Main menu

‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’

সাগুফতা শারমীন তানিয়া আর আমি অনেকদিন ধইরা ভাবতেছি একসাথে একটা বই লিখবো। কিন্তু আমার আইলসামির চোটে লেখা হইতেছিল না। এখনো যে খুব কর্মঠ হইয়া গেছি হঠাৎ, তা অবশ্য না। তবু শেষ পর্যন্ত বইটা জন্মগ্রহণ করতেছে। বইয়ের নাম ‘আনবাড়ি’। নামটা তানিয়ার দেয়া। শুনলেই ওই গানটা মনে আসে – ‘আমার বধুয়া আনবাড়ি যায় আমারি আঙ্গিনা দিয়া…’। 

অবশ্য নামকরণের পিছনে বধুয়া সংক্রান্ত দুঃখবোধ তেমন জরুরি বিষয় না। আনবাড়িই বিষয় – মানে অন্য বাড়ি, অথবা যা নিজের বাড়ি না। আমি আর তানিয়া দুইজনেই বিদেশ থাকি আর প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীদের মধ্যে একরকম ঝুলন্ত ভাব থাকে। কোথাও ঠিক মতন মিশ খাওয়া যায় না। আমরা আসলে যেইখানে থাকি সেইখানে কখনোই পুরাপুরি থাকতে পারি না। এই বইয়ের চরিত্রেরাও আমাদের মতনই পরবাসী, তাই প্রাথমিকভাবে এই বইয়ের নামকরণের সার্থকতা এইখানেও খুঁইজা পাওয়া যাইতে পারে। তবে মূলত একটা বিচ্ছিন্নতাবোধের কথাই বলতে চাইছি এই গল্পে। হয়তো সবারই এইরকম লাগে কোন না কোন সময়ে, স্বদেশ বা বিদেশ ব্যপার না।

বইটায় আমার লেখা একটা অংশ দিলাম এইখানে। আশা করা যাইতেছে ‘শুদ্ধস্বর’ থেকে ২০১৪ এর বইমেলাতে প্রকাশিত হবে।

– লুনা রুশদী। মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া।

_____________________________________________

 

চোখ পর্যন্ত পৌঁছায় না তোমার হাসি…

আর কি যেন বলছিল? একটুখানি চোখ খুলেই বন্ধ করে ফেললাম। আমি তো ঘুমাচ্ছি। নাকি? স্বপ্ন, হ্যাঁ তাই হবে। বাকি কথাটা শোনা হলোনাতো। এরকমই আমি, অর্ধেক মানুষ। আজকাল একটা বইও পড়ে শেষ করি না…আধাআধি গল্পগুলো ঘুরপাক খায় মাথার ভেতর, মেঘের মতোন। নাকি গাভী? কি যেন কবিতাটা ছিল না? ‘কোথায় যেন বাজছে বেনু, মেঘের মতন চড়ছে ধেনু…’  ধুত্তোরি! এটা তো আমি বানালাম। ওইটা মনে হয় শক্তির কবিতা, কেমন দুঃখী দুঃখী, শান্ত কুয়াশা মোড়ানো… ‘যেখানে মেঘ…যেখানে মেঘ…’।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

এদের কি কোনদিন চিল্লাচিল্লি থামবে না? কি হয়েছে মানুষের আজকাল? প্রচন্ড শব্দে ফেটে না পড়লে বুঝি নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়া যায় না? যত জোরে তুমি চিৎকার করবে, ততটাই বেঁচে আছ! ল্যাপটপটা অন করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন অন্ধকার ঘরে মনিটরের নীল আলো  কেমন অতিপ্রাকৃত মনে হয়। এখানে সেখানে জমাট বাঁধা অন্ধকার। ওই কোনার দিকে বড় চারকোনা অন্ধকারটা আমার স্যুটকেস। ডালা খুলে পড়ে আছে দুইদিন ধরে। ভিতরে কাপড়-চোপড়, বই, চিরুণী, ক্যামেরা, ভাংতি পয়সা সব মিলেমিশে সরগরম অবস্থা। আমার কিছুই গোছাতে ইচ্ছা করে না, খালি ঘুমাই আমি, আর মাঝে মাঝে জাগি।

বাথরুমের ট্যাপটা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। শুনতে পাই। বাইরে কেউ একজন কন্ঠনালীর সীমার বাইরে গিয়ে চিৎকার করলো মনে হয়। কিম্ভুত এক শব্দে বাতাস ভারী হয়ে গেল – কে বলবে এই শব্দ মানুষের কন্ঠ নিঃসৃত? কেউ কোথাও কোন আলাপ করছে না, হাসছে না, এমনকি গানও শুনছে না। শুধু ওই প্রাচীন কোন প্রাণীর আর্তনাদের মতন চিৎকারের সাথে মিশে যাচ্ছে রাস্তায় গাড়ি চলাচলের হুশ হুশ শব্দ। শনিবার রাতে বেড়িয়েছে মানুষ। কেউ না কেউ সবসময়েই কোথাও না কোথাও যাচ্ছে।

