[গল্পটা আবদুল মান্নান সৈয়দের “গল্প সংগ্রহ” (২০১২) বইয়ের ১৬৯ – ১৭৬ পেইজ থিকা নেয়া হইছে…]

সামনেই বইমেলা আসছে।

আজ সকালবেলাতেই নাশতা খেয়ে, বেবি-ট্যাক্সি ধরে, বাংলাবাজারে চলে এসেছেন অধ্যাপক কাজী আজিজুর রহমান। একটু বেলা হলেই যা জ্যাম হয় রাস্তায়। বিশেষ করে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত যেতে-আসতে তো প্রাণান্তকর অবস্থা। এসব তাঁর রোজকার অবস্থা। গ্রীন রোড থেকে কবি নজরুল কলেজে আসতে-যেতে হয় তাঁকে নিয়মিত।

এখন অবশ্য পুজোর ছুটি। কলেজ বন্ধ।

প্রেসে পুরোদমে কাজ চলছে। প্রকাশকরা এখন সচেতন হয়ে উঠেছেন। বইমেলার আগেই বই বের করে দিতে হবে।

অধ্যাপক কাজী আজিজুর রহমানের বড় একটি বই বেরোচ্ছে। ‘নজরুল-জীবনী’। কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী। এর আগে তাঁর আর-একটি বই বেরিয়েছে। ‘রবীন্দ্র-জীবনী’। বেশ কয়েক বছর আগে বেরিয়েছিল বইটি। সেটা প্রকাশ করেছিলেন বিখ্যাত প্রকাশনসংস্থা ‘বিনোদন’। ‘বিনোদন’-এর জাহাঙ্গীর হোসেন শাহেব।

অনেকদিন থেকে নজরুল-জীবনী লিখবার তাগিদ দিচ্ছিলেন জাহাঙ্গীর শাহেব। কাজী আজিজুর রহমানের নিজের দিক থেকেও তাগাদা ছিল। কবি নজরুল ইসলামকে মনে হয় অলৌকিক এক প্রতিভা। কোথেকে কীভাবে যে তিনি ঐসব কবিতা-গান লিখেছিলেন, ভাবা যায় না। তারপর জটিল জীবন। তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না ঠিকমতো। অনেকদিন থেকে একটু একটু কাজ করছিলেন। খানিকটা হঠাৎই তাঁর হাতে অভাবনীয়ভাবে আসে কবি নজরুলের একটি পাণ্ডুলিপি। দার্জিলিঙে বসে একটি খাতায় কবি নজরুল এই কবিতাগানগুলি লিখে দিয়েছিলেন জাহানারা চৌধুরীকে। জাতীয় জাদুঘরের প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. এনামুল হক ভালোবেসে অধ্যাপক কাজী আজিজুর রহমানকে এই পাণ্ডুলিপির একটি ফটোস্ট্যাট কপি ব্যবহার করতে দিয়েছেন। কাজী আজিজুর রহমান নজরুল-জীবনী লিখছেন, অনেককাল ধরে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন—তা জানতেন ড. এনামুল হক।

হঠাৎ একদিন আজিজুর রহমানের বাসায় এসেছিলেন ‘বিনোদন’ প্রকাশনসংস্থার কর্ণধার জাহাঙ্গীর হোসেন। একটি কাজ নিয়ে। একটি রান্নার বই বের করছেন তিনি। তার ভাষা দেখে দিতে হবে। টাকার জন্যে এরকম বেশ কিছু কাজ করতে হয়েছে অধ্যাপক কাজী আজিজুর রহমানকে। নোটবইও লিখেছেন প্রথম জীবনে। আরো সব কত কী! উপায় নেই। ক’টি টাকা মাইনে পান? ভাগ্যিশ, বাংলাটা ভালো জানেন। বেশির ভাগ ‘বিনোদন’এরই বই। জাহাঙ্গীর শাহেব তাঁর ওপর নির্ভর করেন।

