Main menu

বদ্রিয়ারে পড়া’র রিস্ক

বদ্রিয়ারে পড়া একধরণের রিস্ক নেয়া। আপনি চাইলে নিতে পারেন, নাও নিতে পারেন। জ্য বদ্রিয়া, ফরাসি দার্শনিক, যার সিমুলেশন-সিমুলাক্রামের রেফারেন্স আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া আর অটোমেশনের যুগে হরদম টানা হয়, তার এই ইন্টারভিউগুলা “ফরগেট ফুকো”-নামের বইয়ে ১৯৭৭ সালে পাবলিশ করা হইছিল। অবশ্য তার আগে প্রায় নয় বছর আগে বদ্রিয়ার পিএইডি থিসিস “সিস্টেম অফ অবজেক্টস” পাবলিশ হয়, ১৯৬৮ সালে- সেইখানে তিনি অবজেক্টসের সিস্টেমের এনালাইসিস করছিলেন মডার্ন কনজুমার সোসাইটিরে সামনে রেখে। সিস্টেম, অবজেক্টস, মিডিয়া এইসব থেকে বদ্রিয়া গেছেন এরপরে আরও নানা জায়গায়, ইল্যুশনস, কনজুমারিজম, যুদ্ধসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

বাংলা ভাষায় বদ্রিয়া পরিচিত না। পরিচিত না হওয়ার কারণে বদ্রিয়ারে ভুলভাবে ইন্টারপ্রেট করবার অনেক সুযোগ আছে। আর ইন্টারভিউ যেহেতু কনটেক্সট ধরে আসে না, এইখানে এই আশংকা আরও বেশি। এই কারণে, বদ্রিয়া পড়াটা একধরণের রিস্ক। আর বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ফিলোসফি, দর্শনচর্চার হালহাকিকত খুব করুণ, শোচনীয়। সামাজিকভাবে অত্যাচারিত হইতে হইতে এখন প্রায় মৃতপ্রায়। বাংলায় ফিলোসফির এই মরণের পিছনে নানাবিধ কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের দেশের যে কয়টা জ্ঞান-উৎপাদনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাতে ফিলোসফি/দর্শন কখনোই মৌলিক পাঠ হিসাবে বেড়ে উঠতে পারে নাই। এর কারণ আছে। তবে উন্নতবিশ্বে ফিলোসফি যে খুব উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে তাও কিন্তু বলা যাবে না। ফিলোসফি পড়ে গ্র্যাজুয়েট হলে অটোমেশনের যুগে চাকরির কোন নিশ্চয়তা নাই কিন্তু। আবার গুটিকয়েক ফিলোসফার যাদেরকে আমরা বেশি করে চিনি, তারা যে একটা বড় সোসাইটিকে প্রতিনিধিত্ব করে তাও কিন্তু না। যে কারণে লেইড-ব্যাক বা আর্মচেয়ার ফিলোসফার নামক গালি চালু আছে, এবং পোস্টমডার্ন ফিলোসফারদের ক্ষেত্রে যা আরও বেশি করে শোনা যায়, ফিলোসফারদের কাজ কেবল একাডেমিক গেইম খেলা, নাথিং এলস। বিভিন্ন মিনিং, হাইপোথিসিস তৈরি করে এমন এক অ্যাবস্ট্র্যাকশনের দুনিয়ায় তারা হারায়ে যান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা রিয়ালিটিরেও ছাড়ায়ে যায়।

