১. বাংলা-ভাষায় লিখিত টেক্সট যখন থিকা পাওয়া যায় মোটামুটি সেই সময় থিকাই বাংলা-সাহিত্যে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রেজেন্স পাওয়া যায়… এবং এমন কোন হিস্ট্রিকাল টাইম নাই – প্রি-কলোনিয়াল, কলোনিয়াল বা মর্ডান – যখন মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়া বাংলা-ভাষায় কোন সাহিত্য রচনা করা হয় নাই! এমনকি এমন কিছু এলিমেন্ট আছে, যেইগুলারে বাদ দিয়া বাংলা-সাহিত্যের ইতিহাস ইনকমপ্লিট থাইকা যাবে!
২. কিনতু তারপরও দেখবেন অন্য অনেক লিটারারি এলিমেন্ট, যেমন – রাধা-কৃষ্ণের লীলা, দেবী-বন্দনা বাংলা-সাহিত্যের ‘মূল উপাদান’ হিসাবে যতটা হাইলাইটেড হয়, নবী’র গুনগান, কারবালার কাহিনি’র মতো এলিমেন্টগুলারে ততটাই এড়ায়া যাওয়ার এবং ‘আদার’ কইরা রাখার টেনডেন্সি আছে…
৩. মেইনলি ৩টা পদ্ধতিতে এই কাজ করা হয় –
ক. এলিমেন্ট হিসাবে ‘ইসলামি সাহিত্য’ বইলা আলাদা ধরনের কেটাগোরাইজেশন করা, যেইটা ঠিক ‘বাংলা-সাহিত্য’ না 🙂
খ. সাহিত্যের ফরম্যাটগুলারে – যেমন, পুঁথি, জারি-গান, হামত-নাত… ইনফিরিয়র ও ‘আদার’ হিসাবে মার্ক করা, যেইগুলারে ফর্ম হিসাবে গুরুত্ব দেয়া যাবে না 🥱
গ. এবং সবচে ভয়াবহ হইতেছে, ‘পুনরাবিস্কারের’ ভিতর দিয়া অই জায়গাগুলারে ‘প্রাচীন’ ও ‘দৃুরবর্তী’ ঘটনা হিসাবে দূরে সরায়া রাখা, এবং প্রি-মডার্ন ঘটনা বইলা পারসিভ করা হয়… আনিসুজ্জামান’রা ‘মুসলিম সাহিত্য’ আবিস্কার করার নামে বাংলা-লিটারেচারে এই পারমানেন্ট ড্যামেজ কইরা দিয়া গেছেন! 🙁 [এই বিষয়ে আরো ডিটেইল কথা বলার তো দরকার আছে, সেইটা আলাদা একটা বড় আলাপ-ই হবে, কারন এইটা ক্রূশিয়াল একটা জায়গা…]
৪. যেই কারনে দেখবেন, ‘আধুনিক’ বাংলা-সাহিত্যে নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিয়া কিছু লেখা যায়-না না, বরং অই টেক্সটগুলা বেশিরভাগ সময়ই বাংলা-ভাষার ম্যাস অডিয়েন্সের লগে কানেক্ট করতে পারে না… ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী-সহ অনেক কবি’রাই এনাফ দরদ দিয়া নবী’রে নিয়া লেখছেন, কিনতু বেশিরভাগ লেখা-ই তেমন কোন স্পেইস তৈরি করতে পারে নাই; একসেপশন যে নাই – তা না, কিনতু আমি গড় টেনডেন্সিটার কথা বলতেছি এইখানে…
এবং আমি মনে করি এইটা হওয়ার একটা মেজর কারন হইতেছে আগের পয়েন্টে যেই সাহিত্য-ধারনার কথা বলছি, সেইখানে ‘ইমান’ রাখা! এখন আপনার ধারনার বেইজ বা পাটাতন’টা তো জরুরি – কারন, পানিতে তো আপনি হাঁটতে পারবেন না, মাটিতে তো আপনি সাঁতরাইতে পারবেন না! আপনি যদি মনে-ই করেন ‘ইসলাম’ মানে হইতেছে ‘নন-বেঙ্গলি’ একটা ঘটনা, আপনি অই জায়গা থিকাই তো কানেক্ট করতে চাইবেন, আর কখনোই সেই মিলের সুতা’টারে ধরতে পারবেন না! এবং এই ধরনের ফেইলড এক্সাম্পলের সংখ্যাই বেশি!
