Main menu

নিসিম এজিকিয়েলের ভারত দর্শন

নিসিম এজিকিয়েল নামের এক কবির বসতি ছিল ভারতে। ইংরাজি ভাষায় লিখতেন। সাবকন্টিনেন্টের মেবি একমাত্র ইহুদি কবি! তাঁর সম্প্রদায়ররে ‘বেনে ইজরাঈল’ বইলা ডাকত স্থানীয়রা। মানে বোম্বাই থেইকা মুম্বাই হওয়া পাবলিকরা, যেই শহর’রে কবি নিজের বইলা ভাবতেন। তাঁর কাব্যের যেই তালা, তা ভাঙতে, কম্যুনালি উনি যে মাইনোরিটি, সেই পরিচিতিটা সামনে রাখবো আমরা। হিন্দি, সংস্কৃত বাদ দিয়া কবির ইংরাজিতে সাহিত্যচর্চার অদম্য বাসনার হেতু মাথায় রাখতে হবে। মানে, ভাষা চয়েজ তো কবির সচেতন কাজ, ফলে পলিটিক্স ও কালচার নিয়া নানান বুঝাপড়া এমবেডেড হইয়া থাকে, থাকবে ওইসব ডিসিশনে। উনি কি লেইখা কার কাছে পৌছাইতে চান’, এর জওয়াব মিলাইতে গেলে আমাদের দরকারি কাজে আসতে পারে আরকি!

রামায়ণ, মহাভারত না ছুইয়াও যে প্রমিনেন্ট ভারতীয় কবি হওয়া যায় তার মেছাল হইয়া রইবেন ইনি! উনার কবিতার সহযোগিতায় লইয়া আমরা উনার দর্শন নিয়া আলাপ করবো। তবে তা করতে গেলে ব্যাপারটারে একটা শিরোনামে ঢুকানো তো টাফ, ফলে আমাদের কাছেও যেই জিনিসটা চোখা লাগতে পারছে, সেইটারে ধইরা নিয়াই আমরা নাম দিলাম একটা, ভারত দর্শন।

নিসিম এজিকিয়েল টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান কবি ছিলেন না। এই কথার শানে নুযুল বুঝতে হলে আপনারে দেখতে হবে উনার বেড়ে উঠার সময়কাল। দেশভাগ বা নিজদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় উনি টগবগা জোয়ান কবি! ইউরোপের হিউম্যানিজমে উনার অগাধ আস্থা। ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ ভারতে চেরাগ জ্বালার পশ্চিমা নবুয়তি সীল ফেইড হইয়া থাকে তেনার কলমে! যদিও প্রাথমিক পাঠে উনারে জনরার বিচারে ভারতীয় (দর্শনার্থে) বইলা ভ্রম হয়।

উনার ম্যাগনাম ওপাস কাব্যগ্রন্থ হইতেছে, দ্য এক্সেক্ট নেইম। ওই বইয়ের কবিতার বাইরে আমরা কানপড়া দিবো না। ইন্ডিয়ান ইংলিশ লিটারেচারের গুরুত্বে পূর্ণ কিছু কবিতারে বিশ্লেষণ কইরা তেনার ভাবের তালা ভাঙবার স্বার্থে চাবিকাঠির কোন খোঁজখবর পাওয়া যায় নাকি, দেখার কোশেশ করি।

‘নাইট অব দ্য স্করপিয়ন’ বা ‘বিচ্ছু রাইত’ নামের এক কবিতা দিয়া শুরু করা যাক। পইড়া আপনে আবেগে ভাইসা না গেলেও জোয়ার অন্তত টের পাইবেন এর! কবিতাটা গল্পের আদলে তৈয়ার করা। মানে, কবি অটোবায়োগ্রাফিকাল কলমে ফিকশনাল একটা কাহিনী বর্ণনা করতেছেন। এইটা পড়তে গিয়া বব ডিলানের ‘দ্য ব্যালাড অব ফ্রাঙ্কি লি এন্ড জুডাস প্রিস্ট’ গানটার কথা মনে পড়তে পারে, 🙂 নো অফেন্স। তো, কবিতাটায় ন্যারেটর বলতেছেন, এক ভয়াবহ বাদলা রাতের কথা। যেই রাতে তার আম্মাজান এক বিষাক্ত বিচ্ছুর কামড়ে প্রায় মূর্ছা গেছেন। তো, এই ঘঠনায় পাড়াপড়শি, তাহার শ্রদ্ধেয় পিতাজান, স্থানীয় বৈদ্য এবং শেষে মায়ের কমেন্টারি কি কি ছিল, কবি তার নির্মোহ বর্ণনা দিতেছেন। কবিতাটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আইরনি, মকারির লেয়ার অল্প মনোযোগেও চোখে পড়ার মতো। এই ব্যাপারটারে বাদ দিয়া গেলে কবিতাটা আমরা যেই এনালিসিস দেখাব তার বিপরীত কোন বুঝাপড়া তৈয়ার করবার পারে। তাই আমরা উনার ফিলোসফি, বেড়ে উঠা ও নানান কবিতায় তেনার অটোবায়োগ্রাফিকাল চালচলনের খোঁজখবর দেবার চেষ্টা করবো। এতে বুঝা যাবে, কেন বা কিভাবে তেনার পক্ষে একজন নারী বা মায়ের কাল্পনিক যন্ত্রণায় ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট, কমলা দাসের ভাষায় ‘রুথলেস ওয়াচার’, বা ডিটাচড অবজারভার হওয়া সম্ভব হইয়াছে। এবং এতে কবিতার সমাপ্তিতে উনার সিরিয়াস (আইরনি মুক্ত আরকি) বর্ণনা উনার কমেন্টারিরে মকারিতেই পর্যবসিত করলো।

