পূজা মূলত ধর্মীয় আচার। এর সাথে দেবদেবীর আরাধনা, ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং মানুষের আধ্যাত্মিক অনুভূতি জড়িত। তবে সামাজিক বাস্তবতায় পূজা শুধু ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সাথে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক পরিচয়, শিল্পচর্চা এবং সামষ্টিক আনন্দেরও সম্পর্ক তৈরি হয়।
বিশেষ কইরা দুর্গাপূজার ক্ষেত্রে এই বহুমাত্রিকতা স্পষ্ট। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা, সংগীত এবং মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ—সবকিছু মিলায়ে দুর্গাপূজা একটা বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে ওঠে।
আগে দেখতাম, দুর্গাপূজার আয়োজনে প্রতিমাই ছিল প্রধান আকর্ষণ। প্রতিমার সাথে মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জার বিষয়টাও থাকত। অবশ্য তখনও প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জায় শিল্পভাবনার প্রকাশ ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধইরা পূজার আয়োজনের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাইতেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিমার পাশাপাশি থিমও গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠেছে। কোথাও কোথাও প্রতিমার চাইতে মণ্ডপের থিম, নির্মাণশৈলী, আলোকসজ্জা কিংবা অভিনব উপস্থাপনাই বেশি গুরুত্ব পাইতেছে।
এই পরিবর্তনকে শুধু পূজার সাজসজ্জার পরিবর্তন হিসাবে দেখলে বিষয়টা পুরাপুরি বোঝা যাবে না।এর সাথে মানুষের রুচি, শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণ, দর্শক আকর্ষণের প্রতিযোগিতা এবং উৎসবের পরিবর্তিত ধরন জড়িত।
একটা বিষয় বোঝা দরকার। দুর্গাপূজা শুধু কোনো উৎসব কিংবা শিল্প প্রদর্শনীর নাম না। এর সাথে হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস, পুরাণ, দেবী দুর্গার উপাসনা এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের ধারণা যুক্ত। প্রতিমা সেই ধর্মীয় বিশ্বাসেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। ফলে পূজার আয়োজনের মধ্যে শিল্পের ব্যবহার থাকলেও সেই শিল্পের সাথে পূজার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের সম্পর্ক কী, সেই প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক না।
থিমভিত্তিক পূজা নিজে কোনো সমস্যা না। শিল্পের মধ্য দিয়া ধর্মীয় ভাবনা প্রকাশ করা যায়, পুরাণের কাহিনি নতুনভাবে উপস্থাপন করা যায়, এমনকি সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার সাথেও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সংযোগ তৈরি করা সম্ভব। কোনো থিম সরাসরি দেবী দুর্গার পৌরাণিক কাহিনির ওপর ভিত্তি কইরা নির্মিত না হইলেও তার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক কিংবা দার্শনিক প্রাসঙ্গিকতা থাকতে পারে। সমস্যা হইল, যখন থিমের সাথে পূজার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের কোনো সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকে না, অথচ শুধু অভিনবত্বের কারণে সেইটাকে সৃজনশীলতার উদাহরণ হিসাবে হাজির করা হয়।
শিল্পের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু শিল্পের স্বাধীনতা আছে বইলাই যেকোনো বিষয়কে যেকোনো প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করলেই তা অর্থবহ হয়া যায় না। একটা শিল্পকর্মের নিজস্ব বক্তব্য থাকতে পারে, তার নান্দনিক মূল্য থাকতে পারে, সামাজিক কিংবা দার্শনিক গুরুত্বও থাকতে পারে। কিন্তু সেই শিল্পকর্ম যখন একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসবের অংশ হয়া ওঠে, তখন তার শিল্পমূল্যের পাশাপাশি উৎসবটার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের কথাও বিবেচনায় রাখা দরকার।
এখানে একটা পার্থক্য বোঝা জরুরি। কোনো থিমের ধর্মীয় প্রাসঙ্গিকতা না থাকলেই সেইটা অর্থহীন শিল্পকর্ম হয়া যায় না। কিন্তু শিল্পকর্ম হিসাবে তার মূল্য থাকা আর দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্যের সাথে তার সম্পর্ক থাকা এক বিষয় না।এই দুই বিষয়কে এক কইরা দেখারও সুযোগ নাই।
মনগড়া থিমের সমস্যা বলতে আমি নতুন কোনো শিল্পভাবনার বিরোধিতা করতেছি না। নতুন কিছু তৈরি করা, প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়া ভাবা কিংবা নতুন নির্মাণশৈলী ব্যবহার করা—এইসবই শিল্পচর্চার স্বাভাবিক অংশ। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন পূজার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বোঝার চাইতে অভিনব কিছু তৈরি করা, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা কিংবা অন্য মণ্ডপের চাইতে আলাদা হয়া ওঠাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়া দাঁড়ায়।
দেবী দুর্গার উপাসনাকে কেন্দ্র কইরা যে উৎসব, সেখানে দেবীই যদি ক্রমশ একটা বৃহত্তর প্রদর্শনীর অংশ হয়া যান, আর মণ্ডপের থিমই যদি প্রধান আকর্ষণ হয়া ওঠে, তাইলে এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়া পূজার কোন দিকটা গুরুত্ব পাইতেছে? ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনা, নাকি দর্শককে চমকায়া দেওয়ার ক্ষমতা?
