Main menu

জীবনানন্দ দাশ পাঠে যেধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বা ঘটেঃ কয়েকটা নমুনা

যেকোনো লেখক/কবিকে একেক যুগ একেকভাবে পাঠ করতে পারে। পাঠের নতুন নতুন ধরন ওই যুগের লেখাপত্রের ভাবধারাকেও পরিবর্তন করতে পারে। দস্তয়েভস্কি কিংবা তলস্তয়, জয়েস কিংবা উলফ অথবা কাফকা বা জীবনানন্দ- এরা বারবার আবিষ্কৃত হয়। তো, আমার এই লেখা মূলত জীবনান্দকে পাঠ করার কিছু প্রচলিত প্রবণতা, কিংবা যেসব ফ্রেমের অধীনে ওরে বন্দী কইরা ফেলা হয়, তার বাইরের পথগুলারও সন্ধান করা একটু।

ফ্রেমের অধীনে বন্দী করার কথা বললাম কেন তা ক্লিয়ার করি। পূর্ববর্তী অনেক ক্রিটিকই জীবনানন্দের কবিতাকে একটা ধারণার’ আওতায় পাঠ করতে চাইছেন। এই ধারনাটা হইতে পারে ‘জীবনান্দীয় প্রবণতা’, ‘নির্জনতার চেতনা’ বা ‘পরাবাস্তবতা’র মতো বিষয়৷ ‘জীবনানন্দের একটা আলাদা জগৎ আছে’, ‘আলাদা স্বর আছে’ – এই কথা বাংলা কবিতার ইতিহাসে অনেকাংশেই সত্যি। তবে কেমলমাত্র এইসব ধারণাকে মহাসত্য ধরে সমগ্র জীবনানন্দকাব্যের কুলুজি খুঁজতে গেলে বিপদ। এতে টেক্সটের অসম্মান ঘটে, জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে আলোচনায় তা ঘটছেও৷ এইজন্যই বুদ্ধদেবের কাছে ধূসর পান্ডুলিপির জীবনানন্দ ‘প্রকৃতির কবি’ হিসেবে বিবেচিত হয়। (যদিও এর আগেই তিনি ওয়ার্ডসওর্থের উদাহরণ দিয়ে কাউরে ‘প্রকৃতির কবি’ বলার কারণে তার অন্য যে সিগ্নিফিকেন্সগুলারে অস্বীকার করা হয় অনেকসময়, সে বিপর্যয়টা নিয়ে বলছিলেন) তবে বুদ্ধদেব বসু নিজেও সেই বিপর্যয় থেকে বাইর হইতে পারেন নাই। বুদ্ধদেব বসুর কাছে জীবনানন্দের কবিতা অনেক বেশি শারিরীক, কিন্তু বুদ্ধিজাত না, উপমাগুলা অনুভূতিপ্রসূত, কিন্তু চিন্তাপ্রসূত না। আবার নির্জনতা, একাকীত্ববোধ, প্রকৃতির অজস্রতা ইত্যাদি শব্দের মধ্যেও কবিতার টেক্সটে বেঁধে ফেলাটা ঝামেলার৷

আমার কথা হইলো, জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কিংবা ‘নগ্ন নির্জন হাত’কে নিছক প্রেমের কবিতা বলে, এর টেক্সটের ভিতরের মূলকে সন্ধান না করে পড়ার যে বিপর্যয় ঘটে, সেটা কবুল করে জীবনান্দকে আবার পড়তে পারার প্রয়োজন এসে গেছে৷ এইজন্যই কবিতার টেক্সটের ভিতরে হাত পাতবো।

আসুন, আমরা বুদ্ধদেবের ভাষায় সবচেয়ে কম ‘বুদ্ধিগত’; সবচেয়ে বেশি ‘শারিরীক’ এবং কম ‘ভাবাত্নক’,রূপাত্নক’, ‘চিন্তাপ্রসূত ; সবচেয়ে বেশি অনুভূতিপ্রসূত জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ থেকে একটা কবিতা পড়ি৷

 