অকল্যান্ডের রাতের রাস্তার ছবি

অকল্যান্ডের রাতের রাস্তার ছবি

আমরাও যেতাম অকল্যান্ডে – শুক্রবার আর শনিবারের রাতগুলো বিশেষ করে। আর কি আজব আজব কাজ যে করতাম! ‘পরিণীতা’ দেখতে গিয়েছিলাম কোন হলে যেন। আমি আর রাসেল নিজেরাই এত বকবক করতে করতে সিট খুঁজছিলাম যে সামনের সারির লাইনধরা মাথাগুলো যে জ্যন্ত মানুষের শরীরের সাথেই জোড়া দেয়া আছে, খেয়ালই করিনি। আমার ঠিক সামনেই কালো মাশরুমের মতন দেখতে কোঁকড়াচুলের এক লোকের মাথায় পপকর্নের প্যাকেট রেখে দিয়েছিলাম। মাথায় গরম লেগে লোকটা চোখ ছানাবড়া করে আমার দিকে যখন তাকাচ্ছিল, আমি হাসির চোটে আর কিছুতেই ‘সরি’ বলতে পারছিলাম না। এই সিনেমারই শেষের দিকে মারাত্মক সীন ছিল! পাশের বাড়ির নায়িকা সাইফ আলী খানকে বাড়িঘর সব দান খয়রাত করে চলে যাচ্ছে আর সেইদিনই আবার নায়কের বিয়ে হচ্ছে। ওদের দুই বাড়ির মাঝে ইটের দেয়াল উঠে গেছে ততদিনে। বিদ্যা বালানের বোন জামাই সঞ্জয় দত্ত নায়ককে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠিয়ে এনে বাড়ির দলিলের সাথে সাথে এতদিনের সঠিক ইতিহাস পেশ করল তার কাছে। তাইতেই নায়ক প্রবল বিক্রমে ফুঁসতে ফুঁসতে মাঝখানের ইঁটের দেয়ালের দিকে ছুটে গেল। আশেপাশে মুগুর না থাকায় টিউবওয়েল না কি একটা যেন কয়েক টান মেরে উপড়ে ফেললো আর সেইটাই গদার মতন ধরে সমানে বাড়ি দেয়া শুরু করলো ইটের দেয়ালে। [youtube id=”vZAcpP2bBrY” align=”center”]বিয়েবাড়ির দাওয়াতীরা সব ‘ভাঙ্গো শেখর, ভাঙ্গো শেখর’ বলে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। দোতলার বারান্দায় দাঁত কিড়মিড় করছেন নায়কের ভিলেন বাবা সব্যসাচী চক্রবর্তী আর দেয়ালের ওইপাশে সপরিবার নায়িকা বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। নায়ক দেয়াল ফুটা করার আগ পর্যন্ত এই অনন্ত গৃহত্যাগ। দর্শকরা সব উত্তেজিত, শোকে বিহ্বল। মাঝখানে আমি আর রাসেল হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। রাসেল বলছিল ‘হারামজাদা দেয়াল পরে ভাঙ্গিস, গেট দিয়া বাইর হ, গেলগা কিন্তু!’ আমার হেঁচকি উঠে যাচ্ছিল আর চোখে পানি।

বোটানী শপিং সেন্টার খুব প্রিয় ছিল আমাদের। গ্লেন ইডেন থেকে এক ঘন্টার ড্রাইভ। প্রায় প্রতি শনিবার সকালে যেতাম। সেই সুশির দোকানটার জানালার পাশের টেবিলটা কি আরামের ছিল। দোকানের নামটা কখনো খেয়ালই করিনি, সবসময় বলতাম ‘আমাদের সুশি-শপ’। দোকানের সবাই চিনতো আমাদের। মাঝেমাঝেই মিসো স্যুপটা ফ্রি পেয়ে যেতাম। কাঠের চারকোনা ভারী অথচ ছোট টেবিলের দুইপাশে মানানসই কাঠের চেয়ার। জানালার ওপাশে দোকানের বাইরে আরো কিছু চেয়ার টেবিল, ছড়ানো ছিটানো দোকান। রাসেল সবসময় নিতো ভাতের ওপরে স্যামন ভাজির সাথে টেরিয়াকি সস আর আমি টুনা-অ্যাভোকাডো রোল আর মিসো স্যুপ। ছোট্ট কাঠের টেবিলের দুইপাশে কত কাছাকাছি ছিলাম আমরা। আমি ওর দু-তিনদিনের না কামানো গালে হঠাৎ দুইএকটা সুক্ষ্ণ শাদা বিন্দু দেখতে দেখতে বলতাম – ‘আহারে জামাইটা বড় হয়ে গেছে, বিয়া দিতে হবে’। রাসেল পরম আপ্লুত মুখে বলতো ‘দিবি? দে না! ওই যে কমলা রঙের জামা পড়াটার সাথে’। তারপর আমরা কিছুক্ষন মেয়ে দেখতাম, ছেলে দেখতাম, অনেক কথা বলতাম অথবা কিছুই বলতাম না। মাঝে মাঝে বৃষ্টি ছিল আর মাঝে মাঝে রোদ। মাঝে মাঝে রাসেল সারাটা সময় পার করতো সেলফোনে গেইম খেলে। আমি তখন জানালায় দেখতাম হাসি-খুশি কিংবা বিষন্ন মানুষ, দেখতাম রঙ, কিংবা মেঘ আর বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ। কখনো ঝাঁঝাঁলো ওয়াসাবির সাথে মিশে যেত আসন্ন ঝড়ের গন্ধ আর মাঝে মাঝে রোদ ও ধুলার গন্ধ মিলেমিশে আরেকটু তাতিয়ে তুলতো চারপাশ।

প্রথম প্রথম অকল্যন্ড পৌঁছে ন্যান্সিবুড়ির গাব প্লেসের বাড়ির মেঝেতে বিছানা করে ঘুমাতাম আর মাঝরাতে পোকার কামড়ে ঘুম থেকে উঠে সারারাত কেটে যেত পোকা মারার চেষ্টায়। সিডনিতে ফেলে যাওয়া বন্ধুদের যাকেই জানাতাম এই বৃত্তান্ত সবাই প্রথমেই বলতো ‘তোদেরকে গাব পাইয়া গাব ধরাইয়া দিছে’। সেই বাড়ির রান্নাঘরের পিছনে ভাঙাচোরা দুই ধাপ কাঠের সিঁড়ি ছিল। কোন কোনদিন সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগে আমি সেই সিঁড়িতে বসে থাকতাম গালে হাত দিয়ে – একমাত্র সম্পত্তি আটশো ডলারে কেনা পুরানো লাল রঙের হোন্ডা সিভিক গাড়িটার আড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি দিতো কয়েকটা গাছের ডাল। ভাবতাম কেমন করে এলাম এখানে। এই শহর কি বিপুল বিদেশ যেখানে কোথাও আমার কোন ছাপ নেই!

