কামরুদ্দীন আহমদের (১৯১২ – ১৯৮২) একটিভ পলিটিকাল ক্যারিয়ার খুব বেশিদিনের না, কিনতু পাকিস্তান আন্দোলনের আগে ও পরে ক্রুশিয়াল পলিটিকাল মোমেন্টে উনি পলিটিকসে একটিভ রোল প্লে করছেন, ঢাকা-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে… স্পেশালি ১৯৫৪ সালের ইলেকশনের সময়ে যুক্তফ্রন্টের দপ্তর সম্পাদক বা সমন্বয়ক হিসাবে কাজ করেন, যার পুরস্কার হিসাবে ‘কূটনীতিক’ হিসাবে কিছুদিন কাজ করেন, এবং রিটায়ারমেন্টের পরে করপোরেট উকিল হিসাবেও সাকসেসফুল হন…

এই সময়ে, কামরুদ্দীন আহমদ তার লেখালেখি’র ভিতর দিয়া ‘বাঙালি জাতিয়তাবাদের’ থিওরেটিকাল একটা জায়গা তৈরি করার চেস্টা করেন এবং ব্যক্তিগত লেখালেখিও শুরু করেন… সম্ভবত আবুল মনসুর আহমদের পরে কামরুদ্দীন আহমদ-ই সবচে রিচ ডকুমেন্ট রেখে গেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়া!

তো, যেহেতু উনি ১৯৫৪ সালের ইলেকশন খুব কাছ থিকা দেখছেন, উনি এর ডিটেইল বর্ননাও দিতে পারছেন… তবে উনার যে পলিটিকাল বিচার, সেইটারে ‘সত্যি’ ধইরা না নিয়া ক্রিটিকালি দেখতে পারাটাই বেটার!

উনি দুইটা বইয়ে এই ইলেকশন নিয়া বলছেন – খুব সংক্ষেপে বলছেন “পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি” বইয়ে (১৯৭০ সালের এডিশনের ১১২-১১৪, ১২১-১২৪ পেইজে) এবং কিছুটা ডিটেইলে আছে “বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী” বইয়ে (২০১৮ সালের এডিশনের ২৩-৩৫ পেইজে) – দুইটা বই থিকাই সিলেক্টেড কিছু অংশ এইখানে পাবলিশ করা হইলো…

 

[পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি]

কনটেক্সট

১৯৪৯-এর মার্চ মাসে প্রথম উপনির্বাচন হল। তাতে জনৈক অল্পবয়স্ক কর্মী শামসুল হকের নিকট সর্বশক্তিমান মুসলিম লীগের প্রার্থী খুরুম খান পন্নী পরাজিত হলেন। এই উপনির্বাচন মুখ্যমন্ত্রীর নিজের জেলাতেই অনুষ্ঠিত হল। এই পরাজয়ে নূরুল আমিন সরকার এতদূর আত্মবিশ্বাসহীন আর ভীত হয়ে পড়ল যে, এর পর থেকে তাদের আর কোথাও উপনির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সাহস হল না। নির্বাচনে মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে পরাজিত ও বিপর্যস্ত হল। উপনির্বাচন না হওয়ার দরুন চৌত্রিশটি আসন শূন্য থেকে গেল। সাধারণ নির্বাচন হবার কথা ছিল ১৯৫১ সালে, কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সৃষ্ট এক আইনের মারপ্যাঁচের মাধ্যমে তাকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হল এবং ১৯৫২ সালেও নূরুল আমিন গণপরিষদের সহায়তায় ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচন পুনরায় মুলতুবী রাখলেন। সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে কয়েক সহস্র রাজনৈতিক কর্মী আর ছাত্রদের নিরাপত্তা আইনে কারারুদ্ধ করা হল।

 

সরোয়ার্দি

১৯৪৯-এর মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী পাকাপাকিভাবে পাকিস্তানে বাস করার জন্য করাচি এলেন। মুসলিম লীগ সরকার একটি ফ্যাসিবাদী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি স্থির করলেন, একটি বিরোধী দল খাড়া করতে হবে। কিন্তু লিয়াকৎ আলী খান খোলাখুলিভাবে ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানে কোন প্রতিপক্ষকে বরদাস্ত করতে পারবেন না। এ সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দী স্থির করলেন যে, তিনি প্রধান মন্ত্রীর ফ্যাসিস্ট মতবাদের মোকাবেলা করবেন।

১৯৪৯ সালে বিরোধী দল খাড়া করার পূর্বে সোহরাওয়ার্দীর সংগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য ঢাকায় তশরিফ আনলেন মিয়া ইস্তিখার উদ্দীন, মানকী শরীফের পীর সাহেব এবং মৌলানা ভাসানী। এঁরা ছিলেন যথাক্রমে পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর আসামের পূর্বতন মুসলিম লীগের সভাপতি। ঠিক হল, নতুন পাকিস্তান মুসলিম লীগের সংগঠক চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে তাঁরা মুসলিম লীগকে একটি উদার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে তোলার জন্য অনুরোধ করবেন। কিন্তু যদি এ প্রস্তাব তাঁর নিকট গ্রহণযোগ্য না হয়, তা’হলে তাঁরা নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করবেন।

