নবীজীর ওফাতের পরপর মুসলমানদের শাসক কে হবে, কিভাবে সেই শাসক নির্ধারণ করা হবে তা নিয়ে বিরাট হাঙ্গামা বেঁধে যায়।

এসময় আনসাররা নেতৃত্বের দাবী জানালেও আবু বকর (রা) বলে দেন যে কুরাইশরা ছাড়া কেউ নেতা হতে পারবে না।

নেতৃত্বের নাম খেলাফত নবীজী দিয়ে যান নাই। কোরানেও নাই। পরবর্তীতে মুসলমানরা নিজেরাই নেতার নাম খলিফা দেয়। আর এই ব্যবস্থার নাম যে খেলাফত সেটা আসে আরও পরে।

খলিফা কিভাবে নির্বাচিত হবে সেটা নিয়েও কোন নির্দিষ্ট রুপরেখা ইসলামে কোন কালেই ছিল না। প্রথম চার খলিফা চারভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। কেউ নির্বাচিত হয়েছেন শূরার মাধ্যমে, সেই শূরা আবার নির্বাচিত হয়েছে প্রভাব বিবেচনায়। অর্থাত, গণতান্ত্রিকভাবেও খলিফা নির্বাচিত হয়েছে। আবার কেউ নির্বাচিত হয়েছেন পূর্বতন খলিফার ইচ্ছানুসারে।

আবু বকরের (রা) খেলাফতও প্রশ্নাতীত ছিল না। নবীজীর সম্পত্তির ভাগবটোয়ারা কিভাবে হবে সেটা নিয়েও ছিল তীব্র দ্বিমত। ফাতেমা (রা) আমৃত্যু আবু বকরের সাথে (রা) মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আলী (রা) আবু বকরের (রা) হাতে বায়াত দিতেও দেরি করেন এই কারণে (যদিও কোন কোন রেওয়াতে আছে যে আগেই একবার বায়াত উনি দিয়েছিলেন পরে সম্পর্ক খারাপ হয়)।

শুধু তাই না, ফাতেমার (রা) ইন্তেকালের পর আবু বকর (রা) আলীর (রা) কাছে যেতে চান মীমাংসা করে বায়াত আনার জন্য। সেসময় ওমর (রা) আবু বকরের (রা) জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা করছিলেন- এতটাই তিক্ততা ছিল।

খেলাফত নিয়ে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে উসমানের (রা) আমলে। উনি ছিলেন উমাইয়া গোত্রের। সেসময় উমাইয়ারা বড় বড় পদ পেতে থাকে এবং দুর্নীতির অভিযোগ আসতে থাকে চারদিক থেকে।

এরকম অচলাবস্থায় উসমানকে (রা) শহীদ করা হয়। ক্ষমতায় আসেন আলী (রা)। ক্ষমতায় আসার পর আলীর (রা) বিরুদ্ধে আয়েশা (রা) এবং মুয়াবিয়া (রা) ফুঁসে ওঠেন। একাধিক যুদ্ধ হয়, উভয়পক্ষে প্রচুর সাহাবী শহীদ হন।

আলীর (রা) এর পর খেলাফত উমাইয়াদের হাতে চলে যায় পাকাপাকিভাবে। শুরু হয় ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বংশীয় খেলাফত।

আধুনিক যুগে ইসলামপন্থী তাত্ত্বিক মওদূদী ও কুতুব উমাইয়া খেলাফতকে খেলাফত হিসাবে স্বীকৃতি দিতে তাই নারাজ। তারা বলেন যে উসমানের (রা) সূত্র ধরে উমাইয়াদের মাধ্যমে খেলাফত ধ্বংস হয়ে রাজতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে।

উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমি, ওসমানী- সকল খেলাফতই ইসলামপন্থীদের চোখে রাজতন্ত্র। প্রথম চার খলিফা বাদে কাউকেই তারা খলিফা হিসাবে মানেন না।

এর ফলে ইসলামের চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস নাই হয়ে যায়। ইসলামের ইতিহাস হয়ে যায় ইসলামহীনতার ইতিহাস। মুঘল স্থাপত্য থেকে শুরু করে আন্দালুসিয়ার জ্ঞানচর্চা- কোনটাই ইসলামপন্থীরা আপন করতে পারেন নাই। ইনফ্যাক্ট, মওদূদী তো মুঘল স্থাপত্যকে রীতিমত অপচয় এবং ইসলামবিরোধী আখ্যায়িত করেছেন।

