Main menu

মিথ্যার লগে কাভি কইরো না বসবাস ।। আলেকজান্দার সলঝেনিৎসিন

[আলেকজান্দার সলঝেনিৎসিন এই এসেখানা লিখিয়াছিলেন ঈসায়ী ’৭৪ সনে। আর অইসময়ের মাঝেই মস্কোর বুদ্ধি ব্যবসায়ীদিগের পাড়ায় উহা রটিত হইয়াছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি, অ্যাকচুয়ালি অইদিনই সিক্রেট পুলিশ তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে হান্দাইয়া পড়ে আর তারে তুইলা নিয়া যায়। পরেরদিন রাশিয়া হইতে তাঁরে বিতাড়িত করা হয় আর পশ্চিম জার্মান দ্যাশে নির্বাসনে পাঠানো হয়। মূল লেখাখানা লওয়া হইছে https://archive.org/details/LiveNotByLies হইতে। – মেহেরাব ইফতি।]

…………………………………………..

একটা সময় আছিল যখন আমরা ফিসফিস কইরা বাৎচিত করতেও ডরাইতাম। এখন আমরা হাতে লেখা নিষিদ্ধ চোরাই বই পড়ি ও লেখি, আর কখনো কখনো আমরা যখন সায়েন্স ইন্সটিটিউটের স্মোক-জোনে একলগে জড়ো হই তখন একজন আরেকজনের কাছে দিল খুইলা ক্ষোভের কথা উগরাই : কীরকম ট্রিকস তারা আমাদের উপ্রে খাটাইতেছে, আর আমাগোরে কোথায় টাইনা নিয়া নামাইতেছে। চক্ষের সামনে গরিবি আর ধ্বংসযজ্ঞের আযাব, আর এদিকে মহাকাশ লইয়া আজাইরা লম্ফঝম্ফ। কোনহানের কোন বেতমিয রেজিম, তাগো হাত শক্ত করো। লাগাইয়া দাও গৃহযুদ্ধ। কোনো হিশাব-নিকাশ না কইরাই ওরা আমাগো টেকায় মাও জে দংয়ের পিছে গিয়া খাঁড়াইছে, তারপর আমাগোরেই পাঠাইয়া দিব তাঁর লগে কাইজ্জা করার লাইগ্যা, যাইতেই তো হবে আমাদের! আর কি কোনো উপায় আছে? নিজেগো ইচ্ছা মতো তারা যারে চায় ট্রায়ালে খাঁড়া করাবে, বিবেকওয়ালা সুস্থ মানুষগুলারে অ্যাসাইলামে দিবে- সবসময় তারাই। আমরা তো হইলাম গিয়া ধইঞ্চা। আমাদের আখেরি সময় হইয়া আসছে। একটা বারোয়ারি আত্মিক মরণ এই ফাঁকে আমাগো সবাইরে টাচ কইরা গেছে, খুব জলদিই আমাদের এবং আমাগো পোলা-মাইয়াদের শারীরিক মৃত্যু গ্রাস করবে। এতো কিছুর পরেও আমরা ভোকচোদের মতো হাসতেছি আর মিনমিন কইরা কইতেছি : ‘কিন্তু এইটা থামাইতে আমরা কি করতে পারি? আমাদের তো নাই কোনো হেডম।’ আমরা এইর’ম জাহেল হইছি যে, আজকের দিনের রিজিকের ন্যায্য হিস্যার লাইগ্যা আমরা ত্যাগ করতে পারি আমাগো সব এথিক্স, আমাগো আত্মা, আমাদের পূর্বপুরুষদের সবরকম প্রচেষ্টা, এমনকি আমাগো ওয়ারিশদের জন্য রাখা সকল সুযোগ সুবিধাও- লেকিন আমাগো ভঙ্গুর অস্তিত্বরে বিরক্ত করা যাইব না। আমাগো নিষ্ঠা নাই, নাই কোনো আত্মাভিমান, না আছে প্রবল উদ্যম। এমনকি আমরা দুনিয়াব্যাপী পারমাণবিক যুদ্ধের বিভীষিকারেও ডরাই না, ইভেন আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধরেও অতো কেয়ার করি না। ইতিমধ্যে আমরা গর্তের ভিত্রে শেল্টার লইছি। নাগরিক হিম্মতের পথে পা আগাইতেই আমাদের যত ডর। ভেড়ার পালের বাইরে ডরে এক পাও একলা মাড়াই নাই আমরা- আর রাতারাতি আমাগোরে খুঁইজা পাইলাম ধবলা রুটি ছাড়া, হিটিং গ্যাস ছাড়া, এমনকি মস্কোতে থাকনের ছাড়পত্রটাও বেহাত।

