Main menu

সহমরণ হতে সতীদাহ

১৮১৮—১৯, রামমোহন রায় দুটি বই পাবলিশ করেন: ক. সহমরণ বিষয় ।। প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ এবং খ. সহমরণ বিষয়ে ।। প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ। দশ বছর পরে, ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক (লর্ড: ১৮২৮–৩৫) বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহ নিষিদ্ধ করেন। এর আগে রামমোহন একটি আবেদন করছিলেন; সেই আবেদনে সাঁড়া দিয়েই সতীদাহ নিষিদ্ধ করা হয়; ফলে পরবর্তীকালের ইতিহাস সমাজসংস্কারে রামমোহনের কৃতিত্ব হিসাবেই হাজির করে এটিকে।

কিন্তু ঘটনা এমন সরল ছিলো না; সতীদাহ আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিলো; ১৮১৩ সালের ২০ এপ্রিল সতীদাহ নিষিদ্ধ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। একই সাথে সহমরণকে আইনীভাবে রিকগনাইজ করে। নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়, ১৬ বছরের নিচে বিধবা হলে, গর্ভবতী অবস্থায় হলে বা দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা বিধবা–এনারা সহমরণে যেতে পারবে না; এবং নেশাদ্রব্য সেবন বা জোরারোপের মাধ্যমে স্বামীর চিতায় বিধবাকে পোড়ানো যাবে না; সহমরণের একমাত্র বৈধ উপায় বিধবার উইল; বিধবার ইচ্ছা ভিন্ন কোন উপায় নাই আর।বিধবার ‘উইল’ জিনিসটা এইখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ; ইংরেজ তথা ইউরোপীয় অনুমান ছিলো সহমরণ হয় না আসলে, ওইটা সতীদাহ। অর্থাৎ বিধবা স্বেচ্ছায় চিতায় ওঠে না, বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো বাঁচা; বিধবার উপর থেকে বাইরের—পরিবারের, ধর্মবেত্তাদের, সমাজের চাপ সরানো গেলে বিধবারা মৃত স্বামীর চিতায় পুড়তে উঠবে না; এই কারণেই ইংরেজ-এর কাছে এটি সহমরণ না, সতীদাহ (বার্নিং উইডো বা সতী/Suttee)। সহমরণের সময়ে উলুধ্বনির মাধ্যমে জীবন্ত পুড়তে থাকা বিধবার আর্তচিৎকার গোপন করা হয় বলে ভাবতো ইংরেজরা। বা বিধবাকে দড়ি দিয়ে বেধে দেওয়া হতো যাতে আগুনের যন্ত্রণায় উঠে দৌঁড় দিতে না পারে, কেউ মুক্ত হয় গেলে যাতে ঠেকাতে পারে সেজন্য চারপাশে লাঠি নিয়ে লোক খাড়াইয়া থাকতো। পরবর্তীকালের বাঙালি ঐতিহাসিকরাও এই ধারনা থেকেই ইতিহাস লিখছেন; সহমরণ হিসাবে না হয়ে সতীদাহ হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারলো এই কারণে।

কিন্ত বিধবার উইল বিষয়ক এই ধারনা পুরাই ভুল প্রমাণিত হয় পরে। বাস্তবে দেখা গেলো ১৮১৩ সালের পরে সহমরণের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হইয়া উঠলো; দ্য হিন্দুজ: অ্যান অল্টারনেটিভ হিস্টি বইতে ওয়েন্ডি ডনিজার জানাইছেন, ১৮১৫ – ১৮১৮ তিনবছরে সহমরণের সংখ্যা ৮৩৯, আগের তিনবছরে এই সংখ্যা ছিলো ৩৭৮; দ্বিগুণেরও বেশি। সেসময়ে প্রকাশিত সমাচার দর্পণের পরিসংখ্যানের সাথে যদিও পুরো মেলে না ডনিজারের হিসাব; অবশ্য দুইটা পরিসংখ্যানের সময়কালে একটু ভিন্নতা আছে।

