Main menu

মুখরা জগৎকুমারীর সনে এক প্রেমিকের ঝগড়াঝাটি

[pullquote][AWD_comments][/pullquote]বাংলা-কবিতা মোর অর লেস নগর-বিরোধী একটা ব্যাপার; যেইসব নাগরিক-কবিতা দেখবেন, ওইখানে এইরকমের ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ এবং রিজেকশন যে আপনি বুঝতে পারবেন, বাংলা-ভাষার কবিরা এখনো গ্রামেই থাকেন, গঞ্জে বা মফস্বলেও; আর যাঁরা থাকেন শহরে, শহর জিনিসটা মাইনা নেয়ার মধ্যে নাই তারা; বাংলা কবিদের গাড়িরা গাড়লের মতো কাশে এখনো, অত তাড়াতাড়ি কোথাও যাইতে চান না এই কবিরা। এঁনাদের বিশেষ কোন প্রস্তাব নাই এক্সিস্টিং লাইফস্টাইলের বিপরীতে, খোদ স্পেসটারে ডিনাই করেই বিদ্রোহের তুরীয় মজা পাইতে থাকেন।

সুমন রহমানের কবিতায় এই রিজেকশনের জায়গাটা নাই বা কম; মে বি উনি শহরের থাইকা যাওয়াটারে মাইনা নিয়া মোর অ্যাকোমোডেড করতে পারছেন, ব্রিদিং স্পেইস দিছেন; খালি গ্রাম-বাংলা’র থাকা বা না-থাকা দিয়াই ওনার কবিতারে ভরাট কইরা ফেলেন নাই।

সুমন রহমানের কবিতা নিয়া জাহেদ আহমদ এই আলাপটা করছিলেন দুইহাজার তেরো সালে।ছাপা হইছিল সৈয়দ আফসার সম্পাদিত অর্কিড পত্রিকার সাতনাম্বার সংখ্যায়। লেখকের অনুমতি নিয়া এইখানে আপলোড করা হইলো।

ই.হা., রক মনু

_____________________

‘বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ যেন এ গান না শোনে / প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া কেউ যেন এ গান না শোনে’ — সুমনের গান

শুরুতেই পোস্টস্ক্রিপ্ট। অবশ্য এই জিনিশ রচনার শেষে দেয়াই দস্তুর। তবে যিনি কিনা আদ্যন্ত এ-রচনা পাঠে উদ্যত হয়েছেন, তার পাঠস্পৃহার তারিফ না-করে উপায় নেই, তিনি নিশ্চয় এটুকু ভায়োলেশন মার্জনাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখছেন। স্বীকার করা শুভ হবে যে, এক্ষণে এই পাঠপ্রতিক্রিয়া-প্রণয়নে-রত অল্পবিদ্যাধর পাঠকশর্মাটি কবিতার কখগঘ সম্পর্কে তেমন জানে না কিচ্ছুটি, কিন্তু কবিতা ভালোবাসে এবং নাগাল পেলে পড়ে। কে বলেছে জ্ঞানগরিমা দিয়ে কবিতা ছোঁয়া যায়? কবিতা বিষয়ে কানাকড়ি জ্ঞানগম্যি নাই কিন্তু জগৎ সম্পর্কে নিজস্ব একটা আন্ডার্স্ট্যান্ডিং রয়েছে এমন লোকেরাই কেবল হতে পারত কবিতার সবচে ভালো পাঠক। কবি কোথায় পাবেন তারে, এই জ্ঞানপগারের পারে? মুখ খুললেই ধরা পড়ে লোকগুলো কী বুকিশ! থাক সেসব, পোস্টস্ক্রিপ্ট প্রকাশ করি এবে : এই রচনা পড়ার আগে, এটি পড়ে সময় নষ্ট না-করে বরং, পড়ে ফেলুন সুমন রহমানের কবিতাবই সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া ; বা তার পূর্বজন্মের ঝিঁঝিট, সুলভ নয় যদিও, পড়ে ফেলুন অনতিবিলম্বে। কেননা আপনি জানেন, কবিতা পড়ার জিনিশ, আলোচনায় কবিতার বিশেষ রসবৃদ্ধি হয় না বরং উল্টোটি। প্রেম যেমন করার জিনিশ, পর্যালোচনার নয়, কবিতা তেমনি পড়ার। হা হতোস্মি! এই দেশে লোকে প্রেমে পড়ে এবং কবিতা করে !! স্মর্তব্য মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত জনপ্রিয় বাংলা গানটি, ওই যে, ‘আমি বড় রাস্তায় দাঁড়ায়ে কবিতা করি, আঁকিবুকি করি…’।


ওহো, গোরাচাঁদের মনে হয় আরেকটু অবশিষ্ট আছে। সেটুকু শেষ করি। কি কি সম্ভব হবে না করা, এই রচনায়, তার একটা তালিকা দেয়া যাক। প্রথমত, উদ্ধৃতি। কেননা ভালো যে-কোনো কবিতাবই সম্পূর্ণত উদ্ধারযোগ্য, অন্তত আমি বিশ্বাস করি, অথবা আলগা-করা কোটেশন চয়নের জরুরৎ নাই। মালা থেকে ছিঁড়ে নিলে একটিও পূঁতি কিংবা গাছ থেকে ফুল, অনান্দনিক সেই কাজ, অপকর্ম তো বটেই। তেমনি কথার জুড়িগাড়ি টেনে নিতে যদি কবিতা ব্যবহৃত হয়, তখন ফৌজদারি কি দেওয়ানি না হলেও সেটি একপ্রকার অপরাধ নিশ্চয়। কবিতাকে ব্যবহৃত হতে দেখলে, অবমানিত হতে দেখলে কবিতা, খারাপ লাগে আমার। আমি চাই কবিতাকে থাকতে দেয়া হোক আনপ্রেডিক্টেবল এবং রেক্লেস, সেল্ফ-এক্সপ্ল্যানেটোরি, ঠিক যেমনটা তার থাকার কথা। আরও মুই পারব না কবিতার সারমর্ম বের করতে, পঙক্তিধৃত পরমার্থ উদ্ঘাটিতেও অপারগ, অথবা রাজনীতি কি সমাজচেতনা। পারিব না কবিনামের অগ্রে একটাকিছু সুনির্দিষ্ট অভিধাবাচক লেবেল সাঁটিতে, যেমন অসাধ্য আমার পক্ষে ‘কবি কী বলিতে চাহিয়াছেন’ তাহা নির্ণিতে পারা। আর, সর্বোপরি, আমার আবুদ্ধি বিশ্বাস : কবিতা আত্মার ফিসফিস, হুইস্পারিং অফ সোল, সো টেন্ডার, সো সাব্লাইম, সো এনরিচড্ এবং আনরিচেবল, অনঙ্গ আকাশলীনা, শারীরিক শাসানি-দাবড়ানি নয় কক্ষণো। অবশ্য কবিতায় আজকাল ব্যাটাগিরিই দেখানো হয় বেশি, কবিতা লেখার কাজ নাকি ইয়া লম্বা এক ম্যারাথন রেস, কিন্তু সুমন রহমান পড়ার কালে এইসব দৌড়ঝাঁপ আপনি খানিকক্ষণ ভুলে থাকতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। তর্ক তোলা বারণ তাই বলে? নিশ্চয়ই না। আর্গ্যুমেন্ট্যাটিভ বাংলাদেশীদের তর্কচক্রে চেয়ার লাগে না, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই তারা দাবড়ে বেড়ায় টাট্টু-স্ট্যালিয়ন, আর উচ্চাঙ্গ খেউড়গায়ক ও খিস্তিশিল্পীদের মজলিশে যেতে হলে আগে আপনার কান তৈরি থাকা চাই। নয় তো মরেছেন। প্রমাণ চান? ভ্রমণ করুন নিয়মিত কয়েকদিন ফেসবুক এবং অ্যাভেইলেবল বাংলা ব্লগগুলো।


ব্যাপারটা কি এমন যে, বুক-রিভিয়্যু করতে বসেছি সুমন রহমানের? কিংবা তার গুণাগুণ সম্বন্ধে বিদ্যা-ফলানো সন্দর্ভ রচনা করছি? না, তা নয়। যদিও তার কবিতায় গুণ রয়েছে, আগুনও, এবং অগোচর নয় গুণ-আগুনাবলি। তিনি ভীষণ প্রভাবশালী গুণীন, তার মতো গুণার্ণব স্বদেশে বিরল, অমন ভঙ্গিমায় কবিকে তেলিয়ে একপ্রকার ফাঁপা আলোচনা ফাঁদার যোগ্য বিশেষণ-ব্যবসায়ী লোকের অভাব অন্তত বাংলাসাহিত্যে নেই। ইহাদের খপ্পর থেকে, অ্যাস্টোনিশিংলি, নিজেকে অদ্যাবধি বাঁচায়ে রেখেছেন সুমন। অনস্বীকার্য যে ওর কবিতায় গুণ আছে, গুণের গমকে শেষটায় সুমনের কবিতাবলি গিমিক-পর্যুদস্ত হয়নি বলেই রক্ষে, এবং ফলত গুণগ্রাহী/গুণাগ্রহীও রয়েছে বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। তেমনি আগুনও, তবে সে-আগুন শান্ত ও সুবাতাস-সঞ্চারী, অন্যতর ঔজ্জ্বল্য তার। ব্যাপারটা কী, তাহলে, বলেন দেখি? কি করা হচ্ছে এখানে? তেমন গুরুত্বগম্ভীর কিছুই নয়, কেবল সুমন রহমানের কবিতা আস্বাদনোত্তর অনুভূতিমালা, আমারই অনুভূতি বলা বাহুল্য, হাজির করতে যাচ্ছি। মানে, সুমনের কবিতা পড়ার সময়, পড়তে পড়তে এবং পড়ার পর আমি যা ভাবি বা দেখি দৃশ্যাদৃশ্য দু-চারিটি ক্ষীণ ও অজ্ঞান অনুভব কেবল। অথবা তা-ও না, আসলে, কেননা কবিতা-পাঠোত্তর অনুভূতি অনেকটা কবিতারই মতো অমীমাংসিত-অব্যাখ্যেয়; অনুভব করা যায় যদিও অক্ষরে ধারণ করতে গিয়ে অনুভূতির অরিজিনালিটি অল্পই অক্ষুণ্ন থাকে। এখানে বলা থাক, কবিতার ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রিসিয়েশন করার মতো অতটা মেকানিক্যাল হওয়া আমার সাধ্যির বাইরে। এর দরকারও হবে না, কারণ সুমনের কবিতায় হাড্ডি-হিম-করা কারবার অর্থাৎ পিলে-চমকানো আচারব্যাপার নাই। যার ফলে তার কবিতা পড়তে গিয়ে পেটফোলা অভিধানের কাছে যেতে হয় না, আর খেতেও হয় না দাঁতকপাটি। স্নিগ্ধ স্বকণ্ঠ প্রকাশের কালে গলাসাধার আওয়াজ শুনিয়ে শ্রোতাদের তিনি বিরক্ত করেন না, কালোয়াতি কলাকারদের ন্যায় নখরা করা সুমনের কবিতার ধাতে নেই। নির্ভয়ে, অতএব, এই কবির মুশায়েরায় আপনি বসতে পারেন। বসুন হাঁটু মুড়ে, কান-মন সচেতন করে, এবং লাভ করুন সহুজে সেই সমুদ্রস্বর শ্রবণের বিরল অভিজ্ঞতা।


এবার আমরা আস্তেধীরে পয়েন্টাভিমুখে হাঁটব। কবে থেকে পড়ছি সুমন রহমান? প্রথম দু-হাজার-দুই যিশুবর্ষে একসঙ্গে ছয়টি কবিতা মান্দার পত্রিকায়, সুমন নিজেই বের করেছিলেন ওই একটিই সংখ্যা যা আজো পড়া যায় আদ্যোপান্ত, অবাক অনবদ্য স্বরস্পর্শ পয়লা বারেই। এরও আট বছর আগে বেরিয়ে গেছে অবশ্য ঈষান জয়দ্রথ রচিত, সুমনেরই ‘অস্তিত্বের উপজাত’ সে, ঝিঁঝিট । jhi 1মফস্বল এক্সপ্রেসের প্যাসেঞ্জার আমি, অনিবার্য কারণেই, এই কবির সঙ্গে তাই মুলাকাত হতে হতে এত বিলম্ব। তবে কবির স্বভাবও, অনুমান হয়, এই বিলম্বের জন্য কম দায়ী নয়। এ-প্রসঙ্গে শেষের কবিতা থেকে একটা লাইনের একটু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রয়োগ করি : দ্বিধা করে নিজেকে যে-কবি যথেষ্ট জোরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ না করায় পাঠকেরা তাকে যথেষ্ট স্পষ্ট করে প্রত্যক্ষ করে না। আর এই অতিপ্রত্যক্ষ ও অতিপ্রদর্শনের জমানায় সুমনের এই স্বভাব আমার কাছে একইসঙ্গে আশ্চর্যের ও স্বস্তির। অনুপস্থিতির উপস্থিতি, এই হুল্লোড়ের দিনে, একজন ভালো ও দূরগমনেচ্ছু কবির জন্য গ্রহণযোগ্য একটা স্ট্র্যাটেজি হতে পারে। সে-যা-হোক, এর অনেক অনেকদিন বাদে এসে এই সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া, দু-হাজার-আট, এবং ফোটোকপি ঝিঁঝিট । দুই বই মিলিয়ে সাকুল্যে চল্লিশ কবিতা, ছয় কমন নিয়ে ক্যালকুলেট করা সঙ্গত কারণেই, আর তাছাড়া তার ডেব্যু-অ্যালবামের অথরশিপ নিয়া তো ঝামেলা বাঁধতে পারে। কেননা ঈষান জয়দ্রথ তো আর সুমন রহমান নন, অথবা ভাইস-ভার্সা, আর এমন ঝামেলা পাকানোর ফলে কেমন মজা হতে পারে এর একটা হাজির নজির সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়ার ঝিঁঝিট ও তার যাবতীয় হাস্যকর কিংবদন্তীপনায়। এই আলাপ আরও পরে উঠুক। তাহলে কারে নিয়া কইব কথা, করিব কাহার নামসঙ্কীর্তন, সুমন না জয়দ্রথ? দুজনের কেউই না। আমরা আগ্রহী যাদের নিয়ে, একটানে এদের কয়েকটি নাম : এমন বাদল দিনে, শীতকালীন বৃষ্টি, অমরতার চেয়ে সত্য, আলাস্কা, স্কুলড্রেস, ছোটখালার যাওয়া, নির্বাসিত, কন্যাকুমারি, একেশ্বরী প্রভৃতি। ইয়াল্লা! বিশ বছরে চল্লিশ কবিতা কুল্লে! ম্যারাথন রেসারগো লগে পাল্লা দিবেন কেমনে এই কবি? বলি কি, রেস হইতে দূরে থাকুন, মজা লুটুন! বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্ভবত, সুমন রহমান দূরেই রহেন এবং রহিবেন দূরামোদী হয়ে। এ না-হলে কেন কোথাও কোনো পত্রিকা বা দাক্ষিণ্যসর্বস্ব দশকসঙ্কলনে দেখা পাই না তার? যুগপৎ ধর্মে ও জিরাফে থাকাই যে-দেশের কবিদের ক্যারেক্টারিস্টিক্স, কাগুজে প্রেজেন্স যেখানে কবির জিয়নকাঠি, তিনি কি সে-দেশেরই লোক নন? সন্দেহ হয়, সুমনের এলিগ্যান্ট ম্যানার-এটিকেট দেখে, ফরেন মাল নাকি! জী না, অপরাপর কবিদের ন্যায় ঐতিহ্যটৈতিহ্য নিয়া আদেখলাপনা নাই, কিন্তু সম্পূর্ণ দেশি বলিয়াই তো প্রতিভাত হয়। অবশ্য ইতিহাসৈতিহ্যমুখো উত্তরাধুনা আলোচক ওখানে তাগিদের ঈপ্সিত ইনগ্রেডিয়েন্টস্ খুঁজে পাবেন না তা বলি না। আমাদের সবার জন্য, সর্বত্র, ওপশন ওপেন থাকবে এটা এনশিওর করা যাচ্ছে।