কৃষক পরিবারের পড়শিরা আইসা বিচ্ছু কর্তৃক আহত (জীবন্মৃত) মা’রে সিম্পেথি জানায়া যাইতেছে। যে যার যার খোদার নাম জপে জপে বিচ্ছুর পরানে করুণা সৃষ্টি করবার কোশেশ করতেছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইতেছে না। এভাবে নানান কায়দা কইরা সফল না হওয়ায় তেনারা নয়া এক জিনিস আবিষ্কার করলেন, পুরানা পাপ! ভিক্টিমের আগের জন্মের পুরানা পাপের জাগতিক প্রায়শ্চিত্ত হইতেছে আসলে, মত দিতেছেন তারা। পাশাপাশি বিচ্ছুটারও একটা জাগতিক বিহিত করবার জন্যে তারা অনেকগুলা লণ্ঠন আনাইলো, রাতের মেটাফোরের বিপরীতে আলোর মতো, তবুও কিছুতেই কিছু হইতেছে না। এবার কথকের বাপের পালা, তিনি একজন যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানমনষ্ক লোক। ফলে কৃষকগোষ্ঠীর লোকাল চিকিৎসায় তিনি বেজার। কিন্তু তেনার এনলাইটেন্ড দেমাগও তো পুঁছতেছে না বিচ্ছু! এজন্যে পাশে শ্লোক আওড়ানো বৈদ্যের কাজেও কোন গ্যাঞ্জাম লাগাইতেছেন না তিনি, মশকরা করতেছেন কবি। বারো ঘন্টা পর, মায়ের যন্ত্রণা কমে, আপনাআপনিই বিষ নাইমা যায়! আইরনি পাকাপোক্ত হইতে না হইতেই খুশি হইয়া উঠেন মা, এবং খোদাকে থ্যাংকস জানান, কারণ তার উসিলায় তিনি তার সন্তানদের তো মুক্তি দিছেন অন্তত! এই ছিলো গল্প, কবিতাটায়। নামটাতে খেয়াল করেন, রাত হলো অন্ধকারের ইমেজ, আবার বিচ্ছু হলো খারাপ, ইভিল। ওই খারাপ আন্ধারে কথকের মা ভোগান্তির শিকার হবে। মানে, মায়ের সাফারিং ওই অন্ধকারটারে হাত বুলাইতে বুলাইতে আলোকিত করবে যেন! শেষে ভারতীয় মা-সুলভ প্রার্থনা দিয়া কবিতা শেষ হলো, এনলাইটেন্ড প্রজেক্টে ইন্ডিয়ান সেক্যুলারজিমের ইন্টারভেনশন বলবেন নাকি এটারে অথবা বলা যাইতে পারে ইংলিশ কবির ইহুদী দেমাগ! Continue reading

আত্মদর্শন – এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদের (১৯২৯ – ২০২১) এই লেখা’টা ছাপা হইছে উনার “বাংলাদেশের আদিবাসী এবং জাতি ও উপজাতি” (পরিলেখ, ২০১৩) বইয়ের ১১০-১১৬ পেইজে। বইটার পিডিএফ কপি উইকিপিডিয়া’র লিংকে পাওয়া যায়। আমরা অই সোর্স থিকা লেখাটা নিছি।

এই লেখাটা অটোবায়োগ্রাফিক্যাল একটা জিনিস, কিন্তু বইটা তা না। বইয়ের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে এই লেখাটা উনি বইয়ে রাখছেন, যাতে রাইটার সম্পর্কে রিডার’রা একটা ধারণা পাইতে পারেন।

বইটা হইতেছে মেইনলি বাংলাদেশের পাবর্ত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়া; অইটা বলতে গিয়া জাতি-উপজাতির ধারণা এবং অন্য সব আলাপ আসছে।    উনার এনালাইসিসগুলা ইন্টারেস্টিং। এটলিস্ট তিনটা জায়গা তো খেয়াল করতে পারবেনই।

এক, হিস্ট্রিক্যাল ফ্যাক্টগুলা; যেইটা হিল-ট্রাকস নিয়া পপুলার আলাপগুলাতে মিসিং। যেমন ধরেন, একটা সময়ে চাকমা রাজাদের দুইটা নাম থাকতো, এর মধ্যে একটা নামে ‘খাঁ’ থাকতো, কারণ মুসলিম শাসকের হেল্প নিয়া চাকমা রাজা আরাকানের রাজারে যুদ্ধে হারাইছিলেন, যার ফলে একটা ভালো সম্পর্ক ছিল; পরে ব্রিটিশ পিরিয়ডে চাকমারা  লক্ষীপূজা শুরু করেন; আর বাংলাদেশ পিরিয়ডে খ্রিস্টান মিশনারি’রা অই এলাকাতে এক্টিভলি কাজ করতেছেন চাকমাদের বাইরে ছোট ছোট উপজাতিদেরকে খ্রিস্টান ধর্মে কনভার্ট করতেছেন। এইটারে কন্সপিরেসি থিওরির জায়গা থিকা না দেইখা, ধর্ম যে একটা জরুরি জাতি-উপাদান সেইটারে মার্ক করাটা তো দরকার।

দুই হইতেছে, বৌদ্ধধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের একটা সম্ভাব্য কানেকশন থাকার কথা উনি অনুমান করছেন। ইসলামের যেইরকম অনেকগুলা তরিকা আছে, বৌদ্ধধর্মেরও অনেক প্যাটার্ন তৈরি হইছিল, যার একটা ধরণ সিরিয়া পর্যন্ত গেছিল, সেইখান থিকা এর ইমপ্যাক্ট আরব পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশে যখন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইছে তখন একটা ক্যাটাগরির বৌদ্ধরাই ইসলামে কনভার্ট হইছেন। যেমন হইছে, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতে; মানে, এইগুলারে ‘ফ্যাক্ট’ বা  ‘সত্যি’ হিসাবে নেয়ার বাইরে কানেকশনগুলারে যাচাই করতে পারাটা দরকার আমাদের।