১৯৪৯ সালে সোহরাওয়ার্দী তাঁর পূর্ব বঙ্গীয় পুরাতন কর্মীদের একত্র করলেন। তারপর স্থির করলেন, স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবেন। মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাকাপাকিভাবে আসাম ত্যাগ করে ঢাকা আগমন করার পর তিনি এবং সোহরাওয়ার্দী যে রাজনৈতিক দলটি গঠন করলেন, শেষ পর্যন্ত তা ‘আওয়ামী লীগ’ নামে পরিচিত হল। প্রধান মন্ত্রী লিয়াকৎ আলী খান এবং মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন তৎক্ষণাৎ সোহরাওয়ার্দীকে ভারতের দালাল বলে আখ্যায়িত করলেন। সোহরাওয়ার্দীর নব গঠিত দলের সভাগুলিতে গোলযোগ সৃষ্টি এবং তাঁর কর্মীদের উপর হামলা ও নির্যাতন করার জন্য সমাজের বিপজ্জনক ও গুণ্ডা প্রকৃতির লোক-দের উৎসাহিত করা হল। মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হল বিরোধী দলীয় সমর্থকদের। বিনা বিচারে তাদের অনেককে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হল। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ সরকার বিরোধী দলের কর্মীদের ব্যাপকভাবে ধর-পাকড় আরম্ভ করায় নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতি সহানুভূতি থাকা সত্ত্বেও বুদ্ধিজীবিরা দূরেই রয়ে গেলেন।…

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি পূর্ব পাকিস্তানে হবার দরুন পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক মুসলিম লীগের তুলনায় ইহা বেশী আঞ্চলিক ভাবাপন্ন হল। যে স্থলে মুসলিম লীগের সমর্থক হল শিল্পপতিরা, ভূস্বামীরা, ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকপালরা আর ক্ষমতাসীন সরকার, সেখানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমর্থনের উৎস হল বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়।

 

ফজলুল হক

১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হবে বলে স্থির হল। ১৯৪৫-৪৬ সালে তাঁর দলের সম্পূর্ণ পরাজয় হবার পর থেকে জনাব ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবনের নির্বাসন হয়েছিল। তিনি এখন রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত করলেন। নূরুল আমিন তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের এ্যাডভোকেট জেনারেল পদে নিযুক্ত করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঐ চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে মুসলিম লীগে যোগদান করলেন। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি পদের জন্য নূরুল আমিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হয়ে তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠান পরিত্যাগ করলেন। ১৯৩৭ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করার পর কৃষক প্রজা পার্টির মৃত্যু হয়ে গিয়েছিল; অনেকে তাঁকে ঐ দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে পরামর্শ দিল। কিন্তু পূর্ববঙ্গে জমিদারী প্রথার বিলোপ সাধন হওয়ায় ‘প্রজা’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করতে চাইলেন না। অতএব ১৯৫৩ সালের অক্টোবরে তিনি কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতৃত্ব করবেন বলে স্থির করলেন।

যুক্তফ্রন্ট

ইতিমধ্যে বামপন্থীরা শাসক-গোষ্ঠীর বিপক্ষে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করার জন্য জনমত সংগ্রহের অভিযান আরম্ভ করে দিয়েছিল। যুবলীগ, গণতন্ত্রীদল এবং বামপন্থী ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকল; তারা আওয়ামী লীগের সভাপতি মৌলানা ভাসানীকে ফজলুল হকের সহযোগিতা করার জন্য যুক্তিতর্কের সাহায্যে প্ররোচিত করল।

ফজলুল হককেও আওয়ামী লীগে যোগদান করানোর জন্য চেষ্টা করা হল, সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানে সেটাই ছিল সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগের প্রধান অসুবিধা ছিল যে, পার্লামেন্টারী পার্টির নেতা হবার মত উপযুক্ত কোন লোক পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। সোহরাওয়ার্দী ইতিপূর্বেই কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বামপন্থীরা এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে যুক্তফ্রন্টের জন্য আবেদন জানাল। তারা আওয়ামী লীগের কর্মকর্তাদের বিরোধী ছিল না, কিন্তু তারা এমন একজনকে চাইল, যিনি সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। ফজলুল হকের রাজনীতিতে যোগদান করাকে তারা দৈবপ্রেরিত মনে করল। তারা জানত, নিজের কোনরূপ সংগঠনী প্রতিভা না থাকায় ফজলুল হক স্বভাবতই তাদের উপর নির্ভর করবেন। সোহরাওয়ার্দী বামপন্থীদের এই মতলব রোধ করার জন্য খুব চেষ্টা করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাত্ররা তার উপর যে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিল তা’ মেনে নিতে তিনি বাধ্য হলেন। এইভাবে ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হল।

সরকার-বিরোধী দলগুলি সংগঠন করার জন্য এর দফতর ঢাকায় স্থাপিত হল। আওয়ামী লীগ এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টির সমসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে এর কার্যকরী পরিষদ গঠিত হল, সোহ্ রাওয়ার্দী হলেন এর সভাপতি। যুক্তফ্রন্ট গঠিত হবার সাথে সাথে ফজলুল হক নেজামে ইসলাম নামে একটি দলকে এর মধ্যে টেনে আনলেন। বামপন্থী প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রী দল এবং কম্যুনিষ্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্টে প্রবেশাধিকার দেওয়া হল না। যা হউক, পীড়াপীড়ির মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টে গণতন্ত্রীদলের যুবক কর্মীদের মনোনয়ন দান করা সম্ভব হল এবং একজন সুপরিচিত কম্যুনিষ্ট কর্মীর জন্য আসন খালি রাখা সম্ভব হল।