উন্নত বিশ্বে এই ধরণের সমালোচনা থাকলেও, ইউনিভার্সিটিগুলো কিন্তু সেই সমালোচনার ধার ধরে ফিলোসফিকে পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয় নাই। কারণ, সেই এগারশ বারশ শতাব্দী থেকে চলে আসা যে জ্ঞানের সিলসিলা সেই পরিক্রমায় ইউনিভার্সিটিগুলো ঠিকই জানে, কোনও বিষয়ে স্পেশালিস্ট/একাডেমিক/এক্সপার্ট বাইর করতে হলে তার শুরুতেই জ্ঞানের একদম বেসিক ক্লিয়ার থাকতে হবে। এবং সেই বেসিক আদতে ফিলোসফিরই বেসিক পাঠ। তাই নানাবিধ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সোশ্যাল সায়েন্স, ইকোনমিক্স, সায়েন্স কোন জ্ঞানকান্ডেই আমরা থিওরি ছাড়া আলাপ হতে দেখি না। এবং এই থিওরির পিতা-মাতারা মূলত বিজ্ঞানী, দার্শনিকেরাই। তবে একাডেমিয়ার পিতা-মাতা দার্শনিক হলেও তাদের যে ক্রিটিসাইজ করা যাবে না, এমন কিন্তু নয়। একাডেমিয়ার পিতা-মাতার জ্ঞানেভাবে অনেক তত্ত্ব কপচাতে পারেন আবার একইসাথে রাজনৈতিকভাবে কোন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন আবার রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হতে পারেন। মাঝেমধ্যে এই ঘুঁটি হওয়ার অভ্যাস বদ্রিয়ার ভাষায় চরমে পৌঁছে যায়- বাংলাদেশ তার সেরা একটি উদাহরণ। এইখানে রাজনৈতিকভাবে আমলাতন্ত্র এতটাই শক্তিশালী যে, সামাজিকভাবে স্বীকৃত মতাদর্শের বাইরে নতুন কিছু করা কঠিন। সেই অর্থে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশ আসলে একটি কনজার্ভেটিভ রাষ্ট্রব্যবস্থা। শক্তিশালী সমাজ, শক্তিশালী আমলার বাইরে গিয়ে ফিলোসফি বেশি টিকতে পারে নাই। তাই দর্শনচর্চা শেকড় হারাইছে।

বাংলা ভাষায়, দেশি ধরণের ফিলোসফিও গড়ে উঠতে পারে নাই। এর কারণ গড়ে উঠবার যে সকল ফ্যাক্টর থাকা লাগে, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, ভাষার ব্যবহারযোগ্যতা তার কোনটাই আমাদের দার্শনিকগণ দিতে পারেন নাই। তাই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলা খুব লিনিয়ার-গড়ে চলেছে। আহমদ ছফা, আব্দুর রাজ্জাক, সলিমুল্লা খান- এরকম সিলসিলা কিংবা গুটিকয়েক পশ্চিমা পোস্টমডার্ন প্রবেশিকা বা লালন শাহের কাব্যিকতা, জীবন-দর্শন- খুব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আধা-বিকশিত হওয়ার কারণে নাই আলাদা কোন চিন্তার প্রতিষ্ঠান, নাই শক্তিশালী একাডেমিয়া (দার্শনিকদের জায়গা যেখানে আমলারা নিছে)। এর ফলে সম্মিলিত দর্শনচর্চার অভাব এখনও মেটানো যায় নি। সম্মিলিত চিন্তাভাবনার অভাবে যেইটা ঘটছে- এক নয়া ঢাকাই এস্থেটিসিজমের উৎপত্তি। যেইখানে সেকেলে হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংগঠনগুলো স্রেফ ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করবার জন্য কিছু জার্গন মুখে তুলে নেয়, আর রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিফল হয় (অটোনোমিয়া মুভমেন্টের ধারেকাছেও নেই সেইসব আন্দোলন)। কিংবা ঢাকা শহরে এক নতুন ট্রেন্ড- মানুষজন পাগলের মতো এখন ইন্টেলেকচুয়াল হইতে চায়, এর কারণ কিন্তু বদ্রিয়াই ভালো বইলা গেছেন। যখন আপনি একটা স্পেসে ভ্যাকুয়াম তৈরি করেন, সেখানের জড়তার কারণে ব্ল্যাকহোলের মতো আশপাশের সবকিছুরে আপনি টাইনা নিয়া আসতে থাকবেন। ইন্টেলেকচুয়াল ব্ল্যাকহোলে তাই আমাদের এই ঢাকাই নিউ জেন এখন পাগলের মতো ইন্টেলেকচুয়াল হইতে চাইতেছে। যদিও তারা জানে না আসলে এই বালটা কী। কিছু জার্গন সম্বল করে, ট্রাই করে ইন্টেলেকচুয়াল হইতে। দু:খের ব্যাপার বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতা, ইন্টেলেকচুয়ালিটির কোন মিনিং-ই আর অবশিষ্ট নাই। সিমন দ্য বোভোয়ার সেই কথা, যখন কোনকিছু থাকে না যা থাকে তা কেবল নস্টালজিয়া। নস্টালজিয়ার উপর ভর করে আমাদের এই জেনারেশন “ইন্টেলেকচুয়াল হওয়ার স্বপ্ন” ডেকে আনবার ট্রাই করে। কিছু প্রতিষ্ঠানও দাঁড়ায়ে যায় তরুণদের বিজ্ঞানমনস্ক করবার ও স্বপ্ন দেখাবার। প্রতিষ্ঠানগুলো স্বপ্ন দেখাতেও পারে তবে সেই স্বপ্ন-বিজ্ঞান-ইন্টেলেকচুয়ালিটি সবকিছুরই মিনিং মিলেমিশে একাকার হইয়া কোনকিছুরেই আর আলাদা করে চিনা যায় না।