সুর থেকে কবিতাকে দূরে সরিয়ে নেয়ার অভিপ্রায় সুমনের নেই, অভিষেকগ্রন্থের নামকরণ থেকেই এ-রকমটা আন্দাজ করে নিতে পারি। ঝিঁঝিট; কী জিনিশ? রাগবিশেষ, উত্তীর্ণ সন্ধ্যার, ইমনের পরেই এর অবস্থান। এইটুকু জেনারেল নলেজ আমাদের রয়েছে সকলেরই। করিম খাঁ গাইছেন ‘পিয়া বিনে নেহি আবৎ চৈন’ কিংবা মেহদী হাসান ‘গুলঁ মে রং ভরে’ ইত্যাদি, ইউটিউব সার্চ দিন, মিষ্টি বিষণ্ন অথচ অনিবার গভীরাভিসারী স্বরসংশ্রয়। [youtube id=”l5Gje0EyBO4″]অনুমান আরো পোক্ত হবে সুমনের পঙক্তিভোজে শরিক হলে, যে, সুরছিন্ন/অসুর কবিতা বা হালে ফ্যাশনেবল ডেভিলিশ পোয়েট্রি ইত্যাদির পক্ষপাতী তিনি নন। তার মানে এই কি যে, একেবারে গীত-জবজবে কবিতা সেসব? স্যাঁতস্যাঁতে সোনাবন্ধুক্রন্দন? অথবা বাউলফকিরি? কিংবা হুজুগে মরমি? একদম না, একদমই না। তার কবিতায় সুর বয়ে চলে ভেতরে ভেতরে, একান্ত অভ্যন্তরে, ভেতরদেশ থেকে আলো পেয়ে ভেতরদেশটা আলোকিত করে রাখে। এ সুর সশব্দ নয় অন্য মায়েস্ত্রোদের মতো, ছন্দে বেজে ওঠে নাই ইহা আলবোলা-টানা প্রথাবনত রেবেল পোয়েটদের ফলো করে, একে শুষে নিতে হয় অতীন্দ্রিয়যোগে। ঠেরো, ঠেরো! তবে কি প্রমাণ করা হচ্ছে সুমন সন্ধ্যাবেলার কবি? তা হবে কেন, প্রভাতকালীন রাগ ভৈঁরো শোনার অভিজ্ঞতাও সমান সুখকর সুমনের বাদনে। মামুদের নিয়ে এই এক আমোদ, চান্স পাইলেই কিছু-একটা ছাপ্পা মারতে চায়, বোতলের গায়ে লেবেল সাঁটাতে এরা দারুণ সিদ্ধহস্ত। সবকিছু ছাপিয়ে সুমনের কবিতায় বড় হয়ে ওঠে একটা ফ্রেশনেস, খুব রিফ্রেশিং একটা আবহাওয়া। ‘সকালের শব্দাবলির ভেতর দিয়ে হেঁটে’ যান তিনি, যেখানে ‘খুব নিচু গলায় পাখিরা’ গুঞ্জনরত, যেখানে ‘চক্ষুময় শান্ত ঘরবাড়ি’, যেখানে ‘খুব স্বচ্ছ সুদূরের মাঠ’, ‘কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার মতো’ দোলে ‘ধানশীষ’। ‘পাকা কাঁঠালের গন্ধে মৌ মৌ’ দুপুরবেলায় ‘কানাকুয়া’-র ডাক, ‘আমাদের প্রত্যেকের’ সেইসব ‘গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘ অবকাশ’ ফিরে দেখা যায় ‘বেলাব থেকে আরও উত্তরে’ গেলে সুমনের কবিতায়।Belabo ‘ঝাপি উদোম করার’ অফুরান বালকবেলা ঝাপটা দিয়ে যাবে বারবার আপনার-আমার চোখে, এই কবিতাবলির সঙ্গে যেতে যেতে, এবং ভরসন্ধ্যায় জেলেপাড়ায় গিয়ে ‘কেদো বাঘের লেজে আগুন দিল কারা’ ইত্যাদি বাহাদুরি গল্পের আসরে বসতে মন চাইবে এবং ‘কী যে ভালো লাগবে আমার’ যখন ‘চৌচালার ওপর খুব ধীরে চেপে বসবে রাত’ এবং ‘দূরে, ভাঙা ব্রিজে / চাঁদপুরগামী নৈশ লোকালের প্ররোচনা’ টের পেয়ে ‘কী যে আনন্দ হবে’ এবং যে-আনন্দ গ্রন্থনার ভার আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে! ‘আঁশটে রোদগন্ধের ভেতর’ তন্দ্রাচ্ছন্ন ঝিমদুপুর আর ‘ইঁদুরে-খোঁড়া গর্তে’ হারানো মার্বেলগুলো বহুযুগের ওপার হতে ফিরে আসবে সুমন রহমানের কবিতার প্রভাবে। এইসব হয়, এইসব আরও কত কী হয়, কবিতার গুড/ইভিল ইনফ্লুয়েন্স এসব।


