অ্যাডোলফি চেম্বারের সিঁড়ি বাইয়া উঠার সময় আমার একটু প্যারা লাগতেসিল। পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় যেমন প্যারা লাগে, ওইরকম। নতুন কারো সাথে দেখা হওয়ার সময় আমার এমনিতেই নার্ভাস লাগে, কিন্তু এইবার সেই ‘নতুন মানুষ’টা ছিল মান্টো। যার সাথে আমার প্রথমবার দেখা হবে। তাই প্যারাটা বাইড়া বিরক্তির পর্যায়ে চইলা যাইতেসিল। আমি শহিদরে কইলাম, “চলো ফিইরা যাই, মান্টো মনে হয় বাসায় নাই।” কিন্তু শহিদ আমার সব আশায় পানি ঢাইলা দিল।

“সন্ধ্যাবেলা মান্টো বাসায়ই থাকে, এই সময়ে সে বইসা বইসা মদ খায়।”

এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হইলো, আমি মনে হয় ভূত দেখসি। মান্টো তো মান্টো, এরপর আবার মাতাল মান্টো! কিন্তু ভয় পাওয়ারই বা কী আছে? সে কি আমারে খায়া ফেলবে নাকি। যত ত্যাড়াব্যাঁকা কথাই উঠুক, বিষয় না। আমিও তো হালকা কোনো বুদবুদ না যে ফুঁ দিলেই উইড়া যাব। তো এইসব ভাবতে ভাবতে, ধুপধাপ ধুলা উড়াইতে উড়াইতে আমরা সেই ভাঙাচোড়া সিঁড়িটা দিয়া উপরে উঠলাম। মান্টোর বাসায়। দরজা হালকা কইরা খোলা ছিল। ঢোকার সময় ঘরটা দেইখা মনে হইলো অনেকটা ড্রয়িং রুমের মতো। একটা কোণে সোফা, আর অন্য কোণে একটা খাট রাখা। ধবধবে সাদা-পরিষ্কার একটা চাদর বিছানো। জানালার পাশে একটা টেবিল ভর্তি বই। টেবিলের সামনেই একটা লোক বইসা আছে, যারে প্রথম নজরে দেইখা মনে হবে বড়সড় একটা পোকা! বা ওইরকমই কিছু।

আমাদেরকে দেইখা অবশ্য মান্টোরে খুবই উৎফুল্ল মনে হইলো, “আরে আসেন আসেন।” ও বেশ আপ্যায়নের ভঙ্গিতে উইঠা দাঁড়াইলো। চেয়ারে বইসা থাকলে যেমন ছোটখাটো লাগে, পুরাপুরি উইঠা দাঁড়াইলে ভুলটা ভাঙে। বুঝা যায়, ও এমনিতে বেশ লম্বা। আর যখন ও একটু বেশিই সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ওরে দেইখা খুব ভয়ংকর কেউ মনে হয়। একটা খসখসে সুতি কুর্তা-পাজামার সঙ্গে জওহর-কাটের কোটি পরা মান্টো।

ও দাঁত দেখায়া হাইসা বললো, “আরে আমি তো ভাবসিলাম আপনে মনে হয় কালো আর রোগা কেউ হবেন।”

আমিও জবাব না দিয়া পারলাম না, “আর আমি ভাবসিলাম আপনে চিল্লাফাল্লা করা অসহ্য একটা পাঞ্জাবি লোক।”

এরপরই আমরা দুইজন এমন সব আলাপে মইজা গেলাম যে দুইজনেরই মনে হইতে থাকলো, আমাদের আগে দেখা না হয়া বহুত বড় ‘লস’ হয়া গেছে। তাই যত কম সময়ে যত বেশি আলাপ কইরা ক্ষতি পুষানো যায়, তারই চেষ্টা করতেসিলাম মনে হয়। এক মুহূর্তও দেরি সইতেসিল না আমাদের। এক-দুইবার আমাদের মাঝে ঝামেলা লাগসে, কিন্তু তখনো যেহেতু একটু রাখঢাক আছে তাই পরেরবার দেখা হওনের জন্য ওই বিষয়গুলা আমরা একটু সাইডে সরায়া রাখলাম। কয়েক ঘণ্টা ধইরা আমাদের চোয়ালগুলা বোধহয় এক মিনিটের জন্যও থামে নাই। মেশিনের মতো দ্রুতগতিতে একেকটা বাক্য জন্ম নিতেসিলো। আর কিছুক্ষণ আলাপের পর আমি বুঝতে পারলাম, মান্টোরও সবকিছু না শুইনা মাঝখানে কথা কয়া ফালানোর অভ্যাস আছে। এইটা বুঝার পর আমার দিক থিকা আর কোনো ভদ্রতা বাকি থাকলো না। এরপরে আলাপটা তর্কের পর্যায়ে পৌঁছায়া গেল, এরপর বাদ-বিবাদ। অবাক হয়া দেখলাম, আলাপের কিছুক্ষণের মাথায়ই আমরা একজন আরেকজনরে অতি সাহিত্যিক ভাষায় ‘স্টুপিড’, ‘ইডিয়ট’ আর ‘অযৌক্তিক’ ইত্যাদি নামে ডাকাডাকি করতেসিলাম।