অবশ্যই কেউ বলতে পারেন, পূজা সময়ের সাথে বদলাবে, শিল্পীরা নতুনভাবে ভাববেন, নতুন উপকরণ ব্যবহার করবেন—এটাই স্বাভাবিক। কথাটা ঠিক। কোনো ঐতিহ্যকে চিরকাল একই রূপে আটকায়া রাখা সম্ভব না,প্রয়োজনও নাই। কিন্তু পরিবর্তন হইতেছে বইলাই তাকে উন্নতি বলতে হবে, এমন কোনো কথা নাই। নতুনত্বেরও বিচার দরকার। কোনো কিছু অভিনব হইলেই তা অর্থবহ হয়ে ওঠে না, আবার পুরোনো হইলেই তা অচল হয়া যায় না।
ঐতিহ্যের সাথে নতুনত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে হইলে ঐতিহ্যটাকে আগে বুঝতে হবে। তার ইতিহাস, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। তারপর সেই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করা যাইতে পারে। কিন্তু ঐতিহ্য সম্পর্কে যথেষ্ট উপলব্ধি ছাড়াই শুধু নতুনত্বের নামে যেকোনো কিছুকে তার সাথে যুক্ত করাকে সৃজনশীলতা বইলা চালায়া দেওয়া যায় না।
আবার সব থিমভিত্তিক পূজাকে একইভাবে বিচার করাও ঠিক হবে না। কোনো থিম যদি দেবী দুর্গার পৌরাণিক তাৎপর্যকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করে, ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সমকালীন বাস্তবতার সংযোগ তৈরি করে কিংবা ঐতিহ্যের নতুন কোনো দিক উন্মোচন করে, তাইলে তা পূজার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
আপত্তি পূজার মণ্ডপে শিল্পের ব্যবহার নিয়া না। আপত্তি হইল, শিল্পের নামে পূজার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে আড়াল কইরা দেওয়ার প্রবণতা নিয়া। পূজার আয়োজন যত বড় হইল, মণ্ডপ যত অভিনব হইল কিংবা দর্শকের ভিড় যত বাড়ল, পূজার সার্থকতাও তত বাড়ল—বিষয়টা এমন না। কারণ একটা ধর্মীয় উৎসবের মূল্যায়ন শুধু তার দৃশ্যমান আয়োজন কিংবা মানুষের আকর্ষণ করার ক্ষমতা দিয়া করা যায় না।
আবার পূজার ধর্মীয় উদ্দেশ্য এবং তার সাংস্কৃতিক আয়োজন পরস্পরের বিরোধীও নয়। কিন্তু যখন সাংস্কৃতিক আয়োজনের একটা বিশেষ দিক এতটাই প্রাধান্য পায় যে পূজার মূল ধর্মীয় তাৎপর্যই আড়ালে চইলা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন সেই পরিবর্তন নিয়া আলোচনা করা দরকার। এই আলোচনা ঐতিহ্যবিরোধিতা না, ঐতিহ্যকে বোঝারই একটা প্রচেষ্টা।
দুর্গাপূজার পরিবর্তন হইতেই পারে। শিল্পীরা নতুনভাবে ভাববেন, নতুন কিছু তৈরি করবেন, প্রচলিত রীতিকে প্রশ্ন করবেন—এইসবের বিরোধিতা করার কোনো কারণ নাই। কিন্তু নতুনত্বের প্রতিযোগিতায় যদি পূজার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অর্থই গুরুত্ব হারায়, তাইলে সেই পরিবর্তনকে নিঃশর্তভাবে সৃজনশীলতার বিকাশ বইলা মাইনা নেওয়া যায় না।
ঐতিহ্যকে নতুনভাবে প্রকাশ করা আর ঐতিহ্যকে তার নিজস্ব প্রেক্ষাপট থিকা বিচ্ছিন্ন কইরা ফেলা এক বিষয় না। নতুনত্বের নামে ঐতিহ্যের অর্থকে আড়াল করা আর ঐতিহ্যকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করাও এক বিষয় না। এই পার্থক্যটা বোঝা জরুরি।
গৌতম কর্মকার
Latest posts by গৌতম কর্মকার (see all)
- দুর্গাপূজা, শিল্পের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় তাৎপর্য - October 21, 2026
- সিনেমায় পরিচিত আবেগের পুনর্ব্যবহার - May 30, 2026
- গৌতম কর্মকারের কবিতা - June 15, 2022