মনে পড়তো সিডনির ব্ল্যাকটাউনে ফেলে আসা ডেভিট স্ট্রিটের সন্ধ্যাগুলো। মাঝে মাঝে বারান্দায় দাঁড়ালে সামনের উঁচু গাছটার গা থেকে কেমন ভেজাভেজা দারুচিনির মতন গন্ধ আসতো। গাছের নাম জানতামনা, তাই নাম দিয়েছিলাম দারুচিনি গাছ আর ওই বারান্দাটা আমার একান্ত দারুচিনি দ্বীপ। তার পাতার আড়ালে কয়েকশো পাখি লুকিয়ে থাকতো আর বিনা নোটিশে একসাথে উড়াল দিত সব্বাই, কি ভীষন তাদের ডাকাডাকি, উথাল পাথাল। কয়েক মূহুর্ত মাত্র, তারপরেই সেই রঙিন পাখিদের চাদরটা উড়তে উড়তে সূর্যাস্তের গোলাপি মেঘটুকুকে ভেদ করে একদম নেই হয়ে যেত। তবু গাছের পাতায় লেগে থাকতো কিছুক্ষণ আগের নিবিড়তার স্মৃতি স্বরূপ পালকের ওম, কখনো দুই একটা আস্ত পালক, বাতাস বহন করতো ওদের কিচিরমিচির ডাকাডাকির প্রতিধ্বনি।

গাছটার সামনেই একটুখানি বাগান পার হয়ে একটা ফুটপাথ, তার ওপাশে ছোট রাস্তা, তারপরে একটুখানি মাঠ এবং সমান্তরালে রেললাইন। খুব বিষন্ন একটা রাত মনে আছে। সবাই ঘুমাচ্ছিল, যেন সারা পৃথিবী। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম মেলবোর্নে ফেলে আসা আমার ঘরটার কথা, যে ঘরটায় দেয়ালজোড়া জানালা ছিল। আর জানালার বাইরেই আম্মার বাগান। গরমকালের দুপুরগুলোতে ঝাঁঝালো রোদ আর লেবুপাতার গন্ধ মিলেমিশে আমার জানালা দিয়ে ঢুকে পড়তো। বাগানে বাগানে দেখতাম রোদের স্বচ্ছ পর্দা গ্যারেজের পাশের বেড়া বেয়ে লতিয়ে ওঠা প্যাশন ফলের গাছ পার হয়ে যাচ্ছে দুলে দুলে। হোলি-ট্রির পাতা চিকমিক করতো। আর আমি তখন ঢাকার বাসার বারান্দায় আমার একলা দুপুরগুলোর কথা মনে করে মন খারাপ করতাম। এরকম অসংখ্য অতীত দুপুর ও সন্ধ্যার স্মৃতি ছুটে আসছিল সেই রাতের দিকে।  সামনের একমাত্র ল্যাম্পপোস্টটার আলোর আভা কুয়াশার সাথে মিলেমিশে বায়বীয় রাস্তা তৈরী করতে করতে অচেনা করে তুলছিল চারপাশ। গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ আসছিল কোত্থেকে যেন। বাতাসের চলাচল আর পাতায় পাতায় সিরসিরানির শব্দ ছাড়া কিছুই ছিলনা। ঠিক তখনই শেষ ট্রেন পার হলো ব্ল্যাকটাউন স্টেশান। বারান্দা থেকেই দেখলাম আলোজ্বলা ট্রেনের কামরাগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজন। কারো হাতে খবরের কাগজ, কারো বই, কেউ ঘুম আর কারো চোখ জানালায় । যেন মৃতদের শহর পার হয়ে গেল অপার্থিব আলোর বুদ্বুদ। অতদূর অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল ট্রেনের কামরার মানুষগুলো একে অপরের কত কাছের আর নিজেকে মনে হচ্ছিল যেন বাতাসে ভেসে বেড়ানো প্রাচীন দীর্ঘশ্বাস। ট্রেনটা চলে যাবার পরেও তার চলার শব্দের অনুরণন মিশেছিল কুয়াশায়।

তারও অনেক পরে ক্লান্ত চপ্পলের শব্দ তুলে ছেলেটা হেঁটে আসছিল। কাঁধে ব্যাকপ্যাক। মুখ নীচু। আমি বারান্দা থেকে ওকে দেখার আগেই ওর হেঁটে আসার শব্দ পেয়েছিলাম। যখন ল্যম্পপোস্টের আলোর আওতায় পা ফেললো, দেখলাম ঝাকড়া চুল নেচে উঠছে প্রতি পদক্ষেপের সাথে, বাতাসে এলোমেলো হচ্ছে। জিন্স ছিল পরনে, কি রঙ মনে নেই আর একটা লম্বাহাতা টার্টলনেকের উপরে হাফহাতা ডোরাকাটা টিশার্ট। দোতলার বারান্দা থেকে একদৃষ্টিতে দেখছিলাম ওকে আমি, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। ঠিক আমার বারান্দার সামনে এসে বাগানটার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো ছেলেটা। গন্ধরাজের গন্ধ পাচ্ছিল নাকি সেও? তারপর আচমকা মুখ তুলে তাকালো আমার দিকে – মুখভর্তি হাসি। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝলমল করছে চোখ। আমি হাসলাম। মাঝে মাঝে সারা জীবন হেঁটে হেঁটে একটা মূহুর্তেই আমরা পৌঁছাই। ভাবলাম ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি…’।

গাব প্লেসের ভাঙা সিঁড়িতে এইসব ভাবতে ভাবতে রাত হয়ে গেলে রাসেল এসে পাশে বসতো মাঝেমাঝে।

‘চল ড্রাইভে যাবি?’

ততক্ষনে আমাদের হোন্ডা সিভিক পার হয়ে উল্টোদিকের বাড়ির প্লাম গাছের ডালের ফাঁকে চাঁদ। মন খুশি হয়ে উঠতো। উঠে দাঁড়াতাম আর কোল থেকে নরম বিড়ালের মতন বিষন্নতা লাফিয়ে নেমে মিশে যেত অন্ধকারে। যেন ছিলই না কোনদিন! ঝলমল করতে করতে বলতাম –

‘ভ্লাদিরেও নিয়া যামু!’