১৮১৮ সাল থেকে প্রকাশিত হওয়া সংবাদপত্রে স্বেচ্ছায় মৃত স্বামীর চিতায় আরোহণের মাধ্যমে হিন্দু বিধবাদের সহমরণের খবর পাওয়া যায় প্রচুর; এসব খবরে ম্যাজিস্ট্রেট বা দারোগার বিধবাকে বোঝানো, বাচ্চাদের কথা ভাবতে বলা ইত্যাদির মাধ্যমে বিধবাদের নিরস্ত করার চেষ্টার কথা জানা যায়; ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি পেতে দুইদিন লাগলে সেই দুইদিন দাহ না করে ঘরে রাখা এবং পরে বিধবার সহমরণ—এমন খবরও পাওয়া যায়।

১৮১৩ সালের নিষেধাজ্ঞায় আরো একটা ধারা ছিলো: হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত/ব্রাহ্মণ যেইখানে সহমরণ বারণ বলে মত দেবেন, সেখানেও সহমরণ হতে পারবে না। রামমোহন এই ধারায় বলা হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত/ব্রাহ্মণের মত দেবার কাজটিই করছেন আসলে। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, সহমরণ রোধে রামমোহনের সামাজিক/বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা শুরুর আগেই সহমরণ নিবারণে ইংরেজের সবিশেষ চেষ্টা চলছিলো; রামমোহন ইংরেজের প্রজেক্ট আগাইয়া নিচ্ছেন। এখনো আমরা বিভিন্ন সরকারি এজেন্ডা আগাইয়া নেবার জন্য বুদ্ধিজীবী ভাড়া করতে দেখি অবশ্য।

ইংরেজের জন্য সহমরণ বোঝা খুব সোজা ছিলো না; ইউরোপ জুড়ে ডাইনী নিধন তখনো খুবই টাটকা স্মৃতি; হিন্দু বিধবাদের তাঁরা ইউরোপের ‘ডাইনী’ হিসাবেই বুঝতো সম্ভবতঃ। সে কারণেই মনে হয় সহমরণ তাদের কাছে ‘উইডো বার্নিং’ বা পোড়াইয়া মারা বা ‘সতীদাহ’; স্বেচ্ছায় চিতায় যাওয়া আসলে কেবলি নেশাদ্রব্যের সাময়িক হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতা। ইংরেজের কাছে চড়ক পূজার ব্যাখ্যাও মনে হয় এমনই ছিলো। হিন্দু বিধবাদের বাঁচানো ইংরেজের বিশেষ এজেন্ডা হওয়া নেটিভের জীবনের প্রতি ইংরেজের মায়া হিসাবে দেখা মুশকিল; কেননা, আগে পরে নীল চাষ বা দুর্ভিক্ষে নেটিভরা মারা যাওয়ায় ইংরেজরা বিশেষ তাড়িত হয় নাই। ইউরোপের মধ্যযুগে ইংরেজরা যে আর নাই সেইটা প্রমাণ করার সহজ উপায় হিন্দু বিধবাদের বাঁচানো; নিজের প্রতি ইংরেজের নৈতিক সন্দেহ দূর করার সোজা রাস্তা এইটাই।

এদিকে রামমোহন বেশ ইন্টারেস্টিং আলোচনা করেন সহমরণ নিয়া; তাঁর আলোচনায় সহমরণের কতগুলি কারণ পাওয়া যায়। তিনি একে সহমরণই বলছেন, সতীদাহ না। হিন্দু বিধবা স্বেচ্ছায় স্বামীর চিতায় যাচ্ছে, তাঁর মতে হিন্দু ধর্মের মাননীয় শাস্ত্রগুলি সহমরণের বিপক্ষে; হিন্দু বিধবাদের বরং ব্রহ্মচর্যে বাকি জীবন কাটাতে হবে। যুক্তি দিচ্ছেন তিনি যে, সহমরণ লোভের কাজ, ব্রহ্মচর্য ত্যাগের; স্বর্গে স্বামীর সঙ্গ পাবার লোভে বিধবা সহমরণে যাচ্ছে; এবং এটি আত্মহত্যা; শাস্ত্রে আত্মহত্যা পাপ।

