Main menu

তবু ইতিহাস যেন রিভেঞ্জ শিখাইতে না পারে আমাদের

“কার্য কার্য, সরাসরি কার্য”–এইটা হইলো ‘মাতৃভাষা’য় আন্দোলন করার শ্লোগান, “অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন”-এর তরজমা করলাম।

বাংলাদেশে মায়ের ভাষায় লেখাপড়া, বিজ্ঞান, আর্ট-কালচার করার মতলব/মানে এইটাই। ১৯ সেঞ্চুরির কোলকাতার তরজমা চিন্তার ভিতর এমন মায়ের ভাষার গোড়া। সেই আবার আসছে বাংলা ভাষার রেসিস্ট ডেফিনিশন থেকে।

অনুমানটা হইলো, বাংলা সংস্কৃতের মাইয়া, তাই বনেদি। রেসিস্ট চিন্তা বাংলার মাঝে মুন্ডা বা সাওতালের বদলে সংস্কৃতের জিন পাইতে চাইছে, বাঙালিরে তাইলে আর্য জাতি (এরিয়ান) হিসাবে দাবি করা যায়।

আর্য হিসাবে ইংরাজ খালাতো ভাই, কলোনাইজেশন আসলে তো আত্মীয়ের শাসন। আত্মীয়ের শাসনে থাইকা বিদ্যাবুদ্ধি বানাই, বাট আমরাও যেহেতু আর্য, বাংলা চর্চা করা দরকার তাই, আমাদের এরিয়ান ভাষা। তাই ইংরাজির তরজমা করতে হবে বাংলায়।

প্রোবলেম হইলো, ইংরাজির চিন্তা, ফিলোজফি, লিটারেচার, আর্ট, সায়েন্সের ডিসকোর্স তো বাংলায় নাই, বাংলায় না থাকা ভাবের ইংরাজি টার্মের তরজমা কেমনে করবেন? এই সওয়ালের জবাবেই সংস্কৃতের মাইয়া হিসাবে বাংলারে আবার হাজির করা হইছে। রেসিয়াল ইভোল্যুশনের ভাবনা দিয়া সাজানো হইছে বাংলার তরজমা।

এই এসেন্স থেকেই ‘কালচার’ ভাবনাটা বাংলায় ততো না থাকায় তরজমা করা হইছে ‘সংস্কৃতি’, ইভোল্যুশনের বাংলা বিবর্তন, এমন বেশুমার। তাই তরজমা বাংলায় কথা কওয়া সমাজ থেকে দূরে নিয়া গেছে বাংলা ভাষারে।

ওদিকে, কলোনাইজেশন যেহেতু আত্মীয়ের শাসন, তাইলে জাস্ট আগের তুর্কি-পারসিয়ান-মোঘল শাসনটা কি? বিদেশি শাসন, বিধর্মীও। কিন্তু বাংলা ভাষাটাই তো পয়দা হইছে ঐ বিদেশি শাসনের মাঝে! ফার্সি তাই বাংলার কোর একটা। কিন্তু এরিয়ান রেসিস্ট দেমাগ যেমন মুন্ডা শাওতালদের বহু শব্দ, লোয়ার ক্লাসে পয়দা হওয়া সংস্কৃত থেকে ট্রান্সফর্মড বহু শব্দ অনার্য/অসভ্য ভাইবা ফালাইয়া দিছে (নাইতে, কইতে, মুত, ধোন) ফার্সিরে ফালাইয়া দিতে চাইছে বিদেশি-বিধর্মী হিসাবে। এইখান থেকে কোলকাতার রেসিয়াল কারখানায় সংস্কৃত কলে শব্দ বানানো হইছে–বেশুমারের বদলে অজস্র–এমন চিন্তার লাইনে; সংস্কৃত গ্রামারের সন্ধি-সমাস প্লান্ট করা হইছে বাংলায়, নয়া শব্দ বানানো হইছে, সংস্কৃত থেকে আমদানি করা হইছে। এই দলের শব্দ হইলো, বীতশ্রদ্ধ, মাতৃভাষা, আঞ্চলিক, প্রশিক্ষণ, প্রশাসন, কেন্দ্র…এমন বেশুমার।

রেসিয়াল ভাবনা না থাকলে মুন্ডা-শাওতাল-ফার্সি ফেলার দরকার হইতো না, ইংরাজির সংস্কৃত তরজমাও লাগতো না, লোয়ার ক্লাসের মতোই সিধা ড্রাইভার, লেবার, হেল্পার, হেডলাইট, ডাইরেক্ট নেওয়া যাইতো…

এইসব ইস্যুরে মনে হইতে পারে ছোটখাট ব্যাপার; কিন্তু এই ব্যাপারের লগে ডাইরেক্ট রিলেশন আছে ২০ সেঞ্চুরির কম্যুনাল রায়টের; এইখানে আরেকটা মজার ব্যাপার আছে; ভারত ভাগ/দেশ ভাগ বইলা কোলকাতায় যেই আহাজারিটা শোনেন সেই ভারতরে ওনারা ধরেন আর্য ভারত হিসাবে যদিও ম্যাপটা আসলে মোঘল–আকবরের ভারত আসলে :), ইতিহাসের কিছু লোক এইটা ক্লিয়ার করছেন!

