Main menu

একদিনের সিলেট ভ্রমণে যা যা ঘটে

ঢাকাদক্ষিণ (ডিএসসিসি না) বলে একটা জায়গায় গেছিলাম রবিবার (২১ নভেম্বর) সকাল সকাল। হুমায়ূন রশীদ চত্ত্বরে ফজরের আযানের সময় বাস থেকে নামি। এরপর বার দু-এক এদিক-ওদিক চক্করের পর যখন সিলেট থেকে গোলাপগঞ্জের অভিমুখে ছুটছিলাম, বাসে।

দু’পাশের হলুদ ধানের ক্ষেত, বন-বাদড় টাইপের কিছু জায়গা আর জলাভূমির মধ্যে কুয়াশার ভেসে থাকা দেখে, ভাবতেছিলাম, ‘তাইলে আমরা কেন নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে যাই’। অচেনাদের চোখে আমাদের এলাকাগুলা অপূর্ব সুন্দর বা ছেড়ে যাওয়ার মতো না। এর উত্তর অবশ্য আমার কাছে নাই। যেহেতু আমার স্মৃতিতে তেমন কিছু বরাদ্দ নাই। আমি যেখানে যাইতে চাই সেখানে আসলে আমার কিছু নাই!

ঢাকাদক্ষিণরে শ্রী চৈতন্যের পূর্বপুরুষের এলাকা বইলা জানছিলাম। গুগলে ঘেঁটে দেখলাম, সেখানে কোনো বাড়ি বা মন্দির আছে। গোলাপগঞ্জ যখন সাতটা নাগাদ নামি, কোনো জনমানব নাই, ছেড়ে যাওয়া বাসের দূর থেকে দূর যাওয়ার চিহ্ন ও তিনটা সিএনজি ছাড়া। ফলত অপেক্ষার তিক্ত স্বাদ এড়াইতে দুবার সিএনজি পাল্টানোর জায়গায় একবারে একা একাই বাড়তি ভাড়া দিয়ে সওয়ার হইলাম। পথ যত আগাইছে আমার কাছে ভালো লাগতেছিল বেশি বেশি। দু’পাশে কখনো টিলা, ক্ষেত-খামার। মাঝে মাঝে মনে হইতেছিল কোনো বনের চলে আসছি। দু’বার নদী মানে ব্রিজ পার হইলাম।

ঠান্ডা বাতাসের উল্টো দিকে তার কাছাকাছি বেগে আগাইতে আগাইতে খানিকটা বিব্রতবোধ করলাম, হঠাৎ-ই। একটা আঁশটে-গেছো গন্ধ চারপাশে। মাফলার ঠিকঠাক করতে করতে নিজের শরীর চেক করলাম, ভালো করে। তারপর সিএনজি’র চালকের দিকে তাকালাম। ওনার দৃষ্টি পথের দিকে। এরপর মনে হইলো, আচ্ছা এটা তো ফুলের গন্ধ। ছাতিম। গুগল ঘেটে দেখলাম, শরত-হেমন্ত ছাতিম ফোটার সময়। ছাতিমের গন্ধের সঙ্গে আমার পরিচয় কয়েক বছর আগে। দোয়েল চত্বর থেকে রিকশায় করে গুলিস্তানের দিকে যাইতেছিলাম। হঠাৎ সঙ্গে থাকা বন্ধুটি চিৎকার দিয়ে উঠছে। ‘ছাতিম ফুটছে’। গন্ধটা ফুলের হতে পারে আমার বিশ্বাস হয় নাই। পরে শুনি এ ফুল নিয়ে নাকি রবিঠাকুরের কবিতাও আছে!

শ্রী চৈতন্যের বাড়ি খোঁজার আগেই ঢাকাদক্ষিণ পার করে আসি বোধহয়। এরপর কুশিয়ারা নদী পার হয়ে গন্তব্য। যেহেতু সকাল সকাল। জাস্ট হাত-মুখ ধুয়ে ঘুম দিই। গেছিলাম বিয়েতে। বর আমার বন্ধু, পুত্রসম। ঘণ্টা দু-এক ঘুমানোর পর গোসল দিয়ে নদীর পারে গেলাম। শান্ত জল, স্রোত নাই, কুলে দু-একটা নৌকা মাঝিহীন। কিন্তু কড়া রোদ। গরমে বেশিরক্ষণ থাকার উপায় ছিল না। ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে বাসায় ফিরলাম।

