Main menu

ফিকশন: কলঙ্কিত তীর্থ – জগদীশ গুপ্ত

এই গল্পটা তিনটা সময়ে তিনভাবে ছাপা হইছিল। ১৯৬০ সালে জগদীশ গুপ্ত মারা যাওয়ার (১৯৫৭) পরে ‘কলঙ্কিত তীর্থ’ নামে একটা নভেলার ‘প্রথম ঘটনা’ হিসাবে। এর আগে ১৯৫৯ সালে “জগদীশচন্দ্র গুপ্তের স্ব-নির্বাচিত গল্প” বইয়ে ‘কলঙ্কিত সম্পর্ক’ নামে; আর তারও আগে ১৯৩০ সালে ‘শ্রীমতি’ গল্পের বইয়ে ‘আহুতি’ নামে। তো, এইখানে লাস্ট ভার্সনটাই রাখা হইছে। যদিও নভেলার পার্ট, কিন্তু আলাদা গল্প হিসাবে পড়তে কোন সমস্যা হওয়ার কথা না।

গল্পের কাহিনিটা ইন্টারেস্টিং। রেইপ মামলায় দুইবছর জেল খাটা জামাই বাড়িতে ফিরতেছে, তখন একজন মেয়ে তার বউ হিসাবে ঘটনাটা কেমনে ডিল করতেছে – তার কথা। তো, ১৯২৫/৩০ সালের দিকেও রেইপ হইতো, মামলা করা যাইতো, আর মামলার শাস্তি হিসাবে জেলও যে হইতো এই ‘রিয়ালিটি’ বাংলা-সাহিত্যে রেয়ার হইলেও যে ছিল বা আছে, সেইটার একটা মেনশন হিসাবে এই গল্পটা পড়া যাইতে পারে।

অবভিয়াসলি, গল্পটা এইটুকই না; মানে, আর্টের সোশ্যাল রিলিভেন্সটুকই আর্ট না আর কি…

/ই. হা.

 

…………………….

কলঙ্কিত তীর্থ

প্রথম ঘটনা 

দীর্ঘ দেড় বৎসর পরে কাল সকালে সাতকড়ি বাড়ী ফিরিবে।

চারটি ভাইয়ের সাতকড়ি দ্বিতীয়; দু’টি বিদেশে থাকে, তবু বাড়ীতে লোকের ভীড়; ভিড়ের মধ্যে সাতকড়ির স্ত্রীও বর্তমান। এত লোকের কে একজন যেন নিঃশব্দে দিন গুনিতেছিল। হঠাৎ সে প্রচার করিয়া দিল কাল সাতু বাড়ী আসিবে।

সাতকড়ির স্ত্রী মাখনবালাও দিন গুনিতে সুরু করিয়াছিল, কিন্তু অন্য ভাবে, স্বামীকে পুনরায় চোখে দেখার দিনটি সে দুরু দুরু বুকে ভয়ে ভয়ে গুনিতেছিল।

গুনিতে গুনিতে অবশ হইয়া একদিন সে ভুলিয়া গিয়াছিল; সুরুর সূত্রটা মনে ছিল… আর গণনার শেষ দিনটা সম্মুখে দাঁড়াইয়া তাহার বুক কাঁপাইতেছিল; কিন্তু একটি একটি করিয়া মাঝখানকার অসংখ্য দিন তার অসাড়ে উত্তীর্ণ হইয়া গেছে।

আর সে চেষ্টা করে নাই, কিন্তু ভয়টা ছিলই…

স্বামীর প্রত্যাবর্তনের দিনটি এত নিকটবর্তী শুনিয়া সে চমকিয়া উঠিল। মাঝখানে ছোট একটা রাত্রি। সুর্য ঐ অস্তে যায়। এই সূর্য কাল আবার উঠিবে… তখন স্বামী আসিবেন।

জীবনের দিন গুলিকে এত সংক্ষিপ্ত মাখনের কোনদিন মনে হয় নাই। সাতকড়ি যে দিন যায় সে দিনের তখন কেবল প্রভাত..আজ এই সন্ধ্যা –

মাখনের মনে হইল, মাঝখানে কেবল একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস সে ত্যাগ করিয়াছে, নিঃশ্বাসটা শেষ করিয়া ফেলা হয় নাই; বুক যেন নিঃশ্বাসের ভারে দুর্বহ হইয়া আছে।…ইহার মধ্যেই দেড় বৎসর কাটিয়া গেল।

বাড়ীতে আরো ঢের লোক আছে; সবাই সাতুর আপন। কেউ ভাই, কেউ বোন, কেউ মা, কেউ ভাজ, কেউ আর কিছু।

কিন্তু এতগুলি পরমাত্মীয় থাকিতে মাখনের মনে হইয়াছে, সমগ্র ব্যাপারটার সঙ্গে তারারই লিপ্ততা যেন সকলের চেয়ে বেশী—সেই বেশী করিয়া জড়ানো।… সে স্ত্রী, বাহির হইতে আহরিতা সামগ্রী।

বাহির হইতে আসিয়া সে স্বামীর কোন্ ক্ষেত্রটা অধিকার করিয়া বসিয়াছে, তাহা | কেহ অনুমান করিতে কখনো বোধ হয় মন খুলিয়া বসে নাই, তবু একটা স্থানে তার আধিপত্যের পরাকাষ্ঠা লোকে যেন তাহার কাছে প্রতাশা করিয়াছে।

একটি স্থানে সে সর্বস্ব সর্বগ্রাসী, সতত জাগ্রত। সে তাহার দাবি পূর্ণতম, একটি অনুপরিমাণ প্রাপ্যের মায়া ত্যাগ না করিয়া অশেষ শক্তিশালিনী দশভুজা, দশ হস্তে কাডিয়া টানিয়া ছিনাইয়া আদায় করিয়া লইবে—ইহা যেন মানুষের যেমন সহজ তেমনি অকুণ্ঠ ব্যাপার।

কিন্তু সেই ক্ষমতা সে দেখাইতে পারে নাই…

সংসারের প্রত্যেকটি লোকের কাছে এই অক্ষমতার লজ্জার তার মুখ হেঁট হয়ে গেছে।…

বিবাহের পর শাশুড়ী কতবার আভাসে ইশারায় জানাইয়াছেন যে, ছেলের বন্ধন সে-ই, জীবনের শৃঙ্খলা সে-ই, সৌষ্ঠব, শ্রী, সুখ, সৌন্দর্য একমাত্র তারই হাতে।