‘হরিণ দেখব বলে’ বেরিয়ে হরিণের দেখা না-পেলেও ক্ষতি পুষিয়ে যায় যখন সুমন আমাদের গাইড হিশেবে দেখিয়ে আনেন অন্য এক অবাক ভুবন, নিয়ে যান ‘বিশাল সুন্দরবনে’ যেখানে যেয়ে আমাদের ‘কল্পনাশক্তি ক্লান্ত হয়ে’ যায় এবং অবধারিতভাবেই যেন হারিয়ে যায় আমাদের ‘উপমার বোধ’, এই সেই সুন্দরবন যেখানে ‘ম্যানগ্রোভ ম্যানগ্রোভ উত্তেজনা চারদিকে’ এবং বনে নেমেই আমরা ‘বানর-ভরা গাছ’ খুঁজতে শুরু করি হয়তো-বা আদিভিটেয় ফেরার গরজে। এর আগেই অবশ্য ‘পশুর নদী’ দেখে নেয়া সারা, ‘ছ-ঘণ্টার ভাটায়’ যে-নদী ‘সুবোধ এবং কুমিররঙা’। আমরা জেনে যাই নদী কারো উপস্থিতির পরোয়া করে না, ‘যে-কোনো ভদ্রলোকের মতোই অন্যমনস্ক’ সে এবং সমস্ত নদীই আজকাল বখে গেছে এবং ‘ওর বখে যাওয়ার ধরনটি কিছু কিছু ক্রিটিকের মতো’ অগভীর অনাব্য তবু বহমান নির্বিকার। সুমনের সঙ্গে নদীভ্রমণ উপভোগ্য হয়ে ওঠে, কেননা তার কবিতাবাইনোকুলার দিয়ে দেখতে পাই ‘নদী পেরিয়ে’ এমন অনেক দৃশ্য, যা আমরা আগে ঠিক ওইভাবে খেয়াল করিনি। দেখি ‘ধীরে পাক দিচ্ছে চিল, ওর লক্ষ্য ভাসমান বয়া’; আরও দেখি নিশ্চিন্ত নৌকাচালক বসে আছে মুঠোতে চেপে হাল, যার কাছে ‘বয়া তন্দ্রার সমার্থক’ ইত্যাদি এবং এইসব দিলখোশ দেখাদেখির ফলেই হয়তো ক্ষমা করে দিই বিকটাওয়াজ ট্রলারের ‘চার সিলিন্ডার ছোকরা ইঞ্জিনটির বেয়াদপি’। রিভারাইন কান্ট্রির কবি সুমন রহমানের এই এক বিশেষ দিক যে, আমার কাছে মনে হয়েছে, নদী বিষয়ক ফ্যাসিনেশন তার কবিতার বড় একটা জায়গা জুড়ে রয়েছে। এই পশুর নদী পেরিয়ে ছাড়াও সুমনের রয়েছে কন্যাকুমারি, কালীদহ, নরসুন্দা প্রভৃতি নদীনিবিষ্ট পঙক্তিমালা। আর এইসব নদীনামধেয় কবিতায় কেবলই স্যুদিং ওয়েদার আর একপ্রকার নৈসর্গিক বিউটি লভ্য বুঝি? বিপন্ন বিষাদ নাই, কিংবা করাল কালচিহ্ন? অগ্রসর হোন, সুমনের সঙ্গে, এবং স্বচক্ষে দেখুন। আপাতত এই দেড় পঙক্তি : ‘পশুর নদী পেরিয়ে আমার মনে কি পড়বে, আমি ছিলাম এক / মিঠাপানির মাছ!’ আহা! মনে কি পড়বে! এই পিছুটান, এই নস্ট্যালজিয়্যা, ভালোবাসা, ধুলো আর কাদা, হায়, এমন মানবজনম! মন, ত্বরায় করো, শুনে ফেলো অশ্রুত সুরগুলো খুঁজে নিয়ে নির্জন কোনো নদীকোণ!noroshunda 1
এই অংশে এসে একনিশ্বাসে পড়ে ফেলা যাক কয়েকটি কবিতা। এলোমেলো পড়া যাকে বলে, উইদাউট এনি ক্লাসিফিকেশন। প্রথমেই পড়া যাক ছোটখালার যাওয়া । এটি পড়ে আপনার বয়ঃসন্ধিকালীন কোনো স্মৃতির হঠাৎ-বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যেতে পারে চোখ। হয়তো কবিরই ব্যক্তিস্মৃতি, কিংবা সামষ্টিক অবচেতনার, সেসব জানা জরুরি নয়। জরুরি হলো এই লাইনগুলো : ‘বৃষ্টি ধরে এলে / আমি শূন্য ফুলদানির ভেতর একা ঘুমিয়ে পড়তাম / ঘুমিয়ে ভাবতাম / প্রপেলার-পাখার অন্তহীন হিমেল নৈঃসঙ্গের কথা’। শৈশবের মতো সুন্দর ও সুদূর কল্পনার উদ্ভাস, শান্ত, সুবাতাসময়। এখানে যেমন ‘মাছরাঙাদের সমাজে সেলাইয়ের প্রচলন নেই’ জেনে ভালো লাগে, তেমনি লাগে না ‘যেন আমার প্রস্তাব বাতিল হয়ে গেছে / সুপারি গাছদের বিশেষ বর্ধিত সভায়’ শুনে। ডাজ ইট অফার এনিথিং? যাকে বলে পোয়েটিক ফ্লাইট, অন্তত আমি তা পাইনি। এহেন ‘বিশেষ বর্ধিত সভা’ বিষয়ক অবহিতকরণের লোভ সংবরণ করলেই ভালো। হর-ওক্ত কবিতায় কাব্যিক উড়ান থাকতে হবে এমতো কোনো বৈধানিক দিব্যি নাই জানি যদিও। তবে এই কবিতা পড়ে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ফ্রয়েড বা য়্যুকাস্তা-অয়দিপোস প্রভৃতি কিছু নাম বিড়বিড়িয়ে আওড়ালে আমি বিশেষ প্রতিবাদ করি না। ব্যাপারটা দুর্ধর্ষভাবেই এসেছে বটে এবং সেই মাধুর্যের আত্মীয়াকে এক অসহায় কিশোরের দেয়া নানাবিধ প্রস্তাবের রূপকার্থ খোসামুক্ত করা আদৌ কঠিন নয়। অন্যত্র মধ্যরাতের নদী কবিতায় যখন পাওয়া যায় এমন সিচ্যুয়েশন : ‘ইউরিয়া ফ্যাক্টরির সবুজ বিষ্ঠা মিশছে / ঘুমন্ত ইলিশের ফুলকায় / তবু গুনগুনিয়ে যাচ্ছে নদী, যেন ওর গানের ভেতর ইলিশের / বোকা বোকা শ্বাসকষ্ট আছে। সহজ মরণ আছে।’ — তখন কেউ কেউ বলে এটি ইকো-পোয়েট্রি, ইউরেকা! আর্কিমিডিস নই আমি, জিজ্ঞাসি : মানে কি, বাস্তুপরিবেশবাদী কবিতা? আমি সায় দিই না কখনো কবিতার এমন খণ্ডকরণের পক্ষে, যেনতেন-প্রকারেণ কম্পার্টমেন্টালাইজ না-করে যেন স্বস্তি পাই না আমরা, আজব! অথচ একই কবিতায় উচ্চারিত ‘একটি নিঃসঙ্গ জেলেনৌকার আলোয় আমার চোখ / ঝাপসা হয়ে আসছে’ পড়ে আমারও চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে, এসেছিল হয়ে, একদিন! এই ‘নিঃসঙ্গ জেলেনৌকা’ হয়তো পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বা তোমার-আমার ঠিকানার পার্শ্ববর্তী সুরমায় দেখে থাকব, কোনো সমাসন্ন অমাবস্যায়, তবে এ-কবিতা জন্মানোর ঢের আগের ঘটনা সেটি। কীভাবে সুমন টের পান তবে, কেমনে ক্যাপ্চার করেন দৃশ্যটি? আবার দেখি এমন ‘একটি দ্বৈততা’-র কথা জানান সুমন মাতৃপুরাণ কবিতায়, যে, তিনি ‘হাসপাতালের মতো নীরব’ এবং একইসঙ্গে ‘দর্শনার্থীর মতো উদ্বিগ্ন’ এবং ‘জন্ম থেকেই’। এবং তৎক্ষণাৎ লাফিয়ে উঠি নীরবে : আমিও, বিলিভ মি! নীরব, বাই নেচার, এবং উদ্বিগ্ন। অতএব সুমনের কবিতা আমাকে পায় না তো কাকে পায়! একেবারে, যাকে বলে, পেয়ে বসে। সুমনের কবিতা আমাকে পায়, পেয়ে গিয়ে পথিমধ্যে ভালোই বাজায়। কারণ ‘পরিত্যক্ত রেলস্টেশনে’ বেড়ে না উঠলেও ‘তালি বাজিয়েছি প্রেক্ষাগৃহের দৈনিক উল্লাসে’ আমিও এবং কোনো-না-কোনোভাবে আমিও তো ‘শুশুকের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সাঁতরে এসেছি কুমীরে-ভরা নদী’ এবং আমিও কি জানতাম ‘প্রতিটি রোমাঞ্চযাত্রার শেষে অবধারিত অশ্রুধারায় প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে আমার ফেলে আসা পথরেখা’! ‘তবু ভালো লাগত’, সুমনের মতো আমারও, ‘আখাউড়াগামী ট্রেন যখন স্লিপারগুলোর ঘুম ভাঙাতে ভাঙাতে যেত’; আর আমারও ছিল ‘মৌন একখানা পাটখড়ির গাণ্ডীব, আর ধ্যানী একজোড়া ঘুড়ি’, ছিলাম এবং রয়েছি আজও ‘আমি সকালসন্ধ্যা মৌমাছির চেয়েও ব্যস্ত, কিন্তু জিরাফের থেকেও নীরব’। তবু তারপরও ‘কেবল স্বপ্নের সাথেই আমি বিবাহিত’, যখন বলেন সুমন, শুনেই আমি লাফিয়ে উঠি ফের এবং সরবে এবার : আমিও তো, ও গড, বিলিভ মি! ছাপোষা আমার মতো অনেকেই একমত হবেন সুমনের সঙ্গে যে ‘আমরা তবু ভোঁতা তরবারিগুলোকেই ভয় পেতে পছন্দ করি। শক্তপোক্ত পাঁজরসমেত ওদের সামনে কম্পমান থাকাই আমাদের পেশা’। আর ‘এমন বাদল দিনে’ এই কবি কেবল কল্পনাচারী কালিদাস হয়ে ওঠেন তেমন নয়, লক্ষ করেন সচরাচর-লক্ষ-করি-না-আমরা এমনকিছু তুচ্ছাতিতুচ্ছ নগুরে দৃশ্য; দৃষ্টি এড়ায় না বৃষ্টিদিনে নগরগলির কাকশূন্য এন্টেনা, বা এমনকি শব্দহীন শীতবৃষ্টিও সুমনের নজর ও শ্রবণ ছুঁয়ে যায়। আর খুবই মিউট ‘বোবা-বোবা’ শীতকালীন বৃষ্টিদিনে ফুটপাতস্থ চায়ের ছাপড়া, সেখানে এককোণে আগুন-পোহানো ‘গুটিশুটি বুড়ো’ যাকে দেখে সুমনের মনে হয় সেই লোক ‘হিব্রুভাষার নবী’ এবং হয়তো চায়ে চুমুক দিতে দিতে সুমন মনে মনে ভাবেন : ‘আমার বলবার কথাগুলি, নিশ্চয় ঐ হিব্রুনবীর ঝোলায় গুমরে মরছে’! এই অকারেন্সগুলো পরিচিত আমাদের, তবু কবিতায় এইভাবে পেয়ে যেন অচেনা-অচেনা লাগে, যেন তবু মনে হয় অপরিচয়ের। এ তো কবিতারই কাজ, পরিচিতকে অপরিচিত করে তোলা আবার অপরিচিতকে চিরপরিচিতের ধরণীতে এনে অধিষ্ঠান দেয়া। আর এই দু-দুটো কাজই করতে পেরেছেন সুমন স্বতঃস্ফূর্ত সহজতার সঙ্গে। এই স্বতঃস্ফূর্ত সহজতা তার কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য, স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু প্রগলভ নয়, প্রমাণ দুই বইয়েই সুলভ প্রচুর পরিমাণে। ধরা যাক এই লাইনগুলো : ‘আমি ভয় পাই সেসব কথা যা তোমাকে বলা হয়নি, এরা আমাকে দিয়েছে অনিদ্রা আর আনন্দ, খুব সপ্রতিভ কোনো আড্ডার মর্মমূলে এরা থেকে গেছে পিত্তথলির পাথরের মতো নীরব ও বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে…’, কিংবা যেমন ‘আমি বোধহয় সূর্যকলসের ফাঁদে-পড়া দার্শনিক পতঙ্গমাত্র / জানা নেই ভুবনচিলের পা কেন খুঁজে ফেরে গগনশিরীষ শাখা / মফস্বলী কাকের কেন চাই এলুমিনিয়ামের এন্টেনা’। আবার ‘আমার সম্পত্তি বলতে একটা কাঁটাঝোপ-গজানো রেললাইন, আর দু-তিনটা অকশনে-ওঠা রেলবগি’ ইত্যাদি স্বীকারোক্তি শুনে মনে পড়ে আমরাও স্বত্বাধিকারী ছিলাম একদিন ওইরকম অমূল্য যত জহরতের, কোন সেই রাঙা কৈশোরে, ছিলাম ছোট ছোট কতই-না জিনিশের ঈশ্বর! গড অফ স্মল থিংস! বড় কথা হলো যে সুমনের কবিতায় কোনোকিছুরই বাড়াবাড়ি নেই, না ভাবনার না ভাবের না শব্দের না ছন্দের, কোনোকিছুই কোনোকিছুকে ছাপিয়ে ওঠেনি। ছিমছাম, ঝিলের অদূরে যেন পর্বতের শান্ত শ্বাসপ্রশ্বাস। অথচ ভাবনাহীন নয়, অথচ ভাবরিক্ত নয়, অথচ নয় শব্দের জাগ্লারি শুধু। অথচ ভরপুর, স্নিগ্ধবর্ণ, ‘বয়সন্ধির নীল পতাকার চেয়ে সুন্দর’। সুমনের কবিতা আমার অভিজ্ঞতাভুক্ত হওয়ার পর থেকে হেথা-হোথা বিচরণরত মেষশাবক কিংবা হাইওয়ের ধারের নাবাল জমিতে বেশ ভাবুক ভঙ্গি ধরে চরে-বেড়ানো মেষপাল দেখে কেবলই মনে হয়, ‘পেশাদার ভবঘুরে ওরা এ শহরে। একেকটা ইবনে বতুতা!’ আরও মনে হয় এরা আমাদেরই ‘বিভিন্ন শৈশব থেকে হারিয়ে যাওয়া / কিছু পশমের টুপি’ ইত্যাদি। ‘আহা! কবি!’ বিবৃতি পাই অমরতার চেয়ে সত্য কবিতায় একইভাবে : ‘ভেড়াদের আমি ভালোবাসি তাদের পর্যটকসুলভ পেশাদারি নির্লিপ্তির জন্যে’, হ্যাঁ, এরপর থেকে ভেড়া চাক্ষুষ মাত্রই বাংলা কবিতায় সুমনের কন্ট্রিবিউশন মেনে নিতে বাধ্য হই আমি। সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া বইয়ের অন্তর্ভূত নামকবিতা পড়তে পড়তে, একেবারেই ব্যক্তিগত অনুভূতির ধাক্কায়, শ্বাস আমার রুদ্ধ হয়ে এসেছিল পয়লাবার মনে আছে। কেননা আমারও জীবনে ছিল ‘উচ্ছল সান্ধ্য আড্ডার জন্য প্রায়-মাংসাশী’ হয়ে-ওঠা রেস্তোরাঁ এক, ‘শীতল অহিংসা’ ছড়াতে-আসা যুধিষ্ঠির আমিও দেখেছি, কিংবা ‘ধনুক বিক্রির পয়সায়’ পুরিয়াসেবী কর্ণ বন্ধু ছিল আমারও, দেখেছি ‘ঝুঁটি-বাঁধা’ ‘ফ্রেঞ্চকাট’ আরও কত কত বাহারের ‘অর্জুনস্রোত’! চোস্ত-কেতাদুরস্ত সেইসব বন্ধুরা আমার! দেখিনি কি আমারই দোসর কত ‘চাকরিপ্রার্থী ভীম’! আমিই ছিলাম স্বয়ং নকুল বা সহদেব একজন, গোবেচারা, ‘ছাত্র পড়িয়ে ক্লান্ত’ আর টিউশনিজীর্ণ ধ্বস্ত-তটস্থ সর্বদা-সারাদিন। সমানবৃত্তির লোক আমরা সবাই দিনভর কুরুক্ষেত্র করে বেড়াতাম, শুধু সন্ধ্যায় প্রত্যেকে একেকটা ‘কথার ফোয়ারা’ বয়ে ফিরতাম পাখির মতো পৃথিবীকিনারার কোনো-এক পাঞ্জেরি রেস্তোরাঁয় কিয়ৎক্ষণের জন্য শুশ্রুষা পেতে, ‘সারাদিনের ক্লান্তি আর লোহার অ্যাংকরের খামচিগুলোতে ব্যান্ডেজ বেঁধে’ নিতে, ফিরতাম রেস্তোরাঁর কাপ-ডিশ-কাটলারিজের টুংটাং খুনসুটিলীন সিরামিক-ঝগড়ার জাজ্বল্য জগতে। কবেকার কথা সেসব, কত কত ধূসর অনন্তবছর আগেকার! কোথা গেলে পাব সেসব নারী ও নক্ষত্রের খোঁজ? ‘জয় কাশীরাম!’ — লা জবাব, ব্রাভো সুমন — ‘দ্রৌপদী নিশ্চয়ই পৃথিবীর প্রথম রেস্তোরাঁর নাম!’