এরপর আবার সিলেট শহরে আইসা হাল বাংলার বেশির ভাগ বিয়ের মতো ফটোশুট দেখতে দেখতে সময় কাটলো। যেহেতু বিয়ে শাদীতে খুব একটা যাওয়া হয় না, নতুন দেখলাম মাথার ওপর ড্রোন উড়ছে। ভিডিও করছে আরকি! বর-কনে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে, ফেইক লজ্জার ভান করছে। নির্দেশনা দিচ্ছে ফটোগ্রাফার। খাইলাম, মোটামুটি যা যা থাকে হাল আমলের এজমালি মেন্যুতে, সুস্বাদু। বিদায় নিয়ে চা খাইতে এক ছোটভাইয়ের অফিসে গেলাম। ততক্ষণ মৌলভীবাজারে যাওয়ার একটা প্ল্যান হয়ে গেছে মেসেঞ্জারে। পিত্তথলির সার্জারি দেখাবে ডাক্তার বন্ধু। এ জিনিস দেখার ওপর আমার একটা হক্ব তৈয়ার হইছে ইতিমধ্যে (প্রায় দুই বছর এ সমস্যায় আমি ভুগছি)।
ছোট ওই ভাইয়ের অফিস মানে ব্যাংকে এক লিটল ম্যাগিয়ানের (?) লগে পরিচয়। উনি ফরহাদ মজহার নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। একটা পজিটিভ ভাইব দেখলাম ওনার মাঝে। কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হইলো, সিরিয়াস কোনো ব্যাপারে না যদিও।

এই ফাঁকে কলেজের সহপাঠী ফোন দিল। ফেইসবুক মারফত আমার সিলেট আগমন তার জানা হইছে। ১৪ বছর দেখা হইলো, প্রায়। যাইয়া দেখি, সে একটা ব্যাংকের ম্যানেজার। এক অসহায় নারী লোন মোটামুটি পরিশোধ করছে, সামান্য কিছুর জন্য ক্লোজ করতে পারছে না। ও ভদ্রমহিলাকে খানিকটা হেল্প করলেন। এভাবে নিয়মিত হেল্প করে কিনা জানি না, ওই নারী খুবই কৃতজ্ঞতা জানালেন। বললেন, এই টাকা উনি অবশ্যই সুবিধামতো সময়ে দিয়ে যাবেন, এ উপকার কখনোই ভুলবেন না। সঙ্গে ছিল কলেজ পড়ুয়া ছেলে। সে নিশ্চয় মায়ের স্ট্রাগল থেকে জীবন কী বুঝতে পারছে।

বন্ধুর সঙ্গ খুবই ভালো লাগলো। যদিও আমাদের তেমন কোনো স্মৃতি নাই আগের দিনের, তারপর মনে হলো, দারুণ একটা স্মৃতি হলো এবার। এটা আমি কখনো ভুলবো না। একজন ভালো মানুষরে মনে রাখা ও কৃতজ্ঞ হবার জন্য এটাই যথেষ্ট। অবশ্য এ ঘটনা নিয়া আমি কিছুই জিজ্ঞাসা করি নাই। ব্যাপারটার যে নিজস্ব মহিমা, তা অটুট থাকুক।

বন্ধুর দরদাম করা রিকশায় ঐতিহাসিক কীন ব্রিজ পার হইতে হইতে বুকে ছ্যাঁৎ করে উঠলো, অনাদিকাল কি এখানে শুটকো চেহারার কিছু মানুষ রিকশা ঠেলতে থাকবে? পেছনে হুল্লোড় আর বুকে কেমন করা নীরবে হজম করছিল রাতের কালো জল।

ভোরবেলার সিলেট। ছবি – ওয়াহিদ সুজন।

হবিগঞ্জের গাড়িতে মৌলভীবাজার যাবো। টিকিট কাটতে গেলে বললো, টিকিটের সময় শেষ। এখন আমি কীভাবে যাবে? কাউন্টারম্যান বললেন, গাড়ির মাঝামাঝির পর কোনো একটা সিটে বসে পড়েন। গাড়িটা বেশ ভালো গতিই চলছে। ৬০-৬৫ কিমি পথ ঘণ্টা-সোয়া ঘণ্টার মধ্যে পার করে আসলো। পাশে বসা আপুরে দু-একটা তথ্য জিজ্ঞাসা করলাম। শেষে দেখি উনি আমারে তুমি বলতেছে। হাসি চেপে উনার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জানালার দিকে বাইরে তাকায়া রইলাম। হাসি কেন? উনি আমার ছোট হবেন!