ইলেকশন

কার্যকরী পরিষদ সিদ্ধান্ত করল নির্বাচনী এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রার্থীকে তারা মনোনয়ন দান করবেন। স্ব স্ব এলাকায় প্রার্থীর পারিবারিক প্রভাব, প্রতিপত্তি, সমাজকর্মী হিসাবে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং মুসলিম লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনদ্বন্দ্বের ব্যয় বহন করার উপযুক্ত আর্থিক সঙ্গতি প্রভৃতি তা’দের বিবেচ্য বিষয় হবে।

প্রার্থীদের তরফ থেকে আগত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিটির সাক্ষাৎ চলল, কিন্তু যে কোন প্রার্থীরই মনোনয়ন সম্পর্কে তিন দলের প্রতিনিধিরা কদাচিৎ একমত হলেন। তাঁদের আলোচনায় সব সময় সন্দেহপ্রবণতা ও একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস দেখা দিত এবং প্রায়ই তা’ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে লাগল, যাতে মনে হল যুক্তফ্রণ্ট বোধ হয় ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু সকলের সাধারণ শত্রু মুসলীম লীগ ভীতি তাদের একত্র করে রাখল।

যে কোন পর্যবেক্ষকের কাছে এটা স্পষ্ট হল যে, যদি মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে ধ্বসে পড়ে, তা’হলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ফ্রণ্ট আর কাজ করতে পারবে না। মুসলিম লীগ যদি শতকরা ৪৫টি আসন পায়, তা’হলেই ফ্রন্টের একত্র থাকা সম্ভব হবে।

একুশ দফা কর্মসূচীর উপর ভিত্তি করে নির্বাচন যুদ্ধ চালান হল। বিষয়ের মধ্যে যুক্তফ্রণ্ট পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে মর্যাদা দেবার দাবী জানাল। অপরাপর দাবীর মধ্যে ছিল নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার, বিনা বিচারে আটক সকল রাজবন্দীর কারামুক্তি, যৌথভাবে চুক্তি করার দাবীকে বলবৎ করার জন্য শ্রমিকদের স্বাধীনতা প্রদান, পাট সম্পর্কে বাস্তবনীতি অনুসরণ এবং পাট চাষীদের ন্যায্যমূল্য প্রদানের ব্যবস্থা।

সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হল; আইন সভার ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি পেল। এরূপ বিপুল জয়লাভ জনসাধারণ আশা করতে পারেনি, যদিও সোহরাওয়ার্দী ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে, মুসলিম লীগ এক ডজনের বেশী আসন পাবে না।

[বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী]

সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি

মুসলিম লীগের সবচেয়ে অসুবিধা হলো নতুন আইনে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারপ্রাপ্তি। কারণ, মুসলিম লীগ ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, জেলা বোর্ডের সদস্য প্রভৃতির ওপর গণসংযোগের জন্য নির্ভরশীল ছিল এবং যাদের ওপর আস্থা স্থাপন করে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিল, তারা সাধারণের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। ধনিক অবাঙালি ব্যবসায়ীদের থেকে আদায়কৃত টাকা বেহিসাব খরচ করার জন্য কর্মীদের সুযোগ এবং তাদের মারফত ভোটার সংগ্রহে ভরসা রাখা হতো। মুসলিম লীগের পক্ষের লোক ছিল গ্রামের শোষক ও অত্যাচারীদের শ্রেণিভুক্ত এবং তাঁদের ওপর সাধারণ লোক ছিল বীতশ্রদ্ধ। তাই সাধারণ লোক তাঁদের বিরুদ্ধে ভোট দেবার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল।

যুক্তফ্রন্টের অঙ্গদলের মধ্যে কৃষক প্রজা পার্টিকে সবেমাত্র পুনর্জীবিত করা হয়েছে। তাই দলকে পুরোপুরি সংগঠিত করা তাদের পক্ষে তখনো সম্ভব হয়নি। কেবল বিভিন্ন জেলার কিছুসংখ্যক পুরাতন কৃষক প্রজা প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ কর্মী ও নেতা এবং মুসলিম লীগ হতে যাঁরা পদত্যাগ করেছেন, হক সাহেবের সঙ্গে ১৯৫৩ সনে তাঁরাই পার্টিতে যোগদান করেন। তাঁরা ছিলেন হক সাহেবের ব্যক্তিত্বের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও কোনো সুসংহত সংগঠন তখনো হয়নি। মওলানা ভাসানী বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত গাঁয়ের দরিদ্র জনসাধারণের সভায় বক্তৃতা করেছেন – ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩ সন পর্যন্ত। কিন্তু সংগঠন করার চেষ্টা কখনো করেননি। শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ সদস্য বলতে বুঝতেন তাদের, যারা কলকাতায় ১৯৪৫ সন থেকে ১৯৪৭ সনের প্রথমার্ধে (ফজলুল কাদেরের ব্যবসায় যোগদান করার পর) তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল এবং ঢাকায় আসার পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মধ্যে যারা তাঁর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিল। এদের নিয়েই তাঁর পার্টি। সত্যি বলতে শামসুল হক সাহেবের মস্তিষ্ক বিকৃতির পর আর কেউ আওয়ামী লীগ সংগঠন করার প্রচেষ্টা চালাননি। এমনকি শামসুল হকের অনেক শিষ্য ও ভক্তও অন্য পথ না পেয়ে ফজলুল কাদেরের শিষ্যদের মতো শেখ মুজিবের নেতৃত্ব মেনে নেয়। তবে শেখ মুজিব তাদের সম্পূর্ণভাবে কখনো বিশ্বাস করেননি।

