Main menu

অলঙ্কার না Badge of slavery? – রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ( ডিসেম্বর ৯, ১৮৮০ – ডিসেম্বর ৯, ১৯৩২), যিনি বেগম রোকেয়া নামে বেশি পরিচিত, উনার লেখাপত্র অনেক পাবলিশারই বই হিসাবে ছাপাইছেন, অনলাইনেও উনার লেখা এভেইলেবল, খুঁজলে পাওয়া যায়। গল্প-কবিতা-উপন্যাস লেখলেও ‘সুলতানা’স ড্রিম’র বাইরে উনার নন-ফিকশন লেখাগুলাই এখনো পপুলার। সুলতানা’র স্বপ্ন একটা ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক আসলে।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসনের বাপ জহীরউদ্দিন মোহাম্মদ আলী হায়দার সাবের ছিলেন রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ গ্রামের জমিদার। রোকেয়া উনার আম্মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরাণী’র লগে কলকাতায় থাকার সময় একজন ইংরেজ মহিলার কাছে কিছুদিন পড়াশোনা করছিলেন। উনার বাপ উনারে ফরমাল পড়াশোনা করতে দেন নাই। ভাই-বইনের কাছ থিকা এবং নিজের আগ্রহে উনি বাংলা, উর্দু, ফারসি, আরবি এবং ইংরেজি ভাষা শিখছিলেন। উনার লেখাতেও অইসব ভাষার টেক্সটের রেফারেন্স পাইবেন।

১৮৯৮ সালে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখওয়াৎ হোসেনের সাথে উনার বিয়া হয়। বিয়ার পরে সাখওয়াৎ হোসেন রোকেয়ারে উনার পড়াশোনার ব্যাপারে হেল্প করেন। ১৯০২ সালে রোকেয়া’র ফার্স্ট লেখা ছাপা হয়। উনাদের দুইটা বাচ্চা হইলেও অল্প বয়সে দুইজনই মারা যায়। ১৯০৯ সালে সাখায়াৎ হোসেন মারা যাওয়ার পরে উনার রাইখা যাওয়া টাকা দিয়া ভাগলপুরে “‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল” বানাইছিলেন রোকেয়া। কিন্তু ফ্যামিলির চাপে উনারে কলকাতাতে চইলা আসতে হইলে ১৯১১ সালে কলকাতাতে একই নামে একটা স্কুল চালু করেন। মেইনলি এই এক্টিভিজমের কারণেই উনি সমাজে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩২ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত উনি উনার এই সোশ্যাল এক্টিভিজম চালু রাখছিলেন।

উনার চিন্তার একটা ঘটনা হইতেছে, চিন্তা ও কাজের মিল। উনি যেই কাজ করছেন, সেইটার লগে মিলায়া চিন্তা করছেন বা যেই চিন্তা করছেন, সেইটা নিয়া কাজ করছেন। (কোন আইডিওলজির কাছে নিজেরে প্রাকটিক্যালিটিরে বন্ধক রাখেন নাই।)  উনার চিন্তা ও কাজ একটা সময়ে অনেক মানুশরে ইনফ্লুয়েন্স করছে, নতুনভাবে ভাবাইতে পারছে।

এখন যখন ‘নারী-শিক্ষা’ ব্যাপার’টা সমাজে আর ‘অশ্লীল’ বা ‘নাজায়েজ’ কোন জিনিস না, মনে হইতে পারে যে, উনার চিন্তার রিলিভেন্স মেবি কমে আসছে। কিন্তু উনার লেখাগুলা পড়লে সেইটা ভুল মনে হইতে পারবে বইলা আমরা মনে করি। ‘নারী-শিক্ষা’ জিনিসটারে উনি একটা টুল হিসাবে ভাবছেন, অইটারেই মঞ্জিলে মাকসুদ ভাবেন নাই।

২.
উনার এই লেখাটা বাংলা ১৩১০ সনে (ইংরেজি ১৯০৩ সালে) গিরিশচন্দ্র সেন সম্পাদিত “মহিলা” পত্রিকার বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় সংখ্যায় ছাপা হইছিল। ১৩১১-তে নবনূর পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ নামে এবং মতিচূর বইয়ে লেখাটা ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামে ছাপা হইছিল। “স্ত্রীজাতির অবনতি” নামে এডিটেড ভার্সনটাই অনেক জায়গায় পাইবেন।

“মহিলা” পত্রিকা শুরু হয় বাংলা ১৩০২ সনে, কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্মসমাজ এর স্পন্সর ছিল, আর এডিটর ছিলেন গিরিশচন্দ্র সেন। ১৩১৭ সনে গিরিশচন্দ্র সেন মারা গেলে বজ্রগোপাল নিয়োগী এর এডিটর হইছিলেন, কিন্তু এরপরে বেশিদিন আর চালু থাকে নাই।

এই লেখা ছাপা হওয়ার পরে রোকেয়ার এই লেখা নিয়া অনেক তর্ক হয়, অনেকেই লেখাটার “প্রতিবাদ” করেন, সম্পাদক গিরিশচন্দ্র সেনও মোটামুটি ব্যালেন্স কইরা একটা “সম্পাদকীয়” লেখেন। “মহিলা” এবং “নবনূর” পত্রিকা’তে ছাপা হওয়া অই লেখাগুলা আমরা খুঁইজা বাইর করতে পারি নাই। (কেউ যদি খুঁইজা দিতে পারেন, তাইলে তো আমাদের উপকারই হয়।) কিন্তু অল্প কিছু অংশ বাংলা একাডেমি’র ছাপা-হওয়া “রোকেয়া রচনাবলী”তে আছে, অংশগুলা লেখার শেষে রাখা হইলো। খেয়াল করলে দেখবেন, রোকেয়াও উনার টাইমে কোন “সেলিব্রেটেট” রাইটার ছিলেন না, বরং একজন “কন্ট্রোভার্সিয়াল” রাইটারই আছিলেন।