৫. তো, যেইটা বলতেছিলাম, এইখানে একটা গ্রেট একসেপশন হইতেছেন – কাজী নজরুল ইসলাম! বাংলা-ভাষায় নবী-প্রেমের পপুলার ও এসথেটিকালি একসেপ্টেড যত টেক্সট আছে, তার অর্ধেকেরও বেশি উনার লেখা! এর একটা কারন হইতেছে নজরুল কলোনিয়াল পিরিয়ডের সংস্কৃতাসাইজড বাংলা’রে বেইজ ধইরা উনার সাহিত্য রচনা করেন নাই, ফেক্সিবল হইতে পারাটারে উনি দরকারি কাজ মনে করছেন! উনি এর বদলে অন্য কোন বেইজও ফরমুলেট করতে পারেন নাই, কিনতু উনি অই জায়গা থিকা পিছলায়া গেছেন, এবং পিপলের রুচি’রে হেইট না কইরা তার উপর ভরসা রাইখা কাজ করে গেছেন… মানে, একটু উপরে থিকা উনি পিপল’রে নসিহত করেন নাই, বরং পিপলের পোয়েট হিসাবে উনাদের কাতারে দাঁড়ায়া কথা বলার একটা রীতি রপ্ত করতে পারছিলেন! তো, সাহিত্য খালি টেকনিক ও আইডিওলজির ঘটনা না, কিনতু এই জিনিসগুলার কোন ইমপ্যাক্ট যে সাহিত্যের উপর থাকে না – এইটাও ঠিক না! তো, সাহিত্য-বিচারে আইডিওলজিকাল মাস্কিং এই ক্ষেত্রে লিটারারি আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের জায়গাটারে পোক্ত করার চাইতে এক ধরনের লিমিটেশনের ভিতরেই ঠেইলা দেয় বেশি!
৬. এইক্ষেত্রে সবচে হার্মফুল রোল প্লে করছে এক ধরনের সিউডো-মার্কসিস্ট সাহিত্য-ধারনা, যেইটা বাংলা-ভাষায় জাস্ট মর্ডানিটিরই একটা এক্সটেনশন, এবং অই মর্ডান-সেকুলার কনটেক্সটে যেহেতু যে কোন ‘ধর্ম-ভাব’ই প্রি-মর্ডান ঘটনা, এই কারনে ঘটনাগুলা ‘প্রাচীন’-ই না খালি, বরং ‘আধুনিক সাহিত্য’ করতে গেলে পুরাপুরি ‘পরিত্যাজ্য’ ঘটনা! এবং যেহেতু ‘আধুনিক সাহিত্য’রেই আমরা ‘মেইন-স্ট্রিম’ বানায়া রাখছি, অই ন্যারো জায়গাটাতে নবী-প্রেমের ট্রেডিশন’টারে আমরা খালি ইগনোরই করি নাই, অই ইগনোর করার বাইরে ‘পশ্চাতপদতা’ বইলা হেইট করতেও শিখছি! আমি বলতে চাইতেছি, এইখানে আন-স্পোকেন একটা বেরিয়ার ছিল, বা এখনো আছে টু সাম এক্সটেন্ড, যেইটা নবী-প্রেমের টেক্সটগুলারে একটা ন্যারো গ্রাউন্ড থিকা দেখে, এবং অই জায়গাগুলারে এপ্রিশিয়েট করতে ও একটা মেইন-স্ট্রিম সাহিত্য-ধারা হিসাবে রিকগনাইজ করাটারে ঠেকায়া রাখে!