এইসব বাক-বিতণ্ডার মাঝে হঠাৎ আমি চোখের কোণ দিয়া ওর দিকে তাকাইলাম। মোটা চশমার ফাঁক দিয়া তার উজ্জ্বল কালো চোখগুলা দেইখা আমার ময়ূরের পেখমের কথা মনে পইড়া গেল। কিন্তু এই চোখ আর ময়ূরের মধ্যে কীসের সম্পর্ক? আমি জানি না। কিন্তু যখনই ওর চোখের দিকে তাকাইতাম, আমার ময়ূরের পেখমের কথা মনে পড়তো। হয়তো তর্কের সময় জেদ আর একগুঁয়েমিতে ওর চোখগুলা ঝিলিক দিয়া উঠতো। ওর চোখগুলা দেইখা এক মুহূর্তের জন্য আমার হার্টবিট থাইমা গেল। এই চোখগুলা আমি আগে কোথাও দেখসি। খুব কাছ থিকা দেখসি। মন খুইলা হাসতে দেখসি, খুব সিরিয়াস, মাইপা দেওয়া ভদ্র হাসিও দেখসি। বিদ্রূপের ভঙ্গিতে এই চোখগুলারে আমি বারবার ধনুকের মতো বাঁইকা যাইতে যেমন দেখসি, ঠিক তেমনি কারো মৃত্যুতে পাথর হয়া যাইতেও দেখসি। ঠিক একইরকম নাজুক হাত-পা, কপালের উপর এক গোছা চুল, হলদেটে গাল আর এবড়ো-খেবড়ো দাঁত। হঠাৎ কইরা হুইস্কি খাইতে গিয়া মান্টো বিষম খাইলো। এরপর ভয়ঙ্কর কাশি। এই কাশিটা পর্যন্ত আমার পরিচিত। ছোটবেলায় শুনছি। কেন জানি আমার অস্বস্তি লাগা শুরু হইলো আর আমি বইলা উঠলাম, “আপনি মোটেও ঠিক কইতেসেন না।” এরপর আমাদের মধ্যে আসলেই ঝগড়া লাইগা গেল।

“আপনার কথার কোনো মাথামুণ্ডুই নাই।”
“খুবই আজাইরা আলাপ।”
“এইটা কোনো কথা না ইসমত বোন ।”
আমি রাইগা গিয়া কইলাম, “আমারে বোন ডাকতেসেন কেন?”
“এমনেই। যদিও এমনিতে আমি মহিলাদেরকে বোন বলি না। এমনকি নিজের বোনকেই বলি না।”
“তাইলে আপনি আমার সাথে মজা নিতেসেন?”
“না, এইটা কেন মনে হইলো?”
“কারণ আমার ভাই সবসময় আমার সাথে মজা নিতো, আমার উপরে যাচ্ছেতাই অত্যাচার করতো। হয় নিজে মারতো আর নয় অন্য কাউরে দিয়া আমারে মাইর খাওয়াইতো।”

এইটা শুইনা মান্টোর হাসি আর থামেই না।

“তাইলে তো আমি অবশ্যই আপনারে বোন ডাকব।”
“ঠিক আছে। কিন্তু মনে রাইখেন, আমার ভাইরা কিন্তু আমারে নিয়া খুব একটা ভালো কিছু ভাবে না। আপনার তো কাশি হইসে, চিকিৎসা করান না কেন?”
“চিকিৎসা? ডাক্তাররা সব গাধা। তিন বছর আগে ডাক্তাররা কইলো আমার টিবি হইসে, এক বছরের মধ্যে মইরা যাব। বুঝাই যাইতেসে, ওদের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা কইরা দিয়া আমি এখনো মরি নাই। আর এখন আমার কাছে ডাক্তারদের গাধাই মনে হয়। এর থিকা বেশি বুদ্ধি তো হিপনোটিস্ট আর ম্যাজিশিয়ানদের আছে।”
“একজন খুব গুরুজন লোকও এই কথাই কইতো।”
“সে কে?”
“আমার ভাই আজিম বেগ। সে এখন নয় টন মাটির নিচে শুইয়া আছে।”

