Main menu

সোনাবন্ধু’র পিরীতি এবং ভালবাসার সুশীল ডিসকোর্স

মানস চৌধুরীর (২০০০) আগে পরে গান নিয়া তত্ত্ব ও গবেষণামূলক কাজ করছেন তেমন দুইজনের লেখার সাথে পরিচয় আছে আমার; আগে ফরহাদ মজহার, পরে সুমন রহমান; এনাদের দুইটা বইয়ের কথা বলতে হবে বিশেষ করে, ভাবান্দোলন (২০০৮) এবং কানার হাটবাজার (২০১১)।

জনাব মজহারের ভাবান্দোলন ২০০৮ সালে প্রকাশিত হলেও তিনি লালন ও তাঁর গান নিয়ে লিখছেন সম্ভবতঃ ১৯৯০ দশকের শুরু থেকেই। গান নিয়া মজহারের লেখার দার্শনিক-রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে; এডোয়ার্ড সাইদের ওরিয়েন্টালিজম, তালাল আসাদের কলোনিয়াল ডিসকোর্স ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে কাজ এবং পার্থ চ্যাটার্জিদের নিম্নবর্গের ইতিহাস—ইত্যাদির মাধ্যমে পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তা ও নিও-মার্ক্সিস্ট রাজনীতির যেই চর্চা শুরু হয় তাতে বাংলাদেশে জনাব মজহারের কাজ গুরুত্ব পাবে; একই সাথে বঙ্কিম চিহ্নিত ‘বাঙালি মুসলমান’-এর জাতীয়তাবোধ তৈরিতে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও আহমদ ছফার ইন্টেলেকচুয়াল তৎপরতায় জাতীয়তাবাদী ভূমিকা রাখছে মজহারের কাজ।

কলোনাইজড/আধুনিক মিডল ক্লাসের কাছে লালনকে আনফোল্ড করেন জনাব মজহার, লালনের গভীরতা এবং চিন্তার সূক্ষ্মতা ও জটিলতা দেখাইয়া বিস্ময় উৎপাদন করেন। আধুনিক পশ্চিমকে এই মিডল ক্লাস যেহেতু গভীর-জটিল বলেই শ্রদ্ধা করে তাই লালনও শ্রদ্ধেয় হইয়া ওঠেন; ফলে, ‘বাঙালি মুসলমান’ জাত্যাভিমানী হবার প্রেরণা পাইতে থাকে মজহারের কাজে। এইভাবে, ‘বাঙালি মুসলমান’-এর জাতীয় চৈতন্য গঠনে দরকারি গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ জেনারেট করছেন জনাব মজহার। আবার, ‘ফকির’ বা ‘বাউল’ বা লালন সাঁইর ‘সাধক’ যদিও কেবলই মেল (ছেলে) এবং বৈষম্য বিরোধিতা নিতান্তই জাত-পাতগত, সম্পত্তির সাম্যের রাজনীতির বিপরীতে মিস্টিক বৈরাগ্য উৎপাদী (পার হইতে চাওয়া) তবু লালনের গানে মার্ক্সবাদী এসেন্স আবিষ্কার করেন মজহার; তাতে কনভিন্সড হইয়া মিডল ক্লাসের নীতিক্লিষ্ট একাংশ মার্ক্সবাদী হবার জন্য মজহারের লালনভোগী হইছেন। আমার বিচারে বৈষম্য বিরোধিতায় লালনের চাইতে মডার্নিটি আগানো; মডার্নিটি বর্ণ-ধর্ম বাদেও লিঙ্গকেও ভেদ না করে অন্তত একটা আইনী সাম্যের প্রস্তাব করছে।

মানস চৌধুরীর কাজে গ্র্যান্ড-ন্যারেটিভ তৈরির লোভ নাই; এইটা বরং ক্লাসের ভিন্নতা যে গানের ভোগ পর্যন্ত বিস্তৃত, সেইটা আনফোল্ড করে। ওনার এই আনফোল্ডিং-এর মধ্যে নিম্ন-বর্গের ইতিহাস ও পোস্ট-কলোনিয়ালিজমের এসেন্স আছে। পিরীত আর ভালোবাসা যে প্রতিশব্দ না, বরং ক্লাসের ভিন্নতা– সেইটা দেখাইয়া দেন জনাব চৌধুরী; এই ভিন্নতা তৈরি ও চালু থাকায় কলোনিয়াল ডিসকোর্সের কায়-কারবার নিয়া বলাবলি করছেন মানস চৌধুরী।

বিশেষ ঐতিহাসিক সময়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকাশের আগে, লোকসমাজের জীবন ও চিন্তারীতিতে ‘শ্লীলতার’ মধ্যবিত্ত প্রশ্নটিই অবান্তর ছিল। রাধারমণের গানকে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোকে’র নীতিনৈতিকতার শাসনের মধ্যে বড়সরোভাবে পড়তে হয়নি।

সুমন রহমানকে বলতে হবে মানস চৌধুরীর তত্ত্ব-চাইল্ড; উভয়ে কালচারাল স্টাডিজের অ্যারেনায় ঘুরছেন। গানের প্রাকটিস ও কনজাম্পশনে ক্লাসের ভিন্নতা নিয়া মানস চৌধুরীর অ্যাজাম্পশনগুলিরে কাজে লাগান জনাব রহমান। জনাব চৌধুরীর সোনাবন্ধু’র পিরীতি এবং ভালবাসার সুশীল ডিসকোর্স (২০০০) এবং ‘সূক্ষ্ম প্রেমে’র অর্থ: নিম্নবর্গীয় গানে যৌনতা এবং নারীর আত্মসত্তা (২০০১)—এই দুইটা লেখায় যেই কনসেপ্ট ও ইঙ্গিতগুলি পাওয়া যায় সেগুলি জনাব রহমান নগরায়নের বাস্তবতায় এক্সপ্লোর করেন। এর বাইরে নিম্নবর্গের জীবন ও রাজনীতিতে গানের কনজ্যুমিং কতটা ব্যাপ্ত থাকছে তা বুঝতে জনাব রহমানের কিছু ঋণ আছে ফরহাদ মজহারের কাছে। ইত্যকার তাত্ত্বিক ধারাবাহিকতায় ধর্ম ও লিঙ্গ হিসাবে গানের কনজ্যুমিং-এর ভিন্নতা কতোটা হয়—সেসব নিয়াও কাজ হবে আশা করা যায়।

মানস চৌধুরীর এই দুইটা লেখা বাছবিচারে প্রকাশ করা হবে; এখন প্রকাশিত হলো প্রথমটা। –রক মনু

————-

পূর্বকথা

লেখাটি এক হিসাবে গান নিয়ে। এক দিকে বাউল বা লোকসঙ্গীত যা কিনা নিম্নবর্গীয় সঙ্গীতচর্চার বিষয়, অন্যদিকে শহুরে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর গান হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীত – এই দুই পরিসর লেখাটিতে বিবেচিত হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই গানের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বাজারে পাওয়া যায় এমন শব্দফিতে বা ক্যাসেট। তবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বেলায় লিখিত সংকলন সহজলভ্য বলে সেটিকেও ব্যবহার করা গেছে। যদিও লেখাটি গান নিয়ে, তবুও গান নিয়ে লেখা বলতে যা বোঝায় তা এটি নয়। গানের ডিসকোর্স বুঝবার একটা চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। আধিপত্যশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ধ্যান-ধারণাতে প্রেম-ভালবাসার যে বৈশিষ্ট্য তা মূলগতভাবে নিম্নবর্গীয় ধ্যান-ধারণা হতে আলাদা। মধ্যবিত্ত নীতি-নৈতিকতা বোধের পরিসীমা প্রেম-ভালবাসার অনুভূতিকে অবদমিত করেছে। গানের মধ্যেও সেই নৈতিকতাবোধ প্রকাশিত। ‘সুশীল ডিসকোর্স’ বলতে এখানে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর বাৎচিত বা ডিসকোর্স বোঝানো হয়েছে যার সূত্র হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীত বেছে নিয়েছি। ‘সোনাবন্ধু’ ‘কালাচাঁদ’ ‘কালিয়া’ ‘পরাণবন্ধু’ ‘রাই বিনোদিনী’ এসবই লোক সঙ্গীত কিংবা বাউলসঙ্গীতে প্রেমাস্পদ মানুষকে সম্বোধন করার পদ। ‘সোনাবন্ধু’র পিরীতি বলতে নিম্নবর্গীয় মানুষজনের প্রেম-ভালবাসা বোঝানো হচ্ছে।

