Main menu

আমি সবসময় লিখতে লিখতে অনুবাদ করতে থাকি – অরুন্ধতী রায়

[ প্যারিস রিভিউ পত্রিকার সামার, ২০২১ সংখ্যায়, এই ইন্টারভিউটা ছাপা হইছে। ইন্টারভিউ নিছেন হাসান আলতাফ। এইখানে ইন্টারভিউটার কিছু অংশ পাবলিশ করা হইলো। ]

ইন্টারভিউয়ার: আপনি কি আমারে আপনার রিডিং হ্যাবিট নিয়া একটু বলতে পারেন?

অরুন্ধতী রায়: যখন কেরালায় বড় হইতেছিলাম, ব্রেইনে মালয়াম পার্ট যেমন ছিল, ইংলিশ পার্টও ছিল – এই ইংলিশ পার্টটুক নারিশ করার জন্য অনেক শেক্সপিয়ার, অনেক কিপলিং পড়ছিলাম। ওইগুলা সবচেয়ে সুন্দর, লিরিকাল ভাষার আর আনলিরিক্যাল পলিটিক্সের একটা কম্বিনেশন, যদিও তখন ব্যাপারটারে ওইভাবে দেখি নাই। উনারা আমারে অবশ্যই ইনফ্লুয়েন্স করছেন, যেমনটা পরে করছেন জেমস বাল্ডউইন, টনি মরিসন, মায়া অ্যাঞ্জেলো, জন বার্জার, জয়েস, নাবোকভ। প্রিয় লেখকদের লিস্ট বানানোটা যে কী প্যারা। গ্রেট লেখকদের থেকে শিক্ষা নিয়া আমি গ্রেটফুল, এর সাথে ইম্পেরিয়ালিস্ট, সেক্সিস্ট, বন্ধু, লাভার, অপ্রেসর, রেভলুশনারি – সবার প্রতিই গ্রেটফুল। সবারই একজন লেখকরে কোন কিছু শিখানোর আছে। মিসেস ডালোওয়ে থেকে আমি অদ্ভুতভাবে সিটিজেনদের ন্যাশনাল রিপোর্ট পড়তে শিফট করতে পারব, যেইটা থেকে দুই মিলিয়ন আসামের লোকজনরে বাদ দেয়া হইছে, যাদের ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ বাতিল কইরা দিছে। যেকোন অধিকার পাওয়া থেকে বাতিল কইরা দিছে।

রিসেন্টলি যেই নভেল আমার ভালো লাগছে ওইটা হইলো ভাসিলি গ্রসম্যানের লাইফ অ্যান্ড ফেইট। চরিত্রগুলার রেইঞ্জ, সাহস, সিচুয়েশনগুলা একদম সেরা। ভলগা পুড়ার একটা সাররিয়েল বর্ণনা দিয়া নভেলটার শুরু হইছে, পানির উপরে ভাসতে থাকা গ্যাসোলিনে আগুন ধরতেছে, যেন একটা নদী পুইড়া যাওয়ার ইল্যুশন – এদিকে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ চলতেছে। সোভিয়েত অথরিটি এই ম্যানুস্ক্রিপ্টটারে একজন মানুষের মতই গ্রেফতার করছিল। আরেকটা রিসেন্ট পড়া হইলো জর্জিও বাসানির দা গার্ডেন অফ দা ফিনজি-কনতিনিজ। এইটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের সময় নিয়া লিখা, যখন ইটালির অনেক ইহুদি ফ্যাসিস্ট পার্টির মেম্বার ছিল। ফিনজি-কনতিনিরা হইলো একটা এলিট ইহুদি পরিবার, যারা বিশাল বিশাল মাঠ আর টেনিস কোর্টওয়ালা একটা ম্যানশনে থাকত। বইটা হলোকাস্টের সময় ফিনজি-কনতিনি পরিবারের মেয়ে আর ওই দুনিয়ার একজন আউটসাইডারের প্রেম নিয়া লিখা। ওই জায়গার আনচেঞ্জিং, থমথমে ভাবের মধ্যে কিছু একটা আছে, চারপাশ আরো আন্ধার হওয়ার মধ্যেও যা যা হইতেছে এইগুলারে অস্বীকার করা। এইটা একটু ভয়ানক আবার অদ্ভুতভাবে কন্টেম্পোরারি। সব ফিনজি-কনতিনিরা মইরা যায়। স্তালিনিস্ট রাশিয়াতে যা হইছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে যা হইছে, কেউ পড়তেছে আর বর্তমানরে বোঝার তরিকা খুঁজতেছে। আমারে যেই জিনিসটা ফ্যাসিনেট করে তা হইল স্তালিনের ফায়ারিং স্কোয়াড যাদের গুলি কইরা মাইরা ফেলছে, তারা মরতে মরতেও কইতেছিল, “লং লিভ স্তালিন!” স্তালিন মরার সময় গুলাগ খাটা মানুষও কান্নাকাটি করছিল। সাধারণ জার্মানরাও কখনো হিটলারের বিরুদ্ধে জাইগা উঠে নাই, যদিও সে এমন যুদ্ধ চালাইছে যেইটা তাদের শহরগুলারে একদম শেষ কইরা দিছিল। আমি ইয়ান কেরশ এর হিটলারের বায়োগ্রাফি, নাদেজদা মান্দেলস্তামের আত্মজীবনীতে (যার হাজব্যান্ড ওসিপ মান্দেলস্তামরে স্তালিন বেসিকালি মাইরা ফেলছিল), অ্যানা আখমাতোভার কবিতায়, ভারলাম শালামভের কোলিমা টেইলে আমি হিউম্যান সাইকোলজির ক্লু খুঁইজা বেড়াই।