সবারই সেই মত।

বাড়ীর বাহিরের লোকেরও সেই ইঙ্গিত, সেই ইচ্ছা, সেই জ্ঞান।

মাকে ডিঙ্গাইয়া অগ্রজ অনুজকে অতিক্রম করিয়া সে-ই সব। একই লােকের জন্য এই সর্বোচ্চ অগ্রগণ্য স্থানটি অকপটে ছাড়িয়া দিয়া নিশ্চিন্ত হইতে কাহারো বাধে নাই কেহ ইতস্ততঃ সন্দেহ করে নাই, শাশুড়ী যেন পরিত্রাণ পাইয়াছিলেন তার…অস্তিত্বই যেন অপরাজেয় অপরিহার্য শাসন-বাণী…তাহাকে লঙঘন করিবার উপায় নাই।

কিন্তু আজ সে পরাস্ত।

শাসনদণ্ড ধূলায় লুটাইতেছে; সে আজ এত তুচ্ছ অকর্মণ্য গুরুত্বহীন যে তার থাকা। না থাকার সমান মূল্য। দুনিয়ার লোকে বলিতেছে কি ভাবিতেছে সে জানে না; কিন্তু স্বামীর জীবন হইতে নিজেকে বিচ্যুত করিয়া লইয়া সেত’ সরিয়া স্বতন্ত্র হইয়া দাঁড়াইতে পারিতেছেনা… তাহার পৃথিবী অতিশয় ক্ষুদ্র…স্বামীর সত্তার বাহিরে যে জীবন্ত পৃথিবী রহিয়াছে, তাহার সঙ্গে সংযোগ তার স্বামীকেই বৃন্ত করিয়া, স্বামীকেই বৃন্তরূপে পাইয়া সে চারিদিকের হাওয়ার মাঝে ফুটিয়া আছে…তাহার পরিচয়ই ঐ।

একদিন হঠাৎ কি হইয়া গেল। পৃথিবী তার পথ ছাড়িয়া উল্টাইয়া পড়িল। যেখানে যে বস্তুটি সুবিন্যস্ত ছিল বলিয়াই সে সুখে ছিল, একটিবার চক্ষের পালক না পড়িতেই তাহা মিলিয়া মিশিয়া বিকৃত একাকার হইয়া তার সেই পৃথিবী ছন্নছাড়া মৃতের শশ্মান হইয়া গেল।

স্বামী জেলে গেলেন।

যে কুঞ্জ মক্ষিকার গীতিগুঞ্জরণে মুখর ছিল, প্রচণ্ড ধাক্কায় তাহা এলাইয়া পড়িল; যে আকাশ আলোর মালা, মেঘের ঢেউ, বায়ুর কাঁপন দিয়া সাজান ছিল, তাহা ছিটকাইয়া অন্ধকারে অদৃশ্য হইয়া গেল; ভাবনার দলগুচ্ছ আর মনের তৃষ্ণা দিয়া তৈরি যে নীড় অনন্য ছিল, তাহার চিহ্নও রহিল না। মন্দিরের নিত্য অর্চনোৎসব বন্ধ হইয়া গেল। ফুলের বুকের মধুরস তিক্ত হইয়া উঠিল।

যে পথে সে আলো দেখিত, যে পথে সে গান শুনিত, যে পথে সুধা ঝরিত, চক্ষের নিমেষে সমস্ত পথ রুদ্ধ হইয়া জগতের সঙ্গে তার আর সম্পর্ক রহিল না।

কিন্তু তাহার এই চরম দুর্গতির অংশ লইতে কেহ বুক বাড়াইয়া আসিল না।।

তাহার মনে হইতে লাগিল, একটা ছিছি রব তাহাদেরই গৃহকেন্দ্র হইতে উথিত হইয়া ছড়াইতে ছড়াইতে যেখানে যতদূরে মানুষ বাস করে, প্রাসাদে কুটীরে, পথে পাথারে, পৃথিবী যেখানে সত্য সত্যই আকাশ স্পর্শ করিয়াছে, সেই শেষতম প্রান্তরেখা পর্যন্ত সেই শব্দ পরিব্যাপ্ত হইয়া গেছে। জীবজগৎ শিহরিয়া কাণে আঙ্গুল দিয়া বসিয়া আছে।

এই দুর্বিসহ লজ্জা অখণ্ড একখানা গুরুভার মেঘের মত কেবল তাহারই বুক জুড়িয়া অক্ষয় হইয়া রহিল –

‘আমিও তোমার সঙ্গে আছি’ বলিয়া ভার বণ্টন করিয়া লইতে কেহ আসিল না।

 

স্বামীর অপরাধ গুরুতর, এত যে, তার চিন্তাই সহ্য হয় না। মানুষ কোনদিন তাহা সহ্য করিতে পারে নাই। সন্তানের জননী হইয়া স্বামীর স্ত্রী হইয়া কুলের বধূ হইয়া, নারী তাহা ক্ষমা করে নাই; ভগবানের নাম বুকে আছে, পশু হইয়া জন্ম গ্রহণ করি নাই জ্ঞান যার আছে, সে তাহা ক্ষমা করে নাই।

স্বামী এমনি অচিন্তনীয় অপরাধ করিয়া জেলে গিয়াছিলেন—মুক্তি পাইয়া কাল ফিরিয়া আসিবেন। গৃহের আর সবাই তাহার জন্য উৎকণ্ঠিত, ভৃত্যটি পর্যন্ত। বিমর্ষ থাকিয়া থাকিয়া তাহারা শ্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। সেই শ্রান্তির মাঝে যেন তাহাদের লজ্জাবোধের সমাধি হইয়াছে তাহাদের পরমাত্মীয়টি এতদিন গৃহে নাই।

মাখনের তা মনে আছে, যেমন তার মনে আছে সে আছে, বাইরের ক্ষুধা আছে, স্পর্শ আছে, দৃষ্টি আছে।। কিন্তু না থাকিলেই ভাল হইত।