যাই হোক, নজরুলের ঐ দার্জিলিঙে-লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখে জাহাঙ্গীর হোসেন এবারই বইমেলায় ‘নজরুল-জীবনী’ দিতে হবে, জানিয়ে দেন কাজী আজিজুর রহমানকে।

সেই বইএরই প্রুফ দেখা চলছে।

প্রথম প্রুফ দেখে দিয়েছেন একজন। দ্বিতীয় প্রুফ থেকে নিজেই দেখছেন কাজী আজিজুর রহমান। ভিতরে ভিতরে পরে-পাওয়া অনেক ম্যাটার ঢুকিয়ে দিতে হচ্ছে। বড় বই হবে। ২৫ ফর্মার কম না।

কাজী আজিজুর রহমান ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। ঠাণ্ডা মাথা নাহলে সেটা সম্ভব হতো না। পৈতৃক বাড়ি আছে। ভাড়া দিতে হয় না, পুত্রসন্তান তিনি একাই—আর চার বোন। কষ্ট করেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করছেন—ছেলে ডাক্তারি পড়ছে ফাইনাল ইয়ারে, মেয়ে ফিলসফিতে এম.এ. পাশ করেছিল, তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ডাক্তারি পাশ করে গেলে আর তাঁর চিন্তা নেই। হোস্টেলে গেলে সুবিধা বলে এখন হোস্টেলে চলে গেছে। বাড়িতে ওঁরা স্বামী-স্ত্রী একা থাকেন। মেয়ে-জামাই আসে মাঝে মাঝে। ছেলেও দেখা করে প্রায়ই।

বেলা এগারোটার দিকে জাহাঙ্গীর হোসেন এলেন। তাঁর রুমে, তাঁর টেবিলে বসেই কাজ করছেন কাজী আজিজুর রহমান।

এসেই চা-বিস্কুটের ফরমাশ দিলেন।
‘নজরুল-জীবনী’র প্রচ্ছদ হয়ে গেছে। বের করে দেখালেন।
দেখে মুগ্ধ হলেন কাজী আজিজুর রহমান। চমৎকার প্রচ্ছদ।
‘কে করেছেন?’
‘ধ্রুব। ধ্রুব এষ।’ বললেন জাহাঙ্গীর হোসেন।
‘বাহ! চমৎকার!’ কাজী আজিজুর রহমান বললেন। ‘নজরুল-জীবনী’ বইটি, তিনি বিশ্বাস করেন, ভালো হবে। সারাজীবন তো সংসার চালাতে উঞ্ছবৃত্তি করতে হয়েছে। এই একটা কাজ ভালো করে করেছেন। আশা করা যায়, সমাদৃত হবে বইটি। জাহাঙ্গীর হোসেন শিক্ষিত প্রকাশক। পাণ্ডুলিপি দেখে তিনি প্রীত হয়েছেন। আশা করছেন, এবার বইমেলায় সাড়া জাগাবে বইটি।

তাড়া তাড়া প্রুফ সামনে। অনেকক্ষণ পরে একটি বিরতি পড়ল কাজে। জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করতে বেশ ভালো লাগছে। সারাজীবন বলতে গেলে বেগার খেটেছেন। নিজস্ব বই বের হচ্ছে, রাশীকৃত প্রুফ পড়ে আছে—এসব সামনে নিয়ে অনেকদিন পরে একটি আন্তরিক পরিতৃপ্তি বোধ করছেন কাজী আজিজুর রহমান।
কাজ ছিল জাহাঙ্গীর হোসেনের। তখনি বেরিয়ে যাবেন। বললেন, ‘আপনি আছেন তো বিকেল পর্যন্ত?’
‘হ্যা।’
‘আমি দুপুরের পরেই আসছি। বিকেলে হুমায়ুন আহমেদের বাড়িতে যাব ধানমণ্ডিতে। আপনাকে গ্রীন রোডে বাড়িতে পৌঁছিয়ে দিয়ে যাব।’ জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন।
‘আচ্ছা। ঠিক আছে।’ মনে মনে খুশি হলেন কাজী আজিজুর রহমান। রাস্তাঘাট প্রায় বিভীষিকা মনে হয়। জাহাঙ্গীর হোসেনের গাড়িতে একটু আরামে ফেরা যাবে।
তারপর জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ‘দুপুরে আপনার খাবার এনে দেবে।’
‘দরকার নেই।’ বললেন কাজী আজিজুর রহমান, ‘আমি বিউটি বোর্ডিং থেকে খেয়ে আসব।’

