১। মাসুদ রানা নিয়ে একটা কমন সমালোচনা হচ্ছে, “ওটা তো জেমস বন্ডের নকল”।
প্রথমত, মাসুদ রানা সৃষ্টির প্রেরণা যে জেমস বন্ড, তা স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন সরাসরিই বলে গেছেন। এবং ফ্লেমিঙের বই থেকে বেশকিছু মাসুদ রানার বই এডাপ্টও হয়েছে।
তারপরেও কথা থেকে যায়।
মাসুদ রানা ইংলিশ জেমস বন্ড না। সে বাঙালী, এবং বাঙালীর বেশকিছু বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে বিদ্যমান। সে আবেগপ্রবণ, দয়ালুও। রাঙার মা নামে একজন বৃদ্ধাকে সে আশ্রয় দিয়েছিল নিজের বাসায়।
রাহাত খান অবশ্যই M এর আদলে তৈরি, কিন্তু এম নন। তিনি রানাকে এজেন্ট যতোটা মনে করেন, তারচেয়েও বেশি নিজের সন্তান মনে করেন। এটা আপনি ব্রিটিশ বসের মধ্যে পাবেন না।
রানা-রাহাত খানের সম্পর্কটাও তাই ইউনিক। রানা জীবনে কখনো রাহাত খানের সামনে সিগারেট খায়নি (সম্মান দেখানোর বাঙাললী টেকনিক), তার সামনে বেশিক্ষণ বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ করে। আবার, খুবই রেয়ার অকেশনে, রাহাত খানকে ঝাড়িও দেয়। ঠিক আপন সন্তানের মতোই।
সোহেল চরিত্রটাও নিঃসন্দেহে ফেলিক্স থেকে ইন্সপায়ার্ড। কিন্তু সেখানে আটকে থাকেনি। সোহেলের মাধ্যমে আসলে কাজী আনোয়ার হোসেন দেখিয়েছেন যে রানা ডেস্কজবে কেমন হতো।
এবং পাকিস্তান আমলে যেমন তেমন, স্বাধীনতার পর থেকে মাসুদ রানার টোন, ন্যারেশন ছিল ইউনিক।
যারা মোটাদাগে বলে দেন যে রানা বন্ডের “নকল”, তারা না পড়েছেন জেমস বন্ড, না পড়েছেন মাসুদ রানা।
২। স্বাধীন বাংলাদেশে (মাসুদ রানা সিরিজের) প্রকাশিত প্রথম বই কোনটি বলেন তো?
উত্তরটা আমিই বলে দেই। মাসুদ রানা’র “এখনো ষড়যন্ত্র”।
হয়ত রানা’র “সেরা উপন্যাস” এর তালিকায় এই বইকে কেউই রাখবেন না। কিন্তু আমার মতে এটা মাসুদ রানা’র অন্যতম প্রভাবশালী উপন্যাস। এই বইটিই স্বাধীন বাংলাদেশে বিসিয়াই এর ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয়। তারচেয়ে বড় কথা, একটি জ্বলন্ত প্রশ্নের উত্তর দেয় এই বই।

“মুক্তিযুদ্ধে পিসিয়াই এর ভূমিকা কী ছিল?”