পঁচিশ বছর পরে

শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে-
বলিলাম- ‘একদিন এমন সময়
আবার আসিয়ো তুমি- আসিবার ইচ্ছা যদি হয়-
পঁচিশ বছর পরে।’
এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে;
তারপর, কতোবার চাঁদ আর তারা
মাঠে-মাঠে ম’রে গেল, ইঁদুর-পেঁচারা
জ্যোৎস্নায় ধানখেত খুঁজে
এলো গেল; চোখ বুজে
কতোবার ডানে আর বাঁয়ে
পড়িল ঘুমায়ে
কতো-কেউ; রহিলাম জেগে
আমি একা; নক্ষত্র যে-বেগে
ছুটিছে আকাশে
তার চেয়ে আগে চ’লে আসে
যদিও সময়,
পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয়!

তারপর- একদিন
আবার হলদে তৃণ
ভ’রে আছে মাঠে,
পাতায়, শুকনো ডাঁটে
ভাসিছে কুয়াশা
দিকে-দিকে, চড়ুইর ভাঙা বাসা
শিশিরে গিয়েছে ভিজে- পথের উপর
পাখির ডিমের খোলা, ঠাণ্ডা- কড়্‌ কড়্‌;
শসাফুল- দু-একটা নষ্ট শাদা শসা,
মাকড়ের ছেঁড়া জাল- শুক্‌নো মাকড়সা
লতায়- পাতায়
ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে পথ চেনা যায়;
দেখা যায় কয়েকটা তারা
হিম আকাশের গায়- ইঁদুর-পেঁচারা
ঘুরে যায় মাঠে-মাঠে, খুদ খেয়ে তাদের পিপাসা আজো মেটে
পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে!

এই কবিতা উত্তম পুরুষে লেখা। কথক এখানে কারো সাথে (কিংবা কিছুর সাথে) শেষবার দেখা করেছেন, এবং বলতেছেন ‘আবার আসিয়ো তুমি- আসিবার ইচ্ছা যদি হয়- পঁচিশ বছর পরে।’ এটা একটা শুদ্ধ আহবান, বা অনুরোধও বলা যাইতে পারে। তবে যিনি আসবেন তার মর্জির উপর ছেড়ে দেওয়া হইছে অর্থাৎ ‘ইচ্ছা যদি হয়’ তাহলে আসতে পারো৷’ এদ্দুর বলার পর তিনি ঘরে ফিরা আসলেন। কাহিনী তো এখানেই শুরু, কথক কারো মর্জির উপর ছেড়ে দিছেন পুনরায় আসাটারে, তবে তিনি কিন্তু ঠিকই অপেক্ষা করতেছেন। এই কবিতায় কথক তাই অপেক্ষা করবেন।

অপেক্ষা কি বস্তু? অনেককিছুই বলা যায়। তবে অপেক্ষার সাথে সময়ের একটা ব্যাপার আছে৷ ধরেন কেউ শাহবাগ মোড়ে দাঁড়ায়ে আছে বাসের জন্য, আধা ঘন্টা হয়ে গেল বাস আসলো না। কিন্তু সে আশা করতেছিলো বাস আসবে সাথেই সাথেই, আর সে উঠে যাবে। এইযে আশা করতেছিল, কিন্তু তারমাঝে বাস আসলো না, আধা ঘন্টা সময় বয়ে গেল- তারে অপেক্ষা বলা যায়৷ সেই লোক হয়তো বলবে ‘আমি বাসের জন্য আধা ঘন্টা অপেক্ষা করলাম, কিন্তু বাস আসিলো না৷ ‘ তো, আমরা বুঝলাম সময়ের সাথে অপেক্ষার সম্পর্কটা খুব পোক্ত।

এবার আসি কবিতায়৷ কথক এখনো অপেক্ষা করতেছেন!