…মাখন বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল, রাত্রি তখন গভীর। আকাশের দিকে মুখ তুলিয়া একবার ভগবানকে সে ডাকিল… | এতবড় আকাশের যেখানে যে জ্যোতির্বিটি ছিল, মেঘের গাঢ় প্রলেপে তাহা একেবারে চিহ্নহীন হইয়া মুছিয়া গিয়াছে। থই থই অন্তহীন কালোর পাথারে পৃথিবী ডুবিয়া গিয়াছে, তার শ্বাস বহিতেছে না…।

মাখনের ভয় করিতে লাগিল—

কালোর অতলগর্ভে অবতরণ করিয়া কাহারা যেন মন্থনে রত হইয়াছে—তাদের হারানো রত্ন খুঁজিতেছে। তাদের হাতের শব্দ নাই, পায়ের শব্দ নাই, মুখে শব্দ নাই। তাদের নির্মম দণ্ড প্রহারে আবর্ত-কেন্দ্র হইতে ঢেউ ছুটিতেছে…আগে ধোঁয়া, তারপর ফেনমুখী হলাহল উদগারিত হইতেছে। সেই হলাহলের পাত্র হাতে লইয়া কে যেন অগ্রসর হইতে লাগিল।

কালের মাঝেই কালো মূর্তিটি স্পষ্ট; যেমন নিঃশব্দ তেমনি দৃঢ়।।

ঐ হলাহল তাহাকে পান করিতেই হইবে। নিস্তার নাই। কতদূর হইতে কালোর কালো স্তর-গুণ্ঠন ঠেলিয়া ঠেলিয়া মূর্তি অগ্রসর হইতেছে আসার তার বিরাম নাই…অনন্ত কাল ধরিয়া সে যেন আসিবেই; পথের তার শেষ নাই –

কবে পৌছিয়া সে পাত্রটি তার হাতে দিবে!

 

বড়জা গোলাপ প্রথমে উঠিয়াছিল –

সে উঠানে আসিয়াই চীৎকার করিয়া উঠিল, এবং সে চীৎকারে ঘুম ভাঙ্গিয়াশ বাহিরে আসিয়া সবাই দেখিল, মাখন মুচ্ছিত হইয়া উঠানে পড়িয়া আছে। শাশুড়ী ছুটিয়া যাইয়া বধুর মাথা কোলে লইয়া বসিলেন। আজ ছেলে আসিবে যে!

গোলাপ আধ মিনিটে তিন বালতি জল তুলিয়া ফেলিল, নিতু মাখনের মত দিয়া ডাকিতে লাগিল; – কাকীমা কাকীমা! সতীশ মুখ বাড়াইয়াই ফিরিয়া গেল।

গোলাপ নিতুকে সরাইয়া দিয়া মাখনের মাথায় জল ঢালিতে লাগিল বিরাজ পাখা করিতে লাগিলেন…এবং অল্পক্ষণ পরেই মাখন চোখ খুলিয়া উঠিয়া বসিয়া মনে করিয়ে পারিল না যে, যে দৃশ্যটি মনে পড়িতেছে, সেই দৃশ্যটি সে স্বপ্নে দেখিয়াছিল, কি সত্য ঘটিয়াছিল।

বিরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন—বৌমা কেমন আছে?

কিন্তু বৌমা কিছু বলিবার পূর্বেই সাতকড়ির দাদা সতীশ নামিয়া আসিল।

বিরাজ বলিলেন,—কোথায় যাচ্ছিস?

সাতুকে আনতে যাচ্ছি মা!

— যা।

সতীশ জিজ্ঞাসা করিল,

—বৌমা উঠানে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন কি করে?

– তাইত ওকে শুদোচ্ছি। তুই ভাবিসনে ভালোই আছে।

অর্থাৎ ছেলেকে আনিতে যাইবার পথে বৌমার জন্য উৎকণ্ঠায় কাল বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই।

—যাই। বলিয়া সতীশ বাহির হইয়া গেল।

 

ধরিয়া আনিবার দরকার সাতুর নিজের ছিল কি না কে জানে;

কিন্তু একা একা অনিমন্ত্রিতের মত গৃহে প্রবেশ করিতে সাতু সঙ্কোচ বোধ করিতে পারে—

তাহারই নিবারণ কল্পে বিরাজ ও তার বড় ছেলে একটু চেষ্টা করিলেন। সতীশ ভাইকে আগ-বাড়াইয়া আনিতে গেল। বিরাজ ও বড় বউ তখন মাখনকে লইয়া পড়িলেন।

—অসুখ করেছে?

মাখন নির্জীবের মত বসিয়াছিল; বলিল—না।

—তবে? ভয় পেয়েছিলে?

— না।

—তবে

 

মাখন বলিল,—রাত্রে ঘুম হল না, বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম! কখন কেমন করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছি জানিনে।

বলিয়া মাখন উডিল।

নিতু মাখনের কাপড় ধরিয়া আহাদে লাফাইতে লাগিল।।

 

অনেক বেলায় সতীশ ফিরিল, কিন্তু একা! ছোট বৌকে চলিতে ফিরিতে দেখিয়া বিরাজ সে দিকে নির্বিঘ্ন হইয়া পুত্রের আগমন প্রতীক্ষায় দুয়ারে দাঁড়াইয়াছিলেন—

সতীশকে একা ফিরিতে দেখিয়া তিনি চেঁচাইয়া উঠিলেন,—সাতু কই?

সতীশ ধীরে ধীরে তার পাশে আসিয়া দাঁড়াইল; বলিল,—সে এলো না।

— এলো না? কোথায় গেল?

—চলো ভেতরে বলছি।

ভিতরে আসিয়া বিরাজ পুনরায় প্রশ্ন করিলেন, – তাকে আনতে পারলিনে কেন ? কোথায় গেল সে?

—কি জানি কোথায় গেল? জেলের বাইরে এসে সে বললে, একটু দাঁড়াও, আমি আসছি। বলে সে কি কাজে গেল জানিনে; দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার—

—খুঁজলিনে কেন?