জাহাঙ্গীর হোসেন বেরিয়ে গেলেন। যাবার আগে তাঁর লোকজনদের আর-একবার বলে গেলেন কাজী আজিজুর রহমানকে চা-টা যখন যা দরকার হয়, দিতে।
অনেকক্ষণ গল্প হয়েছে। বিরতির পরে চাঙা হয়ে আবার প্রুফে মনোনিবেশ করলেন কাজী আজিজুর রহমান। বাড়ি থেকে নতুন কিছু তথ্য সংবলিত পাণ্ডুলিপি, কিছু পত্রপত্রিকা নিয়ে এসেছেন। যথাস্থানে সে-সব ঢুকিয়ে দিতে লাগলেন। কিছু কিছু যোগও করলেন নতুন বাক্য—নতুন বিশ্লেষণ।

নজরুল-জীবনীর কয়েকটি বিষয় তো বেশ জটিল। মা-র সঙ্গে সম্পর্ক, দুই বিয়ে, প্রেমিকাদের সঙ্গে সম্পর্ক, তারপর কোথায় যে কখন থাকছেন—লোকটা যেন জীবনভোর অবিশ্রাম চরকির মতো ঘুরেছেন, আত্মজীবনী নেই, ডায়েরি লেখেননি, স্মৃতিচারকরাও ভুল করেছেন অনেকসময়, সন-তারিখ দেননি, তাঁদের দোষ কী, তাঁরাও তো এসব লিখেছেন বৃদ্ধ বয়সে।

কাজী আজিজুর রহমানের অবশ্য কোনো তাড়া ছিল না। পাঁচ-সাত বছর ধরে একটু একটু করে লিখেছেন। অনেক ভেবে-চিন্তে নিজের ধরনে একটা সমাধান দিয়েছেন। তাঁর বইএর দু-চারটে চ্যাপ্টার মাত্র ছাপা হয়েছে। নজরুল-চর্চা যাঁরা করেন, তাঁরা তাঁকে চেনেনও না।

এত গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন যে, প্রায় দুটো বেজে গেছে যখন, তখন উঠলেন কাজী আজিজুর রহমান।

ঘাড় গুঁজে কাজ করেছেন এতক্ষণ, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। তিন তলা থেকে নেমে একটা রিকশা নিয়ে বিউটি বোর্ডিঙে গেলেন কাজী আজিজুর রহমান। আশ্বিন মাস। আকাশে শাদা মেঘ। নীল মেঘ। রোদের তেজ এখনি কমে এসেছে। দুপুর বেলার বাতাসেও গরম নেই এখন আর।

বাংলাবাজারে যখনই কাজ করতে আসেন কাজী আজিজুর রহমান, দুপুর হলে খেয়ে নেন বিউটি বোর্ডিঙেই। বাড়ির মতো পরিবেশটা ভালো লাগে তাঁর। হৈ-চৈ নেই, সেটাও একটা কারণ। আর পরিচ্ছন্ন।

আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, ওখান থেকে বেরিয়ে হেঁটেই ফিরবেন কাজী আজিজুর রহমান। যে-ক’দিন এসেছেন ‘বিনোদন’ অফিসে, রোজ তাঁর এই নিয়ম। দুপুরে খাওয়ার পরে একটু মিষ্টি খাওয়া। এ তাঁর বহুদিনের অভ্যেস। খাওয়ার পরে একটু মিষ্টি খেলে ভালো লাগে।