এই বিষয়ে কাজ ও লেখালেখির একটা সূত্রপাত হিসেবে ভাবছি বর্তমান লেখাটিকে। বাউল গান কিংবা লোকসঙ্গীত অথবা মধ্যবিত্তের গান কোনটাই প্রচুর সংখ্যায় বিবেচিত হয়নি এই লেখায়। প্রান্তিক হলেও যে বাউল চর্চা চলছে তার প্রত্যক্ষ পরিবেশন দেখাও জরুরী। বর্তমান লেখাটিকে এ বিষয়ে পাঠ করবার একটা প্রস্তাবনা হিসেবেই দাঁড় করাতে চাইছি, এর বেশী কিছু নয়।

কেন নৃবিজ্ঞানীর জন্য এই বিষয়ে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ?

নৃবিজ্ঞান বা অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের শাখায় কাজ করছেন – এমন কারো মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, প্রেম-পিরীতি বিষয়ে কিংবা গান নিয়ে গবেষণা বা জ্ঞানার্জন করা নৃবিজ্ঞানীর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কেন? এই জিজ্ঞাসা নিয়ে এগুতে চাইলে গোড়াতেই একটা তাত্ত্বিক পূর্বানুমানকে জায়গা দেয়া জরুরী। তা হচ্ছে: প্রেম-ভালবাসা শ্রেণী নিরপেক্ষ নয় এবং সামাজিক অনুশীলনে এর লিঙ্গীয় পরিসরও নির্মিত। ফলে প্রেম-ভালবাসা নিয়ে গবেষণায় মনোযোগ দেয়া একই সাথে শ্রেণী ও লিঙ্গের বিষয়ে মনোযোগ দেয়াও বটে। সামাজিক নৃবিজ্ঞানী হিসেবে সে দায় কারো না কারো ওপর বর্তায়। আবার, গান অনুভূতি প্রকাশকারী এবং উদ্রেককারী হিসেবে তৎপর ভূমিকা রাখে। গানের ডিসকোর্স বা বাৎচিত বিশেষ সময়কালে, বিশেষ মানুষজনকে বিশেষ প্রসঙ্গ তুলে ধরতে সহায়তা করে। তাই, যে সময়ে সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরা ডিসকোর্স বিশ্লেষণকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তখন গানের ডিসকোর্সও বাদ পড়তে পারে না। গানে প্রেম-ভালবাসা একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গানে তা একভাবে নিম্নবর্গীয় গানে অন্যভাবে। তবে গড়পড়তা প্রেম-পিরীতির একটা বিস্তৃত পরিসর গানের জগতে স্থান পেয়েছে। ফলে প্রেম-পিরীতির ডিসকোর্স অনুসন্ধান করবার জন্য গান একটা অর্থবহ জায়গা।

ডিসকোর্সকে বিশেষকালে, বিশেষ স্থানে ক্রিয়াশীল বক্তব্যের সমষ্টি হিসেবে উপলদ্ধি করা হচ্ছে জ্ঞানজগতে, যা বিশেষ প্রসঙ্গ, অনুভূতি প্রকাশ করে। শ্রেণীগত পার্থক্যকে যদি নিছক সম্পদের পার্থক্য হিসেবে না দেখি তাহলে ধ্যান-ধারণা বুঝতে ডিসকোর্সও সহায়ক হতে পারে। তেমনি লিঙ্গীয় বৈষম্যকে যদি ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ অনুশীলন দিয়ে বুঝতে চাই, সেক্ষেত্রেও ডিসকোর্স সহায়ক হতে পারে। প্রেম-ভালবাসা নিয়ে কাজ যেমন লিঙ্গ ও শ্রেণী বুঝবার কাজ, তেমনি ডিসকোর্স বিশ্লেষণ আসলে শ্রেণীগত ও লিঙ্গীয় চৈতন্য বিশ্লেষণ। সামাজিক নৃবিজ্ঞানীর পরিসরেই এই কাজ।

পদ্ধতিগত সংকট

গানের যান্ত্রিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মধ্যেই কতকগুলো সংকট তৈরি হয় যে সংকটগুলির মুখোমুখি না হয়ে গবেষকের উপায় থাকে না। সংকটগুলো কমবেশী গানের লেখকসত্ব এবং সময়কালের সাথে সর্ম্পকিত। আধুনিকায়ন প্রকল্প স্পষ্টতই বিশেষীকরণের জন্ম দিয়েছে। সেই হিসেবে অ-লোকসঙ্গীতের সমস্ত জগতই গীতিকার, সুরকার গাইয়ে এবং বাদ্যযন্ত্রীর পরিচয়কে, সেইসাথে ভূমিকাকেও, আলাদা করে। রবীন্দ্রসঙ্গীত এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহারণ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের বেলায় গীতিকার ও সুরকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা স্বতন্ত্র করাই কেবল নয়, সুরের খাঁটিত্ব পরীক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী করবার প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু, রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাইরেও নজরুল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদের গানের পাশাপাশি যেগুলো আধুনিক গান হিসেবে পরিচিত – সেগুলোরও রচয়িতা, সুরকার এবং গাইয়েরা অন্ততঃ চিহ্নিত হয়ে থাকেন। বড় বড় গান-উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ খেয়াল রাখে এবং আধুনিক উৎপাদন ও মজুরী-ব্যবস্থায় তা খেয়াল না রাখবার উপায়ও নেই। ফলে এমনকি ক্যাসেটের গানেরও রচয়িতা ও সময়কাল অনায়াসেই জানা সম্ভব কিংবা কিছু ইঙ্গিত হতে অনুসন্ধান করা সম্ভব। এখানে লেখকসত্বের সীমারেখা বজায় রাখা লেখকের নিজের কর্তব্যের মধ্যে যেমন পড়ে, তেমনি উৎপাদক ও বাজারজাতকারীর কর্তব্যও বটে। সেই সীমারেখাটা আসলে পণ্যের নির্মাতা চিহ্নিতকরণের সীমারেখা।

উল্টোদিকে, লোকসঙ্গীত বলতে ‘ভদ্রলোক’রা যা বুঝে থাকেন কিংবা বাউলগান আধুনিক পুঁজিবাদী বিশেষীকরণের নিয়মে পড়ে না। এর রেওয়াজ একেবারেই ভিন্ন। এর চর্চা শরীকি। সেটা নানাভাবেই শরীকি। প্রথমত, যে দল বাউলগান পরিবেশন করেন, বাদ্যযন্ত্রী ও গাইয়ে সহ, তাঁদের অংশগ্রহণ শরীকি। দ্বিতীয়ত, শ্রোতামন্ডলীর স্পষ্ট ভাব-আদানপ্রদান ঘটে থাকে এই ধরণের পরিবেশনে, সেই অর্থেও এটা শরীকি। তৃতীয়ত এবং মুখ্যত, কোন একটা বিষয়বস্তুকে বা গল্পকে নাননজনই তাঁর গানে বাঁধতে পারেন। ‘গানবান্ধা’র সেই নিয়মে গল্প যেমন বদলাতে পারে, তেমনিই পরিবেশন ঢঙ বদলাতে পারে। এরকম নানা পরিসরের স্বাধীনতা রয়েছে বাউল গানের গাইয়েদের। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, পুরো জগৎটাই কথ্য ঐতিহ্যের, লেখ্য ঐতিহ্যের নয়। গান শেখা এবং শেখানো সবটাই পরম্পরা নির্ভর। তাই পদ দীর্ঘকাল একদম অবিকল থাকতে নাই থাকতে পারে আর সেইটেই গ্রহণযোগ্য। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ‘কপিরাইট’ ব্যবস্থা সেখানে অর্থহীন। তবে গানের মধ্যেই কোন রচয়িতা উপস্থিত থাকবার একটা চল আছে যা সব ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকরী নয়। লালনের অনেক গানে লালনের পরিচয় পাওয়া যায় যখন তিনি যুক্তি দিতে থাকেন তাঁর পদে, যেমন ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে'; কিন্তু অন্য অনেক গানেই তা পাওয়া যায় না। ফলে এসব গানের রচয়িতা বা সময়কাল কোনটাই আবিষ্কার সম্ভব হয় না।