তিন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন যে বিপ্লবের নামে সবসময় ‘জন-বিচ্ছন্ন’ একটা জিনিস, এই  ক্রিটিক উনার মতো আর কেউ মেবি এতো ভালোভাবে করতে পারেন নাই। তেভাগা আন্দোলনরে যে উনি ‘ইলা মিত্র ও তাঁর জামাইয়ের আন্দোলন’ বলছেন, সেইটা ‘ঠিক’ না হইলেও সমাজের বড় অংশের মানুশের লগে যে রিলেশন তৈরি করতে পারে নাই, সেইটা ‘সত্যি’ ঘটনাই অনেকটা; বা ব্রিটিশ আমলের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলনরে যে ‘হিন্দু-জাগরণের’ ঘটনা বলছেন, সেইটা পুরাপুরি ‘সত্যি’ না হইলেও ‘ভুল’ কথাও না। মানে, কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলারে যে রোমান্টিসাইজ করার জায়গাগুলা আছে, সেইখানে উনি বেশ ব্রুটাল হইতে পারছেন। এইটা পজিটিভ, এক হিসাবে।

কিন্তু তারপরও দেখবেন, উনার যেই সাজেশন বা ডিসিশান সেইগুলারে নেয়া যায় না। যেমন, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থিকা মিলিটারি উইথড্র করা ঠিক না, সমতলরে বাঙালিদেরকে হিল ট্রাকসে জমি কেনার পারমিশন দিতে হবে, ‘বাঙালিরাই হইতেছে আদিবাসী’… এইরকম জায়গাগুলা। এইগুলা খালি ভুল-ই না বরং জুলুমের-অপ্রেশনের হাতিয়ারও হয়া উঠতে পারে।

আর এইগুলারে আসলে উনার ভুল হিসাবে দেখলেও ‘ভুল’ হবে, বরং উনি যেই পজিশনটাতে আছেন, সেইখান থিকা এইরকম সাজেশনগুলাই আসার কথা। উনার পলিটিক্যাল পজিশনটা কি? যদিও ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ কথা উনি বলছেন, কিন্তু উনার পজিশনটারে বেটার বুঝা যাইতে পারে ‘বাঙালি মুসলমান জাতীয়তাবাদের’ জায়গা থিকা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’রে যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জায়গা থিকা দেখেন, তাইলে কিন্তু বাঙালি এবং মুসলমান, এই দুইটা আইডেন্টিটির উপরে আটকায়া থাকতে হয় না, তখন হিন্দু, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, এইরকম আলাদা করতে হয় না, বহুজাতির জায়গা থিকাই দেখতে পারা যাইতো। কিন্তু  আহমদ ছফা ও সলিমুল্লাহ খানদের মতো এবনে গোলাম সামাদও বাঙালি আইডেন্টিটির লগে মুসলিম আইডেন্টিটিরেই অ্যাড করতে চান শুধু। এইটা উনার কোর পজিশন।

সেকেন্ড জিনিস হইতেছে, উনি প্রাকটিক্যালির উপর নজর দিতে চাইলেও একটা সংজ্ঞা বা ডেফিনেশনের উপরেই ভরসা রাখতে চান, আর সেইটা খালি ‘কেতাবি’-ই না, অনেকটা ‘ব্যাকডেটেড’ ঘটনাও। যেমন ধরেন, যেইভাবে উনি বাংলা-ভাষী লোকজনরে ‘আদিবাসী’ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়া উঠছেন, সেইখানে উনি যেই সংজ্ঞা’রে নিতেছেন, সেইটা পুরানা আমলের ল্যান্ডের সাথে জড়িত একটা জিনিস; কিন্তু এখন একাডেমিয়াতেও ‘আদিবাসী’ বলতে অই জনগোষ্ঠীরে বুঝানো হয় না, যারা ‘প্রাচীন বা আদিম মানুশ’, বরং এমন একটা জনগোষ্ঠী বা কালচার, যারা ‘বিলীন’ হয়া যাইতেছে, যাদেরকে প্রটেক্ট করা দরকার। এবনে গোলাম সামাদ বলতেছেন, এদেরকে তো বিলীন হইতেই হবে; এইরকমই তো হয়া আসছে, এইরকমই তো হবে!  তো, এইরকম আনফরচুনেট ডিসিশান নেয়ার জায়গাটাতেও উনি নিজেরে সন্দেহ করতে পারতেছেন না! এইটা মোটামুটি ভয়াবহ একটা জিনিস। বাঙালি হওয়ার নামে যেইরকম জুলুমরে আপনি সার্পোট করতে পারেন না, ইসলাম কায়েম করার নামে বা ‘প্রগতিশীল’ হওয়ার নামেও একইরকমের জুলুমরে সার্পোট করা যায় না। এইটা খালি আইডিওলজিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের ঘটনা না, বরং যে কোন আইডিওলজিরেই জুলুমের হাতিয়ার হিসাবে ম্যান্ডেট না দিতে চাওয়ার ঘটনা। এই জায়গাটাতে এবনে গোলাম সামাদরে নেয়াটা ঠিক হবে না।

থার্ড বা ক্রুশিয়াল জায়গাটা হইতেছে, এই কারণে উনার আর্গুমেন্টগুলারে উনি আসলে মিলাইতেও পারেন নাই। বেশিরভাগ সময়ই বিচ্ছিন্ন এবং এমনকি ইরিলিভেন্টও মনে হইতে পারে যে, কেন বলতেছেন উনি এই কথা, এর রিলিভেন্সটা কি, এইরকম। মানে, এইটারে বেশি-বয়সের মানুশের কথা-বলার সমস্যা বা একসাইটিং ইনফরমেশনের বাইরেও রিলিভেন্স ক্রিয়েট না করতে পারার সমস্যা হিসাবেও নিতে পারাটা দরকার।…