হিস্ট্রিতে এমন আরেকটা ঘটনা আছে চীনে। আজকের চীন কইলে যেই ম্যাপটা ভাসে মনে, চীন যেই ম্যাপটারে আপহোল্ড করে, সেই চীন কিন্তু কোন চীনা রাজা/এম্পারার বানায় নাই! চীনের এই ম্যাপ/টেরিটরি আসলে একজন মোঙ্গলের বানানো; কুবলাই খান সেই মোঙ্গল, উনি পুরা চীন দখল কইরা নিজের এম্পায়্যার বানাইছিলেন, বিদেশি! চীনের আজকের কালচারের ম্যাপিংটাও আসলে ওনার টাইমেই বানানো! ভারতেও একই দশা, ভারতের প্রাইড যেই বলিউড, সেই বলিউডের কালচার ভাবনা–গান-বাজনা, ডান্স, শায়েরি, সুফিয়ানা, ইশক–এগুলি তো মোঘল আকবরের দরবারের ভাবের ছবি!

যাই হোক, কইতেছিলাম, ভারত ভাগ লইয়া আর্য-সংস্কৃত-হিন্দু অন্নদাশংকর যেই আহাজারি করেন, সেই ভারতটা মোঘলের বানানো, ইংরাজ নামের আত্মীয়ের শাসনে যেই মোঘল বিদেশি-বিধর্মী হইছেন! এইখানে কম্যুনাল রায়টের গোড়া আছে একটা। ইংরাজের শাসনে থাকতে থাকতে যেই নেশনালিজমের পয়দা সেইটা ভারতে যারা থাকেন তাগো সবাইরে ভারতীয় মানতে রাজি হয় নাই, বাংলা ভাষারে ধুইয়া মেরামত করাটা সেই ভাবনার এক্সিকিউশন, আর অনার্য হিন্দুরা তো চাকর!

এই ভাবনাটা কোলকাতায় পয়দা হইছে, বাংলার ঐ ধোলাইও; আপনের মনে হইতে পারে রায়ট বা ভারত ভাগ তো কংগ্রেস আর মুসলীম লীগের মামলা, কোনটাই বাংলার না, কোলকাতারও না! বাট কংগ্রেস আসলে কোলকাতারই মাল, বঙ্কিম কংগ্রেসের আসল প্রোফেট; বাস্তবে যদিও নিজেরে হিন্দু কমিউনিটির মেম্বার মাইনা নিয়া বঙ্কিম যেই লিবারাল ভাবনার লোক আছিলেন, কংগ্রেসে সেইটা আছিল না পুরা, বরং রঠার পাতলা চিন্তা আর চোরা কম্যুনাল চিন্তার লগে কংগ্রেসের মেলে ভালো, মানবতাবাদ আর সেক্যুলারিজমের পর্দার নিচে ব্রাহ্ম হিন্দু, উপনিষদের স্পিরিচুয়ালিটি আর ভিক্টোরিয় এথিকসের মিশেল; বঙ্কিম হিন্দু আছিলেন জনমের ভিতর দিয়াই, স্যুডো ‘মানব’ সাজেন নাই; রঠা-গান্ধী তাই বঙ্কিম না কোনভাবেই।

তো, কংগ্রেস কোলকাতার মনের পলিটিক্যাল পার্টি, এইটা আর কোলকাতার বাংলাঅলাদের দখলে থাকে নাই; কারণ? মে বি, রেসিস্ট মগজে বানানো বাংলা ভাষার লগে জনতার কানেকশন রাখা যায় নাই, হিন্দির সেই মুশকিল আছিল না, আবার, কোলকাতার মন হইলো কেরানি মন, পলিটিক্সের মতো বড়ো কাম তো কেরানির মন ততো পারে না! হিন্দি-উর্দু উকিলেরা পলিলিক্স করছে, বাংলার/কোলকাতার উকিলেরা রামায়ণ-মহাভারত তরজমা করছে হয়তো, দুই-চারটা নভেল লিখছে, জমিদারের নায়েব হইছে, সরকারি চাকরি করছে, এনজিও বানাইছে।