ইন্টারভিউয়ার: অনেক রাশিয়ান দেখি।

রায়: হ্যাঁ, এখন অনেক রাশিয়ান। উনারা যেমনে একটা বড় ন্যারেটিভরে ধরেন, এইটা খুবই ইন্টারেস্টিং। আর অবশ্যই চেকভ, যে মাইক্রোস্কোপিক ভাবেও এই কাজটা করতে পারেন। উনারা যে রাস্তার লেনের ভিতর থাকতে চান না এই জিনিসটা আমি এনজয় করি। বিশেষ কইরা এখন যখন ট্রাফিকের নিয়মকানুন আরো শক্ত হইতেছে, রাস্তাগুলা আরো চিকন হইতেছে। লেখক, পাঠক, পাবলিক কনভারসেশন, সবাইরে একটা দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখা হইতেছে। উপর, নিচ, পাশ সবদিক থেকে কন্ট্রোল করা হইতেছে। ভারতে লিটারেলি রাস্তাঘাটে একদল মানুষ কালচারাল সেন্সরশিপ বাঁচানোর ঠেকা নিয়া রাখছে, বেশিরভাগ সময় সরকারের ছুপা ব্লেসিংও থাকে। আমরা এক ধরণের ইন্টেলেকচুয়াল গিট্টুর দিকে আগাইতেছি।

ইন্টারভিউয়ার: আপনার লেখা তো মনে হয় না কখনো মাইক্রোস্কোপিক, ছোট গল্পের ছাঁচে গেছে – নভেল ফরমাটই বাইছা নেন।

রায়: আমি বছরের পর বছর একটা নভেলের ইউনিভার্সে ডুব দিতে ভালোবাসি। ওইসময়ে নিজেরে সবচেয়ে বেশি জ্যান্ত লাগে। কিছু লেখক ওই প্রসেসে সাফার করে, কিন্তু আমি এনজয় করি। ওই ইমপারফেক্ট ইউনিভার্সে থাকা প্রেয়ারে থাকার মত – প্রোডাক্টটা, বা তার শেষটা, বা তার সাকসেস, বা তার ননসাকসেস থেকে এইটা আলাদা। নভেলের কী একটা বাজে নাম দিলাম – প্রোডাক্ট। সরি।

ইন্টারভিউয়ার: ওই প্রোডাক্টটা কী? একটা নভেল কীরকম হওয়ার কথা?