পলিটিক্যাল স্টাডি সার্কেল দিয়া আমাগোরে তালিম দেওয়া হইছে, আর এভাবেই আমাদের বাকি জীবন কাটানো ভালো- আরামে বসবাস করার এইর’ম আইডিয়ায় আমাগোরে উৎসাহিত করা হইছে। তুমি তোমার পরিবেশ এবং সোশ্যাল কন্ডিশন থেকে পলাইতে পারো না। হরহামেশা চেতনা জীবনের অস্তিত্বরে পরিমাপ করে। কিন্তু আমাদের করার আছেটা কী? আমরা কি এই ব্যাপারে কিস্যু করতে পারি না?

সত্যটা হইল, আমরা অবশ্যই কিছু করতে পারি। মিছা কথা কইয়া আমরা নিজেরাই নিজেগোরে ঠকাইতেছি। তাগোরে সবকিছুর লাইগ্যা ব্লেইম কইরা লাভ নাই, এগুলার দায় আমাদেরই লইতে হবে। কেউ হয়ত খুব-তেরেসে কইতে পারে : আমাদের টুঁটি চাইপা ধরা হইছে। না কেউ আমাগো কথা কানে তোলে না কেউ আমাগোরে পুছে। আমরা কিভাবে তাগোরে শুনতে বাধ্য করতে পারি? তাগো চিন্তা পরিবর্তন কইরা ফেলবো আমরা- এইটা তো অসম্ভব।

আমাদের দেশে ইলেকশনের অইরকম পরিস্থিতি নাই- কিন্তু ফিরা নির্বাচন দিয়া তাগোরে খেদাইতে পারলে মেবি বিষয়টা স্বাভাবিক হইত। স্ট্রাইক, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ- এইগুলা পশ্চিমের লোকদের জানা আছে, কিন্তু আমরা নিপীড়িত। এইটা তো আমাদের কাছে ভয়ানক এক্সপেকটেশন যে, হুট কইরা একজন ক্যামনে চাকরী ছাইড়া দিয়া রাস্তায় নাইমা যাইতে পারে? এছাড়াও গত শতাব্দীর রাশান ইতিহাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নমুনা হিশাবে আরো কিছু ডেঞ্জারাস ওয়ে আছে আমাগো সামনে। যাইহোক, এগুলা আমাদের জন্য না। আর সত্যি কইতে কি এগুলার আর দরকার নাই। কুড়াল মারার কামকাইজ শেষ হইয়া যাওনের পর যে বীজগুলা বোনা হইছিল অইগুলা জাইগা উঠতেছে। যেসব পোলাপান আর অহংকারী বেকুব লোকেরা এইটা ভাবছিল যে সন্ত্রাস, রক্তাক্ত ক্যু আর সিবিল ওয়ারের ভিতর দিয়া দেশটারে তারা সুখের নহরে ভাসাইয়া দিবে, তারা যে কি পরিমাণ দিশাহীন আর গলদ ধান্দার ফাঁপরে আছিল এইটা আমরা এখন দেখতে পাইতেছি। নবজাগরণের আব্বারা, আপনাগো পদে পদে সেলাম। আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাইতেছি যে, মন্দ কাম মন্দ ফলেরই জন্ম দেয়। এরপরও আমরা চাই আমাগো হাতগুলা সাফসুতোর থাকুক! এই চক্করের কি এইখানেই শেষ? এইটা থেকে বাইর হওনের আর কি কোনো রাস্তা নাই? কোনো অ্যাকশন না নিয়া আচম্বিত কিছুর লাইগ্যা অপেক্ষা করা – আমাদের হাতে কি সেরেফ এই একটা উপায়ই বাঁইচা আছে? এইটা কখনোই সম্ভব হইব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা নিজেগোরে মিছা কথার চক্কর থেকে আলাদা করতে পারমু।