এই যদি কংগ্রেস হয় মুসলীম লীগ কি? আর যা যা হৌক, মুসলীগ লীগের চিন্তার/একটিভিজমের বেশির ভাগ কংগ্রেসের রিঅ্যাকশনই! বাংলার ধোলাই যেমন কোলকাতার হিন্দুরা করছেন, তার রিভেঞ্জ নিছেন মোসলমানরা আরেকটা ধোলাই কইরা, ওরা এরিয়ান হইছেন, এরা হইছেন পারসিয়ান/আশরাফ; সো, দুই তরফেই ভিকটিম হইছে আতরাফ-ছোটলোক-অনার্য; ছোটলোকের বাংলা কিছু সংস্কৃত, কিছু ফার্সি, কিছু মুন্ডা, কিছু সাওতাল, কিছু ইংরাজি–খুবই প্লুরাল, রেসিয়াল ইভোলুশনের চমৎকার কড়া এন্টি-স্টেটমেন্ট; আর্য হিন্দু আর আশরাফ মোসলমান সেইটারে রেসিস্ট বানাইয়া তুলছে, তারপর জনতারে খাওয়াইতে চাইছে। জনতা যখন খায় নাই তখন একটা সেক্ট এমনকি ভং ধরছে ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’ নাম লইয়া–‘নিম্নবর্গ’ শব্দটা দেখেন কেমন সংস্কৃত কারখানার নগদ মাল!

তবু এইসব ইতিহাসে ঘইটা গেছে, আনডু করার তো উপায় নাই; আমাদের এখন ডিসিশন নিতে হবে; এইসব ইতিহাসে বেশি ঢুইকা থাকলে আমরা রিভেঞ্জের ফান্দে পইড়া যাইতে পারি, ইতিহাস প্রায়ই প্রতিশোধের কারিগর! আজকের ফ্রান্সে আলবেনীয়-আলজেরীয়দের হামলার মাঝে কলোনিয়াল রিভেঞ্জ কতটা যে আছে খোদা মালুম! আমাদের উপায় কি তাইলে?

আমাদের উপায় ডেমোক্রেটিক হওয়া; সমাজের বেশিরভাগের বুলি/শব্দ/ভাষারে ফলো কইরা রেসিয়াল-কম্যুনাল পিরিত-ঘেন্নার বাইরে যাওয়া, সমাজের বাংলা খেয়াল করলে এইটা বুঝবেন ভালো। ধরেন, মানুষ/মানব শব্দটা এরিয়ান হিন্দুরা রেসিয়াল জেনেওলজি দেখাইবে, যে, মনুর সন্তানেরা হইলো মানুষ, আশরাফ মোসলমানরা পারলে মানুষ শব্দটারেই বাদ দিয়া দেবে; কিন্তু সমাজে দেখেন, মানুষ মানে মনুর বাচ্চারা না তো, মানুষ মানে ইনসান, আদম, হিউম্যান–সমাজে জেনেওলজি নাই; এমনকি মনু-ই আর কম্যুনাল/রিলিজিয়াস আদিপুরুষ নাই, মনু হইলো আদরের বাচ্চা মাত্র! সমাজ এই সংস্কৃত শব্দটারে ট্রান্সফর্ম কইরা নিছে, মনুরেও! বাট বানানো শব্দ কলোনিয়াল প্রেশারের ১৫০/২০০ বছর পরেও সংস্কৃতি শব্দটারে সমাজে ঢুকানো যায় নাই, বীতশ্রদ্ধ-অজস্র-বর্গ-প্রতিশ্রুতি এমন শত শত শব্দ ঢুকানো যায় নাই! ইংরাজি-পর্তুগিজ শব্দ আলগোছে নিয়া নিতে পারছে, সংস্কৃত শব্দ দিয়া তরজমা করতে হয় নাই। সাফ উঠাইয়া যেমন পরিষ্কার ঢুকানো যায় নাই, তেমনি সোজা বা করা–এমন সব সংস্কৃত গোড়ার শব্দও উঠাইয়া দেওয়া যায় নাই। ঐ রেসিয়াল দেমাগের প্রেশারে দুয়েকটা আবার সাকসেসফুলি ঢুকতেও পারছে, যেমন, ‘অর্থ’, প্রশ্রাব কইতে নারাজ হইলেও পেশাব কইছে তো!

ডেমোক্রেসি আমাদের রেসিজম বা কম্যুনালিজম থেকে মুক্তি (মুক্তিও ঢুকতে পারছে, আজাদি দিয়া রিপ্লেস করার চেষ্টায় কাম হয় নাই, চেষ্টার বদলে কোশেশ নেয় নাই সমাজ।) দেবে; আমাদের আর্ট-কালচারও এমনে ডেমোক্রেটিক হইয়া উঠলে জনতার কোলে উঠতে পারবে; কোন এক সময়ে হয়তো আমরা এই ফিউডাল মিডল ক্লাসের শাসন থেকেও মুক্তি পাইবো হয়তো এই ডেমোক্রেটিক চেঞ্জের লগে হাঁটতে হাঁটতে।  

 

৬ অক্টোবর ২০১৬

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
রক মনু

রক মনু

কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য