এই অপেক্ষার সময়কালটাও উনি জানেন, ২৫ বছর। কিন্তু এই কালটা যাবে কেমনে? এইবার জীবনানন্দ আশ্রয় নেবে প্রকৃতির অনুষঙ্গের। কারণ প্রকৃতি বা আমাদের আশেপাশের প্রাণজগতের পরিবর্তনই তো সময়রে ভালো করে চিত্রিত করতে পারে৷ জীবনানন্দের কবিতায় তো প্রকৃতির পরিবর্তন আসে বারবার। কিন্তু এই পরিবর্তনকে উনি এখানে কেমনে ইউজ করবেন?

এইবার ইমেজগুলা দেখেন। কতবার চাঁদ আর তারা মাঠে মরে গেল (চাঁদ-তারা মরে যাওয়া অভিনব ইমেজ), ইঁদুর -পেচারা এলো গেল, আরো অনেককিছু ঘটতে থাকলো। সময়ের যে ধারাবাহিকতা আর পরিবর্তন- তা-ই আসতে থাকে প্রকৃতির নানা ঘটনার মাধ্যমে। কিন্তু কথকই কেবল ‘রহিলাম জেগে আমি একা’। কারণ ওইযে অপেক্ষা। নক্ষত্রের যে বেগে আকাশে ছুটে, তারচেয়ে আগে সময় ছুটে, তবুও ২৫ বছর আর শেষ হয় না। আহারে অপেক্ষা!

এবার কবিতার পরের অংশে পাশার দান উলটে যাইতে দেখবো আমরা। প্রকৃতির একই জিনিস এভাবে চলতে থাকে। কবিতার পরের অংশ শুরু হয় ‘তারপর-একদিন’ বলার মাধ্যমে। এইযে এরমধ্যে সময় বয়ে যাইতেছে, কথকের অপেক্ষা চলতেছে – সেটা ফিল করাবার জন্যই ‘তারপর-একদিন’ আসে। প্রকৃতির অনেকগুলা ঘটনার ইমেজ দেখা যায়। কিন্তু এবার এই ইমেজগুলা মলিন। ২৫ বছর ধরে এই বিশাল অপেক্ষার ব্যাপারটাও তো মলিন? সবকিছু যেন ক্ষয়ে যাইতেছে বিলুপ্ত নগরের মতো। এই অপেক্ষার চেতন আর প্রকৃতির অনুষঙ্গ মিলে এক করুণ অভিজ্ঞতার কথা মনে করায়ে দেয় এবার। সমুদ্রসমান অপেক্ষার করুণ অভিজ্ঞতা৷

এরমধ্যে ‘দেখা যায় কয়েকটা তারা/
হিম আকাশের গায়- ইঁদুর-পেঁচারা/ ঘুরে যায় মাঠে-মাঠে, খুদ খেয়ে তাদের পিপাসা আজো মেটে।’

আর শেষে?

‘পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে!’

এইযে এতো এতো অপেক্ষা, এতো ঘটনা, সময় এতো দ্রুত যায় তবুও ২৫ বছরের অপেক্ষা ফুরায় না’- এখান থেকে আমরা এবার জানলাম ২৫ বছর কবেই কেটে গেছে। সময় কি একটা ইল্যুশন না? সময় কি এমনেই ধোকা দেয় না আমাদের? ২৫ বছরের অপেক্ষাতেই তো ২৫ বছর হঠাৎ কেটে যায়, এ এক মহা মরিচীকা৷ এই কবিতার অন্যতম ভাববস্তু আসলে সময়ের ইল্যুশন। এই ভাববস্তু বাদ দিলে কবিতাটার আকার খুব একটা দাঁড়ায় না৷