শান্তির জীবনে যখন ভায়োলেন্স ঢুইকা পড়ে, আর স্পর্ধায় যখন তার মুখ চকচক করতে থাকে, মনে হয় যেন নিশানা উঠাইয়া চিৎকার কইরা কইতেছে : ‘আমি ভায়োলেন্স। রাস্তা ছাইড়া কাইটা পড়ো সবাই- আমি তোমাগোরে পিষা ফেলবো।’ লেকিন ভায়োলেন্স খুব দ্রুতই বুড়া হইয়া যায়। আর নিজের মধ্যেই কনফিডেন্স হারাইয়া ফেলতে থাকে, মেকি ভদ্রতার মুখোশ রক্ষার লাইগ্যা মিত্র হিশাবে পাইতে চায় মিথ্যারে। কারণ মিথ্যা ছাড়া তার নিজের গা বাঁচাইবার আর কিচ্ছু নাই। আর প্রতিদিন ভায়োলেন্স আমাগো কান্ধে তার থাবা তুইলা না দিয়া আমাদের কাছে এইটাই দাবি করে যে, আমরা যেন মিথ্যার কাছে সবসময় মাথা নিচু কইরা থাকি আর মিথ্যার লগেই হরদম বসত করি- যেন সকল খিদমতের মধ্যে মিথ্যা মিশা থাকে।

এর থেকে আযাদ হওনের সবচে’ সহজ তরীকা আমাগো আশেপাশেই ছড়াইয়া আছে। সেটা হইল : আদমি যেন মিথ্যার লগে বসত না করে। যদি মিথ্যা সবকিছুরে কয়েদ কইরা ফ্যালে, যদি মিথ্যা সবকিছুরে আঁকড়াইয়া ধরে- তবুও যেন আমার কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য না পায়। যে মনগড়া কাল্পনিক ফাঁদের মইধ্যে আমরা হান্দাইয়া গেছি, সেইটা থেকে বাইর হইয়া আসার মোক্ষম পথ এইটাই। এইটা যেমন আমাদের জন্য সবচে’ সুবিধার, ঠিক তেমনি মিথ্যার লাইগ্যা চূড়ান্ত আযাবের। কারণ লোকজন যখন মিথ্যার সহবত ছাইড়া দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মিথ্যার আয়ু কমতে থাকে। বাঁইচা থাকার জন্য মিথ্যারেও ছোঁয়াচে রোগের মতো কারো না কারো উপর নির্ভরশীল হইতে হয়।

আমরা নিজেরাই নিজেগোরে উৎসাহ দিই না। অতোটা ম্যাচিউর হই নাই যে রাস্তায় নাইমা মিছিল করমু, চিল্লাইয়া সত্যটা জানামু অথবা আমরা কী ভাবি সেইটা মন খুইলা কমু। এসবের অবশ্য জরুরতও নাই। এগুলা খুব ডেঞ্জারাস কাম। কমসে কম আমরা এইটুকু করতে পারি : যেগুলা আমাদের মনের কথা না, সেগুলারে অস্বীকার করা। এইটাই আমাগো পথ। যে ভয়ের শিকড় আমাগো দিলের ভিত্রে ইতোমধ্যে গজাইছে, সেখান থেকে বিযুক্ত হওয়ার সবচে’ সোজা আর অ্যাকসেসেবল রাস্তা এইটাই। যদিও এইটা কওয়া বিপদজনক তবুও বলা যায় যে, আইনরে অমান্য করার গান্ধীবাদী পদ্ধতির থেকেও এইটা বেশি সহজ।

আমাগো লক্ষ্য হইল, পইচা যাওয়া রাস্তাটা থেকে দূরে সইরা থাকা। আমরা যদি মতাদর্শের মাপকাঠি আর মরা হাড়গুলারে একলগে না মিলাই, যদি আমরা ছেঁড়াবেড়া পতাকাটারে জোড়াতালি না দিই, আচম্বিত হইয়া যামু এইটা দেইখা যে, মিথ্যাগুলা কত দ্রুত অসহায় হইয়া পড়ছে আর মাটির লগে মিশা গেছে।

যায় গায়ে কাপড় নাই, দুনিয়া দেখুক সে ল্যাংটা।

অতয়েব আমাগো ভীরুতারে লগে নিয়াই, আমাদের সবাইরে একটা চয়েজ বাইছা নিতে হবে : আদমি কি সজ্ঞানে মিথ্যার ক্রীতদাস হইয়া থাকবে (অফকোর্স, এইটা সে লাইক করে বইলা না, আসলে ফ্যামিলির খোরকি আর পোলামাইয়ারে মিথ্যার ছাঁচে মানুষ কইরা তুলতে এইটা তারে করতে হয়), নাকি সে মিথ্যারে উষ্টা মাইরা খেদাইয়া তার ওয়ারিশ আর সমসাময়িকগো রেসপেক্ট কুড়াইবে?