৭. কিনতু গত ৩০-৪০ বছরে, দুনিয়াতে পলিটিকাল মার্কসিজমের ফেইলওরের পরে, বা বলা যায় তারও আগে গ্লোবালি ১৯৬০-এর দশকে মার্কসিজমের ক্রিটিকাল রিডিং চালু হওয়ার পরে, এবং সাঈদের ওরিয়েন্টালিজমের বদহজম হিসাবে এক ধরনের ভ্যাকুয়াম তৈরি হইতে শুরু করছে, যার সাইড-এফেক্ট হিসাবে ও অন্যান্য জিও-পলিটিকাল কারনেও ‘ইসলামি-সাহিত্য’ বইলা একটা জিনিস রিভাইব করতে শুরু করছে, আর এইটাও প্রবলেমেটিক একটা ঘটনাই! মানে, এই যে থট প্রসেস – বাংলায় একটা ইসলামিক ট্রেডিশন আবিস্কার করা – এই পলিটিকাল প্রজেক্ট আর্ট-কালচারের জায়গাতে লং রানে প্রবলেমই ক্রিয়েট করার কথা… এইটা নাই – তা না, কিনতু পলিটিকাল এফিলিয়েশনটারে সাহিত্য-বিচারের মানদন্ড হিসাবে নিলে সেইটা সাহিত্যের কোন ভালো তো করতে পারে-ই না, পলিটিকসের পারপাসও ভালো-ভাবে সার্ভ করতে পারার কথা না! যার ফলে, এইরকমের ‘পুনরাবিস্কারের’ ঘটনাগুলা নতুন কিছু রেফারেন্সরে সামনে নিয়া আসতে পারলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবস্টেকল হিসাবেই হাজির থাকে!
৮. মানে, সামাজিক-সত্য, ঐতিহাসিক-সত্যের বাইরেও এক ধরনের সাহিত্যের সত্য বইলা একটা জায়গা আছে! এসথেটিকস বা সৌন্দর্য্য একটা বাড়তি জিনিস না, বরং দরকারি একটা ঘটনা! বাংলা-ভাষায় এবং বাংলাদেশি সাহিত্যে অই এসথেটিকাল জায়গাগুলারে পিপলস-আর্টের জায়গা থিকা রি-বিল্ড করা, রি-লোকেট করা এবং নতুন-ভাবে তৈরি করার জায়গাটা এখনো পেইন্ডিং আছে আসলে!
৯. আর অই জায়গা থিকা আমি কয়েকটা এক্সাম্পল কম্পাইল করলাম এইখানে… এইগুলা ঠিক কোন পারসোনাল চয়েসের ঘটনা না, বরং লিটারারি আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের রেজাল্ট হিসাবে অবজারভ করার জন্য বলবো আমি! মানে, সংজ্ঞা দিয়া, ব্যাখ্যা দিয়া সাহিত্য-ধারনা তৈরি করা যায় না – তা না, কিনতু আমি মনে করি, এক্সাম্পলগুলা ইম্পর্টেন্ট, এবং কোন কোন পারসপেক্টিভ থিকা এক্সম্পালগুলারে নেয়া হইতেছে বা বাদ রাখা হইতেছে – সেই বিচার-বিবেচনা থিকা ব্যাখ্যাগুলারে লোকেট করতে পারলে বেটার! এইখানে কিছু ধারনা নাই যার বেসিসে আর্ট তৈরি হইতেছে, বরং আর্টের বেসিসেই আর্টের ধারনাগুলা তৈরি হইতেছে ও সবসময় ইভলব করতেছে আসলে!