রামমোহনের আরেকটা অকাট্য যুক্তি হলো—সহমরণে নির্বাণ লাভ হয় না নারীর; নির্বাণ কী? এইটা বৌদ্ধধর্মের নির্বাণ না ঠিক; এইটা হলো ‘যোনী’ থেকে মুক্তি লাভ। স্বামীর চিতায় মরলে স্বর্গে স্বামীসুখ পাবে ঠিক, কিন্তু তাতে করে পরজন্মে আবার নারীজন্মই হবে; কেননা সহমরণে নির্বাণ তথা ‘যোনী’ থেকে মুক্তির কোন বিধান নাই শাস্ত্রে। ‘যোনী’ থেকে মুক্তির জন্য নারীকে কঠিন ব্রহ্মচর্যে বিধবাজীবন পার করতে হবে। অর্থাৎ রামমোহন অভিশপ্ত নারীজন্ম থেকে মুক্তির জন্য নারীকে সহমরণে যাইতে মানা করছেন। হাউ ইন্টারেস্টিং!

১৯৩২ (আশ্বিন ১৩৩৯) সালে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা ।। প্রথম খণ্ড’ প্রকাশিত হয়। এই বইতে প্রধানতঃ মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুরের মিশনারি থেকে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত ‘সমাচার দর্পণ (১৮১৮—১৮৩০)’ থেকে শিক্ষা, সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য বিষয়ের সংবাদগুলি সংকলন করেন সম্পাদক। ‘সমাচার দর্পণ’-এ সহমরণ নিয়ে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, মার্শম্যান সম্পাদক হলেও পত্রিকার খবর লেখালেখির কাজ করতেন হিন্দু পণ্ডিতরা। শুরুতে বলা কয়েকটা বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে হিন্দু পণ্ডিতদের এই ভূমিকা থেকে। যেমন, সহমরণ বিষয়ের খবরগুলি প্রায় সবই বিধবাদের স্বেচ্ছায় স্বামীর চিতায় যাওয়ার বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের নিরস্ত করার নানাবিধ চেষ্টার পরেও বিধবারা স্বামীর চিতায় যাচ্ছেন খবরগুলিতে। কোন জোরাজুরি বা নেশাদ্রব্য খাওয়ানো হচ্ছে না। মৃত ব্রাহ্মণের ৩২ বউয়ের মধ্যে চারজন একসাথে অভিন্ন স্বামীর চিতায় মরছেন—এমন খবরও আছে।

সমাচার দর্পণে প্রকাশিত সহমরণের খবরগুলি সহমরণকে উৎসাহিত করতো; ধর্ম ও নারীর জয়গানের ভাব আছে এগুলিতে। অনুমান করি, খবরগুলি ছিলো ১৮১৩ সালের সহমরণ বিষয়ক আইনের প্রতিক্রিয়া; সে হিসাবে বলা যায়, হিন্দু বিধবারাই ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের প্রথম দিককার শহিদ। সহমরণের খবরগুলিতে সম্ভবতঃ ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদ বিকশিত হবার কিছু লক্ষণও পাওয়া যাবে; অর্থাৎ সহমরণই শুরুর দিককার জাতীয়তাবাদী তৎপরতা! এর বাইরে সহমরণের পক্ষে-বিপক্ষে দুয়েকটা চিঠিও প্রকাশিত হইছিলো। পক্ষের একটি চিঠিতে রামমোহনকে অহিন্দু হিসাবে ইঙ্গিত করা হচ্ছে; রামমোহন বৈষ্ণব কুলোদ্ভূত বলে তাঁর মতামত হিন্দুদের বেলায় অপ্রযোজ্য বলে দাবি করা হচ্ছে। একদিকে সম্পাদক মার্শম্যান, অন্যদিকে হিন্দু পণ্ডিত—এইভাবে সহমরণের বিপক্ষ-পক্ষে ভাগাভাগি ছিলো সম্ভবতঃ। খবরগুলির আরেকটা লক্ষণীয় দিক ছিলো; সহমরণের সবগুলিই মোটামুটি ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণীদের খবর। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সহমরণের কোন খবর প্রকাশিত হয় নাই।