এভাবেই কবিতা পড়ি আমি, সিমপ্লি এভাবে, এই নিজের সঙ্গে রিলেট করে নিতে নিতে রিলোকেট করি আমার হারানো লোকালয়। এছাড়া আর কিভাবে কবিতা পড়তে হয় আমি জানি না, আমি জানি না আর কেমন করে গ্লোবালের জ্ঞানঘূর্ণিপাকের তোড়ে সেলিব্রেট করা যায় লাইফ। আমি শুধু জানি ‘নিঃসঙ্গ থাকার জন্য এই দেশ যথার্থই নাতিশীতোষ্ণ’, জানি ‘কাগজ উড়িয়ে-নেয়া হাওয়া’ ‘আমারই হাহাকার দিয়ে ভরিয়ে তোলে আমার ঘরটাকে’। জানি আমি এ-জীবন এক ‘স্বল্পকালীন প্রবাস’ ছাড়া আর কিছু নয়, এই দমবন্ধ পরবাসে ‘ঐ যে উড়ছে কার শুকাতে-দেয়া শাড়ি’, ‘আর শাড়িটিও কেমন, পতপত করে’ বলে চলেছে একাধারে কারো ‘বিরহের কথা’। আর জেনেছি এ-জীবনে শেষ বলে কিছু নেই; ‘প্রতিটি সমাপ্তিরই বর্ণমালা ও নিজস্ব কোলাহল থাকে’, জেনেছি আমি। কিংবা ‘বর্ষায় আমার মৃত্যু নেই / আমার মৃত্যু নিখোঁজ হয়ে আছে / লাল মোরগের আরো লাল ঝুঁটিদেশে’ — জেনেছি নিজেরই আন্তর এই উচ্চারণগুলো সুমনের কবিতায়। ‘কে আমাকে নিয়ে যাবে নিরক্ষীয় বনে?’ — এমন প্রশ্ন তো রয়েছে আমারও মনে এবং আমারও কি রাত্রিবাস ভেজেনি গোপনে? এইসব পড়তে পড়তে বারবার উঁকি দিচ্ছিল কিছু কোয়্যারিজ মম অন্তরে : কেমন ধারার কবি ইনি? কোন স্কুল অফ থট অথবা কার ঘরানার? সুমন কি নেচার-পোয়েট, যেমন ওঅর্ডসওঅর্থ ? অথবা আইরিশ প্যাস্টোরাল-পোয়েট, শেমাস হিনি? কিন্তু ওইরকম প্রশ্নমালার প্রতিক্রিয়ায় একটা অদৃশ্য ব্রাকেটের ভেতর থেকে সমবেত হাসাহাসির আওয়াজ পাওয়া যায় শুধু, উত্তর যায় না পাওয়া। বাংলা কবিতায় এমন নরম নাগরিকতা আমরা দেখেছি কি এর আগে? এমন ‘স্বচ্ছ আত্মপ্রকাশ’? অন্তত আমার নজরে আসেনি স্বীকার করব। নরম, ন্যাকামিবিহীন, খুবই মনোলীন ব্যক্তিক উচ্চারণ। ‘স্বচ্ছতা জীবনের গভীরতম শর্ত’ মনে করেন যে-কবি, তার কাছ থেকে অন্তত কবিতায় রহস্য তৈরির নামে বেলেল্লা মাথা-ফাটানো অবকল্পনা পাওয়া যাবে না তা আশা করা বাহুল্য নয়। অবশ্য পাইকারি হারে একপ্রকার পরাবাস্তবের গণপ্রয়োগ কবিতায় দেখতে দেখতে আমাদের বাপদশা ঘটিয়া গিয়াছে। সেক্ষেত্রে সুমনে এসে একটুখানি স্বস্তিনিশ্বাস ফেলতে পারল বাংলা কবিতা। আরও বলছিলাম নগরানুষঙ্গ কবিতায় উপস্থাপন বিষয়ে। কবিতায় নগর মানেই বোদলেয়রের ভূত, সমর বলেন আর শহীদ বলেন, অবক্ষয় ও অজাচার আর কখনো-বা উপরিতলের রাজনীতি নিয়ে রঙিন রোয়াব ইত্যাদি ছাড়া নগরে যেন অন্যকিছু চলে না। আর নৈসর্গিক নন্দন ও নগরসমাজের শোভা-সজ্জার কথা তো কবিতায় বড়-একটা শোনা যায় না। আফসোস! আক্ষেপে ভেসে না-যেয়ে একবার আমরা সুমন রহমানের কবিতা ট্রাই করে দেখতে পারি। ভীষণ বিটকেলে একটা কালচার গ্রো করেছে এখানে এই উঠতি শহরসভ্যতার দেশে, গেল বছর-বিশ ধরে এটি প্রকট হয়ে উঠেছে দ্রুতবেগে, যেন সমস্তকিছু নিয়ে রগড় করা আর রঙ্গতামাশার বাইরে এখানকার কবিতা-গান-গল্পগুজব-সমাবেশের কিছুই করার নেই। পিচ্ছিল একপ্রকার মাথাপাৎলামি কিংবা আখাম্বা পণ্ডিতি করাটাই যেন কবিতা বা সামগ্রিক শিল্পবাসনার সমার্থক হয়ে উঠেছে। সুমন রহমানকে এর ব্যতিক্রম মনে হলো, পরিমাণে অল্প কবিতা লিখেছেন বা ছেপেছেন বলেই হয়তো অমন ইকোনোমি ক্লাসের ক্ল্যাপ্সস্লিপ্সা সামলাতে পেরেছেন। সুমন মজা করেন, কবিতায়, কিন্তু ফাজলামো নয়। অদ্ভুত মার্জিত ও ব্যালেন্সড্ তার সেই মজা করার ভঙ্গি। ভাবালুতা ছাড়া বাংলা কবিতা হামেশা পাওয়া যায় না, আলবৎ, আর এই রেয়ার প্রাপ্তি যে-কয়জনের কবিতায় ঘটে সুমন তাদের একজন। অযথা কাব্যি-করা আবেগ-গদগদ পঙক্তিপাঁচালি নয়, তার কবিতা মিতাবেগ ও বুদ্ধিদীপ্তিময়। তার কবিতার শরীর ও মেজাজ ঝকঝকে, স্নানান্তিক স্ত্রীলোকের ন্যায় ঝরঝরে শান্তিশিহরণকর রূপ, কদাপি আলগা স্মার্টনেস সেটা নয়। সুমনের স্বর সফ্ট্, আবারও বলি, তবে সেই সফ্টনেস সো-কল্ড্ মিস্টিক বা মরমিকাতর নয়। আলাওলের দেশে কবিদের আলাভোলা ভাবভঙ্গি ভীষণ ফ্যাশনেবল, অথচ বিস্ময়করভাবে কেমন একটা টাটকাপ্রাণ মেধা আর স্বাস্থ্যস্নিগ্ধ আবেগের সঞ্চার করেন সুমন তার কণ্ঠস্বর দিয়ে। কেমন চনমনে রোদ খেলা করে তার নির্মিত বাকপ্রতিমায়, স্যাঁতস্যাঁতে একটাও কর্নার লক্ষ করা যায় না তাতে। এতক্ষণ ধরে এ-অনুচ্ছেদে এই ঝিলিমিলি বিজ্ঞাপনতরঙ্গ প্রচারিত হলো সুমন রহমানের কবিতা যারা আজও পড়ে দেখেন নাই, শুধু তাদেরকেই টার্গেট করে, তাহাদেরি তরে।

সুমন রহমান (জন্ম ১৯৭০); ছবি: ফেসবুক থেকে নেয়া।

সুমন রহমান (জন্ম ১৯৭০); ছবি: ফেসবুক থেকে নেয়া।


এবার আরও একটু ক্রিটিক্যালি ল্যুক-ব্যাক করে দেখা যাক কিসের ঘাটতি আর কিসের প্রাচুর্য রয়েছে এই কবির কিংডম জুড়ে। একটা প্রোফেটিক টোন খুব উপভোগ্য উঁকি দেয় মাঝেমধ্যে, যেমন : ‘চাঁদের বিচ্ছেদ কি তোমাকে উপহার দেয়নি একটি অতলান্তিক সমুদ্র!’ কিংবা অন্যত্র : ‘হিমালয়ছুট যেসব চামড়াভিখারি কৃষকের মেদমাংসে নিজেদের বেশ লাগছে ভাবছে, উন্মুখ ধানীজমির কাছে তারা কেবল পর্বতশৃঙ্গের মহামৌনতাকেই বিক্রি করতে সক্ষম’ … ইত্যাদি। জিব্রান মনে পড়ছিল, দ্য প্রোফেট। কখনো-কখনো সুমনের রাজ্যে একধরনের ডিটার্মিন্যাটিভ অ্যাপ্রোচ লক্ষ করে নেত্র কোঁচকায় : ‘কার্যকারণ হচ্ছে যাবতীয় অভিজ্ঞতার প্রধান মুদ্রাদোষ’; অথচ একই কবিতায় যখন শুনি, ‘মিনিট-স্থায়ী পুনর্মিলন, সমগ্র জীবনের যৌথতার চেয়ে সত্য’ বলে নিজের বিশ্বাস ব্যক্ত করেন সুমন, উই ডু এগ্রি উইথ হিম। কিন্তু পরক্ষণের উচ্চারণ ‘অমরতার চেয়ে সত্য অমরতার দিকে যাওয়া’ টাইপের জাজমেন্ট/সিদ্ধান্ত সহসা মেনে নেয়া সম্ভব হয় না। কারণ হয়তো আমার মতো লঘিষ্ঠসংখ্যক কারো কারো নিকট অমরতার প্রসঙ্গোত্থাপনই আপত্তিকর। সন্তানোৎপাদনের মধ্য দিয়ে এই-যে দুনিয়ার এত লোক দিনকে রাত আর রাতকে দিন করে চলেছে, কোথায় চলেছে? সেই তো অমরতার দিকেই! তাহলে এটা তো অত মহান কিছু নয়। কবি বোধহয় বলতেও চাইছেন যে, এ মহান মোটেও নয় তবে সত্য নিশ্চয়। সত্য এই যে, আমরা চাই বা না চাই আমরা অমরতার দিকেই যাই। সত্য, মানে, এটাই বাস্তব। অমরতার দিকে যাই বংশবিস্তারের মাধ্যমে। সেই সূত্রে ‘মার্জারজন্ম’-মূষিকজন্মও তো অমরতার দাবি করতে পারে। কেউ তো নিষেধ করছে না, দাবি করলে করুক! তবে না, কবি সিদ্ধান্তপ্রবণ নন। যত তিনি নিশ্চিত হতে গেছেন, তত বেশি অনিশ্চিত হয়ে এসেছেন ফিরে। ‘এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে গেছি। সেখানে দেখেছি / গোলকধাঁধা তৈরি করেছে তোমার চক্ষু জোড়া’ এবং ‘তোমার কুন্তলরাশি ঝপাৎ বৃষ্টিপাতের মতো / আমাকে লুকিয়ে ফেলেছে / যাবতীয় চিন্তাশীলতার কাছ থেকে’। চিন্তাক্লিষ্ট গণ্ডদেশ, অন্তত কবিতায়, কম লোকেরই ভালো লাগে। একটা সেন্স অফ রিবার্থ উৎফুল্ল করে তোলে একেশ্বরী কবিতার একদম শেষদিকটায় : ‘তবু যোগী নেয়নি কিছুই। দূর বনাঞ্চল থেকে / খরবায়ু নিয়ে আসে টইটম্বুর / ফলের কান্না, আসে দাবানল / হাসে দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী / কেউ কি দেখেনি / বন পুড়ে গেলে / ভয়ার্ত পশুপাখিদের / পলায়নপর রেখার আড়ালে তার নাচ / নাচে একেশ্বরী / আগুনরঙের শাড়ি শরীরে জড়িয়ে’। একধরনের গল্পরেখা পাওয়া যায় তার কবিতায়, বলেন কেউ কেউ, ফলে সংযোগ স্থাপন সহজ হয় কবিতার সঙ্গে। এটা অবশ্য ঠিক, তবে এই লভ্য গল্প আবার ষাট-সত্তরের বাংলা কবিতায় সুলভ গপ্পোবাজির আদলে নয়। সুমন গল্প বুনে দেন সহনীয় মাত্রায় সিগন্যালের আশ্রয় নিয়ে। এবং আমার বিশ্বাস, দুনিয়ার সমস্ত বিমূর্ত শিল্পের ভেতরে রয়েছে শক্তিশালী গল্পের উপস্থিতি। হতে পারে সেই বিমূর্ততা আফতাব-এ-মৌসুকি উস্তাদ ফইয়াজ খাঁর বাজনার, বা বাখ বা মোৎসার্ট বা বিতোফেন বা চাইকোফস্কির, অথবা কোনো মহান ইম্প্রেশনিস্ট কি এক্সপ্রেশনিস্ট ধারার অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টারের কাজের। টেক্সচার-কালার-ফর্ম-টেকনিক-টোন-স্ট্রোক সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে সেই অ্যাবস্ট্রাকশন্। একই শিল্পকর্ম দিয়ে একেক ইন্ডিভিজ্যুয়াল ভোক্তাকে একেক গল্প প্রেজেন্ট করার জন্য প্রযুক্ত হয় সেই বিমূর্ততা, আমাকে আমার জীবনের কোনো মুহূর্তখণ্ড অব্লিভিয়ন থেকে ফিরিয়ে এনে দেয়াতেই তার সার্থকতা, আর কিছু নয়। যদিও অধিকাংশ সমঝদারের শিল্পভোগ বলতেই শিল্পীর গায়ে জড়ানো পশমিনা শালের দরদাম বা বড়জোর শিল্পী সম্পর্কে বাজারচলতি কিছু মিথের পুনঃপুনরোল্লেখেই সীমাবদ্ধ, বড়জোর ওয়াহ্-ওয়াহ্ … সুভানাল্লা … লা-জোয়াব … বহোৎ-খুব পর্যন্তই। কিন্তু সুমন ওইরকম করতালিতৃষ্ণ কবিশিল্পী নন বলেই মনে হয়েছে আমার। সুকৌশল সন্তর্পণে সময়ের সন্দর্ভ রচনা করে চলেন তিনি, খণ্ড খণ্ড সময়চিত্র ধারণ করে চলেন কবিতায়। একগাদা নয়, কয়েকটি উদাহরণ চয়ন করা যাক, অল্প ও অতিনির্বাচিত কতিপয় ইতিহাসজ্ঞান আর প্রতিবেশচেতনার প্রমাণ। ধরা যাক এই উদাহরণ : ‘গুণে দাও দক্ষিণা / প্রভুর — ডুবে মর স্বখাত সলিলে / ডুবতে ডুবতে দেখ / তোমার প্রাণের গান শুনে / পা দোলাচ্ছে ভরপেট ডাইনোসরেরা’। কিংবা এইগুলো : ‘মা-বাবার বকাঝকা শুনতে শুনতে শুকিয়ে যাওয়া / মধ্যবিত্তের আইবুড়ো মেয়ে / যেন বুধবার বিকেলের গৃহগামী ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে / ওর নতুন দুলজোড়া / যেন ওর অপরাধ অশ্রুপাতেরও যোগ্য নয়’ … আহা! অথবা কী দুর্ধর্ষ এই উচ্চারণ, শুনুন : ‘চারদিকে শামুকেরই দেশপ্রেম আজ / দেশান্তরিত মৎস্যসমাজ / হৈ হৈ হাঁসের ডামাডোলে খুব আর্ত বোধ করছে / একটি জলঢোঁড়া’। আর এই ভূখানাঙা মানুষের মেদিনীমণ্ডলে এক হাস্যোজ্জ্বল-লাস্যঝরা গা-গতরে হৃষ্টপুষ্ট নোবেল লরিয়েট শান্তিঋষির মুখ চকিতে দেখে উঠি ঈগড্রাসিল কবিতায় : ‘ঘোর বৃষ্টির নখরে গেঁথে দেবো / আমাদের দুর্ভিক্ষপূর্ব থমথমে রাত্রি আর / ঝিমানো মুরগিগুলো’ … হো-হো-হি-হি হেসে উঠি, ঘৃণা আর বেদনায় মুখ যদিও-বা ক্লিষ্ট হয়ে রয়। অথবা, পার্সোনাল রেফারেন্স সম্বলিত মনে হলেও লক্ষ করুন এই উচ্চারণ : ‘রোহিনী অরুন্ধতী এবং আরো সব / নিকটজনেরা / ছুঁড়ে মেরেছে বল্লম / নোনা / রক্তের ঘ্রাণ পেয়ে / পিছু নেয়া সব ক্ষুধার্ত ও প্রাবাদিক প্রাণীগর্জনে / আমার যে পেয়েছিল / ঘুম’ … । উরু খুলে সেলাই-দেখানো বদমাইশ মাল্টিলিঙ্গুয়াল বই থেকে শুরু করে ভাটিয়ালি বেচে মবিল খরিদকারী ক্ষীণতনু ও ক্ষয়িষ্ণু মাঝি পর্যন্ত সুমনের পর্যবেক্ষণাওতাভুক্ত। অথচ এই ভীষণ বাস্তবের মগ্ন অনুসন্ধানকারী হয়েও সুমন কল্পনা বা ইমাজিনেশনের গুণকীর্তন করেন কীভাবে, দেখুন : ‘ঘুমন্ত স্তনস্পর্শের শিহরণ থেকে ওর জন্ম। আমার ক্রোধের ওপর পোশাক খুলে রাখল সে, আমার দিগ্বিজয়ের বাসনাকে চেপে ধরল ঠোঁট দিয়ে। আমারও গাণ্ডীব নমিত হয়ে এল, পৃথিবীর মহান সেনাপতিদের মতো।’ কোনোদিন ভুলব না আমি এই পঙক্তিটি : ‘পাহাড়ের গায়ে লেগে-থাকা শৈবালেরও থাকে পাহাড়কে গিলে খাবার বাসনা।’ আরে, তাই তো!