—ঢের খুঁজেছি মা, হাট বাজার হোটেল, ইষ্টিশন, এদিক সেদিক সব জায়গায় খুঁজেছি।

সতীশ ঘরে ঢুকিয়া গেল।

বিরাজ একটি নিঃশ্বাস ফেলিল, মাখনও একটি নিঃশ্বাস ফেলিল, কিন্তু একেবারে উল্টো কারণে; বিরাজের নিঃশ্বাসে ছিল কান্না, মাখনের নিঃশ্বাসে ছিল তাহারই বিরামের একটু স্বস্তি।

কিন্তু মাখনের প্রাণ পুড়িতেছিল—

চোখের সম্মুখে মায়ের এই ব্যাকুলতা হঠাৎ যেন তার সকল যন্ত্রণার বড় হইয়া উঠিল। ছেলেকে গর্ভে ধারণ করিয়াছেন তিনি, তার মূল্য তার প্রাপ্য, কিন্তু সে মূল্যটিকেই অপমানিত করিয়া যে সন্তান এমন কলঙ্কের ছাপ, জাত অজাত উৰ্দ্ধ অধো পূর্বউত্তর যাবতীয় পুরুষের নামের উপর দাগিয়া দিতে পারে, তাহার জন্য জননীর এই কোমলতা আর ব্যাকুলতা যেন মাখনের সংজ্ঞায় ঘা দিল। হঠাৎ সে বলিয়া উঠিল, মা, এস; দাঁড়িয়ে থেকে কষ্ট করে লাভ কি! অন্ধকার না হলে তিনি আসবেন না। আর, না এলেই বা এমন কি ক্ষতি?

শুনিয়া বিরাজ যেন ছাঁকা খাইয়া চমকিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইলেন; দেখিলেন, ছোট বৌ রান্না ঘরের চৌকাঠ ধরিয়া দাঁড়াইয়া আছে; মুখ খানা যেন সকল ভাবের অভাবে রুক্ষ, বড় বৌ কাপড় ধরিয়া টানিয়া তাহাকে বোধ হয় বারণ করিতেছিল; শাশুড়ীকে ফিরিতে দেখিয়াই সে কাপড় ছাড়িয়া দিল।

বিরাজ ধমকাইয়া উঠিলেন,—সে কি কথা, বৌমা, সে করেছে কি! বেটাছেলে অমন কাজ ঢের করে। ছেলের অকল্যাণের কথা তুমি মুখে আনছ আমার সামনে দাঁড়িয়ে! এত সাহস তোমার!

 

মাখন শাশুড়ীর রোষ ভ্রক্ষেপও করিল না, বলিল, – তা কল্যাণের কিছ কি বাকি আছে মা? তাঁর ফেরারী হওয়াটাই কি সকলের চেয়ে বড় অকল্যাণ?

কিন্তু বিরাজ তা বুঝিলেন না –

দেড় বৎসরের প্রথম কয়েকটি দিন সন্তানের কৃতকর্মের লজ্জায় ম্রিয়মান থাকিয়া, তাঁর মাত-হৃদয়ে বিচ্ছেদ বেদনাই দিন দিন দুঃসহ হইয়া উঠিয়াছে।

মাখনের কথাগুলি সেই বেদনার স্থানেই আঘাত করিল; আরো তাতিয়া উঠিয়া বলিলেন, – শোনো বৌমা, দেড় বছর পরে সে আসছে; সে এসে যদি তোমার আচরণে বিরক্ত হয়, তবে তোমার ভাল হবে না। লাঞ্ছনা তোমার অদৃষ্টে ঘটবে। মিষ্টি মুখে কথা বলবে; তোমার মান অভিমান আর বাঁকা কথা এখন তোলা থাক…

মাখন শাশুড়ীর মুখের দিকে নিষ্পলক চক্ষে চাহিয়া রহিল। বিরাজ বলিতে লাগিলেন, তুমি যেমন আছ তেমনি থাক; আমরা তোমার গুরুজন, আমাদের সামনে…

কিন্তু মাখন পিছন ফিরিল।

দেখিয়া বিরাজ যাহা বলিতেছিলেন, তাহা পাল্টাইয়া শেষ কথাটাই সতেজে বলিয়া দিলেন—যাও, কিন্তু সাবধান।

একটু নিঃশব্দ হইতেই সতীশ গলা বাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিল,—কি, মা?

—যাই বলছি! বলিয়া বিরাজ দুঃখের আর ক্ষোভের কথা বড় ছেলের কাণে ঢালিতে উঠিয়া গেলেন—

কিন্তু সুখ পাইলেন না। এই ঘাঁটা ঘাঁটিতে সতীশের লজ্জা করিতে লাগিল; বলিল, বড় বৌকে বলো, সেই বুঝিয়ে বলবে। বলিয়া সে মুখ নামাইল।

মায়ের তাড়নায় অতিষ্ঠ হইয়া সতীশ ভাইকে আর একবার খুঁজিয়া আসিল, কিন্তু গম্য অগম্য ইতর ভদ্র কোন স্থানেই নিরুদ্দিষ্টের সাক্ষাৎ মিলিল না, সন্ধানও মিলিল না।

বিরাজ মুহুর্মুহুঃ ঘর বাহির করিতে লাগিলেন। তার মুখের শব্দ বন্ধ হইয়া রহিল; মুখে তার ভাত উঠিল না।

কিন্তু ফলিল মাখনের কথাই!

নিতু বলিতেছিল,—কাকা কখন আসবে কোথায় গিয়েছে কাকা?

বিরাজ বলিলেন,—তা জানিনে।

—এতদিন কোথায় ছিল?

বিরাজ মুখ ফিরাইয়া রহিলেন কথা কহিলেন না।

নিতু বলিতে লাগিল, কাকা অনেকদিন বাড়ীতে আসেনি, নয় ঠাকুমা? কেন আসেনি? কোথায় ছিল এতদিন? আমাদের জন্যে খেলনা আনবে?|

পৌত্রের কৌতূহলের নিবৃত্তি করিবার দিকে ঠাকুমার কিছুমাত্র উৎসাহ দেখা গেল না; পরন্তু প্রশ্নগুলিতে যে মিনতি ছিল, আগ্রহ ছিল, নিজের প্রাণের সঙ্গে আন্তঃস্রোতে তার মিল থাকিলেও তার অজ্ঞাতেই একবার তারা তাঁহার চোখের পাতা ভারি করিয়া তুলিল—

..মনে পড়িল না যে সবই বিসদৃশ, কিন্তু আনমনা হইয়া রহিলেন।

বিরাজ আনমনাই ছিলেন-

হঠাৎ চমকিয়া দেখিলেন, আপাদ মস্তক কাপড়ে ঢাকা একটি লোক তার সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছে। চিনিতে তাহাকে বিলম্ব হইল না।

—সাতু?