৩.
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের চিন্তা ও কাজকাম’রে দুইটা জায়গা থিকা দেখার ধরণ এখন সমাজে চালু আছে। এক হইতেছে, উনি সমাজে “নারী-শিক্ষার” পসার ঘটাইছিলেন, “পিছিয়ে পড়া সমাজে” “নারী-স্বাধীনতার প্রতীক” ছিলেন। এর বিপরীত ঘরানা হইতেছে, “উনি তো ইংরেজ কলোনিয়ালদের খাতিরের লোক ছিলেন”, “কলকাতায় যখন স্বদেশী আন্দোলন চলতেছে তখন ইংরেজদের ডোনেশন নিয়া স্কুল চালাইছেন”। এমনকি এই “বির্তক” মোকাবেলা করতে গিয়া উনারে “পোস্ট-কলোনিয়াল” হিসাবে আইডেন্টিফাই করার আলাপও চালু আছে, স্পেশালি উনার “সুলতানা’র ড্রিম”রে বেইজ কইরা। (এইটা এক ধরণের গ্লোরিফিকেশনের জায়গা থিকাই আসে, যেইটা নিয়া সাবধান থাকাটা দরকার।)

কিন্তু আমরা বলবো, এইরকম “হিরো ভার্সেস ভিলেন” এর ক্যাটাগরি থিকা উনার কাজকামরে বিচার কইরেন না। ভুল হবে সেইটা। বরং একটা নেগোশিয়েশনের জায়গা থিকা দেখেন। দুইটা পক্ষের লগে নেগোশিয়েট করতেছেন উনি। রোকেয়া ইংরেজদের পক্ষের লোক যেমন ছিলেন না, একইরকমভাবে ইংরেজ-বিরোধী ন্যাশনাল-মুভমেন্টে নারীদের রিকগনিশনের কোন জায়গাও যে নাই, এই জিনিস ইন্ডিকেট করার ভিতর দিয়া “স্বরাজ” বা ইনকিলাব-বিরোধী হয়া যান নাই। উনি বরং “নারী-প্রশ্ন”টারে সেন্টার করতে চাইছেন: “পুরুষদিগকেও বলি,—ভ্রাতৃগণ ! আমরা স্বাধীন না হইলে তোমরাও স্বাধীন হইবে না। নিশ্চয় জানিও, আমরা যত দিন নরাধীনা থাকিব তোমরাও তত দিন পরাধীন থাকিবে। তোমরা আমাদের উপর প্রভুত্ব কর বলিয়া তোমাদের উপর আর এক জাতি আধিপত্য করিতেছে।”

আমরা কোন অতীতে ফিরা যাইতে পারি না, কখনোই। যেইটা করতে পারি, আমাদের ফিউচার’রে তৈরি করতে পারি, বা সেইটাই করতেছি আসলে আমাদের বর্তমানের কাজকামের ভিতর দিয়া। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনও এই কাজটা করছেন, একটা ফিউচার তৈরি করতে চাইছেন, কোন অতীতে ফিরা না গিয়া। এইটা করতে গিয়া ইউরোপিয়ান-চিন্তার লগে এক ধরণের মোকাবেলা করতে চাইছেন। উনার এই মোকাবেলার জায়গাগুলারে রিকগনাইজ করতে পারাটা জরুরি, গ্লোরিফাই বা ভিলিফাই করার চাইতে।…

এই কারণে উনার ইম্পর্টেন্ট টেক্সটগুলারে আমরা এভেইলেবল রাখতে চাই যাতে নতুন কাউরে নতুন চিন্তা করতে এই লেখাগুলা হেল্প করতে পারে।

তো, আসেন, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসনের লগে দেখা হোক, কিছু বাতচিত হোক আমাদের, আবার!

এডিটর, বাছবিচার
…………………………

ভগিনীগণ!

তোমরা কি কোনদিন আপনার দুর্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যসমাজে আমরা কি, দাসী!! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসায় উঠিয়া গিয়াছে শুনিতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? আমরা যে নরাধীন সেই নরাধীন! দিদীমাদের মুখে শুনি যে, নারী নরের অধীন থাকিবে, ইহা ঈশ্বরেরই অভিপ্রেত— তিনি প্রথমে পুরুষ সৃষ্টি করিয়াছেন, পরে তাহার সেবা শুশ্রুষার নিমিত্ত রমণীর সৃষ্টি হয়। কিন্তু একথার আমার সন্দেহ আছে। কারণ দিদীমাদের এ জ্ঞান পুরুষের নিকট হইতে গৃহীত। তাহারা ত বলিবেনই যে, রমণী কেবল পুরুষের সুখ শাস্তিদাত্রিরূপে জন্মগ্রহণ করে।