এরপর কিছুক্ষণ আমরা আজিম বেগের আর্ট নিয়া আলাপ পাড়লাম। শহিদ আর আমি শুধু দেখা করতেই আসছিলাম কিন্তু রাত প্রায় এগারোটা বাইজা গেছে আর আমরা এখনো এইখানেই বইসা আছি। শহিদ অবশ্য আমাদের আলাপে তেমন অংশ নিতেসিল না। ওর খুদা লাগসিল। ও বললো, আমরা মালাডে পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে রাত একটা বাইজা যাবে। তাই আমাদের এইখানেই কিছু একটা খায়া নেয়া উচিত। মান্টো তখন আমারে আলমারি থিকা প্লেট-চামচ বাইর করতে কইলো আর নিজে একটা হোটেল থিকা খাবার আনতে গেল।

একটু পরে সে ফিইরা আসলো। বললো, “ওই বোয়াম থিকা একটু আচার বের কইরা নেন।” এইটা বইলা খাবারটা সামনে রাইখা সে আবার ওই চেয়ারে গুটিসুটি মাইরা বসতে গেল। একটু আগে যে টেবিলে বহু সাহিত্যিক তর্ক-বিতর্কের ধোঁয়া উড়সে, এখন ওইটাই ডাইনিং টেবিল হয়া গেসে। আর আমরাও কোনো ফর্মালিটি ছাড়াই খাওয়া শুরু করলাম। আমাদের দেইখা মনে হইলো, এইখানে মনে হয় বহু বছর ধইরা আমরা এমনেই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করতেসি।

খাওয়ার সময়ও একটা বাক-বিতণ্ডা হইলো। একটু পরপরই ও ‘লিহাফ’ গল্পটার কাছে ঘুইরা-ফিইরা আসতেসিল। এইটা নিয়া আমার আর আলাপ আগাইতে ভাল্লাগতেসিল না। আমি এড়ানোর চেষ্টা করসি, কিন্তু সে এই গল্পের একেবারে আগাগোড়া, সবকিছু নিয়া আলাদা কইরা আলাপের জেদ করতেসিল। আমি যে কইসি, এই গল্পটা লেখার কারণে আমি দুঃখিত, তা নিয়াও মান্টো বেশ হতাশ ছিল। সে আমারে ভীতু আর শ্যালো বইলা বকা দিলো। কিন্তু আমিও ‘লিহাফ’রে আমার মাস্টারপিস হিসাবে কোনোভাবেই মাইনা নিতেসিলাম না, আর মান্টো বারবার জেদ কইরা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা দুইজনে মিইলা লিহাফের প্রতিটা কোনাকাঞ্চি নিয়া আলাপ কইরা বেশ খোলামেলা আলাপ কইরা ফেলসি। আমি দেইখা অবাক হইলাম যে মান্টো এত ভদ্রভাবে কেমনে সবচেয়ে অশালীন বা নোংরা অবজার্ভেশনটা পর্যন্ত দিতে পারে, কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই। অথবা হইতে পারে ওর কাছে অবজার্ভেশনের কোনো মানেই নাই। ওর আলাপ শুইনা রাগ বা বিরক্তির বদলে আমার ভীষণ হাসি পাইতেসিল।

আমরা যখন বাইর হয়া যাব, তখন ও সাফিয়ার কথা কইলো। আমরা যতক্ষণ ছিলাম, ও মনে হয় সাফিয়ার কথাই ভাবতেসিলো।

“সাফিয়া খুব ভালো মেয়ে।”
“সাফিয়া দারুণ রান্না করে।”
“ওর সাথে দেখা হইলে আপনাদের ভাল্লাগবে।”
আমি জিগাইলাম, “এতই যদি মিস করেন তাইলে ওরে ডাইকা পাঠাইতেসেন না কেন?”
মান্টো আবার তার স্বভাবসুলভ বিদ্রূপে জবাব দিল, “আরে আপনি কি ভাবেন, আমি ওরে ছাড়া ঘুমাইতে পারতেসি না?”
আমি আলাপটা অন্যদিকে ঘুরানোর জন্য কইলাম, “ঘুমাইতে তো মানুষ ক্রুশের উপরেও পারে।”