সাতু গায়ের মাথার আচ্ছাদন খুলিয়া মাকে প্রণাম করিল।

এবং পরক্ষণেই হৈচৈ বাধিয়া গেল। নিতু চিৎকার করিতে লাগিল, -বাবা, কাকা এসেছে; মা, কাকা এসেছে; কাকীমা, কাকা এসেছে, বলিয়া কাকার মুখের দিকে মুখ তুলিয়া তাহার হাত ধরিয়া নাচিতে লাগিল।

—আয়। বলিয়া বিরাজ অগ্রসর হইয়া গেলেন। তাঁহার পিছন পিছন সাতু বাড়ীর ভিতর ঢুকিয়া দেখিল, তার স্ত্রী বাদে আর সবাই একত্র হইয়া সোৎসুকে দাঁড়াইয়া আছেন। …

দাদাকে সে প্রণাম করিল, বৌদিকে প্রণাম করিল…দাদার ছোট ছেলেটাকে সে দেখিয়া যায় নাই। – ‘এটা আবার কবে হ’ল’? জিজ্ঞাসা করিয়া তাহাকে কোলে তুলিয়া সাতু চুম্বন করিল।

দাদার বিশেষ কিছু বলিবার ছিল না। ‘আমায় দাঁড় করিয়ে রেখে কোথায় পালিয়েছিলি’? এই প্রশ্নটি অল্প সময়ের মধ্যে অনেকবার তার মনে আসিয়াছিল, কিন্তু কেন পলাইয়াছিলি তাহা বুঝিতে পারিয়া মাকে সন্তুষ্ট করিতেও চক্ষু-লজ্জায় প্রশ্নটি না করিয়াই সে সরিয়া গেল! বৌদিরও হেসেল ছিল; তিনি সেখানেই গেলেন।

বিরাজ ছেলের গায়ে হাতে বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন—বড় রোগা হয়ে গেছিস।

সাতু নিজের গায়ের দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিল, – বড় কষ্ট দিয়েছে, মা; পেট ভরে খেতে দিত না।

শুনিয়া মায়ের চোখে জল আসিল। বলিলেন,“আজ সারাদিন কি খেয়েছিস?

সাতু মিথ্যা কথা বলিল, কিছুই খাইনি, মা।

—কিছুই খাসনি। আহা হা হা…বলিয়া বিরাজ আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন।

…এবং “ছোট বৌমা,রান্না হল?” বলিয়া উত্তরের জন্য এক মুহূর্ত সবুর না করিয়া নিজেই রান্নার তদারক করিতে রান্না ঘরের দুয়ারে যাইয়া দাঁড়াইলেন।

রান্না হইল কি না তাহা দেখিবার পূর্বেই তিনি দেখিতে পাইলেন, ছোট বৌ ব্যাধিকাতর দুর্বল ব্যক্তির মত জড় সড় হইয়া এক কোণে দেওয়ালের সঙ্গে গা ঠাসিয়া বসিয়া আছে।

বলিলেন—বড় বৌমা, রান্না হল?

সাতু সারাদিন কিছু খায়নি।

বড়বৌ বলিল,—এই হলো, মা। সে খুব ব্যগ্র হইয়া উঠিল।

বিরাজ অবেলায় রান্না ঘরের আমিষ মাটি মাড়াইতেন না, কিন্তু এখন বড় তাগিদ ছিল; ছোট বৌয়ের দিকে আর একটু আগাইয়া গেলেন। গলা খুব খাটো করিয়া বলিলেন, তুমি অমন করে বসে আছ যে?

মাখন কথা কহিল না, তার মাথা মাটির দিকে আরো খানিকটা ঝুঁকিয়া পড়িল। বিরাজ বলিতে লাগিলেন, — ছেলের শরীরের দিকে চেয়ে আমার মন ভাল নেই, বৌমা, এমন সময় তুমি আমায় জ্বালিও না বলছি। ওঠো।

মাখন বলিল,—উঠে কি করবো?

করবে আবার কি! নেচে বেড়াতে তোমায় কেউ বলছে না। ছেলের সামনে মুখ অমন বিষ করে থাকতে পাবে না।।

বলিয়া মহারাগত ভাবে মাথায় মস্ত একটা ঝাঁকি দিয়া তিনি প্রস্থান করিলেন। সাতু ইত্যবসরে তার দেড় বৎসর পরিত্যক্ত গড়গড়াটা বাহির করিয়া লইয়াছে।

কেবল তার প্রিয় তরকারীগুলি প্রস্তুত করিতে বৌদুটিকে হুকুম করিয়াই বিরাজ নিশ্চিত হন নাই—সাতুর শ্রান্তিহারী তামাক-টিকেও আনাইয়া চাকরটিকে সে দিনের মত ছডি দিয়াছিলেন।

সাতু তামাক সাজিয়া টানিতে বসিল—

নিতু তার পায়ের ফাঁকে বসিয়া প্রশ্ন করিল;—কোথায় ছিলে কাকা এতদিন? বালকের ঐ একই প্রশ্ন —

কিন্তু এবারেও তার আশা মিটিল না; সাতু একটা মিথ্যা উত্তর গড়িয়া না তুলিতেই বিরাজ আসিয়া পড়িলেন, বলিলেন—তোর সে কথায় কাজ কিরে লক্ষ্মীছাড়া? পালা এখান থেকে।

বলিয়া নিতুর সোহাগসুখ ভাঙ্গিয়া দিয়া তাহাকে ধমকাইয়া তুলিয়া দিলেন।

সাতু চির দিনই সপ্রতিভ—

নিতুর প্রশ্নে এবং ভৎসনা দিয়া মায়ের এই আবৃত করিবার চেষ্টায় তার মনে ঘুণাক্ষরেও একটু বিকার উপস্থিত হইল না; বলিল,—আহা, বসুক না। বলিয়া সে নিতুকে হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া বসাইল, কিন্তু নিতুর তখন আর খবর জানিবার উৎসাহ নাই।—

 

পুরুষদের খাওয়া দাওয়া হইয়া গেছে। মাখন নাম মাত্র দুগ্রাস ভাত মুখে তুলিয়াই উঠিয়া পড়িল। গোলাপ সেদিকে একবার বিষন্ন চক্ষে চাহিয়া দেখিল; কিছু বলিল না। বহুযোজন দুরে ঝড় উঠিলে না কি সমুদ্রের নির্বাত তটেও তার ঢেউ আসিয়া লাগে।