মওদূদী-কুতুবদের খেলাফতকে অস্বীকার করার বিরুদ্ধে পাক-ভারত উপমহাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তের “তুরাসি” আলেমরা সরব হন। এখনও মওদূদীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে মওদূদীর সেই বইটা- খেলাফত ও রাজতন্ত্র (খিলাফত অর মুলুকিয়াত)।

ইসলামপন্থার শুরুটাই হয়েছে খেলাফতের বিরোধিতা করতে যেয়ে। ইসলামপন্থীদের চোখে খেলাফত ছিল অনৈসলামী, জুলুমবাজ এবং অদক্ষ। তাই তুর্কি ইসলামপন্থীরা কামাল পাশার সাথে হাত মিলিয়ে খেলাফত ভেঙ্গে ফেলতে একসাথে কাজ করে।

খেলাফতের পরিবর্তে আনা হয় ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়তের ধারণা।

কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র ও সেই রাষ্ট্রের আইন হিসাবে শরিয়তকে স্থাপন করা একটা আধুনিক বিচ্যুতি। কারণ শরিয়ত বলে কিছু নাই, আছে ইসলামী শরিয়ত। শরিয়ত অর্থ জীবনধারা। মুসলমানদের জীবনধারা হচ্ছে ইসলামী শরিয়ত। হিন্দুদের জীবনধারা হিন্দু শরিয়ত।

ইসলামী খেলাফত বা সালতানাতের সাথে অন্যান্য রাজতন্ত্র ও আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে ইসলামী খেলাফত ও সালতানাত কখনো একক আইনকাঠামো প্রণয়ন করে নাই। অর্থাত, ইহুদীরা ইহুদীদের আইন অনুযায়ী চলত, খ্রিষ্টানরা খ্রিষ্টানদের, আর মুসলমানরা ইসলামের। এটার পরিবর্তন শুরু হয় ওসমানীয় খেলাফতের মডার্নাইজেশন প্রজেক্ট তথা তানজিমাতের মাধ্যমে- ঊনিশ শতকে।

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া কোন বড় ইসলামী খেলাফত বা সালতানাতে কখনোই শরিয়ত একক আইনব্যবস্থা ছিল না। পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম ৬০০ বছর বাদশাহী করেছে। কিন্তু সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে নাই। কারণ সতীদাহ ছিল হিন্দু শরিয়তের অংশ এবং ইসলাম অন্যের ওপর নিজের শরিয়ত চাপিয়ে দেওয়া সমর্থন করে না।

ইবনুল কাইয়িমের মত “কঠোর” তাত্ত্বিকও অমুসলিমদের মধ্যে ইনসেস্টকে পর্যন্ত বৈধতা দিয়ে গেছেন যদি এটা তাদের শরিয়তে সিদ্ধ হয়!

কিন্তু আধুনিক ইসলামপন্থীরা রাষ্ট্র মানে মনে করেন আধুনিক রাষ্ট্র আর আইন মানে মনে করেন আধুনিক রাষ্ট্রের সিভিল আইন। ফলে, তারা মুখে ইসলামী রাষ্ট্র বা খেলাফত এবং শরিয়ত বললেও তারা প্রিকলোনিয়াল যুগের ইসলামী রাষ্ট্র-সমাজব্যবস্থা বোঝান না। তারা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোটাকেই ইসলাম বলে চালাতে চান।

বাংলাদেশে এই ইসলামপন্থার উত্থান বিস্ময়কর অনেকগুলি কারণে।

প্রথমত, বাংলাদেশ নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশ। এই মুসলমানরা আবার সুন্নি মুসলমান। ক্লাসিকাল সুন্নি পলিটিকাল ফিলসফি অনুসারে শাসক যতই জালেম হোক না কেন, শাসককে পরাজিত করার ভাল সম্ভাবনা না থাকলে অযথা বিদ্রোহ করে ফেতনা-ফাসাদ করা হারাম। একারণে মওদূদী-কুতুবরা ক্লাসিকাল ইসলামী স্কলারশিপকে পছন্দ করেন না।

