Main menu

ক্রাইমের পানিশমেন্ট ও দস্তয়ভস্কি

ক্রাইম কি আর পানিশমেন্ট কেন? ব্যক্তির ক্রাইম করার অধিকার আছে কিনা। তাইলে পানিশমেন্টের এজাজতও কেন ক্রিমিনালের কোর্টে রাখা হয় না?

এইসব প্রশ্নগুলারে জবাব খুঁজলে একটা জায়গায় এনার্কিস্ট ছাড়া প্রায় সবাই একমত হবার কথা, সোশাল কন্টাক্ট থিওরী। যে, মানুশের বৃহত্তর কল্যাণে রাষ্ট্র বানাইছি আমরা। যেহেতু সবাই শাসক হওয়াতে লস ছাড়া লাভবিশেষ পাইতেছি না। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে মানুশরে নিয়ন্ত্রণ আর শোষণের কাজকাম নাই তা না, বাট শাসনের দরবার করলে তো শোষণ মিলবেই! তো, নিজেরারে সুখে রাখতে শাসিত হওয়াতে মত দিলাম আমরা, কিছু ব্যাপাররে ক্রাইম নাম দিয়া পানিশমেন্ট দেবার অধিকার দিলাম আমরা শাসন করার এক কিসিমের অথরিটিরে। রুশদেশের দস্তয়ভস্কি যাতে ঠ্যাং দিয়া নিজের নভেলের কাহিনী বানায়, ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। যদিও কাহিনীটা সবটুকু না, তবুও কইলাম আরকি! কথার কথা, ক্যারেক্টারের পিছেই নিজের সব পর্যবেক্ষণ ঢালছেন উনি, বা কায়দা কইরা বলা যাইতে পারে পুরানা সমাজে ফিকশনাল এক্সপেরিমেন্ট কইরা নয়া রিয়ালিটির আমদানি..!

রাসকলিনভের নজরে যদি পুরা ক্রাইম দেখি তাইলে পানিশমেন্টে স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু পিটার্সবার্গের মহাজনের দিক দিয়া তাকাইলে জাস্টিস কতটুকু কায়েম হইলো? একজন হৃদয়বিদারক মহিলা, সোসাইটি’ই হয়তো তারে ওইরকম বানাইছে, নিজের লাভ নিজে ভালো বুঝতেন বইলা দস্তয়ভস্কির হিরো তারে লাঠি দিয়া মাইরা ফেললেন..! সাক্ষী হবার অপরাধে খুন করলেন ‘অমানবিক’ মহাজনের বোনরে..! অথচ অথরিটি তেনারে সাজা দিলেন কি, সাইবেরিয়ায় সশ্রম কারাদণ্ড! বহু প্রমাণ হাতে রাইখাও ক্রিমিনালের স্বীকারোক্তির অজুহাতে, চোখা নজরে দেখলে দেখবেন, দস্তয়ভস্কি ক্যাপিটাল পানিশমেন্টরে উতরাইয়া যাইতে চাইতেছেন..! মজার ব্যাপার হইলো, পাঠকের তাতে ঝামেলা হইতেছে না, মব সেখানে জাস্টিস হিসাবে জেলান্তর হইয়া সশ্রম কারাদণ্ডে সন্তুষ্টই আছেন। ক্রিশ্চিয়ানিটির দোহাই দিয়া দস্তয়ভস্কি এইখানে রাইটারের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেন, মৃত্যুদণ্ড থেইকা পাঠকের দৃষ্টি সরায়া নিলেন।