মাখনের মনের কথা গোলাপের অজানা নাই.মাখনের বুকের বেদনা যেন নিঃশ্বাস বায়ু চালিত হইয়া তার বুকে বাজিতেছিল…তবু সে বলিয়া দিল—ভাই, আমার মাথা খাস।

বড় বৌ ছলছল চক্ষে তাহার চিবুক স্পর্শ করিয়া চুম্বন করিল।

—ছোট বৌমার খাওয়া হ’ল? বলিয়া বিরাজ আসিয়া দাঁড়াইলেন…

তাহার অকারণেই মনে হইতেছিল, ছোট বৌ যেন ইচ্ছা করিয়াই বিলম্ব করিতেছে।

বড় বৌ বলিল,—হয়েছে।

ছোট বৌয়ের দিকে চাহিয়া বিরাজ বলিলেন,—হেসেল বড় বৌমা সারবে’খন; তুমি যাও, শোওগে।…বলিতে বলিতে তার নজরে পড়িয়া গেল, ছেলের খাওয়া থালা।’

থালাখানা তাঁহার সাক্ষাতে তুলিয়া আনা হইয়াছিল; কিন্তু তিনি সাক্ষাতের উপর ছিলেন না বলিয়াই বোধ হয় সেই উচ্ছিষ্ট ভোজনপাত্রে বৌ ভাত লয় নাই…দেখিয়া বধূর প্রতি নিদারুণ অপ্রবৃত্তি জন্মিয়া তাহার যে কেমন ঠেকিতে লাগিল তাহা বলা যায় না।…কিন্তু সে কথা তিনি মোটেই তুলিলেন না; কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন – কথা বলছ না যে?

কি কথা তিনি বধূর মুখে শুনিতে চান তাহা তিনিই ভাল করিয়া জানেন না…কোথায় একটু ধিক্কার যেন ছিল, তাহাকে নির্বিষ করিতে তিনি তার আকাঙ্ক্ষার সায় খুঁজিয়া মরিতেছিলেন…বধূর মুখের কথায় যদি তাই একটু পান; কিন্তু মুস্কিল এই যে, গলা চড়াইবার উপায় নাই।

আরো খানিক অপেক্ষা করিয়া বিরাজ আবার বলিলেন, মনের ঝাঁক যেন মুখ দিয়া গলিয়া বাহির হইতে লাগিল — কথা কইছ না যে? কার হাতে তুমি পড়েছ তা জান ? আমার হাতে, আমায় ঘাঁটিয়ে কেউ নিস্তার পায়নি।

বলিবার কিছু ছিল না বলিয়াই মাখন কিছু বলিল না। বড় বৌ মধ্যস্থ হইয়া আসিল; বলিল, তুমি যাও মা, আমি ওকে দিয়ে আসছি। যাওয়া ছাড়া বিরাজের আর গতিই ছিল না—পাথরে আঘাত কে কত করিতে পারে। মনে মনে ছোট বৌয়ের মাথা চিবাইতে চিবাইতে তিনি চলিয়া আসিলেন।।

বড় বৌ মাখনের হাত ধরিয়া লইয়া চলিল। মাখন আপত্তি করিল না—বিষে সর্বাঙ্গ ছাইয়া অবশ হইয়া গিয়াছিল।

 

মধুডাঙ্গার নাম মাত্র মেলা, দহ বার খানা দোকান বসে। বালতি, কড়াই প্রভৃতি রান্নার সরঞ্জাম; আর্শি-বসান কৌট, কাঠের চিরুণী, কাঠের মালা ফিতে ঘুনসী; পাঁপড় ভাজা, পান সিগরেট, আর মিষ্টান্ন…বালকের আর গৃহস্থের ক্ৰেয় যা, তাহাই কেহ গরুর গাড়ীতে | কেহ নিজের পিঠে চাপাইয়া লইয়া আসে।

কিন্তু সমারোহটা ভিতরেই বেশী।

রাধামাধব বিগ্রহের মন্দির, তার সম্মুখেই নাটমন্দির, তার এদিকে চত্বর, চত্বরের দক্ষিণে অতিথিশালা—সাধু বৈষ্ণবের বিশ্রাম আর ভোজনের স্থান।

সন্ধ্যা লাগিতেই কীর্তন সুরু হইয়া গেল। কিন্তু সেখানে সবাই নাই; বাহিরে গাছের তলায় স্থানে স্থানে বৈষ্ণবীগণ সহ বাবাজি বসিয়া আছেন…কেউ ইট পাতিয়া আগুন করিয়া কড়াইয়ে চাল সিদ্ধ করিয়া লইতেছে…ধোঁয়ায় ধূলায় স্থানটি বড় অপরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে। সবাই অলস, যে বেড়াইতেছে সে গা দুলাইয়া বেড়াইতেছে, যে বসিয়া আছে সে মুখ খুঁজিয়া বসিয়া আছে, যে শুইয়া আছে সে পিঠ দুমড়াইয়া হাঁটুর সঙ্গে মাথা ঠেকাইয়া শুইয়া আছে…

বাইশ তেইশ বছরের একটি বিধবা মেয়ে মণিহারী দোকানে বসিয়া কাহার জন্য ঘুঙ্গী বাছাই করিতেছিল…দু’গাছা বাছিয়া লইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়াই দেখিল, তার পাশেই . একটা অপরিচিত লোক দাঁড়াইয়া আছে—মেয়েটি সরিয়া গেল।

অদূরেই বিস্তৃত বাগিচা—

কেজো অকেজো ছোট বড় ঝোপ জঙ্গলে বাগিচা পরিপূর্ণ। একটা লোক ঝোপের আড়ালে শৌচে বসিয়াছিল.

