Main menu

নেমকহালাল

১৯৭১ সালে ভারতে পেরায় এক কোটি বাংলাদেশি রিফিউজি গেছিল। এই হিসাব ইন্ডিয়ার দেওয়া। জাতিসংঘের কাছে কেবল ক্যাম্পের রিফিউজিদের হিসাব আছে, সেই হিসাবও ইন্ডিয়া দিলেও তাদের রেজিস্টেশন হইছে, নাম্বারটা হইলো পেরায় ৬৫ লাখ। বাকিরা আত্তীয়-দোস্ত বা পরিচিতদের ফেমিলির লগে আছিল বইলা জানাইছে ইন্ডিয়া। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ আর্মিরে টেনিং দিছে ইন্ডিয়া, গুলি-বন্দুক দিছে, যুদ্ধও করছে বাংলাদেশের পক্ষে। আজকেও বাংলাদেশে তাই অনেকেই ইন্ডিয়ার সেই নেমকের কথা মনে করেন, শুকরিয়া আদায় করেন। ইন্ডিয়ার লগে বর্ডারে, ইন্ডিয়ার বানানো কাটাতারে যখন ফেলানির লাশ ঝুইলা থাকে, তখনো সেই নেমকের কথা মনে করাইয়া দেন অনেকেই, আমাদের রাষ্ট্রের বাহিনিগুলাও হয়তো সেই নেমকের আছরেই হাসামুখে বর্ডারে ইন্ডিয়ার গুলি বা পিটানিতে মরা লাশগুলা লইয়া আসেন, মরা বাংলাদেশির লাশের লগে সেই নেমকহালালির ফটোসেশন আমরা দেখি।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

নেমকহালালির এই পাচালি বা ন্যারেটিভ যারা জিকির করেন, তারা অনেকেই রিফিউজি আছিল তখন; কিন্তু চোখা নজরে চাইলে তাদের কেলাস বোঝা যাইতে পারে। উপরের হিসাবে দেখেন, ৩৫ লাখ আছিল ক্যাম্পের বাইরে, আত্তীয়-দোস্ত-পরিচিতের ফেমিলির লগে; আন্দাজ করা যাইতে পারে যে, এরা বড়লোক বা সেকেন্ড কেলাসের লোক হবেন যাদের দোস্ত-পরিচিতরা এই মেহমানদারি করার তাকত রাখে–মনে এবং দৌলতে। যাদের তেমন দোস্ত-পরিচিত নাই, গরিব, তারা ক্যাম্পে আছিল। ক্যাম্পে থাকা এই বাংলাদেশিরা কেমন আছিল? আজকের রোহিংগা বা ‘বিহারি’ ক্যাম্পের দশা ভাবতে পারেন সেইটা বুঝতে, কেবল রোহিংগাদের কথা ভাবাই ভালো, কারণ, ‘বিহারি’রা বহু বছরে হয়তো অন্তত মনে মনে অনেকখানি সামলাইয়া লইছে।

রোহিংগাদের লইয়া বাংলাদেশের অনেকেই আজেবাজে কথা কন পেরায়ই, কিন্তু বাস্তবে রোহিংগাদের কারণে বাংলাদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢুকতেছে, তাদের খাওয়ায় জাতিসংঘ, হাজার হাজার বাংলাদেশি অনেক টাকা বেতনের চাকরি পাইছে, পানোয়ার (যারে কক্সবাজার হিসাবে চেনেন আর কি 🙂 ) লোকাল ইকোনমিতে অনেক পয়সা ঢুকছে।

লগে আরো কিছু পয়েন্ট ভাবার আছে। অক্টোবরে ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখে সরকার, বছরের আরেক সময় আরো ৬৫ দিন। জাইল্লাদের আইডি কার্ড দিছে, মাছ ধরা যখন বন্ধ তখন ঐ কার্ড দেইখা জাইল্লাদের ৩০ বা ৪০ কেজি কইরা চাউল দেয় ২/৩ বার; মানে দেবার কথা, কিন্তু জাইল্লাদের লগে কথা কইয়া দেখছি, পেরায় কেউই ঐ চাউলের পুরাটা পায় নাই, এবং বহু জাইল্লা কার্ডই পায় নাই; মেম্বার-চেয়ারম্যানেরা নিজেদের লোকজনের নামে সেই সব কার্ড দিয়া দিছে। এই যদি হয় বাংলাদেশি জাইল্লাদের দশা, তাইলে ক্যাম্পের রিলিফ পুরাটা পাবার সম্ভাবনা দেখেন? কই যায় রিলিফের সেই ভাগ? এ তো গেল আন্দাজ বা হাইপোথিসিস, লোকালদের জ্বালায় আরামে কাম করা মুশকিল হয় জাতিসংঘের, রিলিফের ভাগ চায় লোকালরা, সেই মুশকিল আছান করতে রোহিংগাদের রিলিফের পয়সায় কক্সবাজারের এক কলেজে দেখলাম বাস দিছে জাতিসংঘ! রোহিংগাদের ব্যাপারে আরো নালিশ আছে, এমনকি দেশের এলিট এনভায়রনমেন্টালিস্টরা নালিশ করেন–৫০০০ একর জংগল উজাড় হইছে ক্যাম্প বানাইতে। এই এনারাই সুন্দরবনের পাশে কয়লার কারেন্ট, এলএনজি কারখানা বা শালবনে কত কত ফ্যাক্টরি লইয়া ততো মাথা ঘামায় না; এমনকি কক্সবাজারে এখন যেই রেললাইনের কাম চলতেছে তাতেই অন্তত ৫০০০ একর জংগল সাফ করতে হবে! তাইলে কষ্টে আছে আসলে রিফিউজিরাই, এখনকার রোহিংগা বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশিরা!

