Main menu

বাংলাদেশের মিউজিক (৩)

এক।। দুই ।।

………

বাংলাদেশের বৃষ্টির গান

বৃষ্টির গানের জনরা নিয়া

এই জিনিসটা পয়লা মনে হইছিলো, সোলসের পার্থ’র “রিমঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ে/ মন দরিয়ায় তুফান ওড়ে…” গানের মিউজিকটা খেয়াল কইরা, অইখানে “মনের মানুশ এমনি দিনে মনে পড়ে যায়/মনের খবর তারে কেমনে জানাই!” বইলা যে চিল্লান’টা দেয়, অইটা তো “বৃষ্টির গানের ইমোশনের” লগে তো এতোটা যায় না! :p মানে, বৃষ্টি তো হবে ভিজা-ভিজা, নেতানো একটা জিনিস, এইখানে চিল্লানি কি দেয়া যাবে? বা ভি.এস.নাইপল’রা বাংলাদেশরে যেইরকম “বৃষ্টি-বিধৌত ব-দ্বীপ” বানায়া রাখছেন, অইটার লগে কন্ট্রাডিক্টরি হয়া যাবে না? 🙂 (আশা মুগদালের একটা গান আছে, “আজকা শাবন জিরায়া বরসে… অইটার মিউজিকের লগে মিল পাইবেন কিছুটা…)

তারপরে, ডিফরেন্টের টাচের গান’টা খেয়াল করেন “শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে…” এতো পপুলার (মানে, মিডল-ক্লাসের নাইনটিইজের জেনারেশনের কাছে) কেমন হইলো? অইটাতেও সোলসের বিরহ’টাও নাই, “উদাসী” ব্যাপারটাও কি রকম লাউড, উদাস হইলে মানুশ এইরকম চিল্লায় নাকি! অথচ দেখেন, অই চিল্লানির কারণেই এইটা ‘ভালো’! মানে, পপুলার হওয়ার পিছনে এইটার কন্ট্রিবিউশন থাকার কথা যে, ব্যান্ডের গান তো এইরকমই হইতে হবে!

তো, আমারে ভুল বুইঝেন না যে, আমি ওকালতি করতেছি, এইগুলা ভালো গান! ব্যাপারটা হইতেছে, জনরা হিসাবে কেমনে আলাদা।

তবে অ্যাক্রস দ্য জনরা; মানে, ব্যান্ডের গান, পুরানা দিনের গান, আধুনিক গান, ট্রাডিশনাল গান, সব জায়গাতে দুয়েক্টা জিনিস কমন, যেইটা দিয়া এইটা যে, বাংলাদেশের বৃষ্টির গান – সেইটারে মেবি লোকেট করা যায়। জিনিসটা অবশ্যই স্ট্যাটিক না। ওভার দ্য পিরিয়ড অফ টাইম চেইঞ্জ হইছে, হইতেছে, হবে।

গানের লিস্টিং নিয়া

লিস্টিং করতে গিয়া, ৭০/৮০’র মতো গান পাইছিলাম বৃষ্টি নিয়া, বাংলাদেশের। তবে আমার ধারণা, আরো গান থাকার কথা। মানে, এইটা কমপ্লিট লিস্ট না। যেহেতু আমি আর আমার ফেসবুকের ফ্রেন্ডরা মেইনলি নাইনটিইসের লোক, অই সময়ের ব্যান্ডের গান, আধুনিক গানই বেশি লিস্টে আসতে পারছে। সবচে বেশি মিসিং মনে হইছে ‘ট্রাডিশনাল’ গানগুলা, বৃষ্টি ব্যাপারটা মেবি “বৃষ্টি” শব্দ দিয়া অইরকমভাবে ছিল না, বা নাই। ব্যাপারটা মেঘ-ই হওয়ার কথা।…

তো, এই লিস্ট’টা করতে পারলে তো নানান দিক দিয়াই সুবিধার। আর ক্যাটাগরি করতে পারলে, সময় অনুযায়ী সাজাইতে পারলে। খালি বৃষ্টি না, বৃষ্টিরে ধইরা অনেক কিছু নিয়া কিছু আন্দাজ করা সম্ভব হইতে পারে। (এই কাজ একলা তো আমি কখনোই করতে পারবো না, আর এইটা আমার ইন্টারেস্টের এরিয়াও না, তারপরও ইচ্ছা’টা জানায়া রাখলাম আর কি!) এই স্যাম্পল সাইজের বেসিসেই কথা বলি কয়েকটা।