২ আমি আদিম কালের ইতিহাস জানি না বটে, তবু বিশ্বাস করি যে, পুরাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমরা এরূপ দাসী ছিলাম না। মানুষ যেমন ক্রমে সভ্য হইয়াছে— গায়ে রঙ মাখা ছাড়িয়া কাপড় পরিতে শিখিয়াছে, তেমনই ক্রমে বাহুবলে ও বুদ্ধিকৌশলে নারীজাতির উপর আধিপত্য করিতে আরম্ভ করিয়াছে। ঈশ্বর এমন পক্ষপাতী নহেন যে, এক জাতিকে অন্য জাতির অধীন করিবেন। যদি তাই হইত তবে সৃষ্টিকৰ্ত্তা পুরুষের যেমন দুই হস্ত দুই চক্ষু সৃষ্টি করিয়াছেন, রমণীরও সেই প্রকার অবয়ব সৃজন করিলেন কেন? কই দ্বিমস্তক পুরুষ বা নাসাহীনা রমণী কোন্ দেশে আছে? এরূপ ত সৃষ্টিবৈচিত্র্য কোথাও দেখা যায় না। তবে কেমন করিয়া বলিব ঈশ্বর পক্ষপাতী? যে সমাজ রাজা ও প্রজার সৃষ্টি করিয়াছে, পুলিশ প্রভু ও বড়লাট প্রভুর মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি করিয়াছে, সেই সমাজ নারীকে নরের অধীন করিয়াছে। যে ভূজবলে ও চাতুরী কৌশলে সুচতুর মানুষ বন্য পশুকে করায়ত্ত করিয়াছে- অশ্বের দ্বারা শকট টানাইতেছে, হস্তীকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বাধিয়াছে, পশুরাজকেশরীকে লৌহপিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়াছে, সেই বাহুবলে ও বুদ্ধিবলে নারীকে তাহারা অধীনতাপাশে বাঁধিয়াছে।

৩ আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষেরা আমাদের মনকে পর্য্যন্ত enslaved করিয়া ফেলিয়াছে। স্বাধীনতা ও অধীনতার যে প্রভেদ তাহা বুঝিবার সামর্থটুকুও আমাদের নাই। কি ভীষণ অধঃপাত। তাঁহারা ভূস্বামী গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্রমে আমাদের “স্বামী” হইয়া উঠিয়াছেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশু পক্ষীর ন্যায় আদুরে হইয়া পড়িয়াছি ! এখন আমরা সমাজের বন্দিনী।

৪ আর এই যে, আমাদের অতি প্রিয় অলঙ্কারগুলি— এগুলি badges of slavery! ঐ দেখ কারাগারে বন্দিগণ লৌনিৰ্ম্মিত বেড়ী পায়ে পরিয়াছে, আমরা (আদরের জিনিষ বলিয়া) স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী পরিয়া বলি “মল পরিয়াছি!” উহাদের হাতকড়ী লৌহনিৰ্ম্মিত, আমাদের হাতকড়ী স্বর্ণ বা রৌপ্যনিৰ্ম্মিত “চুড়ি!” বলা বাহুল্য অনেকে এক হাতে লোহার ‘বালা’ও পরেন ! কুকুরের গলে যে dogcollar দেখি, উহারই অনুকরণে আমাদের জড়োয়া চিক নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। অশ্ব হস্তী প্রভৃতি পশু লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণশৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া বলি “হার পরিয়াছি!” গোস্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া “নাকা দড়ী” পরার, আমাদের স্বামী আমাদের নাকে “নোলক” পরাইয়াছেন !! অতএব দেখিলে ভগিনি, আমাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি badges of slavery ব্যতীত আর কিছুই নহে ! আবার মজা দেখ, যাহার শরীরে badges of slavery যত অধিক, তিনি সমাজে ততোধিক মান্যা গণ্যা।

৫ এই অলঙ্কারের জন্য আমাদের কত আগ্রহ— যেন জীবনের সুখসমৃদ্ধি উহারই উপর নির্ভর করে! তাই দরিদ্রা কামিনীগণ স্বর্ণরৌপ্যের হাতকড়ী না পাইয়া কাচের চুড়ি পরিয়া দাসীজীবন সার্থক করে। যে বিধবা চুড়ি পরিতে অধিকারিণী নহে, তাহার মত হতভাগিনী এ জগতে নাই !! অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূক গহনা ভাল লাগে। অহিফেন তিক্ত হইলেও আফিংচির অতি প্রিয় সামগ্রী। মাদকদ্রব্যে যতই সর্ব্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না। সেই রূপ আমরা অঙ্গে badges of slavery ধারণ করিয়া আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি— গর্ব্বে স্ফীতা হই! হায়! আমাদের অধঃপাতের একশেষ হইয়াছে। হিন্দুমতে সধবা স্ত্রীলোকের কেশকর্ত্তন নিষিদ্ধ কেন? তাহা কি একটু চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? সধবানারীর স্বামী ক্রুদ্ধ হইলে স্ত্রীর সুদীর্ঘ কুম্ভলদাম হস্তে জড়াইয়া ধরিয়া তাহাকে সহজে উত্তম মধ্যম দিতে পারিবে ভল্লুকের নৃত্য দেখিয়াছ? সময়ে সময়ে ভল্লুকের সহিত “কুস্তি” করিয়া ভল্লুকস্বামী পরাজিত হইলে তাহার “নাকাদড়ী” ধরিয়া টান দেয়। তখন ভল্লুকবীর অসহ্য যাতনায় অধীর হইয়া জোর কম করে! সেইরূপ সধবা প্রহার তাড়নায় পলায়নতত্পর হইলে স্বামী তাহার কেশপাশ ধরিয়া সবলে আকর্ষণ করে। প্রত্যেক রমণীরই সুদীর্ঘ অলকগুচ্ছ যে ঐরূপে ব্যবহৃত হয়, আমি তাহা বলিতেছি না। তবে কেশবৃদ্ধি দ্বারা সকল স্বামীর জন্য অন্ততঃ ঐ সুবিধাটা প্রস্তুত রাখা হয় !! ধিক্ আমাদিগকে ! আমরা আশৈশব এই চুলের কত যত্ন করি! কি চমৎকার সৌন্দর্য্য্যজ্ঞান ! Continue reading