তো, সাহিত্য যত পুরান হবে, তত এক্সপ্লেইন করার দরকার আসলে কমে, যেমন ধরেন, যেই জিনিস ১০০ বা ২০০ বছর পার হইয়াও টিকে আছে – শাহ মুহাম্মদ সগীর, লালন ফকির, হাছন রাজা, ইভেন কাজী নজরুল ইসলাম সেইখানে তাদের লিটারারি সিগনিফেন্স নিয়া নানান রকমের ডিবেট থাকতে পারে, কিনতু সাহিত্য হিসাবে তাদের কোন সিগনিফিকেন্স নাই – এইটা বলাটা মুশকিলই হবে… তারপরে যাদের লেখা দুই-একটা জেনারেশন পার হইছে, যেমন গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, উনাদের আর্ট-ওয়ার্কগুলা এখনো তাজা-ই আছে অনেকটা, কিনতু উনাদের কাজের বা তারপরের আবিদ আজাদ ও হাসান রোবায়েত’রে নেয়ার কারন হইতেছে তাদের কবিতাতে যে ‘বাংলাদেশি’ ভাইব’টা আছে সেইটারে রিকগনাইজ করা… মানে, এই নিয়া আরো ডিটেইল আলাপ তো আছেই!
সবচে জরুরি যেই লিমিটেশন এইখানে আমি কিছু জিনিস এসারশন-ই করতেছি, ফ্যাক্ট ও টেক্সট-বেইজড উদাহারন দিয়া বলতে পারলে বলার জায়গাটা আরো জোরদার হইতো, কিনতু সেইটা তো আসলে একটা ডিটেইল স্টাডি’র ঘটনাই! এইখানে জাস্ট পয়েন্টগুলারে মেনশন করে রাখতে চাইতেছি, যেইগুলা আরো ইলাবরেট করা এবং এভিডেন্সের বেসিসে রিভিউ করাটা জরুরি, একটা ফাইনাল আরগুমেন্ট হিসাবে একসেপ্ট করার আগে!
এর বাইরে আরো অনেকের লেখাই এইখানে ইনক্লুড হইতে পারে – সৈয়দ সুলতান (১৫৫০ – ১৬৪৮), আলাওল (১৬০৭ – ১৬৮০), শেখ চান্দ (১৬৫০ – ১৭২৫), উকিল মুন্সি (১৮৮৫ – ১৯৭৮), ফররুখ আহমদ (১৯১৮ – ১৯৭৪), আল মাহমুদ (১৯৩৬ – ২০১৯), আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩ – ২০২৩), ক্বারী আমিরউদ্দিন (জন্ম ১৯৪৩)… ইভেন আমি নিজেও তো কিছু জিনিস লেখছি…
আর বাংলা-ভাষার সব লেখা তো আমি পড়ি নাই, বা গদ্যও এইখানে ইনক্লুড করা যাইতে পারে (বিষাদ সিন্ধুর শুরুতে খুব সুন্দর একটা বর্ননা আছে, বিশ্বনবী, মোস্তফা-চরিত আরো অনেক বই আছে…), এবং সবকিছু মিলাইলে বেশ ভালো একটা এন্থোলজি হইতে পারে এই বিষয়ে, যেইখানে মিনিমাম ২০-২৫ জন রাইটারের ডাইভারসিফাইড টেক্সট আমরা পাইতে পারি, যেইটা বাংলা-ভাষায় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রেজেন্সের যেই ইউনিকনেস, সেইটারে আরো স্পস্ট করতে পারবে… আমি জাস্ট এইখানে একটা হিন্ট দেয়ার কাজটাই করে রাখলাম, একটা ইন্ট্রো হিসাবে…
তো, ফিউচারে যারা এই কাজটা করতে যাবেন, তাদেরকে আমি রিকোয়েস্ট করবো জাস্ট লিস্টিং কইরেন না, সাহিত্য বা আর্টের জায়গাটারে সেন্টার কইরা ভাইবেন, এমনকি চিন্তা ও আইডিয়ার বেসিসেও এক্সম্পাল নিতে পারেন, কিনতু যে কোন বেসিস থিকা একটা বাছাই করতে পারলে বেটার, ভু্ল হইলেও মিনিংফুল একটা জিনিস হইতে পারবে সেইটা… আমার’টার মতো! 🥱