হঠাৎ কি দেখিয়া সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িয়া খানিক পা টিপিয়া টিপি ছুটিয়া নাট মন্দিরে ঢুকিয়া গেল…দশ বারজন লোক জুটাইয়া যখন সে অকুস্থলে উপস্থিত হইল, তখন সেই বিধবা মেয়েটি তিনটি লোকের কবলে মুখ বাঁধা অবস্থায় গোঁ গোঁ করিতেছে…যখন লোক সমাগম তারা টের পাইল তখন তারা ব্যুহের অভ্যন্তরে।।

সাধু ধরা পড়িল।

তারপর মামলা, অসংখ্য যাতায়াত, অজস্র অর্থব্যয়…কত কি বিশৃঙ্খলতা, কি প্রত্যেকটি ঘটনা স্বতন্ত্র এবং স্পষ্ট…তারপর সুদীর্ঘ সশ্রম কারাবাস…দেহের শক্তি যেন নিড়াইয়া বাহির করিয়া লইয়া তাহারা কাজে লাগাইয়াছে…নিদারুণ দাসত্ব—

তামাক টানিতে টানিতে সাতু অতীতকে প্রত্যক্ষ করিতেছিল—

ভাবিতেছিল, নিতান্তই দৈব, নতুবা ধরা পড়িবার ত’ কোনই সম্ভাবনা ছিল না, সতর্কতা অবলম্বন করিতে কসুর হয় নাই…মেয়েটির সঙ্গ লইয়া পদে পদে তাহাকে অনুসরণ করিয়াছিল; ঘুণাক্ষরেও তাহাকে টের পাইতে দেয় নাই…।

দোকান পাট বন্ধ হইয়া মেলার বহিরঙ্গ নির্জন হইয়া গেল—কীর্তন তখন দুনে চলিতেছে, কীর্তনওয়ালা ঘামিয়া নাইয়া উঠিয়াছে তবু তার বসিবার নামটি নাই। খুলী যেন নেশায় মাতিয়া উঠিয়াছে…মেয়েটি সিং-দরজার পিছনে অন্ধকারে বসিয়া ঢুলিতেছিল—

হঠাৎ হরিধ্বনিতেই চমকিয়া উঠিয়া সে বোধকরি গায়ে হাওয়া লাগাইতে বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল…দোকানের আওতায় বাতাস ভাল বহিতেছে না…মেয়েটি হাঁটিতে হাঁটিতে গলির মুখে আসিয়া দাঁড়াইল।

তারপর যা ঘটিল তাহা চক্ষের পলকে, মেয়েটির মুখের উপর কাপড় চাপা পড়িল, সঙ্গে সঙ্গে তার দেহখানা শূন্যে উত্তোলিত হইয়া তীরবেগে চলিতে লাগিল—

কিন্তু বিধাতা এমনি প্রসন্ন যে গভীর রাত্রে নির্জন বনাভ্যন্তরেও তিনি একজন সাক্ষী পূর্ব হইতেই রাখিয়াছিলেন; সে-ই ধরাইয়া দিল…মেয়েটির মুখখানা সাতুর মনে। পড়িতে লাগিল—নয়নাভিরাম; কালোর উপর উলকির ফোটা…চোখ দুটি আয়ত সিন্দুরশঙ্খ নাই…অঙ্গে দ্বিতীয় বস্ত্র নাই। নিতান্ত গেঁয়ো হাবা, দেখিলেই তা বোঝা যায় মেলায় একা আসিয়াছিল, কি সঙ্গে কেহ আসিয়াছিল কে জানে!

এখন সে কোথায়—কেমন তার দশাটাকে জানে…

ভাবিতে ভাবিতে দরজার খিলের শব্দ পাইয়া সাতু ধীরে ধীরে চোখ ফিরাইয়া দেখিল। মাখন আসিয়াছে…সে মেয়েটির চেয়ে মাখন সুন্দর—

বলিল, এস।

কিন্তু মাখন স্বামীর আহ্বানে সরাসরি বিছানায় না যাইয়া দেওয়াল ঘেঁসিয়া দাড়াইল! আহ্বান সে শুনিতে পাইয়াছে কি না সাতু তাহাই বুঝিতে পারিল না।

স্বামীর সঙ্গে মাখনের মিলনের একটা সূত্র ছিলই। – প্রাণের আঁশে আঁশে যোগের স্রোতে প্রবেশ করিয়াছিল কি না কে জানে, কিন্তু, সংসর্গজ একটা প্রতি জন্মিয়াছিল— কোথায় ভয়াবয় দত্তপানি একজন একজন শাসক বসিয়া আছেন, তিনিও টানিয়া লইয়া একটা স্থানে জোড় মিলাইয়া দিয়াছিলেন। স্বামীকে সে চিনিয়াছিল। মানুষ মানুষের হাসি দেখিয়া চেনে, ভাষা শুনিয়া চেনে, চাহনি দেখিয়া চেনে, স্পর্শ পাইয়া চেনে চিনিবার দিকে এমন উগ্র সচেতন পরিচয় প্রাণের কাছে প্রাণের গোপন করা যেমন কঠি, চিনিতে পারিয়া তাহার দিকে চোখ বুজিয়া থাকাও তেমনি কঠিন…

সুখের হোক দুঃখের হোক, তবু স্পর্শ ছিল—আছে আর আছি বলিয়া নিরন্তর একটা অনুভূতি ছিল একটা আকুতি ছিল—

সেটা মাখনের বিলুপ্ত হইয়া গেছে— মরুভূমির বালুর উপর নিপতিত জলবিন্দুর মত সে এত বড় ব্রহ্মাণ্ডের কোথায় যাইয়া আশ্রয় লইয়া অদৃশ্য হইয়া আছে, তাহার উদ্দেশ নাই।

মাখন স্বামীর চোখের উপর চোখ পাতিয়া রাখিল, সে-দৃষ্টির অর্থ কি সাত তাহা বুঝিল না; বুঝিল না যে, দুজনাই মানুষ হইলেও তাহাদের জগত বিভিন্ন কোন জগতের অপরিচিত আত্মা এই জগতের আত্মার কাছে বন্দী হইয়া আসিয়াছে..পুরুষের দিকে স্ত্রীর এই দৃষ্টি বিভীষিকার সম্মুখে মুচ্ছিতার বিফল দৃষ্টি—নিঃশব্দ আর্তনাদ..

সাতু হাসিতে লাগিল।

বলিল,- বড়ই অভিমান যে! ডাকছি তা’ আসা হচ্ছে না…ঢং দেখলাম বিস্তর। …নেও হয়েছে, এস এখন।—না, আমায় উঠতে হবে ?