বাংলাদেশের মিউজিক (১)

আজম খান নামের ঘটনা

১.
বাংলাদেশ মানে যে ঢাকা শহর – এই কালচারাল পরিচয় উৎপাদনই আজম খানের মেইন সিগনিফিকেন্স। আজম খানের আগে (তার সময় এবং এখনো প্রায়) আসলে বাংলা-সংস্কৃতি ছিল (বা আছে) কলকাতা-কেন্দ্রিক হয়া। বাংলাভাষার ‘জনপ্রিয়’ গানগুলি উৎপাদিত হইছে অইখানেই। শচীন, হেমন্ত, মান্নাদে ইত্যাদি। এর বাইরে যদি কাজী নজরুল ইসলাম বা আব্বাসউদ্দীন এর কথাও বলেন, উনাদের স্বীকৃতিটা অই কলকাতা থিকাই আসছে। আজম খানের গানই প্রথম ব্যতিক্রম, যা কলকাতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানায় নাই বা অইখানের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিটারে গুরুত্বপূর্ণ কইরা তোলে নাই।

২.
ত, এইটার প্রতিক্রিয়া বা এফেক্টটাই বা কেমন হইলো? আমার ধারণা, অনেকেরই তথ্য আকারে জানা আছে যে, উনার গানরে একসেপ্ট করা হয় নাই, প্রথমে; কিন্তু সময় যত পার হইছে, ‘বাংলাদেশ’ ধারণাটা যতটা প্রতিষ্ঠিত হইছে, আজম খানের গানও তার স্পেস কইরা নিতে পারছে।

তখন (এবং এখনো) তার গানের বিরোধিতাটা ছিল দুইটা জায়গা থিকা: কলকাতা-কেন্দ্রিকতা এবং গ্রাম-বাংলার অনুসারীরা, এই দুইটা ধারণার লোকজনই তার গানরে নিতে পারে নাই। আসলে গ্রাম-বাংলা বইলা ত কিছু নাই; যা আছে সেইটা পুরানা একটা মিথ, যেইখানে ধারণা করা হইতো যে আছে, সহজ-সরল-স্বাভাবিকতা। আজম খান ‘নগর’ নিয়াই চিন্তিত হইছেন, ঢাকা শহরের গানই তিনি গাইছেন মেইনলি। এইভাবে গ্রাম-বাংলার বাংলাদেশরে যেন তিনি ঢাকা শহর দিয়া রিপ্লেস কইরা ফেলছেন। এইটা একটা ঘটনা, যেইটাতে গ্রাম-বাংলার অনুসারীরা ক্ষিপ্ত হইছেন। কিন্তু তাদের ক্ষিপ্ততাতে আসলে কিছু নাই, কারণ গ্রাম-বাংলা’র কোন সংস্কৃতি তারা নিজেরাও তৈরি করতে পারেন নাই, আসলে গ্রাম-বাংলার নাম দিয়া তারা কলকাতার সফিশটিকেশনরেই সার্পোট করছেন এবং করতেছেন। এর বাইরে এক ধরণের বোকা বোকা গ্রামও উৎপাদিত হইছে কিছুদিন, টিভি নাটকে।

আর যেই নগররে আজম খান রিপ্রেজেন্ট করছেন, তারাই আসলে উনার মূল বিরোধীপক্ষ। এই ঢাকা শহর একটা সময় ছিল মধ্যবিত্তের দখলে (অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়া), এখন এইটা মনে হইতেছে যেন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চইলা যাইতেছে। অনেক মধ্যবিত্তই অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের ভিতর দিয়া নিজেদের কনজামশন পাওয়ার বাড়াইয়া তুলছেন। কিন্তু কালচারাল দখলদারিত্ব মধ্যবিত্তের হাতেই আছে, থাকবেও মনেহয়। কিন্তু মধ্যবিত্তের কালচার দুইদিক দিয়া ধাক্কা খাইলো আজম খানের গান শুইনা: একদিকে সে ঢাকা শহরের বাদাইম্মা লোকজন নিয়া কথা বলে, আবার যেইভাবে বলে, সেইটাতে কলকাতা-কেন্দ্রিক মধ্যবিত্তসুলভ সফিশটিকেশন তার নাই। তাই ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেনীর সংস্কৃতির দিক থিকা তার বিরোধিতা আছে এবং উনারে একসেপ্ট করলেও একটা এক্সটেন্ড পর্যন্ত থাইকাই যাইবো বইলাই মনে হয়।

তাইলে উনার একসেপ্টেনস এর জায়গাটা আসলে কই? প্রথমত, মধ্যবিত্তের রুচিবোধ নিয়া ক্লান্ত তরুণ-সমাজের কাছে তিনি নতুন সম্ভাবনা দেখাইছেন। যে, গান এইভাবেও গাওয়া যাইতে পারে। হারমোনিয়াম ছাড়া গিটার বাজায়া (ইংলিশ গান না খালি) বাংলা-গানও গাওয়া যায়! উনার এই জায়গাটা থিকাই নতুন একটা ধারা তৈরি হইছে। ইন্সট্রুমেন্টের ব্যাপারে ট্যাবু জিনিসটা এবং একই সাথে গায়কি’তে ঢিমে-তালের মেজাজ’টারে এভেয়ড করার জায়গা তৈরি হইছে। সেকেন্ড হইতেছে,উনি ‘পূব’ এর আধ্যাত্মের কথা কইছেন, কিন্তু ‘পাশ্চাত্য’-এর প্রেজেন্টশনটারে নিছেন। ’৬০-’৭০ এর দিকে আমাদের কমিউনিস্ট-শাসিত চিন্তা-ভাবনায় ‘পাশ্চাত্য’ মানেই ছিল বাজে জিনিস, পরিতাজ্য। কিন্তু মধ্যবিত্ত যখন তার অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়া ‘পাশ্চাত্য’রে এক্সপ্লোর করছে, তখন তারা এই ধারণা থিকা বাইর হয়া আইসা ঢাকায় আইকন হিসাবে আজম খানরে পিক করতে পারছে।