এই কারণে জ্ঞানকাণ্ড হিসাবে বাংলা ভাষায় ফিলোসফির কোন আকার নাই, তেমনি রিয়ালিটি চেক দিলে দেখা যায়, বাংলা ভাষায় দর্শনচর্চারও কোন মানে নাই। অতএব, আপনি ডেফিনিটলি বইটা পড়তেছেন মানে একটা রিস্ক নিতেছেন।


মিডিয়ার কথা বাদ দিলে, বদ্রিয়ার রাজনীতিতে জায়গা কোথায়? বদ্রিয়ার কথা বেশি মিডিয়া এনালাইসিসেই শোনা যায়। কিন্তু রাজনীতিতে বদ্রিয়া যেন এক প্রকার অচ্ছুৎ। এর কারণ সম্ভবত তার ইরাক যুদ্ধের বই। তিনি ওই বইয়ে দাবি করছেন, এবং ফিলোসফিকালি বিশ্লেষণ করে দেখাইছিলেন, হয়তো ইরাকের গালফ যুদ্ধ হয়ই নাই। বইটা যখন আমি পড়ি, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। পড়তে গিয়া রীতিমতো চমকে গেলাম, উনার অবস্থান আমার কাছে খুব র‍্যাডিকাল ঠেকলো, আবার ফালায়াও দিতে পারতেছিলাম না কারণ আল্টিমেটলি আমরা তো রিয়ালিটি সম্পর্কে কোনভাবেই শিওর হইতে পারি না। কিন্তু সেই প্রশ্ন আমার ভিতরে থাইকা গেছিল, বদ্রিয়া আসলে রাজনীতিরে কীভাবে দেখেন? উনার মিডিয়ার ধারণা খুব সংক্ষেপে বলা দরকার। বদ্রিয়ার কাছে, মিডিয়া মূলত হাইপাররিয়াল একটা স্পেস তৈরি করতেছে, সকল কনজুমার যেইখানে বন্দি হইয়া আছে, এবং ধীরে ধীরে মানুষ হারায়ে যাইতেছে বা ডিজাপিয়ার হইতেছে এবং আমাদের দুনিয়া পুরাটাই একটা জম্বিফায়েড দুনিয়া আকারে হাজির হইতেছে। মিডিয়ার ক্ষেত্রে বদ্রিয়ার এই থিওরি মিডিয়া থিওরির প্রেক্ষিতে বিচার করলে কনজুমারদের খুব প্যাসিভ আকারে দেখে, অনেকটা হাইপোডার্মিক নিডল থিওরির মতো। যদিও তিনি এই ইন্টারভিউয়ে তার এই মিডিয়ার ব্যাপারে ধারণা রিভিজিট দেয়ার কথা বলতেছেন। তার থিওরি নিজের কাছে খুব মিনিংফুল লাগতেছে এই কারণে থিওরিটা প্রবলেমাটিক। বদ্রিয়ার কাছে থিওরিরই থাকার দরকার নাই, কারণ থিওরি নিজে একটা ফিকশন আর রিয়ালিটিরই যেইখানে এখন মিনিং হারায়ে গেছে, থিওরির জরুরতও হারায়ে গেছে। থিওরির ফিকশন বানানো ছাড়া এখন আর কোন কাজ নাই। কিন্তু মিডিয়ার ব্যাপারে যে বদ্রিয়ার ধারণা, তা আজও প্রাসঙ্গিক।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হইলো, যখন বদ্রিয়ারে আমরা রাজনীতির দুনিয়ায় নিয়া আসতে চাই আমরা দেখি বদ্রিয়া রাজনীতিরে একদম নাকচ কইরা দিতে পারতেছেন না। মিডিয়া নিয়া যে এত মাতামাতি, কিন্তু বদ্রিয়া দিনশেষে মিডিয়ারে দেখতেছেন রাজনীতির এজেন্ট প্রভোকেটর হিসাবে যেইখানে মিডিয়ার আর তেমন কোন গুরুত্ব নাই। রাজনীতির আলোচনায় তিনি সোশ্যালের যে ধারণা তা খারিজ কইরা দিছেন, কারণ সোসাইটি ডেড। একটা মৃতপ্রায় অবস্থায় পাবলিক থাকতেছে, একধরণের