রায়: আমার মনে হয় দিনদিন নভেলগুলা বেশি সহজ, স্মুথ হয়ে যাইতেছে। যখন আপনি ভাসিলি গ্রসম্যান বা বড় রাশিয়ান নভেলগুলা পড়বেন, ওইগুলা ওয়াইল্ড আর অস্থির, কিন্তু এখন একটা উপায় আছে যেখানে লিটারেচাররে বাজারজাত করা হইতেছে, প্যাকেজ করা হইতেছে – এইটা কি রোমান্স? এইটা কি একটা থ্রিলার? কমার্শিয়াল? সাহিত্যিক? এইটারে কোন শেলফে রাখব? আর এখন আমাদের তো আবার এম.এফ.এ নভেল আছে (নভেল লেখা শেখার জন্য মাস্টার্সের কোর্স থাকে, এই কোর্সে যে নভেল লিখা হয়), যেইটা প্রায়ই সুন্দর কইরা বানানো হয়। কোন ছোটখাট ভুলটুল থাকে না। চরিত্রের সংখ্যা, চ্যাপ্টারের লেংথ, সবই খুবই স্কিলফুলি সাজানো – আর আমি বলব ওইখানে পুরুষ নভেলিস্টদের ফ্রি হ্যান্ডে লিখতে দেয়। ওদের আরো সহজেই বড় ক্যানভাস দেয়া হয়। কিন্তু নারী হইলে কয়, বইয়ে কয়টা চরিত্র? একটু বেশিই পলিটিকাল হয়া গেল না? আমি তাদের জিগাইতাম, ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিট্যুড বা ওয়ার অ্যান্ড পিস এ কয়টা চরিত্র আছে? আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে সেটেল্ড হ‌ও‌য়া ক্লাসগুলা, কনটেম্পোরারি কালচারাল রাজারা যারা শিল্প-সাহিত্যের টেস্ট ঠিক ক‌ইরা দেয়, তারা প্রায়ই রিয়েল, ডিপ, আনসেটেলিং পলিটিক্স – যেইটা ইউজুয়ালি শেখানো হয় না- এইগুলা নিয়া দুশ্চিন্তা করে। এক্সপেক্ট করা হয় যে আমরা একটা নির্দিষ্ট ভিউ থেকে লিখব, যেখানে প্রগ্রেস, এনলাইটমেন্ট, সিভিলাইজেশনের একটাই কমন আইডিয়া সবাই মাইনা নিছে। কিন্তু আমার মনে হয় এই জিনিসটা এখন বদলাইতেছে। সারা দুনিয়ার ইয়াং লেখক আর কবিরা নানা দিক দিয়া এইটারে চ্যালেঞ্জ করতেছে।

ইন্টারভিউয়ার: একটা সাজানো প্রোডাক্টের আইডিয়াটা ইন্টারেস্টিং, এখানে লেখকরা যেসব বিষয় নিয়া বলতে “পারমিশন” পায়, বা একটা বইতে যা যা আনতে পারে, এই সাবজেক্টগুলারে লিমিট কইরা দেয়- যেন একটা ফ্যামিলি স্টোরিতে পলিটিকাল ব্যাপারস্যাপার আনা যাবে না, বা ভাইস ভার্সা। মিনিস্ট্রিতে আপনি তিলোর ব্যাপারে বলেন যে সে তার “আলাদা-আলাদা দুনিয়ারে আলাদা কইরা রাখার ক্ষমতা হারায়া ফেলছিল”, যেইটা আপনার কাজের তরিকা নিয়াও বলা যায় – নভেলগুলাতেও দেখা যায়, আপনি যেমনে জনরা থেকে জনরাতে শিফট করেন ওইখানেও দেখা যায়।

রায়: একজন নভেলিস্ট আলাদা দুনিয়া রাখতে পারবে না। আপনার কাজই হইলো এই দুনিয়াগুলারে একটার সাথে একটা বা একটার পিঠে আরেকটারে স্ম্যাশ করা। একাডেমিক দুনিয়া, জার্নালিস্টিক দুনিয়া, এনজিও দুনিয়া, তারা জিনিসপাতি আলাদা রাখতে পছন্দ করে- এইটা একটা ক্লাইমেট চেঞ্জ রিপোর্ট, এই রুমে আমরা হিন্দু ন্যাশনালিজম নিয়া ডিল করি, ওই রুমে যুদ্ধ আর শান্তি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডমিন এরিয়া, এইটা ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স, এই ডিপার্টমেন্ট পরিবেশ ইস্যু ফান্ডিং নিয়া কাজ করে, এই রুমে আমরা জাত-পাত-বর্ণ আর অন্য আইডেন্টিটিওয়ালা ইস্যু নিয়া চিন্তাভাবনা করি। মাঝে মাঝে আমি যখন খারাপ মুডে থাকি, আমার মনে হয় এইটা অনেকটা ফান্ডিং অ্যাপ্লিকেশনের ক্যাটেগরি করার মত। কিন্তু এইগুলারে আসলেই, র‍্যাডিকালি বুঝতে গেলে, আপনারে জিনিসগুলার সম্পর্করে দেখতে হবে। কাশ্মিরের ঝামেলা আসলেই বুঝতে চাইলে আপনারে শুধু মিলিটারি দখলের বিষয়ই না, ঐ অঞ্চলের জিওগ্রাফি, প্রাকৃতিক সম্পদের দখল, নদীর গুরুত্বও বুঝতে হবে। যখন উড়িষ্যার দুইটা কমিউনিটিতে ভায়োলেন্স ছড়ায়া পরে, এই কমিউনিটিগুলার কনফ্লিক্টের ইতিহাস ছাড়াও আপনারে অবশ্যই এরিয়ার বক্সাইট পাহাড় আর মাইনিং কম্পানিগুলা দেখতে হবে। ইন্ডিয়ান ইকোনমি কেমনে কাজ করে বুঝতে হইলে শুধু ফিনান্স বুঝলেই হবে না। আপনারে কাস্ট বা জাত নামের কাঁচের ভিতর দিয়া ব্যাপারটারে দেখতে হবে। আপনার অনেকগুলা চোখ লাগবে যেইগুলা আপনার মাথার সবদিক কভার করবে, ফ্লেক্সিবল একটা চামড়া লাগবে। অন্তত আমি এইরকম নভেলিস্ট হইতে চাই। এইটা আমার জন্য ট্র্যাজেডি আবার পরশপাথরের মতও। এইটা আমার জীবন বরবাদ করে দিছে আবার জোড়াও লাগাইছে। মাঝে মাঝে ভাবি আমি যদি অন্যরকম হইতে পারতাম, অন্যধরণের মানুষ হইতে পারতাম।

