আমার পড়া সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রথম বই ছিলো শবনম। তখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। বেশিদিন আগের ঘটনা না। দুনিয়া জুড়ে তখন করোনা চলতেছিলো। কোয়ারেন্টাইনে বসে নানান কিছু এক্সপ্লোর করতেছি।

শবনম উপন্যাস আমারে মুগ্ধ করলো। তারপরে দেশে-বিদেশে পড়লাম, নির্বাচিত রম্য রচনা পড়লাম, বেশকিছু গল্প পড়লাম। সবগুলাই অসাধারন লাগলো। মুজতবার গল্প বলার একটা ইউনিক স্টাইল আছে। একটা সিগনেচার আছে। পান্ডিত্যের প্রকাশ আছে। বিশেষ করে তার স্যাটায়ার, বা গম্ভীর কোন ব্যাপারকে উপহাস করে হালকা করে দেওয়ার স্কিল। এই উপহাসও হাওয়ার উপর না, কোন যুক্তি বা পান্ডিত্য আছে। এই পুরা কম্বো আমাকে সৈয়দ মুজতবা আলীর দিকে প্রবল আকর্ষন করে।

কিন্তু আমাকে যেই ব্যাপারটা উসকাইলো সেটা হইতেছে, আমি এতোদিন পরে মুজতবা আলী কেন পড়তেছি? আমি তো টানা গল্প-উপন্যাস পড়তেছি ক্লাস সিক্স থেকে। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে, বিশাকের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরির থেকে, বাপের পকেট কিংবা মায়ের ভ্যানিটি বেগের টাকা মেরে। তখনো এন্ড্রয়েড ফোন হাতে আসে নাই। পিডিএফ পড়ার সুযোগ ছিলো না।

আবার মুজতবা আলী আমার নিজের এলাকার লোক। আমাদের সিলেটের লোক। তার পিতৃভূমি মৌলভীবাজার, আমার জেলা। আমার স্কুল ছিলো সৈয়দ মুজতবা আলী রোডে। আমি কেন মুজতবা আলীকে আবিষ্কার করতেছি ইউনিভার্সিটি উঠে?

এই ঘটনা আমার একার সাথে ঘটে নাই। আমার আশপাশের বই পড়ে এমন ইয়ার-দোস্তদের কখনো মুজতবা আলী পড়তে দেখি নাই। যখনই জিজ্ঞেস করছি মুজতবা আলী, শাহেদ আলী, আবুল মনসুর আহমদ পড়ছে কিনা, সবাই মাথা ডানে-বামে ঘুরায়ে না বলছে। শরৎ, সুনীল, রবীন্দ্রনাথ, শীর্ষেন্দু, সত্যজিৎ পড়ুয়াই বেশি। একমাত্র বাংলাদেশি হিসাবে হুমায়ুনের পাঠক অনেক। শহীদুল জহির, হাসান আজিজুল, ছফা পড়ুয়া পাওয়া যাইতো কিছু।

কিন্তু এই ঘটনাটা ঘটলো কিভাবে? বাংলাদেশের সাহিত্যের ল্যান্ডস্কেপ থেকে বাংলাদেশ গুম হয়ে গেলো কিভাবে? হুমায়ুন আহমেদকে বাদ দিলে। আমার মতে হুমায়ুন একটা বড় ইন্টারভিন করছেন। কিন্তু হুমায়ুনের জনপ্রিয়তারে অনেক কষ্টে “বাজারি লেখক” বলে চালাই দেওয়া গেছে। বাকিদের ব্যাপারে এতো কষ্ট করতে হয় নাই৷

মানে ব্যাপারটা হইতেছে টেস্ট ঠিক করে দেওয়ার। স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেওয়ার। কোনটা ভালো সাহিত্য, কোনটা মাঝারি বা খারাপ সাহিত্য – তা ঠিক করে দেওয়ার। অনেকটা কোন ডিভাইসের বিল্ট-ইন সেটিংসের মতো। এই সেটিংস কাস্টমাইজ করা যায় না, এমন না। কিন্তু কাস্টমাইজ যে করা যায়, আরো ভালো ফিচার যে আছে, এইটা বেশিরভাগেই জানবে না৷