আজ এইসময় থেকে :

– সত্যরে বিকৃত করে এমন যে কোনো কিছু এখন থেকে সে আর লিখব না, সাইন করব না, কিংবা ছাপাইব না এমনতর শব্দ।

-আন্দোলনকারী, টিচার, চ্যান্সেলর কিংবা থিয়েটারের অভিনেতা হিশাবেই হোক না ক্যান, তেমন কোনো মিছা কথা সে আর কইবে না অনেক লোকের সামনে অথবা পারসোনাল আলাপে। নিজের পক্ষ থেকেও কইবে না কিংবা অন্যের ফুসলানিতেও কইবে না।

-এমন কোনো কিছুরে তেল দিবে না কিংবা এমন কোনো আইডিয়ার প্রচার করবে না যেখানে সে দেখতে পায় মিথ্যার লগে সত্যরে ঘুঁট পাকাইয়া রাখা হইছে। এটা হইতে পারে পেইন্টিংয়ে, স্কাল্পচারে, ফটোগ্রাফিতে, টেকনিক্যাল সায়েন্স অথবা মিউজিকে।

-এমন কোনো টোটকা কথায় যদি নিজের মত না থাকে, আরেকজনরে খুশি করার লাইগ্যা কিংবা সেইফলি নিজের কাম হাসিল করার লাইগ্যা মুখের কথাতে কিংবা রাইটিংয়ে সে যেন নবাবী ফরমানের মতো কইরা কোটেশন না মারে।

-আদমির নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর কইরা তারে যেন কেউ মিটিং-মিছিলে লইয়া যাইতে না পারে, মন থেকে মাইনা লইতে না পারলে সে যেন কোনো ব্যানার হাতে না লয়, যেন স্লোগান না দেয়।

-যে কোনো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মন থেকে সাপোর্ট দিতে না পারলে সে যেন ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

-সে যারে সন্দেহজনক অথবা আমড়া কাঠের ঢেঁকি বইলা মনে করে, কোনোভাবেই তারে যেন ডিরেক্ট অথবা গোপনে ভোট না দেয়।

-গৎবাঁধা কিংবা অলীক আলাপসালাপ হইতে পারে এমন কোনো মাহফিলে কেউ যেন তারে টাইনা লইয়া যাইতে না পারে।

– যে মিটিংয়ে, অধিবেশনে, লেকচারে, পারফর্ম্যান্সে কিংবা ফিল্মে সে ডাহা মিছাকথা কিংবা আইডলজিক্যাল ননসেন্স অথবা বেহায়া প্রোপাগান্ডা দেখবে- এমন যায়গা থেকে তাগদা চইলা আসতে হবে।

– এমন কোনো নিয়ুজ পেপার অথবা ম্যাগাজিন কিনা বা সাবস্ক্রাইব করা যাইব না যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রাইমারি ইনফরমেশন চাইপা যাওয়া হয় কিংবা বিকৃত করা হয়।

অবশ্যই এই তালিকায় মিথ্যা থেকে সইরা আসার নেসেসারি ও সম্ভাব্য সবরকম রাস্তা বাতলাইয়া দেওয়া গেলো না। কিন্তু একজন আদমির চক্ষের সামনে আরো বহু রাস্তা খুইলা যাইতে থাকবে যখন সে নিজেরে পিউরিফাই করতে শুরু করবে। সত্যি কইতে কি, পয়লাবার এইটা সবার লাইগ্যা একরকম হইব না। কয়েকজন প্রথমেই তাগো চাকরি খোয়াইবো। সেসব ইয়াং পোলাপানেরা যারা সত্যরে লইয়া দিন বিতাইতে চায়, শুরুর দিকে তাগো লাইফে হরেকরকম ক্যাচাল বাঁধবো, কারণ যে সওয়ালের জবাব তারা পাইতেছে, তার আগামাথা পুরাটাই মিথ্যা দিয়া মোড়ানো। এখন এইটা দরকারি যে যেকোনো একটা কিছু তাদের বাইছা নিতে হবে।