ইন্টারভিউয়ার: আপনি তো আপনার ফিকশনে “অফিশিয়াল” বা পলিটিকাল ভাষার উপর ভালোই নজর দেন- যেমন দা গড অফ স্মল থিংস এ পুলিস লিস্টটা, মিনিস্ট্রিতে যেমনে আঞ্জুম হিজড়া শব্দটা ব্যবহার করে আবার সাঈদা এমটিএফ (মেইল টু ফিমেইল), এফটিএম (ফিমেইল টু মেইল), আর সিসজেন্ডারের মত শব্দ বুইঝা নেয়, “আনটাচেবলস” বা “শিডিউল্ড কাস্ট” (সনাতন ধর্মের যে মেইন চারটা কাস্ট, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র- এই চার কাস্টের বাইরের কাস্টরে শিডিউল্ড কাস্ট বলে) এর মত লেবেলগুলা।

রায়: এইটা নিয়ে যতই ভাবি, রিয়েলাইজ করি যে এইটা আমার কাছে কত ইম্পর্ট্যান্ট – পাবলিক ভাষা নিয়া কনশাস থাকা, সেই সাথে নিজের একটা প্রাইভেট ভাষা খুঁজতে থাকা। যখন ইন্ডিয়াতে নাইন্টিজের দিকে নিউক্লিয়ার টেস্ট হইছিল, তখন পাবলিক ভাষা পুরা বদলে গেছিল।

ইন্ডিয়া নিজেরে নিউক্লিয়ার পাওয়ার ঘোষণা করার পরে কথাবার্তায় একটা নতুন ধরণের এগ্রেসিভ হিন্দু ন্যাশনালিজম আসছিল, মানুষজনরে “রিয়েল” বা “সহী” ইন্ডিয়ান বলা, রিলিজিয়াস মাইনরিটি – বিশেষ কইরা মুসমানদের আলাদা কইরা দেখা জায়েজ হয়া গেল। ওপেনলি ইসলামোফোবিক হওয়া নিয়ম হয়া গেল। ভাষার এই শিফটটা দেইখাই আমি “দা এন্ড অফ ইমাজিনেশন” লিখছি – ইন্ডিয়ার নিউক্লিয়ার টেস্টের উপর আমার এসে। তারপর আমি যখন নর্মদা ভ্যালি গিয়া অ্যান্টি ড্যাম মুভেন্ট নিয়া লিখলাম, ওইটার ভাষা অন্যরকম ছিল। মানুষ নিজেদের প্যাপ (pap) ডাকত- প্রোজেক্ট অ্যাফেক্টেড পারসনস। আপনি কি একজন প্যাপ? না, লিস্টে আমার নাম নাই। এখন ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্সের জন্য আসামে নতুন ভোকাবুলারি হইছে। দূরের দ্বীপগুলাতে জেলেরা ডাউটফুল ভোটারস, ডিক্লেয়ারড ফরেনারস, জেনুইন সিটিজেনের মত ইংলিশ শব্দ ব্যবহার করে, আর লিগেসি ডকুমেন্ট গুছানো নিয়া চিন্তা করে। কাশ্মিরে মিলিটারি দখলের কারণে আলাদা একটা ভোকাবুলারি হইছে। মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ তিলোর কাশ্মিরি-ইংলিশ ডিকশনারিতে দেখানো হইছে। তারপর কাস্টের ভাষা আছে – বাজে ট্র্যাডিশনাল ব্যবহার, জঘন্য অফিশিয়াল টার্মগুলা। যেভাবে বেশ কয়েকটা লোকাল ভাষায় শূদ্র আর দলিত মহিলাদের এবং মানুষকে ডিজরেস্পেক্টফুল ভাবে রেফার করা হয়, এই ডিজরেস্পেক্টটা ভাষাটার মধ্যেই ঢুইকা বইসা আছে।