আচ্ছন্নতায় বা গিডি ফিলিং এর ভিতর- এর মানে দিনশেষে পাবলিক রাজনীতির কাছে পরাজিত। রাজনীতি ঠিকই পাবলিকরে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারে। এবং ঠিক এই কারণে, যখন বদ্রিয়ার মিডিয়া-তত্ত্ব নিয়া আলোচনা করা হয়, সাথে সাথে বদ্রিয়ার রাজনৈতিক ধারণা থাকাও জরুরি হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক আলোচনায়, বদ্রিয়ার সিস্টেমের এনার্জির যে ধারণা তাও ইন্টারেস্টিং। মে’৬৮ নিয়া বদ্রিয়া কথা বলছেন। আমরা ভাবতে পারি, সবসাময়িক রাজনৈতিক আন্দোলনের কথা। তিনি বলছেন, মে’৬৮ যত দ্রুত এত শক্তি নিয়া আবির্ভাব করলো, ততদ্রুতই সমস্ত শক্তি নিয়া হারায়ে গেল। তাহলে সিস্টেমটার এত এনার্জি সেইগুলা কই গেল? রাজনৈতিক আলাপে রাষ্ট্র যে সিমুলেশনস ব্যবহার করতে পারে তার একধরণের আভাস আমরা তার ইন্টারভিউগুলোয় দেখতে পারি। রাষ্ট্র আর টেররিজম যে পরস্পররে সিমুলেশনের দুনিয়ায় সহযোগি হইতে পারে সেই কথাও তিনি বলছেন। হস্টেজের আলাপে তার ইমপসিবলিটি অফ এক্সচেইঞ্জ ধারণার আভাস পাওয়া যাইতে পারে। শুধু হস্টেজ না, বর্তমান সময়ে চিন্তা করলে, হস্টেজ, টেররিজম, পলিটিকাল কিলিং একটা নাটকীয়রূপে আমাদের সামনে হাজির হইছে। যতটা ড্রামাটিকভাবে মিডিয়া চেষ্টা করে এদের উপস্থাপন করতে, বদ্রিয়ার মতে তত নাটকীয়ভাবে এই ঘটনাগুলোর মিনিং হারায়ে যাইতে থাকে। এবং এই মিনিং হারায়ে যাওয়ার খেলা যে আকস্মিক এমন না। রাষ্ট্র ডেলিবারেটলি এই কাজটা করতে থাকে। এর কারণ হলো, বর্তমানে রাষ্ট্র ই-গভরনেন্স আর বিগ এনালিটিকসের মাধ্যমে যত সহজে হাইপাররিয়াল স্পেস তৈরি করতে পারে, তা এতদিনকার আরও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ইল্যুশনের থেকেও মারাত্মক এবং কার্যকরী। এবং এই সিমুলাক্রাম আদতে রাজনীতিরে জোরেসোরে সাপোর্ট করে। এর মাধ্যমে ই-সিটিজেন তৈরি হইতেছে যা একপ্রকার ডি-সাবজেক্টিফিকেশনের অংশ। নাগরিক মারা পড়ে এই হাইপার-রিয়াল সিস্টেমে। এবং রাষ্ট্র সবসময়ই সচেতন তার ‘দেখানো’-র ব্যাপারে। বদ্রিয়া বলছেন, রাষ্ট্র নাগরিকদের এইরকমভাবে বুঝ দেয়, বাস্তবে ক্ষমতা এক্সিস্ট করে না। কিন্তু ইন রিয়ালিটি, ক্ষমতা এক্সিস্ট করে। বদ্রিয়ার মতে, ক্ষমতা হচ্ছে সেইটাই যা নিজের মৃত্যু ডেকে আনে। এখন হাইপার-রিয়ালিটিতে ক্ষমতা একপ্রকার অমরত্ব লাভ করতেছে। এবং ক্ষমতারে আর অন্য কোনকিছু দিয়া রিপ্লেস করাও সম্ভব না। আমার ধারণা, বদ্রিয়ার হাইপার-রিয়ালিটির ধারণায় ক্ষমতা একটা ইনগ্রেইনড অংশ। ক্ষমতা ছাড়া হাইপার-রিয়ালিটি ঠিকমতো সাস্টেইন করতে পারে না।