১০
কবিতা বিষয়ক আলোচনায় কবির মিথ-মেকিং কোয়ালিটি নিয়া একেবারে কিছুই না-বললে বেচারা আলোচকের প্রেস্টিজ থাকে না। আমার অবশ্য এদিক থেকে একটা সুবিধে রয়েছে, বেনিফিট অফ লিটল্ লার্নিং যাকে বলে, সেই সুবিধে এস্তেমাল করতে চাইছি পুরোপুরি। মিথ ব্যবহার করতে গিয়ে কবিদেরকে, সচরাচর, দেখা যায় বিষ্ণু দে ভর করতে এবং খটমটত্বে বিষ্ণু মশাইকেও পেছনে ফেলে যেতে। একের-পর-এক মিথচরিত্র উপর্যুপরি বিছিয়ে গেলেই যেন কবিতাপঙক্তি পোক্ত হয় মনে করেন তারা। কি জানি, হয়তো তা-ই হয়। তবে এহেন সৎমাসুলভ বৈরী বিহেভিয়্যরের ফলে পাঠক হিশেবে আমাদের দফারফা সারা হয়ে যায়, এসব বেদন অবশ্য কবিদের সিম্প্যাথি আদায় করতে পারেনি কোনোকালে এবং পারবে বলে মিনিমাম আশাও দিয়াছি জলাঞ্জলি। কিন্তু সুমন রহমান এক্ষেত্রেও প্রশংসার্হ মুনশিগিরি করে দেখিয়েছেন। ধরা যাক, র‌্যান্ডোম স্যামপ্লিং, ঈগড্রাসিল কবিতাটা। আমি যদি নর্স মিথোলোজি বিন্দুবিসর্গও না জানি, স্বর্গ-মর্ত্য-নরকে শেকড়-শাখাবিস্তৃত ঈগড্রাসিল নামের পৌরাণিক সেই পাঁশুগাছ ও নর্ডিক পুরাণ জুড়ে একটা ছাইবৃক্ষের প্রভাবপ্রতিপত্তি বিষয়ে বিলকুল অজ্ঞ থাকি, ঈগড্রাসিল ঠিকই আমাকে পেঁচিয়ে ফেলে এক অজানা আবেশে। এবং, ‘দেয়াল ফাটিয়ে / বেরিয়েছ বিশ শতকের মুখ’, পয়লা লাইন থেকেই। স্বচ্ছ ও স্পষ্ট, সিগন্যালের পর সিগন্যাল, কন্টেম্পোরারি পোলিটিক্সের হৃদয়বোধ্য একটি পিক্টোরিয়াল প্রেজেন্টেশন। উপরি পাওনা হিশেবে দেখতে পাই আরও কতকিছু, যথা : ‘আজ আর্দ্রতারোধক দেশলাই-খোলে নিরাপদ ঘোড়ার কাহিনি’; বহুদিন ধরেই আমি আমার ছেলেবেলার সেভেন-হর্স ম্যাচবক্সের একটা খালি খোল খুঁজছিলাম, রহিম ও করিম ভরসাভাইদ্বয়ের ব্যবসাবাতাসের তোড়ে সেই কৈশোরস্মারক ঘোড়ামার্কা-বাঘমার্কা ফায়ারবক্সগুলো কবেই উধাও! সুমনের সৌজন্যে একটা পাওয়া গেল, মোহাফেজখানায় রেখে দেবো ভাবছি। ঠিক তেমনি ভিন্ন মজা পাওয়া গেল প্রস্তরযুগের ঘোড়াগুলোর উপস্থিতিতে এক অবসন্ন মহাকবির মুখ চকিতে মনে পড়ায়। অথবা সামন্তরাজার মুখটি চিনতে কি কষ্ট হয় খুব? রকমারি ইন্দ্রজাল এবং ‘দুর্লভ স্বপ্নের / অপ্রাপ্তি ও সম্ভাবনা দিয়ে বানানো’ ওই রাজার মুখোশ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ‘লাখ লাখ বোমারু বিমান’ আর ড্রোন-হেলিকপ্টারে দেখো ‘ছেয়েছে আকাশ’! কবিতায় মিথ এভাবেই অন্তঃশীলা থাকবে, পানির উপরে ভেসে উঠবে কেন মরা মাছের মতো? সুপ্রযুক্ত প্রতিটি শব্দই তো একেকটি মিথ, কবিতায় ব্যবহৃত প্রতিটি ইউনিট, অথবা এক্সপ্রেশন কি ইমেজারি কি অ্যানেকডোটগুলো। আসাদের শার্ট কি মিথ হয়ে ওঠেনি, কিংবা জয়নুলের কাক? অনুরূপ সুমনের বিদ্যাকূট ও ছোটখালা ও উমাচরণ কর্মকার ও নদীগুলো একেকটি বিশিষ্ট মিথের মর্যাদা পাক। তেরোশ নদীর এই দেশ, মিথিক্যাল তেরোশ ক্যারেক্টার কমসে-কম, খুঁজে কেন মরছি মিছে হেথা-হোথা প্রাচ্য ও প্রতীচ্য পুরাণ? ‘ওই দেখা যায় তালগাছ’ … কই? তালগাছটি কি মিথ হয়ে উঠছে না আজ আমাদের এই আধা-আর্বান দেশে? ‘ওই আমাদের গাঁ’ … দেখা যায়? গ্রামপতনের নিঃশব্দ সন্ত্রাসই রিয়েলিটি, মিথ হয়ে যাচ্ছে গাওগেরাম। কানাবগির ছা আর পান্তা-পুঁটি নিখোঁজ অলরেডি। মিথে পরিণত হয়ে যেতেছে দেখো গোটা বাংলাদেশ। গতকালকের ঘটনাটাই আজকে কেমন পুরুষানুক্রমে-প্রবহমান কাহিনির মতো শোনায়। অথচ কবিতায় কেবল পরাবাস্তবের পত্তনি, মিনিপুষির মিস্টিফিকেশন, ভীষণদর্শন কল্পজাগতিক কার্নিভ্যাল শুধু। রোজকার বিলীয়মান নিসর্গধরিত্রীর ডক্যুমেন্টেশন কই? নিজের কার্নিশে একটাও চড়ুই বসে না যে, সেদিকে খেয়াল নাই, লিখতে গিয়া খালি ফিনিক্স-গরুড়-আবাবিল নিয়া মাতামাতি! কিন্তু সুমন রহমান পড়ে ভরসা পাই, না, সব বিহঙ্গ এখনো হয়নি অন্ধ কিংবা বন্ধ করেনি পাখা। মাশরুম গ্রোথ লক্ষ করেও কবি নিশ্চয় পণ্ডিতির পানে পিঠ দিয়ে পদ্মপাতায় সূর্যস্পর্শ পরখিবেন গভীর অভিনিবেশে! কবি লিখবেন কবিতা, এইটাই ন্যাচারাল, যেমন ‘মিথ অ্যান্ড মিনিং’ লিখবেন ক্লদ্ লেভি স্ত্রস্। উলটোবুজলি বিরান ভুবনে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে ব্যস্ত কবিরা কাতার বেঁধে; এ কী কেবলি পেটের দায়, সখি? কী তাজ্জব-কা বাৎ! বহুজাতিকের বেতনে আজিকে বাংলা কবিতা কাৎ!

১১
সুমন রহমানের একটি কবিতা আলাস্কা আমার বিশেষভাবেই প্রিয়, জন ডেনভারের গান ভালোবাসি বলেই নয়, যদিও ওই কান্ট্রিসিঙ্গার আর আমার কুয়াশামাখা কাকাতুয়া কৈশোর একাকার; ভরযৌবনা সেই আলাস্কা-কুমারী, ছন্নছাড়া ভালুক আর রূপালি ট্রাউটের ত্রিভুজ প্রেমের গল্পের কারণে নয়, অথবা নয় ‘মাঠকর্মীদের উল্টো-করে শুকাতে দেয়া ল্যাট্রিন প্যানগুলো’-র সঙ্গে ‘সিমেন্টের শত শত সীল মাছ’-এর মতো অভাবিত তুলনা টানার কারণেও; কবিতাটা আমার প্রিয় স্রেফ তার নামের কারণেই। মেদুর করে তোলে এক-লহমায় সেই দিনগুলোর সুর … সানশাইন অন মাই শোল্ডার মেইক্স্ মি হ্যাপি … ফিরে এসে কাঁধে বসে একগুচ্ছ রৌদ্রপ্রজাপতি, ফিরে ফিরে বেজে যায় কোথায় কোনখানে সেই কলোরাডো রকি মাউন্টেন … ওয়াইল্ড মন্টানা স্কাই … কান্ট্রিরোড টেইক মি হোম / ট্যু দ্য প্লেইস আই বিলং … । ‘ইন আ চ্যুজেন কান্ট্রি … আলাস্কা এন্ মি’, নিদারুণ মেলোডিমিরাক্যুলাস এক রামপ্রসাদী জীবন যেন! [youtube id=”cM6BukqNHSA”]‘বহুযুগ ধরে কারো রক্তে দ্রবীভূত না-হওয়া নাইট্রোজেনের ঘনশ্বাসের মতো’ অদ্য আলাস্কাহীন জীবন আমারও। তবে এটি কি মাসুদ খানের কুড়িগ্রাম কবিতাটা মনে পড়ায় না? কোনো মিল নাই তেমন ভেতরগত, তবু মনে পড়ায়। উভয়েই স্থাননামভিত্তিক, হয়তো এই কারণেই পূর্বস্মৃতি ইগ্নাইট করে। এও অবশ্য মনে হয় যে, একটা দুরসম্পর্ক রয়েছে সুরের দিক থেকে; যেমন : ‘হয়ত আলাস্কা নামে কোনো গ্রাম নাই, হয়ত আলাস্কা নাই; … কোথায় আলাস্কা? ফাঙ্গাস-পড়া মনপর্বত, কোথায় সে? … হতে পারে আলাস্কা নেই। …’ কেন? জলজ্যান্তভাবেই তো আলাস্কা আছে, এরপরও সন্দেহ কেন? মাসুদ খানও সংশয়ী ছিলেন কুড়িগ্রামের বাস্তব অবস্থান নিয়ে। এহেন আনসার্টেনিটি ভুবনজনপ্রিয় ল্যাতিন্যামেরিকান আখ্যানভাগে এবং অত্র বঙ্গখণ্ডের সৈয়দ হক পরবর্তী শহীদুল জহিরে এত বহুলভাবে এসেছে যে, এর বাইরে নব্বই-দশকী পথেঘাটে-পুরস্কারভূষিত অমৌলিক অনুকারদের উল্লেখ উহ্য রাখলেই ভালো। তবে এসব মাইনর অস্বস্তি সত্ত্বেও কবিতাটা আমার প্রিয়। মনে-পড়াপড়ি প্রসঙ্গে এখানে একটু বাচাল হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছি নিশ্চিত। ছেলেকে না-বলা রূপকথা নামে একটা কবিতা আছে, সুমন রহমানের, যা কিনা রণজিৎ দাশের ছেলেকে বলা রূপকথা মনে পড়ায়। কিন্তু এ কেবল কবিতানামের কারণেই, আমি নিশ্চিত, নামসারূপ্য ব্যতীত অন্য কোনো অন্তর্নিহিত সাযুজ্য রয়েছে কি? নেই, না আঙ্গিকগত না ডিকশনের, কোনো মিল নেই। দুটো কবিতা রেস্তোরাঁ আর একেশ্বরী কিয়দংশের সঙ্গে জয় গোস্বামীর স্বরসাযুজ্য লক্ষ করা যায় খুব ডিস্ট্যান্ট হলেও, উদাহরণ যথাক্রমে : ‘তবে একা পেলে, ফাটা গ্লাসটিকে, আরো বীভৎস করে / পুরো গল্পটি শোনাতে হবে, যাতে ওর দফারফা হয়’ এবং ‘এই দুর্লভ / স্বপ্নজন্তুটিকে তুমিই পাহারা দিও / নইলে সে ভেসেই বুঝি যায় / মন্দিরচূড়ার গর্বিত হাওয়ায়’; তুলনীয় জয়, যেমন : ‘একবার যদি হাতে পাই একা ছাতে পাই / কিছুতেই ছেড়ে দেবো না’ এবং ‘হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে’ … ইত্যাদি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এছাড়া শিকড়ের কথা শুনে কবিতাটিতে যে ভর্ৎসনার সুর, পড়তে পড়তে ফরহাদ মজহারের গুবরে পোকার শ্বশুর মনে পড়ছিল। অবশ্য এর মানে এ নয় যে সুমন রহমানের কবিতায় অমুক-তমুকের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, এই মাত্রায় মনে-পড়াটা বরং কবিতার জন্য পজিটিভ ভূমিকা পালন করে। ভুঁইফোড়ে দেশমুলুক ভরে যেতেছে, সেখানে এক ইন্ডিভিজ্যুয়াল ট্যালেন্টের জন্য তার পোয়েটিক ট্র্যাডিশন মনে রাখা ফরজ বটে। এই রে! সেরেছে! এই চাগিয়ে উঠল বুঝি আদি ও আসল কোবিদের কর্তব্যজ্ঞান! আর কার কার প্রভাব আছে? আর কার কার! জলদি করো বার, আর কার কার প্রভাব আছে, আর কার কার! একটু-আধটু প্রশংসা করা ভালো, তবে কেবল প্রশংসাবাক্য প্রচারিলেই হবে না, কবিকে একহাত দেখে নেয়াও চাই। সুযোগ বুঝে একটু শিখিয়েও দেয়া চাই এটা-সেটা, কাকে বলে কবিতা বা করোগেটেড টিনশেডেড বাংলোবাটিকা, কার নাম রেনুবালা বা কার গলে শোভা পাবে ঐ-দেখা-যায় মহাকালের মুক্তার মালা। হায়, চান্স পেলে চামচিকাও কবিকে শেখাতে চায়!