ফলে বাংলার প্রতিটি গ্রামে মওলানা সাহেব ও শেখ মুজিবের অজ্ঞাতে এক বিশেষ ধরনের আওয়ামী লীগার জন্ম নেন, তাঁরা হলেন ইউনিয়ন বোর্ডের সংখ্যালঘু দল। সংখ্যাগরিষ্ঠরা যেহেতু মুসলিম লীগের সঙ্গে ছিলেন, তাই সংখ্যালঘু দল নিজেদের আওয়ামী লীগার বলে জাহির করতে লাগলেন। কারণ, রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা পার্টির মধ্যে না থাকলে গ্রামবাংলায় ভোেট পাওয়া শক্ত। এক অর্থে বিনা প্রচেষ্টায় দেশের সর্বত্র আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও এরা সবাই প্রায় সুবিধাবাদী দলের লোক।

অন্যদিকে পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলমান ছেলেদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা প্রসারিত হতে লাগল। তাই প্রায় প্রত্যেক গ্রামের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও ধনী কৃষক পরিবার থেকেই ছাত্র ঢাকা আসতে লাগল। পাকিস্তান হবার পূর্বে মুসলমান ছাত্রসমাজ ঢাকা, কলকাতা, আলিগড় প্রভৃতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য যাওয়ায় তাদের মধ্যে একই রকম মনোবৃত্তি গড়ে উঠতে পারেনি। অধিকাংশকেই এবার যেহেতু ঢাকা আসতে হলো, তাই তাদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবোধ গড়ে উঠতে লাগল। আর নেতারাও ছাত্রদের নিকট থেকেই গ্রামবাংলার সকল স্থানের লোকের অবস্থা ও মনোবৃত্তি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করার সুযোগ পেলেন। এখানে বলা প্রয়োজন যে ১৯৫৪ সনেও রাজশাহী বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়নি। মুসলিম ছাত্রসমাজে তখন থেকেই ফাটল দেখা দিল। ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্ররা এবং কলকাতা থেকে আসা বাস্তুত্যাগী ছাত্ররা কোনো ব্যাপারেই একমত হতে পারছিল না। সংখ্যাগুরু বাঙালি ছাত্র চাইল মাতৃভাষার মাধ্যমে সকল ছাত্রের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ছাত্ররা ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ দাবি করল। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগুরুর মত সমর্থন করে বাংলার প্রতিটি গ্রামে তাদের সমর্থক জোগাড় করতে সমর্থ হলো।

প্রশ্ন করা যেতে পারে, আওয়ামী লীগের মতো মুসলিম লীগ ওই সুবিধাটা গ্রহণ করল না কেন? উত্তরে বলা যায়, মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ তখনো অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে মেশার সুযোগকে অনেক বেশি মূল্য দিতেন। তাঁরা সাধারণ গাঁয়ের ছাত্রসম্প্রদায়ের সঙ্গে মেশা বিশেষ পছন্দ করতেন না। যদিও সাধারণ নির্বাচনের পূর্বেই প্রাপ্তবয়স্করা ভোটাধিকার পেয়ে গেছে।

১৯৫৩ সনের ডিসেম্বর মাসে যুক্তফ্রন্ট গঠন হবার পর যখন কৃষক ও আওয়ামী নেতারা বাংলার নির্বাচন কেন্দ্রের মানচিত্র খুলে বসলেন, তখন তাঁরা দেখতে পেলেন যে ২৩৭টি নির্বাচন কেন্দ্রে দাঁড় করাবার মতো প্রার্থীসংখ্যা তাঁদের কারও দলে নেই। হক সাহেব অবস্থা বুঝে ফরিদপুরের পীর মোহসিন উদ্দীন (দুদু মিঞা) সাহেবের মারফত কিশোরগঞ্জের মওলানা আতাহার আলীকে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে অনুরোধ জানালেন। কারণ, তাঁর দলের মধ্যে অনেকেই রাজনীতি করতেন। তাই ইমাম সাহেবদের ও তাঁর মুরিদদেরও সাহায্য পাওয়া প্রয়োজন ছিল। আতাহার আলী সাহেব শর্ত সাপেক্ষে রাজি হলেন। তাঁর দলের লোক স্টিয়ারিং কমিটিতে থাকবে। অর্থাৎ তাঁরাও যুক্তফ্রন্টের অঙ্গদল হিসেবে পরিগণিত হবেন। শেখ মুজিব ঘোরতর আপত্তি তুললেন। শহীদ সাহেব পূর্বেই আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না।