কলেজবন্ধু আমার রুটিনের মধ্যে ছিল না। তাই মৌলভীবাজার গিয়া পিত্তথলির অপারেশন মিস করলাম। আধঘণ্টা সময় বিরতি। এরপর অ্যাপেন্ডিকসের একটা অপারেশন। ওই বিরতিতে কী করলাম? মনু নদীর ব্যারেজে গিয়া চা খাইলাম। অপূর্ব একটা দৃশ্য। সে বিষয়ক তাৎক্ষণিক স্ট্যাটাস হইলো এমন— ‘মনু ব্যারেজ। কুয়াশার ভেতর চাঁদ। প্রায় নিখুঁত গোল। দৃশ্যটারে সাজায়া তুলতে বৃক্ষের কালো কালো ভূত হামাগুড়ি দিয়ে আসে বা আমরা তাদের দিকে এগিয়ে যাই। আবছা আলোয় কিছু পথ চলে গেছে দূরে অথবা দূর বলে ভ্রম হয়। এমন রাতে যা হয় আরকি! ব্যারেজের খোলা দরোজা দিয়ে জলের শব্দ এ চলচ্চিত্রে আবহ সংগীত। মানুষগুলো মুক-বধির। এ দৃশ্যে একটা শিয়াল হেঁটে যেতে যেতে জগতে মানুষের ভূমিকা খাটো করে দিলো।’

যাই হোক, আমার চিকিৎসক বন্ধু হতে চাইছিলেন চিত্রকর, হয়ে গেলেন জেনারেল সার্জন। খুব ব্যস্ত শিডিউলের মাঝে সময় করে নিয়মিত ছবি আঁকেন। বিশেষ করে পোর্ট্রেট। বাট, সার্জারি উনার শুধু পেশা নয়, প্যাশনও। আমরা হাসপাতালে ফিরলাম। ভাবলাম, আমাকে অপারেশন দেখতে হবে না। দুর্বল চিত্ত নিয়া বইসা আছি বাইরে। খানিক পর একজন নার্স এসে বললেন, আপনাকে ভেতরে ডাকে। একটা চেয়ার দেওয়া হইলো, বসলাম। প্রথমে ভাবছিলাম তাকাবো না। পরে ভয়ের জয় হলো সাহসের ওপর। তারা শরীরের একটা অংশ ফুটা করে ফেলছে। সেখানে কী কী যেন বের হয়ে আসছে। গোলমতো একটা জিনিসকে অ্যাপেন্ডিকস মনে হইলেও ওইটা মূলত ক্ষুদ্রান্ত্র। অ্যাপেন্ডিকস একটা নালীর মতো জিনিস। ওইটা কাটা হইলো, তারপর বের হওয়া বাকি জিনিস ঢুকিয়ে দিয়ে পেট সেলাই করা হইলো। তাদের সাহসের তারিফ করবো কী, আমিই তো ভয়-টয় আর পাইলাম না। তবে এর আগের রোগীর পিত্তথলির অবস্থা নাকি খারাপ ছিল। ওইটা দেখলে নির্ঘাত ভয় পাইতাম, ঘণ্টা খানেকের অপারেশন ছিল।

সোয়া ১২টার বাসের টিকিট আগেই করা ছিল। ওই নারী সহযাত্রীর কাছে জেনেছিলাম, পরদিন থেকে সিলেট বিভাগে গাড়ি মালিকদের ধর্মঘট। তার কীসের যেন টোল দিতে চায় না। এরপর আমরা খাইতে গেলাম। আমি খাইলাম হাওরের বোয়াল মাছ আর রুটি, এর আগেরবার এ মাছের সঙ্গে ভাত খাইছিলাম। রান্নাটা ভালো হইলো। এরপর চা খাইয়া একটা উঞ্চ ও আন্তরিক পরিবেশের মধ্যে গাড়িতে উঠলাম। বাসায় যখন পৌঁছায় তখন সকাল ৫টা ২০ বাজে। ফজরের আযান শুনতে পাইলাম মসজিদ পার হইতে হইতে।

… বাসায় পৌঁছে মধু দিয়ে গরম পানি খাইয়া, নামাজ পড়ে ঘুমায়া পড়লাম।

 

The following two tabs change content below.

ওয়াহিদ সুজন

দর্শন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা, চাকরি সংবাদপত্রের ডেস্কে। প্রকাশিত বই ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’ ও ‘এই সব গল্প থাকবে না’। বাংলাদেশি সিনেমার তথ্যভাণ্ডার ‘বাংলা মুভি ডেটাবেজ- বিএমডিবি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। ভালো লাগে ভ্রমণ, বই, সিনেমা ও চুপচাপ থাকতে। ব্যক্তিগত ব্লগ ‘ইচ্ছেশূন্য মানুষ’। https://wahedsujan.com/

Latest posts by ওয়াহিদ সুজন (see all)

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য