ভ্লাদি মানে ভ্লাদিমির, দুইটা গোল চোখ আর লেজওয়ালা হিপোপটমাস চেহারার একটা কুশন। রাসেল কিনে দিয়েছিল সিডনিতে। আমি অনেক খুঁজে নাম বের করেছিলাম পুঠন, সেটা রাসেলের কাছে এসে ভ্লাদিমির পুটিন হয়েছিল। রাসেল আমাকে বিড়াল ডাকতো, নিজে ছিল ভাল্লুক। তো ভাল্লুক আর বিড়ালের ক্রস-ব্রিডে একটা তুলার হিপোটোমাসের জন্ম নেয়া খুবই সম্ভব। তাই আমাদের বিছানা বালিশের সাথে সাথে জড় হয়েও নিরব জীবন্ত একটা উপস্থিতি ধারণ করে সে থাকতো। সিডনি থেকে অকল্যান্ডেও ভ্লাদি সাথেই ছিল। সে যে শুধুই কুশন একটা, ভুলেই গেছিলাম আমরা, তাকে তাই পুষতাম। আচ্ছা ভ্লাদি এখন কই? নিয়ে এসেছি কি তাকে?

শেষ পর্যন্ত নামতেই হচ্ছে বিছানা থেকে। বিছানা বলতে পাতলা তোষক দেয়া একটা কাঠের ফিউটন। তার উপরে চাদর বিছিয়ে নিয়েছি।  কম্বলের ওম ছেড়ে বের হতে কেঁপে উঠছি,  যদিও  অক্টোবর মাস এখন। কাগজ কলমে বসন্ত শুরু হয়ে গেছে সেপ্টেম্বরের এক তারিখ থেকে। এমনকি রাস্তার গাছগুলোও সবুজ হয়ে উঠছে আবার, ফুল ফুটছে। ওয়েলিংটন শহরের এই ঘরে তবু থমকে রয়েছে শীতকাল।

ওয়েলিংটন শহরে ওয়াটার ফ্রণ্টের সামনে পাথরে খোদাই করা লেখা

ওয়েলিংটন শহরে ওয়াটার ফ্রণ্টের সামনে পাথরে খোদাই করা লেখা

নাকি আমিই তাকে বাক্সবন্দি করে নিয়ে এলাম অকল্যান্ড থেকে? মেঝেতে ওই ডালা খুলে পড়ে থাকা বাক্সটা তাহলে অন্ধকারের সাথে সাথে শীতও ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঘরটাকে এখনো আমার ঘর বলা যাচ্ছে না। সত্যি কথা হল দুইদিন আগে সেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হওয়া প্রায় সন্ধ্যায় এখানে এসে যখন ঢুকলাম, কেমন বিধ্বস্ত লাগছিল। এই বিছানাটা তখন সোফা আকারে ওইদিকের দেয়াল ঘেঁষে ছিল। সোফার ঠিক উপরেই কালো ফ্রেমের মধ্যে একটা ছবির প্রিন্ট। বনের মধ্যে ছোট ছেলে পড়ে গিয়ে কাঁদছে, মুখ নিচু, এলোমেলো চুলগুলোকে ঠিক চুল বলে চেনা যাচ্ছে না, গাছের পাতাও হতে পারে কিংবা কিছুর ছায়া, ছেলেটাও যে একটা ছেলেই সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতন কিছু নাই ছবিটাতে, তারপরও বোঝা যায় একটা নুয়ে পড়া ঘাড়ের হালছাড়া ভঙ্গি, মাটির উপরে পরে থাকা হাতের পাতার সমর্পনের ভাব। তার একাকিত্ব ঘিরে রয়েছে গাছের পর গাছ।

ঘরে ঢুকেই ছবিটা আমি যে ঠিক এমনি করেই দেখেছিলাম তা কিন্তু না। গত দুইদিনে ঘুম আর জেগে ওঠার ফাঁকে ফাঁকে ওই ছবিটার দিকেই চোখ চলে গেছে, যেহেতু ফিউটনটাকে বিছানা বানানোর পরে ওই ছবির দেয়ালের দিকেই পা রেখে শুয়েছি আমি। পাশেই দেয়াল জোড়া বেগুনী পর্দা, এখনো সরিয়ে দেখা হয়নি। আর আসবাব বলতে রয়েছে ছোট চারকোণা টেবিলের সাথে দুইটা চেয়ার, একটা কাপড় রাখার আলমারি আর একটা চেস্ট অফ ড্রয়ারস। এটা একটা ফার্নিশড স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট – এক ঘরের দুনিয়া। এর মধ্যেই বাথরুম, রান্নাঘর। আসবাব সব বাড়িওয়ালার, তাই ভাড়া একটু বেশি। এরকমই ভালো, আমার তো বিছানা থেকেই নামতে ইচ্ছা করে না, কিভাবে এতসব কিনতাম আমি না থাকতো যদি?

সদর দরজা খুলে মিটার খানেক দৈর্ঘ্যর একটা করিডোর মতন জায়গায় রান্নাঘর। একপাশে ছোট বার ফ্রিজ, উপরে সিংক, মাইক্রোওয়েভ। তার পাশে স্টোভ, ওভেন, একটা এক ড্রয়ারের ডিশ ওয়াশার আর উপরে দেয়ালে লাগানো ক্যাবিনেট। তার ভেতরে প্লেট, গ্লাস, কাপ, হাড়ি পাতিল, চামচ সব রাখা আছে। আমার মতন ঘটি-বাটি সম্বলটুকুও না থাকনেওয়ালাদের জন্য বেশ আদর্শ ব্যবস্থা। রান্নাঘরের এক মিটারের পরে আরেকটা দরজা, সেখান থেকেই অফিসিয়ালি ঘরের শুরু। একপাশে রান্নাঘরের সমান্তরালে বাথরুম।

