নাজির আহমাদের (১৯২৫ – ১৯৯০) বাপ-চাচা’রা হইতেছে পুরান ঢাকার লায়ন সিনেমা হলের মালিক ছিলেন; উনার দুই ভাই – হামিদুর রহমান (ভাস্কর, নভেরা আহমদের সাথে যিনি শহিদ মিনার বানাইছিলেন) ও সাঈদ আহমেদ (নাট্যকার ও লিটারারি ক্রিটিক) উনার চাইতে একটু বেশি ফেমাস…
কিনতু বাংলাদেশের সিনেমার শুরু’র দিকে উনারও ভালো কন্ট্রিবিউশন আছে, পাকিস্তান হওয়ার পরে ঢাকার পয়লা ডকুমেন্টারি ফিল্ম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ঢাকা সফর নিয়া ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ (১৯৪৮) উনি বানাইছিলেন, সালামত (১৯৫৩-৫৪) নামে একজন ওস্তাগার’রে (রাজমিস্ত্রি) নিয়া আরেকটা ডকুমেন্টারি বানাইছিলেন বইলা জানা যায়… তবে উনার মেইন কন্ট্রিবিউশন হইতেছে সরকারি হেল্প নিয়া ঢাকায় এফডিসি এস্টাবলিশ করা, যেইখান থিকা ঢাকায় ফিল্ম প্রডিউস করা শুরু হয়…
তো, ১৯৬২ সাল থিকা উনি লন্ডনে থাকতেন, ১৯৮৪ সালে একবার ঢাকায় আসলে অনুপম হায়াৎ উনার এই ইন্টারভিউ’টা নেন এবং কেজি মোস্তফা সম্পাদিত সচিত্র বাংলাদেশ পত্রিকার ১৬/০১/১৯৮৫ সংখ্যায় লেখাটা ছাপান… অনুপম হায়াৎ-এর নেয়া ইন্টারভিউটাই আমরা এইখানে ছাপাইতেছি আবার!
…
আমার জন্ম নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে। আমাদের পরিবার জড়িত ছিল চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবস্থার সঙ্গে। ঢাকার লায়ন সিনেমা হলের মালিক ছিলেন আমাদেরই পরিবার। আমার আব্বা মীর্জা ফকির মোহাম্মদের সেই সুবাদে কোলকাতার অনেক চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিল যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা। ওখানকার অরোরা স্টুডিওর ঘোষ বাবুর সঙ্গে ছিল বাবার বন্ধুত্ব। আমার মামা হাসান সাহেবের নিউ সিনেমা কোম্পানি লি. নামে একটা চিত্র পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান ছিল। আমি আব্বার সঙ্গে প্রায়ই কোলকাতায় যেতাম এবং ওখানে ছবি দেখতাম। ওখানকার লোকজনও এখানে আসতেন। চলচ্চিত্রের সঙ্গে এভাবেই গড়ে ওঠে আমার একটা যোগাযোগ। আমি তখন স্কুলে পড়ি ইতিমধ্যেই মঞ্চের প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে গেছে। ১২ বছর বয়সে আমি একটি নাটকে চানক্য পণ্ডিতের ভূমিকায় অভিনয় করি।
১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করার পর ১৯৩৯ সালে যোগ দেই ঢাকা বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট ও ঘোষক হিসেবে। ওই বছরই ঢাকায় স্থাপিত হয় প্রথমে বেতার কেন্দ্র।
১৯৪২ সালে ঢাকা থেকে বদলি হয় যোগ দেই কোলকাতার বেতার কেন্দ্রে। নবাববাড়ির খাজা নসরুল্লাহ তখন এসেম্বলি মেম্বার ও ডেপুটি স্পীকার। তার কাছে ছিল ঢাকায় তৈরি প্রথম ছবি ‘লাস্ট কিস্’-এর দু’টো রীল আমি দেখি। এর আগে ছবিটা ১৯৩০ সালের দিকে মুক্তির সময় দেখতে পারি নি। যা দেখেছি তাতে ‘লাস্ট কিস্’কে ঠিক চলচ্চিত্র বলা যায় কিনা এ ব্যাপারে আমি সন্দিহান। এ ছবিতে খাজা নসরুল্লাহ, দেবী বাঈজী ও হরিমতির অভিনয় দেখেছি।