এটা ভাবা সঙ্গত হবে না যে, সমস্যাটা কেবলমাত্র একজন লেখক আবিষ্কার করতে না পারা কিংবা রচনার সময়কাল জানতে না পারার মত সরল। সেটা আপাতঃ সমস্যা। এমনকি একটা কাল্পনিক নিরঙ্কুশ লোকজীবনে সেটা কোন সমস্যাই নয়। বাউলচর্চায় গুরুশিক্ষা হতেই বাউল শেখেন দার্শনিক তথা গানের নির্মাতাকে। কিন্তু, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে, সেই সাথে উৎপাদক ও গানের কারখানাকে। সেক্ষেত্রে সংকটের গভীরতর একটা চেহারা দাঁড়াচ্ছে। দুটো উপলদ্ধি দিয়ে সেই সংকটকে চেনা সম্ভব। প্রথম উপলদ্ধি হচ্ছেঃ গানের বাজার বিস্তৃত হতে শুরু করার পর ‘পল্লীগীতি’ বা ‘লোকগীতি’ বলে একটা জিনিস উৎপাদিত হচ্ছে। টেলিভিশন বা রেডিও প্রধান সারির উদ্যোক্তা হলেও ক্যাসেট কোম্পানীগুলোর উত্থানের পর তা আলাদা গুরুত্বের জায়গায় এসেছে। এসব ক্ষেত্রে গীতিকারকে একদম সাজিয়ে বানানো হচ্ছে। কিছু অ-ভদ্রলোকী শব্দ ও কথা, ক্রিয়াপদের কিছু অ-শহুরে উচ্চারণ এবং লোকসুরের একটা কাঠামো জুড়ে দেয়া – মোটামুটি এই হচ্ছে ‘পল্লীগীতি’ বানাবার কারিগরী কৌশল। লোক মনোজগৎ ও বাউল চিন্তাপদ্ধতি বুঝতে চাইলে কারখানায় বানানো পল্লীগীতিগুলো সনাক্ত করা জরুরী। বাজারের বাউল গানের সংকলনে খুব কম ক্ষেত্রেই রচয়িতার নাম থাকে; আবার থাকলেও নিশ্চিত হওয়া কঠিন যে বাউলের পদ শহুরে গীতিকার আত্মসাৎ করেননি – যেহেতু বাউল পক্ষে নিয়ন্ত্রণ ও  নজরদারী করবার কোন ব্যবস্থা নেই। বানানো ‘লোকগীতি’ শ্রোতাদের কাছে গৃহীত হচ্ছে কি হচ্ছে না, সেটা এক্ষেত্রে অবান্তর প্রশ্ন। সামাজিক বিজ্ঞানীদের এটা বোঝা খুবই জরুরী যে নিম্নবর্গীয় মানুষজনের সঙ্গীতপিপাসু হবার সামাজিক ব্যবস্থা এই মুহূর্তে খুবই সীমাবদ্ধ। সুতরাং, পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা দিয়েই কোন কিছু বিশ্লেষণ করা সঙ্গত হবে না। বানানো ‘পল্লীগীতি’ ও  বাউলসঙ্গীতের একাকার হয়ে যাবার সমস্যা একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝতে সুবিধা হবে। ডন মিউজিকের অত্যন্ত মুনাফাসফল সংকলন দিলরুবার গাওয়া ‘পাগল মন’। সংকলিত ১২টি গানের ১১টিই বানানো হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। একটি গান রাধারমণের, সেটা উল্লেখ করাই আছে সংকলনে। এই এগারোটি গানের মধ্যে রাধারমণের ‘ভ্রমর কইও গিয়া’র সংযোজন বিস্ময় তৈরি করে। সুরকারের পরিচয় দিতে গিয়ে নির্মাতা লিখলেনঃ সংগ্রহ। বাউল গানের সুরের বেলায় সংগ্রহ কথাটি অর্থহীন। একটা বিশেষ পদ্ধতিতে বাউল গান চর্চিত হয় এবং তার আসল শক্তি বাউল দর্শন। গীতিকার-সুরকার বিভাজনই সেখানে সমস্যাজনক। সুরটা নিজে পয়দা করলেন বলে কোন বাউল মনেও করেন না। বাউল দর্শনের চিন্তা পদ্ধতি এবং লোকচেতনা ও  লোকসুরের সম্মিলনকে বুঝতে চাইলে দার্শনিক রাধারমণ, রাধাশ্যাম, কাঙাল হরি পাগল আবুলের গান কিংবা লোকমুখে যৌথভাবে গড়ে ওঠা কোন গান চিনতে পারা জরুরী। বাজারে পণ্যকৃত গানের ক্ষেত্রে সেটা খুবই কঠিন।

সংকটকে চেনার জন্য দুটো উপলদ্ধির কথা বলছিলাম। দ্বিতীয় উপলদ্ধি হচ্ছেঃ বাউলসঙ্গীত লোকসঙ্গীত এবং লোকচৈতন্য স্থির কিছু নয়; শহুরে ও মধ্যবিত্ত ভাবনাজগতের অভিঘাত তার রূপান্তর ঘটাচ্ছে। বিশ শতকের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতে শ্রেণীকাঠামোর ধরণ এবং প্রবল শ্রেণীর দাপটকে চেনা এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণীর দাপটকে শুধু আর্থিক সামর্থ্য দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়, যদিও সেরকম একটা মাথামোটা পাঠভঙ্গি বিদ্যাজগতে রয়েছে। শহুরে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর চিন্তাজগতের আধিপত্য রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকাকে দখল করেছে। সেটা কিছুটা চেষ্টা করলে দেখতে পাওয়া সম্ভব। এর বাইরেও রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, গ্রাম পর্যন্ত বহুকাল আগেই পৌঁছে যাওয়া সরকারী বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। ‘ভদ্রলোকী’ আশা-অকাঙ্খা, মনোজগৎ, বিশ্বসংসারকে দেখবার দৃষ্টিভঙ্গি-সবই লোকজীবনে অনুবাদ হচ্ছে। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সেই অনুবাদ প্রক্রিয়া চালু রাখছে। এর মধ্য দিয়ে লোকচৈতন্যের রূপান্তর ঘটছে, মধ্যবিত্তের কাছে কাম্য-প্রত্যাশিত লোকচৈতন্য ও লোকজীবনের দিকে; সেই রূপান্তরকে এবং দাপুটে মধ্যবিত্তকে বিশ্লেষণ করতে না পারলে ভ্রান্তপঠন হবে। লোকজীবন ও চৈতন্যকে অনড়, অনৈতিহাসিক শ্রেণীকরণ করে বসলে অনায়াসেই যে সমস্যা হয় তা হচ্ছেঃ রূপান্তরিত লোকচৈতন্যকেই ‘খাঁটি’ বলে চিহ্নিত করা এবং সেই ‘খাঁটি’র মাহাত্ম্য বর্ণনা করা। বাজার ব্যবস্থা এবং মধ্যবিত্তের দাপট এতে চাপা পড়ে যায়, নিম্নবর্গীয় মানুষজনের প্রতিরোধ চিনবারও উপায় থাকে না। এই সমস্যা এড়াবার একটা সম্ভাব্য প্রাথমিক রাস্তা হচ্ছে সময়কাল চিহ্নিত করা। বাজারের ক্যাসেট সংকলন হতে তা সম্ভব নয়। এমনকি, বাংলা একাডেমীর লোকসঙ্গীতের পদাবলীর যে বিশাল সংগ্রহ রয়েছে – তাও একই সমস্যায় আক্রান্ত। কোন অঞ্চল হতে সংগৃহীথ তার উল্লেখ থাকলেও রচনার সময়কাল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিহ্নিত নয়।