১২
মহাকালের মোহগ্রস্ততা আশা করি সুমন রহমানের মধ্যে নেই খুব-একটা, থাকলেও প্রকাশ সীমিত, অন্তত দৃষ্টিকটু মোহাচ্ছন্ন মহাকালকাঙলামি বিস্তর ঢুঁড়েও পাইনি এখানে। এ-প্রসঙ্গে এক মশহুর সম্পাদকের মুখ মনে পড়ছে। বেশিকাল আগের কথা নয়, ব্যক্তিগত ও ঘরোয়া আড্ডায় সেই সম্পাদককে ঘিরে আলাপ করছিলেন কয়েক ইমার্জিং পোয়েট। তৎকালে শিক্ষাধীন-চিকিৎসক জনৈক তরুণের কবিতা তার সম্পাদিত পত্রিকায় কেন ও কোন সম্পাদনাবাটখারায় ওজন লইয়া ছাপেন তিনি, তদুত্তরে সেই সম্পাদক মশাইয়ের জবানে বেরিয়ে এসেছিল অবাক-করা এক সত্য। বলেছিলেন, অভিযোগোত্থাপনকারী অন্য অনেকের মতো মগজের হৃদয়ের স্ক্রুপ-বল্টু খুলে ঝুরঝুর ঝরে গেলেও কবিপ্রবর ওই তরুণের কবিতার কুলকিনারা করতে তিনিও তথা আমাদিগের সেই সম্পাদনকর্তা পারেন না। তাহলে কেন প্রকাশ করেন অত যত্নে সম্পাদিত আপন পত্রিকায়? কে জানে, এডিটর উবাচ, যদি মহাকালে স্পেস পেয়ে যায়! সহাস্য সরল কিন্তু সিরিয়াস স্বীকারোক্তি সেই সম্পাদকের। পরিস্থিতি কতটা বিপর্যয়কর হলে পরে এহেন মহাকালমোহে একটা আস্ত দশক ডুবন্ত থাকে? একই দশকে আবির্ভূত কবি সুমন রহমান সনাক্তিযোগ্যরূপে আলাদা, ডিস্টিংক্ট, আনবাউন্ডেড অর্ফিয়ুস।

১৩
সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়ার উৎসর্গপত্রে উৎকীর্ণ দেখতে পাই রবার্ট ফ্রস্টের লাইন। আর যায় কোথা, সাদৃশ্য খুঁজতে শুরু করি ফ্রস্টের সঙ্গে সুমনের। এই সাদৃশ্য তল্লাশের ভেতরে নেই কোনো প্রথানত কলাসমালোচকের দৃষ্টি দিয়ে এক কবির ওপর অন্য কবির প্রভাব খোঁজার নিগেটিভ কনোটেশন্যাল মরিয়া প্রয়াস। ঝানু গোয়েন্দার জাসুসি এ নয়, এ একপ্রকার শখের ডিটেক্টিভগিরি বলা যায়, এক নাদান পাঠকের পরিকল্পিত পাঠতদন্ত। প্রতিবেদন পেশ করার আগে এটা কবুল করে নেয়া যাক যে এই তদন্তকর্মে ব্যাপৃত হওয়ার প্ররোচনাফাঁদ, পাঠকের জন্য, সুমন নিজেই পেতে রেখেছেন। গ্রন্থনামকরণে তো বটেই, উপরন্তু গ্রন্থপ্রবেশের প্রাক্কালে এটি বিতর্কাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে তিনি ফ্রস্টানুরাগী। পৃথিবীর সঙ্গে যেমন ফ্রস্টের তেমনি সুমনেরও সম্পর্ক প্রেমপূর্ণ ঝগড়াঝাটির। বহুপঠিত দ্য লেসন ফর টুডে কবিতায় ফ্রস্ট নিজের সমাধিশিয়রে এপিটাফ রাখতে ইচ্ছুক : ‘আই উড হ্যাভ আ শর্ট ওয়ান রেডি ফর মাই ঔন / আই উড হ্যাভ রিটন্ অফ মি অন মাই স্টোন : / আই হ্যাড আ লাভার্স কোয়্যরেল উইথ দ্য ওয়ার্ল্ড।’ কবির প্রত্যাশিত কাজই হলো, য়্যুনিভার্সালি, পৃথিবীর সঙ্গে দ্বান্দ্বিক সংলাপ চালু রাখা। আর কাব্যগ্রন্থের তোরণে এই উদ্ধৃতি টাঙিয়ে রেখে যেন কবি হিশেবে নিজের নন্দনরুচিগত অবস্থান স্পষ্ট করেন সুমন। ফ্রস্টকে যেমন ‘সহজ সরল ভাষা, আধভাঙা ছন্দ, গূঢ় দৃষ্টি, ছোট্ট আর আলাদা ধরনের টুকরো-টাকরা ছবির গঠন, মনের মতো কানে কানে কথা বলা যেন, অথচ কী গভীর ঔদাস্যময় এবং আন্তরিক …’ প্রভৃতি চিনিয়ে দেয়, এককথায় বলতে গেলে সুমনেরও পরিচয়চিহ্ন হিশেবে এ বেমানান হবে না। ফ্রস্ট যেমন ‘ছলনাপরায়ণ, সুশীল, বিনম্র এবং রসিক’, সুমনও তেমনি। কিন্তু সুমনের সময়ারোহী অপরাপর কবিরাও তো খুব ঝগড়াপাটব, বাকবিতম্বাজান্তব কবিতা বানাতে বেদম উৎসাহী, ফেসবুক-ফ্যানাটিক আমাদের দিনগুলি রাতগুলি তো ঝগড়াতেই জায়মান। অতএব ঝগড়ায় একজন কবির পৃথকত্ব বুঝে ওঠা ডিফিকাল্ট। বোঝা যায় বটে, বলে না দিলেও বোঝা যেত, পৃথিবীর সঙ্গে সুমনের ঝগড়াটা কোনো পরাক্রমশালী থিয়োরেটিশিয়ান বা প্রমীলা-পটাতে-ব্যস্ত প্লেবয়ের নয় বরং প্রেমিকের। ‘তিনি এমন এক পৃথিবীর প্রেমিক, যে পৃথিবীকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, সমালোচনা করা যায়; কিন্তু সেসবই করতে হয় সমঝোতার সহনশীলতা ও প্রেমের প্রত্যয় নিয়ে।’ সুমনের কবিতা পারিপার্শ্বিক প্রহসন নিয়ে শ্লেষ ও বিদ্রুপপ্রবণ হলেও তাতে নেই তিক্ততা; আজকাল ব্যক্তিবিদ্রুপে এবং শ্লেষে-শ্লেষে ভেসে যেতেছে যেন জগৎসংসার। উভয়ের মধ্যে এমন আরো অনেক মিল আমরা বার করতে পারি। যেমন দুজনেই খুব শান্ত চোখে সমস্তকিছু দেখেন এবং দেখান, স্নিগ্ধপ্রভ তাদের সেই দেখাদেখি/দার্শনিকতা, কেউই নন কুইনাইন-গিলে-ক্লিষ্ট বিমর্ষ ফিলোসোফার। দুঃখস্বর তাদের বাদনে হয়ে ওঠে আনন্দোৎসারী, বিসমিল্লার সানাইয়ে যেমন, বিষম জটিলও গলে জল হয় একফুঁয়ে। এছাড়াও অনেক আবিষ্কার, যা কোনো গ্লোবাল জর্নালে পাব্লিশযোগ্য, অনিবার্য কারণবশত বর্তমান রচনায় অ্যাকোমোডেট করা যাচ্ছে না। আর্লি দিনগুলোতে ফ্রস্ট লিখেছিলেন নর্থ অফ বোস্টন, সুমন লিখলেন বেলাব থেকে উত্তরে — এইসব আবিষ্কার এক প্রেমিকের আবিষ্কার, পণ্ডিতের নয়, যদি জানতেই চান।

১৪
ছন্দে তেমন অধিকার আমার নাই, কথা বলার কিংবা কাজকর্ম করার, কেবল কান হাতড়ে একাধটু ঠাহর করতে চেষ্টা চালানো ছাড়া। আর তাতে বিড়ম্বনার আশঙ্কাই বেশি, অন্ধের হাতি দেখার মতো। দড়ি-ছিঁড়া কবিতাটা কানে বাজাতে বাজাতে মনে পড়ল গোসাঁইয়ের সৎকারগাথার বাজনা। মনের ভেতর কেউ ক্ষীণ গলায় যেন বলতে চাইল, জয়ছন্দ! এটি, এই ছন্দটি, সর্বশেষ জয় গোস্বামীর কবিতায় এত দৃষ্টিগোচরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে একে বলাই যেতে পারে জয়গন্ধা/জয়াক্রান্তা ছন্দ। জয়ের মৌরসি-পাট্টা না নিশ্চয়, তবু চলন-চাল না পাল্টে এটি ব্যবহৃত হতে দেখলে ছান্দসিকদের ধিক্কারবাক্য অবধারিত। অবশ্য কবিতার নিয়মিত পাঠক প্রচলিত ছন্দে লিখিত কবিতায় অপ্রচলিত স্বর ও ব্যঞ্জন টের পেলে নাখোশ হওয়ার বদলে খুশিই হবেন। তবু নিকটাতীতে অতিব্যবহৃত ছন্দ সচেতনভাবে পরিত্যাজ্য হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যদিও জয় গোস্বামীর পূর্বতন আরও অসংখ্য কবির হাতে ব্যবহৃত-ব্যবহৃত-ব্যবহৃত হয়েছে এই ছন্দ, হয়েছে লেখা যেমন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের শাশ্বতী তেমনি শান্তনু চৌধুরীর লাভিনিয়া, তবু জয় যেন এতে নিজের প্রকাশটা স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটাতে পেরেছিলেন। ফলে এটি হয়ে উঠতে পেরেছিল জয়ের ট্রেডমার্ক। সেই কারণেই, ফর দ্য টাইম বিয়িং, বাংলা কবিতায় এর প্রয়োগ অনেকখানি রিস্কি বলা যেতে পারে। এই প্রসঙ্গসূত্র ধরে বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, আমার এক নন-কবি বন্ধু, সুমনের গরিবি অমরতা নামাঙ্কিত গল্পগ্রন্থ ও ব্লগবাহিত কিছু কবিতা যেমন বিলবোর্ড-নিবাসিনী ইত্যাদি পড়ে সুমনানুরাগিণী যিনি কিছুকাল যাবৎ, অনুরাগ অপাত্রে নয় জেনেও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে ভেতরে-ভেতরে আমি ভীষণ হুমকির সম্মুখীন। সেই মধুহৃদির বক্তব্য হলো : ছন্দ তুমি ঋণ নিবার পারো অসুবিধা নাই প্রিয়তম, তয় চিন্তা ধার না-নিলেই হয়। কথাটা খাঁটি গিনি না হলেও এক্কেবারে ফেলনা নয়। কবিতার ইতিহাস তার টেক্নিকের ইতিহাস না ডিকশনের না অন্যকিছুর, ইত্যাকার বালসুলভ বাহাসে না-যেয়ে স্যুইটহার্ট সন্বোধনপূর্বক ওরে আমি বলি : চিন্তার জাল গুটায়ে নিয়ে রসনাগ্রে রৌদ্র চাখা ভাইটালিটির বিচারে বেশি জরুর। বলি আরও : কবিতায় থিমেটিক কন্সার্ন অনেক পরে-কা বাত, আগে চাই ভোমরালাল চণ্ডালের নাচ ও জলপ্রপাত। ওসব বিষয়ে সুমন যথেষ্ট ওয়াকেফহাল বলেই ইচ্ছা প্রকাশ করেন এভাবে : ‘আমি আমার প্রজ্ঞাকে তোমার চাপল্যধারায় / লুকিয়ে রাখতে চাই’, এবং যেনবা আরও বলতে চান, চিন্তন-ফিন্তন যদি করতেই হয় কবিতাবাহনে চেপে তো ‘বিড়াল যেভাবে হাঁটে’ তেমন সন্তর্পণে। কবিতার ‘কুন্তলরাশি’, তিনি চান, ‘ঝপাৎ বৃষ্টিপাতের মতো’ লুকিয়ে ফেলুক তাকে ‘যাবতীয় চিন্তাশীলতার কাছ থেকে’। এর বেশি দৃষ্টান্তমূলক পঙক্তি প্রদর্শন অনাবশ্যক বোধহয়। তবে ট্র্যাডিশনাল বাংলা প্রোসোডিগুলোর ওপর দখল সত্ত্বেও সুমন ওই পথ মাড়িয়েছেন কদাচিৎ, ভেবে দারুণ অবাক হই এবং সেইসঙ্গে স্বস্তি পাই তার রুচিস্মিত পরিমিতিবোধ দেখে। একটা উদাহরণ পাতে তুলে দেখা যেতে পারে। ঝিঁঝিট-এ এমন একহালি কবিতা পাই যেগুলো সনেট এবং প্রত্যেকেই তারা আঁটোসাঁটো আঠারো মাত্রার পয়ার; যথা : জননী, সকল মেটেসাপ, দেবদারু, ঈগলের মৃত্যু । পরবর্তীকালে এই ইনিশিয়েটিভের কন্টিন্যুয়েশন না-দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি যেন-বা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। অথচ সিরামিকের নিজস্ব ঝগড়া প্রকাশকালীন বাংলাদেশজ কবিতাসাহিত্যে চলছিল সনেটধুম, মধু থেকে শক্তি তক সমগ্র বঙ্গে যে-সংখ্যক সনেট রচিত হয়েছে সেসবের সমষ্টির দেড়গুণ সম্ভবত গত ছ-সাত বছরে লেখা আর ছাপা হয়ে গেছে, এমন একটা সনেট-হুজুগের সময়ে প্রকাশিত সুমনের বইটিতে একটাও সনেট নাই দেখে কেমন কৌতূহল হয় শুধাইতে, এই আত্মসংবরণ সুমনের স্বনির্বাচিত নয়? ভাবতে ভালো লাগে যে, এই স্বনির্বাচন, এই সেল্ফ-সিলেকশন, অভিরুচিগত ঔজ্জ্বল্য, সুমনের কবিব্যক্তিত্বের একটা হলমার্ক। অবস্থা যখন এমন যে, এই বাংলাদেশে, জীবনানন্দবর্ণিত ‘অনেকরকম’ কবিতার ঢল নেমেছে যেন। রকমগুলো সম্পর্কে একটা লাম্-সাম্ ধারণা পেতে চান? চক্ষু খুলিয়া চাহিবামাত্রই দেখিতে পাইবেন জয়কণ্ঠী কবিতা, রণজিৎরঙা কবিতা, বিনয়বরন কবিতা, উৎপলোদ্বেল কবিতা, শক্তিসিদ্ধ কবিতা ছাড়াও সম্প্রতি জহরসেনাচ্ছন্ন কবিতাও উঁকি মারছে ইতিউতি। ভীষণ এই ভোলেবাবা-পার-করেগা কালে সুমন রহমানের মতো দুয়েকজন কবি যেন ওয়েসিস, মায়াবী সিমুম; পড়ে মনে হয় এ-কবি আর-যা-ই-হোক দর্পণে আপন বদন দেখতে মরিয়া, আগ্রহী না দেখতে কোনো কন্দর্পকান্তি নায়কের ছায়া। আরেকটা কথা : আমাদের এখানে একা একা নামাজ-রোজার রুসম্ খুব-একটা নাই। ইক্তাদাইতু বিহাযাল ইমাম ব্যতীত নাই হেরা-কন্দরে উপাসনার প্র্যাক্টিস। হুজুর যদি ডাইনে ফেরেন, মুসুল্লিগণ হুড়মুড়িয়ে ডাইনে ডাইভ দেন। সম্প্রতি যেমন অত্র এলাকায় নুয়া করে মহরৎ হয়েছে একটি তিতপুরানা সংস্কৃত ছন্দবিশেষের, মহরৎ শুভ ও উপভোগ্য মনে হচ্ছে এখনোব্দি, কিন্তু উপভোগের উদরাময় না-ঘটানো পর্যন্ত কোনোকিছুতে ইস্তফা দেয়ার ইতিহাস আমাদের নাই। শঙ্কা সেখানেই। তোটকতোড়ে ছেড়ে-দে-মা বাপদশা না-হয় যেন আবার, আহা আমাদের, দুঃখিনী বাংলা কবিতার!