তো, আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের এখনকার পপুলার ন্যারেটিভগুলার ব্যর্থতার জায়গা থিকা এবনে গোলাম সামাদের চিন্তাগুলা রিলিভেন্ট হয়া উঠার সম্ভাবনার মধ্যে আছে, যদি এখনো রিলিভেন্ট না হয়া উঠতে পারে; সেইখানে একটা বাছবিচারের মধ্যে দিয়াই আমাদেরকে যাইতে হবে, যেইটা উনারে নেয়া বা না-নেয়ার চাইতেও জরুরি একটা ঘটনা হিসাবে আমরা মার্ক করে রাখতে চাইতেছি।

গোলাম এবনে সামাদ মারা গেছেন গত ১৫ই অগাস্ট, ২০২১-এ। আসেন, উনার এই লেখাটা পড়ি।

এডিটর, বাছবিচার

……………

অনেক সময় কারো লেখা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে লেখকের সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছা জাগে । বর্তমান পুস্তকটি পড়তে যেয়েও আমার সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছা জাগতে পারে। তাই আমি আমার নিজের সম্বন্ধে দু কথা বলছি। আজ থেকে প্রায় তিরাশি বছর আগে রাজশাহী শহরে জন্মেছিলাম আমি। আমি লেখাপড়া করেছি রাজশাহীতে স্কুলে ও কলেজে। রাজশাহী শহরের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ আমার মন মানসিকতা গঠন করেছে। রাজশাহী বড় শহর ছিল না। আমি যখন স্কুলে পড়ি, তখনও এ শহরে বাঘ আসত। এই শহরের কাছে খুব ঘনঘন না হলেও শিরোইল নামক এলাকায় ছিল যথেষ্ট বন। যেখানে ছিল চিতাবাঘ। এই শহরে ছিল প্রচুর সাপ । যাদের অনেকই ছিল বিষধর। শহরের কাছেই একটা এলাকায় অনেক অজগর সাপ ছিল । যারা খরগোশ গিলে খেত। অন্যদিকে রাজশাহী শহরে ছিল একটা প্রথম শ্রেণির কলেজ। আর ছিল বরেন্দ্র মিউজিয়াম। এখানে ছিল একটা শিক্ষার পরিবেশ। যা আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি বহু বিষয়ে ঘরে পড়াশোনা করে জানতে চেয়েছি। অনেক বিষয়ে ছিল আমার জানবার আগ্রহ। আমি আমার বাল্যকাল থেকেই জানতে আগ্রহি ছিলাম মানুষ সম্বন্ধে। ইচ্ছা ছিল নৃ-তত্ত্ব পড়বার। কিন্তু সেটার সুযোগ ঘটেনি। আমি ঢাকায় যেয়ে তেজগাঁ কৃষিশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছিলাম কৃষিবিদ্যা । তারপর বিলাতে যাই উদ্ভিদের রোগ-ব্যারাম সম্পর্কে পড়াশোনা করতে । বিলাতের লিড্স শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলাম উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব। বিলাতে ছিলাম মাত্র এক বছর। তবে এই এক বছর আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল। Continue reading

বই: “সবারে নমি আমি” কানন (বালা) দেবী (সিলেক্টেড অংশ)

[কানন (বালা) দেবী (১৯১৬ – ১৯৯২) হইতেছেন ইন্ডিয়ান ফিল্মের শুরু’র দিকের নায়িকা, কলকাতার। ১৯২৬ থিকা ১৯৪৯ পর্যন্ত মোটামুটি এক্টিভ ছিলেন, সিনেমায়। তখনকার ইন্ডিয়ার ফিল্ম-স্টুডিওগুলা কলকাতা-বেইজড ছিল। গায়িকা হিসাবেও উনার সুনাম ছিল অনেক। ১৯৭৩ সনে (বাংলা সন ১৩৮০) উনার অটোবায়োগ্রাফি “সবারে নমি আমি” ছাপা হয়। সন্ধ্যা সেন উনার বয়ানে এই বইটা লেখেন। অই বইটা থিকা কিছু অংশ ছাপাইতেছি আমরা এইখানে।]

………….

চুম্বন

জোর বরাত’ -এর একটা বেদনাদায়ক ঘটনা আজও আমার কাছে রহস্যাবৃতই রয়ে গেল।

একটা সিনের টেক হচ্ছিল। রিহার্সাল অনুযায়ী যথারীতি সংলাপ বলে গেলাম। সিনের শেষে হঠাৎ ছবির হিরো ইংরাজী ফিল্মের ঢঙে আমায় জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলেন।…ঘটনার আকস্মিতায় হঠাৎ বিহ্বল হয়ে পড়লাম। সামলে উঠতে সময় লাগল। যখন প্রকৃতিস্থ হলাম, বিস্ময়, বেদনা, অপমান, অভিমান, নিজের অসহায় অবস্থার জন্য কষ্ট সব মিলিয়ে একটা নিষ্ফল কান্না যেন মাথা কুটতে লাগল। অল্প বয়স, তখন ভাব-প্রবণতাও প্রবল। তাছাড়া বাঙালী ঘরের মেয়ে, আবেগের এমন উগ্র প্রকাশে অভ্যস্ত নই। আর এ-কাজ ঘটল তাঁরই পরিচালনায় অভিভাবক ভেবে যাঁর .. ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। যাঁর দায়িত্বজ্ঞানের ওপর আমার এত শ্রদ্ধা, বিশ্বাস! যদি অভিনয়কে স্বাভাবিক করবার জন্য এই চুম্বনের প্রয়োজন, তবে আমাকে আগে থেকে বলে মনকে কেন প্রস্তুত করবার অবকাশ দিলেন না?