ইমরুল হাসান
অগাস্ট, ২০২৬
…
শাহ মুহাম্মদ সগীর (১৩০০-১৪০০)
লালন ফকির (১৭৭২ – ১৮৯০)
হাছন রাজা (১৮৫৪ – ১৯২২)
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ – ১৯৭৬)
গোলাম মোস্তফা (১৮৯৮ – ১৯৬৪)
জসীমউদ্দিন (১৯০৩ – ১৯৭৬)
সিরাজুল ইসলাম (১৯৩০ – ২০০২)
আবিদ আজাদ (১৯৫২ – ২০০৫)
হাসান রোবায়েত (জন্ম. ১৯৮৯)
…
শাহ মুহাম্মদ সগীর (১৩০০-১৪০০)
ইউসুফ-জুলেখা
জীবাত্মায় পরমাত্মা মোহাম্মদ নাম।
প্রথম প্রকাশ তথি হৈল অনুপাম॥
জগত ইতি জীব আদি হৈল ত্রিভুবন।
মোহাম্মদ হোতে কৈলা ত্রিভুবন॥
নিরঞ্জন আকারেত প্রেমে সে মজিলা।
এহি লক্ষ্যে জগত জীব সৃজন করিলা॥
পরম ঈশ্বর তানে বুলিলেক বন্ধু।
.
এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবিকুল।
মোহাম্মদ তান মধ্যে প্রধান আদ্যমূল॥
তান গুণ কীর্তি কথ কহিমু বাখান।
বিস্তারিয়া না লিখিলুঁ অল্প সমাধান॥
…
লালন ফকির (১৭৭২ – ১৮৯০)
তোমার মত দয়াল বন্ধু আর পাব না
তোমার মত দয়াল বন্ধু আর পাব না।
দেখা দিয়ে ও হে রসুল ছেড়ে যেও না।
তুমি হে খোদার দোস্ত
অপারের কাণ্ডারী সত্য,
তোমা বিনে পারের লক্ষ্য
আর দেখা যায় না।
আমরা সব মদিনাবাসী
ছিলাম যেমন বনবাসী
তুমি আসায় জ্ঞান পেয়েছি
আছে সান্ত্বনা।
আসমানি আইন দিয়ে
আমাদের সব আনলে রাহে
আজকে মোদের ফাঁকি দিয়ে
ছেড়ে যাবে না।
তোমা বিনে এরূপ শাসন
কে করবে আর দীনের কারণ
লালন বলে, আর তো এমন
বাতি জ্বলবে না৷।
…
হাছন রাজা (১৮৫৪ – ১৯২২)
রূপ দেখিলাম রে নয়নে
রূপ দেখিলাম রে নয়নে আপনার রূপ দেখিলাম রে।
আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল মোরে।
আয়নার মাঝে যেমন মুখ দেখা যায়।
সেই মতে আমার রূপে দেখা দিল আমায়।
আমারে দেখিলাম আমি আমার সাক্ষাতে।
দিলের চক্ষে পরিচয় করিলাম আমার জাত।
নূরের বদন আমার ঝলমল ঝলমল করে।
নিজ রূপ দেখিলে আর জন্ম না পাব রে।
হাছন রাজা দেখল রূপ হইয়া ফানা ফিল্লাহ।
এক বিনে দুই নাই কেবলই ইল্লাল্লাহ।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কর মনে সায়।
মোহাম্মদ রসুল উল্লাহ কারবা যে পায়।।
…
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯ – ১৯৭৬)
তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে
যেন ঊষার কোলে রাঙা-রবি দোলে।।
কূল মখ্লুকে আজি ধ্বনি ওঠে, কে এলো ঐ
কলেমা শাহাদাতের্ বাণী ঠোঁটে
খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে,
আকাশ-গ্রহ-তারা পড়ে লুটে,
পড়ে দরুদ ফেরেশতা, বেহেশতে সব দুয়ার খোলে।।
মানুষে মানুষের অধিকার দিল যে-জন
‘এক আল্লাহ্ ছাড়া প্রভু নাই’ কহিল যে-জন,