থার্ড হইতেছে, ‘লালন-সংস্কৃতি’র পূজা! বর্তমানে অনেকেরই চেষ্টা আছে বলার যে ‘নদীয়াই হইতেছে বাংলাদেশ’; কিন্তু এই নদীয়া’র ভরা জোয়ারে যেইটা হইছে, বাদাইম্মা লোকজনের একটা কালচারাল ভ্যালু তৈরি হইতেছে, সমাজের ভিতরে। আজম খান যেহেতু তাদের নিয়া গান গাইছেন, সেই জায়গাতে উনারে একসেপ্ট করা যাইতে পারে! ওই নিন্মবর্গ, নিন্মবর্গ আর কি!!

কিন্তু আরেকটা বিষয় আছে, আজম খান তার গানে যেইখানে নগরের বাদাইম্মা গোষ্ঠীরে নগরের ভিতর স্বীকার কইরা নিছেন, সেইটার অস্বীকার ত নগর-চিন্তার একদম মর্মমূলে। তাই এই স্বীকার বা অস্বীকারের খেলাটা আসলে অনেকদূর পর্যন্তই যাইতে পারে। Continue reading

এডিটোরিয়াল: বাকশালি ডিসিশান নাগরিকের এজেন্সিরেই আরেকবার বাইপাস করে মূলত

মজলুমের পক্ষে প্রত্যেকটা এক্টরে আনরিমার্কেবল প্রমাণ কইরা, ইনসিগনিফিকেন্ট তকমা দিয়া আপনে যতই জালিমের বিরোধিতা করেন না কেন, আদতে ওইভাবে জালিমের এক্টরে লেজিটিমাইজই করতে থাকেন ধাপে ধাপে।

পারভেজ আলম এই কাম করতেছেন ধারাবাহিকভাবে। তিনি মোদি আসার প্রতিবাদে গরু জবাই করারে ভিলিফাই করছেন। গরু জবাইকারিদের সাইকো সাব্যস্ত করতে চাইছেন। কেন মোদি বিরোধিতায় গরু জবাই করা যাবে না? সেই প্রসঙ্গে উনি যেইসব কথা বলছেন, তাতে বাংলাদেশে গরু জবাই করাই ইলেজিটিমেট হইয়া যায়। কইছিলাম ওই সময়, গরু জবাই যদি থাকে বাংলাদেশে মোদি বিরোধিতায় গরু জবাই না থাকতে পারার কোন এক্সক্লুসিভ কারণ নাই।

মাদ্রাসার ছাত্র খুন করার পর, উনিও কইতে থাকলেন হেফাজতের ইউজ করার কথা। ওই কর্মসূচি হেফাজতের ছিল না। মাদ্রাসার ছাত্রদের যে কোন স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদরেও যখন ওই ইউজ করার নেরেটিভ দিয়া বোঝা লাগে, তখন আসলে ওই ছাত্রদের যে কোন সময় খুন করার রাইটই সরকারি বাহিনীর হাতে তুইলা দেওয়া হয়। মাদ্রাসার স্টুডেন্টদের খুনের প্রতিবিধানে কার্যত আর কোন পথই খোলা থাকে না এর পর। ওই নেরেটিভ এতটাই উবিকুইটাস।

আর এখন উনি, ‘এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ দিয়া যে কোন লাভই নাই, ইসরায়েলের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক না রাখার যে কোন মানেই নাই, সেই তত্ত্ব উৎপাদনে হাত দিছেন। প্রশ্নটা হইতেছে যেমনে সিভিল সমাজের সাথে কোন প্রকার আলোচনা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নিছে বাকশালি জোচ্চোরগুলি সেইটা নেয়া যায় কিনা। এই প্রশ্ন টপকায়ে যখন- ‘এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ রাইখা কোন লাভই নাই- এমন আলাপের অবতারণা ঘটে, তখন তখনই তার মধ্য দিয়া সরকারি ওই চোরা ডিসিশানের হালালিফিকেশন শুরু হয়। পারভেজ আলমের এই এপ্রোচ র‍্যান্ডম নয়; ধারাবাহিক। ফলেই সন্দেহজনক।

আর যদি আপনে লাভের কথাই চিন্তা করেন, মিডল ইস্টের ইসরায়েল-ফিলিস্তিনে কি হইতেছে না হইতেছে বাংলাদেশে বইসা বাংলাদেশের পিপল তাতে কখনোই প্রভাব ফেলতে পারবে না, পারে নাই; পারভেজেরা সত্তর-আশির দশকের কথা কন, আসলে ওই সময়ও এর কোন সিগনিফিকেন্স ছিলো না। ওই কনক্রিট সিগনিফিকেন্স দিয়া মাপার এইখানে কোন বেসিসই নাই। এর সিগনিফিকেন্স সব সময়ই সিম্বোলিক। এবং এই সিগনিফিকেন্স এখন আরও বেশি, যখন মিডলইস্টেও ইসরায়েলি জুলুমের একটা সার্বিক নর্মালাইজেশন শুরু হইছে, তখনও এর বিপক্ষে নীতিগত অবস্থান ধইরা রাখার বাংলাদেশী সিটিজেনদের যে কসম, সেইটা বিডির সিটিজেনদের এজেন্সিরে প্রিজার্ভ করার কসম মূলত। সেইখানে ইসরায়েলের লগে সম্পর্ক ঠিক করার বাকশালি ডিসিশান(কার্যত) নাগরিকের এজেন্সিরেই আরেকবার বাইপাস করতে চায়। পারভেজেরা বুইঝা হউক বা, না বুইঝা তারেই আবার নর্মালাইজ করতে লাগছে।