১৮২৯ সালে ‘সতীদাহ’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পরে রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সহ কোলকাতার চার বিশিষ্ট নাগরিক উইলিয়াম বেন্টিংক-এর সাথে দেখা করার খবরও প্রকাশিত হইছিলো। নিষেধাজ্ঞার পরে ইংল্যন্ডে আপীল করার জন্য সভা করার খবর পাওয়া যাচ্ছে সমাচার দর্পণে। আরো জানা যায়, আপীল করার পরামর্শও লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক-এর; তিনি পত্রিকা মারফত জানান যে, এ বিষয়ে কেউ আপীল করলে তিনি সানন্দে ইংল্যন্ডে পৌঁছাবেন সেটি।

এখানে সমাচার দর্পণ থেকে সহমরণের কিছু খবর এবং একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হলো। ইউরোপীয়দের আঁকা সহমরণের বহু পেইন্টিং আছে; প্রথম পেইন্টিং পাওয়া যায় ডাচ প্রোটেস্টান্ট বণিক Jan Huyghen van Linschoten (১৫৬৩–১৬১১)-এর ১৫৯৬ সালে প্রকাশিত Itinerario: Voyage ofte Schipvaert van Jan Huygen van Linschoten naer Dost ofte portugaels Indien বইতে। এই ছবিতে সহমরণকে একটি উৎসব হিসাবে আঁকা দেখা যাচ্ছে। এইটাসহ সহমরণের/সতীদাহের কিছু পেইন্টিং প্রকাশ করা হলো।
—————–
সমাচার দর্পণে প্রকাশিত সহমরণ বিষয়ক খবর

২৭ মার্চ ১৮১৯ ।। ১৫ চৈত্র ১২২৫

সহমরণ। শহর কলিকাতার এক ব্রাহ্মণ মরিয়াছেন অল্পবয়স্কা তাহার স্ত্রী সহগমন করিয়াছে আমরা শুনিয়াছি যে দুই দিনপর্য্যন্ত আপন মৃত স্বামীকে রাখিয়া তৃতীয় দিন সহগমন করিয়াছে এত বিলম্বে সহগমন করিতে পূর্ব্বে শুনি নাই। তাহার কারণ এই স্ত্রীর বয়স বিবেচনা করাতে এত কাল বিলম্ব হইল। কথক বৎসর হইল শ্রীশ্রীযুত নানাদেশীয় মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতেরদের নিকটে হিন্দুশাস্ত্রানুসারে সহগমন বিষয়ে যথার্থ ব্যবস্থা লইয়া আজ্ঞা দিয়াছেন যে ষোড়শবর্ষন্যূন বয়স্কা কিম্বা গর্ভবতী কিম্বা যাহার অতিশিশু বালক থাকে সে স্ত্রী সহগমন করিতে পাইবেক না।
এবং হিন্দুশাস্ত্রে ইহাও কহে যে সহমরণাদিরুপ কর্ম্মে নির্ব্বাণ মুক্তি হইতে পারে না কিন্তু সুখ ভোগমাত্র হয়। অতএব হিন্দুশাস্ত্রের মতে নির্ব্বাণসাধন কর্ম্মেরি প্রশংসা করিয়াছেন।