১৫
কবিতায় ব্যবহৃত কতিপয় রেটোরিকের ব্যাপারস্যাপার আমরা সাধারণ পাঠকেরাও বেশ বুঝতে পারি, কিন্তু সব পারি না তা বলাই বাহুল্য, এবং বুঝতে পেরে ঢের আনন্দও অনুভব করি। নিতান্ত কমন অলঙ্কার যা আমরা চাই এনজয় করতে একটা-কোনো কবিতা পড়ে, এছাড়াও অলঙ্কারাদি রয়েছে নিশ্চয়, যেমন — উপমা, তুলনা, প্রতীক, রূপক, চিত্রকল্প প্রভৃতি। কিন্তু অলঙ্কারের ভারে খোদ অঙ্গই যদি প্যারালাইজড্ হয়ে পড়ে, এদেশে কবিতার এই হাল হামেশাই হয় বটে, সেক্ষেত্রে পাঠক হিশেবে আমাদের অসহায় দশার দোষ খুব দেয়া যাবে কি? চিত্রকল্পের পাছায় চিত্রকল্প ঠেসে অ্যায়সা কাবাব প্রিপেয়ার করেন কথিত কবিগণে, কেমন কৈরে সে-বস্তু গলাধঃকরণ কৈর্বে বেচারা আমার-মতো-সরুগলা পাঠক? তদুপরি তিনারা তুলনার পর তুলনা আর উপমার উপ্রে উপমা জুড়িয়া আচানক একেকখানি চিজ পয়দা করেন, করে এমন ভাব ধরেন যেন ওই তার একসিঙ্গেল কবিতায় কয়েদ কৈরেছেন ত্রিকালের মূর্ত-অমূর্ত সমুদয় ভুবন, ফলে বে-এক্তার পাঠকের প্রাণে প্যানিকের সঞ্চার হয়। এইটে কেউ অস্বীকার করে না আজ, যে, জীবনে এবং শিল্পে স্পেস এক জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ জিনিশ। কবিকে স্পেসের ব্যবহার জানতে হয়, স্পেস এক ম্যাজিক-উপাদান কবিতার, একে ব্যবহার করতে পারার অপর নাম শিল্পনৈপুণ্য। প্রভূত রহম করেন সুমন রহমান, পাঠকের প্রতি, ইমেজারি/চিত্রকল্পের পোর্টম্যান্টো নয় তার কবিতাগুলো; অথবা তার কবিতা নয় একের পর এক অলঙ্কারের এক্সিবিশন শুধু। সুমনের কবিতাগ্যালারিতে একবার ঢুঁ দিলেই বোঝা যাবে কেমনতর পরিমিতি, কি-রকম সেন্স অফ প্রোপোর্শন, বজায় রেখে নিজের কাজে স্পেস ডোনেট করতে হয় একজন কবিকে।

১৬
নাম-প্রকাশ-অনুচিত এক কবির একগাদা কবিতা পড়ে সত্যজিৎ, আমার সহকর্মী বন্ধু, আমারে জিগায় : এগুলো পোয়েট্রি, না পেড্যান্ট্রি? আমি নিরুত্তর। কবিকে জিগাইলে নিশ্চয় উনি বলিতেন ম্লান হেসে : ‘বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা!’ আমি অচিরেই শ্রীমান সত্যজিৎ রাজনকে সুমন রহমান পড়তে দেবো মনস্থির করেছি। বেচারা একটু পোয়েট্রিপ্রিয়, ছবি আঁকে, পেটভর্তি শৈশবের বিচিত্র গল্পগাছা। নাম-প্রকাশ-অনুচিত আরেক কবির খান-তিনেক কবিতা শুনে ওয়াহাব, আমার আরেকজন আপিশ-বন্ধু, মাঝপথে থামায় : এই কবির বয়স কত হতে পারে, আই মিন, কিৎনা উমর হ্যায় উনকা? আমার উত্তর : আমাদেরই সমবয়সী। ওয়াহাবের পুনর্মন্তব্য : আমি ভেবেছিলাম বারোদিনের শিশু রহিম-বাশশা!! ভাবছি, মিস্টার আব্দুল ওয়াহাবকে একদিন চেপে ধরে সুমন রহমান শোনাব। সে হিন্দিসিনেমাসক্ত, অ্যাকাউন্টস্-অডিট সামলাতে ব্যস্ত সারাদিন, ন্যাচারাল উইট আর হিউমারে টৈটুম্বুর। অবশ্য ওই দুইজনই অবিবাহিত, মতান্তরে অতিবিবাহিত, ফলে একটা প্রাইমারি পর্যায়ের কবিতাচাহিদা তাদের রয়েছে বিশেষত ফেসবুক-স্ট্যাটাস বা টেক্সট-মেস্যাজ হিশেবে সুভাষিতাবলির সন্ধানে বেশ সিরিয়াসলি কবিতাবইয়ের খোঁজপাত্তা জানতে চায়; যথাসাধ্য রিসোর্সের যোগান আমাকেই, অগত্যা এবং সানন্দে, দিয়ে যেতে হয়। ওদিকে তারেক, আমার আরেক কলিগ, কবিতা পড়া বা শোনার ব্যাপারে একেবারেই নিস্পৃহ। বলা ভালো তারেক আমাদের আপিশের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর্মরত, বাল্যবিবাহিত, ফলে নেসেসিটি অফ রিডিং/রিসাইটিং পোয়েট্রি ইদানীং ঘোর সংসারী ও স্ত্রীনিষ্ঠ জনাব আহমেদ হোসাইন তারেকের জীবনে নেই আর। তার মানে, এই এক উপযোগিতার দিক কবিতার, যে, প্রেম ও প্রেমিকা হাসিল হয়ে গেলেই ফুরিয়ে যায় কবিতাপাঠের প্রয়োজন? এইটা, আপাতত, নান অফ মাই কন্সার্ন। কে কখন ও কিভাবে কেন কবিতা পড়ে সেটা একটা আলাদা অনুসন্ধানের বিষয়। এনিওয়ে, এবার একটা অনুচ্ছেদ-বিরতি নেব, সঙ্গে থাকুন সরস্বতী!

১৭
ইজাজৎ পেলে এখানে এমনকিছু ফাইন্ডিঙস্ শেয়ার করতে চাই যা কিনা আমি খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, যদিও ইহজন্মে দেখে মরতে পারব এমন আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কথাগুলো বলতে সুবিধে হবে একটা কবিতা হাতে নিয়ে, সুমনেরই, এমন বাদল দিনে । এখানে দেখা যাবে একদঙ্গল বাইনারি শব্দ/শব্দগুচ্ছের প্রেজেন্টেশন; যথা : ‘চুল ও এথিক্স্’, ‘শুনতে ও গুনতে’, ‘রোড ও রেস্তোরাঁ’, ‘তৃতীয় ও চতুর্থজন’, ‘কাঁঠালপাতা ও মাটির ঢেলা’, ‘বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া’। আমার একসময় বেশ লাগত এই জিনিশ, বেশ একটা কাব্য-কাব্য কুলুকুলুধ্বনি, ইদানীং খুব মনোটোনাস লাগে; অ্যালার্জি হয়, বলতে দ্বিধা নাই, কবিতার ভেতর কাব্যিপনায়। এই এক কমন প্রবণতা আজকাল, কবিতাবইয়ের নাম থেকে শুরু করে ভেতরে এক্কেরে লাইনে-লাইনে এহেন নিম্নমাধ্যমিকে-শেখা দ্বন্দ্ব সমাসের দখলদারি, বিরক্তিকুঞ্চিত কপালের কারণে চেহারার ছাঁদটাই আমার গিয়েছে বদলে। এম্নি কিছু নমুনা, কাল্পনিক, আসুন দেখা যাক : চড় ও চাপাটি, মিঠা ও খাট্টা, তাল ও তেঁতুল, জল ও হুতাশন, চাক্কু ও রক্তের বেদনা, স্নানঘর ও সুরতুন্নেছা, মাজাব্যথা ও লাল ঝান্ডুবাম প্রভৃতি ইনফিনিটি। ঈশ্বর হয়তো বলতে পারবেন এগুলোর উৎপত্তি কোত্থেকে, এখানে আমি শুধু অনুমান করতে পারি, এই খাসিলৎ আমরা অ্যাডপ্ট করেছি ইংরেজি থেকে; যেমন : ল্যভ্ এন্ আদার ডেমন্স্, টোয়েন্টি ল্যভ্ পোয়েম্স্ এন্ আ স্যং অফ ডিস্পেয়ার, দ্য গ্রেট ওয়াল এন্ দ্য টাওয়ার অফ বেবেল ইত্যাদি সীমাশুমারহীন। ইনিশিয়ালি ইহা ভালোই, এক পর্যায়ে ক্লিশে। দশকাধিক সময় ধরে এই ও-ও-ও-ও গোঙানির আওয়াজে বাতাস ভারি ও বিকল হয়ে এসেছে। এই পার্টিকুলার আওয়াজ ব্যতীত উত্তরাধুনা বাংলা কবিতা চালানো সম্ভব নয় মনে হচ্ছিল, ভুল বুঝতে পারলাম সুমন রহমান পড়ে। এই একখানা মাত্র কবিতা ছাড়া সমগ্র সুমনে কোত্থাও গোঙানিচিক্কুর নাই, স্ট্রেইঞ্জ! অনুরূপ অন্তর্যাতনা আরও আছে, একটা বলে এ-যাত্রা খামোশ হই। ব্যাপারটা হলো, গত গণনা-দুঃসাধ্য বছর ধরে এক মানবজন্ম ব্যতীত কত-শত বিচিত্র জন্মের ছড়াছড়ি বাংলা কবিতায় হেরিলুম! যেমন : ঘাসজন্ম, খড়জন্ম, জলজন্ম, তেলজন্ম, আগুনজন্ম, বাতাসজন্ম, বলদজন্ম, গাধাজন্ম, গবেটজন্ম প্রভৃতি চিত্তমনোহর জেনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙের চূড়ান্ত বিকাশ দেখতে পাচ্ছি ইদানীং বাংলা কবিতায়। ফ্যামিলি-প্ল্যানিং সেন্সিটাইজেশনের অভাবে একটা জাতির কাব্য কত উচ্চতর মার্গে উঠে যেতে পারে, এ এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গজ কবিতার প্রভাবে এই জিনিশ এতদবঙ্গে এত বহুল চর্চিত হয়েছে যে, কি বলব, ইয়া মাবুদ! সুমন রহমান তন্ন-তন্ন খুঁজে কেবল দুটো জন্ম, ‘শ্যাওড়াজন্ম’ ও ‘মার্জারজন্ম’, পেয়ে শোকর-গোজার করেছি মনে মনে।