আমি আপনাকে এইসব কেমনে বুঝাব? আমার জন্য এই কাহিনিটা হইলো জীবন নিজেই। কাহিনি বলাটা নিজেই একটা কাহিনি। আর কাহিনিটা যেই ভাষায় ওইটা আরেকটা কাহিনি। কারণ, দুনিয়ার এই অংশে ভাষা হইলো এক মহাসাগর যেইটার মধ্যে ভাষা মাছ আর শব্দ মাছ সাঁতরায়া বেড়াইতেছে।

… … …

ইন্টারভিউয়ার: কেরালা থেকে দিল্লি আসার পর কেমন লাগছিল? মনে হয় একটা বিশাল কালচার আর ভাষা চেঞ্জ ছিল।

রায়: হ্যাঁ ছিল। কিন্তু এইটা ওয়ান্ডারফুল ছিল। ওই দিনগুলা আমার মা আর আমার জন্য টাফ ছিল। আমার মা একজন এপিক মানুষ। উনি আমারে বানাইছেন আবার উনি আমারে বরবাদ করছেন, এই দুই শব্দের এপিক সেন্সেই আমি এইটা বলতেছি। উনার ভয়ঙ্কর ধরনের অ্যাজমা আছে, আর ছোট থাকতে ওইটারে আমি খুব ভয় পাইতাম। উনি বলতে থাকতেন আমি কিন্তু মইরা যাব, তখন তুমি কি করবা? তোমারে তো রাস্তায় থাকতে হবে। আমার মনে হত আমার নিঃশ্বাস আমার নিজের না, মায়ের। উনার থাইমা থাইমা নেয়া নিঃশ্বাসে আমি বাঁচতাম। আমি আসলেই ভাবছিলাম উনি মরলে আমিও মইরা যাব। ছোটবেলায় খুব ভীতু ছিলাম। আর এখন উনার বয়স সাতাশি বছর! আবার অন্যদিকে, উনিই আমার মেরুদণ্ডরে স্টিলের বানাইছেন। আমি আজকে যা হইছি ওইটার গ্রাউন্ডওয়ার্ক উনিই কইরা দিছেন। উনিই আমাদের সোশাল আইসোলেশনকে আমাদের শক্তি বানাইছেন। উনিই আমারে আমার গায়ের রঙে কমফোর্টেবল বানাইছেন – আমি ফ্যামিলির বাকিদের চেয়ে কালো ছিলাম। খুবই ভয়াবহ অপরাধ। উনি এনশিওর করছেন যে আমার যে একমাত্র পুতুলটা ছিল – যদিও আমি পুতুল খেলা টাইপ ছিলাম না – যেন কালো হয়। কিন্তু তারপরে ছোট আমি যখন আজকের নারী হয়ে উঠা শুরু করলাম, আমার মা খুবই রাইগা গেছিলেন। অনেক বছর ধইরা আমাদের মধ্যে ভয়াবহ ঝামেলা চলতেছিল।

আমি ১৯৭৬ সালে ১৬ বছর বয়সে দিল্লিতে আসছিলাম স্কুল অফ আর্কিটেকচারে জয়েন করতে, আর আমারে বাঁচানোর জন্য দিল্লিরে আমি ভালোবাসতাম। যতই নোংরা আর বিশ্রি হোক না কেন। যত বড়ই কালচারাল চেঞ্জ হোক না কেন… আমার কাছে এইটারে ফ্রিডমের স্বাদ লাগত। সেকেন্ড ইয়ারে উঠার পর আমি বাসায় যাওয়া বন্ধ কইরা দিলাম। আমি কলেজ শেষ করা পর্যন্ত আর্কিটেকচারাল ড্রাফটসম্যান হিসেবে কাজ কইরা গেছি। আমার প্রথম বয়ফ্রেন্ড, যে কীনা আরেকজন স্টুডেন্ট ছিল ওখানকার, ওর সাথে থাকা শুরু করলাম। আমি উগ্র, হাই আর কেয়ারলেস হয়া গেছিলাম। কেউ আমারে কিছু বলতে পারত না কারণ আমি বাসা থেকে টাকা নিতেছিলাম না। আমি ইঁদুরের মত থাকতেছিলাম, কিন্তু আমি খুব হ্যাপি ছিলাম।