এবার পাঠক/পাঠিকা ব্যাপারটা আপনাদের হাতেই তুলে দিলাম। এই কবিতারে নিছক ‘প্রকৃতির কবিতা’ বললে কী বিপর্যয়টা ঘটতে পারে, সেটা নিশ্চয়ই টের পাওয়া যাইতেছে৷ জীবনান্দের কবিতায় চিন্তা তেমন নাই, বা তার উপমা, অনুষঙ্গ কেবল অনুভূতিপ্রসূত বলার বিপত্তিটা এখানেই৷ উনার কবিতা অনেকসময়ই বড় কোন বক্তব্যরে ভাষায় এনে ঠিকঠাক আটাইছে পারছে, ভাষায় একটা Condensed ভাব আসে এইজন্য৷ এবং এই ভাববস্তু বা সমগ্র কবিতার কেন্দ্রীয় চেতনা/চেতনাগুলারে ক্রমাগত সাপোর্ট দিয়ে যাইতে থাকে তার অনুষঙ্গ, তার উপমা, তার রেটরিক৷ প্রকৃতিও এমন একটা অনুষঙ্গ এই কবিতায়, তবে এটাই সকলকিছু না৷

টেক্সটের নিবিড় পাঠের মাধ্যমেই এই কবিতার অঙ্গসঞ্চালন বুঝা সম্ভব।

২.

এইবার আসি উপমা আর ইমেজ নিয়া।

ইমেজ নির্মাণের দিক দিয়ে খুব কম কবিই জীবনানন্দের কাছাকাছি। এটা শুধু ভালো ইমেজ নির্মাণের কথা বিবেচনা করে না, খুবই বিচিত্র, ইউনিক ইমেজ নির্মাণের দিক দিয়েও। এই যেমন তার ‘পাখিরা’ কবিতাটার কথা বলা যাক। কবিতাটা শুরু হইছে এমনেঃ

ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে—/বসন্তের রাতে/বিছানায় শুয়ে আছি;/ —এখন সে কতো রাত! /ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর, /স্কাইলাইট মাথার উপর, /আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর। /তারপর চ’লে যায় কোথায় আকাশে? /তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে।

একটু পরেই এই কবিতার সমুদ্র আবার আসবে। পুরা কবিতায়ই সমুদ্র বারবার আসতে থাকে বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ঘন ইমেজ হয়ে। দেখা যায়, একজন লোক বসন্তের রাতে বিছানায় শুয়ে আছে৷ আর সে সমুদ্রের স্বর শুনতেছে৷ এদিকে স্কাইলাট মাথার উপর আর আকাশের পাখিরা কথা কয় পরষ্পর। সবশেষে দেখা যায় তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে। জীবনানন্দের অনেক কবিতায় দেখা যায়, যেসব জিনিস আমরা বাস্তব জগতে দেখতে পারি না, ছুইতে পারি না এগুলা আসে ইমেজ আকারে। যেমন আকাশে পাখিরা কিভাবে কথা বলে তা দেখতে পাওয়ার কথা না। আমরা জানি, এটা অদ্ভূত একটা ব্যাপার। বা, ডানার ঘ্রাণ বলে আসলে কিছু আছে? কিন্তু জীবনানন্দ এরসাথে যুক্ত করে দেয় ইন্দ্রিয়কে। আমরা ইমেজ আকারে আসলে যেন ডানার ঘ্রাণই শুনতে পাই!

এরপরঃ

শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে,/চোখ আর চায় না ঘুমাতে;/ জানালার থেকে ওই নক্ষত্রের আলো নেমে আসে, /সাগরের জলের বাতাসে/ আমার হৃদয় সুস্থ হয়; /সবাই ঘুমায়ে আছে সব দিকে—/ সমুদ্রের এই ধারে কাহাদের নোঙরের হয়েছে সময়?

একটা কমপ্লিট ইমেজ কিভাবে হাজির হইসে। এর আগের অংশেও আমরা বসন্ত দেখি। এইবার আমরা পেলাম শরীরে বসন্তের স্বাদ। কেমন স্বাদ? এইটাও ইন্দ্রিয়জ।এরপর আমরা দেখবো কেবল একজনই জেগে আছে, বাকিরা ঘুমায়ে। এইসময়, ‘সমুদ্রের এই ধারে কাহাদের নোঙ্গরের হয়েছে সময়?’ কারা আবার বিশ্রাম নেবে, ঘুমাবে? এইভাবে কবিতায় ভাষ্য আর ইমেজ একই পথে জড়াজড়ি করতে থাকে জীবনানন্দের কবিতায়।