বাংলা সাহিত্য তেমনি ব্যাপার। যেখানে বিল্ট-ইন সেটিংসে বাংলাদেশ নাই। আছে কলকাতার জমিদার, আপার-কাস্ট শিক্ষিতের রুচি। বিশ শতকের কলকাতার নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবন, স্ট্রাগল এবং খুব সবধানী মাপা-মাপা প্রমিতপনা। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের জীবন-যাপন নাই, তার জীবন-যাপনের সাথে জড়িত কোন কিছু নাই। বাংলাদেশ বা পূর্ব-বাংলা মানেই ক্ষেত, নাক-সিটকানো ঘটনা, গ্রামের চাচাতো ভাই।

এই যে একটা জনগোষ্ঠীর জীবন-যাপন এবং কৃষ্টিকে গুম করে রাখা, ভুলিয়ে দেওয়া বা ইনফেরিয়র হিসাবে সেলফের পিছনে ঠেলে দেওয়া – এই ঘটনাই কলোনাইজেশন। একটা জনগোষ্ঠীর মানসিকভাবে গোলাম হয়ে থাকা। নিজের দিকে তাকাইতে না পারা। কিছু সেট করে দেওয়া স্ট্যান্ডার্ডের মতো করে নিজের চিন্তা, এস্থেটিকস ইত্যাদির গড়ন দেওয়া। ফেরান লাভলি মেখে যেমন আপনাকে একটু সাদা হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, তেমনি দুই-চারটা কলকাতার বই পড়ে জাতে উঠার চেষ্টা করতে হবে।

বাংলাদেশের সাহিত্য কলকাতার কলোনি হয়ে আছে দীর্ঘকাল ধরে। এইখানে যারা কলকাতার লেখকদের ভালো নকল করতে পারে, তারাই ভালো সাহিত্যিক। এর বাইরে যেনো সবই চাষা-ভূষার সাহিত্য। কিন্তু, বাস্তবে এই চাষা-ভূষার সাহিত্যই অর্গানিক সাহিত্য। এর বাইরের কলকাতাই সাহিত্যকে বরং আর্টিফিশিয়াল সাহিত্য বলা যায়। বাংলা সাহিত্য বলে চালাই দেওয়া হইতেছে, কিন্তু মেজোরিটি জনগোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করতেছে না৷

বাংলাদেশ পিরিয়ডে বাংলা সাহিত্য তেমন একটা হয় নাই, আমার ধারনা। এর কারন, বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী একটা থিওলজি বাংলা সাহিত্য বুঝা-পড়া, স্ট্যান্ডার্ড ঠিক হওয়ার ক্ষেত্রে প্রবলভাবে কাজ করছে। বাংলা গান এবং সিনেমার সাথে তুলনা করলে এইটা বুঝা যাবে। গানে (বিশেষ করে ব্যান্ড মিউজিকে) এবং সিনেমায় বাংলাদেশকে যেভাবে সেন্টারে পাওয়া যাবে, গল্প-উপন্যাস-কবিতায় তেমনটা পাওয়া যাবে না।

যার কারনে, সিনেমায় আমরা মাঝে মাঝে কলকাতার সিনেমাকে ইন্ডিয়ান-বাংলা সিনেমা বলতে পারি। কিন্তু সাহিত্যে কলকাতার সাহিত্যকে ইন্ডিয়ান-বাংলা সাহিত্য বলতে পারি না। বাংলা সাহিত্য মানেই বাই-ডিফল্ট কলকাতাই সাহিত্য।

তো, আমার ধারনা বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদী বেইস থেকে উৎপাদিত সাহিত্য, যেখানে ক্যলকেশিয়ান সাহিত্যবোধ-ই স্ট্যান্ডার্ড বা কিবলা, তা মিনিংফুল কিছু কনট্রিবিউট করতে পারে নাই। করতে পারবেও না। বাংলাদেশকে সেন্টারে না রেখে মিনিংফুল কিছু কনট্রিবিউশন সম্ভব না। বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যের এই কিবলা পরিবর্তন জরুরি।

The following two tabs change content below.
Avatar photo

মো: আরিফুল হক

টুকটাক গল্প লেখি, কবিতা লেখি, অনুবাদ করি। এছাড়া পলিটিক্স নিয়া আগ্রহ আছে। প্রফেশনে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।