মানুষের লাগি’ চির-দীন্ বেশ ধরিল যে-জন
বাদশা ফকিরে এক শামিল করিল যে-জন
এলো ধরায় ধরা দিতে সেই সে নবী
ব্যথিত-মানবের ধ্যানের ছবি
আজি মাতিল বিশ্ব-নিখিল মুক্তি-কলোরোলে।।
ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ
ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ
এলো রে দুনিয়ায়
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস
দেখবি যদি আয় ॥
ধূলির ধরা বেহেশতে আজ
জয় করিলো দিলো রে লাজ
আজকে খুশির ঢল নেমেছে
ধূসর সাহারায় ॥
দেখ আমিনা মায়ের কোলে
দোলে শিশু ইসলাম দোলে
কচি মুখে শাহাদাতের
বাণী সে শোনায় ॥
আজকে যত পাপী ও তাপী
সব গুনাহের পেল মাফি
দুনিয়া হতে বে-ইনসাফী
জুলুম নিল বিদায় ॥
নিখিল দরূদ পড়ে ল‘য়ে নাম
সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম
জ্বীন পরী ফেরেশতা সালাম
জানায় নবীজির পায় ॥
মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে
মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে।
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান, (ওরে) এমন মধুর লাগে।।
ওরে গোলাপ নিরিবিলি
নবীর কদম ছুঁয়েছিলি —
তাঁর কদমের খোশবু আজো তোর আতরে জাগে।।
মোর নবীরে লুকিয়ে দেখে
তাঁর পেশানির জ্যোতি মেখে,
ওরে ও চাঁদ রাঙলি কি তুই গভীর অনুরাগে।।
ওরে ভ্রমর তুই কি প্রথম
চুমেছিলি তাঁহার কদম,
গুন্গুনিয়ে সেই খুশি কি জানাস্ রে গুল্বাগে।।
হেরা হতে হেলে দুলে
হেরা হতে হেলে দুলে নুরানী তনু
ও কে আসে হায়
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা খুলে খুলে যায়
সে যে আমার কামলিওয়ালা কামলিওয়ালা।
তার ভাবে বিভোল রাঙা পায়ের তলে
পর্বত জঙ্গম টলমল টলে
খুরমা খেজুর বাদাম জাফরানী ফুল
ঝরে ঝরে যায়।
আসমানে মেঘ চলে ছায়া দিতে
পাহাড়ের আঁসু গলে ঝরণার পানিতে
বিজলী চায় মালা হতে
পূর্ণিমা চাঁদ তার মুকুট হতে চায়।
সাহারাতে ফুটলরে ফুল রঙ্গীন গুলে-লালা
সাহারাতে ফুটলরে ফুল রঙ্গীন গুলে-লালা
সেই ফুলেরই খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা।।
সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ-সুরুয, গ্রহ-তারায়
ঝুঁকে পড়ে চুমে সে ফুল নীল গগন নিরালা।।
সেই ফুলেরই রওশনীতে আরশ কুর্শী রওশন,
সেই ফুলেরই রং লেগে আজ ত্রিভুবন উজালা।।
সেই ফুলেরই গুলিস্তানে আসে লাখো পাখী,
সে ফুলেরে ধরতে বুকে দোলে রে ডাল-পালা।।
চাহে সে ফুন জীন ও ইনসান হুর পরী ফেরেশতায়,
ফকির দরবেশ বাদশাহ চাহে করতে গলে মালা।।
চেনে রসিক ভোমরা বুলবুল সেই ফুলের ঠিকানা,
কেউ বলে হযরত মোহাম্মদ কেউ বা কমলীওয়ালা।।
…
গোলাম মোস্তফা (১৮৯৮ – ১৯৬৪)