পয়লা জিনিস হইলো, এতো যে গান, এইগুলা কিন্তু আমাদের মনে থাকে না, মানে টপ অফ দ্য মাইন্ডে থাকে না; সবচে বেশি মনে আসে আসলে কিছু হিন্দি সিনেমার গানের কথাই, ইংলিশ গানও, কলকাতার আধুনিক (মানে ‘৬০র দশকের) গান, বাংলাদেশের গানগুলা এতোটা মনে আসে না; বা আসলে ফেসবুকে শেয়ার দেয়াটা বা পাবলিকলি মনে-করা’টা এতোটা স্মার্ট কোন ব্যাপার হইতে পারে না, বরং একটু অস্বস্তিই থাকার কথা, ব্যাপার’টা বেশি ‘ক্ষ্যাত’ দেখাইবো না তো? 🙂 মানে, এইটা ‘আরবান কালচারের’ কোন ঘটনা না, আপনি যদি ‘প্রকৃত বাঙালি’ হইতে চান প্রায় সবকিছুতেই দেখবেন ‘বাংলাদেশি’ জিনিসগুলারে একটু এড়াইতেই হয়, না-বলার ভিতরে রাখতে হয়, তা নাইলে ‘কালাচারাল’ লোক হইতে পারেন না এতোটা!

এইটা কেন হইলো? গান’গুলা বাজে বইলা? মানে, খারাপ-ভালো গান তো আছেই; কিন্তু আমার কথা হইতেছে, এর বাইরেও ‘বাংলাদেশি গান’ এইটা ‘কালাচারাল ক্যাপিটাল’ হিসাবে একটা ইনফিরিয়র জিনিস, বাংলাদেশে। গান ভালো নাকি খারাপ – এর বাইরেও এই জিনিসটা আছে, কাজ করে একভাবে। কোন আর্ট বাংলাদেশে বানানো হইছেই বইলা যেমন ভালো না, একইরকমভাবে খারাপও তো হইতে পারে না। কিন্তু আছে সেইটা। আমাদের ‘মনে না করা’ না, বরং পাবলিকলি মেনশন না করার ভিতর দিয়া এইটা এফেক্টিভ থাকে। এইটা আমার একটা ক্লেইম।

সেকেন্ড হইলো, ভ্যারিয়েশনের জায়গাগুলা, মানে একটা কালচারেও তো নানান ক্লাসের ঘটনা মিইলা-মিইশা থাকে, অই কালচারাল ভ্যারিয়েশনগুলা মিসিং। যেমন ধরেন, রুনা লায়লা যেই “রসের দেওরা”টা গাইছেন অইটা এক কিসিমের গান, আবার মাইলেসের যে ওয়েস্টার্ন কোন গানের কপি’র মতো “রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টিতে হাতে তুলে গিটার…” – দুইটাই (এবং আরো অনেকগুলাই) বাংলাদেশে গাওয়া হইছে তো। এবং দেখবেন, দুই কিসিমের বা দশ রকমের হইলেও ভালো গান কিন্তু ভালোই। সব ক্লাসের লোকজনেরই কম-বেশি ভাল্লাগার কথা। কিন্তু এই ভ্যারিয়েশনরে আমার ধারণা, একভাবে খুন করা হইতেছে। কালচাররে এক্সপ্লোর করার চাইতে একটা লিনিয়ার ফর্ম হিসাবে পারফর্ম করানোর জায়গা থিকা দেখা হইতেছে, যেইটা খুন করার শামিল আসলে।… এক তো হইলো রিকগনিশন নাই, শরম লাগে এইসব গান শুনতে; সেকেন্ড হইলো, লিনিয়ারটিরি এই ঘুঁটা যে, এইটা তো তত একটা ‘বাঙালি’ (নট বাংলাদেশি) না!