তাইলে এই রোহিংগা-ঘিন্নার গোড়া কই? এইটারেই কয় জেনোফোবিয়া। এবং এই জিনিস ১৯৭১ সালে ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি রিফিউজিরা সমানই ফেস করছেন, স্পেশালি যারা ক্যাম্পে থাকতেন! রিফিউজিদের লগে মারামারি হইছে লোকালদের; জাতিসংঘের দেওয়া রিলিফের পুরাটা না দিয়া ইন্ডিয়ান অফিশিয়ালরা বাকিটা খাইছে; পয়সার অভাবে পুরাটা না পাওয়া রিলিফেরই একটা ভাগ কম দামে বেচতে হইছে, সেইটা দিয়া বাড়তি ব্যবসা হইছে ইন্ডিয়ার ফড়িয়াদের। মানুষ কলেরায় মরছে, পুশটির অভাবে মরছে; রিলিফের কামে ২০০+ ট্রাক কিনছিল ইউনিসেফ, ইন্ডিয়ার সরকার সেইগুলা কলিকাতার রাস্তায় ফালাইয়া রাখছে, রাস্তায়ই নামায় নাই। জাতিসংঘের বা বিদেশিদের সব ক্যাম্পে যাইতে দিতো না ইন্ডিয়া, কেবল সল্টলেকের ক্যাম্পেই যাইতে পারতো বিদেশিরা। ওয়েস্ট বেংগলের সরকার সেন্টাল সরকারকে চাপ দিছে যাতে রিফিউজিদের অন্য সব রাজ্যে সরাইয়া নেওয়া হয়, অন্য কোন স্টেট রিফিউজি লইতে রাজি হয় নাই। ১৬ ডিসেম্বরের পরেই ইন্দিরা ফরমান জারি করছেন–১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির ভিতরেই এই ১ কোটি বাংলাদেশির ইন্ডিয়া ছাড়তে হবে। এবং জানুয়ারির ভিতরেই বেশিরভাগ রিফিউজি দেশে ফিরছে। ক্যাম্পে থাকা এই রিফুজিরা কতটা ইন্ডিয়ার নেমক খাইছে তাইলে, যেই ইন্ডিয়া রিফুজিদের পাওয়া খয়রাতের পয়সাতেও আজকের বাংলাদেশিদের মতোই কামড় দিছে? তাদের মনে কতটা নেমকহালালির ভাবনা পয়দা হইতে পারে এমন দশায়? তাইলে হিসাব কইরা মনে হইতেছে, ক্যাম্পের বাইরে থাকা ঐ ৩৫ লাখ বাংলাদেশি দোস্ত-আত্তীয়ের কাছে তাদের পার্সোনাল নেমকহালালির দায় চাপাইতে চাইতেছেন পুরা বাংলাদেশের কান্ধে (আজকের তসলিমারে খেয়াল করেন)।

কিন্তু এই পুরা হিসাবটার আরো কয়েকটা দিক আছে। রোহিংগা ইস্যুর লগে আরো কিছু ব্যাপারে তুলনা বুঝতে সুবিধা হইতে পারে। রোহিংগাদের থাকতে দেবার পিছে বাংলাদেশের কোন পলিটিক্যাল গোল নাই, মায়ানমার ভাংগায় বাংলাদেশের মন নাই; ইন্ডিয়া সাফ সাফ পলিটিক্যাল এজেন্ডা আছিল; রোহিংগারা যুগ যুগ ধইরা থাকতেছে বাংলাদেশে, ফেরার আশা করাই কঠিন; তুলনায় বাংলাদেশ ইস্যু অনেক কিলিয়ার-কাট আছিল। ৭০ সালে পাকিস্তানের ইলেকশন সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে যেই পপুলার সাপোর্ট যোগাইছিল, রোহিংগাদের তেমন সুবিধা নাই। বাংলাদেশে যুদ্ধ কইরা পাকিস্তান যে হারবেই, এবং সেইটা কয়েক মাসেই, সেইটা বহু কারণেই ভাবা গেছিল। সবচে বড় কারণ হইলো, বাংলাদেশে ছাপলাই পাইতে পাক আর্মির ইন্ডিয়া পার হইয়া আইতে হইতেছে! আরেকটা বড় কারণ হইলো, ঐ ইলেকশনের ফলাফলের কারণেই বাংলাদেশের ফ্রিডমওয়ার খুবই জাস্টিফাইড ভাবতে বাধ্য সারা দুনিয়া, বাংলাদেশ সরকার খুবই হালাল সরকার, হামলাটাও ২৫ মার্চ রাইতে আগ বাড়াইয়া করছিল পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশ সরকারের দাওয়াতে বাংলাদেশে যুদ্ধ করতে আইতেছে ইন্ডিয়া, দখলদার খেদাইতে, এমন এক অকাট্য লেভারেজ আছিল ইন্ডিয়ার। বাংলাদেশের ৭০/৮০% মানুষ যদি ময়দানে বা মনে যুদ্ধে নামে, লগে ইন্ডিয়া নামে ময়দানে, তাইলে তো পাকিস্তানের না হাইরা উপায় থাকে না! এইসব দিক দিয়া হিসাব কইরা দেখেন, রোহিংগাদের মেহমান হিসাবে লওয়া ১৯৭১ সালে ইন্ডিয়ায় বাংলাদেশিদের মেহমান হবার তুলনায় অনেক বড় ঘটনা! পলিটিক্যাল ইনটেনশন বাদে ইন্ডিয়া বাংলাদেশিদের কেমনে মেহমানদারি করে সেইটা আজকের বর্ডারেই মালুম হইতে পারে; এমনকি এনআরসি’র নামে নিজের নাগরিকদেরই কেমনে খেদাইয়া দিতেছে, সেইটা মাথায় রাখলে পরদেশিদের কেমনে মেজবানি করতে পারে, আন্দাজ করা কঠিন হইতেছে?