জ্যোতিষবাবুকেও আমি এ প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বললেন, “বললে তুমি রাজী হতে না। ইট ইজ অ্যান এপেরিমেন্ট, অত ‘টাচি হলে চলে? আর্টিস্টদের আরো স্পোর্টিং হতে হয়। সাধারণ মানুষ যা কল্পনায় আনতে পারে না, শিল্পীরা অনায়াসে তা পারে বলেই না তারা শিল্পী।” ইত্যাদি অনেক স্তোকবাক্য শোনালেন।

কিন্তু যাই বলুন আমার মনের ভার নামল না। নিজেকে বড় অপমানিত মনে হয়েছিল, আমি কি পরিচালকের হাতের ক্রীড়নক? নিজের মতামত, স্বাধীন সত্ত্বা কিছুই থাকবে না? ভেবেছি আর কেঁদেছি।

আজ ত নায়িকাদের সম্রাজ্ঞীর সম্মান। আমার এ সমস্যা এ-যুগে হাস্যকর। এখন ত নায়ক-নায়িকার একটিমাত্র ইচ্ছে বা সাজেশনই এ-লাইনে বেদবাক্য। এ আঘাত আজও ভুলিনি। তবে এর মধ্যেও ভাববার কথা আছে বৈকি।

এখন চলচ্চিত্রের অগ্রগতির স্বর্ণযুগ। তবুও বোম্বে ফিল্মে আলিঙ্গন ত আছেই অথবা চুম্বনের প্রায়-চালু অবস্থা। কিন্তু এই প্রগতিশীল যুগের বাংলা ছবিতে চুম্বনের অবতারণা করা যায় কিনা এ নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। কিন্তু আজ থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে চলচ্চিত্রের শৈশবে, বাংলাদেশেরই এক পরিচালক চুম্বন-এর দৃশ্যের কথা ভেবেছিলেন এবং তাকে ছবিতে প্রয়োগ করার দুঃসাহসও হয়েছিল—এটা প্রোগ্রেসিভ মাইণ্ডের লক্ষণ নিশ্চয়। তাঁর সঙ্গে সমান তালে আমাদের মন পা ফেলতে না পারলেও, দুঃসাহসিক পরীক্ষার কৃতিত্ব তার প্রাপ্য নিশ্চয়ই। ভালমন্দর বিচার ত আপেক্ষিক।

যাই হোক, দৃশ্যে আমি অপ্রস্তুত অবস্থায় আক্রান্ত হয়ে নায়ককে দুহাতে ঠেলে দেওয়ার জন্য ছবিটি ঠিক পরিবেশনযোগ্য হয়নি এবং সেইজন্যই শেষ পর্যন্ত ঐ দৃশ্যটি এন জি হয়ে গিয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা আজও ভুলিনি। স্টুডিওতে যে বাবুর্চি বা বেয়ারার ওপর আমাদের খাওয়াবার ভার থাকত, আপাতদৃষ্টিতে খুব হাসিখুশি চেহারা। কি বদান্যতা। সবাইকে তাড়াতাড়ি খাওয়াবার সে কি ব্যগ্রতা! কিন্তু ব্যগ্রতার অন্তরালের কাহিনীটুকু আর কেউ জানত কিনা বলতে পারি না, তবে আমার অজানা ছিল না। ওর একটা অভ্যাস ছিল, একজনকে খাইয়ে পাঁচজনের হিসেব দেওয়া। উদ্বৃত্তাংশ যেত তারই ছাঁদায়। অন্য সবার ভাগ্যে কি জুটত জানি না। তবে লাঞ্চ বলতে আমার বরাদ্দ ছিল চায়ের প্লেটে দু’ স্লাইস পাউরুটি, দু-টুকরো আলু ও চার-টুকরো মাংস। ওপর থেকে পরিমাণের সত্যিই নির্দেশ দেওয়া ছিল কিনা বলতে পারি না। তবে আমার হাতে পৌছত ঐটুকু এবং তালিকায় থাকত আমার মত চারজনের উপযোগী ভোজ্যবস্তুর হিসেব।

নায়ক ও পরিচালক

তখনকার যুগের নায়িকাদের ত আজকের মত সাম্রাজ্ঞীর মর্যাদা ছিল না। অত্যন্ত আনন্দের কথা—আজকের যুগের নায়িকা সত্যিকারের শিল্পীর সম্মান পেয়ে থাকেন। তার ইচ্ছে অনিচ্ছেয় শুনেছি নায়ক নির্বাচন হয়ে থাকে। কিন্তু তখনকার দিনের নায়িকা নামেমাত্র নায়িকা, কার্যতঃ প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত নায়কদের পর্যন্ত আজ্ঞাবাহিকা ছাড়া কিছুই ছিলেন না। মাঝে মাঝে মনে হোত আমি কি কলের পুতুল। নিজস্ব কোন সত্তা নেই? শুধু অন্যের জুলুম সহ্য করেই জীবনটা কাটাতে হবে। প্রযোজক, পরিচালকদের কথা ছেড়েই দিলাম। তারা তো সবারই প্রভু। কিন্তু অল্প বয়স ও অনভিজ্ঞতার কত সুযোগই না সবাই নিয়েছে। নিরুপায় অবস্থার জন্য গ্লানিভরা মুহূর্তের সে অসহ্য যন্ত্রণা কি ভোলার? Continue reading

কন্টেম্পরারি কয়েকটা বাংলাদেশি ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ (সিনেমা, নাটক, ডকুমেন্টারি) নিয়া