পরার্থপরতা ও গ্রেটার গুডের যে য়ুরোসেন্ট্রিক সমসাময়িক ডমিন্যান্ট ফিলোসফি, দস্তয়ভস্কির ড্রামার হাত তারেও ডীল করলো ক্রিমিনাল সাইকোলজি দিয়া। জর্ডান পিটারসন যেমন ক’ন, তলস্টয় পড়বা সোশিয়লজিস্ট হিসাবে, আর দস্তয়ভস্কিতে সাইকোলজি ঠাসা। রাসকলিনভ ওই বুড়ি প’নব্রোকাররে হত্যা করে কিন্তু উপযোগবাদিতার দোহাই দিয়া, যে, ওই টেকাটুকা তো উনার লোভ ছাড়া কোন কাজে লাগতেছে না, সো, আমি যদি ওইগুলার মালিক হই ঠিকমতো পড়া শেষ কইরা দেশের সেবা করা যাবে, প্রেমিকার আর বেশ্যালয়ে যাবার দরকার র’বে না, বুড়ির বইনরেও মানবিক লাইফ লীড করানো যাবে..। “For one life, thousands of lives saved from decay and corruption.” তো, দস্তয়ভস্কি আমরারে দেখান, দশজনরে বাঁচায়া একজনরে মারাটাও ক্যামনে অনৈতিক। যেইটারে পরে আমরা ‘প্যারেটো এফিসিয়েন্স’ টার্মে চিনবো আমরা, খোদ ওয়েস্টার্ন ফিলোসফিতেই! অবশ্য ব্যাপারটারে সোসাইটি থেইকা এলাইনেশন হবার একটা কারণ হিসাবেও দেখা যাইতে পারে, যে, গ্রেটার গুডের ডিসিশন নিতে আপনেরে তো অথরিটি হতে হয়, না?, এবং সেই ‘সুপারম্যান’গিরিতে প্রোটাগনিস্টের কপালে সেই পুরানা, গ্রিকযুগের, প্রাইড’ই ভর করে। যেই প্রাইড সর্বনাশ করে ট্রাজিক হিরোর। কিন্তু দস্তয়ভস্কি এইখানে নয়া কিছুর সাজেশান দিতেছেন, প্রাইডে মরা লাগতেছে না নায়কের, যীশুর দরবারে ধর্না দিলেই হইতেছে..! মানে, ক্রিশ্চিয়ানিটির দাওয়াত দিতেছেন দস্তয়ভস্কি, যেন মানুশের ক্রুয়েলিটিরে কাউন্টার দেবার মতোন দুনিয়ায় জিনিস আছে ওই একটাই..। সোনিয়া হলেন রাসকলিনভের মেরী ম্যাগডিলেন, যে নয়া যীশুর পুরানা ট্রান্সফরমেশনের সাক্ষী হইতে চলতেছেন। যেই রূপান্তরের ভিত্তি হইলো, সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য।” যেইটা ইসলামেরও গোড়ার কথা, যে, বহু সাহাবীর ‘পাহাড়ের,থেইকা বড়ো অপরাধ ও পাপ’ এর থেইকা নিষ্কৃতি মিলতেছিল।

বহুত সিনেমা হইছে এইটারে বেইজ কইরা। ছাড়া ছাড়া কাহিনীর এক ফিল্ম দেখলাম ১৯৩৫ সালের। যেইখানে ডিরেক্টর দস্তয়ভস্কির হইয়া ‘রিমান্ড’প্রথার ক্রিটিক করতেছেন। যে, ডান্ডা কি আসলেই জানে ক্রিমিনাল কে..! পরে, ক্রিমিনালের স্বীকারোক্তি মিললেও তা যে মাইরের চোটে, এবং তা দিয়া অথরিটির জালেমি দেখান তিনি।

Crime and Punishment is a 1935 film directed by Josef von Sternberg for Columbia Pictures. The screenplay was adapted by Joseph Anthony and S.K. Lauren from Fyodor Dostoevsky’s novel of the same title. The film stars Peter Lorre in the lead role of Raskolnikov.