থার্ড হইলো, আর্ট ক্রিয়েট করা যে কতো কঠিন জিনিস – সেইটা টের পাইবেন, বৃষ্টির গান গাইলেই সেইটা বৃষ্টির ঘটনাটারে ট্রান্সফর্ম করতে পারে না অইভাবে। বৃষ্টি মিনিং ঘুইরা-ফিরা বাংলা-গানে অই দুই-চাইরটা জিনিসই: ইরোটিক (সবচে সেলিব্রেটেড এবং ভালো) আর বিরহ-ই (সবচে ফাঁপানো এবং মিডিওকার) বেশি, এর বাইরে ন্যাচার নিয়া আছে কিছু, কিন্তু অন্য কোন ঘটনা প্রমিনেন্ট হয়া উঠতে পারে নাই। জেমস, আইয়ূব বাচ্চুও বৃষ্টি নিয়া গান গাইছেন, কিন্তু দেখেন, আলাদাভাবে অইগুলা মনেও করা যায় না, কারণ বৃষ্টির যেই মিনিং সেইটার বাইরে লিরিকসে, মিউজিকে বা উনাদের গানে আলাদা কিছু তৈরি হয় নাই। হুমায়ূন আহমেদ যে পিপলের আর্টিস্ট এইটা উনার গান দিয়াও বুঝা যায়, একটা বিরহরে উনি ক্রিয়েট করতে পারছেন, যেইটা ছাড়া মেনশন করার মতো আর কোন ক্রিয়েশন নাই আসলে, রিসেন্ট বাংলাদেশের বৃষ্টির গানে।…

মানে, বৃষ্টি তো একটা উছিলাই সবসময়। আমিও বৃষ্টির গানরে উছিলা কইরা কিছু কথা বলতে চাইছি। এইরকম কম্পাইলেশন বা লিস্টিংগুলা যদি আমাদের সামনে থাকে, আমার ধারণা তাইলে অনেকেরই কথা বলাটা বা অনেককিছু দেখাটা সহজ হইতে পারে।

ডামি/ড্রাফট লিস্টিং

অ. অফিসিয়াল সিলেকশন

১. এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না। সিঙ্গার: রুনা লায়লা। মিউজিশিয়ান: সুবল দাস।
২. আল্লা মেগ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই। আব্বাসউদ্দিন, রুনা লায়লা।
৩. চলো বৃষ্টিতে ভিজি। সিঙ্গার: হাবিব, সাবিনা ইয়াসমীন, শাওন। লিরিকস: হুমায়ূন আহমেদ।
৪. বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না জোরে। সিঙ্গার: আগুন, সাবিনা ইয়াসমীন। মিউজিক: আলাউদ্দিন আলী। লিরিকস: গাজী মাজহারুল আনোয়ার।
৬. শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে। ডিফরেন্ট টাচ।
৫. আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে। সিঙ্গার: নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী।
৭. হেই যুবক – বেবী নাজনীন।

 

 

আ. স্পেশাল মেনশন

১. “রসেরও দেওরা, বাড়ির কাছে প্রেমের নদী ডুব দিলা না/রিমিঝিমি বৃষ্টি পড়ে, ভিইজা গেল শাড়ি আমার, চাইয়া দেখলা না” – রুনা লায়লা।
২. বাদল মেঘ ঘুমাতে দেবে না। সিনেমা – রাজা সাহেব। মেহেদী হাসান।
৩. মেঘ থম থম করে। সিনেমা – সীমানা পেরিয়ে। ভূপেন হাজারিকা।
৪. আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি। সিঙ্গার: সুবীর নন্দী। মিউজিক: শেখ সাদী খান।
৫. আমার আছে জল। শাওন, হুমায়ূন আহমেদ।

https://www.youtube.com/watch?v=M_QXGDhEEUg

……………

ক. কাল্টস/নিউ কাল্টস

১. চঞ্চল হাওয়া রে। দ্য রেইন।
২. মুক্তো মালার ছাতি মাথায় বর্ষা এলো রে। ফেরদৌসী রহমান।
৩. এতো বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে। রুনা লায়লা।
৪. টিপ টিপ বৃষ্টি। শেখ ইসতিয়াক।
৫. রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টিতে। মাইলস।
৬. আনন্দ ভৈরবী। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নাসিফ আমিন, আহমেদ হাসান সানি।

…………………

খ. ট্রাডিশনাল

১. মেগ রাজা রে তুই আমার সোদ্দর ভাই – মাহবুব পিয়াল।

(এইখানের পুরা জায়গাটাই মিসিং আসলে।)

গ. নাটক-সিনেমার গান

১. হৈ হৈ হৈ রঙিলা রঙিলা রে। সিনেমা – রংবাজ। সিঙ্গার: সাবিনা ইয়াসমীন ও আলী সিদ্দিকী। মিউজিক: আনোয়ার পারভেজ। লিরিকস: গাজী মাজহারুল আনোয়ার।
২.হুড়মুড় হুড়মুড় করে মেঘা। সিঙ্গার: সুবীর নন্দী। লিরিক্স: হুমায়ূন আহমেদ।
৩. যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়। সিঙ্গার: শাওন। মিউজিক: এস আই টুটুল। লিরিকস: হুমায়ূন আহমেদ।
৪. ঝুম ঝুম বৃষ্টি – কুমার বিশ্বজিৎ, কণা।

…………….