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা
সালাওয়া তুল্লা আলাইকা।।
তুমি যে নূরের নবী
নিখিলের ধ্যানের ছবি
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি।।
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা
সালাওয়া তুল্লা আলাইকা।।
চাঁদ সুরুজ আকাশে আসে
সে আলোয় হৃদয় না হাসে
এলে তাই হে নব রবি
মানবের মনের আকাশে।।
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা
সালাওয়া তুল্লা আলাইকা।।
তোমারি নূরের আলোকে
জাগরণ এল ভুলোকে
গাহিয়া উঠিল বুলবুল
হাসিল কুসুম পুলকে।।
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা
সালাওয়া তুল্লা আলাইকা।।
নবী না হয়ে দুনিয়ার
না হ’ইয়ে ফেরেশতা খোদার
হয়েছি উম্মত তোমার
তার তরে শোকর হাজারবার।।
ইয়া নবী সালাম আলাইকা
ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা
ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা
সালাওয়া তুল্লা আলাইকা।।
…
জসীমউদ্দিন (১৯০৩ – ১৯৭৬)
মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়
মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়
সালাম আমি করবো গিয়ে নবীরও রওজায়
আরব সাগর পারি দেব নাই যে আমার তরী
পাখি নয় তো উড়ে যাব ডানাতে ভর করি
আশা আছে সম্বলও নাই করি কি উপায়
মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়
কাফেলাতে কে যাও তুমি
কে যাও বাইয়া তরী
আমায় যাওনা ও ভাই সঙ্গে লইয়া
খানিক কৃপা করি
আমায় যদি সঙ্গে না নাও নবীর মদিনায়
আমার সালাম দিও ভাই রে মদিনার বাদশায়
আমার হইয়া কান্দি ও ভাইরে নবীরও রয়জায়
মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়
…
সিরাজুল ইসলাম (১৯৩০ – ২০০২)
নবী মোর পরশমনি
নবী মোর পরশমনি
নবী মোর সোনার খনি
নবী নাম জপে যে জন
সেই তো দোজাহানের ধনী ॥
সে নামে মধুমাখা
সে নামে জাদু রাখা
সে নামে মজনু হইলো
মাওলা আমার কাদের গনি ॥
নবী মোর নূরে খোদা
তার তরে সকল পয়দা
আদমের কলবেতে
তারই নূরের রওশানি।
ও নামে সুর ধরিয়া
পাখি যায় গান করিয়া
ও নামে আকুল হয়ে
ফুল ফোটে সোনার বরণী ॥
চাঁদ সুরুজ গ্রহ তারা
তারই নূরের ইশারা
নইলে যে অন্ধকারে
ডুবিত এই ধরণী।
নিদানে আখেরাতে
ত্বরাইতে পুলসেরাতে
কাণ্ডারী হইয়া নবী
পার করিবে সেই তরণী ॥
…
আবিদ আজাদ (১৯৫২ – ২০০৫)
আমার রসুল
আমাকে গুঁড়ো-গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিলে না কেন
আমার রসুলের রোজার খেজুরে?
কেন দাঁড় করিয়ে রাখলে না আমাকে
সেই কিশোর রাখালের ক্লান্তি ও স্বপ্নের পাশে
মরুদ্যানের দিক থেকে ছুটে আসা হাওয়ার মতো?