কারণ, তিনি আওয়ামী লীগ করেছিলেন ‘জনসাধারণের মুসলিম লীগ’ হিসেবে। তাই মুজিবকে তিনি নেজামে ইসলামকে অঙ্গদল করে নেবার জন্য রাজি করালেন। অর্থাৎ দুই পার্টি থেকে তিন পার্টি হলো। প্রগতিবাদী ছাত্র ও যুবকেরা প্রমাদ গুনল। তারা ‘গণতান্ত্রিক দল’কে অঙ্গদল করে নেবার জন্য চাপ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু মওলানা আতাহার আলী অনৈসলামিক কমিউনিস্ট পার্টির দলের লোককে কিছুতেই ঢুকতে দেবেন না। তিনি সোজা বলে দিলেন গণতান্ত্রিক দলকে নিলে তিনি এবং তাঁর দল যুক্তফ্রন্ট থেকে সরে যাবেন। ফজলুল হক সাহেব উপায়ান্তর না দেখে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দিতে চাইলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেজামে ইসলামকে প্রতিহত করার জন্য গণতান্ত্রিক দলকে নেবার পক্ষে চাপ সৃষ্টি করতে থাকল। শহীদ সাহেব তখন এই বলে সব দিক রক্ষা করলেন যে গণতান্ত্রিক দলকে অঙ্গদল করা হবে না। তবে তারা মনোনয়নের জন্য দরখাস্ত করতে পারবে। সব দরখাস্তকারীর গুণাগুণ বিবেচনা করে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

 

তিন নেতা ও যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন

কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের মনোনয়নের জন্য দরখাস্তের ফরম এসে গেল। দরখাস্তের সঙ্গে এক শ টাকা দেওয়া আবশ্যক ছিল। ফিস দিলেই দরখাস্ত আমি রেজিস্ট্রি করে নিতাম। মাঝে মাঝে একই লোক দুবার দরখাস্ত করত।

প্রথমবারের টাকা ফেরত চাইলে সেটা দেওয়া হতো না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে কক্সবাজারের ফরিদ আহমদ অ্যাডভোকেট, প্রথম দরখাস্ত করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে। পরের দিন সেই ফরিদ আহমদই আবার এলেন অফিসে আচকান-পায়জামা পরে, মাথায় টুপি, হাতে ছড়ি। দরখাস্ত পেশ করলেন আর একখানা। এবার নেজামে ইসলামের প্রার্থী। আমি খুবই অবাক হলাম। এ জন্য যে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আমি তাঁকে দেখেছি বামপন্থী হিসেবে। তারপর আওয়ামী লীগে। হঠাৎ দুসপ্তাহ পরে নেজামে ইসলামে। পূর্বের কথা ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, হঠাৎ তাঁর মত পরিবর্তনের কারণ কী? সহজ-সরলভাবে উত্তর দিলেন, কক্সবাজারে ওই নির্বাচন কেন্দ্রে শেখ মুজিবের ফিরোজ নামে এক প্রার্থী আছে; যেহেতু মুজিবই স্টিয়ারিং কমিটিতে তাঁর দলের লোকের পক্ষে মুখপাত্র, সেহেতু তাঁর সমর্থন তিনি পাবেন না। অন্যদিকে মওলানা আতাহার আলী সাহেবের সঙ্গে আলাপ করে তাঁর ভরসায় নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী হয়েছেন।

এদিকে বাইরে প্রচার হয়েছে যে, হক সাহেব ও মওলানা সাহেবই আপিল বোর্ডের সদস্য হয়েছেন এবং শহীদ সাহেব কেবল ‘গ্লোরিফাইড ক্লার্ক’। সুতরাং হক সাহেবের দলের জয় হবার ভরসাই বেশি। কারণ, মওলানা

ভাসানী সাহেব ঢাকায় কোনোকালেই একসঙ্গে এক সপ্তাহের বেশি অবস্থান করেন না। তাই শেষ পর্যন্ত হক সাহেব একাই আপিল শুনবেন এবং তাঁর কথাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়াবে। এটা কেবল ফরিদ আহমদের ধারণাই ছিল না। দেশময় এ কথা কৃষক প্রজা পার্টি জানিয়ে দেবার ফলে হক সাহেব বিভিন্ন জেলায় গেলে তাঁর নিকট লোকজন ধরনা দিতেন মনোনয়ন বদলানোর জন্য। তিনিও তা-ই করতেন। আমাকে খবর দিতেন নতুন করে নতুন মনোনীত প্রার্থীর নাম প্রকাশ করার জন্য। এ কাণ্ড হক সাহেব নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগেও করেছেন। হক সাহেব একা নন, মওলানা সাহেবও অমনি করে চট্টগ্রামে নবী চৌধুরীর স্থলে আওয়ামী লীগের এম এ আজিজকে মনোনয়ন দিয়ে আমাকে খবর পাঠালেন তাঁর মনোনীত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে। আমি অবশ্য এসব ক্ষেত্রে তাঁদের কথা রক্ষা করতে পারিনি। আমার প্রতি শহীদ সাহেব ও মানিক মিয়া সাহেবের পূর্ণ সমর্থন থাকার জন্যই বোধ হয় সেটা সম্ভব হয়েছিল।