আমার ডালা খোলা স্যুটকেসটা পড়ে আছে বাথরুমের সামনেই ফুটখানেক জায়গা পার হয়ে, উল্টে দেয়া কচ্ছপের মতন অসহায়। ওর পেট থেকে ইন্সট্যান্ট নুডলসের প্যাকেট বের করার জন্য খুলেছিলাম গতকাল। খুঁজতে খুঁজতে কিছু কাপড় ছিটানো হয়েছে কার্পেটে। আছে ছোট বড় আট দশটা ব্যাগ ভর্তি বই, ডিভিডি আরো সব হাবিজাবি। দশ বছরের সংসার জীবনের কবরের উপরে গজিয়ে ওঠা ঘাসের মতন এইসব আমার হাতে উঠে এসেছে। হিন্দু হলে আরেকটা জবরদস্ত উপমা দিতে পারতাম এখানে – সংসার জীবনের মৃতদেহ ছাই হয়ে যাওয়ার পর বিসর্জনের অস্থির মতন এদের সাথে নিয়ে এসে কার্পেটে ঢেলে দিয়েছি আমি। বাথরুমের জানালা দিয়ে ওপাশের ফ্ল্যাটগুলোর আলো ঢুকছে, সেই আলো দরজা পার হয়ে ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে অনেকখানি ফুরিয়ে ফেলছে নিজেকে। এই আধমরা কাঁপা আলোয় ছড়ানো ছিটানো ব্যাগগুলোকে দেখলে মনে হয় ভূতের মিটিং।

ছোট্ট এক লাফে স্যুটকেস পার হয়ে গিয়ে বাথরুমের বেসিনের ট্যাপটা বন্ধ করলাম। রাত বোধ হয় অনেক হয়েছে। ওদের পার্টি শেষ। এখনো পড়ে থাকা কয়েকজনের দুই একটা ছুড়ে দেয়া কথার টুকরা যেন কফিন থেকে উঠে আসছে। বাতাসের শব্দ। শুনতে পাই সামনের শান বাঁধানো সার্বজনীন উঠানে একটা খালি কাঁচের বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে এপাশ থেকে ওপাশ। গাড়ি চলাচল কমে এসেছে। বাইরের সিঁড়িতে ক্লান্ত পা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ, যেন কোনদিন আর বাড়ি ফেরা হবে না তার। বেসিনের সামনের আয়নায় বাইরের আলোয় আমার মুখটা আবছা, ধোঁয়া ধোঁয়া। লাইট জ্বালবো? থাক এরকমই ভালো।  বেশ খিদা লেগে গেছে। দুপুরে একটা নুডলস খেয়েছিলাম। এছাড়া আর কিছু নাই। অথচ এখন এই নুডলস বানানোর ঝামেলাটুকুও করতে ইচ্ছা হচ্ছে না। কয়েকটা বিস্কিট থাকলেও হতো, কিংবা বাদাম…বা চকলেট। উফ চকলেট!

মনে আছে তখন ন্যান্সিবুড়ির গাব প্লেসের বাসা ছেড়ে আমরা উঠে গিয়েছিলাম কে-রোডের উপরে বুড়িরই আরেক বাড়িতে, একদম অকল্যান্ড শহরের মাঝখানে । এই বাড়ির অবস্থা আগের বাড়ির চাইতেও কাহিল। কয়েকশো বছরের পুরানো দালানের বেসমেন্ট একটু রঙ করে ভাড়া দিয়েছিল বুড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হতো কবরে নামছি। দিনের বেলাতেও ফ্লুরোসেন্টের আলো জ্বালিয়ে না রাখলে কিছু দেখার উপায় ছিল না। বুড়ির ছিল নানা রকমের ব্যবসা। বাড়ি ভাড়া দেয়া, গাড়ি চালানো শেখানো, ওকালতি। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটা একটা পাবলিক লন্ড্রি আর অন্য আরেকটা প্রায় একই রকম অ্যাপার্টমেন্টের মাঝখানে। লন্ড্রিটাও বুড়িই চালাতো। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যেত আমাদের দেয়ালের লাগোয়া লন্ড্রির অফিস ঘর থেকে ভেসে আসা রেডিওর শব্দে। আর সারারাত ঘুমাতে দিত না পাশের ফ্ল্যাটের ছেলেটা। সে রোজ একটাই গান বাজাতো বিকট জোরে আর তারপরেই শুনতাম কাগজ ছেড়ার শব্দ। এখানেই শেষ না। লন্ড্রির পাশের অ্যাডাল্ট শপ সারারাত খোলা থাকতো। এমনিতেও কে-রোড নাকি এক সময়ে রেড-লাইট অঞ্চল হিসাবে বিখ্যাত ছিল। পরবর্তীতে অনেক রকম দোকানপাট হয়েছে, তবুও আগে খ্যাতির কিছু কিছু এখনো ধারণ করে আছে।

বাড়ির পেছন দিকে সেই কোন জনমে সবুজ রঙ করা ভাঙা কাঠের দরজা খুললেই সিঁড়ি কয়েক ধাপ। সিঁড়ি পার হয়ে এবড়ো-থেবড়ো আর জঞ্জালে ভরা উঠানের এককোনে আমাদের লাল হোণ্ডা সিভিকটার জায়গা হয়েছিল। উঠানের উল্টোপাশে গির্জা। ঊনিশ শতকের তৈরী বিশাল কাঠের দালান। সামনের প্রশস্ত টানা বারান্দায় বেশ কিছু বেঞ্চ পাতা। দিনের বেলায় লোকের ভীড় থাকতো, রাতের বেলা একদম শুনশান। কত নির্ঘুম মাঝরাতে আমার একাকী মন কেমন করার সাক্ষী হয়ে রয়েছে বেঞ্চগুলো!