আখেরে আরো পিছের কিছু ইতিহাস ঘাটা যাইতে পারে। ঢাকার আরেক নাম জাহাংগিরনগর, জানেনই তো। এই জাহাংগির হইলেন আনারকলির সেলিম, দিল্লির মোগল আকবরের পোলা। আকবরের আমলেই বাংলার গোলামির শুরু, বাংলার সুলতানি আমলের পরে। এবং এই আকবরের আমলেই দিল্লির এখনকার শান-শওকতের শুরু। দিল্লির যতো মোগল ইমারত আছে, সবগুলাতেই আজকের বাংলাদেশের পয়সা আছে এবং ভারতের অযুতনিযুত টুরিস্ট কামাইয়ের অনেকখানিই সেইসব মোগল ইমারতের বদৌলতে; তাজমহলই তো একলাই ১০০০! বাংলাদেশের কাছে ইংল্যন্ডের ম্যানচেস্টার যা, দিল্লিও তাই, তুলনায় লাহোর-করাচি মাত্র ২৩ বছর! কেবল দিল্লিই না, মুর্শিদাবাদে বাংলাদেশের পয়সা গেছে, কলিকাতা শহর গইড়া উঠছে বাংলাদেশের পয়সায়। তার কত পার্সেন্ট খরচ হইছে গুলি-বন্দুকে? বৃটেনের কাছে যেমন পয়সা পায় বাংলাদেশ, দিল্লি/ইন্ডিয়ার কাছেও তারচে কম পায় না, বরং বেশিও হইতে পারে! আবারো তুলনা করেন রোহিংগা ইস্যুর লগে; বাংলায় কি আরাকানের পয়সা ঢুকছিল ইতিহাসের কখনো? উল্টা চিটাগাংয়ের কতক পয়সাই হয়তো আরাকান দরবারে গেছিল!

আর বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করা, পলিটিক্যাল ইনটেনশন বাদ দিলাম, ইন্ডিয়া তো এমনিতেই যুদ্ধবাজ, পাকিস্তানের লগে আরো কত যুদ্ধ করলো, শ্রিলংকায়ও তো যুদ্ধবাজি করছে, আজকের কাশ্মিরে? আরেকটা যুদ্ধের মওকা বানাইয়া দেবার কারণে বরং বাংলাদেশেরই শুকরিয়া আদায় করার কথা ইন্ডিয়ার!

নেমকহালালির কথা কইয়া তাইলে আসলে কে কি কন? আরো বেশি না কইলেন কি কি? ইন্ডিয়া নিজের আখের গুছাইতে বাংলাদেশের জন্য ৯ মাস যা করছে, বাংলাদেশ সেইটা যুগ যুগ ধইরা করতেছে হুদাই, রোহিংগাদের কোন পাওনা নাই বাংলাদেশে, আর ইন্ডিয়ার কাছে আগেও অযুতনিযুত পয়সা পাইতাম আমরা, এখনো পাই, বাংলাদেশের পয়সা দিয়াই ইন্ডিয়া ব্যবসা কইরা খাইতেছে আজকেও, আসল তো দূর, সুদও দেয় না এক পয়সা! উল্টা রেমিটেন্সের হিসাবে ৩ নম্বরেই বাংলাদেশের নাম লইতে হয় ইন্ডিয়ার।

[নোট: ১৯৭১ সালের অক্টোবরে নিউইয়ক টাইমসের এই আর্টিকেলে তখনকার রিফুজি ইস্যু বুঝতে পারেন কিছুটা: https://www.nytimes.com/…/bengali-refugees-stirring-strife-… ]

 

১০ অক্টোবর ২০১৯

The following two tabs change content below.

রক মনু

কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।

Latest posts by রক মনু (see all)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য