মিষ্টির দোকানে এখন দুপুরবেলা ভিড় নেই। কয়েকটা কড়কড়ে পরোটা পড়ে আছে। রাজভোগ আর ছানার অমৃতি দিতে বললেন। এরকম মিষ্টি নতুন শহরে পাওয়া অসম্ভব।
বছর ৩৫ বোধহয় বয়েস হবে ছেলেটির।

মিষ্টি আর খাবার পানির গেলাশ দিল টেবিলে। দোকানের পানি অবশ্য খান না কাজী আজিজুর রহমান। কাঁধের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে টেবিলে রাখলেন।
কয়েকদিন ধরে আসছেন তো এখানে। একদিন কথায় কথায় নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন কাজী আজিজুর রহমান। কবি নজরুল কলেজের অধ্যাপক।
ছেলেটিই মালিক এই মিষ্টির দোকানের। ‘অন্নদা পাল এ্যান্ড গ্র্যান্ড সন্স’-এর।

সোজাসুজিই বলল ছেলেটা, ‘স্যার, আর বোধহয় থাকতে পারবো না এখানে।’

‘কেন?’ একটু অবাক হয়ে গেলেন কাজী আজিজুর রহমান।

‘চাঁদা দিতে দিতে হয়রান। এখন দোকানটাই দখল করতে চায়। নারায়ণগঞ্জে আমার দাদার দোকান আছে। আপাতত হয়তো সেখানেই যেতে হবে।’
কী বলবেন কাজী আজিজুর রহমান?

ছেলেটা আর কথা বাড়াল না। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল তাঁর। রাস্তায় বেরিয়ে, হেঁটে ‘বিনোদন’ অফিসে যেতে যেতে, আশ্বিনের চমৎকার উজ্জ্বল রোদে বাতাসে মন খারাপ অবশ্য আর থাকল না কাজী আজিজুর রহমানের। তারপর তো একদম কাজে ডুবে গেলেন।

কখন বিকেলের আলো নিভে গেছে, খেয়ালই ছিল না। খেয়াল হলো, যখন জাহাঙ্গীর হোসেন ফিরলেন।

এসেই চায়ের হুকুম দিলেন।

তারপর চা খেতে খেতেই বললেন, ‘চলেন, দেরি করা যাবে না। হুমায়ুনের সঙ্গে ঠিক ছ-টায় এ্যাপয়েন্টমেন্ট।’

কম্পিউটারের হাবিব শাহেবকে ডেকে সব বুঝিয়ে দিলেন কাজী আজিজুর রহমান। তারপর জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়তে হলো।

বাংলাবাজারের এইসব রাস্তায় গাড়ি রাখা অসম্ভব। খানিক দূর রিকশায় গিয়ে তারপর গাড়িতে উঠতে হলো।

জাহাঙ্গীর হোসেন গাড়িতে উঠে বললেন, ‘ধানমণ্ডি। হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে চলো।’

দিন এখন দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে। আলো জ্বলে উঠেছে রাস্তায় রাস্তায়।

সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত লাগছিল কাজী আজিজুর রহমানের। একই সঙ্গে একটি পরিতৃপ্তি বোধ করছিলেন।

গাড়ি কখনো জ্যামে পড়ছে, কখনো শাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে—এই করে করে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে যখন এসে পড়েছে, তখন জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ‘এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে, গ্রীন রোড হয়ে গেলে দেরি হয়ে যাবে আরো, আপনি এখানে নেমে গেলে অসুবিধা হবে না তো?’