কোনো কোনো সন্ধ্যায় আমি আর রাসেল ড্রাইভে যেতাম গির্জা আর আমাদের বাড়ির মাঝখানের ধূলা ভর্তি, টায়ারের দাগ ওয়ালা অসমান পথটুকু পার করে। গলি থেকে বেরিয়েই কে-রোড। পুরো নাম কারাঙ্গাহাপে, মাওরি শব্দ, আল্লাহ জানে মানে কি।

কারাঙ্গাহাপে রোড, ইন ১৯০৯

কারাঙ্গাহাপে রোড, ইন ১৯০৯

অদ্যাক্ষরটাই পরিচিত বেশি, উচ্চারণ সহজ। প্রথম দিন রাস্তা খুঁজতে গিয়ে এই নামের কারণেই সমস্যায় পড়েছিলাম আমরা। বুড়ি বলেছিল কে-রোড, অথচ ম্যাপের বইয়ের কোথাও আর খুঁজে পাই না। আবার রোড বললো না স্ট্রিট বললো সেই নিয়ে দুশ্চিন্তা, এই দোকান সেই দোকান, রাস্তাঘাটের মানুষজনকে প্রশ্ন করতে করতে নাস্তানাবুদ অবস্থা। নিজেদের যে কি রকম ‘বাইরের লোক বাইরের লোক’ লেগেছিল সেইদিন, যেন কারো বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে বিনা আমন্ত্রনে ঢুকে পড়েছি। রাসেল তখন নতুন রাস্তায় গাড়ি চালাতো আর বারেবারে পথ হারাতো। আক্ষেপ করে বলতো ‘এই দেশের রাস্তা তো মনে হয় জীবনেও চিনমু না রে’। অথচ সিডনিতে এমন কোন রাস্তা অথবা কানা-খোড়া-চিপা গলি ছিল না যা সে চিনতো না। ওর বন্ধুরা ঠাট্টা করে ডাকতো ‘চিপা-রাসেল’।

এ-হেন চির অচেনা যে কে-রোড, তাও কয়েক মাস পরে কত আপন হয়ে উঠেছিল। আমাদের গলির মুখে, বাঁ পাশে ডিক-স্মিথ ইলেকট্রনিকস এর দেয়াল ঘেঁষে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে থাকতো চল্লিশোর্ধ এক মহিলা। কোঁকড়া চুলে মুখের একপাশ ঢাকা। তাকে পার হয়ে যেত একের পর এক দ্রুতগামি গাড়ির হেডলাইট। আলোগুলো ঢেউয়ের মতন বয়ে যেত তার শরীর ছাড়িয়ে। রাস্তার আলোটা মাথার উপর জ্বলতে থাকতো। আমাদের দেখলে পরিচিতের হাসি হাসতো সে, ম্লান-আধিভৌতিক। রাসেল বলেছিল মহিলা খদ্দেরের আশায় দাঁড়ায় সেখানে। আমার বিশ্বাস হতো না। তার মুখটা কেমন ঘরোয়া, স্নেহময়ী, সাজগোজেরও বালাই ছিল না তেমন।

হাতের ডান পাশে ছিল বাস-স্টপ, রাস্তার দুইপাশেই টানা বারান্দার মতন চলে গেছে অনেক খানি, উপরে ছাউনি দেয়া। বাসস্টপ পেরিয়ে বেশ কিছু কাপড়ের দোকান, খাবারের দোকান, ব্যংক। ছিল ওয়ালিয়া সুপারেট। সুপারেট শব্দটা অকল্যান্ডেই প্রথম শুনেছিলাম, এর অর্থ সুপারমার্কেটের বাচ্চা। মেলবোর্নে এরকম দোকানগুলোকে বলে মিল্কবার, সিডনিতে ডেলি। পারিবারিক ব্যাবসা হয় সাধারণত। পরে জেনেছিলাম অকল্যান্ডে বেশির ভাগ সুপারেটেরই মালিক ভারতীয়। অনেক রকম রসিকতাও চালু আছে এ নিয়ে। ওয়ালিয়াতে প্রায়ই যেতাম রুটি, দুধ, ডিম অথবা রাসেলের সিগারেট ইত্যাদি টুকিটাকির জন্য। দোকানি মহিলার সাথে বেশ খাতির হয়েছিল। পাঞ্জাবি স্বামীর কিউই বউ। একটু মোটা-সোটা গোলগাল চেহারার। কথা বলতে ভালবাসতো। দোকানটা চব্বিশ ঘন্টা খোলা থাকতো। মহিলা তার স্বামীর নামে নালিশ দিত। স্বামী নাকি তাকে ঘুমাতে দিত না, দিনরাত দোকান পাহারায় রাখতো। দোকানের পেছনে পর্দার আড়ালে একটা সিঙ্গেল খাট দেখিয়েছিল আমাকে একবার। মাঝে মাঝে খুব ঘুম পেলে ওইটাই তার ঘুমের জায়গা। সোনিয়া নামের তিন বছর বয়সী খুব ফুটফুটে একটা মেয়ে ছিল ওদের, খুব মিশুক আর হাসিখুশি। মাঝে মাঝে দেখতাম দোকানের ছোট টিভিতে কারিনা কাপুর আর হৃতিক রোশানের নাচের সাথে সাথে সোনিয়া নাচছে কাউন্টারের উপরে দাঁড়িয়ে… ‘তেরে বিন জিউ নাইউ লাগতা…লে যা লে যা দিল লে যা সোরিয়ে…’ । হঠাৎ দুই একটা আছাড় খেয়েও হাসিতে কুটিপাটি হতে হতে দুই হাতের উপর ভর করে উঠে দাঁড়াতো। ওর মা হাততালি দিত তালে তালে।

স্ট্রিপ ক্লাবের হোর্ডিং

স্ট্রিপ ক্লাবের হোর্ডিং

ওয়ালিয়ার একদম মুখোমুখি রাস্তার ওই পাশে ছিল একটা স্ট্রিপ ক্লাব। তার উপরে বিশাল হোর্ডিং এ আধশোয়া হয়ে শুয়ে নগ্ন উদ্ভিন্ন যৌবনার পূর্ণায়ত স্কেচ। দিনের বেলায় সাদামাটা। অথচ এক রাতের বেলা তার অন্যরূপও আমি দেখেছিলাম। কোন শুক্রবারের রাত ছিল সেটা, রাতের অকল্যান্ড তাই অন্য দিনের চেয়েও বেশি জীবন্ত। রাসেলের সাথে খুব ঝগড়া হয়েছিল, ও রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল মাঝরাতে। আর আমিও ওর পেছন পেছন ঘুমের কাপড়েই বেরিয়েছিলাম। আমাদের মাটির তলার ঘরে বাতাস পৌঁছাতো বাসি হয়ে, তাই বাইরে যে কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে টেরও পাইনি। ভেজা গন্ধে ভরা ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটায় কেমন হতভম্ব হয়ে হাঁটছিলাম। গভীর রাতে কফিন থেকে বের হলে ড্রাকুলারও কি এমন লাগতো? কে জানে!