কিন্তু যারা অনেস্ট হইতে চায় তাগো জন্য তো ভাইগা যাওয়ার কোনো পথ নাই। এমনকি সবচে’ সিকিউর টেকনিক্যাল সায়েন্সের ক্ষেত্রেও আমাগো মইধ্যে এমন কেউ নাই যে সত্যের দিকে আগাইতে গিয়া কিংবা মিছা কথার দিকে যাইতে গিয়া উপরে কওয়া ধাপগুলার অন্তত একটাও এড়াইতে পারব। সত্য অথবা ছলনা- হয় আত্মার মুক্তির দিকে অথবা আত্মার দাসত্বের দিকে যাওন।

আর যে নিজের আত্মারে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট হিম্মত রাখে না, সে যেন তার ‘প্রোগ্রেসিভ’ ভিয়্যুর লাইগ্যা হেডমগিরি না দেখায়, এবং তারে বড়াই করতে দিও না জনগণের আর্টিস্ট হিশাবে অথবা একজন একাডেমিশিয়ান হিশাবে, একজন জেনারেল হিশাবে অথবা একজন কাবেল আদমি হিশাবে। বরং নিজেরে সে নিজেই বলুক : আমি একটা গরু, একটা কাওয়ার্ড, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার খাওন-দাওন আর আরাম-আয়েশের কোনো প্রবলেম হইতেছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে এগুলা সব একই।

প্রতিরোধের যত রাস্তা আছে, তার মধ্যে এই পথটাই সবচে’ মডেস্ট। তারপরও আমাদের জন্য এই পথে চলা সহজ হইবে না। তয় গায়ে আগুন লাগানো অথবা হাঙ্গার স্ট্রাইক করার চেয়ে এইটা ইজিয়ার। আগুনের ফনা আপনার শরীররে দখল কইরা ফেলবে না, হিটের চোটে বাইর হইয়া আসবে না আপনার চোখ এবং সবসময়ই আপনার ফ্যামিলির কপালে জুটব ব্রাউন ব্রেড আর বিশুদ্ধ পানি।

য়্যুরোপের সেই মহান মানুষগুলা, যে চেকোস্লোভাক মানুষগুলার লগে আমরা বেঈমানি করছি আর তাগোরে ঠকাইছি, তারা কি আমাগোরে দেখাইয়া দেয় নাই যে একটা সংবেদনশীল মন লইয়াও ক্যামনে ট্যাঙ্কের সামনে গিয়া খাঁড়ানো যায়?

আপনি হয়তো বা কইবেন, এইটা কিন্তু সহজ রাস্তা না। কিন্তু বিশ্বাস করেন, বাদবাকি যেসব পথ আছে তার মধ্যে এইটাই সবচে’ সোজা পথ। শরীরের লাইগ্যা এই পথ কষ্টের, কিন্তু আত্মার জন্য এইটাই একমাত্র বেহতর পন্থা। পথটা যদি কঠিনও হয়, এমন একডজন মানুষ খুঁইজা পাইতে কষ্ট হইব না যারা বছরের পর বছর ধইরা এই নীতিতে আছেন এবং সত্যরে আঁকড়াইয়া ধইরা বাঁইচা আছেন।

সুতরাং, আপনে এই পথে আসা পয়লা আদমি না, উল্টা যারা এই পথে আগে থেকেই চলতে শুরু করছিল আপনে তাগো লগেই আইসা যোগ দিছেন। সম্মিলিত কোশেশের মাধ্যমে আমরা যতো সংঘবদ্ধ হইতে পারমু, ততই আমাগো জন্য এই পথের যাত্রা আসান হবে এবং পথের দূরত্বও কমতে থাকবে। যদি কোনোভাবে আমাদের সংখ্যা হাজার হইতে পারে, দেশের চেহারা বিলকুল বদলাইয়া যাবে।