কোলকাতা বেতারে আমিই তখন একমাত্র মুসলমান ঘোষক এবং শেষ ঘোষকও। ওই সময় ভারতীয় তথ্য বিভাগের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার কর্মকর্তা ছিলেন এইচ সি হাশুম। যুদ্ধের সময় তৈরি নিউজ রীলে বাংলা কমেন্টারী দরকার। আমি মুসলমান বলে হাশুম যোগাযোগ করেন আমার সঙ্গে কমেন্টারীর ব্যাপারে। আমি নিউজ রীলে প্রথম ধারা বর্ণনায় কণ্ঠ দেই ১৯৪৪ সালে। তখন কেন্দ্রীয় সরকারের স্টুডিও ছিল চৌরংগী রোডে। আমি ওখানে অনেক নিউজ রীলে কণ্ঠ দেই। ওই সময় বাংলা প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে তথ্য-সংবাদ-প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হতো আরোরা ফিল্মি স্টুডিওতে। আমি ওখানে গিয়েও ধারাবর্ণনায় অংশ নিতাম। এভাবেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর আমি আবার ঢাকা বেতার কেন্দ্রে বদলী হয়ে আসি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ সাহেব আসবেন ঢাকায়। এখানে তার অবস্থানকালে কার্যক্রমের ওপর একটি তথ্য চিত্র তৈরি করতে হবে। কিন্তু তখন সরকারের ছবি তৈরি করার মতো সাজসরঞ্জাম নেই, কুশলী নেই, স্টুডিও নেই। মোহাম্মদ মুশতাক তখন জনসংযোগ পরিচালক। তিনি জানতে পারেন যে, আমি কোলকাতায় বিভিন্ন ছবিতে কাজ করেছি। ক্যামেরা, ছবি তোলা, স্টুডিও সম্পর্কে আমার জ্ঞান রয়েছে। তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন জিন্নাহ সাহেবের সফরের ওপর ছবি তোলার ব্যাপারে। এ নিয়ে মুশতাক ও আমি বেশ কদিন ধরে আলাপ-আলোচনা করি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় কোলকাতার অরোরা ফিল্মি স্টুডিওর সাহায্য নেয়ার। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি কোলকাতা গিয়ে অরোরা ফিল্মি স্টুডিও থেকে একজন অভিজ্ঞ ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসি যন্ত্রপাতিসহ। কায়েদ আজম এখানে ১১ দিন ছিলেন। রেডিওর একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি ছিলাম তার সঙ্গে। আর সঙ্গে ছিলেন ওই ক্যামেরাম্যানও। ছবি তোলার পর আমি তা কোলকাতায় নিয়ে যাই প্রসেস করার জন্য। ছবি সম্পাদনা ও ধারা বর্ণনা ছিল আমারই। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় ধারা বর্ণনা দেয়া হয়। ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ অনেকে এটাকে ‘পূর্ব পাকিস্তানে ১১ দিন’ নামে অভিহিত করলেও তা ভুল। বলতে পারেন ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ই হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের প্রথম চিত্র। কায়েদে আজমের সফরের এক মাসের মধ্যেই ছবিটা রিলিজ দেয়া হয় (১৯৪৮)।
১৯৪৯ সালে আমি বিবিসিতে যোগ দিই। ওই সময় রেডিওর প্রধান হন বোখারী সাহেব আর তার সহকারি হন এইচ সি হাশুম। হাশুমের সঙ্গে আগে থেকেই আমার জানাশোনা ছিল। ওই সময় তারা লণ্ডনে যান ব্রিটিশ মুভিটোনের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের চুক্তির ব্যাপারে। চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান থেকে শ্যুটিং করা যেসব ডকুমেন্টারী ও নিউজ রীল ব্রিটিশ মুভিটোনের পাঠানো হবে ওখানে সেসব প্রসেস করা হবে। আমি ওখানে সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব নিই। বিবিসির কাজ সেরে আমি প্রতিদিন ৫টার পর ব্রিটিশ মুভিটোন স্টুডিওতে ঢুকতাম আর সেখানে কাজ করতাম ১১টা পর্যন্ত। ওই সময় বিল ময়লার ছিলেন ব্রিটিশ মুভিটোনের একজন কর্মকর্তা। পরে তিনি কলম্বো প্ল্যানের অধীনে পাকিস্তানে আসেন সরকারের চলচ্চিত্র বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে। বলা যায়, বিল ময়লারের উদ্যোগেই জন্ম হয় পাকিস্তান সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দপ্তরের।
ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমীন। তিনি লণ্ডন এলে আমি তাকে ব্রিটিশ মুভিটোন স্টুডিও পরিদর্শনে নিয়ে যাই। ওখানে তিনি আমার কাজ দেখে বলেই ফেললেন, ‘এখানে আপনি তো ওদের (পশ্চিম পাকিস্তান) জন্য ছবি বানাচ্ছেন আমাদের (পূর্ব পাকিস্তান) জন্য কি কিছু করা যায় না? আপনি দেশে ফিরে আসুন। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।’ তিনি আমাকে আরো বলেন দেশে ফেরার সময় যেন আমি ক্যামেরা নিয়ে যাই। পরে আমি তার কথা মতো একটা অ্যারিফ্লেক্স ক্যামেরা কিনে তার নামেই দেশে পাঠাই। ঢাকায় যখন এ ক্যামেরা খুলতে যাব তখন প্রদেশে নির্বাচনী প্রচারণা তুংগে। মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের রাজনৈতিক অবস্থান তখন প্রতিকূলে।
লণ্ডন থেকে দেশে ফিরে আমি জনংযোগ বিভাগে যোগ দেই চলচ্চিত্র বিষয়ে উপ-পরিচালক হিসেবে। আমার সহকারী হিসেবে ছিলেন আনোয়ার হোসেন (ডন পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক আলতাফ হোসেনের ছোট ভাই)। ক্যামেরা আমরা পেলাম, কিন্তু চালাবে কে? আমি যোগাযোগ করলাম সরকারের চলচ্চিত্র বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিটিশ মুভিটোনের সেই বিল ময়লারের সঙ্গে। তিনি মীর্জা নামে একজন ক্যামেরাম্যান পাঠান লাহোর থেকে। প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবে আমরা শুরু করলাম ‘সালামত’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজ।
সালামত ছিলেন আমাদের বাড়ির ওস্তাগার। বয়সের ভারে কুঁজো তার দেহ, হাড্ডিসার শরীর, কিন্তু মুখখানি বড় মায়ময় হাসি হাসি। এই সালামত ওস্তাগারের জীবনে কত বসন্ত এসেছে আর গেছে। ইট-চুন-সুড়কি-বালু দিয়ে কত দালান-কোঠা সে গড়েছে। সে দেখেছে ঢাকা শহরের উত্থান-পতন, পুরনো ঢাকা সদরঘাটের গিঞ্জি গলি, পলেস্তরা খসা বাড়ি-ঘর ছাপিয়ে মানুষ ছুটছে উত্তর এলাকা রমনা-সেগুনবাগিচা-আজিমপুরের দিকে। বাড়ছে শহর উঠছে নিত্য নতুন দালান-কোঠা, গড়ে ওঠছে নতুন রাজধানী শহর। সালামত এসবের সাক্ষী। সালামতের দৃষ্টিতে নতুন নির্মীয়মাণ ঢাকা শহর ছিল এ ছবির বিষয়। সালামতের কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা ছিল আমারই। ছবির সার্বক্ষণিক কাজে আমাকে সহায়তা দেন আবদুল আহাদ, তিনি ছবির সুরকারও। ঢাকায় সেসব প্রচলিত রাজমিস্ত্রীর কন্ঠের গান আমরা ছবিতে ব্যবহার করেছি। চিত্রগ্রহণের কাজে মীর্জাকে সহায়তা করেন হাবীব বারকী। ‘সালামতে’র আমরা দু’টো ভার্সন করি, একটি ছোট (এক হাজার ফুট)। ‘সালামত’ মুক্তি পায় ১৯৫৩-৫৪ সালে।