মান্টো জোরে জোরে হাসা শুরু করলো।

আমি তখন একটু ষড়যন্ত্রের সুরে কইলাম, “আপনি কি সাফিয়ারে অনেক বেশি ভালোবাসেন?”
এইটা শুইনা সে আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাইলো, মনে হইলো আমি কোনো গালিটালি দিসি।
সে একেবারে চিৎকার কইরা উঠলো, “ভালোবাসা! আমি ওরে একেবারেই ভালোবাসি না।” চোখটোখ ঘুরায়া আবার কইলো, “আমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না।”
আমি একটু অবাক হওয়ার ভান কইরা কইলাম, “আপনি কখনো কাউরে ভালোবাসেন নাই?”
“না।”
“আর আপনার কখনো মাম্পস কিংবা মিজেলসও হয় নাই। কিন্তু হুপিংকাশি নিশ্চয়ই হইসে।”
এইটা শুইনা সে আবার হাসিতে ফাইটা পড়লো।
“আচ্ছা, ভালোবাসা দিয়া আপনি কী বুঝাইতেসেন? ভালবাসা খুবই জটিল একটা বিষয়। কেউ তার মারে, বোনরে, মেয়েরে…বউরে ভালোবাসে, আবার তার জুতারেও ভালোবাসে। আমার এক বন্ধু তার কুত্তারে ভালোবাসে, আর হ্যাঁ, আমি আমার ছেলেরে ভালোবাসতাম।” এই সময়ে ছেলের কথা মনে পড়ায় সে চেয়ার থিকা উইঠা দাঁড়াইলো।

“হলফ কইরা কইতেসি, ও খুব কম বয়সেই হাঁটা শুরু করসিল। পুরা ঘর ঘুইরা ঘুইরা ময়লা জমা করতো আর খাইতো। তবে সবসময় আমার কথা শুনতো ও।” অন্য সব বাপেদের মতো মান্টোও এমন কইরা তার ছেলের কথা কওয়া শুরু করলো, যেন সে অনেক বিশেষ কিছু।

“বিশ্বাস করেন, মাত্র ছয় বা সাতদিন বয়স থিকা আমি ওরে আমার বিছানায় ঘুম পাড়াইতাম। ভালো কইরা সারা শরীরে তেল মালিশ কইরা দিতাম। তিন মাসও পুরা হওয়ার আগেই ও খিলখিল কইরা হাইসা উঠতো। সাফিয়ার তো ওরে দুধ খাওয়ানো ছাড়া আর কিছু করা লাগতো না। ও সারারাইত ঘুমাইতো আর আমি খালি দুধ খাওয়ানোর জন্য চুপচাপ ওর কাছে রাইখা আসতাম। ও বুঝতোও না। তবে বাচ্চা রাখার আগে জায়গাগুলা খুব ভালো কইরা ইউ ডি কলোন বা স্পিরিট দিয়া পরিষ্কার করতে হয়, নইলে বাচ্চার গায়ে র‍্যাশ হয়া যায়।”

মান্টো খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথাগুলা কইতেসিল আর আমি অবাক হয়া ভাবতেসিলাম, “এইটা কেমন পুরুষ মানুষ, যে বাচ্চার যত্ন নিয়া এতকিছু জানে?”

একটু জোর কইরা হাইসা নিয়া মান্টো কইলো, “কিন্তু ও মইরা গেছে। ভালোই হইসে। আমারে পুরা আয়া বানায়া দিসিলো। ও বাঁইচা থাকলে আমি এখনো মনে হয় ওর ডায়পার ধুইতাম। আর কোনো কামকাজ হইতো না আর। আসলেই ইসমত বেহেন, আমি ওরে খুব আদর করতাম।”

আমরা যাওয়ার সময় সে কইলো, “সাফিয়া কয়দিন বাদেই ফিরবে। ওর সাথে দেখা হইলে আপনাদের ভাল্লাগবে।”

আসলেই সাফিয়ার সাথে দেখা হওয়ার পর আমার খুব ভাল্লাগসিল। আমাদের প্রথম দেখার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের এমন বন্ধুত্ব হয়া গেসিল যে মাথায় মাথা ঠেকায়া আমরা গল্প শুরু করসিলাম। এমন সব নিষিদ্ধ বিষয় নিয়া, যা পুরুষের শোনা বারণ।