কিন্তু আমরা যদি খুব ডরায়ে যাই, আর অজুহাত দিতে থাকি যে কেউ আমাগো গলা টিপা ধরছে- তখন এইসব অজুহাত ধোপে টিকব না। আমরা নিজেরাই এইটার জন্য দায়ী থাকমু। চলেন আমরা মাথা নিচা কইরা আরো কিছু টাইম পার কইরা দিই, আরো কিছুক্ষণ ন্যাকা বিলাপ করি। আর আমাদের বায়োলজিস্ট ভাইয়েরা আমাগো চিন্তার দৌড় দেইখা অইদিন হেল্পাইতে আইব, যেদিন তারা আমাগো চিন্তাফিকির আন্দাজ করতে সক্ষম হইব আর আমাগো জিন বদলানোর হদিশ খুঁইজা পাইব।

এভাবে যদি আমাদের পদ দুইটাও ঠাণ্ডা হইয়া আসে, পা ফালাইতেও যদি আমরা ঘাবড়াইয়া যাই, তাইলে সত্যিই আমরা ঘটিরাম আর অকর্মার ঢেঁকি। পুশকিনের এই বিদ্রুপ আমাদের উপরেই আইসা পড়ে :

গরু-ছাগলের বাইচ্চারা স্বাধীনতা লইয়া কী করব আর?
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধইরা তাদের বইতে হবে ঝাঁঝাঁ আর জোয়ালের ভার।

(১২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৭৪)

 

………………………………………………………

 

পোস্টস্ক্রিপ্ট ।। আর্ট, ইন্টেলেকচুয়ালিটি আর প্রপাগান্ডা ।। ইমরুল হাসান
                                                      

সলঝেনিৎসিনের বলার ইনটেনশনটা নিয়া আমার কোন সমস্যা নাই, কিন্তু সারপ্রাইজিংলি বেশিরভাগ ক্রিয়েটিভ রাইটারদের পলিটিক্যাল কনশাসনেসের জায়গাটাই কেন জানি এইরকমের ভালগার যে,  ইমোশনাল হইয়া যান,  প্রিচিং করতে শুরু করেন, একটা মোরালিটির। অথচ উনাদের আর্টে এইটা বেশ কমই থাকার কথা বইলা আমার মনেহয়। মোরালিটি ভালো জিনিস না – ঘটনাটা এইরকমের না, বরং মোরাল জায়গাটারে কিছুটা ক্লিয়ার না কইরা এইরকম কথা কওয়াটা তো একরকমের সুডো পলিটিক্যাল স্ট্রাডেজি। এই কনশাসনেসটা গ্রেট রাইটারদের নাই – এইটা মানতে একটু ঝামেলাই হয়।

পারসোনাল এক্সপেরিয়েন্সের জায়গাগুলি তো আছেই। যেইখান থিকা নিজের চিন্তা ভাবনারে আলগা করাটা খুবই মুশকিলের। যেইটা আমার অনুমান, সলঝেনিৎসিন একটা লার্জ পপুলেশনরে দুষতেছেন কোলাবরেট করছে বইলা সোভিয়েত রেজিমরে। কিন্তু একজন ইন্ডিভিজ্যুয়ালরে যদি সারভাইবালের জায়গা থিকা দেখেন, সবসময় তো তারে নেগোশিয়েট করতে হয় পাওয়ারের সাথে, এক্সটার্নাল ফ্যাক্টরগুলির লগে। ইন্ডিভিজ্যুয়াল এগজিসটেন্সের জায়গা থিকা ব্যাপারটা খালি সত্যি আর মিথ্যার সাথে রিলেটেড না, বরং নিজেরে বুঝাইতে পারার ঘটনাটাই বেশি। ধরেন, একটা খুন কইরাও আমি নিজেরে বুঝাইতে পারি যে, নিজেরে বাঁচানোর লাইগা আমি এইটা করছি, চিটারি করা, ঘুষ খাওয়া, পাওয়ারের লগে হাত মিলানি, যেন আমি করিই নাই, এইভাবে কইরা ফেলাটা (কোন গিল্টি ফিলিংস ছাড়াই) খুবই পসিবল। এইটা এমন না যে, মিথ্যার লগে থাকতেছি আমি বা সত্য কাজ করতেছি না। আমি তো জানি না বা বুঝি নাই বা আমার মতো কইরা তো আমি বুঝতেছি! আর এই বুঝাটা কখনোই “মিথ্যা” না। 