রাহাত খান ছিলেন পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (পিসিয়াই) এর প্রধান। সেই হিসাবে পাকিস্তান সরকার যন্ত্রের এক স্পর্শকাতর পদে আসীন। কিন্তু তিনি ছিলেন বাঙালী। শুধু এই কারণেই পাকিস্তানিরা তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে।
পাকিস্তানিরা অবশ্য জানতো না যে রাহাত খান বাংলা’র স্বাধীকার আন্দোলনকে মনে মনে সমর্থন করেন। কিন্তু প্রফেশনালিজমের কারণে তিনি নিজের এই ব্যক্তিগত অবস্থান তাঁর কাজে কখনো বাধা হতে দেন নি।
তিনি জানতেন যে পাকিস্তানিরা তাঁকে টার্গেট করবে। সেই মতো তিনি প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই তিনিও ঘুণাক্ষরে ভাবেন নি পাকিস্তানিরা কতোটা হিংস্র হতে পারে।
২৫শে মার্চ তিনি অপারেশন সার্চলাইট সম্পর্কে জানতে পারেন। আরো জানতে পারেন, এই অপারেশনের প্রথম প্রহরেই পিসিয়াই এর সমস্ত বাঙালী অফিসারকে হত্যা করা হবে। ফিল্ড এজেন্ট হোক বা অফিস স্টাফ।
সাথে সাথে রাহাত খান নিজের সিদ্ধান্ত বদল করেন। আত্মগোপন না করে তিনি নিজেকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেন বাকিদের বাঁচানোর জন্য। এবং তিনি তাঁর বাসার ফোন থেকে পিসিয়াই এর সব বাঙালী অফিসারকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন। শুধু রেহানা কে উনি জানাতে পারেন নি। ওর বাসার ফোনটা নষ্ট ছিল।
রেহানা ছিল রানার পিএস। রাহাত খান রানাকে ফোন দিয়ে ৩টি নির্দেশ দেন।
১। রেহানাকে সিকিওর করা (ফার্স্ট প্রায়োরিটি)
২। ভুলেও ধানমন্ডির দিকে (রাহাত খানের বাসা) না আসা।
৩। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া।
রানা ঝড়ের বেগে রেহানার বাসায় যায়। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
শি ওয়াজ ব্রুটালি রেপড অ্যান্ড মার্ডার্ড।
দ্বিতীয় নির্দেশটা লংঘন করে রানা বসকে সিকিওর করতে যায়। কিন্তু ওখানেও দেরিতে পৌঁছায়। পাকিস্তানি আর্মি রাহাত খানকে ধরে নিয়ে গেছে। সোহেলও রাহাত খানকে সিকিওর করতে এসেছিল। তারও পৌঁছাতে দেরি হয়।
তবে ৩য় নির্দেশ পালন করতে কোন দেরি করেনি দুই বন্ধু।
৩। পিসিয়াই থেকে বিসিয়াই। এবং রানা এজেন্সি।
মাসুদ রানা ছিল পাকিস্তান আর্মির এক মেজর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেটেরান মেজর জেনারেল রাহাত খান যখন পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (পিসিয়াই) গঠন করেন, তখন তিনি সেনাবাহিনী থেকে রানাকে হ্যান্ডপিক করেন। রানা সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সে যোগ দেয় এবং খুব অল্প সময়ে নিজেকে পিসিয়াই এর সেরা এজেন্ট হিসেবে প্রমাণ করে।
৭১ সালে যুক্তিযুদ্ধের সময় পিসিয়াই এর বাঙালী অফিসারদের উপর পাকিস্তানি আর্মি সাড়াশি আক্রমণের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনাটা মোটামুটি ভেস্তে যায় রাহাত খানের জন্য। তবে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়। রাহাত খান পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী হন।
রানা, সোহেল সহ পিসিয়াই এর সমস্ত ফ্রন্টলাইন এজেন্ট মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয় এবং দেশকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রানাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাদের স্পাই নেটওয়ার্ককে বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স তথা বিসিয়াই।
রাহাত খান পাকিস্তানে বন্দী। এমতাবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানকে দাঁড়া করানোর জন্য সর্বস্ব ঢেলে দেয় এজেন্টরা। সোহেলকে চিফ এডমিনিস্ট্রেটর করা হয়। সোহেলকে ফ্রন্টে রেখে রানা বিসিয়াই এর কর্মকাণ্ড শুরু করে। বিসিয়াই আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্রগুলো নস্যাতের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেয় রানা। এবং কাজের সুবিধার জন্য সবাইকে জানানো হয় যে রানা আর বিসিয়াই এর সাথে নেই। এমনকি সোহানাও এমনটাই জানতো। আসল সত্যটা জানতো কেবল সোহেল।
রানা ফিল্ডে আর অফিসে সোহেল। এভাবে দুইবন্ধু খেটেপিটে বিসিয়াইকে দাঁড় করায়।
এরপর রানা পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ করে রাহাত খানকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তাঁকে বিসিয়াই এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সমস্ত সত্তুর দশক জুড়ে বিসিয়াই এর সাথে পিসিয়াই এর সংঘর্ষ চলতে থাকে। রানা রেহানা হত্যাকারী নাসিরকে (সেও পিসিয়াই এর প্রতিষ্ঠাকালীন এজেন্ট এবং রানার একসময়ের বন্ধু) খুঁজে বের করে হত্যা করে। রেহানা হত্যার প্রতিশোধ নেয়।
রাহাত খান ফেরার কয়েক বছর পরেই সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে রাহাত খান মাসুদ রানাকে বিসিয়াই থেকে বরখাস্ত করেন, দৃশ্যত বিনা কারণে।
কারোই হিসাব মিলছিলো না। বিশেষ করে রানার। কিন্তু প্রচন্ড আঘাত সত্ত্বেও সে ভেঙ্গে পড়লো না। নিজের রুটিরুজি নিশ্চিত করতে সে অনীতা গিলবার্টকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলো গোয়েন্দা সংস্থা “রানা এজেন্সি”।
এরপরে রানা মহাবিরক্তির সাথে লক্ষ্য করলো যে বিসিয়াই রানা এজেন্সিতে কেস পাঠাচ্ছে। এমনকি মাঝেমাঝে নির্দেশও পাঠাচ্ছে।
প্রথম কয়েকবার রানা হজম করে গেল স্রেফ রাহাত খানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কারণে। কিন্তু এটা বারবার হতে থাকলে সে রাহাত খানের সাথে দেখা করে এবং নিজের ক্ষোভ আর বিরক্তি প্রকাশ করে।
তখন রাহাত খান তাকে প্রশ্ন করেন, “আমার পক্ষে কি তোমাকে বিসিয়াই থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব?”