লোকজীবনের নিম্নবর্গীয় মানুষজনের আলাপচারী বাঙ্ময় (ডিসকার্সিভ) ক্ষেত্রে যে রদবদল ঘটেছে শ্রেণী বৈষম্যে মধ্য দিয়ে, তার ঘটনার জরুরী। বিশেষত যেখানে ডিসকোর্স বা বাৎচিত নিয়ে গবেষণা হচ্ছে সেখানে ডিসকোর্সের এবং তার অর্থের রূপান্তর উপলদ্ধি করতে পারা একেবারে প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোন একটিমাত্র শব্দও ভিন্ন সময়কালে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে, ভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। বিপরীতক্রমে, শ্রোতা কোন শব্দ বা ভাষ্যের যে অর্থ খাড়া করেন  তাও ঐতিাসিক।  পঠনও কোন স্থির জায়গায় থাকে না। এ বিষয়েও একটা উদাহারণ দিয়ে খোলাসা করা যেতে পারে। দুটো ভিন্ন সময়কালের লোকসঙ্গীত (একটি বাউলের অন্যটি বানানো) এবং একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতে ‘অঙ্গ’ শব্দটির ব্যবহার দেখা যেতে পারে।

রাধারমণের গান ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’তে ‘অঙ্গ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে –

 

‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া

শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া (রে)…।’

রবীন্দ্রনাথের গানে ‘অঙ্গ’ ব্যবহৃত –

‘… মম সঙ্গীত তব অঙ্গে অঙ্গে দিয়েছি জড়ায়ে জড়ায়ে

তুমি আমারি, তুমি আমারি

মম জীবনমরণবিহারী।’

কিংবা

‘… ঝলকিছে কত ইন্দু কিরণ, পুলকিছে বনগন্ধ

চরণভঙ্গে ললিত অঙ্গে চমকে চকিত ছন্দ’

 

আবার সাম্প্রতিক সময়ের সংকলন ‘পাগলমন’- এ দিলরুবার গলায় গানে ‘অঙ্গে’র ব্যবহার পাই –

 

‘… পিরীতি শিখাইয়া বন্ধু রইলা কেন দূরে

রাতে বিছানা কান্দে নিশিরাতের চরে

অঙ্গের বসন এলোমেলা করিল পাগল রে…’

 

তিনটি ক্ষেত্রে ‘অঙ্গ’ শব্দের ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এবং ভিন্ন অনুভূতি তৈরী করে তা। ‘অঙ্গ’ এখানে নিছক শব্দ নয়। ডিসকোর্স বা বাৎচিত বিশ্লেষণ করতে অনুভূতির এই বদল বোঝা জরুরী। রবীন্দ্রনাথের গানে শরীরহীনতার চর্চা চলে এবং অন্য দুইক্ষেত্রে শরীরানুভূতি প্রকাশিত হয় – ব্যাপারটা এত সরল নয়। একটা বিশেষ সময়কালে কোন বিশেষ শ্রেণীতে কোন ভাষা কী অর্থ বা অনুভূতি প্রকাশ করে সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই ডিসকোর্স। মধ্যবিত্ত মানদন্ডে উপরের উদাহারণগুলোর প্রথমটি  ও তৃতীয়টি উভয়ই ‘অশ্লীল’ বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখা প্রয়োজন, দুটো গানের জন্মকাল ও লোকজগতে অনুশীলনের ঢঙ একেবারেই ভিন্ন। বিশেষ ঐতিহাসিক সময়ে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকাশের আগে, লোকসমাজের জীবন ও চিন্তারীতিতে ‘শ্লীলতার’ মধ্যবিত্ত প্রশ্নটিই অবান্তর ছিল। রাধারমণের গানকে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোকে’র নীতিনৈতিকতার শাসনের মধ্যে বড়সরোভাবে পড়তে হয়নি। এর মানে এই নয় যে, অভিজাত শ্রেণী তখন ছিল না। পক্ষান্তরে, ঔপনিবেশিক সময়কালে এই শতকের মধ্যবিত্ত শহুরে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর গঠন হল যার  কর্তৃত্ব ও আধিপত্য পূর্বতন অধিপতি শ্রেণীর থেক ঢের ঢের বেশী। সঙ্গীতকে সংজ্ঞায়ন, মান নির্ধারণ সবই সম্ভব হল এর পক্ষে। ‘শ্লীলত-অশ্লীলতা’র দ্বিবিভাজন এই শ্রেণীর উত্থানপর্বের সাথে সর্ম্পকিত করে দেখতে হবে। রাধারমণদের গানগুলো উত্তরকালের প্রবল মধ্যবিত্ত শ্রেণী খারিজ করে দিতে পারল ‘অরুচিকর’ ‘অশ্লীল’ হিসেবে। এই মধ্যবিত্ত নীতিনৈতিকতার বোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তাপদ্ধতি এবং এর দাপট বিশ্লেষিত হওয়া প্রয়োজন। তৃতীয় উদাহারণটির বেলায় প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারখানায় বানানো সে গানটি যে সময়কালে তৈরী হচ্ছে, সে সময়ে ‘শ্লীলতা-অশ্লীলতা’র পরিসর নির্ধারিত। শহুরে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণী যে তখন নিজেরই নির্ধারিত শ্লীল পরিসরে সঙ্গীত চর্চা করছে সেতো স্পষ্টই, উপরন্তু এর বিপরীতে নিম্নবর্গীয়দের সঙ্গীত জগতকে অশ্লীল বলে সাব্যস্ত করছে। এই প্রেক্ষিতে ‘শ্লীল-অশ্লীল’ পরিসরকে চিনে নিয়ে এবং মেনে নিয়ে নিম্নবর্গীয় সঙ্গীতচর্চা ঘটবার অবকাশ আছে। অর্থাৎ শ্রোতামনের কাছে ‘অশ্লীল’ অনুভূতি উৎপাদন করাই সেই চর্চার লক্ষ্য হতে পারে। বিশেষত যখন আমরা শহুরে গান-উৎপাদক একটা গোষ্ঠীকে ও বাজারকে চিহ্নিত করতে পারছি, তখন এই বিবেচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে একদিকে শহুরে গান নির্মাতার আশা-আকাঙ্খা এবং কাম্য-প্রত্যাশিত লোকজগৎ নিয়ে বানানো ‘পল্লীগীতি’ বা ‘লোকগীতি’র চল রয়েছে; অন্যদিকে বাউল চিন্তাপদ্ধতি ও লোকচৈতন্যের রূপান্তর ঘটবার দাপুটে ব্যবস্থা রয়েছে। এই দুই বাস্তবতাকে চিনতে পারার জন্য বাউল ও ব্যাপক অর্থে লোকসঙ্গীতের সময়কাল ও রচয়িতা শনাক্তকরণ জরুরী। নইলে বিশেষ সমাজ ব্যবস্থা এবং লোকচৈতন্য অনুধাবন করা, মধ্যবিত্তের পরিসরে, একেবারেই অসম্ভব।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় জরুরী। গানের ডিসকোর্স বিশ্লেষণ করার বেলায় পদ বা গানের কথাকে তার গায়কী রেওয়াজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা পদ্ধতিগতভাবে গোলমাল বয়ে আনবে। সূক্ষ বিচারে দেখলে এটা ডিসকোর্সের ধারণাগত সমস্যা হতে তৈরী হতে পারে। ডিসকোর্স বা বাৎচিত শুধুই বাক্যাংশ হতে পারে না। বিশেষ সময়কালে বিশেষভাবে ব্যবহৃত, বিশেষ অনুভূতির উদ্রেককারী হিসেবে ডিসকোর্সকে উপলদ্ধি করলে, গানের বেলায় তা কেবল বাণী বা পদ হতে পারে না। এমনকি কেবলমাত্র সুরের সংযোজন থাকা না থাকা নিয়েও বলছি না আমি। সুর কখনো গায়কী রেওয়াজ হতে বিযুক্ত নয়, বাউল ঐতিহ্যে তা কথা হতেও বিযুক্ত হতে পারে না। ফলে, গানের ডিসকোর্স তার প্রকাশভঙ্গিসহ বিবেচ্য হতে হবে। গবেষকের জন্য একটা জটিল মোকাবিলার পরিস্থিতি এটা।শুধু সুরজ্ঞান থাকা বা না থাকার প্রশ্ন নয়, কিভাবে বিশেষ সুর ও গায়নশৈলী বিশেষ অনুভূতির সাথে যুক্ত তা অনুধাবন করবার একটা তাগিদও থাকতে হবে। এমনিতে প্রচার মাধ্যমে বিশেষভাবে ‘লোকসঙ্গীত’ ও ‘বাউলসঙ্গীত’কে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে মাঝে মধ্যেই কিছু ‘ভদ্রলোক’ ও ‘ভদ্রমহিলা’ শ্রেণীর গাইয়েরা লোকসঙ্গীত অর্থাৎ বানানো (manufactrured) ‘পল্লীগীতি’ শুনিয়ে থাকেন। কিছুটা উচ্চগ্রামের স্বরে, ভাওয়াইয়া হলে স্থানে-অস্থানে গলাটা খানিক ভেঙ্গে গাইয়েরা পল্লীগীতির স্বরূপ নির্ধারণের চেষ্টা করে থাকেন। এই মূহুর্তে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রওয়ালা ব্যান্ডদলগুলো ‘ফোক’ গান গাইছে। লোকসঙ্গীত বা বাউলসঙ্গীতের ধরন চিনতে এগুলো মধ্যবিত্ত গবেষকের জন্য নয়া নয়া সংকট তৈরি করছে যার মোকাবিলার পথ খোদ গবেষককেই করে নিতে হবে।