‘কোনো অসুবিধে নেই।’ বললেন কাজী আজিজুর রহমান, ‘রিকশা নিয়ে বা হেঁটে চলে যাব।’

জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, ‘কাল সকাল-সকাল আসবেন। বই সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত রোজই কিন্তু আসতে হবে আপনার।’

‘আসব। সত্যিকার অর্থে এটাই আমার প্রথম বই। আমার নিজের গরজেই আসব।’ বলে নেমে গেলেন কাজী আজিজুর রহমান।

বিদ্যুৎবেগে জাহাঙ্গীর হোসেনের গাড়ি এগিয়ে গেল। কাজী আজিজুর রহমান টের পাচ্ছিলেন, জাহাঙ্গীর হোসেন একটি চাপা উত্তেজনায় ভুগছিলেন সারা রাস্তা।

গ্রীন রোডে তখন রীতিমতো সন্ধ্যা নেমে এসেছে। জমকালো সন্ধ্যা। রাস্তায় রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। দোকানে দোকানে আলো। বাড়িতে বাড়িতে আলো। নতুন যে উঁচু উঁচু হাসপাতাল হয়েছে সেগুলো হোটেলের মতো ঝলমল করছে। রাস্তায় রিকশা, বেবি-ট্যাক্সি, টেম্পো, গাড়ি ছুটে চলেছে অবিশ্রাম। ক্রিং ক্রিং প্যাঁ পোঁ চলেছেই।

এটুকু রাস্তা হেঁটেই যাওয়া যাক—ভাবলেন কাজী আজিজুর রহমান। খানিক দূর এগোতেই কাজী আজিজুর রহমান দেখলেন আঁধার ঘনিয়ে আসছে। আর সন্ধ্যা লাগতে-না-লাগতেই পাশের বনবাদাড়ে ঝিঁঝির ডাক শুরু হয়ে গেছে। বাঁদিকে ধানখেতের পর ধানখেত। ডানদিকে ঝুপড়ি ঝুপড়ি গাছ। ভুট্টার খেত। পাশে ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। তারপর অড়হর খেত। বড় বড় আমগাছ কাঁঠালগাছ আরো কত নাম-না-জানা গাছ অন্ধকার করে রেখেছে।

কুলি রোডের রাস্তায় ধুলোয় পা ডেবে যেতে লাগল। গরুর গাড়ি যাওয়া-আসা করে এই রাস্তায়। কাজী আজিজুর রহমানের সারা শরীর ধুলোয় ভেসে যেতে লাগল। পাজামা ধুলোয় ধূসর হয়ে গেল।

কাজী আজিজুর রহমান ভাবল, আজ ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরতে এত দেরি হলো, আম্মা নিশ্চয় রাগ করবেন। এই তো সেদিন, কলেজে যখন পড়তো, সন্ধে করতেই একদিন আম্মা তাকে এক চড় লাগিয়েছিলেন। এখন অবশ্য গায়ে হাত তোলেন না—ইউনিভার্সিটিতে ওঠার পর থেকে—কিন্তু রাগ ঠিকই করেন। আজ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে ফিরতে ফিরতে এত দেরি হয়ে গেল।

‘হুক্কা—হুয়া! হুক্কা—হুয়া!’ হঠাৎ কাছেই শেয়ালের ডাক শুনে চমকে খানিকটা পিছিয়ে গেল কাজী আজিজুর রহমান।

তারপর দূর থেকে বটগাছটা লক্ষ করে হাঁটতে লাগল আবার। বটগাছটা এত উঁচু যে কুলি রোডে ঢোকার শুরু থেকেই প্রায় গাছটার চূড়া দেখা যায়। মাঝে মাঝে
লাল লাল ফলে ছেয়ে যায় গাছটা। তার পাশেই দু-তিনটে পলাশগাছ। চৈত্র মাসে তাতে একটা পাতা থাকে না, ঝরে যায় সব, শুধু টকটকে রক্তাক্ত ফুলে চারদিক যেন আভাময় হয়ে ওঠে। তখন যেন চেনাই যায় না আলাদা করে।