… … …

আমার মনে পড়ে, আমার এক দূর-সম্পর্কের নানা, যিনি সরকারি সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, আমারে দেখতে আসছিলেন। আদর থেকে না। এইটা ওইসব ক্রিপি জিনিসগুলার একটা ছিল – কথা ছড়াইতে, বাসায় গিয়া মানুষরে বলার জন্য যে এই মাইয়া নষ্ট হয়া গেছে। ততদিনে আমার আর কিছু যায় আসত না। তো উনি হোস্টেল গেটে আসছিলেন, আর আমি নিচে নামছিলাম। উনি ওইরকম মানুষ, যারা পিঠে হাত দিয়া বলবেন, ওহ, তুমি ব্রা পরো নাই। উনি চারপাশে তাকায়া দেখলেন ছেলে মেয়ে সব একসাথে লনে বইসা আলাপ করতেছে, স্মোক করতেছে, উনার তো মাথায় আকাশ ভাইঙা পড়লো। উনি আমারে কইলেন, তোমরা লিমিট ক্রস কইরা গেছ না? আমি কইলাম, আমাদের কোন লিমিট নাই। আমি জানতাম এখানে আমার বলা একেকটা শব্দ বাসায় আমার কফিনে পেরেক ঠুকার মত হইত। সব কথা কমপ্লেইন্ট আকারেই যাইত। তারপর উনি জিগান, তোমাদের ওয়ার্ডেন কই? আমি কই, আমাদের কোন ওয়ার্ডেন নাই। উনি কন, রাতে কয়টার মধ্যে ফিরত আসা লাগে? আমি কই, ফিরত আসা লাগে না। উনি শক খায়া পরে চইলা গেলেন।

আমি আমার ফেরত যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ কইরা ফেলছিলাম। বেশি কঠিন কিছু ছিল না, কারণ আমি আমার মানুষ পায়া গেছিলাম। আমার মনে হয় ইন্ডিয়াতে আপনি যদি আমার মত মানুষ হন, যে একবারে নষ্ট হয়া গেছে, তাইলে আপনি নিজের জন্য এক ধরণের ফ্রিডম পায়া যান। একটা ব্যবস্থা হয়া যায়।

ইন্টারভিউয়ার: “এরে নিয়া কোন আশা নাই…”

রায়: হ্যাঁ, কিন্তু খারাপ ভাবে না। অন্যদের উপর যে নিয়মগুলা কাজ করে, দমবন্ধ করা, দুর্বল কইরা দেওয়া নিয়মগুলা, ওইগুলা থেকে বাঁচা যায়। হয়তোবা যেইরকম অদ্ভুত বিহেভিয়ার দেখা যায় এইজন্য। কিন্তু অবশ্যই আপনারে টাকার দিক দিয়া ইন্ডিপেন্ডেন্ট থাকতে হবে। নাইলে আপনি বরবাদ হয়া যাবেন। ফিনিশড।

… … …

ইন্টারভিউয়ার: বইটা লেখার প্রসেস কী ছিল?

রায়: যখন আমি প্রথম দা গড অফ স্মল থিংস লিখা শুরু করলাম, আমি ভাবছিলাম যে যদি অ্যানির মত একটা ফিল্ম মেইন্সট্রিমের বাইরে হয়, তাইলে এই নভেল আরো বেশি মেইনস্ট্রিমের বাইরে যাবে। এইখানে এক ধরণের ফ্রিডম আছে। ইলেক্ট্রিক মুন -এর স্ক্রিনপ্লে লিখার জন্য কিছু টাকা ছিল, কারণ কন্ট্রাক্ট পাউন্ডে ছিল, যেইটা সাইন করার পর রুপির দাম খুব নাইমা যায়। ইন্ডিয়াতে তখন এই পাউন্ডগুলা ডাবল হয়া গেল। আমরা তো ভাবতেছিলাম, ওয়াও। পার্টি হবে। তো সময় বাড়ায়া বইয়ের উপর কাজ করার জন্য আমার কিছু টাকা ছিল। এই যে কেউ যদি কোন কিছু কেয়ার না করার সুযোগ পায়, এইটা এক ধরণের ফ্রিডম, জানেন তো?