এতটা সময় জুড়ে পদ্ধতিগত সংকট নিয়ে আলোচনা করবার একটা স্পষ্ট কারণ আছে। আগেই বলেছি, এ বিষয়ে কাজ ও আগ্রহ এখানেই থামিয়ে রাখবার কোন ইচ্ছে নেই আমার। যদিও গানের ডিসকোর্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রেম-পিরীতি বিষয়ে মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর ভাবনাজগৎ, ধ্যান-ধারণা এবং নিম্নবর্গীয় ভাবনাজগতে, ধ্যান-ধারণার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করার কথা, তবুও পদ্ধতিগত আলোচনা আগামী কাজের পটভূমি হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

দুই শ্রেণীর প্রেমপিরীতি

শুরুতেই বহুল পরিচিত একটি লোকগীতির পদ তুলে ধরছি। শব্দ সংরক্ষণ প্রযুক্তির সুবাদে আব্বাসউদ্দেন আহমেদের গলায় খুবই জনপ্রিয় হয় গানটি।

১   ‘সোনাবন্ধুরে কোন দেশেতে যাইবা ছাড়িয়া।

২    আমি কাইন্দা কাইন্দা হইলাম সারা কেবল তোমার লাগিয়া রে।

৩   সুখবসন্ত দিলরে দেখা

৪    আর তো যৈবন যায়না রাখা

৫    আমি আছি বন্ধু তোমার আশায় চাইয়া রে।

৬   পিরীত কইরা এই ফল হইল

৭    জগতে কলঙ্ক রইল রে

৮  কেবল রইল বন্ধু তোমার লাগিয়া রে।

৯   যেই না দেশে যাইবারে তুমি

১০ সেই না দেশে যাব আমি গো

১১ অঞ্জন পক্ষী হইয়া করব আমি দেখা রে।’

 (দেখার সুবিধার্থে পদের ক্রমাঙ্ক দেয়া হল)

লোকসঙ্গীতে ভাবাবেগ (passion) প্রকাশের এই রীতি প্রচলিত এবং এরকম নজির পাওয়া যায় অনেক গানে। গানটি বিশ্লেষণ করলে অনেকগুলো বিষয় সামনে চলে আসে। গানটির চতুর্থ ও সপ্তম চরণ পড়ে ভাবা সম্ভব যে এর কথক নারী। কিন্তু লোক ও বাউল সঙ্গীতের আত্মসত্তা (subject) মধ্যবিত্ত গানের মত ধ্রুব নয়। এই বিশেষ গানটি পুরুষ গাইয়ে গাইতে পারেন এবং সে রকম রেওয়াজ চলতি তো আছেই, উপরন্তু একে পুরুষের ভাষা হিসেবে ভাববার সুযোগও রয়েছে। শুরুতেই ‘সোনাবন্ধু’ সম্বোধন লিঙ্গ নিরপেক্ষ। লোকসঙ্গীতে ‘সোনাবন্ধু’ ‘পরাণবন্ধু’ ‘পাখী’ এরকম বহু সম্বোধন লিঙ্গ নিরপেক্ষ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। সেই সাথে পুরুষ ও নারী বাচক সম্বোধনও কাজ করে। পুরুষ বাচক সম্বোধন হচ্ছে ‘শ্যাম কালাচাঁদ’, ‘কালাচাঁদ’ ‘কালিয়া’ ‘রসের নাগর’ (নারী বাচক ব্যবহারও ঘটতে পারে) ইত্যাদি। নারী বাচক সম্বোধন হচ্ছে ‘প্রাণসখী’ ‘সজনী’ ‘রাই বিনোদিনী’ ‘রাধিকা’ ইত্যাদি। এই ধরণের সম্বোধন বুঝতে চাইলে বৈষ্ণব প্রভাবকে বিবেচনায় আনতে হবে। লোকসঙ্গীত কিংবা বাউল সঙ্গীতের জগতে ‘রাধাসত্তা’ ও ‘কৃষ্ণসত্তার’ উপস্থিতি নিয়মিত। এই দুই সত্তা এক বিচারে বিপরীতার্থক। কিন্তু, আধুনিক চিন্তা পদ্ধতিতে নারী পুরুষের ভিন্নতা যে দ্বিমুখী তীক্ষ্ণ পরিসর বিভাজন তৈরী করেছে সেই প্রক্রিয়া লোকজগতে অনুপস্থিত ছিল। লোকসঙ্গীতেও তাই লিঙ্গীয় সর্ম্পকের একেবারে শক্তপোক্ত বৈষম্য ধরা পড়ে না। সেটা বোঝা সম্ভব লিঙ্গীয় ভূমিকার রূপনিমার্ণকে বিবেচনা করলে। যে কাম্য নারীত্ব মধ্যবিত্ত আশা আকাঙ্খাতে পুরুষালি বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে নির্মিত হয়েছে মধ্যবিত্ত গানের জগতে সেই নারীত্ব, রমনীয়তা লোকগানের রূপকথা নির্মাণে অনুপস্থিত।

 

‘ওগো শান্ত পাষাণ মূরতি সুন্দরী

চঞ্চলেরে হৃদয়তলে লও বরি’

কিংবা

‘সুনীল সাগরে শ্যামল কিনারে দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে।।

………………….