ছবি দেখে সরকারি কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী সবাই খুশী। খুশী হয় প্রদর্শকরাও। বুঝতে পারলাম, আমাদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। মনে সাহস বাড়ল। এবার শুরু করলাম একটি ফিল্মি স্টুডিও স্থাপনের প্রচেষ্টা। কারণ, পূর্ণাঙ্গ স্টুডিও ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত গড়ে তোলা যায় না। আমরা জানি যে, দেশ বিভাগের আগে কোলকাতা-বোম্বে-লাহোরের ফিল্মি স্টুডিও গড়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের ঢাকায় কোনো স্টুডিও হয় নি। এই স্টুডিওহীন পরিবেশেই আমি বানিয়েছি ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ (১৯৪৮) ও ‘সালামত’। তবে আমি বলব, ‘সালামত’ হচ্ছে এ দেশের চিত্রশিল্পের অগ্রপথিক। ‘সালামত’-এর কারণেই পরে ফিল্মি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার থেকে ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা অনুমোদন পাওয়া যায়। টাকা পেতে পেতে ৫৪ সালের নির্বাচন এসে যায়। ওই নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন হেরে যান। দুশ্চিন্তায় পড়লাম।, কারণ ফিল্মি ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নূরুল আমীন ছিলেন খুবই আগ্রহী। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমি তৎকালীন চীফ সেক্রোটারি এন এম খানের মাধ্যমে যোগাযোগ করি গভর্নর ইস্কান্দার মীর্জার সঙ্গে। ইস্কান্দাত্ম মীর্জা এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহ দেখান। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের আমদানী-রফতানী বিভাগের চীফ কন্ট্রোলার ওসমানীর কাছে চিঠি লিখেন ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি আমদানীর জন্য লাইসেন্স দিতে। আমরা যথাসময়ে লাইসেন্স পেয়ে যাই। যন্ত্রপাতি পেয়ে তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের ভেতর একটা খালি বিল্ডিংয়ে আমরা ল্যাব, প্রিন্টিং মেশিন রেকডিং ও প্রজেকশন রুম বসাই। এ জন্যে প্রয়োজনীয় স্টাফও নেয়া হয়। এদের মধ্যে ছিলেন চিশতি, কায়সার ও মোহসিন। ইতিমধ্যেই গভর্নর ইস্কান্দার মীর্জা বদলী হয়ে গেছেন।
অর্থ সংকট দেখা দেয়। আমার বেতন আসে সরকারি কোষাগার থেকে, কিন্তু স্টাফদের বেতন নিয়ে সমস্যা। আবার দুশ্চিন্তায় পড়লাম। এই সংকটের মধ্যেও আমরা কিছু সংবাদচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করি। এসবের মধ্যে রয়েছে ‘হুইল’ (তেজগাঁও ও টংগি শিল্প এলাকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের ওপর)।
বিজি প্রেসের ভেতর যে স্টুডিও তৈরি করা হয় সেটি ছিল অস্থায়ী ও সংকীর্ণ পরিসরের। আমরা স্থায়ী স্টুডিও স্থাপনের জন্যে শ্যুটিং-রেকর্ডিং প্রজেকশনের সুবিধাসহ আরো বড় জায়গা খুঁজছিলাম। সরকারের বিভিন্ন বিভাগে যোগাযোগ করে আমরা তেজগাঁওয়ে জমি পাই, সেখানে আজকের এফডিসি অবস্থিত। ওই সময় সরকারের প্রধান স্থপতি ছিলেন মি. ম্যাকোলেন। তিনি প্রথম স্টুডিও ফ্লোর ও ল্যাব বিল্ডিংয়ের ডিজাইন করেন। ম্যাকোনেলকে আমি এ ব্যাপারে লণ্ডন নিয়ে গিয়েছিলাম ব্রিটিশ মুভিটোন স্টুডিওতে। ওই স্টুডিও দেখেই তিনি ডিজাইন করেন। স্টুডিও প্রতিষ্ঠার জন্যে জায়গা পেয়েছিলাম গভর্নর ইসকান্দার মীর্জা ও চীফ সেক্রেটারি এন এম খানের অনুমোদনে। আজকে সেখানে এফডিসি হয়েছে, দিন-রাত কাজ হয়, ওই সময় সেখানে ছিল জঙ্গল। বড় বড় গাছপালা আর আগাছায় ভরা ছিল সেই স্থান। সেখানে আস্তানা ছিল বিষধর সাপের। সাপের ভয়ে কেউ সেখানে যাওয়ারও সাহস করতো না। এমনকি আমরাও সাপের উৎপাতে একবার জায়গাটা ছেড়ে দেয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু আমি পিছপা হইনি। শেষ পর্যন্ত বিষধর সাপের ভয়ের কাছে জয় হয়েছে আমাদের প্রচেষ্টা, ফিল্মি ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।
এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, ওই সময় অভিনয়-সংগীতকে কেউ ভালো চোখে দেখতো না। চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধারণা ছিল আরো খারাপ। ওদিকে বাঁধা ছিল বিদেশি ছবির এজেন্টদের কাছ থেকেও। সামাজিক ও ব্যবসায়িক বাঁধাকে অতিক্রম করতে যেয়ে আমার জীবনের ওপরও হামলা এসেছে। কিন্তু আমি পিছপা হইনি। আমার স্বপ্ন স্টুডিও প্রতিষ্ঠায় চলচ্চিত্রকে সামাজিককরণের। ওই সময় ঢাকায় আবদুল জব্বার খানের পরিচালনায় ‘মুখ ও মুখোশ’ নামে ছবির কাজ শুরু হয় সাইলেন্ট ক্যামেরায়। আমি এদের বললাম সাউণ্ড ক্যামেরায় কাজ করতে। কিন্তু উদ্যোক্তারা শুনল না। একটা পুরনো ক্যামেরা দিয়েই শুরু হয় এ ছবির কাজ। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমি ওটাকে সমর্থন করতে পারি নি। যা হোক, এ ছবির শ্যুটিং হয় এখানে কিন্তু, ডেভলপ করা হয় লাহোরে।
১৯৫৭ সালে আমি পশ্চিম পাকিস্তান গিয়ে জানতে পারি যে, সরকার ওখানকার চলচ্চিত্র শিল্প ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে এক কোটি টাকার লাইসেন্স দিয়েছে। আমি তখন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের জন্যেও দাবী করলাম। আমাকে জানানো হল কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হলে সমপরিমাণ টাকা বরাদ্দ দেয়া ওই হবে।
এ প্রেক্ষিতে বলে নেয়া ভালো যে, আমি যেমন চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যে টাকা চাইছি তেমন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের জন্যে টাকা চাইছিলেন আজিজুল হক। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানে চলছে যুক্তফ্রন্ট সরকার। শেখ মুজিবুর রহমান তখন প্রদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী আর আসগর আলী শাহ শিল্প সচিব এবং আবুল খায়ের শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব। আমি উপ-সচিবের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ১ কোটি টাকার কথা জানালাম। বললাম, কর্পোরেশন করলে এ টাকা পাওয়া যেতে পারে। মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সব শুনে আমাকে তার বাসায় ডাকেন। তখন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন শেষ হতে মাত্র দুদিন বাকি। শেখ সাহেব আমাদেরকে কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সত্বর কাগজপত্র তৈরি করতে বললেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে অধিবেশনের শেষ দিন শেখ মুজিবুর রহমান ইপি এফডিসি ও ইপিসিক প্রতিষ্ঠার জন্যে এক হাতে দু’টো বিল পরিষদে অনুমোদনের জন্যে পেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে বিনা বাধায় বিলটি পাশ হয়ে যায় আমরা তখন আনন্দিত। আমার চোখের