তাঁর উদয় ও অস্তের সকল মেষ ও ভেড়ার ভিতর দিয়ে বয়ে যেতাম
আমি উট ও কাফেলার ঘণ্টাধ্বনি হয়ে তাঁবুর বিয়াবানে।
আরবের বুকের তাপ, জ্বর ও যন্ত্রণা শুষে নেওয়ার জন্য
আমাকেই পাঠালে না কেন ভোর ও মেঘের হাওয়ায়?
হে আল্লাহ সেই ভোরগুলো কি তোমারই পোষ্য ছিলো না?
সেই মেঘগুলো কি তোমারই আজ্ঞাবহ ছিলো না প্রভু?
আমার রসুল আঁজলায় তুলে নিলেন বিষাক্ত মরীচিকা
পান করলেন দুশমনের পাঠানো ঝড়, যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতি।
তুমি আমার রক্ত ছেঁকে পাঠালে না কেন
তাঁর অজুর জন্য একগণ্ডুষ পানি?
তাঁর হিজরতের আগেই আমি হতাম যদি
মদিনার আকাশের বাঁকা চাঁদ!
তাঁর পা কাঁটায় ব্যথিত হবার আগেই আমি কেন তোমার দয়ায়
ছোট ছোট ফুল হয়ে ফুটে উঠলাম না তাঁর ব্যথার চারায়?
তিক্ত মরুভূমির তৃষ্ণার্ত কাঁটাগাছে?
হে আল্লাহ তোমার ধু ধু বালি ও দুঃখের সঙ্গে মিশিয়ে
আমার আত্মাকে কেন প্রবাহিত করে দিলে না আপেলে-আঙুরে,
শুকনো রুটি ও উষ্ট্রীর দুধে?
আমার আয়ু কেন হলো না
তাঁর কপালের ঘাম-মোছার ছিন্ন টুকরা বস্ত্র?
আর আমার কবিতা স্পর্শ করতে পারত যদি
হেরা-পর্বতের ব্যক্তিগত গুহার একাকিত্ব ও আর্তনাদ!
হে আল্লাহ তুমিই মাবুদ, আর আমের বউল হয়ে আমার বুকে আছেন আমার দুঃখের রসুল।
…
হাসান রোবায়েত (জন্ম. ১৯৮৯)
ভাষা
রসুল, তোমাকেই যেন ডেকে উঠি চিরকাল বাংলা ভাষায় –
…………….
অ্যাড অন:
ইমরুল হাসান (জন্ম ১৯৭৫)
নোও দাইসেলফ (Know Thyself)
.
আমরা কি জানি না?
আমরা তো জানি।
আমাদের জানা-বোঝা-ই দেখি
আমরা বানায়া রাখে আমাদেরকে
আমরা কুয়াশায় হাঁটি
আমরা টের পাই বাতাস
চেইঞ্জ হইতেছে ধিরে ধিরে
বাতাস আইসা থাইমা থাকতেছে
একটা মোমেন্টে আমাদের দমে
আমরা জানি, আমাদের জানা’রে
পুরাপুরি জানতে পারতেছি না আমি
দমে দমে দম ফেলার-ই ফুসরত নাই
দমে দমে মনরে বলি, বলো,
“লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…”
দম ফুরায়া যায়, আমাদের জানা শেষ হয় না
আমাদের হিউম্যান নলেজের সীমানা –
দ্বীনের নবী মোস্তফা,
তার রাস্তায় ধুলা-বালির মতো আমরা হারায়া যাই;
আমরা কি জানি না?
আমরা জানি যে, আমরা জানি না!
“লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…”
/২০২৪
…
Latest posts by ইমরুল হাসান (see all)
- ইয়া নবী সালাম আলাইকা - September 11, 2026
- ফুলবাড়ীর রাজনীতি (২০০৮) বইয়ে মাহমুদুর রহমানের আরগুমেন্টগুলা কি কি? - August 26, 2026
- কথা বলার স্মৃতি: ইচক দুয়েন্দে (২০২৪) - May 23, 2026