অন ‘ডুব (No Bed of Roses)’

এই সিনেমাটারে নাটক মনে হওয়ার একটা বড় কারণ মেবি, মিউজিক। আমার কাছে মনে হইছে, নাটকে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের জিনিসটা মিসিং থাকে, থাকেই না প্রায়; কিন্তু সিনেমাতে সবসময় একটা মিউজিক বা সাউন্ড চলতেই থাকে। (বাংলা-সিনেমার ঢিসুম-ঢিসুম নিয়া লোকজন যতই হাসাহাসি করুক, অইটা ইম্পর্টেন্ট। সিনেমার সাউন্ডের ঘটনাটা।…) এইখানে যদিও সাইলেন্স দিয়া পেইন-টেইন বুঝাইতে চাইছে, অইটা হয় নাই আসলে, বরং নাটক-নাটক ব্যাপার হয়া গেছে। এইটা গ্রস একটা মিসটেক হইছে মনেহয়। সাইলেন্সটা তৈরি হয় নাই, বরং মিউজক’টা মিসিং হইছে।

আর এইটা তো বাপ আর মেয়ে’র সিনেমা আসলে! মানে, ‘বাংলা-সিনেমা’ হইলে নাম হইতে পারতো – “বাপ কেন প্রেমিক?” 🙂 কিন্তু এই জায়গা’টা থিকা দেখার ঘটনাই তো আসলে ঝামেলার। 🙁 মানে, এইরকম ক্রাইসিসের জায়গা থিকা জিনিসটারে ডিল করা যায় না। যার ফলে, কাহিনি’টা দাঁড়াইতে পারে নাই।

এইরকম আলাপ তো অনেকদিন থিকাই চালু আছে যে, ক্রিয়েটিভ কিছু হওয়ার লাইগা ইন্টেলেকচুয়াল হওয়ার তো দরকার নাই! যার ফলে, মনে হইতে পারে, আর্টের যেন ইন্টেলেকচুয়াল কোন ক্লেইম নাই! কিন্তু ঘটনা তো তা না, বরং আর্টের ইন্টেলেকচুয়াল এক্সপ্লোরেশনটা ডিফরেন্ট রকমের। তো, অইখানে সিনেমার এই কন্ট্রিবিউশনটা নেগেটিভ একটা ঘটনা আসলে।

থার্ড বা ইম্পর্টেন্ট জিনিস হইলো, সিনেমা’টা কার লাইগা বানাইতেছেন আপনি? – এইরকম ‘অডিয়েন্সের’ একটা ইমাজিনেশন থাকে। আমার কাছে মনে হইছে, এই সিনেমার এক্সপেক্টেড অডিয়েন্স হইতেছে ‘গ্লোবাল কালচারাল মিডল-ক্লাস’, বাংলাদেশে যে উনারা নাই তা না, একটা ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়া উনারা আছেন।

এই টেনডেন্সিটা খুব ভালোভাবে খেয়াল করতে পারবেন, আব্বাস কিরোস্তামির ‘ফ্রেঞ্চ সিনেমা’: সার্টিফাইড কপি, আর ‘জাপানিজ সিনেমা’: “লাইক সামওয়ান ইন লাভ” দিয়া। উনি ইরানি ডিরেক্টর কিন্তু যেই সিনেমা বানাইছেন অইগুলা ফ্রেঞ্চ আর জাপানিজ মুভিই আসলে। একইভাবে, বাংলাদেশেও ফ্রেঞ্চ সিনেমার অডিয়েন্স আছেন আসলে, জাপানিজও; যারা একটা ‘গ্লোবাল কালচারাল ক্লাস’-এ বিলিভ করেন। (এইটা আমার আবিষ্কার! 😎)

ছোট-খাট দুয়েক্টা জিনিস দিয়া এইটা টের পাওয়া যায়। যেমন ধরেন, ইরফান খান বা সিনেমাতে তার সেকেন্ড ওয়াইফ যে বাংলা বলেন, এইটা বাংলাদেশি হিসাবে আমাদের কানে লাগে তো; যদি বাংলাদেশের সিনেমাহলের কথা ভাবতেন ফারুকী, তাইলে হয়তো কাউরে দিয়া ডাবিং করায়া নিতেন। (এই কারণে সিনেমা খারাপ হইছে – তা না, অডিয়েন্সের জায়গাটা খেয়াল করার লাইগা বলতেছি।

তো, এই ‘গ্লোবাল কালচারাল ক্লাসের’ যে খালি একটা ‘ইন্টারন্যাশনাল’ টেস্টের ব্যাপার থাকতে হয় – তা না, লোকাল ফ্লেভারও লাগে। অইখানে ফারুকী দাফন-কাফনের জায়গাটা নিয়া ‘বাংলাদেশি’ সিগনেচার রাখছেন। একইসাথে গ্লোবালও হইছেন আসসালামু আলাইকুমের সাবটাইটেল’রে Greetings রাইখা।…

এইগুলা দোষের কিছু না অবশ্যই, কিন্তু এইভাবে লোকালাইজেশনের এফেক্ট দিয়া গ্লোবাল হওয়ার ঘটনা’টা মোস্টলি একটা আর্টিস্টিক ব্লাফের ঘটনাই হয়া উঠে আসলে। (এই জায়গাতে আইসা মনে হইলো, পিঁপড়াবিদ্যাও অই জায়গা থিকা ভাল্লাগে নাই আমার।)

তো, পুরুষ ‘প্রেমের ও বাৎসল্যের’ বেদনা যে নাই – তা না, কিন্তু এই জায়গাটারে ফারুকী কোন ক্রিয়েটিভ এক্সিলেন্স বা কোন ইন্টেলেকচুয়াল জায়গা থিকা লোকেট করতে পারেন নাই আসলে। নতুন কোন চিন্তা ছাড়া জায়গাতে ফেইলওর হওয়ারই কথা, কিন্তু ফেইলওর’টাও খুববেশি যুইতের হয় নাই আর কি! 🙁