অধিক সহমরণ বাঙ্গালা দেশে হয় পশ্চিম দেশে তাহার চতুর্থাংশও হয় না এবং বাঙ্গালার মধ্যে ও কলিকাতার কোট আপীলের অধীন জিলাতে অধিক হয় আরো হিন্দুস্থানে যত সহমরণ হয় তাহার সাত অংশের একাংশ কেবল জিলা হুগলিতে হয়।

৭ এপ্রিল ১৮২১ ।। ২৬ চৈত্র ১২২৭

সহমরণ।–গত মহাবারুণী যোগে উড়িষ্যা প্রদেশের অনেক লোক গঙ্গাস্নানে আসিয়াছিল তাহার মধ্যে মো বাঁশবাড়িয়া গ্রামে এক ব্যক্তি আপন স্ত্রী প্রভৃতি পরিজন সমেত রহিয়াছিল দৈবাৎ শনিবারে গঙ্গাস্নান করিয়া সেই রাত্রিতে তাহার পীড়া হইয়া প্রাণ ত্যাগ হইল। পরদিন রবিবার তাহার স্ত্রী সহমরণে যাইতে নিশ্চয় করিয়া ঐ মোকামে গঙ্গাতীরে চারিদিকে চারি হস্ত প্রমাণে এক কুণ্ড কাটাইল ও ঐ কুণ্ড কাষ্ঠ ও চন্দন কাষ্ঠ ও ধুনা ও আর ২ সুগন্ধি মসালাতে পূর্ণ করিয়া তাহাতে অগ্নি সংযোগ করিল। পরে ঐ কুণ্ডের অগ্নি অত্যন্ত প্রজ্বলিত হইল দেখিয়া আপন মৃত স্বামির শরীর ঐ প্রজ্বলৎ কুণ্ডে ণিক্ষেপ করিল। অনন্তর ঐ স্ত্রী গঙ্গাস্নান করিয়া ও সূর্য্যার্ঘ্য দিয়া এক হাঁড়ী ঘৃত কক্ষদেশে করিয়া ঐ অগ্নিকুণ্ডে ঝম্প দিয়া পড়িল এবং তক্ষণাৎ ভস্মসাৎ হইল তাহার আত্মীয় লোকেরা হরিধ্বনি করিতে লাগিল।
এতাদৃশ সহমরণ ব্যবহার এতদ্দেশে নাই তৎপ্রযুক্ত বিশেষ করিয়া লিখা গেল।

২৩ মার্চ ১৮২২ ।। ১১ চৈত্র ১২২৮

সহমরণ।–কলিকাতার অন্তঃপাতি কোঠের সাহেবেরা সহমরণ বিষয়ক এই রিপোর্ট শ্রীশ্রীযুত বড় সাহেবের নিকটে পাঠাইয়াছিলেন।

সন

১৮১৫ সাল ১৮১৬ সাল ১৮১৭ সাল সন
কলিকাতার অন্তঃপাতি ২৫৩ ২৮৯ ৪৪১
ঢাকা ৩১ ২৪ ৫২
মুরশেদাবাদ ১১ ২২ ৪২
পাটনা ২০ ২৯ ৩৯
বানারস ৪৮ ৬৫ ১০৩
বরেলী ১৭ ১৩ ১৯
৩৮০ ৪৪২ ৬৯৬