সাফিয়া আর আমার এইসব ফিসফিসানি দেইখা মান্টোর হিংসা কে দেখে। খালি মজা নিতো। কোনো কোনো সময় তো দেয়ালে পিঠ ঠেকায়া আমাদের আলাপ শুনতে আসতো।

মাঝে মাঝে মজা নিয়া কইতো, “বাপরে বাপ! আমি কোনোদিন ভাবিও নাই মহিলারা এত নোংরামির আলাপ পাড়ে।”

লজ্জায় সাফিয়ার কানগুলা লাল হয়া যাইতো।

“আর আপনে ইসমত বোন, আমি তো ভাবিও নাই যে আপনে এইরকম পাড়ার অশিক্ষিত মহিলাদের মতো কথা কইবেন। বাসররাত কেমন গেল? বাচ্চা কেমনে হইলো? ছি ছি!”

আমিও তখন একটু লাগাম টাইনা কইতাম, “আপনেও পারেন মান্টো সাহেব। আমিও তো ভাবি নাই আপনে এত ছোট মনের মানুষ। আপনেও কি এইসব বিষয়রে নোংরা ভাবেন নাকি? এর মধ্যে নোংরার আছেটা কী? বাচ্চার জন্ম তো দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর দুর্ঘটনা। আর এই চার দেয়ালের মধ্যের ফিসফিসানি-গুজগুজানিটাই কিন্তু আমাদের ট্রেনিং। আপনার কী মনে হয়, বাচ্চা পয়দা করা আমরা কলেজ থিকা শিখসি? বুড়া বুড়া প্রফেসরগুলাও এইসব বিষয়ে এমন ভাব ধরে যে দেইখা মনে হয় আগে কখনো শুনে নাই। পাড়া-মহল্লার এইসব অশিক্ষিত মহিলাদের থিকাই আমরা জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট জিনিসগুলা শিখসি।”

“সাফিয়া তো এইসব কিছু জানে না। ও সাহিত্য নিয়া কিছু বোঝে না। সবকিছু শুইনাই ওর চোখ কপালে উঠে। আপনার লেখাও ওর ভাল্লাগে না। আপনার অস্বস্তি লাগে না ওর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধইরা আলাপ দেয়া- কোরমায় কতটুক হলুদ দিবেন, উড়াধ ডাল, দইবড়া— এইসব নিয়া?

সাফিয়া আঁতকায়া উঠলো, “এই মান্টো সাহেব, কোরমায় হলুদ দেয় কে?”

তখন সে সাফিয়ার সাথে তর্ক জুইড়া দিল। তার বিশ্বাস, সব রান্নায়ই হলুদ দেয়া হয়, আর না দেওয়া হইলে সেইটা বিশাল অন্যায়! “আমার এক রাজপুত বন্ধু ছিল ও শীতের দিনে ব্যায়াম করার আগে ঘি আর হলুদ মিশায়া খাইতো। ও একটা আসল পালোয়ান।”

আমরা তখন সাফ সাফ বইলা দিলাম যে ওর বন্ধু ঘি-হলুদ যা ইচ্ছা মিশায়া খাইতে পারে, কিন্তু আমরা কোনোভাবেই কোরমাতে হলুদ দিব না। শেষে মান্টো কোনোমতে আমাদের কথা মাইনা নিলো।

মান্টো আর আমি যখনই পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা করতে যাইতাম, পাঁচ ঘণ্টার আগে উঠা হইতো না। ওর সাথে তর্ক করার মানে হইসে বুদ্ধিতে শান দেয়া। যেন মাথার ভিতরে ঝাড়ু দেওয়া হইতেসে, মাকড়সার ঝুল সাফ হইতেসে। মাঝে মাঝে এই আলাপগুলা এত জটিল হয়া যাইতো যে মনে হইতো অনেকগুলা সুতা একসাথে প্যাঁচ খায়া গেসে আর আমাদের বোধবুদ্ধি সব লোপ পাইসে। মাঝে মাঝে এইসব আলাপ ঝগড়ায় রূপ নিতো। আমরা একে অন্যের সাথে বেশ খারাপ ব্যবহার করতাম। হাইরা গেলে আমি আমার হতাশা ঠিকই লুকায়া নিতাম কিন্তু মান্টোর চোখে পানি চইলা আসতো। ওর চোখগুলা ময়ূরের পেখমের মতো আরো টানা টানা হয়া যাইতো। নাকের ছিদ্রগুলা বড় হয়া যাইতো।