এই নর্মালাইজেশন দুইটা কাম করেঃ এক বাকশালের যে ‘দরমুজ টাইপ’ ডিসিশান নেয়ার স্ট্রাটেজি তারে কবুল কইরা লয়, এবং দুই সিটিজেনদের ন্যায় ও অন্যায়ের ফারাক করতে পারার যে অর্গানিক এবিলিটি তারে ধীরে এনিস্থেটাইজ করতে থাকে। দীর্ঘাবসারে এই দুইটার কোনটাই কাম্য হইতে পারে না যদি না কেউ নিঝুম মজুমদারবৎ ঘোর বাকশালি হইয়া থাকে। বাকশালিরা দেশের ‘মুসুলমান’দের ব্যাপারে খোলামেলাভাবেই দরমুজ টাইপ ডিসিশান নেয়ার পক্ষপাতি এখন। উনারা ইসরায়েলরে সাপোর্ট দেয়ার ক্ষেত্রেও ন্যায্যতার জায়গা নিয়া ভাবতে চায় না আর। এই লাইনে যেকোনো ভাবনারে আমাদের তাই রিচেক-রিভিউয়ের ভেতর রাখা দরকার, তা পারভেজ আলম, মানে দৃশ্যত নন-বাকশালি কেউ, ভাবলেও।

Continue reading

মারজুক রাসেলের কবিতা

………………………

।। চাঁদের বুড়ির বয়স যখন ষোলো ।। অরণ্যভ্রমণ ।। মারজুক শা’র মাজার ।। হ্যান্ডিক্র্যাফট ।। মুরুব্বিরা ইন-লক পছন্দ করেন না ।। চিতাইপিঠা ।। মেয়েদের জিনিস ।। অল্টারনেটিভ ।। সেমি-ডাবল-লাইফ ।। বালিশ নিক্ষেপ ।। খরগোশ, সহনশীল উচ্চতা থেকে ।। ভাগ্যবান নামের একজন স্লিপ-ওয়াকার আমারে বলেছিল এইগুলো লিখে রাখতে ।। বৈবাহিক অবস্থা: □ অবিবাহিত □√ বিবাহিত ।।
………………………..

 

চাঁদের বুড়ির বয়স যখন ষোলো

আমি ইশকুলকে নাইনে পড়াই। লাইন (প্রেম!) করার চেষ্টা বলে ‘চালিয়ে যাও’… চালাতে গিয়ে বন্ধুকে দাঁড় করিয়ে তার সাইকেল, সাইকেল-আরোহণ, লক্ষ্য রিকশা, রিকশার মেয়েটা, মেয়েটার ইশকুল, ইশকুলের গেট থেকে দারোয়ানের তেল-চকচকে লাঠি আর রাগী চোখ দেখে ফিরে আসা। লুকিয়ে ধুমপান। পয়সা অনুকূল টাকায় উত্তীর্ণ হলে সিনেমা-হল, ফারুক-ববিতা। সেলুন দেখলেই ঢুকে পড়া, চুলসহ নিজেকে আঁচড়ে নেয়া। ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য’ নোটিশের পুস্তিকা দেরত দিতে যাওয়া সন্ধ্যা, সন্ধ্যামালতী। টেক্কা-সাহেব-বিবি-গোলামের ব্যবহার শেখানো বয়োজ্যেষ্ঠদের পেছনে লেগে-থাকা রাত্রি, টুয়েন্টি নাইন, কলব্রিজ, ব্রিজ… । বাকি চাইবার আগে দোকানের বেড়ায় টাঙ্গানো ‘বাকী দেয়া বড় কষ্ট, বাকিতে বন্ধুত্ব নষ্ট’- লেখাটাকে মনেমনে আবজর্না-পর্যায়ে ছুঁড়ে ফেলা। বাবার পকেট, পকেট থেকে দুচারখানা ছোট নোট সরানো, ধরা পড়ে যাওয়া, আমার উপস্থিতিতে মাকে শুনিয়ে বাবার (বড় হলে চোর হবে) ভবিষ্যদ্বাণী । … কোন বাড়ির একতলা-দোতলা-তেতলা-চারতলা-পাঁচতলার বারান্দায় দিকটায় শুকোতে দেয়া যাবতীয় নারীপোশাকে দৃষ্টি আটকানো আমার ১৭, আমার অন্যায়…

মুরব্বিস্থানীয় নিকটজনেরা বয়সকে দোষ দেয়। বয়স আমাকে পুনরায় প্রশ্রয় দিয়ে বোঝায়- ‘চাঁদ ও তার বুড়ি, দুইজনেই কলঙ্কের সমান অংশিদার।’

 

অরণ্যভ্রমণ

মোটামুটি এক প্রবেশপথের
মুখে একটা ময়ূরী দেখে
ফিরে আসলাম বিভূতিভূষণ।

 