স্ট্রিপ-ক্লাবের ভেতর থেকে চটুল বাজনা উথলে পড়ছিল সামনের ফুটপাথে। ড্রামের শব্দ হৃদপিণ্ডে ধাক্কা মেরে যাচ্ছিল। কয়েক দোকান পরেই একটা নিশুতি রাতের রেস্তোরাঁয় জ্যাজ বাজছিল। আর আমি দেখছিলাম ক্লাবের হোর্ডিং এর সেই লাস্যময়ীকে। তার শরীর জুড়ে কত রকম আলোর খেলা! কখনো লাল-নীল, কখনো পানির মতন অবিরল সাঁতার কাটতে কাটতে অঙ্কিত দেহটাকে করে তুলছিল রহস্যময়, জীবন্ত। স্তনবৃন্তের প্রান্তে এসে তীব্র লাল আলো মুহূর্তের জন্য ঝিকিয়ে উঠেই অসংখ্যা ফুলঝুড়ির বিচ্ছুরণে আরক্ত করে তুলছিল তার শরীর। ঠিক তখনই পাশের আফগান কাবাবের দোকানের সামনে ঝোলানো উইন্ড-চাইমটা বাজছিল টুং-টাং। সে রাতে সবকিছু মিলেমিশে কয়েক পলকের জন্য তৈরী হয়েছিল এক সমান্তরাল জগত। কে-রোডের সেই স্ট্রিপ-ক্লাবের সামনেই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, আবার ছিলামও না।

তাই সেই দয়ালু ট্যাক্সিওয়ালা যখন আমার কাঁধে টোকা দিয়েছে, আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম। সে এতরাতে আমাকে ওইভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়েছিল। তারমধ্যে রাসেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়েছিলাম, চোখে তখনো পানি লেগে ছিল, চুল এলোমেলো, গায়ে ফ্লানেলের স্লিপিং স্যুট, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। ছেলেটা ভারতীয়। মায়া হয়েছিল তার। বলেছিল ভাড়া ছাড়াই আমার গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। আমি তখনও ঘোরের ভেতর ছিলাম, বলেছিলাম ‘আমি যেখানে যেতে চাই, কেউ কোনোদিন সেখানে আমায় পৌঁছে দিতে পারবে না…’। তার অবাক চোখ উপেক্ষা করে ঘরে ফিরে গিয়েছিলাম। ওই রকম নাটকীয় ভাবে কেন বলেছিলাম সেইদিন?  কিছুক্ষণ পরেই রাসেল ফিরেছিল হাঁফাতে হাঁফাতে। তাকে নাকি এক ট্র্যান্সভেসটাইট তাড়া করেছিল ‘বিজনেস বিজনেস’ বলে। হাসতে হাসতেই ঝগড়া মিটে গেছিল আমাদের।

যে  চকলেটের কারণে কে-রোড মনে পড়লো এখনো সেই কথাই বলা হলো না কিছু। ততদিন বেশ কয়েক মাস পার হয়ে গেছে মাটির নিচে। একটা সেকন্ডহ্যান্ড ডাবল খাট কেনা হয়েছে, সেই খাটের কারণে ঘরের দরজা সম্পূর্ণ খোলা যেত না।  আমাদের ঠিক ওপরতলাতেও নতুন ভাড়াটে এসেছে। মাঝে মাঝে রাত বারোটা-একটার দিকে ওরা গোসল করতো আর সেই গোসলের পানি সিলিং চুইয়ে ফোটায় ফোটায় আমাদের কপালে পড়তো। কাঁচা ঘুম ভেঙে উঠে বসে টের পেতাম দুই হাত দূরে রান্নার অঞ্চলে সিংকের নিচে ইঁদুরের চলাফেরা। সেই অন্ধকারের ভেতর আমি কাঁদতে শুরু করলে রাসেলও উঠে বসতো। আলো জ্বালতে জ্বালতে চোখমুখ যথাসম্ভব চিন্তিত করে তুলতে তুলতে জানতে চাইতো ‘কিরে পাতিলমুখী কান্দিস ক্যান?’

ওর সেই সম্বোধনে একটু একটু হাসি পেলেও আমি কান্না অব্যহত রাখতাম, বলতাম ‘আমি এইখানে থাকমু না!’

সে চোখ মুখ একসাথে গোল করে ফেলতে ফেলতে খুবই অবাক স্বরে বলতে থাকতো ‘আরে কি বলিস! দ্যাখ গোসল করার জন্যে নামতেও হইতেছে না খাট থিকা, ইন্দুররা পায়েস রানতেছে মাঝরাতে উইঠা, এইরকম বাড়ি তুই কই পাবি? চল ইন্দুরগুলারে নুডলস খাইতে দেই…’