এইটা লেখা অনেকটা সিক্রেট কাজ ছিল। তখন আমরা প্রদীপের বাপ-মার বাসার ছাদের দুই রুমে থাকতাম। আমার সাথে ওর ডিল ছিল যে সকাল থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমি একটা রুম লক করতে পারব। আমি কাউরে বলি নাই আমি কী লিখতেছিলাম। আমি নিজেই জানতাম না কী লিখতেছিলাম। আমি কিছু খুঁজতেছিলাম। আকাশী রঙের প্লাইমাউথ লেভেল ক্রসিঙয়ে থাইমা আছে এই চ্যাপ্টারটা লিখা শুরু করলাম। এইটা চলতেই থাকল। আমি তখন ভাবতাম, আমার বয়স আশি হয়া গেলেও আমি ওই ফাকিং লেভেল ক্রসিঙয়েই আটকায়া থাকব, ওইটা নিয়াই লিখতে থাকব।

আমার মনে হয় আমার ভিতরের আর্কিটেক্ট সবসময়ই একটা স্ট্রাকচার, একটা ফর্ম খুঁজতেছিল। আমিও খুঁজতেছিলাম কিন্তু জানতাম না কী খুঁজতেছিলাম। তারপর, লেখার দুই বছরের মাথায়, হঠাৎ কইরা জিনিসটা আমার কাছে ছবির মত কইরা আসলো। ইন ফ্যাক্ট, এক দিনে কেমনে কাহিনিটা আগাবে এইটা আমি আঁকছিলাম, যেখানে কাহিনির অন্য সুতাগুলা বছর বছর ধইরা আগাইত। এইটা আমার কাছে এক ধরণের রিদম, একটা অদৃশ্য ড্রামবিটের মত কইরা আসছিল যেইটা আমি মাপার চেষ্টা করতেছিলাম। তারপর একদিন আমি ওইটারে দেখলাম। স্ট্রাকচারটারে। একটা খামের পিঠে আঁইকা ফেললাম, একটা বোর্ডে পিন মাইরা আটকায়া দিলাম। অনেক শান্তি পাইছিলাম। লেভেল ক্রসিঙ খুললো আর গাড়িটা চইলা গেল।

ইন্টারভিউয়ার: এইটা তো বেশ ইন্টারেস্টিং- ছবি দিয়া লেখালেখি। আপনি কি এখনো লেখার ফর্ম আর স্ট্রাকচার নিয়া ভাবার সময় আপনার আর্কিটেকচারাল ট্রেইনিং কাজে লাগান? সবসময় তো লেখকদের কাজের আউটলাইন নিয়া শুনা যায়, কিন্তু এইটা শুনতে আলাদা লাগতেছে।

রায়: হ্যাঁ, এইটা আউটলাইনিংয়ের চেয়ে ডিজাইনিং বেশি। আমার চিন্তাভাবনা করার তরিকায় আর্কিটেকচার সবসময়ই ইম্পর্টেন্ট রোল প্লে করে।

… … …

ইন্টারভিউয়ার: আমি আপনারে কথাকলি নিয়া আরেকটু জিগায়া শেষ করতে চাইতেছিলাম। দা গড অফ স্মল থিংস-এ এস্থা আর রাহেল মন্দিরে যাওয়ার সময় কথাকলির একটা ইম্পর্ট্যান্ট রোল থাকে। এইটা স্টোরিটেলিং বা কাহিনি প্রেজেন্ট করার আরেকটা ফর্ম। আপনি এই ফর্মটা কেমনে পাইছেন?

রায়: আয়েমেনেমে কথাকলি ড্যান্সারদের একটা পুরা কমিউনিটি আছে। দা গড অফ স্মল থিংস-এ আমি যখন কথাকলির বর্ণনা দিতে গিয়া একজনের কথা ভাবতেছিলাম। আমি উনারে অনেক ছোটবেলা থেকেই চিনি। উনি কল্পনার বাইরে সুন্দর ছিলেন। উনি আমারে কইছিলেন, উনি যখন ছোট ছিলেন তখন থেকেই ড্যান্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু উনার ফ্যামিলি অনেক গরিব ছিল। উনার মা উনারে উস্তাদ, মানে গুরুর কাছে নিয়া গেছিলেন। ওইদিন বৃষ্টি পড়তেছিল, ছোট ছেলেটা আর উনার মা গুরুর বাসায় হাঁইটা গেছিলেন, ছাতা ছিল না দেইখা একটা মিষ্টি আলু গাছের পাতারে ছাতা বানাইছিলেন। গুরুদক্ষিণা, যেই গিফটটা গুরুরে উনার স্টুডেন্টরে উনার কেয়ারে নেয়ার জন্য, শিখানোর জন্য দেয়া হয়, ওইটা দেয়ার মতও টাকা ছিল না উনাদের। তো গুরু উনার মাকে আলাদা ডাকলেন, পাঁচ রুপি দিয়া কইলেন, যেইটা মেইবি কয়েক সেন্ট (পয়সা) হবে, আর কইলেন, এখন এইটাই আমারে গুরুদক্ষিণা হিসাবে দেন। আর এই দয়ার একটা সুইট অ্যাক্ট দিয়াই আমার দেখা সেরা একজন স্টোরিটেলারের এডুকেশন শুরু হইছিল।