মধুপগুঞ্জে সে লহরী তুলিবে

কুসুমপুঞ্জে সে পবনে দুলিবে,’

(প্রেম পর্ব।। গীতবিতান)

 

এই উদাহারণগুলো হতে কাঙ্খিত রমনীয়তার ধারণা স্পষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথের গানে আসলে উনিশ শতকের ও বিশ শতকের গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত পুরুষেরই (শহুরে ও শিক্ষিত) আকাঙ্খা ধরা পড়ে। আপাত দৃষ্টিতে আমার এ ধরনের নির্বাচনকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে হতে পারে। এ কথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথের অনেক গানেই আকাঙ্খিত নারীত্ব নির্মাণের উদাহারণ দেবার মত বৈশিষ্ট্য নেই। কিন্তু যদি আমরা লিঙ্গীয় ভূমিকার নির্দিষ্টকরণ খুঁজতে যাই তাহলে প্রচুর উদাহারণ রয়েছে যার মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত পুরুষের পৌরুষ এবং তার বিপরীতে নারীর আদল বানানোর প্রক্রিয়া আছে। তবে রবীন্দ্রনাথের গানে বাস্তব সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতার ও অনুভূতির প্রকাশভঙ্গি অনুধাবন সহজ নয় কিংবা সেই প্রকাশগুলোই স্পষ্ট নয়। ফলে আপাতভাবে নারী বা পুরুষ কোন আত্মসত্তাই (subject) খুঁজে পাওয়া দুরুহ। হয়তো মধ্যবিত্ত সাবজেক্ট আরও কার্যকরী পদ হতে পারে অনুসন্ধানের জন্য। 

দুই শ্রেণীর সঙ্গীতধারায় নারী ও পুরুষের লিঙ্গীয় ভূমিকার পরিসর নিয়ে আলোচনার গোড়াতেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, লোকসঙ্গীত বা রবীন্দ্রসঙ্গীত উভয় জগতেই একটা বিষম লিঙ্গীয় (hetero sexual) আধিপত্যের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে। এই চর্চার মধ্যে যে পদাবলীগুলো আমরা দুই ভিন্ন ক্ষেত্রে পাই, তাও বেড়ে উঠেছে একটা বিষমলিঙ্গীয় সর্ম্পককে আশ্রয় করে, তা ইঙ্গিত করে একটা বিষমলিঙ্গীয় সর্ম্পকের দিকে। কিন্তু, এক্ষেত্রেও নিম্নবর্গীয় ও ভদ্রলোক শ্রেণীর গানের পদে ও প্রকাশভঙ্গিতে মূলগতভাবেই ফারাক আছে। এখানে পদ বা গানের বাণী নিয়েই বলা সম্ভব সহজে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গানে বিষমলিঙ্গীয় সম্পর্ক অনিবার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু, স্পষ্ট করেই বলা যায়, লোকগানের অর্থ সব সময় নিরঙ্কুশভাবে বিষমলিঙ্গীয় সম্পর্কে পরিসীমিত হয় না। এখানে আমি শুধু গানের বাণী বা কথাগুলো লিখবার সময়কার কার্যকরী অর্থের কথাই বলছি না, বরং কিভাবে কোন গান (চূড়ান্ত বিচারে গানের পরিবেশন শৈলীসহ) শ্রোতা পাঠ করতে পারেন তাও আমার বিবেচ্য। শ্রোতার জন্য গানের পঠন শুধুমাত্র বিশেষভাবে পরিসীমিত হয়ে পড়ছে কিনা সেই ভাবনা থেকেই  এই প্রসঙ্গটা তুলছি। মধ্যবিত্ত তথা রবীন্দ্রনাথের গানে ব্যবহৃত আত্মা (self) অর্থাৎ ‘আমি’কে যদি আমরা পুরুষ কল্পনা করি, তাহলে অনিবার্যভাবেই ‘তুমি’ হচ্ছেন নারী। এখানে তাঁর নিজেরই শ্রেণীকৃত প্রেম পর্বের গানের কথাই বলছি।

 

‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে।’

কিংবা

‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’ ইত্যাদি

 

উদাহারণে পরিসীমিতভাবে এবং সর্বাত্মকভাবেই বিষমলিঙ্গীয় পাঠ-ইঙ্গিত আছে। লোক ও বাউলঙ্গীতে শিথিলতা আছে যার কারণে সর্বাত্মক বিষমলিঙ্গীয় পাঠের বাইরেও কোন সম্ভাবনা থাকে।

 

‘গোলেমালে গোলেমালে পিরীত কইরো না’

………………………………..

‘এক পিরীতে শিব শ্মশানবাসী

আরেক পিরীতে গোরা হল নদেয় নিমাই সন্ন্যাসী

ওরে গীত গোবিন্দ পদ্মাবতী এরাই কেবল কয়জনা’

কিংবা

‘তুই আমারে পাগল করলি রে

ওরে ও গোরা দয়া না করিলি

আবার বিচ্ছেদ সাগরে তুই ভাসাইলিরে’।

 

উদাহারণ দুটির প্রথমটির দ্বিতীয় ছত্র যদি লক্ষ্য করি আমরা কিংবা দ্বিতীয়টির প্রথম ও তৃতীয় ছত্র, তাহলে দেখতে পাব সেখানে এমন প্রকাশভঙ্গি ও প্রসঙ্গ আছে যার সাথে সমলিঙ্গীয় ভালবাসায় অভ্যস্থ মানুষজনও (বিশেষত পুরুষরা) যুক্ত বোধ করতে পারেন।তাঁদের ভালবাসাবাসির একটা পাঠ দাঁড় করানো সম্ভব এখানে। পঠনের এই বহুবিধ সম্ভাবনা লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য। প্রথম উদাহারণটিতে ‘পিরীতে সন্ন্যাসী হওয়া’ এবং দ্বিতীয় উদাহারণে ‘পাগল করা’ ও ‘বিচ্ছেদ সাগরে ভাসানো’ ডিসকোর্সগুলি লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে বহুল পরিচিত। তবে সেটা মূলত একটা বিষমলিঙ্গীয় অর্থে। এখানে, এই বিশেষ দুটি গানে পিরীতের প্রধান অর্থ লঙ্ঘিত হয়েছে। আমি জোর দিতে চাইছি এই লঙ্ঘন বা অতিক্রমণ (transgression) লোকসঙ্গীতের একটা বড় বৈশিষ্ট্য। গোরা বা নিমাই সন্ন্যাসীকে এই গানের পাত্র বানানোর পেছনে চৈতন্যদেবের, যা গোরার সিদ্ধি-উত্তর খেতাব, বিশ্ববীক্ষা-আধ্যাত্মিক চেতনা কাজ করেছে। লোকসঙ্গীত কিংবা বাউলসঙ্গীতের বড় একটা অংশ সে ঐতিহ্যের সাথেও সম্পর্কিত।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভাবনাজগতে শুচিতার একটা নির্দিষ্ট অর্থ দাঁড়িয়েছে। এই শ্রেণীকে চিনবার ক্ষেত্রে যৌনতার নিয়ন্ত্রণ ও যৌনাচার শাসন করবার বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এই মূল্যবোধ আশ্রয় করেছে বিয়ে ব্যবস্থার ঐতিহাসিক রূপ নেয়ার মধ্যে। আধুনিক বিয়ে ব্যবস্থা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যৌনমতাদর্শের সবচেয়ে বড় প্রকাশ। একগামিতাকে (monogamy) শুধু নির্দিষ্ট করে দেয়াই এর বৈশিষ্ট্যমাত্র নয়, বরং অপরাপর নানা সম্ভাবনাকে ‘অনৈতিক’ চিহ্নিত করে প্রান্তিক করে ফেলাও সেই প্রক্রিয়ার পরিচায়ক। মধ্যবিত্তের গানে একগামিতার জয়জয়কার। আমি বলতে চাইছি না যে, রবীন্দ্রসঙ্গীত বর্তমান বিয়ে ব্যবস্থার জয়গান করতে থাকে কিংবা নারী পুরুষের একগামিতা যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। আমি এও বলতে চাইছি না যে, একগামিতা গর্হিত কাজ।  যে মধ্যবিত্তের আত্মপরিচয় যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা ও অবমুক্তির সাথে, সেই শ্রেণীর শাসন ও নিয়ন্ত্রণকে চিনবার জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ দাঁড় করাবার চেষ্টা করছি মাত্র। সেই শাসন ও নিয়ন্ত্রণ এই বিশেষ আলোচনায় ভালবাসা ও যৌনতা নিয়ে। এই শাসন ও নিয়ন্ত্রণ নারী ও পুরুষের জন্য আবার ভিন্ন। তবে সে আলোচনা ঠিক এই মুহুর্তে আনছি না। রবীন্দ্রনাথের গানে পাই –