২.
পরিমিতবোধ’টা তো ভালো; কিন্তু যেই ভিউ-পয়েন্ট’টা থিকা স্টোরি’টা বলা হইছে, আমি অইটারেই নিতে পারি নাই। তবে যেই জায়গাটা নিয়া ডিল করতে চাইছে, অইটা ইন্টারেস্টিং। আর আমি যট্টুক বলছি, সিনেমাটা তো অট্টুকই না, এর বাইরে আরো ব্যাপার-স্যাপার তো আছেই।

Continue reading

ইনছাফের পুলছেরাত অথবা ওয়াকিং অন দ্য এজ অব জাস্টিস

মানুশের জনম কেমন ঘটনা? বাপ-মা, অন্তত এই ২ জন মানুশের জনমের মতো ঘটনাটা ঘটায়। তারা দুইজন তাইলে কি একটা কেরাইম করলো? একটা পাপ করলো? কেরাইম অথবা পাপ হইলে দুই জনের ভিতর কার ভাগ বড়ো?

এই পোশ্নগুলার ফয়ছালার আগেই পাপ আর কেরাইমের ভিতর ফারাক অথবা রিশতা একটু বিচার করা দরকার।

দুনিয়ার ধর্মগুলার ভিতর কেরাইম আর পাপের আইডিয়া আছে; ধর্মের ইজারাদার বইলা দাবি করা লোকেরা পেরায়ই পাপ আর কেরাইমের ভিতর ফারাক করতে রাজি হয় না, তারা জেই খোদার গোলাম, নিজেরাই শেই খোদা হিশাবে দাবি করে পেরায়ই, ধর্মরে ভালোবাশার নামে ধর্ম দখল কইরা নিজেদের খোদার শরিক হিশাবে হাজির করে দুনিয়ায়!

তাইলে ফারাকটা কই? কেরাইম অথবা পাপের আইডিয়ার গোড়ায় আছে হকের আইডিয়া; মানুশের কাছে/উপর অন্ন মানুশের (অন্ন মাকলুকাতের) হক আছে, তার লগে আছে খোদার হক। খোদার হক মারার নাম পাপ, আর (খোদার) বান্দার/মাকলুকাতের হক মারার নাম কেরাইম। এখন তাবত মাকলুকাতের জিম্মাদার জেহেতু খোদা, তাই মাকলুকাতের হক মারাও খোদার হকের উপর হামলা কতকটা; তাই কেরাইমগুলাও পাপ; কিন্তু খোদার হক মারলে মাকলুকাতের হক মারা হয় না! তাই মানুশের উপর খোদার হক আদায় করা না হইলে ছেরেফ পাপ হইলো, কেরাইম হইলো না!

এখন মানুশের উপর খোদার হক কি? খোদার হক ২ টা ধরা জাইতে পারে বা ১ টাই আখেরে–ইমান এবং/বা এবাদত। নামগুলা জুদা হইলেও ধর্মগুলার ভিতর বৌদ্ধ আর ছেকুলারিজম/ইভলুশনিজম বাদে ইমান আর এবাদতের আইডিয়া খুবই পোক্ত, ঐ দুইটায় একটু আলগা বটে। তাই এই দুই ধর্মে ঐ অর্থের পাপের আইডিয়া তেমন পাইতেছি না; বৌদ্ধ ধর্মে পাপ আর কেরাইম, দুইটা একলগে মনে হয় ‘পাপ’ হিশাবেই আছে, কিন্তু এই পাপের শাজা খুব নেচারাল– কোন খোদায়ি বিচার বাদেই আবারো দুখের জিন্দেগিতে ফেরত আশতে হওয়া। আর ছেকুলারিজম/ইভলুশনিজম নামের ধর্মে পাপের আইডিয়া থাকার উপায় নাই, এদের মরালিটির আইডিয়া খুবই ঝাপশা, তবে কেরাইমের কিলিয়ার আইডিয়া আছে মনে হয়, এবং এই আইডিয়ার গোড়া হইলো–শমাজ বানাবার চুক্তি না মানা, চুক্তি থিকা বাইরাইয়া জাওয়া।

বহু টাইপের শমাজের ভিতর বহু বহু ধর্মের হাজিরা থাকলেও কেরাইমের আইডিয়া মোটামুটি একই! শমাজ বানাবার চুক্তির ভিতর দিয়া জেমন কতগুলা হক পয়দা হয়, বেশিরভাগ ধর্মেও তেমনি মাকলুকাতের হক পাওয়া জাইতেছে এবং এই হকগুলা আদায় না করলে কেরাইম ঘটতেছে। বৌদ্ধ ধর্মে ‘পাপ’ এবং ‘শাজা’ খুব পার্ছোনাল হইলেও শমাজে জখন এই ধর্মটা ১ নাম্বার হয়, তখন কোন এক তরিকায় মরালিটি বানাইয়া লইতে হয়, লয়; চিনে জেমন মনে হয় কনফুছিয়াস থিকা মরালিটি লইয়া বৌদ্ধ ধর্ম শামাজিক হইয়া উঠতেছে।

তো, এই জে হকের আইডিয়া, এই হক মারার নাম কেরাইম এবং কারো হক মারা গেলে/হইলে তার ফয়ছালা করার নাম জাস্টিস ছিস্টেম বা ইনছাফ; তাইলে ইনছাফের মোকাম বা মনজিল হইলো ভিকটিম বা মজলুমকে খুশি করা, জুলুমের খতিপুরন, তার মাইরা দেওয়া হক আদায় কইরা দিয়া তারে খুশি করার ছিস্টেম। দুনিয়ার শকল জাস্টিস ছিস্টেমই তাই, মাকলুকাতের হকের তদারক করা, মাকলুকাতের উপর ছেরেফ খোদার হকের বা পাপের ফয়ছালা করা না।