১৮
কোনো বিষয়ে, বিশেষভাবেই কবিতা নিয়ে, এভাবে এই বর্তমান রচনার টোনে কথা চালানোর বিপদ বড় কম নয়। এক্ষেত্রে আলোচনাকারীর ব্যক্তিরুচি কিংবা আলোচকস্বভাব অতিগুরুত্ব পেয়ে যায়, যা হয়তো গর্হিত অপরাধ নয় ঠিকই, কিন্তু কবিতার কতটা কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব এভাবে সে-এক প্রশ্ন বটে। কেমন করে কবিতাঘাটের কাছাকাছি পৌঁছা যায়, বটে, এ আরেক ফ্যাসাদ। কেন বিপজ্জনক মনে হচ্ছে, এভাবে কবিতালোচনা, বিশদে বলি। একটি বিতর্কের অনুষঙ্গ স্মরণ করা যাক, বহু আগের, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত-র মধ্যকার। শঙ্খ ঘোষ রচিত সুন্দর নাম্নি কবিতা আলোচনা করেছিলেন সুনীল, ‘লোকে তো কোথাও যাবে, তাই আসি, এমন কিছু নয় / নিহিত পাতালছায়া ভরে দেয় আকাশপরিধি’ ইত্যাদি লাইন সম্বলিত সেই কবিতাটি নিয়মিত কবিতাপাঠকের নিকট অপরিচিত নয়; সুনীলের আলোচনাস্টাইল আঁচ করা যাবে সূচনা-অনুচ্ছেদের কয়েক বাক্যেই : ‘পাঠককে প্রথমেই জেনে রাখতে হবে, কবিতার কিছু লাইনের মানে থাকে, কিছু লাইনের কোনো মানে থাকে না। প্রতি লাইনের ব্যাখ্যার ইচ্ছে মূঢ়তা ও অসংগত প্রয়াস মাত্র। … কিন্তু পাঠক অসহায় … পাঠক প্রতিটি শব্দ ও লাইনের মানে বা প্রয়োজন খুঁজতে গিয়ে হিমসিম খায়, অনেক সময় সেইজন্যই কবিতাটি নিরর্থক হয়ে যায়। কারণ, একথা নিশ্চিত, ঐসব ধূসর, রহস্যময়ভাবে আগত শব্দ বা বাক্যবন্ধই একটি কবিতার মূল কবিতা।’ তা মানতে আমাদের, অন্তত আমার, আপত্তি নেই। ছিল অলোকরঞ্জনের, আপত্তি, তিনি তা করেন এভাবে : ‘শঙ্খ ঘোষের সুন্দর কবিতাটির সুনীল-রচিত ভাষ্য আমার কাছে অত্যন্ত সপ্রতিভ এবং অগভীর বলে মনে হয়েছে। স্বভাবী একজন পাঠক যেমন নিজের আবেগ/বাসনা/সংস্কারের সঙ্গে কবিকে মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করেন, এক্ষেত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার বেশি কিছু করেন নি।’ তদুত্তরে সুনীল বলেন : ‘আমি কিন্তু সত্যি তার বেশি কিছু করি নি এবং করতেও চাই নি। আমি বদ্ধমূল অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, তাতে দোষ করেছি কি? অপরের কবিতা পাঠ করার সময় আমি শুধুই একজন বিনীত, নম্র ও উদগ্রীব পাঠক, এবং নিজস্ব আবেগ ও বাসনার সঙ্গেই কবিতাকে মিলিয়ে নিতে চাই। তা ছাড়া কবিতার কাছে আর কী দাবি করবো? কবিতার রস উপলব্ধি করতে গিয়ে আত্মাভিমানবশত এই রকম মনোভাব আনা যে, এই কবিতাটা তো যথেষ্ট ভালোই, কিন্তু বোদ্ধা হিসেবে আমিও কম নই, আমিও কথায়-কথায় বাইবেল বা দান্তে বা বেদান্ত থেকে ফটফট করে কোটেশান তুলতে পারি আর কবির এক-একটা কথার পাঁচ রকম মানে বার করে দিতে পারি — কবিতার আলোচনায় আমার মতে এ-পদ্ধতি একটি ধারাবাহিক ভুল, তা ছাড়া আমি অত সব রেফারেন্স নিজে জানিও না, তাও একটি কারণ। অলোকবাবু কবিতা সম্পর্কে অনেক কথা জোর দিয়ে বলতে পারেন, তিনি কবিতার মধ্যে অনিবার্য সত্য খুঁজে পান। আমার অবশ্য পদে পদে দ্বিধা, দুর্বলতা ও ভয় থেকেই যায় … কবিতার অনিবার্য সত্য জেনে আমাদের লাভ কি? পাঠক হিশেবে নিজস্ব বাসনায় অভিভূত হওয়া — কবিতা পাঠের এই তো একমাত্র উদ্দেশ্য …।’ অব্যবহিত পরে, একই প্রত্যুত্তরপত্রের অন্যত্র, সুনীল বলছেন : ‘বাংলায় যে-ভাবে কবিতার আলোচনা হয়, তা পড়ে এ-রকম মনে হতে পারে যে বাংলাদেশে এতকাল শুধু অ্যালিগোরিক্যাল কবিতাই লেখা হয়েছে। পাহাড় মানে এই, নদী মানে এই, জ্যোৎস্না বলতে কবি অমুক বুঝিয়েছেন — এসব কথাবার্তায় কবিতাকে খুবই খর্ব করা হয়; ভেসে আসে ক্লাশরুমের গন্ধ। … কবিতার মধ্যে কথায়-কথায় বিশ্বজগৎ, মানব-সভ্যতা, বিপুল সত্তা, এগুলি টেনে আনা একেবারে হ্যাক হয়ে গেছে।’ এই বিতর্কে সুনীলকৃত কনক্লুডিং কথাগুলো উল্লেখযোগ্য : ‘কবিরা এখন ভিতরে ফিরে এসেছেন, এখন সমালোচকদেরও চশমা বদল করতে হবে। কবিরা এখন আর কারুকে কিছু শেখাতে চান না, সমালোচকদের কাছ থেকেও আমাদের শেখার কিছুই নেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের শিক্ষার ভার নিয়ে কবিরা এখন ক্লান্ত। এখন শিক্ষিত করতে ডাকার বদলে, কবি চান পাঠককে তাঁর সহমর্মী হতে। উপলসন্ধানী হবার বদলে সমালোচককেও এখন হতে হবে সেই মর্ম-সন্ধানী পাঠক, যার ভালো নাম আল্টিমেট রীডার।’ কই, মর্মসন্ধানী পাঠকের ভূমিকায় সেই হৃদয়সংবেদী সমালোচক, কোথা সেই আল্টিমেট রিডার? বছর-পঁয়তিরিশ আগের এই সুনীলাহ্বান, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৬-১৯৬৮ পর্যন্ত অমরেন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত কবিতা-পরিচয় পত্রিকায়, বিশুষ্ক কবিতালোচনাপ্রান্তরে এখনও সমান প্রযোজ্য। আজও হোথা-হেথা বাংলা কবিতা লাঞ্ছিত-শ্লীলতাহৃত হয়ে চলেছে একপ্রকার স্বনিয়োজিত/সরকারনিযুক্ত প্রভাষকদঙ্গলের পীড়নোৎপাদী বিচিত্র যুক্তি-তক্কো-গোপ্পের প্রতাপে। সেইজন্যই বলছিলাম, বিপদ, এভাবে এই কায়দায় কবিতালোচনার বিপদ ঘোরতর। স্বভাবকবিদের যুগ অবসিত বহুদ্দিন হয়, উৎপাত ষাট, স্বভাবসমালোচকদের কাল শুরু হলো বলে!

১৯
এবার, ওগো ও ঝাউগাছের পাতা, বাড়ি ফিরবে না? রাহমান বা মাহমুদের বই নিয়ে বসবে না? আমাদের এই সুমন রহমান ‘অবিশুদ্ধতার পূজারী’, সৃষ্টির ভেতর ‘বিশুদ্ধতার ধ্যান’ ধরার মতো ভানপ্রতিভা তার নাই বিলকুল। সুমন তার ‘শার্টের হাতায় সিগারেটের পোড়া দাগটিও গোপন করতে’ চান না। তাহলে কেমন করে হবে মেহেরজান? কেমনে তোমাকে মুগ্ধ করবে সে? এই কবি ওই উহাদের মতো অল্পবিস্তর ভানপটু হতো যদি, ফি-বছর কবিতাবই বিইয়ে যারা তোমায় মুগ্ধ রাখে দিবারাতি, প্রীত রহিতে তুমি। কিন্তু সুমন যে ভান দিয়ে দ্বার খোলার মতো অত ভানুসিংহ নন, ওগো, খুলতেই যদি হয় তিনি গান দিয়েই খুলবেন বলে বদ্ধপরিকর। অবশ্য তুমি যদি কিঞ্চিৎ অ্যাটেনশন দাও, শুনতে পাবে এর হৃদয়নিঃসৃত এমন উচ্চারণ : ‘বিশাল একটি অপচয়ের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি যে! সমাজসংশ্লেষের সপ্রতিভ চেহারাটার চর্চা করি, চিরুণি ও ছুরিপকেটে আড্ডা দিচ্ছি ভদ্রলোকদের সাথে। এরচে চিরকাল যদি অনাদৃত থাকতে পারতাম!’ প্রাগুক্ত পত্রিকাপাতায় সুমন রহমানের এই কবিতাটি প্রথম যখন পড়ি, তোমাকে শেষবারের মতো বলি, তিতিবিরক্ত হয়ে ভেবেছিলাম এ কেমন অশ্লীল আত্মপ্রচার! নিজের পত্রিকায় নিজেই নিজেকে ইন্টার্ভিউ করা! ফারাক তবে রইল কই নব্বই-লেজুড়-ধরা ওইসব স্বঘোষিত আসমানদারদের সঙ্গে একলষেঁড়ে সুমনের? পরে বুঝতে পেরেছি, ইনডিড, এটা ওই জিনিশ নয়। সত্তার সঙ্গে আলাপের অন্য নাম যদি কবিতা হয়, কনভার্সেশন উইথ সেল্ফ/কাউন্টার-সেল্ফ যদি হয় ক্রিয়েটিভ আর্ট, সুমনের এ-কবিতা তাহলে এরচেয়েও বেশি কিছু। কবির নিকটতর হওয়ার নির্ভরযোগ্য ধাপ এটি, স্বীকারোক্তিমূলক আত্মোদ্ঘাটন : ‘বস্ত্রহরণকে যারা উন্মোচনধর্ম ভাবেন, নিজক্ষেত্রে শতভাগ সফল হলেই তারা ঝিঁঝিট-এর বানিয়ে-তোলা কিংবদন্তীপনার মধ্যে একটা পেঁয়াজের থাপ্পড় আবিষ্কার করবেন।’ স্যুপার্ব!

২০
এবং শেষ প্রশ্ন, আখেরি সওয়াল। লালাবাই এই প্রাচীরের শেষ কবিতা, কেন? সুমন রহমানের মতলবখানা কি, শীতঘুম? ধুম-মাচালে এই জমানায় ঘুমপাড়ানিয়া গান শুনিয়ে বই খতম করার পেছনে দুরভিসন্ধি কিছু থাকতে পারে কি না, ভাবায়। অমূলক আশঙ্কা? নাইন্টিন-নাইন্টি-ফোর, টু-থাউজ্যান্ড-এইট, তারপর? ‘কয়েকটি লঞ্চ শুধু ঘোড়ার মতো ঝিমাতে ঝিমাতে / কাঠমিস্ত্রীদের সমালোচনা শুনছে’ যেখানে, কানার হাটবাজার ভরে এইসব বেফায়দা আলোচনাচক্রের চক্কর থেকে বেরিয়ে আমরা চাই কবিতার কিঙ্কিণী কিংবা ঢাক-দ্রিমিদ্রিম। মুনাজেরা নয়, ওগো নব্য নান্দীকর, মুশায়েরা চাই। কাঠমেস্তরিদের দৌরাত্ম্য কমুক, উঠে দাঁড়াক ঘাড়ভাঙা ঘোড়া, উড়াল দিক পাখভাঙা পাখি, নৃত্য করুক নদীবিধৌত মহুয়া-মলুয়ার দেশে সাবলীল লঞ্চগুলো। সধবা-বিধবা শতপ্রকারেণ শবদে-শবদে বিবাহ সংঘটনের ‘বিদ্যাসাগরীয় অভিলাষ’ যেন পণ্ড না হয়, মহাত্মন, অনুযোগাত্মক এই প্রার্থনা আমলে নেবেন আশা রেখে এ-রচনা এখানেই সাইন্ড্, সিল্ড্ এবং ডেলিভার্ড ডিক্লেয়ার করা হলো।

সুমন রহমান, ১৯৮৯

সুমন রহমান, ১৯৮৯

 

The following two tabs change content below.

জাহেদ আহমদ

জাহেদ আহমদ। জন্ম ১৯৭৮। জন্মজেলা সীমান্তবর্তী টিলা, চা-বাগান, জলছড়া আর কড়া বৃষ্টির শহর সিলেট। অসরকারি একটা আপিশে জীবিকাযাপন। অনিয়মিতভাবে লেখালেখিলিপ্ত, মূলত নোটক, মুখ্যত প্রকাশবাহন ফেসবুক।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য