মারজুক শা’র মাজার

দম।
দমে মুক্তি, দমে পুণ্য
‘শূন্য আকাশ আকাশ শূন্য…’
জিকির বাড়বে আকাশ আকাশ,
তাহলেই সবুজসুমতি মৃতপ্রায় ঘাস।
দানবাক্স অক্সিজেন, প্রেম ছাড়া কিছুই গ্রহণ করে না।
হে-এএএই, অন্ধকারে কে যাচ্ছ? দাঁড়াও;
মারজুক শা’র মাজার সামনে-
‘শূন্য আকাশ আকাশ শূন্য…’ জিকিরটা বাড়াও।

 

হ্যান্ডিক্র্যাফট

‘যার কেউ নাই তার ‘হাত’ আছে’ –
এই বাক্য নিউজপ্রিন্টে
নীল কালিতে লেখার পরে
ঘি-রং আঠায় কে লাগালো
থুড়থুড়ে বটগাছে?
যার কেউ নাই তার হাত আছে!
‘যার হাত নাই, তার?’
সন্ত বলল, “আহাহহাহা…।’

Continue reading

তর্ক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম-প্রমথ চৌধুরী

এইরকমের একটা ধারণা তো এখনো আছে যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ‘কাল্পনিক’ ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেন বাংলাদেশের ‘সাম্প্রদায়িক মুসলমানরা’। কিন্তু উনারা দুইজনেই তো ছিলেন ‘অসাম্প্রদায়িক’, অ্যাজ ইফ উনাদের মধ্যে সাহিত্যিক কোন ডিফরেন্সও নাই! তো, এইটা আসলে সত্যি কথা না। একটা সময়ের মানুশ হিসাবে, একই এলাকার এবং একই ইন্টারেস্টের মানুশ হইলে পারসোনাল যোগাযোগ, ভক্তি-শ্রদ্ধা-সম্মান এইসব থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এইটা কখনোই না যে, উনারা একই আইডিওলজির লোক! রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল ইসলাম নিয়া এই ভুল ধারণা বাজারে এখনো কম-বেশি চালু আছে।

তো, এই তর্কের জায়গাটা দিয়া কিছুটা খেয়াল করা যাইতে পারে, উনাদের ডিফরেন্সের জায়গাটা কই ছিল, বা আছে? পয়লা কথা হইতেছে, এইটা খালি সংস্কৃত-শব্দ আর আরবী-ফার্সি শব্দের মামলা না, যেইটা প্রমথ চৌধুরী পরে বুঝাইতে চাইতেছেন, বরং ঘটনা’টা হইতেছে “পাবলিকের ফর-এ” আর “পাবলিকের এগেনেস্টে”। নজরুলরে রবীন্দ্রনাথ কইছেন, “… তোমাকে জনসাধারণ একেবারে খানায় নিয়ে ফেলবে” মানে, পাবলিকের লাইগা লেইখো না! পাবলিকরে কেয়ার কইরো না! পাবলিক তো ‘সাহিত্য’ বুঝে না! এইরকম। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীদের এই মত এখনো ডমিনেন্ট যে, ‘সাহিত্য’ করতে চাইলে পাবলিকের চিন্তা বাদ দিতে হবে। এখন এর এগেনেস্টে কাজী নজরুল ইসলাম যে ‘পাবলিক যা খায়’ সেই সাহিত্য করছেন বা করার কথা বলছেন – তা না; কিন্তু উনি ধরে নিছেন, সমাজে মানুশ আছে, মানুশ কবিতা পড়ে, গান শুনে, কবি হিসাবে সমাজের বাইরের মানুশ না উনি। মানুশ যেমনে কথা কয়, যেই জিনিস ভাবে, সেইগুলা আমার সাহিত্যে আসতে পারে, আসলে ভালো। এইরকম। এইটা হইতেছে বেসিক ডিফরেন্সের জায়গা।

সেকেন্ড হইতেছে, ‘সামাজিকতার ঘটনা’টা। সোশ্যাল পজিশনের ঘটনাগুলা আছে সমাজে এবং ‘কবি হওয়া’ ব্যাপারটাও এর বাইরে না। খালি নজরুলের গরিবি নিয়াই রবীন্দ্রনাথ আর উনার এলিট সঙ্গপাঙ্গরা ‘মৃদুহাস্য’ নামে টিটকারি মারছেন – তা না, খুঁজলে এইরকম টিটকারির নমুনা আরো পাওয়া যাবে। মানে, মিনিমাম একটা সোশ্যাল স্ট্যাটাস মেইনটেইন না কইরা ‘কবি’ ‘সাহিত্যিক’ তো হইতে পারবেন না আপনি সমাজে! হইলেও, অইগুলা আপনারে মাইনা নিতে হবে। জগদীশ গুপ্ত’র লগে আলাপেও এই জিনিস পাইবেন, আল মাহমুদের অটোবায়োগ্রাফিতেও এইসব রবীন্দ্র-বান্দরদের দেখা পাইবেন। যে, ‘কবি’ হিসাবে একটা এলিট ক্লাসের (মধ্যবিত্ত সমাজের) লোক আপনারে হইতে হবে, না হইলে অই ক্লাসের ‘রুচি’ মাইনা আপনারে চলতে হবে। কাজী নজরুল ইসলাম যে সেইটা করতে চান নাই – তা না, কিন্তু উনি ঘাড়-তেড়ামি করছেন। কারণ উনি জানেন, কলকাতার এই সাহিত্য-সমাজ উনারে কবি বানায় নাই, পাবলিকের কাছে উনি কবি হইছেন। এতে কইরা উনার কবিতা ভালো হইছে কি খারাপ হইছে – সেইটা ঘটনা না, কিন্তু উনার সিগনিফিকেন্সের জায়গাটা অইখানে। এই যে, সাহিত্য-সমাজ’রে ‘ছোট’ কইরা ফেলা – এইটা উনারা সহজে নিতে পারার কথা না, নেনও নাই উনারা। কাজী নজরুল ইসলামের এগেনেস্টে প্রপাগান্ডাগুলা এই সোশ্যাল পজিশনের জায়গা থিকাই আসছে বেশিরভাগ সময়।