পাপের ফয়ছালা বা মাকলুকাতের উপর খোদার হকের তদারক করতে জাবার নাম খোদার শরিক হইতে চাওয়া; তখন কিছু মাকলুকাত আর মাকলুকাত থাকতে চাইতেছে না, তখন তাগো কাছে অন্ন মানুশ/মাকলুকাতের হক ঝুকিতে পড়ার শম্ভাবনা, তারা বেশি পাওয়ারফুল হইয়া উঠতেছে, দুনিয়াবি জিস্টিস ছিস্টেমের আওতায় থাকতেছে না, খোদ জাস্টিস ছিস্টেম তাগো দখলে চইলা জাবার ঝুকি পয়দা হয় তখন!

এখন তাইলে শুরুর পোশ্নে ফেরত জাই; মানুশের জনম দেওয়া পাপ কিনা; জানি না আমরা, কোন ধর্ম অন্তত তেমনটা কইতেছে না, এমনকি বৌদ্ধ ধর্মও না। ধর্মগুলার এই বলাবলির বাইরে কিছু আছে কিনা, তা মানুশের চিন্তার আওতার বাইরে, তা খোদায়ি মামলা। বরং কেরাইম কিনা, শেই আলাপ করা জায়; এবং শেইটা ছোট্ট আলাপই, কেননা, জনম দেওয়াটা কেরাইম হিশাবে দেখাদেখি নাই দুনিয়ায়! তবে, কেউ কেউ পার্ছোনালি নিজের জনমকে বাপ-মায়ের কেরাইম হিশাবে দেখে, দেখতে পারে; কিন্তু শেইটা পোরমান করার উপায় নাই! কারন, কেরাইম হইতে হইলে তার হক মারতে হবে মা-বাপের; খোদ জনমের আগে শামাজিক/দুনিয়াবি অর্থে শে জেহেতু আছিলোই না, তাই তার হক বইলাও কিছু পাওয়া জাইতেছে না! আর একবার শে পয়দা/নাজিল হবার পরে তারে বাচাইয়া রাখাটাই বরং মা-বাপের কাছে তার হক! তবে শে জতোদিন নাবালক ততোদিন তারে পালার মানে হইলো আশলে মা-বাপ তারে কর্জ দিতেছে! শাবালক হবার পরে এই কর্জ আবার ফেরত দেবার কথা তার; ঐটা কর্জ হবার কারনেই পরে মাইয়া-পোলার কাছে মা-বাপের হক পয়দা হইতে পারলো। তবে একটা ভালো ছোসাইটি/শমাজ একটা ছিস্টেম খাড়া করায়, তারা একটা কমন ফান্ড বা বায়তুল মাল বানায়, জেইখান থিকা গরিব বা বুড়াদের মদদ দেয়; নাইলে মাইয়া-পোলার উপর অনেক অনেক চাপ পড়তে পারে, নিজেদের মাইয়া-পোলা পালার লগে লগে বাপ-মা’রে পালতে হওয়া বিরাট চাপ হইতে পারে অনেকের জন্নই।

শুরুতে ঐ জনম দেওয়া পাপ বা কেরাইম কিনা, শেই ফয়ছালার দরকার আছিলো। নাইলে জে কেউ তার উপর অন্নের হক মানতে নারাজ হইতে পারে! কইতে পারে জে, আমি কি কইছি জনম দিতে? আমারে জনম দিয়া আমার মা-বাপ জেই কেরাইম করলো, আমার মা-বাপের শোয়ার এন্তেজাম কইরা শমাজ জেই কেরাইম করলো, তাতে তাগো কাছে আমার বেশুমার হক পয়দা হয়, আমার শারা জিন্দেগি তাগো কাছে/উপর আমার হক আদায় করতে হবে শমাজ আর আমার মা-বাপের! তাই শুরুতেই দেখাইলাম জে, তেমন দাবি করার উপায় নাই এবং মানুশের উপর অন্নের হকই নর্মাল এবং শেইটা আদায় করতে হবে, নাইলে কেরাইম ঘটে!

ধর্মগুলায় দেখতেছি, খোদা মানুশকে ইনছাফ কায়েম করতে কইতেছে, মানে আপনার কাছে অন্ন মানুশের বা মাকলুকাতের জতো হক আছে, শেইগুলা আদায় করতে কইতেছে; মানুশের কাছে খোদার হকের জিম্মাদার খোদা নিজেই, মানুশকে তার জিম্মাদার বানায় নাই। বান্দার লগে খোদার রিশতা খুবই ডাইরেক, খুবই পার্ছোনাল; কোন কোন ধর্মে আমরা কতক ইজারাদার দেখি, চার্চ বা বামুন জেমন খোদার হকের জিম্মাদার হবার দাবি করে পেরায়ই; কিন্তু এইটা খোদ ধর্মের মর্মে ততো নাই! নাই জে, তার পোরমান হইলো, বেহেস্ত-দোজখের আইডিয়া, বান্দারে দোজখের/বিচারের ব্যাপারে হুশিয়ার করা, পোরতি বান্দার কাছে ছেজদা আদায় করতে চাইতেছে খোদা। খোদার আইডিয়া জদি খেয়াল করি আমরা, তার পরম পাওয়ার জদি আমলে লই তাইলে বুঝবো জে, খোদার জিম্মাদার লাগে না, তার ইচ্ছা মোতাবেক ঘটতে বাদ্ধ দুনিয়াদারি! Continue reading

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য