মানে, আমাদের বেশিরভাগ সমস্যাটারে আমি ইন্টেলেকচুয়ালি বোঝাপড়ার জায়গা থিকা দেখাটারে প্রেফারেবল মনে করি। মিথ্যা বইলা একটা জিনিসরে উনি যে নিতে না করছেন, সেই মিথ্যাটা যে কেমনে মিথ্যা, কেন মিথ্যা, এই জায়গাটাতে যানই নাই। মেবি ধরে নিছেন, সবাই তো আমরা জানিই, কোনটা মিথ্যা। বা যে যেইটা মিথ্যা বইলা জানি, সেইটা যেন না করি। জায়গাটারে এইরকম ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ভাইবা নেয়াটা বিপদেরই মনেহয় আমার কাছে। বেশিরভাগ রাইটার বা আর্টিস্টরা তো ভাবেন যে, আর্টরে ডিফাইন করা যায় না বা এইটা করলে এক ধরণের বাউন্ডারি দিয়া দেয়া হয়, আটকায়া যাওয়া হয়, তো, এই জিনিসটা “মিথ্যা” না, কিন্তু যখনই আমরা এই ধারণাটারে আপহোল্ড করতে থাকবো, তখন একটা স্পেইস ওপেন হয়, যেইখানে ভুল বুঝানোর ঘটনাগুলিও মোর পসিবল হয়া উঠতে পারে বইলা আমার মনেহয়। বরং যতদূর পর্যন্ত পারা যায়, এই জায়গাগুলিরে কনশাসনেসের ভিতরে নিয়া আসার ট্রাই করাটা জরুরি।

সত্য কোন সহজ জিনিস না। রাইটার বা আর্টিস্ট বা ইন্টেলেকচুয়াল হিসাবে সত্যরে জাগায়া তুলতে হয় যাতে কইরা পাবলিক সত্যরে ধইরা রাখার সাহসটা পায়। আমার ধারণা, সলঝেনিৎসিনও তার রাইটিংসে এই কাজই করতে চাইছেন, কিন্তু এইখানে কইতে গিয়া কেমন জানি একটু গুলাইয়াই ফেলছেন। অন্য কোন পলিটিক্যাল পারপাস সার্ভ করছেন কিনা, সেই জায়গাটাতে সার্টেন না হইয়াও এইটা মনেহয় বলাই যায়।

.
আর্টের বা ইন্টেলেকচুয়ালিটির কাজ প্রপাগন্ডা করা না, একটা ইল্যুশন তৈরি করা না বা এগজিসটিং রিয়ালিটি’র একটা ধারণা’রে অ্যামপ্লিফাই করা না; বরং এমন একটা স্পেইস ক্রিয়েট করা যেইখানে সত্য বা মিথ্যার জায়গাগুলি আরো স্পষ্ট হইয়া উঠতে পারে। পিপল যাতে ডিসাইড করতে পারে, কোনটা মিথ্যা আর তার এগেনেস্টে দাঁড়ানোর সাহসটা করতে পারে।

অনেক ইমোশন নিয়াই উনি কইছেন কথাগুলি, ‘সত্য’ জায়গা থিকাই বলছেন মেবি, কিন্তু একটু কান পাতলে মনে হইতে পারে, কোন মোটিভেশনাল স্পিকার কথা কইতেছেন, আমরা’র লগে!L

এই কারণে উনার বলাটারে অনেকটা প্রপাগান্ডা টাইপ ঘটনা মনে হইছে। সাহিত্য করা তো উনার উদ্দেশ্য আছিলো না,  কিন্তু ইন্টেলেকচুয়াল আর্গুমেন্টের জায়গাটাতেও উনি যাইতে পারেন না বা চান নাই হয়তো। তো, এইরকম ক্যাটাগরি’র ভিতর দিয়াই আমি পড়লাম আর কি, উনার লেখাটা।

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
মেহেরাব ইফতি

মেহেরাব ইফতি

সিনিক; পোয়েট; এসেয়িস্ট; ক্রিটিক; ট্রান্সলেটর; ইন্টারভিউয়ার; প্রুফরিডার; লিটারারি-এজেন্ট। জন্ম, ১৯৯৭ সনে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.