জবাবে রানা বলে, “অবশ্যই। চিফ হিসেবে যেকোনো এজেন্টকে বরখাস্তের এক্তিয়ার আপনার আছে।”
রাহাত খান বুঝতে পারেন যে তার শিষ্যটি তাঁর পরিকল্পনা ধরতে পারেনি। তাই সে ক্ষুদ্ধ আছে।
রাহাত খান জিজ্ঞাসা করেন, “বিসিয়াই এর প্রতিষ্ঠাতা কে?”
রানা অবাক হয়ে জবাব দেয়, “কেন? আপনি।”
হেসে ফেলে রাহাত খান বলেন, “আমি পিসিয়াই এর কথা বলিনি। বিসিয়াই এর প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে মাসুদ রানা। সেই মানুষকে আমি কেন, কারোই বিসিয়াই থেকে বরখাস্তের অধিকার নেই। কারণ, তুমি যেখানেই থাকো, তুমিই বিসিয়াই।”
এটা করা হয়েছিল, কারণ বিসিয়াই নানা কারণে অনেক জায়গায় নাক গলাতে পারতো না। সেখানে একটা গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে নাক গলানো অনেক সহজ ছিল।
ধীরে ধীরে রানা এজেন্সির ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে এবং এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি হয়ে উঠে। বিসিয়াই এর সাথে রানা এজেন্সির সম্পর্ক গোপন রাখার স্বার্থে এজেন্সির হেড অফিস লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়। এই কাজে সাহায্য করেন ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের চিফ মারভিন লংফেলো।
রানা কিন্তু এখন আর কাগজেকলমে বিসিয়াই এজেন্ট নেই। প্রয়োজনও নেই। কারণ মাসুদ রানাই তো বিসিয়াই।
আমি যতোদিন মাসুদ রানা ফলো করেছি (২০১০ এর দিক পর্যন্ত) ততোদিন পর্যন্ত এটাই ছিল মাসুদ রানার সেট আপ এবং টাইমলাইন।
এই কারনে, মাসুদ রানা হইতেছেন বাংলাদেশি স্পাই।
২২শে জানুয়ারি, ২০২২
…
রেফারেন্সঃ
বিসিয়াই প্রতিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধকালে রানা, রাহাত খান আর সোহেলের ভূমিকা, রেহানার মৃত্যু, রাহাত খানের বন্দী হওয়া এই ব্যাপারগুলো “এখনো ষড়যন্ত্র”তে উল্লেখ আছে। পরের উপন্যাস “প্রমাণ কই”এও কিছু জিনিষ উল্লেখ আছে।
রাহাত খানকে উদ্ধার করা নিয়ে কাহিনী হচ্ছে “বিপদজনক”।
“নীল আতংক” তে রানা এজেন্সি গঠিত হয়।
“বিদায় রানা” তে রানাকে বিসিয়াই থেকে “বহিষ্কার” করা হয়।
“পপি”তে রাহাত খান রানাকে বহিষ্কারের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেন।
সাজেদুল হক (রনি)
Latest posts by সাজেদুল হক (রনি) (see all)
- মাসুদ রানা: বাংলাদেশি স্পাই - জানুয়ারি 20, 2026