এই কবিতায়ই আরো অপরূপ কিছু ইমেজ আছে।

সাগরের ওই পারে—আরো দূর পারে /কোনো এক মেরুর পাহাড়ে /এই সব পাখি ছিলো; /ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে দলে-দলে সমুদ্রের ’পর /নেমেছিলো তারা তারপর, /মানুষ যেমন তার মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে পড়ে।বাদামী—সোনালি—শাদা—ফুট্‌ফুট্‌ ডানার ভিতরে /রবারের বলের মতন ছোটো বুকে/ তাদের জীবন ছিলো— /যেমন রয়েছে মৃত্যু লক্ষ-লক্ষ মাইল ধ’রে সমুদ্রের মুখে/ তেমন অতল সত্য হ’য়ে।

আমরা পাখিদের কথা আগেই দেখছি। এইবার আসবে পাখিরা। এই পাখিরা দূর কোন মরুর পাহাড়ে ছিল। তারা ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে সমুদ্রের উপরে আসছে। এইযে ব্লিজার্ডের তাড়া খাইতেছে পাখি,অদ্ভূত ইমেজ আসতেছে এভাবে। এরপর আসবে আরো অদ্ভূত জিনিস। এই পাখিদের জীবন ছিল “রবারের বলের মতো ছোট বুকে’। এমন অদ্ভূত উপমা এবং ইমেজ বোধহয় বাংলা সাহিত্যে খুব কমই আছে। এটার অন্য তাৎপর্যও আছে। এইযে রবারের বলের মতো ছোট বুক,এরমধ্য দিয়ে জীবনের ক্ষুদ্রতারেই কি আনতে চান উনি? পরের লাইনেই আমরা দেখবো, মৃত্যুও আছে লক্ষ লক্ষ মাইল ধরে সমুদ্রের মুখে। এইযে মৃত্যুর মতো একটা বাস্তবতাকে এমন বিশাল করে হাজির করা, অতল সত্য করে, তারে জীবনের বিপরীতে দাঁড় করানো।

হয়তো এই পাখিরা তাড়া খেয়ে হাজার হাজার মাইল এই সমুদ্রের উপরে আসতেছে। আর একসময় ক্লান্ত হয়ে কেউ কেউ সমুদ্রের উপরই মৃত্যুর মুখে চইলা যাইতে পারে! তাদের রাবারের মতো ছোট বুকে যে ভঙ্গুর প্রাণ ছিল, সেটা ঝইরা পড়বে সমুদ্রের সমান অটল মৃত্যুর সামনে।

বুদ্ধদেব জীবনানন্দের কবিতা নিয়া আলাপে জীবনানন্দীয় উপমা আর ইমেজরে ইন্দ্রিয়জ হিসেবেই বলতে চাইছেন, উনি জীবনানন্দের উপমারে বলছেন, ‘চিন্তাপ্রসূত নয়, অনুভূতিপ্রসূত’। হ্যা, জীবনানন্দের অনেক উপমাই ইন্দ্রিয়জ। তবে খালি এই ভূমিকারে আমলে নিলে দাশের কবিতার প্রতি অবিচারও করা হবে। দাশের কবিতায় উপমা কবিতার আইডিয়ারেও সমানতালে কন্ট্রিবিউট করে৷ চিন্তা আকারে দাঁড়া হয়। এখানে যেমন পাখিদের তাড়া খাওয়ার পার্টে ‘রবারের বলের মতো ছোট বুক’রে কেবলমাত্র অনুভূতিপ্রসূত হিসেবে পড়াটা ঝামেলার, এইটা একইসাথে চিন্তারেও ধারণ করে৷


এবার আমার খুব প্রিয় একটা কবিতা দিয়া শুরু করি। এটা নিয়া আলোচনা বেশ কম। এ কবিতারে প্রেমের কবিতা, কালচেতনা ইত্যাদির মধ্যে গুলাইয়া ফেলার প্রবণতা আছে। আরেকটা জিনিস হইল, এই কবিতায় অনুষঙ্গ হিসেবে প্রকৃতি এককভাবে আসে নাই। কবিতাটা পড়া যাক।

