“শুনো, ধর্ম আর দেশ মিলাইতে যায়ো না। পরে ফুলের নাম কী দিবা, ফাতেমা-চূড়া?”

৫ আগস্টের কিছু পরে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে এই উক্তিটা লেখা হয় মওলানা ভাসানীর বরাতে। সেদিন ধানমন্ডি থেকে এলিফেন্ট রোডের দিকে যাইতেও এই কথাটা নজরে পড়ল। কিন্তু এইবার আর বাক‍্যটাকে অতটা পলিটিক‍্যালি কারেক্ট বইলা মনে হইলো না। কেমন যেন পোয়েটিক নিরীহতার আড়ালে একটা উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা মনে হইলো কথাটা।

আমি যতটুকু বুঝি তা হইলো এই কথাটার বেইজ লাইন হইলো ধর্ম আর দেশ (রাষ্ট্র?) এক রাখা যাবে না। নাইলে ভজঘট লাইগা যাবে। মানে ওয়েস্ট যেইটারে সেকুলারিজম বলে সেইটা আর কি! তো, খুবই মহৎ উদ্দেশ্য। এক জনের ধর্ম আরেক জনের উপরে চাপানোটা তো জুলুম। কিন্তু আমি খেয়াল করলাম ঐ বাক‍্যটার বেইজ লাইন যে ধর্মকে আলাদা কইরা দেখা, যার কারণে কৃষ্ণচূড়া যেন ফাতেমাচূড়া না হয়। তাতে করে সবকিছুরে ধর্ম দিয়া বিচার করাও হইলো না আবার পোয়েটিক বিউটিও ঠিক থাকল। কিন্তু ভজঘট এই খানেই। ফুলটার নামই রাখা হইছে সনাতন ধর্মের একজন প্রভাবশালী দেবতার নামে। অর্থাৎ ফুলটায় অলরেডি ধর্ম নিজেই বিরাট ক্ষমতা নিয়া হাজির অথচ তাতেও ধর্মের হাজিরা দেখা হইতেছে না কিন্তু যখনই ফাতেমাচূড়া নামে কেউ ডাকবেন তখন সেখানে ইসলাম হাজির হইতেছে, সেকুলার ধারণা নষ্ট হইতেছে সম্ভবত এস্থেটিকসও নাই হয়ে যাইতেছে। কী আতাজ্জব ব‍্যাপার! অথচ ফুলটারে মুসলমানরা জীবনেও ফাতেমাচূড়া বইলা ডাকার খায়েশ করে নি।

মাদাগাস্কার থেকে আসা এই ফুলটার (ডেলোনিক্স রেজিয়া) সাথে কৃষ্ণের কোনো মাইথোলজিক‍্যাল কানেকশনও নাই তবুও তার নাম কৃষ্ণচূড়া হওয়াটা কিন্তু ধর্মীয় ঘটনা না কিন্তু ফাতেমাচূড়া হওয়াটা ধর্মীয়!

এইজন‍্য এইসব উক্তিরে আমার মহান কিছু মনে তো হয়ই না বরং সেকুলারিজমের নেকাবে আস্ত ধর্মীয় হেজিমনিই মনে হয়।

বাংলাদেশের মুসলমানেরা বরং কৃষ্ণচূড়া নামটারে নিয়া কোনো ক্রিটিকই করে নি। তার সাহিত‍্যে, মুখের ভাষায় এইটারে সে দেদারসে ইউজ কইরা গেছে। তাই এই ফুলটাতে হুদাই কৃষ্ণের বিপরীতে ফাতেমাকে দাঁড় করানো আশলে মওলানারই ফ‍্যালাসি! বাংলাদেশের মুসলমানের কান্ধে যে সমালোচনা চাপাইতে চাইছিলেন মওলানা সেইটাই বরং আরোপিত ও ভুয়া কল্পনার বেহুদা আতঙ্ক।

[এডিটোরিয়া কমেন্টস:

এই কথাগুলার সাথে আরো ২টা জিনিস ইনক্লুড করা যাইতে পারে –

১. অনেক শব্দই ধর্মিয় রিচুয়ালের জায়গা থিকা আসছে, যেমন ‘কোজাগরি চাঁদ’, এইটা আসলে হিন্দু মিথোলজি’র “কে জাগো রে” র জায়গা থিকা, যে দেবি দুনিয়াতে আইসা লোকজন যারা প্রার্থনা করার জন্য জাগনা আছেন, তাদেরকে ধইরা ধইরা ‘বর’ বা উইশ ফুলফিল করার সুযোগ দিত, কিনতু এখন তো এক ধরনের ‘কাব্যিকতা’-ই মিন করে

আবার যেইরকম উপবাস আর রোজা – আগে কিনতু উপবাস লেখা লাগতো, রোজা ছিল ‘মুসলমানি বাঙলা’ 🙂 অরিজিনাল বাংলা না!… তো, ভাষা নন-রিলিজিয়াস কোন ঘটনা না, এইখানে কালচারের এবং ধর্মের ঘটনাগুলা আছে, থাকে…

২. আবার দেয়াল-লিখন নিয়াও বলা যাইতে পারে, কয়েকটা পাতা দিয়া যেই ছবি’টা আছে যে, পাতা ছিঁড়া যাবে না… এইগুলা কিনতু জুলাইয়ের পরের ছবি, সেকুলার কইরা তোলার ঘটনা, জুলাইয়ে সব মানুশ এক হয়াই ছিল, সেকুলার হওয়ার দরকার পড়ে নাই, পরে এইরকম এক হওয়ার আওয়াজগুলারে ‘অ্যাড-অন’ হিসাবে ইনসার্ট করা হইছে

মানে, বাংলাদেশের লোকজন ‘মুসলমান’ হয়া যাইতে পারে – এই ডরটা যতটা না রিয়ালিটি তার চাইতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্রাহ্মন্যবাদের ডরেরই রিফ্লেকশন একটা; যে, ফাতেমা-চূড়া কেউ ডাকতেছে না ঠিকই, কিনতু যদি কেউ ডাইকা বসে ঠেকাইতে কি পারবো আমরা! তো, এই ডরটারে রিয়েল কইরা তুলতে চাওয়ারও ঘটনা যেন এই দেয়াল-লিখন’টা, যেইটা আবার একজন দাড়ি-টুপি পরা মুসলমানই বলতেছেন! সো, এই কথা তো ভুল হইতে পারে না! এই কনোটেশনটা (connotation) একটা বড় ঘটনা]

The following two tabs change content below.
Avatar photo

হাসান রোবায়েত

hrobayet2676@gmail.com প্রকাশিত বই: ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে (২০১৬) মীনগন্ধের তারা (২০১৮) এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে (২০১৮) আনোখা নদী (২০১৮) মাধুভাঙাতীরে (২০২০) তারাধুলিপথ (২০২১) মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (২০২১) রুম্মানা জান্নাত (২০২২) মুসলমানের ছেলে (২০২২)