যাক, ফরিদ আহমদের কথা বলতে গিয়ে অনেক দূরে চলে এসেছি। এবার স্টিয়ারিং কমিটির কার্যকলাপ সম্বন্ধে কিছু না বললে যুক্তফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ অনেক কথাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যুক্তফ্রন্টের প্রথম অসুবিধা হলো যে এত করেও সকল নির্বাচন কেন্দ্রের জন্য প্রার্থী আমরা পাইনি, এমনকি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যখন দরখাস্তসমূহ বাছাই হলো, তখন আমাদের হাতে ৬২০ খানা দরখাস্ত। ময়মনসিংহ জেলা থেকে অর্ধেকের বেশি নির্বাচন কেন্দ্রে কোনো প্রার্থী ছিল না। আবুল মনসুর সাহেবকে পাঠানো হলো যেমন করেই হোক প্রার্থী খুঁজে বের করতে। শহীদ সাহেবের এক কথা-পাস-ফেল বড় কথা নয়, কোনো নির্বাচন কেন্দ্র যেন প্রার্থীহীন না হয়। মুসলিম লীগ ছিল তখন পুরাতন মুসলমান রাজনীতিবিদদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁরা অনেক আগে থেকেই অবতীর্ণ হয়েছিলেন। প্রার্থীর ভিড় তাই সেখানেই বেশি। দ্বিতীয়ত যুক্তফ্রন্টে আন্তদলীয় কোন্দল চলছিল। এটাও বাইরে প্রকাশ হয়েছিল। সুতরাং শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যেতে পারে বলে মনে হতে লাগল, ইতিপূর্বে কয়েকবার যেমন পশ্চিমবঙ্গে ভেঙে পড়েছে। তাই অনেকেই যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন চাইতে ইতস্তত করছিল।

আমি যেদিন সংবাদ প্রকাশের জন্য খবর পাঠালাম যে আমরা ১১৫৬ খানা দরখাস্ত পেয়েছি। সেদিন আমাদের হাতে ছিল মাত্র উপরিউক্ত ৬২০ খানা দরখাস্ত। প্রায় ৪০টি সিটের জন্য কোনো দরখাস্ত ছিল না। আবুল মনসুর সাহেব ও শেখ মুজিবের প্রচেষ্টায় পুরাতন প্রজা আন্দোলনকারী লোকজন নিয়ে আর অন্যদিকে শেখ মুজিবের ইসলামিয়া কলেজের বন্ধুবান্ধব ও ঢাকায় ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে সে অভাব কোনোপ্রকারে পূরণ করা হলো। তখন নির্বাচনের আর ২৫-২৬ দিন বাকি। ছাত্রনেতাদের মধ্যে এল খালেক নেওয়াজ, দবিরুল ইসলাম, শামসুল হক, কামরুজ্জামানসহ কয়েকজন। মনোনয়ন দান সমাপ্ত হলো ১৯-২০ দিন পূর্বে। কিন্তু এ মনোনয়নের সময় শেখ মুজিবের সঙ্গে মোহন মিঞার কেবল তিক্ততাই দেখা দেয়নি, অন্তত দুটো নির্বাচন কেন্দ্রের মনোনয়ন নিয়ে হাতাহাতি, মারামারিও হয়ে গেছে। তাঁর একটি কেন্দ্রের প্রার্থীরা চট্টগ্রামের নবী চৌধুরী ও আজিজ, অন্যটির প্রার্থীরা খন্দকার মোশতাক আহমদ ও রমিজ উদ্দীন। প্রথমটায় নবী চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। এ কেন্দ্রেই মওলানা সাহেব যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে আজিজকে মনোনয়ন দান করেন। কোনো মনোনয়ন না দিয়ে দুজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ রাখা হলো: খন্দকার সাহেব কৃষক প্রজা পার্টির রমিজউদ্দীন সাহেবকে হারিয়ে দিয়ে পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

 

নির্বাচন অভিযান

নির্বাচনের সতেরো-আঠারো দিন পূর্বে শহীদ সাহেব উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে যশোর যান। সেখানে বক্তৃতায় হঠাৎ ঘোষণা করলেন যে নয়টি কি বড়জোর দশটি আসন পেতে পারে মুসলিম লীগ। আমি তো তাঁর বক্তৃতা পড়ে অবাক, কারণ যাবার পূর্বদিন আমাকে মানচিত্র দেখিয়ে যখন নির্বাচনের পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিতে বললেন তখন আমি তাঁকে সব কেন্দ্রের রিপোর্টের সারাংশ বলে মানচিত্র ধরে দেখালাম যে প্রায় ৪৫টি সিটে আমাদের কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্যান্য কারণের মধ্যে টাকার অভাবেই কয়েকজন প্রার্থী কেন্দ্র থেকে পলাতক হয়ে ঢাকায় এসে বসে আছে। অথচ অফিসেও আর বিশেষ টাকা নেই। অন্যদিকে মোহন মিঞার মিল্লাত কাগজ ক্রমাগত মনোনয়ন সম্বন্ধে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করছে। শহীদ সাহেব আমাকে বললেন একটা বিবৃতি দিয়ে দিতে যে মনোনয়নের কাজ সমাধা হয়ে গেছে।