তারপরে সত্যি সত্যিই টু মিনিট নুডলস এর প্যাকেট খুলে ইঁদুরদের ডাকতো ‘আসো আব্বু, আসো আসো আসো…’। আর আমাকে বিভিন্ন রকম গল্প শোনাতো ইঁদুর পরিবার ভিত্তিক। এত কিছুর পরেও আমার কান্না না থামলে বলতো ‘চল ফুডটাউন নিয়া যাই, চকলেট কিনে দিব’। সেই আশ্বাসে শান্ত হয়ে ভ্লাদিমিরকেও রেডি করতাম আর রাসেল মন ভালো করার বুদ্ধি দিতে থাকতো  ‘বুঝলিরে হুডুল-ডুডুল, দোকানে যাবি, যারে দেখবি তার সামনেই গম্ভীর মুখে দাঁড়াইয়া যাবি, তারপরে বলবি – আমার নাম হাঁড়িচাচা, আমি একটি ছড়া বলবো…’।  দোকানে গিয়ে প্রচন্ড দৌড়াদৌড়ি করতাম আমরা। নাইটশিফটে যে ছেলেমেয়েরা কাজ করতো, ওরা চিনে ফেলেছিল আমাদের। মাঝে মাঝেই ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে বলতো ‘আবার তোমরা আসছো!’ কিন্তু আমাদের দেখে ওরা খুশিই হতো বুঝতাম। মাঝে মাঝেই দুই একটা চকলেট ফ্রি দিয়ে দিতো আমাদের কাণ্ডকারখানার প্রতিদানে।

আরো কিছুদিন পরে একদিন কে-রোড দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। ততদিনে আমার বেশ ভালো একটা চাকরি হয়ে গেছে ব্যাংকে। বাড়ির খুব কাছে। হেঁটেই যাওয়া-আসা করতাম। রাসেলের তখনো চাকরি হয় নি। সে সন্ধ্যাবেলা অড জব করতো এক আসবাবপত্রের দোকানের গুদামঘরে। বিশাল ভারি ভারি সব টিভি, টেবিল ইত্যাদি নামাতে ওঠাতে হতো। বাড়ি ফিরতো রাত বারোটার পর, প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে। এসেই এলিয়ে পড়তো বিছানায়, জুতা-মোজা খোলার শক্তিটুকুও থাকতো না আর। আমি গরম টাওয়েলে তার হাত-পা মোছাতে মোছাতে বা ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে ধমক দিতাম। এই কাজ করার কী দরকার? সে ঘুম জড়ানো গলায় আবছা হাসি টেনে বলতো ‘ইহ! বউয়ের কামাই খামু নাকি? তাও আবার বিলাই বউ?’  তো কাজের এই দুই রকম সময়ের কারণেই প্রায় কথাই হতো না তেমন আমাদের ছুটির দিন ছাড়া। দিনের বেলাটা ওর কি করে কাটতো তাও জানতাম না। সেইদিন ফেরার পথে ওয়ালিয়ায় ঢুকলাম রাতের রান্নার জন্য কিছু কিনতে। ওয়ালিয়ার মহিলা কাছে ডেকে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলো হাতে। দেখলাম এক রিয়েল-এস্টেট কোম্পানির বিজ্ঞাপনের পত্রিকা, তিন-চার পাতার। প্রথম পাতাতেই কে-রোডের বাসস্টপের ছবি, তার উল্টোপাশে নির্মানাধীন একটা নতুন দালান যা ওই কোম্পানী বানাচ্ছে। বাস-স্টপের ফুটপাথ কয়েকজন হেঁটে যাচ্ছে। প্রথমে বুঝলামই না এটা আমাকে কেন দেখাচ্ছে। ভাবলাম কে-রোডের ছবি বলে হয়তো দেখাচ্ছে। বললাম ‘বাহ, সুন্দর এসেছে’। ও তখন পথচারীদের একজনকে দেখালো ‘এইটা তোমার বরের ছবি না?’ আরে তাইতো! রাসেল আপন মনে হেঁটে হেঁটে কই যেন যাচ্ছে। পারিপার্শ্বিক, লোকজনের সাথে কি দিব্যি মানিয়ে গেছে, আলাদা করে চিনতেই পারি নি। কখনোই ছবিটা দেখে বোঝা যায়নি মাত্র কয়েক মাস আগেই কি রকম আপন-হীন ছিল এই শহর, রাস্তা। হয়তো এমন করেই একেকটা শহরে আমাদের ছাপ থেকে যায় আর শহরটাও মিশতে থাকে আমাদের অস্তিত্বে।

শীত করছে খুব। কম্বলের তলায় ঢুকলাম  আবার।  ভ্লাদিকেও পাওয়া গেল না। চকলেটও না। ঘুম পাচ্ছে। পাশের বাসায় কে যেন আছে মনে হয় । এত রাতে কাকে এমন বকাঝকা করছে? ফোনে? কথাগুলো কিছু বোঝা যাচ্ছে না, শুধু মাঝে মাঝে স্বরটা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। কাঁদছে কি মেয়েটা?

কম্বলের পায়ের কাছটা ভারি লাগছে না? আচমকা মনে হয়েছিল বিল ক্লিনটন বোধহয়…আমার বিড়াল।

বিড়াল

বিড়াল

ব্রেকফাস্ট-অ্যাট-টিফেনিজ সিনেমার হোলি-গো-লাইটলির নকল করে প্রথমে তার নাম রেখেছিলাম বিলাই। ছোট করে বিল। রাসেল বলল শুধু বিল হয়ে আমাদের বিড়ালের পোষাবে না, তাই ক্লিনটন জুড়ে গেছিল নামের সাথে। অকল্যান্ডে আমার গায়ের উপর ঘুমাতো সবসময়। এখানে তো সে নেই। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছি সেই ডেকের কাছের ক্যাবেজ-ট্রির তলায় বসে একদৃষ্টে চেয়ে আছে গাড়ির দিকে। রাসেল অ্যাক্সিলেরেটর চাপলো। সাইড –ভিউ আয়নায় দূরে সরতে সরতে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বিল…

 

The following two tabs change content below.

লুনা রুশদী

কবি, গল্পকার, অনুবাদক। জন্ম, করোটিয়ায়; ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত ঢাকাতে, তারপর অস্ট্রেলিয়ায়। পড়াশোনা অস্ট্রেলিয়ায়, বেশ কয়েক বছর নিউজিল্যন্ডে থাকার পর বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকেন। প্রকাশিত বই – ব্রোকেন রিপাবলিক (২০১৩, শুদ্ধস্বর), অরুন্ধতী রায়ের বইয়ের অনুবাদ।

Latest posts by লুনা রুশদী (see all)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য