বদ্রিয়া হিউম্যান-বিয়িং এর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা বলছেন। মানুষ আদতে এসকেপ খুঁজে। ডিপ এক্সিস্টেনশিয়াল কোশ্চেন থেকে। এই কারণে, হাইপাররিয়ালিটি মানুষের রাজনৈতিকভাবে সাবভার্সিভ হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ কইরা দিতে পারতেছে। কারণ, মানুষ খুব আইলসাচোদা এবং আরামে থাকতে চায়। ভদ্রলোক যেমন বলতেছিলেন, চয়েজ করতে চায় না। কিন্তু আমি বলব, এড়াইতে চায়। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে এসকেপ খুঁজতে সহায়তা করে না, বরং এসকেপেই রাখে। রাষ্ট্র যে এই এসকেপে মানুষরে রাখতে পারে তার বড় কারণ, মানুষ নিজে এই এসকেপে থাকতে চায়। ডিপ কোশ্চেনগুলা এড়াইতে চায়।

কারণ, এইটা সহজ রাস্তা।

কনজুমার কালচার মানুষের এই এসকেপকে ঘিরেই ব্যবসা করে। মানুষ যত এসকেপে থাকতে পারবে, তত ব্যবসায়িকদের লাভ। সেইটা যে শুধু কেনাবেচার জায়গাতে তা না। এই কালচার মানুষরে ডিফাইন করে দিতেছে। এই কারণে ফ্যাশন মডেল “মডেল” হইয়া উঠতে পারতেছে, কোন একটা স্মার্টফোনই মানুষরে নির্ধারণ কইরা দিতেছে সে আসলে কেমন মানুষ- ধনী না গরিব, স্মার্ট না আনস্মার্ট। এবং গরিব, মিডল ক্লাস মানুষ স্বেচ্ছায় ওই আইডেন্টিটিতে সাবস্ক্রাইব করতে চায়। তারা কিন্তু ভাবে আমার চে’ উপরের ক্লাসের মানুষটার আচার-আচরণ, হাবভাব, স্মার্টনেস তা এচিভ করা জরুরি। কেন করা জরুরি তা সে জানে না। এই জানার প্রয়োজনও সে গভীরে অনুভব করে না। কিন্তু সে একটা জিনিস জানে- তারে ওই আচার-আচরণ, হাবভাব, স্মার্টনেস এচিভ করতে হবে। এবং এইটার জন্য সে যে কোন উপায় নিতে পারে, এন্ড থাকুক বা না থাকুক। একটা পর্যায়ে এন্ড আর থাকে না, উপায়টাই বড় হয়ে যায়। এই কারণে মানুষের চাওয়া-পাওয়ারও কোন শেষ থাকে না। কারণ, তার মাথায় একটাই লক্ষ্য, উপরে উঠতে হবে। কিন্তু এইভাবে উপরে উঠতে উঠতে সে একটা মিনিংলেস হাইপার-স্পেসেই হারায়ে যাইতে থাকে, বদ্রিয়ার ভাষায় মইরা যাইতে থাকে, ডিজাপিয়ার হইতে থাকে, যেইখানে তার পোশাক-আশাক, হাবভাব, আইডেন্টিটিই বড়, কিন্তু অন্তরীক্ষে ফাঁপা।

এক কথায় এসকেপ। পাগলামি। আর এই পাগলামিতে মানুষজন কেন জয়েন করতেছে তা কেবল রাষ্ট্র-রাজনীতি-মিডিয়ার আলাপ দিয়াই সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। এর সাথে গভীর এক্সিস্টেনশিয়াল প্রশ্ন জড়িত। সেই প্রশ্নের তালাশ এইখানে নাই।


তাহলে আপনি রিস্ক নিতেছেন। পাগলামির দুনিয়ায় আপনারে স্বাগতম।

‍‍‍‍~
তৌকির হোসেন
যাত্রাবাড়ি, ঢাকা।
২৫ মার্চ, ২০২১

………

এই বইটাসহ তিনজন ফিলোসফারের ইন্টারভিউ’র বই কিনতে পারবেন, এই লিংকে:

(1) ইন্টারভিউ সিরিজ এবং বাছবিচার ও প্রিন্ট পোয়েট্রি’র বই – Posts | Facebook

 

The following two tabs change content below.

তৌকির হোসেন

জন্ম ১০ নভেম্বর, ১৯৯৮। চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, সেখানেই পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নরত। লেখালেখি করেন বিভিন্ন মাধ্যমে। ফিলোসফি, পলিটিক্স, পপ-কালচারেই সাধারণত মনোযোগ দেখা যায়।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য