা-সামনি কথাবার্তা হয়, তবে অধিক বিনয়, ভদ্রতার সাথে কথা বলো। চেহারা, উচ্চারণভঙ্গী, আওয়াজ, প্রকাশভঙ্গী এবং প্রয়োগ—সব ব্যাপারই এমনভাবে বজায় রাখবে, যাতে ভদ্রতা ও শিষ্টতা প্রকাশ পায়। তবে ভদ্রতা ও শিষ্টতা যেন আবার কৃত্রিমতায় অর্থাৎ নাটুকেপনায় পর্যবসিত না হয়। নিজের কোন ভুল অপনোদন করার ক্ষেত্রে কথা বলার সময় সর্বদাই সরলভাবে ক্ষমা চেয়ে কথা বলতে হবে। যেমন, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি, আমার ধোকা হয়েছিল অথবা আমি ভুল বুঝেছিলাম — যাহোক, বিষয়টি যদিও ও আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছে, তথাপি আপনার কথার উপর ভরসা করছি। কারো সাথে যদি দুটি তিন দফা কথা কাটাকাটি হয় — তবুও কেউ তার কথা থেকে সরে না দাঁড়ায়, তখন তার সাথে বিতর্ক বাড়ানো উচিত নয়। আপনার কথাটি নিয়ে আমি চিন্তা করবো অথবা পুনরায় আপনার মতটি বিবেচনা করবো — এই ধরনের কথা বলে হাসিখুশীতে বন্ধুত্ব বজায় রেখে বৈঠক শেষ করে দেবে। যার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে, তিনি যদি বন্ধু-ব্যক্তি হন, তাহলে তাকে কথার দ্বারা বা ব্যবহারে এমন নিশ্চয়তা দান করবে যে, তর্ক-বিতর্ক চ্ছলে কথা কাটাকাটির জন্য তোমার মনে বিদ্বেষ বিদ্যমান নেই। অথবা তাকে বুঝতে চেষ্টা করো যে, কথা কাটাকাটির দ্বারা বন্ধুর মনে কষ্ট দেওয়া তোমার আদৌ উদ্দেশ্য ছিল না। কারণ ঝগড়া কিংবা সন্দেহ অধিক দিন টিকে থাকলে ভালবাসা শিথিল হয়ে যায়। এমনকি আস্তে আস্তে (বন্ধুত্ব) সম্পর্কটিই ভেঙ্গে পড়ে। এভাবে এমন একটি প্রিয় জিনিস বন্ধুত্ব হাত ছাড়া হয়ে যায়।

বিভিন্ন মতের লোক একত্র হলে পারতোপক্ষে কলহ, বাদানুবাদ ও বিতর্ককে উপেক্ষা করার চেষ্টা করাই শ্রেয়ঃ। কেননা, বিতর্ক দীর্ঘ হলে উভয় পক্ষের জন্য তা অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন দেখবে যে, বিতর্ক বেড়ে যাচ্ছে, বক্তব্য, বিবৃতি বলার স্বর দ্রুতগতি লাভ করছে, তখন যতদূর সম্ভব শীঘ্র কথা শেষ করে দেবে এবং পরস্পর হাসি-খুশীর কথাবার্তা বলে মন ঠাণ্ডা করে নেবে। আশা করি, আমার দেশবাসী আমার কথাগুলি নিয়ে চিন্তা করবেন। আর, আমাদের বৈঠকগুলিতে তর্ক-বিতর্ক ও বাদানুবাদের পরিণতি কি দাঁড়ায়, তা লক্ষ্য করলেই আমার কথার সত্যতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

The following two tabs change content below.

বাছবিচার

এডিটর, বাছবিচার।