পূর্বে আর কোনো মনোনয়ন পরিবর্তন করা হবে না। তাঁর দ্বিতীয় নির্দেশ হলো, বাবু রণদা প্রসাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিয়ে যাদের টাকার অত্যন্ত প্রয়োজন তাদের যতটা সম্ভব দিয়ে দিতে। আবুল মনসুর সাহেব বলেছেন ‘অফিস সেক্রেটারি জনাব কামরুদ্দীন আহমদের সাহায্যে শহীদ সাহেব একাই যুক্তফ্রন্টের গ্লোরিফাইড হেডক্লার্ক রূপে যুক্তফ্রন্ট অফিস জীবন্ত রাখিলেন। প্রার্থীগণের ভিড় তাঁর কাছেই হইতে থাকিল… তথাকথিত সুপ্রিম পার্লামেন্টারি বোর্ড, মানে হক সাহেব ও ভাসানী সাহেবের প্রার্থী মনোনয়নের ধারেকাছেও আসিলেন না।’ (আবুল মনসুর সাহেবের আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, তৃতীয় সংস্করণ ৩২৮ পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য) নির্বাচনী অভিযানে ব্যস্ত থাকার জন্যই বোধ হয় আবুল মনসুর সাহেব উপরিউক্ত মন্তব্য করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ রায়পুরা থানায় নবাববাড়ির সৈয়দ আবদুস সলিম সাহেবের পক্ষে বক্তৃতা করতে এলেন করাচি থেকে মিস ফাতেমা জিন্নাহ, বেলুচিস্তানের কাজী ইসা প্রমুখ। আমাদের পার্টির প্রার্থী খানিকটা ভীত হয়ে পড়ল। তিন নেতার কাউকে ঢাকায় না পেয়ে আমাকেই বলল তার ওখানে সেদিনই সকালের ট্রেনে যেতে। উপায় ছিল না, তাই রাজি হলাম। কালীগঞ্জে এসে দেখি, হক সাহেব আমাদের যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী ফয়জুর রহমানের বিরুদ্ধে রেজা-এ করিম সাহেবকে মনোনয়ন দান করেছেন। আর রেজা-এ করিম সাহেবও তাঁর সহিযুক্ত আবেদনপত্র বিমানের সাহায্যে নির্বাচন কেন্দ্রে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আমার পক্ষে রেজা-এ করিম সাহেবের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করা খুবই অসোয়াস্তিকর ছিল। কারণ, আমি ওকালতি জীবনের প্রারম্ভে তাঁর ‘জুনিয়র’ ছিলাম। কিন্তু ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জাতির ভাগ্যকে পৃথক করে দেখা উচিত। তাই অত্যন্ত কঠোর ভাষা প্রয়োগ করে আমাকে বক্তৃতা করতে হলো। নির্বাচনের পর আমি অনেক দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে পারিনি। যাকগে, রায়পুরা গিয়ে দেখি, আমাদের প্রার্থী মিছেই ভয় পেয়েছিল। ফাতেমা জিন্নাহর সভায় দুহাজারের বেশি লোক হয়নি। অথচ আমাদের সভায় আমার মতো তৃতীয় শ্রেণির নেতার বক্তৃতা শোনার জন্য ২৫ থেকে ৩০ হাজার লোক ছিল।

সন্ধ্যায় ঢাকা ফিরে এসে বাসায় কিছু খেয়ে আবার অফিসে গেলাম। সারা দিনের ডাক খুলে তো চক্ষুস্থির। হক সাহেব এক ময়মনসিংহ জেলার চারজনের মনোনয়ন নাকচ করে নতুন মনোনয়ন দিয়েছেন। আর নতুন প্রার্থীদের চিঠি দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন ইত্তেফাক-এ ওই সংবাদ প্রকাশ করতে। প্রার্থীদের কাছ থেকে চিঠি রেখে আমি ইত্তেফাক অফিসে মানিক মিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করতে গেলাম। মানিক মিয়া আমার সঙ্গে একমত হলেন যে শহীদ সাহেবের মতামত না নিয়ে হক সাহেবের ওই ধরনের পরিবর্তন ঘোষণা করা যায় না। রাতে রাজশাহী সার্কিট হাউসে শহীদ সাহেবকে ফোনে পেলাম। তিনি আমার ও মানিক মিয়ার সঙ্গে একমত হলেন। সবচেয়ে মারাত্মক হলো যখন টাঙ্গাইলের এল আর খান (পরবর্তীকালে মন্ত্রী) মোটে দশ দিন পূর্বে এসে আমাকে চিঠি দেখালেন যে হক সাহেব মল্লিকের স্থলে তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছেন।

আমি তাঁকে জানালাম যে শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেব না ফেরা পর্যন্ত আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। অসোয়াস্তিকর হলো যে এল আর খান পূর্ব থেকেই আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। তার পরদিনই হক সাহেব ঢাকায় ফিরে এলেন। যত লোককে তিনি নতুন করে মনোনয়ন দিয়েছিলেন, তারা তাঁকে ঘিরে ধরল এবং তারা তাঁকে খেপিয়ে তোলার জন্য মিথ্যা করে বলল যে আমি হক সাহেবের চিঠি ও টেলিগ্রামগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি। হক সাহেব আমাকে ফোন করে তক্ষুনি তাঁর বাসায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন। ফোনেই বললেন, ‘তুমি বাঘ দেখেছ কিন্তু তার থাবা দেখোনি’ ইত্যাদি। ওই অবস্থায় যাওয়া উচিত হবে কি না, বুঝতে না পেরে হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবকে তাঁর বাসায় ফোন করলাম। চৌধুরী সাহেব আমাকে বললেন যে আমি তক্ষুনি যেন না যাই। তিনি হক সাহেবের বাড়ি যাচ্ছেন। অবস্থা বুঝে আমাকে ফোন করবেন। ফোন না পেলে আমি যেন না যাই। আমি তাই আর গেলাম না। হামিদুল হক সাহেবও আমাকে ফোনে খবর দিলেন না।