‘আমরা দুজনা স্বর্গ খেলনা গড়িব না ধরণীতে’

কিংবা

‘দুজনে দেখা হ’ল মধু যামিনীরে’…।

 

এরকম অজস্র উদাহরণে শাব্দিকভাবেই ‘দুজন’ কিংবা আমি-তুমির মধ্য দিয়ে ‘দুজন’ নিরন্তরভাবে উপস্থিত এই যুগল উপস্থিতি। একটা বৈধ প্রেমের রূপ নির্মাণ করে, যে বৈধতা একেবারেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীপরিসীমার ও শ্রেণীক্ষমতার উৎপাদন।মধ্যবিত্তই এখানে বৈধতা-অবৈধতা, শুচি-অশুচি বিপ্রতীপতা (dychotomy) তৈরী করেছে। অথচ লোকগানে পাই –

 

‘আমায় এত রাতে কেনে ডাক দিলি প্রাণ কোকিলারে

নিভছিল মনের আগুণ জ্বালাইয়া গেলি।

আম ধরে থোকা থোকা তেঁতুল ধরে বাঁকা (হায়রে)

আমায় আসবে বলে শ্যামকালাচাঁদ নাহি দিল দেখা।

আমার শিয়রে শাশুড়ি ঘুমায় জ্বলন্ত নাগিনী

আমার বৈঠানে ননদী শুয়ে দুরন্ত ডাকিনী।।’

 

মধ্যবিত্ত শ্রোতা অনায়সে একে ‘পরকীয়া’ বলতে পারেন, কিন্তু সেটা মধ্যবিত্ত বিচারবোধে নেতি অর্থই প্রকাশ করে। এখানে শাশুড়ি ও ননদীর পাহারায় থেকে বন্ধুর সাথে সাথে পিরীতি করছেন প্রেমিকা। এখানে তিনি নারী সত্তা। ননদী, শাশুড়ি, নিয়ে কিংবা মাঝির মারফৎ স্বামী ভিন্ন প্রেমিককে  বার্তা পাঠানো – একাধিক লোকগানে পাওয়া যায়। বিপরীতক্রমে, কৃষ্ণসত্তাকে পাই যিনি রাধা ভিন্ন বন্ধুর সাথে পিরীতি করছেন। এখানে কৃষ্ণ ও রাধা সত্তাকে নিছক পুরাণের কৃষ্ণ ও রাধার সাথে একাকার করে দেখলে সমস্যাজনক হবে। বাউল ও লোকদর্শনের অর্ন্তনিহিত শক্তি অন্যত্র।

শক্তিটা তাহলে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। লোকসঙ্গীত কিংবা বাউলসঙ্গীতের বাস্তবতা বৈজ্ঞানিক নিমিত্ত (scientific reason) নির্ভর নয়। বৈজ্ঞানিক নিমিত্ত একেবারেই আধুনিক প্রগতিবাদী ডিসকোর্স পয়দা করা। লোকসঙ্গীতের বাস্তবতা বৈজ্ঞানিক নিমিত্ত নির্ভর নয় বলে সেটাকে অবাস্তব ভাবা যাবে না। অবাস্তব ভাবাটা উন্নাসিক বিচারবোধকে হাজির করবে, সমাজ উপলদ্ধিকে নয়। তা বাস্তব এ কারণে যে, নির্দিষ্ট মানুষজন এই গানের সাথে যুক্ত বোধ করেন; তাদের আবেগ-অনুভূতি, আশা-আকাঙ্খার মধ্যে এই গান অর্থহীন হয় না। চন্ডীদাসের পালায় পাই –

 

‘… রজকিনী চন্ডীদাসরে একদিন কইমাছ ভাজিয়া

খাবার তরে আইন্যা রে দিল ঘটিতে ভরিয়া,

পথের মধ্যে ছোকরা একদল চন্ডীরে জিগায়

ঘটিত ভইরা কী মাছ আনছো দেখাও তুমি আমায়।

…………………………………….

এশ্ কের টানে ভাজা কইমাছ

ভাজ কই তাজা হইয়া এবার করে গড়াগড়ি রে

পিরীত রতন পিরীত যতন রে।….’

 

এশ্কের টানে ভাজা কইমাছ তাজা হচ্ছে শোন লোক শ্রোতারা এর সম্ভব-অসম্ভব বিচার করতে বসেন না। মাছ তাজা হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এশকের মাহাত্ম্য যেভাবে অনুভূত হল – সেই অনুভূতি লাভটাই এখানে বড় বিবেচ্য। মধ্যবিত্ত যাকে যুক্তিশীলতা (rationality) বলে জানেন তার কোন প্রাসঙ্গিকতা এখানে খুঁজতে যাওয়া নিরর্থক। অনুভূতির ঐ বিশেষ প্রাসঙ্গিকতাই ডিসকোর্সকে বুঝতে সহায়তা করবে।

উদাহরণটিতে একটা টানা গল্প আছে। গল্পের বয়ান লোকগানের একটা বৈশিষ্ট্য। কাহিনীর গাঁথা ছাড়া বাউল দর্শনের তত্ত্বপ্রধান গানে যুক্তিতর্কের ব্যাপক উপস্থিতি থাকে। বয়ান (narration) বা যুক্তিতর্কের এই শৈলী বাউল কিংবা লোকসঙ্গীতের একটা চাঙ্গা দেহ বানায়। মধ্যবিত্ত গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য কোনভাবেই এটা নয়। এই ভিন্নতা দুধরণের আত্মসত্তা (subject) বানানোতে মদদ দেয়। লোকগানের বয়ানে প্রচুর ক্রিয়া (action) থাকে কিংবা থাকে তর্ক করবার যুক্তি। সেই ক্রিয়াতে অংশগ্রহণকারী পাত্রপাত্রী বা সেই যুক্তি প্রদানকারী বাউল মিলে যে লোক আত্মসত্তা প্রকাশ করে তা সক্রিয় (active)। মধ্যবিত্ত আত্মসত্তা ক্রিয়া হতে বিযুক্ত থাকে। একটা নিস্ক্রয়তা সেই আত্মসত্তার বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যায়। ভালবাসাবাসির গানে এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষ অর্থ বহন করে। চলতি ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রনাথের গান বিশ্লেষণে প্রায়শই কতকগুলো বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘বিমূর্ত’, ‘অতীন্দ্রিয়’, অথবা বলা হয় ‘শরীরকে অতিক্রম করে নিয়েছেন তিনি’ কিংবা ‘স্বাপ্নিলতাই রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রাণ’। একথা সঠিক যে, রবীন্দ্রসঙ্গীতে রূপকের (metaphor) ব্যবহার প্রচুর এবং তা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। কিন্তু, স্পষ্ট হওয়া দরকার, রূপক ব্যবহার রবীন্দ্রসঙ্গীতকে লোকসঙ্গীত থেকে পৃথক করেনি। রূপক লোকসঙ্গীতেও প্রচুর ব্যবহৃত।