মুখের অঙ্গভঙ্গি একেবারেই বাঁকাত্যাড়া— তখন সে বাঁচানোর জন্য শহিদরে ডাকতো। তখন ঝগড়াটা সাহিত্য আর ফিলোসফি থিকা সইরা একটা ঘরোয়া কোন্দলে চইলা যাইতো। শহিদ আমার উপর খুব রাগ করতো, “তুমি খালি আমার বন্ধুদের সাথে খারাপ ব্যবহার করো। মান্টো অনেক রাগ করসে, ও আর কক্ষনো আমাদের বাড়িতে আসবে না। আর আমারো ওর বাড়িতে যাওয়ার সাহস নাই। ওর কী কোনো ঠিক আছে – যদি রাগের মাথায় কিছু কয়া দেয়, তাইলে এতদিনের বন্ধুত্বটা শেষ হয়া যাবে।”

আমারো মাঝে মাঝে মনে হইতো যে আমি মান্টোর সাথে একটু বেশিই বাজে ব্যবহার করসি। এই কারণে ও এতটাই রাইগা যাবে যে সাফিয়ার সাথে আমার এত কাছের বন্ধুত্বটা, যা কিনা মান্টোর সাথের বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি পোক্ত আর ঘনিষ্ঠ – ওইটাও না শেষ হয়া যায়। মান্টোর অহঙ্কার তখন ঔদ্ধত্যে পৌঁছায়া গেসিলো। ওর বন্ধুদের সামনে শো অফ করার একটা ব্যাপার ছিল, আর যারা ওর দ্বারা ইমপ্রেসড – এদের মধ্যে কেউ তারে নিয়া মজা নিলে খুবই বিরক্ত হইতো। সে আমারে সমানে সমানে ভাবতো, তাই শুধু আমরা দুইজন থাকলে যা ইচ্ছা কওয়া যাইতো। কিন্তু অন্য ‘সাধারন মানুষ’দের সামনে ওরে নিয়া সার্কাজম করলে ও নিতে পারতো না। তার আশেপাশের বেশিরভাগ মানুষরেই ও নিজের থিকা মানসিকতার দিক দিয়ে ইনফিরিওর ভাবতো।

কিন্তু আমাদের মাঝে সকালে ঝগড়া হইলেও আবার সন্ধ্যায় দেখা হইলে এমনভাবে কথা বলতো যেন কিছুই হয় নাই। আমরা আবারো সেই একইভাবে তর্ক চালায়া যাইতাম। যদিও প্রথম কয়েক মিনিটে আমরা খুব ভদ্রভাবে কথা কওয়ার চেষ্টা করতাম, একে অন্যের সব কথাই মাইনা নিতাম। কিন্তু এইসব ভনিতা কাইটা যাওয়ার পর শুরু হইতো আসল লড়াই। আমাদের কথায় যেন হাজারটা বুলেটের শক্তি। কেউ কাউরে ছাইড়া কথা কই না। মাঝে মাঝে তো মানুষজন ইচ্ছা কইরা, মজা নেওনের জন্য আমাদেরকে এক ঘরে রাখতো। যাতে আমরা কথা কইয়া মজা পাই, আবার রাগ কইরা ঘর মাথায়ও তুলি। তবে এইরকম অবস্থায় আবার আমরা কিছু সময়ের জন্য নিজেদের মধ্যের সব ফারাক এদিকে রাইখা দিতাম। আসলে আমরা তর্ক করতাম নিজেরা আনন্দ পাইতে, অন্যদেরকে মোরগ-লড়াই কইরা বিনোদন দেওয়ার জন্য না। মান্টো মনে করতো যে আমরা নিজেরা নিজেরা যতই ঝগড়া করি, অন্য মানুষজনের সামনে আমাদেরকে একটা একতা দেখাইতে হইব, যাতে মানুষ আমাদেরকে একলগে দেখলে ভয় পায়া যায়। কিন্তু আমি বেশিরভাগ সময়ই বিষয়টা ভুইলা যাইতাম আর তারপরই অনেকগুলা ইস্রাফিলের শিঙা একসাথে বাইজা উঠতো!

(টু বি কন্টিনিউ…)

The following two tabs change content below.
Avatar photo

অনিন্দিতা চৌধুরী

জন্ম ১৯৯৭ সালের ২রা মার্চ, সিলেটে। গদ্য-পদ্য দুইটাতেই নিজের মতো কইরা কলম চালায়া যাইতে ভালোবাসেন। অনুবাদ আর উর্দু সাহিত্যে বিশেষ আগ্রহ আছে।