সন্ধ্যার পর দেখলাম হক সাহেব নিজেই অনেক লোক সমভিব্যাহারে অফিসে এলেন। সঙ্গীদের নিচে রেখে, কী মনে করে বাঘের মতো গর্জন করতে করতে একাই ওপরে উঠতে লাগলেন। আমার ঘরেও অনেক কর্মী তখন কাজ বুঝে নিচ্ছিল, কোথায় কাকে কী কাগজপত্র নিয়ে যেতে হবে। হক সাহেব আমাকে নিয়ে শহীদ সাহেবের শোবার ঘরটায় ঢুকলেন। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তিনি কী করবেন। হঠাৎ আমার কাঁধের ওপর তাঁর স্নেহের হাতখানা রেখে বললেন, ‘না না, তুমি ঠিকই করেছ ওদের নাম প্রকাশ না করে। আমাকে এমনভাবে ওরা ধরেছিল যে আমি যা করেছি তা না করে পারিনি। কেবল আমার একটা কথা রাখতে হবে, এল আর খানের মনোনয়নটা তোমাকে গ্রহণ করতেই হবে।’ কারণস্বরূপ যা বললেন, তাতে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আজও সে কথা খুলে বলতে পারব না। তিনি দেশের নেতা, সুতরাং আমারও নেতা। আমি রাজি হলাম। রাতে শহীদ সাহেবকে রংপুরে ফোনে বললাম। তিনি বললেন, কাজটা ভালো হলো না। তবে ওই অবস্থায় অন্য কিছু করা সম্ভব ছিল না। মল্লিকের জন্য আমার দুঃখ হলো। মনে হলো, একটা লোকের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো।

শহীদ সাহেব ফিরে এলেন চার দিন আগেই। আমি তাঁর যশোরের বক্তৃতার প্রতিবাদ করলাম এই বলে যে অন্যে যা-ই বলুক, তাঁর পক্ষে মুসলিম লীগ ৯-১০টা আসন পেতে পারে বলা উচিত ছিল না। কারণ, আমি তাঁকে বলে দিয়েছিলাম আমাদের প্রার্থীদের অবস্থা। তিনি হেসে উত্তর দিলেন যে তোমার দেওয়া ‘ডেটার’ (স্বীকৃত সত্য) ওপরই আমি ওই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে প্রথমত পূর্ব পাকিস্তান অত্যন্ত ঘনবসতি এলাকা। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত সাধারণভাবে সংখ্যালঘুরা গ্রহণ করে, অবশ্যই যদি সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত বেশি হয়। দ্বিতীয়ত যেসব নির্বাচনী এলাকার অন্তত তিন দিকেই অন্য একটি দলের বিজয় সুনিশ্চিত হয়, নির্বাচনের সাত দিন পূর্বে সেসব নির্বাচন কেন্দ্রের লোকের উৎসাহ ও উদ্দীপনার জোয়ারে অন্য দলের প্রার্থী হেরে যায়। এখন তোমার মানচিত্র আবার পরীক্ষা করে দেখো, তাতে মুসলিম লীগের দশটির বেশি সিট হয় না। আমি নয়টিই বলতাম, বলিনি এ জন্য যে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন সাহেব যেভাবে তাঁর নির্বাচন কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করেছেন, তাতে হয়তো নুরুল আমিন জিতলেও জিততে পারেন।

নির্বাচন অবশেষে শেষ হলো। চারদিকে যুক্তফ্রন্টের জয়জয়কার, মুসলিম লীগের ভরাডুবি। নুরুল আমিন সাহেবও শেষ পর্যন্ত এক ছাত্রনেতা খালেক নেওয়াজের নিকট হেরে গেলেন। ১৯৩৭ সনে নুরুল আমিন সাহেব সাধারণ নির্বাচনে আবদুল ওয়াহেদ বোকাইনগরীর মতো এক প্রাইমারি স্কুলশিক্ষকের কাছে হেরে গিয়েছিলেন, কিন্তু এবার কেবল নুরুল আমিন হারেননি, হেরেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, হেরেছেন মুসলিম লীগের সভাপতি। যুক্তফ্রন্ট একটা আসন হারাল শহীদ সাহেবের দোষে। যশোরের কমরেড আবদুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন মুসলিম লীগের শামসুর রহমান সাহেব। ওই কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবার কথা ছিল প্রফেসর আবদুল হাইয়ের। আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক (Publicity Secretary) ছিলেন তিনি। কিন্তু কমরেড আবদুল হক সাহেব যেহেতু তাঁর আপন বড় ভাই, তাই তিনি তাঁর নাম প্রত্যাহার করে বড় ভাইয়ের জন্য তদবির করছিলেন। হক সাহেবের দল কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। এমনকি শেখ মুজিবও নিশ্চুপ থাকলেন স্টিয়ারিং কমিটিতে। শহীদ সাহেব অনেক রকম যুক্তি দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থন নিয়ে নির্বাচন কেন্দ্রটি উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করলেন। হক সাহেব বললেন, ‘শহীদ তুমি ভুল করলে, কারণ বাংলার মুসলমান কমিউনিস্টদের ভোট দেবে না। কমিউনিস্টরা অস্ত্রের সাহায্য ছাড়া এই দেশে কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না।’ হক সাহেবের কথাই ঠিক হলো। মুসলিম লীগের শামসুর রহমান ওই নির্বাচন কেন্দ্র থেকে জিতে গেলেন।