আমার জন্য, যাই দেখি, যাই নিই, কাজে লাগাই, টার্গেট বানায়া ফেলি – যেইটা হইলো কাহিনি বলা। এইটা অদ্ভুত যে একজন লেখকের গ্রেটেস্ট ইনফ্লুয়েন্স নাচ থেকে আসছে। কিন্তু এইটা সত্যি। কথাকলি- কথা হইলো কাহিনি আর কলি হইলো নাটক। কথাকলি ড্যান্সারের শরীর কাহিনি বলে, আর শুধু বলেই না, কাহিনি হয়া যায়। মহা-শক্তিশালী রাজা থেকে কাহিনি এক মিনিটেই একটা ছোট, ইন্টিমেট ডিটেইলে বদলায়া যাইতে পারে। এইটা আকাশ হইতে পারে, রথ হইতে পারে, যুদ্ধ, প্রেমিক, হরিণ, জঙ্গলের বান্দর, ভয়ংকর রাজা, চক্রান্ত করা রানী হইতে পারে। আমি এইটা পছন্দ করি। শরীর দিয়া লেখা। আমার চামড়া, আমার চোখ, আমার চুল। আমার সবসময় মনে হয় কোনরকম হেভি ব্রিদিং ছাড়া এইরকম বড় ঝাঁপ দিতে পারার ক্ষমতাটাই হইলো স্টোরিটেলারের ফিটনেস। কোন এফোর্ট দেখানো লাগে না। শুধু বিশাল ব্যাপার থেকে ছোট ব্যাপারেই মুভ করার ক্ষমতাটা না, হিউমার থেকে দুঃখের ব্যাপার থেকে হার্টব্রেক থেকে অশ্লীলতাতে মুভ করা – সবকিছুই আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট। কখনো আপনি খুবই সুন্দর, হার্টটাচিং একটা লেখা দেখবেন, কিন্তু ওইটাতে কোন হিউমার নাই, কোন অশ্লীলতা নাই – আর এইটা আমার কাছে, আমি যা করি ওইটার একটা অংশ। এইটারে সবকিছু হইতে হবে – হিন্দুস্তানি ক্লাসিকাল মিউজিকের ভাষায়, এইটার এমন একটা রাগ হইতে হবে যেখানে সরগমের সব নোট থাকবে। শার্প আর ফ্ল্যাটসহ।

ইন্টারভিউয়ার: এই কন্টেক্সটে ফিটনেস একটা পাওয়ারফুল শব্দ। একজন ড্যান্সারের জন্য এইটার মধ্যে শারীরিক ফিটনেসও পড়ে।

রায়: হ্যাঁ, কিন্তু আমার কাছে এইটা লেখালেখির জন্যও একটা ভালো শব্দ। কারণ আপনারে মেটাফরিকালি অ্যাথলেটিক হইতে হবে, একজন ড্যান্সারের শরীরের উপর যে কন্ট্রোল রাখার যে ক্ষমতাটা আছে, ওইটা আপনার লাগবে। হাত-পাগুলারে সুন্দরভাবে, এফোর্টছাড়া উঠানোর ক্ষমতা। যেইখানে লেখার মধ্যে আপনি মাঝেমাঝে হেভি ব্রিদিংটা শুনতে পারবেন। আমি সবসময় ভাবি কিছু গ্রেট লেখক উনাদের ব্রিলিয়ান্সের জন্য পাঠকের মেমরিতে রয়া যান, যেইটা উনারা যেই ইউনিভার্স নিয়া লিখছেন সেই মেমরিরে ছাপায়া যায়। আর অন্যরা নিজেদের গ্রেটনেসের মেমরি রাইখা যান না, কিন্তু উনাদের লেখা দুনিয়ার মেমরি গাঁইথা দেন। আমি এইরকম লেখক হইতে চাই। আমি আমার লেখা, আমার বানানো দুনিয়ায় থাকতে চাই। আমি আমার ফিকশনে থাকতে চাই। আমি একটা কবরস্থানে থাকতে চাই, জান্নাত গেস্ট হাউজের একটা রুমে থাকতে চাই। নিজের একটা সমাধি নিয়া। আসলে, আমি অলরেডি থাকি।

The following two tabs change content below.

রপকথা নাওয়ার

জন্ম ২০ ডিসেম্বরে, শীতকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেছেন। রোমান্টিক ও হরর জনরার ইপাব পড়তে এবং মিম বানাইতে পছন্দ করেন। বড় মিনি, পাপোশ মিনি, ব্লুজ— এই তিন বিড়ালের মা।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য