বটগাছের নিচে এক ফকিরের ঝুপড়ি। ফকির শাহেবকে দেখেছে মাঝে মাঝে কাজী আজিজুর রহমান। তাঁর বয়েস নাকি একশোর ওপরে। সব সময় দেখেছে তাঁকে শাদা কাপড় পরতে। শীতে গ্রীষ্মে নির্বিকার। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন ঝমঝম করে দিনের পর দিন বৃষ্টি হতে থাকে, তখনো ঐ ঝুপড়ির মধ্যে তিনি কাটিয়ে দিচ্ছেন। কী খেয়ে বাঁচেন, কী করেন, কেউ তা জানে না।

ফকিরের ডেরা পেরিয়ে এল কাজী আজিজুর রহমান।

তারপর দুলারা মিয়ার বাড়ি। ছ-ফুট লম্বা দুলারা মিয়া এ পাড়ার সর্দার।

দূর থেকে দোকানটা দেখা যাচ্ছে। হারিকেনের মিটমিটে আলো জ্বলছে। এই দোকানটাই এ রাস্তার একমাত্র দোকান। রাত ন-টায় বন্ধ হয়ে যায়।

তারপর তোয়েব মিয়ার বাড়ি।

তারপর ওদের বাড়ি।

সন্ধে উতরে গেছে সবে। হারিকেন জ্বালা হয়েছে।

আব্বা তো ঘরে। আম্মা বোধহয় রান্নাঘরে।

খোলা বাড়ি। এদিককার বাড়ি যেমন হয়। পাশের জমির সীমানা মাদার গাছের বেড়া দিয়ে।

বারান্দায় উঠতেই শিরিনের সঙ্গে দেখা।

—‘আম্মা কোথায় রে?’ জিগেস করে আজিজ।

সে-কথার জবাব না দিয়ে শিরিন মুচকি হাসে, ‘ভাইয়া, কে এসেছে, জানো?’ রহস্যময় গলা শিরিনের।

‘কী ব্যাপার? কে এসেছে আবার?’ কিছুই বুঝতে না-পেরে অবাক হয়ে যায় আজিজ।

‘ডালিয়া।’ চোখ নামিয়ে বলে শিরিন।

বুকের ভেতরে একটা ধাক্কা খায় আজিজ।

মুখ ফুটে শুধু বলে, ‘ও।’

‘যাই। খবর দিই, তুমি এসে গেছ।’

নিজের ছোট্ট ঘরটিতে ঢুকে যায় আজিজ।

আম্মার কী কারণে যেন আজ মেজাজ শরিফ। দেরি হওয়ার জন্যে কিছু বললেন না। শুধু একবার জিগেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, খোকা, এত দেরি হলো কেন?’
আজকাল নতুন মিথ্যে কথা বলতে শিখেছে খোকা। বলল, ‘লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম।’

আর কিছু বললেন না আম্মা। রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন।

মুখ-হাত ধুয়ে চা-টা খেল খোকা।

ডালিয়াকে নিয়ে এল ওরা দুই বোন। নার্গিস, শিরিন। বড় আপা, মেজো আপার বিয়ে হয়ে গেছে। এরা খোকার ছোট। কিন্তু সবাই খুব হাসছে। ডালিয়াও খুব হাসছে। ওদেরই বয়েসী।

‘খোকা ভাই, কেমন আছেন?’

কী-যে অপরূপ সুন্দরী হয়ে উঠেছে ডালিয়া দিন-কে-দিন। কয়েক মাস আগে যখন দেখেছিল, তার চেয়ে আজ আরো সুন্দর লাগছে।

লজ্জায় মাথা তুলতে পারে না খোকা।

নার্ভাস হেসে বলে, ‘এই তো। তোমার খবর কী?’