মাখন চোখ নামাইয়া মাটির দিকে চাহিয়া একবার ঢোক গিলিল—তার বুক ধড়ফড় করিয়া কাঠ হইয়া যাইতেছে।

সাতৃ উঠিতে উঠিতে বলিল,“উঃ! বলিয়া বিরক্তি আর ক্লেশ প্রকাশ করিয়া সে উঠিল…

মাখন কেবল সরিয়া যাইতে লাগিল—

কোথায় যাইতে চায়—সে জ্ঞান তার নাই..যাইবার স্থান নাই, তবু নিজেকে আড়ষ্ট করিয়া তুলিয়া সে কেবল সরিয়া সরিয়া দেয়ালের বাহিরে যে অশেষ উন্মুক্ত পৃথিবী, যেন তাহাকেই লক্ষ্য করিয়া চলিয়াছে। তার স্কুল অবয়ব কেবল ত্বকের উপর পশ্চাতের কঠিন বাধা অনুভব করিতেছে—দেয়ালের সঙ্গে ঘর্ষণে তার পিঠ কাটিয়া গেল…

সাতু অগ্রসর হইয়া আসিতেছে— স্বামীর স্পর্শটা আসিয়া যেন তার সর্বাঙ্গ বিদ্ধ হইতে লাগিল—

কিন্তু দেহ-সঙ্কোচনের স্থান আর নাই…এবং পর মুহূর্তেই তার সঙ্কুচিত সর্বাবয়ব যেন রুদ্ধবায়ু বাহিরের দিকে নির্গত করিয়া দিয়া বাহিরের চাপ বাহিরের দিকে ঠেলিয়া দিল…সর্বান্তকরণ বিদ্যুতের আগুনে জুলিয়া লাল হইয়া প্রাণপণে দেহ বিস্তৃত করিয়া দাড়াইল। সাতু তাহা দেখিল, এমন ব্যাপার না দেখিয়া উপায় নাই; কিন্তু সাতু তাহা গ্রাহ্য কারল না—করিলে জেলে যাইত না বলিল,—সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়, একটা কথা আছে না? অমন করে চাইলে কি হবে!

আমার—বলিতে বলিতে থামিয়া সাতু থমকিয়া দাঁড়াইয়া—মাখন হাত তুলিয়াছিল…

হাত তুলিবার ভঙ্গীটি বড় অসাধারণ—সে যেন শুধু আত্মরক্ষা নয় তার উপরেও মারাত্মক কিছু—

সাতুর যতই ভুল হোক, এবার সে ভুল করিল না, হটিয়া আসিয়া বলিল,—মারবে না কি? মাখন বলিল,আমায় ছুঁয়ো না।

—যদি ছুই?

—ভাল হবে না।

শুনিয়া সাতর বুক কাঁপিয়া উঠিল। অতিশয় তীক্ষ একখানা অস্ত্র যেন তার সামনে ঝলসিয়া উঠিল।।

সাতু ফিরিল।

প্রাণভয়ে পলাইবার মত করিয়া ছুটিয়া আসিয়া দড়াম করিয়া দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া ডাকিল,—মা?

বিরাজ জাগিয়াই ছিলেন, এক ডাকেই সাড়া দিয়া ছেলের ব্যাকুলতা কানে বাজিতেই তিনি লাফাইয়া উঠিলেন;—কি রে? কি হ’ল রে?

বলিতে বলিতে তিনি দরজা খুলিয়া বাহির হইয়া আসিলেন।

সাতু বলিল,—বৌকে বের করে আন’; ও ঘরে আমি যাব না— মারবে বলেছে।

বিরাজ ঠিকরাইয়া উঠিলেন,—মারবে বলছে!

—তা’পারে। ওর কাপড় চোপড় ঝেড়ে দেখ; ছুরি-ছোরা বোধ করি ওর কাছে আছে। শুনিয়া বিরাজ হতজ্ঞান হইয়া গেলেন—

বড় কষ্টে দীর্ঘদিন তার কাটিয়াছে… উৎকণ্ঠায় তার স্নায়ু আহোরাত্র উঠিয়া পড়িয়া ঝম ঝম করিয়া বাজিয়াছে…ছেলের ক্লান্ত শীর্ণ চেহারার দিকে চাহিয়া তার কিছুই ভাল লাগে নাই…তার উপর, বধূর পিছনে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বিরক্তিতে, আর বধূর অমানুষিক আচরণে ক্রোধে তার রক্ত তখনও ফুটিতেছিল।

এখন ছুরি লইয়া বধূ তার পুত্রকে খুন করিতে উঠিয়াছে, আচমকা এই খবরটা পাইয়া তার মাথার হাড় পর্যন্ত আগুনের জ্বালায় জ্বালিয়া উঠিল…

—কই? বলিয়াই যখন তিনি বধূর উদ্দেশ্যে ধাইয়া গেলেন তখন তিনি উন্মাদ, হিতাহিত বুঝিবার জ্ঞান লোপ পাইয়া গেছে…চাখে পড়িল বধূ কোণে দাঁড়াইয়া আছে।

কেমন করিয়া দাঁড়াইয়া আছে তাহা তার চোখে পডিল না, ছোরার ভয়ও তিন করিলেন না…লাফাইয়া তাহার সম্মুখে পড়িলেন, ঘাড় ধরিয়া তাহাকে সম্মুখে আনলে এবং ঘাড়ে ধাক্কা দিতে দিতেই তাহাকে বারান্দায় আনিলেন, উঠানে নামাইলেন, পার করিলেন… বধূর ঘাড় হইতে হাত নামাইয়া সদর দরজার খিল খুলিলেন…

 

বলিলেন —যা চুলোয়! বলিয়া শেষ ধাক্কা দিয়া তাহাকে সদর দরজার বাহিরে পাঠাইয়া খিল আঁটিয়া দিয়া দাঁড়াইয়া হাঁপাইতে লাগিলেন—

সাতু দুঃখিত ভাবে বলিল— জেলই আমার ছিল ভাল।

 

 

The following two tabs change content below.

জগদীশ গুপ্ত

জগদীশ গুপ্ত’র (১৮৮৬ – ১৯৫৭) প্রথম ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হয় ১৯২৭ এ। প্রকাশের সময় বিচার করলে উনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরবর্তী সময়ের এবং ‘আধুনিক ছোটগল্প’ লেখকদের কিছুটা পূর্ববর্তী।

Latest posts by জগদীশ গুপ্ত (see all)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য