ঘ. ব্যান্ডের গান

(প্রেফারেন্স অনুযায়ী লিস্টিং করা হয় নাই।)

১. বৃষ্টি নেমেছে – ওয়ারফেইজ।
২. বৃষ্টি নেমেছে – অর্থহীন।
৩. রিম ঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ে – সোলস, পার্থ।
৪. বৃষ্টি দেখে অনেক কেঁদেছি – সিঙ্গার ও মিউজিক: পার্থ বড়ুয়া। লিরিকস: লতিফুল ইসলাম শিবলী।
৫. বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর – জলের গান।
৬. এই বৃষ্টি ভেজা রাতে – আর্টসেল।
৭. বৃষ্টি – উইনিং।
৮. বৃষ্টি কাব্য – শিরোনামহীন।
৯. যখনই আকাশে – পেপার রাইম।
১০. টুপ টুপ – ইন ঢাকা।

ঙ. আধুনিক গান (পুরান)

১. এক বরষার বৃষ্টিতে ভিজে – নীলুফার ইয়াসমীন।
২. ঝর ঝর বৃষ্টি তুমি ঝরো না – নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী।

চ. আধুনিক গান (নয়া)

(প্রেফারেন্স অনুযায়ী লিস্টিং করা হয় নাই।)

১. মেঘলা মেঘলা দিনে – মিকি মান্নান।
২. বৃষ্টি ধুয়ে দেয় – তপু।
৩. বর্ষা – কণা।
৪. বৃষ্টি এতো জোরে এসো না – জেমস।
৫. বৃষ্টি ভেজা রাতে – আইয়ুব বাচ্চু।
৬. বৃষ্টি পড়ে – বাপ্পা মজুমদার।
৭. বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর – সেলিম চৌধুরী।
৮. কাল সারারাত বৃষ্টি ঝরেছিল – আসিফ আকবর।
৯. বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, পায়ে দিয়ে সোনার নুপুর – সেলিম চৌধুরী।
১০. ধিন তানা ধিন তানা – কণা।
১১. একটু দাঁড়াবে কি – হাবিব।
১২. এই বৃষ্টি ভেজা রাতে – লিংকন ডি কস্তা।
১৩. বৃষ্টি – অভি কিমবেল, শুভ।
১৪. বর্ষা – ইমরান।
১৫. বৃষ্টি ছুঁয়ে – তাহসান, মৌটুসী।
১৬. ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে উঠেছে কাঁপন – বেবী নাজনীন, আসিফ আকবর।
১৭. এই ভেজা রাত, এই ভেজা হাওয়া – মনির খান।
১৮. চল না দুজনে এই নীলিমা ছুঁয়ে – কাজী শুভ।
১৯. ভেজা সন্ধ্যা অঝোর বৃষ্টি – বালাম।
২০. বৃষ্টি ঝরে যায় – তোসিফ।
২১. ঝুম – মিনার।

 

 

কুরবানি ঈদের গান

বাংলাদেশে কুরবানি’র গান কোনটা? (সেইটা পরে বলতেছি, কিন্তু) তার চাইতে জরুরি প্রশ্ন হইতেছে, বাংলাদেশে কোন কুরবানির গান নাই কেন?

কিছু ‘গরু’ অবশ্যই ইউটিউব সার্চ দিয়া ১৫/২০টা গান বাইর কইরা এবং লিংক দিয়া বলবেন, কই আছে তো! মানে, এখন কেমনে বুঝাই, ‘গান নাই’ বলতে আমি কি বুঝাইছি?