নগ্ন নির্জন হাত

আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে:
আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার।

যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে
অথচ যার মুখ আমি কোনাদিন দেখিনি,
সেই নারীর মতো
ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে।

মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা
সেই নগরীর এক ধুসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে।

ভারতসমুদ্রের তীরে
কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে
আজ নেই, কোনা এক নগরী ছিল একদিন,
কোন এক প্রাসাদ ছিল;
মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ;
পারস্য গালিচা, কাশ্মিরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,
আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্খা,
আর তুমি নারী-
এই সব ছিল সেই জগতে একদিন।

অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,
অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল,
মেহগনির ছায়াঘর পল্লব ছিল অনেক;
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল;
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,
খুঁজি না।

ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী,
অপরূপ খিলানও গম্বুজের বেদনাময় রেখা,
লুপ্ত নাশপারিত গন্ধ,
অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধুসর পান্ডুলিপি,
রামধনু রঙের কাচের জানালা,
ময়ুরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায়
কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস-
আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়।

পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,
রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!
তোমর নগ্ন নির্জন হাত;

তোমার নগ্ন নির্জন হাত।

দেখেন এই কবিতায় প্রথমমেই সময় আইসা পড়ছে ‘আবার’ এর মাধ্যমে। আমরা জানতেছি আবার আকাশে অন্ধকার ভারী হয়ে উঠতেছে। তারমানে আগে আলো ছিল, একটা অতীত ছিল- অতীতে আলো ছিল। একটা সময়ের চলমান প্রক্রিয়া পাইলাম আমরা। পরের লাইনে উনি শুনাইতেছেন এই অন্ধকার আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতোই। মানে আলো আর অন্ধকার খুব আলাদা এন্টিটিও না, ন্যাচারাল জগতে জড়াজড়ি কইরা শুইয়া আছে এরা। জীবনানন্দ এবার অন্ধকার রুপের আরো বর্ণনা দিতেছেন। যে কথকরে ভালোবেসেছিল, যার মুখ উনি দেখেন নাই, সেই নারীর মতো অন্ধকার। এখানে পার্সনিফিকেশন হইতেছে। অন্ধকার মানুষের রূপ নিয়া প্রকাশিত হইতেছে। উনি আবার নিদৃষ্ট করতাছে না কিন্তু৷ বলতেছেন যার মুখ উনি দেখেন নাই। এমনে অন্ধকার দেখতে কেমন, তাও যেন উনি ঠিক দেখেন নাই৷ এইখানে দেখেন একটা অন্ধকারের মধ্যে একজন সাবজেক্টের কথা আসলো৷ সাবজেক্টরে এক নারী ভালবাসতো৷ কিন্তু এই নারী কোথায়?

জীবনানন্দ এবার কবিতার মোড় পাল্টাবেন। এক বিলুপ্ত নগরীতে চইলা যাবেন। যাবেন না ঠিক, স্মৃতি থেকে বা ইতিহাস থেকে নিয়া আসবেন। ইতিহাসও তো একপ্রকার স্মৃতিই৷ এইজন্যই ‘মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা’।

এবার আসবে কোন এককালে সেই নগরীর অস্তিত্বের কথা। তার সাথে সাথে কোন এককালে সেই নারীর কথাও।

“ভারতসমুদ্রের তীরে
কিংবা ভূমধ্যসাগরের কিনারে
অথবা টায়ার সিন্ধুর পারে
আজ নেই, কোনা এক নগরী ছিল একদিন,
কোন এক প্রাসাদ ছিল;
মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ;
পারস্য গালিচা, কাশ্মিরী শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,
আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্খা,
আর তুমি নারী-
এই সব ছিল সেই জগতে একদিন।”