মওদূদী-কুতুবকে শিয়া প্রভাবিত বলার অন্যতম কারণও এটা। শিয়ারা প্রকট ইনসাফবাদী। তারা যেটাকে জুলুম হিসাবে চিহ্নিত করে সেটাকে তারা কোনভাবেই মেনে নিতে চায় নাই। তাই তারা বারবার বিদ্রোহ করেছে, যুদ্ধ করেছে। কারবালায় ইমাম হোসাইনকে (রা) নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে সুন্নীরা জুলুমকে এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড মনে করতেন না। তারা জুলুমকে পছমদ না করলেও কথায় কথায় জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সমাজে ফেতনা-ফাসাদ তৈরী করেন নাই। শিয়ারা বহুদিন পর্যন্ত এই রিয়েলিটি মেনে নেয় নাই- কয়েকশো বছর পর তারা লুকায়িত ইমাম তত্ত্ব সামনে এনে বাস্তবতা মেনে নেয়।

দ্বিতীয়ত, আমরা হানাফি। ইমাম আবু হানিফা শাসকের রোষানলে পড়লেও ওনার ছাত্র সেই একই শাসকের সাথে কোলাবরেট করেন। হানাফি মাজহাব প্রচারিত প্রসারিত হয় সেই সূত্রেই। একারণে হানাফি মাজহাবকে বলা হয় দরবারি বা রয়্যাল মাজহাব।

এটা তাই কোনই অবাক করা বিষয় না যে তিনটা গান পাউডার এম্পায়ারের দুইটাই হানাফি: ওসমানীয় এবং মুঘল।

হানাফি ফেকাহ সবসময় স্ট্যাবিলিটিকে প্রাধান্য দিয়েছে। একারণে হানাফি মাজহাব খলিফা কর্তৃক ভাইদের হত্যারও বৈধতা দেওয়া হয়।

হানাফিদের সাথে হাম্বলিদের অনেক দ্বন্দ্ব থাকলেও হানাফিরা একজন হাম্বলি আলেমকে খুব পছন্দ করেন। সেই আলেমের নাম ইবনে তাইমিয়া। কারণ ইবনে তাইমিয়া তাঁর আস সিয়াসা আশ শরিয়াহ বইতে লিখেছেন যে শরিয়তের চেয়েও রাজনীতির দাবী আগে। এবং এটাই শরিয়ত।

বাংলাদেশে ইসলাম যে আরব বনিকদের মাধ্যমে আসে নাই বরং মোঘলদের মাধ্যমে এসেছে তার প্রমাণও এটা যে আমরা হানাফি। যদি আরব বনিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলাম আসত তবে আমরা শাফেয়ি হতাম। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, দক্ষিন থাইল্যান্ড, কেরালা, ইয়েমেন, পূর্ব আফ্রিকার সমুদ্রের পাশের দেশগুলি শাফেয়ি। কারণ শাফেয়ি মাজহাব বৃদ্ধি পেয়েছে বনিকদের মাধ্যমে।

আমরা হানাফি কারণ মোঘলরা বাংলার মেহনতি চাষীদের পৃষ্ঠপোষকতা দানের মাধ্যমে বাংলায় ইসলামের প্রচার প্রসার ঘটিয়েছে।

তৃতীয়ত, হানাফি মাজহাব খুবই ইউনিক একটা মাজহাব। বড় মাজহাবগুলির মধ্যে হানাফি মাজহাবই আমার জানামতে একমাত্র মাজহাব যে মাজহাব ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি পৌত্তলিকদেরও জিম্মাদারিত্ব নেওয়া হয় (মালিকি মাজহাবেও কিছু প্রভিশন আছে)।

ফলে, পাক-ভারত উপমহাদেশের হিন্দুদের সাথে মোঘলরা ঐভাবেই মিশেছেন যেভাবে আহলে কেতাবের সাথে মুসলমানরা মিশে।

এত কিছুর পরও বাংলাদেশে শুধু ইসলামপন্থার উত্থানই ঘটে নাই, সম্প্রতি খেলাফতি সালাফিদের উত্থানও দেখা যাচ্ছে। অথচ ইসলামপন্থা মজ্জাগতভাবে খেলাফতবিরোধী মতবাদ। সম্পূর্ণ বিষয়টা বহু স্তরবিশিষ্ট আয়রনিক।

৩রা অক্টোবর, ২০২৪

The following two tabs change content below.
Avatar photo

মোহাম্মদ ইশরাক

রাইটার। পড়াশোনা করছেন Mahidol University, Hamad Bin Khalifa University এবং University of Leeds-এ।