থার্ড বা লাস্ট জিনিসটা হইতেছে যে, এর কোন সরাসরি দাবি আপনি পাইবেন না। বলা হবে, ছন্দ তো মিলে না! শুনতে তো ভালো লাগে না! নিয়ম তো নাই! এইরকম। মানে, ভিতরে ভিতরে, সাবভারসিভ লেবেলে এইটা চালু আছে, থাকতেছে সবসময়। কথা কইতে গেলে, বলা হবে, কই, এইরকম কিছু বলছি নাকি আমরা! বললেও এমনভাবে বলা হবে, যেন লজিক্যাল কিছু বলা হইতেছে, না-মাইনা কোন উপায় নাই, মানুশ যেন বাঁইচা আছে, কিছু নিয়ম মানার লাইগাই। এইরকম ভঙ্গিমাগুলার ভিতর দিয়া বরং বেশি টের পাওয়া যায় অপ্রেশনগুলা। আর যেহেতু কোন ‘প্রমাণ’ নাই বা গোপন কইরা ফেলা হয়, তখন বলাটা সহজ হয় যে, এইগুলা হইতেছে ‘সাম্প্রদায়িক মনোভাবের’ ঘটনা। 

এইটা যে তা না, বাংলা-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের যে আলাদা আলাদা ক্লেইম আছে, এই জায়গাটা এই তর্কের ভিতর দিয়া কিছুটা হইলেও ক্লিয়ার হইতে পারবে বইলা আমরা মনে করি। আর এইটা উনাদের পারসোনাল ভালো-সম্পর্ক বা খারাপ-সম্পর্কের কোন ঘটনা না, বরং সাহিত্যিক পজিশনের ঘটনা। 

আসেন, তিনটা লেখাই পড়ি!

ই.হা.

………………………

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে রবীন্দ্র-পরিষদের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ওয়াজ করেন। পরে সাপ্তাহিক “বাঙ্গলার কথা” পত্রিকাতে ২০ শে ডিসেম্বর ১৯২৭ (পৌষ ৪, ১৩৩৪) সালে এই লেখাটা ছাপা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অতি-আধুনিক বাঙ্‌লা সাহিত্য

এই পরিষদে কবির অভ্যর্থনা পূর্বেই হয়ে গেছে। সেই কবি বৈদেহিক; সে বাণীমূর্তিতে ভাবরূপে সম্পূর্ণ। দেহের মধ্যে তার প্রকাশ সংকীর্ণ এবং নানা অপ্রাসঙ্গিক উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত।

আমার বন্ধু এইমাত্র যমের সঙ্গে কবির তুলনা ক’রে বলেছেন, যমরাজ আর কবিরাজ দুটি বিপরীত পদার্থ। বোধহয় তিনি বলতে চান, যমরাজ নাশ করে আর কবিরাজ সৃষ্টি করে। কিন্তু, এরা উভয়েই যে এক দলের লোক, একই ব্যবসায়ে নিযুক্ত, সে কথা অমন ক’রে চাপা দিলে চলবে কেন।

নাটকসৃষ্টির সর্বপ্রধান অংশ তার পঞ্চম অঙ্কে। নাটকের মধ্যে যা-কিছু চঞ্চল তা ঝরে পড়ে গিয়ে তার যেটুকু স্থায়ী সেইটুকুই পঞ্চম অঙ্কের চরম তিরস্করণীর ভিতর দিয়ে হৃদয়ের মধ্যে এসে প্রবেশ করে। বিশ্বনাট্যসৃষ্টিতেও পঞ্চম অঙ্কের প্রাধান্য ঋষিরা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন– সেইজন্য সৃষ্টিলীলায় অগ্নি, সূর্য, বৃষ্টিধারা, বায়ুর নাট্যনৈপুণ্য স্বীকার ক’রে সব শেষে বলেছেন, মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ। ইনি না থাকলে যা-কিছু ক্ষণকালের তাই জমে উঠে যেটি চিরকালের তাকে আচ্ছন্ন ক’রে দেয়। যেটা স্থূল, সেটাকে ঠেলে ফেলবার কাজে মৃত্যু নিয়ত ধাবমান। যেটা স্থাবর,

ভয়াদস্যারিস্তপতি ভয়াত্তপতি সূর্যঃ। ভয়াদিদ্ৰশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুৰ্ধাবতি পঞ্চমঃ॥

এই যদি হয় যমরাজের কাজ, তবে কবির কাজের সঙ্গে এর মিল আছে বৈকি। ক্ষণকালের তুচ্ছতা থেকে, জীর্ণতা থেকে, নিত্যকালের আনন্দরূপকে আবরণমুক্ত ক’রে দেখাবার ভার কবির। সংসারে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ অঙ্কে নানাপ্রকার কাজের লোক নানাপ্রকার প্রয়োজনসাধনে প্রবেশ করেন; কিন্তু কবি আসেন “পঞ্চমঃ’; আশু প্রয়োজনের সদ্যঃপাতী আয়োজনের যবনিকা সরিয়ে ফেলে অহৈতুকের রসস্বরূপকে বিশুদ্ধ ক’রে দেখাতে। Continue reading

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য