এইযে কোন এক নগর ছিল,প্রাসাদ ছিল, মূল্যবান আসবাব ছিল প্রাসাদে, কথকের বিলুপ্ত হৃদয়, কথকের মৃত চোখ- মানে সাবজেক্ট আকারে কথক নিজেও, আর সেই নারী- এরা সব জগতে ছিল একদিন। কিন্তু আজকে আর নাই। মানে সেই নারী আজকে আর জীবনে নাই, স্মৃতি হয়ে গেছে ইতিহাসের নানা ঘটনার মতোই। তার কথাই মনে হইতেছে বারবার।

এবার আবার এই ভাবেরই বিস্তৃতি দেখবো আমরা৷

“অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,
অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল,
মেহগনির ছায়াঘর পল্লব ছিল অনেক;
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল;
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,
খুঁজি না।”

আবার আমরা জানতেছি অনেক কমলা রঙের রোদ, কাকাতুয়া পায়রা, মেহগনির ছায়াঘর পল্লব ছিল (দেখেন শান্তিময় ইমেজ সবগুলা, রঙ্গিন), আর ‘তুমি ছিলে’- মানে সে নারী ছিল। কিন্তু এখন আর নাই, শান্তিও নাই। তার মুখ তো কত শতাব্দী ধইরা অদেখা রইয়া গেল৷ কথক আর খুঁজতেছেও না আসলে তারে৷ তার নিজের হৃদয়ও তো বিলুপ্ত,স্বপ্ন-আকাঙ্খা বিলীন।

এখানে টাইম-শিফটের ব্যাপারটা খেয়াল করেন। প্রথমে আমরা পাইলাম ‘আবার অন্ধকার’৷ মানে বর্তমানে৷ অন্ধকারটা কার মতো? সেই নারীর মতো৷ এরা এক হইয়া গেল৷ তারপর আমরা গেলাম অতীতে। জানলাম আগের দিনের নগরের কথা, যা এখন আর নাই৷ আবার আমরা বর্তমানে আসবো। কথকের বর্তমান বিষাদে। এই বিষাদ আইনা দিল কে? ওইযে প্রথমে বলা সেই ফাল্গুনের অন্ধকারই। এই অন্ধকাররই অতীতের স্মৃতিকে বর্তমানে আইনা দিছে।

‘ফাল্গুনের অন্ধকার নিয়ে আসে সেই সমুদ্রপারের কাহিনী,
অপরূপ খিলানও গম্বুজের বেদনাময় রেখা,
লুপ্ত নাশপারিত গন্ধ,
অজস্র হরিণ ও সিংহের ছালের ধুসর পান্ডুলিপি,
রামধনু রঙের কাচের জানালা,
ময়ুরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায়
কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস-
আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়।’

লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ, খিলান আর গম্বুজের বেদনাময় রেখা।

এরপরঃ

‘ময়ুরের পেখমের মতো রঙিন পর্দায় পর্দায়
কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস-‘

এবার আসি স্মৃতির কথায়। কোনো জিনিস স্মৃতি হয় কেমনে? মানে ধরেন, একটা ঘটনা অতীত হইয়া গেল, আর বর্তমানেও তার রেশ থাকলো- এরে তো আমরা স্মৃতি কইতে পারি। ক্রমাগত সময়ের সাপেক্ষেই স্মৃতি তৈরি হয়৷ একজায়গায় থেমে থাকলে তো স্মৃতি হইতো না। এখানে গতি লাগতেছে। এখন আমরা গতির কি তা জানবো।

“সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকের সাপেক্ষে যখন কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে তখন তাকে গতিশীল বস্তু বলে। আর অবস্থানের এ পরিবর্তনের ঘটনাকে গতি বলে।”

মানে সময়ের সাথে সাথে অবস্থান বা স্পেসের পরিবর্তন লাগে, তবেই গতি হয়। এবার আসি জীবনানন্দের কবিতায়।