(আনুমানিক) ৯০ বছর আগে কাজী নজরুল ইসলাম রমজানের ঈদ নিয়া একটা লেখছিলেন বইলা এবং আব্বাসউদ্দিন সেই গান রেকর্ড করছিলেন বইলা, সেই গানটা রমজানের ঈদের আগের দিন আমরা বাজাইতে পারি (নাচতে না পারলেও)। এইরকম কোন ‘সিগনেচার সং’ বাদ দেন, ধরেন আপনার ফ্রেন্ড সার্কেলে ৫/৭ জন একলগে বইসা গাইতে পারেন, এইরকম কোন কুরবানির ঈদের গান নাই।

কালচারাল নিডের কথা বাদ-ই দেন, এর একটা বাজারও তো আছে! কিন্তু আমাদের আর্ট-কালচার করা লোকজন এইটা নিয়া ‘সাহিত্য’ আসলে করতে পারেন নাই।

এক হইলো, এই ‘ট্রাডিশন’টা নাই। যেমন ধরেন, প্রেমের কবিতা লাখ লাখ পাইবেন; যে কেউ ভাবলে, বসলে, দুই-চাইরটা লেইখা ফেলতে পারবেন, কারণ এই ভাইব’টা বাংলা-ভাষার ভিতরে, বাংলা-সাহিত্যের ভিতরে আছে, যার ফলে লেখাটা সহজ (আবার একইভাবে, কঠিনও); দেশপ্রেমের কবিতাও লেখা যায়। কিন্তু নতুন কোন সাবজেক্ট নিয়া লেখাটা কঠিন, কারণ তখন সেইটা ‘হয় না’ আসলে। একটা সাবজেক্টরে সাবজেক্ট কইরা তোলাটা কালচারের বাইরেও একটা আর্টিস্টিক ক্ষমতারও ঘটনা। আর সেইটা কম-বেশি একটা কালচারাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়েরও মামলা…

আরেকটা জিনিস একটু ইরিলিভেন্ট হইলেও বইলা রাখতে চাই, ব্রাহ্মণবাদী টেক্সট-রিডিংয়ে এই জিনিসটা পাইবেন, টেক্সট’টারেই মুখ্য কইরা তোলা হয়, যেন যা কিছু বলা হইলো না, তা আর বাস্তবে নাই! কনটেক্সট’টারে কন্সিডার করা হয় না। কিন্তু ভাষাতে অই না-থাকা জিনিসগুলাও থাকে। যেমন একটা সময়ে আইসা ফিল করার কথা, আরে, কুরবানির গান নাই ক্যান!

কলকাতার হিন্দুদের দুর্গাপূজা যেমন ইংরেজ আমলের একটা ঘটনা, কুরবানি জিনিসটা ১৯৫০-৬০’দিকেও সামাজিক ঘটনা হয়া উঠার কথা না, ৮০’দশকে একটা কমন জিনিস হয়া উঠতে পারছে মনেহয়। (কেউ কোন লেখার কথা জানা থাকলে রেফার কইরেন।)

২.
টাইমের হিসাবে, ইউটিউবে (অবশ্যই অথেনটিক সোর্স না) বাংলাদেশের ফার্স্ট কুরবানি’র গান পাইছি ২০১২ সালের। এর আগেরও থাকতে পারে। মোবাইল কোম্পানি রবি মনেহয় দুয়েক্টা জিনিস ট্রাই করছিল ২০১৩/১৪’র দিকে, কিন্তু জমাইতে পারে নাই। (আরসি কোলার একটা বিজ্ঞাপণও হিট হইছিল, কিন্তু অইটা তো আর গান না।)

প্রমিথিউস ব্যান্ডের বিপ্লবের একটা গান আছে, ২০১৬ সালের, যেইটা আমার ধারণা একটা কাল্ট সং হয়া উঠতে পারে।

 

এর বাইরে যেই গানগুলা আছে, বেশিরভাগই ফান, হিউমার গরুর বাজার নিয়া, বেপারি-কাস্টমার নিয়া। গত দুই-তিন বছর ধইরা প্রতি বছরই একটা/দুইটা গান রিলিজ হয়। ‘ডিমান্ড’ তো আছে আসলে। কিন্তু ফেমাস বা সেলিব্রেটি সিঙ্গার-লিরিসিস্ট না উনারা কেউ।

প্যারোডি গানও আছে কিছু; মানে, কুরবানি যে দিতেছি আমরা, লজ্জার ব্যাপার তো কিছুটা! কলার ছুলকায় পা পিছলায়া পড়ার পরে নিজে নিজে হাইসা দিতে পারার মতো।…