কিছু একটা বলতে হয়, তাই বলল খোকা।

শিরিন বলে, ‘চলো না, ভাইয়া, বন্যার পানি কতটা বাড়ল সবাই মিলে দেখে আসি।’

শিরিন ভাই-বোনদের সবার ছোট। সব বিষয়ে উৎসাহী। নার্গিসও তার প্রস্তাবে উৎসাহী। বলে, ‘চল ভাইয়া, ডালিয়াকে নিয়ে ঘুরে আসি সবাই।’

‘কাঠের পোল বোধহয় ভেসে গেছে কবে।’ বলল খোকা।

ফুটফুটে জ্যোৎস্না উঠেছে।

ছোট্ট দোকানটির লণ্ঠন জ্বলছে।

ওরা চারজন বেরিয়ে এল। বাড়ির সামনে বাগান। আমগাছ, কাঁঠালগাছ। এসব আছে অনেককাল থেকে। আম্মা শখ করে লাগিয়েছেন কলাগাছ, পেঁপেগাছ, আতাগাছ।
ওরা নেমে এল রাস্তায়। ধুলোর রাস্তা জ্যোৎস্নার আলোয় ঝকমক করছে। আকাশে অজস্র তারা ফুটে আছে। এত পরিষ্কার আকাশ যে, শাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে দেখা যাচ্ছে তাও।

একটা পাখি ডেকে উঠল।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে, ছোট দোকানটা পেরিয়ে একটু এগোতেই দেখা গেল, বন্যার থইথই পানি।

শিরিন চেঁচিয়ে উঠল, ‘ইশ, পানি এ্যাদ্দুর এসে গেছে!’

এই তো দু-তিন দিন আগে এসেছিল ওরা তিন ভাই-বোন। সকালবেলা। তখন তো পানি এ্যাদ্দুর আসেনি।

দেখা গেল, খালে অনেকগুলো নৌকো বাঁধা। বড় বড় নৌকো। প্রত্যেক বর্ষাকালে, বন্যার সময় এইসব বড় বড় নৌকোয় কাঠ আসে। নৌকোগুলোয় মিটমিটে আলো জ্বলছে। লোকজনের কথাবার্তা শোনা গেল। বন্যার সময় কুলি রোডের এই জায়গার জন্য চেহারা। বেশ-একটা জমজমাট ভাব। অন্যসময় তো কাকপক্ষী নেই। নিথর। কাঠের পোল পেরিয়ে গেলেই মস্ত বাগান। দিনের বেলাতেও অন্ধকার। নির্জন।

নার্গিস আর শিরিন একটু এগিয়ে গেছে।

ইচ্ছা করেই নাকি?—পরে ভেবেছে খোকা।

এখন ডালিয়া অস্ফুটে বলল, ‘ইউনিভার্সিটি থেকে গোপীবাগ কত দূর? যেতে পারেন না একবার? একে ধরে ওকে ধরে আসতে হয় আমার।’ তারপর একটু হেসে বলল, ‘খোকা নাম দিয়েছে ঠিকই। কিচ্ছু বোঝেন না।’ তারপরই গলা চড়িয়ে বলল, ‘এই নার্গিস-শিরিন, চলো ফিরি এবার।’

জ্যোৎস্নায়-অন্ধকারে মাখামাখি হয়ে আছে কুলি রোড।

দোকানে নির্বিকার আলো জ্বলছে।

কোন্‌ গাছের ডালপালার ভেতর থেকে একটা রাত-পাখি ডেকে উঠল।

রাত্রিবেলা নার্গিস-শিরিনের সঙ্গে ডালিয়া এক খাটে শুতে গেল।

তার ছোট্ট ঘরে শুয়ে পড়ল খোকা। ঘুম আসছিল না তার। সেই রাত-পাখিটাই কি ডেকে চলেছে জ্যোৎস্নার ভেতরে? খোকা জানে না কেন তার চোখের পানিতে বালিশের কোনা ভিজে যেতে লাগল ॥

[২০০০]