১৫ নভেম্বর ১৮২৩ ।। ৯ অগ্রহায়ণ ১২৩০

সহমরণ ।।– মোং কোন নগর গ্রামের কমলাকান্ত চট্টোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি কুলীন ব্রাহ্মণ সর্ব্ব সুদ্ধা বত্রিশ বিবাহ করিয়াছিলেন তাহার মধ্যে তাহার জীবদবস্থাতে দশ স্ত্রী লোকান্তরগতা হইয়াছিল বাইশ স্ত্রী বর্ত্তমানা ছিল। তাহারদের মধ্যে কেবল দুই স্ত্রী তাহার নিজ বাটীতে ছিল আর সকলে স্ব ২ পিত্রালয়ে ছিল। ২১ কার্ত্তিক বুধবার ঐ চট্টোপাধ্যায় পরলোক প্রাপ্ত হইলে তাহার সকল শ্বশুর বাটীতে অতি ত্বরায় তাহার মৃত্যু সম্বাদ পাঠান গেল তাহাতে কলিকাতার এক স্ত্রী ও বাঁসবাড়ীয়ার এক স্ত্রী নিকটস্থা দুই স্ত্রী এই চারিজন সহমরণোদ্যতা হইল। পরে সেখানকার দারোগা এই বিষয় সদর রিপোর্ট করিয়া সদর হইতে হুকুম আনাইতে দুই দিবস গত হইল পরে ২৩ কার্ত্তিক শুক্রবার তৃতীয় দিবসের মধ্যাহ্নকালে হুকুম আইলে ঐ চারি জন পতিব্রতা সহমরণ করিয়াছে। এই স্ত্রীরদের বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসর অবধি পঞ্চাশ বৎসর পর্য্যন্ত হইবেক।

২৭ এপ্রিল ১৮২২ ।। ১৬ বৈশাখ ১২২৯

সহগমন।।–ওলাওঠা রোগে অনেক বাঙ্গালি মরিয়াছে তাহার মধ্যে ঐ [গয়া] মোকামে এক ব্রাহ্মণ মরিলে তাহার স্ত্রী সহগমনে উদ্যতা হইল তাহাতে গয়ার জজ শ্রীযুত মেং কিরিষ্টফর স্মিথ সাহেব গিয়া তাহাকে অনেক নিষেধ করিলেন তাহাতে সে ব্রাহ্মণী আপন অঙ্গুলী অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া পরীক্ষা দেখাইল তাহা দেখিয়া জজ সাহেব আজ্ঞা দিলেন যে তোমার যে ইচ্ছা তাহা করহ। পরে সে স্ত্রী সহগমন করিল।

১৩ নভেম্বর ১৮২৪ ।। ২৯ কার্ত্তিক ১২৩১

সহগমন।–লখিপুরনিবাসি আনন্দচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়নামক এক জন প্রধান লোক রোগবিশেষে আপন আয়ুঃশেষ জানিয়া কালীঘাটে আগমনপূর্ব্বক সুরধুনী তীরে তিন দিবস বাস করিয়া সাময়িক বিহিত ক্রিয়ায় কালক্ষেপণানন্তর ১৭ কার্ত্তিক সোমবার রাত্রিকালে প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন। এঁহার বয়ঃক্রম ৬৭ বৎসর হইয়াছিল তাঁহার স্ধ্বী স্ত্রী স্বামির মরণে মৃত্যু শ্রেয়ো জানিয়া তৎসহগামিনী হইয়াছেন। সং কৌং

২৭ আগষ্ট ১৮২৪ ।। ১৩ ভাদ্র ১২৩২

সহগমন।।–সিমল্যানিবাসি ফকিরচন্দ্র বসু ১ ভাদ্র সোমবার ওলাওঠারোগে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছেন। ইহার বয়ঃক্রম প্রায় ৩৬ বৎসর হইয়াছিলো তাঁহার সাধ্বী স্ত্রী শ্যামবাজারনিবাসি শ্রীমদনমোহন সেনের কন্যা তাঁহার বয়ঃক্রম ন্যূনাতিরেক ২২ বৎসর হইবেক এবং সন্তান হয় নাই। ঐ পতিব্রতা স্ত্রী রাজাজ্ঞানুরোধে দুই দিবস অপেক্ষা করিয়া বুধবার প্রাতে সুরের বাজারের নিকট সুরধুনী তীরে স্বামিশবসহ জ্বলচ্চিতারোহণপূর্ব্বক ইহলোক পরিত্যাগ পুরঃসর পরলোক গমন করিয়াছে।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
রক মনু

রক মনু

কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য