এখানে একটা সরল রাস্তা ভেবে দেখা যেতে পারে। ক্রিয়ার সাথে ‘আত্মে’র (self) নিরন্তর বিযুক্ত হতে থাকা রবীন্দ্রনাথের গানকে পৃথক করেছে। আত্মসত্তার এই বিযুক্তিকে মোটের ওপর ‘আধুনিক গানের’ই (রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ) বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে আধুনিক বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গানের অগ্রদূত হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গানই বিশেষভাবে ভাবা হচ্ছে। আত্মসত্তার এই বিযুক্তি প্রক্রিয়ায় ক্রিয়া যা কিছু হয় তার বেশীর ভাগই ‘নিজ’ এর বাইরে। ‘নিজ’ বা ‘আত্মা’ একটা স্থির যেন। প্রেম-ভালবাসার গানে এই বিযুক্তিকরণ প্রেমকে শরীরহীন করে ছাড়ে শেষমেশ। ভাবাবেগ/উদ্বেলতা (passion) তখন চাপা পড়ে যায়। প্রেমের অযৌনকরণের মধ্য দিয়ে আমরা আবিষ্কার করতে পারি অবদমিত (repressed) মধ্যবিত্ত আত্মসত্তা। রবীন্দ্রনাথের গানের দুর্বোধ্যতা বলতে মধ্যবিত্ত পরিসরে যা বোঝানো হয় তা আসলে এই অবদমিত আত্মসত্তার উদযাপন কখনো কখনো। বিযুক্তিকরণকে এক্ষেত্রে অযৌনকরণ, অশরীরীকরণের কারণ ভাবলে ভুল হবে। অযৌনকরণ এখানে উদ্দেশ্য, বিযুক্তিকরণ উপায়। মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর প্রকল্প এটা। যৌন নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের প্রকল্প, অনুভূতির অবদমনের মধ্য দিয়ে। ক্রিয়া-অক্রিয়ার কথা বলছিলাম। নিম্নবর্গীয় পদে ‘বিরলে বসিয়া কান্দি’ পাওয়া গেলে রবীন্দ্রসঙ্গীতে পাই ‘ভাষাহারা মম বিজন রোদনা প্রকাশের লাগি করেছে সাধনা।’ নীচে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে হতে ইচ্ছেমত বাছাই করে কতকগুলো ক্রিয়া তুলে ধরছি। সবই প্রেমপর্ব হতে, প্রাসঙ্গিকভাবেই।

 

‘আকাশে আজ কোন্ চরণের আসা যাওয়া’ (১১)

‘গান হায় ডুবে যায় কোন্ কোলাহলে’ (১৭)

‘যে ফুল গেছে সকল ফেলে…’ (২১)

‘বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে’ (২৯)

‘ছিড়ি মর্মের শত-বন্ধন তোমা-পানে ধায় যত ক্রন্দন’ (৩২)

‘বাতাসে কী কথা ভেসে চলে আসে’ (৫৮)

(পাশের ক্রমাঙ্ক গীতবিতানে প্রেমপর্বের গানের ক্রমাঙ্ক)

 

লোকগানে ‘নিজ’ বা ‘আত্ম’ সক্রিয় সচল। সেখানে পিরীতির রেওয়াজ ভিন্ন। শরীরকে অনুভূতি হতে পৃথক করবার আধুনিক তাগিদ নেই। উদ্বেলতা (passion) প্রকাশের চল সেখানে আছে। প্রথম উদারণটিতে আবার মনোযোগ আকর্ষণ করছি। গানটির ৩,৪,৯,১০,১১ ক্রমাঙ্কের চরণ বা ছত্রগুলিতে প্রেমিকের বা বন্ধুর ভাবাবেগ বা উদ্বেলতা প্রকাশিত। ‘সুখবসন্ত’ দেখা দিল, ‘যৌবন ধরে রাখা’ কঠিন এবং ‘বন্ধুর সান্নিধ্যে’ যাবার জন্য অঞ্জন পাখী হওয়ার বাসনা। বসন্তের খুব স্পষ্ট একটা অর্থ লোকচৈতন্যে আছে। তার আগে ‘সুখ’ বিশেষণের ব্যবহার ভাবাবেগকে স্পষ্ট করেছে, বসন্তের কামোদ্দীপক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরেছে। নিম্নবর্গীয় মনোজগতে এই অনুভূতি অবদমনের প্রয়োজন নেই। পিরীতি শরীর হতে ব্যবচ্ছেদ কৃত হয় না।

 

‘… তোমার দেহভরা রূপের যে রাশি

ও তুমি অধর পুরে দেহ হাসি রে

যোগী ভিক্ষা ধর।’

 

ভিক্ষা এখানে প্রেমের রূপক, বলাই বাহুল্য, অশরীরী নয়। এই উদাহরণটি অবশ্য লিঙ্গীয় রূপনির্মাণের অনির্দিষ্টতার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে। কিংবা ‘পাগল হইয়ে কোলে বসিয়ে নয়নের জলে বন্ধু আমায় ভাসাইলি’, ‘ও রসের কালিয়া, কই গেলি কই গেলি আগুন জ্বালাইয়া’ ইত্যাদি।

‘প্রেমের আগুন জ্বালাইয়া’ বলবার মধ্যে অনবদমিত প্রেমাবেগ প্রকাশিত হয়। লোক ঐতিহ্যে, অরূপান্তরিত নিম্নবর্গীয় প্রেম-পিরীতিতে সেটা নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় যা গুটিকতক উদাহরণে স্পষ্ট নাও হতে পারে। ‘ভদ্রলোকে’র সুশীল বাৎচিতে এই প্রেমাবেগ প্রকাশিত হয় না, গঠিত ভদ্রলোক শ্রেণী এই প্রেমাবেগ প্রত্যাশাও করে না। চূড়ান্ত বিচারে বিয়েমুখী যৌনশাসিত যুগল নির্মাণই (অবশ্যই বিষমলিঙ্গীয়) এই শ্রেণীর প্রেমচর্চা।

 

পাঠ নির্দেশ

ফরহাদ মজহার, “লালন ও আমাদের সময়”, চিন্তা, বছর ৪, সংখ্যা ৫, ১৯৯৪

ফরহাদ মজহার, “কে তাহারে চিনতে পারে”, চিন্তা, বছর ৭, সংখ্যা ১৬, ১৯৯৮

ফরহাদ মজহার, “বাংলার ভাবান্দোলন”, শৈলী, বর্ষ ৪, সংখ্যা ১৬, ১৯৯৮

মানস চৌধুরী ও রেহনুমা আহমেদ, ‘লিঙ্গ, শ্রেণী ও অনুবাদের ক্ষমতা: বাঙ্গালী মুসলমান মধ্যবিত্ত বিয়ে ও পরিবার’, সমাজ নিরীক্ষণ, সংখ্যা ৩৩, ১৯৯৭

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী, কলকাতা

Asad, Talal, Genealogies of Religion: Discipline and Reasons of power in Christianity and Islam, The John Hopkins University Press, London, 1993

Gramsci, Antonio, Selections from the Prison Notebooks, Orient Longman, Hyderabad, 1996

Hall, Stuart, Representations: Cultural Representation and signifying Practices, Sage and Open University Press, London, 1997

Foucault, Michel, The Archaeology of Knowledge, Routledge, London, 1997, (1972)

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
মানস চৌধুরী
গল্প-লিখিয়ে, বিশ্লেষক, অভিনেতা, নৃবিজ্ঞানী। মানস চৌধুরী (১৯৬৯-) গল্প লিখতে শুরু করেন কেবল এই ভাবনা থেকে যে প্রবন্ধের থেকে গল্প প্রকাশনা সহজ হবে। তবে তার কপাল বিশেষ ভিন্ন হয় না এমনকি এই নতুন ধারাতেও।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.