মুভির আলাপ যখন পাড়ছি তাইলে ফিকশন আর ড্রামার সেই পুরানা ক্যাচাল না পাড়লেই নয়। কারণ দস্তয়ভস্কির নভেলরে কতটুকু মুভিতে হান্দানো গেল, আই ডাউট..! মানে, প্রাগৈতিহাসিক সেই লেঙ্গুয়েজ ভার্সেস ইমেজের খেলা। মিডিয়াম হিসাবে সিনেমায় দস্তয়ভস্কির লেঙ্গুয়েজ যতটুকু ইমেজের রূপ পাইছে তা যথেষ্ট কিনা। আসলে, সিনেমার তৈয়ার হওয়ানি হইতেছে ড্রামা থেইকা, এরিস্টটলের পোয়েটিকস আলগা হলেও যারে লিটেরারি রূপ দিছে। স্ট্রাকচার বানায়া দিছে তিনটা, দ্য সেটাপ, দ্য কনফ্রন্টেশান, দ্য রেজুলেশন। কলোকিয়াল বয়ানে যাদের ডাকা যায় বিগিনিং, মিডল এবং এন্ডিং বইলা। থিয়েটারের মতো সিনেমাও এই ফরম্যাটে নিজের কাম সারার চেষ্টা করে। কিন্তু ওই রুশ ঔপন্যাসিক তো লেখছেন ফিকশন, কমার্শিয়াল ফিকশন না, বরং লিটেরারি ফিকশন। মানে, রাসকলিনভের পরিণতি না সবটুকু কল্পনা ঢালা হইছে তেনার চরিত্র নির্মাণে, ক্রিমিনালের সাইকোলজি কিভাবে কাজ করতেছে আরকি। মানে, ক্যারেকটার লইয়া ডীল করছেন দস্তয়ভস্কি, বাট সিনেমা তো থ্রি এক্ট স্ট্রাকচারের গল্প লইয়াই আছেন।

 

রুশ নভেল নিয়া ব্রেন্ডন গ্লিসন। আইরিশ সিনেমা দ্য গার্ড থেইকা নেয়া স্ক্রিনশট।

 

সবশেষে, সুদের বয়ান দিয়া শেষ করি। সুদ এমন একধরনের প্রথা যা বহু পুরান পাপে পাপী! ইংরাজি Pawnbroker মানে বন্ধক রাখা থেইকা মহাজন পর্যন্ত..। বাঙলার মানুশ কি বুইঝা যে সুদের মতো পেশায় জড়িতদের মহান জন ভাবতো, তা এক আশ্চর্যের বিষয়! হইতে পারে চড়া সুদের বিস্ময়কর অর্জনে আশ্চর্যিত বাঙালির ওই নামকরণ দিয়া কিছু মুগ্ধতা রাইখা যাওয়া। কাজী নজরুল বিদ্রোহ করতেছেন,

জনগণে যারা জোঁকসম শুষে তারে মহাজন কয়
সন্তানসম পালে যারা জমি তারা জমিদার নয়!

তো, নভেলের সেটিংয়েও বন্ধকি সিস্টেম বা সুদপ্রথার অযৌক্তিকতা দেখা যায় না, বরং দস্তয়ভস্কি দেখান, ওই ‘অমানুশ’রা না থাকলে মজলুম জনেরা জুলুমের শিকার হইতে বন্ধক’ই বা কি রাখতেন, দরকারি লোন’ই বা কোত্থেইকা মিলাইতেন..! ওইটা আসলে সুদ নিয়া তৎকালীন খ্রিস্টসমাজের অবস্থান। চতুর্দশ শতাব্দীর ইউরোপ প্লেগ থেইকা সুদের ব্যাপারে তার চিরাচরিত বৈরী অবস্থান পাল্টায়, রাষ্ট্র এবং গির্জা উভয়েই সুদের ভিত্তিতে কর্জে অসুবিধার কিছু তো দেখেই না বরং নিজেরা ঋণ নেয়া শুরু করে..! পরে জন ক্যালভিন তো বইলাই বসেন যে, ধনার্জনের বিষয়টা তো খোদ খোদার এখতিয়ারে..!

The following two tabs change content below.

জোবাইরুল হাসান আরিফ

চাঁটগাইয়া। রাইটার। কবি। ক্রিটিক।

Latest posts by জোবাইরুল হাসান আরিফ (see all)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য