সামনে ভাসছে পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপি এফডিসি)। ওই দিন সন্ধ্যে বেলায় আমি ও আবুল খায়ের আবার বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় যাই। উৎফুল্লিত শেখ সাহেব বললেন, “এফডিসি তো হয়ে গেল, আসগর আলী শাহকে চেয়ারম্যান বানিয়ে দিয়েছি। আবুল খায়েরকে এমডি। আর আপনাকে অপারেটিভ ডাইরেক্টর। এখন চলচ্চিত্রের জন্যে কাজ করুন গিয়ে।” তার উৎসাহ না থাকলে বোধ হয় এ দেশে এফডিসির জন্ম হতো না। আর হলেও হতো অনেক দেরীতে। আর এ দেশে ফিল্মি স্টুডিও করার পেছনে নূরুল আমীন, ইস্কান্দার মীর্জা, এন এম খানেরও অবদান রয়েছে। এটা ঐতিহাসিক সত্য। এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর পরই দেশে সামরিক আইন জারী হয়ে যায়।
স্টুডিও ফ্লোর নির্মাণের পর আমরা প্রথম শুরু করি ‘আসিয়া’ নামে একটি ছবির কাজ। গ্রামীণ জীবনভিত্তিক ‘আসিয়া’ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতের জন্যে একটি ‘টেস্কট ও ট্রেনিং’ ছবি করা। ‘আসিয়া’র পরিচালক ছিলেন ফতেহ লোহানী। কাহিনী ও সংলাপ আমার। ছবির নায়িকা হেনাকে (সুমিতা) যোগাড় করা হয় ফরিদপুর থেকে। চেহারা দেখে তার মুখে উচ্চারিত গ্রামীণ ভাষার উচ্চারণ শুনে তাকে নায়িকা নির্বাচিত করা হয়। আর ছবির নায়ক হন তৎকালীন মঞ্চাভিনেতা শহিদউদ দাহার। ছবির সংগীত পরিচালনা করেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও আবদুল আহাদ। প্রযোজনায় ছিলেন মোশারফ হোসেন। এ ছবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন নূরুল ইসলাম (এখন বিবিসিতে) আর চিত্রগ্রহণে ছিলেন বেবী ইসলাম ও কিউ এম জামান।
এফডিসি প্রতিষ্ঠার পর ‘আসিয়া’ সহ প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা চারটি ছবি নির্মাণের অনুমতি দেই। বাকি ছাবিগুলো হচ্ছে ফতেহ লোহানীর ‘আকাশ আর মাটি’, মহিউদ্দীনের ‘মাটির পাহাড়’ ও এ জে কারদারের ‘জাগো হুয়া সাভেরা’। সামরিক আইন জারির ফলে কেন্দ্র থেকে অর্থ পেতে দেরী হয়, প্রাদেশিক সরকারের সাহায্যে এফডিসি চলে। ইতিমধ্যেই আবুল খায়েরকে বদলী করে মফস্বলে পাঠানো হয়েছে, তার জায়গায় এমডি হয়ে আসেন চীফ সেক্রেটারির জনসংযোগ অফিসার খায়রুল কবীর। আর আমি এফডিসিতে ছিলাম ১৯৬২ সাল পর্যন্ত। আমার সময় এফডিসিতে ছবি করতে আসেন সালাউদ্দীন, এহতেশাম, মোস্তাফিজও। ওই সময় আমাদের ছবি নির্মাণের লক্ষ্য ছিল জীবনধর্মী সৃজনশীল কিছু করা। এফডিসির প্রথম ছবি ‘আসিয়া’ প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পায় আর ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ পায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। সংক্ষেপে এই হচ্ছে আমার স্মৃতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্মেষ।
বাছবিচার
Latest posts by বাছবিচার (see all)
- আমার স্মৃতিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্মেষ: নাজির আহমাদ - August 14, 2026
- (বই থেকে) বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মপ্রকাশ – কামরুদ্দীন আহমদ (এক) - March 14, 2026
- বাংলাদেশি ফিকশন: জমিদারি উচ্ছেদ – আবুল মনসুর আহমদ (১৯৪৫) - January 30, 2026