‘কক্ষ ও কক্ষান্তর থেকে আরো দূর কক্ষ ও কক্ষান্তরের
ক্ষণিক আভাস-‘

কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে- কক্ষ কিন্তু স্পেস বা অবস্থান। এই অবস্থান বারবার বদলাইতাছে, কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে যাইতাছে৷ ধরেন একটা ট্রেনের মতো৷ ট্রেনের বগি একটা স্পেস৷ চলন্ত ট্রেনে স্পেস দৌড়ায়। তবে এইযে স্পেস থেকে স্পেসে যাওয়া এইটা পুরাভাবে হাজির হইতেছে না, দিতেছে ক্ষণিকের আভাস। অর্থাৎ সময় আর স্থানের সাপেক্ষে একটা স্মৃতি ক্ষণিকের আভাস দিতে দিতে আসতেছে। অনেকটা মেঘলা আকাশে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানির মতো।

এতক্ষণ আমরা জানলাম আগে এই নগরী ছিল, এক নারী ছিল- কেউই আর নেই, কিছুই আর নেই। তবে তার স্মৃতি তো আছে৷ যা হারায়ে গেছে তারে তো আর আগের মতো কইরা পাইতে পারি না আমরা, তারে আংশিকভাবে হয়তো পাওয়া যাইতে পারে, স্মৃতিতে। যা গেছে তাহাকে আর পাওয়া যায় না, সময়ও তো তাই! তো এই আংশিক পাওয়া এখানে কি রূপে মূর্ত হবে? ‘নগ্ন নির্জন হাত’ রূপে।

‘পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,
রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!
তোমর নগ্ন নির্জন হাত;

তোমার নগ্ন নির্জন হাত।’

এইসকল ঘটনার মধ্যে, পর্দায়,সময়ে,স্থানে- হঠাৎ মূর্ত হবে ‘তোমার নগ্ন নির্জন হাত।’ তুমি তো নাই, তোমার হাতের স্মৃতি আছে। সম্পূর্ণ নাই, আংশিক আছে। সমগ্র কাল নাই,কালাংশ আছে৷

এই কবিতা অত্যন্ত জটিল আর অভিনব। এরে নিছক প্রেম বা ইতিহাসচেতনা বা পরাবাস্তবতার ফ্রেমে মাপলে বড় কেলেঙ্কারি হওয়ার কথা না?


এইখানে কিছু কথা মন্তব্য বা সম্ভাবনা আকারে বলি। জীবনানন্দকে প্রকৃতির কবি বলার বিপর্যয়টা এখানেও যে, তিনি প্রকৃতিকে বিলীন হন না। ‘পঁচিশ বছর পরে’তে প্রকৃতির নানা ঘটনার মধ্যে ‘আমি’ জেগে থাকে। ‘পাখিরা’ কবিতায় কেউ একজন বসন্তের রাতে বিছানায় শুয়ে থাকে। বনলতা সেনে কেউ পৃথিবীর পথে হাজার বছর হাঁটে, ‘সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে’। মডার্নিস্ট কবিতার প্রভাব আছিলো জীবনানন্দের উপর৷ তো, ওসময়ের নেচার কালচার বিভেদের একটা প্রভাব তারমধ্যে থাকার সম্ভাবনা আছে৷ যে তিনি বাংলার প্রকৃতির বুকে সাবজেক্টিক আকারে বারবার ফিইরা আসতে চাইছেন, উনিই তো আবার বলছেন,

‘আমি সব দেবতারে ছেড়ে আমার প্রাণের কাছে চ’লে আসি’।

এই বিষয়ে আরেকদিন। আজকে এখানেই ইতি৷

…………………………

একটি আকুল আবেদনঃ

জীবনানন্দকে ‘নির্জনতার কবি’, ‘প্রকৃতির কবি’, ‘পরাবাস্তব কবি’ বানানোর চেয়ে টেক্সটের কবি বানানো বেশি জরুরি। কবিতায় টেক্সটই পথ দেখায় শেষপর্যন্ত। জন্মদিনে দাশরে আরো আরো নানা জায়গা থেকে পাঠ করার আশা করি, দেখারও।

হ্যাপি রিডিং।

The following two tabs change content below.

তাসনিম রিফাত

জন্ম ১৯৯৮ সাল। ঢাকায় থাকেন। সাহিত্য ও নৃবিজ্ঞান নিয়া পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য