তবে ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার হইতেছে, যারাই এই ট্রাই-ট্রুইগুলা করতেছেন, তাদের সবাই-ই ইয়াং। এইটা এনকারেজিং একটা জিনিস। আমি হোপফুল যে একটা বাংলাদেশি কুরবানির গান আমরা পাইতে পারবো হয়তো, রিসেন্ট ফিউচারেই। কারণ কালচারাল স্টিগমাটাও কমতেছে মনেহয় কিছুটা।…

৩.
তো, এর আগ পর্যন্ত, বাংলাদেশে কুরবানির ঈদের গান হইতেছে আসলে হিন্দি কুরবানি (১৯৮০) সিনেমার “কুরবানি, কুরবানি…” গানটা। (বিপ্লবের গানের শুরুতেও গানটার একটু আছে দেখবেন।) আমার ধারণা, অনেকেই চিনবেন গান’টা। দেখেন তো, মনে করতে পারেন কিনা!

 

 

দেশের গান

বাংলাদেশে না হইলেও হাজার খানেক দেশের গান থাকার কথা। প্রেমের গান আর বাউল গানের পরে এই ‘দেশের গান’-ই জনরা হিসাবে বা সাবজেক্ট হিসাবে সবচে রিচ হওয়ার কথা। এইটার শুরু তো অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় থিকা। এর পরে জিয়ার আমল পর্যন্ত এই ‘দেশের গান’র রেওয়াজ ছিল। এরশাদের সময় থিকা পাবলিকের কাছে দেশের গান জিনিস’টা ভুয়া হইতে শুরু করে অনেকটা; মানে, “আবেদন” কইমা যায়। 🙂

তো, একটা জনরা চালু হইলে যা হয়, দেখা যায়, আরে, আগেও তো দেশের গান ছিল অনেক! এইভাবে পুরান কিছু গানও ইনক্লুড হইতে থাকে। যার ফলে ১৯৫২’র ভাষা-আন্দোলনের কিছু গানও দেশের গানে নেয়া গেছে। কিন্তু মুশকিল হইছে যখন ১৯০৫’র ‘বঙ্গভঙ্গ’ বাতিল করার সময় যখন কলকাতার বাবুদের গানরেও ‘দেশের গানে’ ইনক্লুড করা হইছে। জনরা ভারী হইছে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের, বাংলাদেশের স্পিরিটটা অইখানে পুরাপুরি মিসিং, মিসলিডও করা হইছে। এই ‘বাঙালিপণা’ ইন্সফ্লুয়েন্সও করছে জনরা’টারে, যে ন্যাচারাল বিউটি ছাড়া কি দেশের গান হয় কিনা! কিন্তু বাংলাদেশের দেশের গান এইটুকের মধ্যে আটাকায়া থাকে নাই।…

আবার মুক্তিযুদ্ধের পরে, দেশের গান ব্যপারটা খালি ‘দেশপ্রেম’ হয়া থাকে নাই; ‘সমাজ-বাস্তবতার’ দিকেও টার্ন করতে পারছে; কম হইলেও কিছু নজির আছে। অবভিয়াসলি, সবচে ইউনিক উদাহারণ হইতেছে আজম খানের “হায় আমার বাংলাদেশ”! স্বাধীনতার পরে এই গান গাওয়া হইলেও ‘৯০-এ এবং এখনো এইটা হইতেছে সবচে আইকনিক একটা গান!…

মানে, টাইমলাইন অনুযায়ী যদি দেখেন ৩টা টাইমজোনে ভাগ কইরা দেখা যাইতে পারে –

১. ১৯৭১ টু ১৯৮১: এইরকম দিন-ক্ষণ মাইনা তো লোকেট করা যাবে না অইভাবে; যারা মিউজিক ইন্ড্রাষ্ট্রির লোক উনারা হয়তো কিছু সিগনিফিকেন্ট ঘটনা মার্ক করতে পারবেন, কেমনে জিনিসটা অফ হয়া গেছিল।

২. ১৯৭১’র আগের গান – অনেক পরিচিত গানই ১৯৭১’র আগের, এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত-ই ‘বঙ্গভঙ্গের’ সময়ের গান। অইখানে ব্রিটিশ-বিরোধী ব্যাপারগুলার বাইরে ন্যাচারাল বিউটি হইতেছে প্রমিনেন্ট।

৩. ১৯৮০’র দশক এবং এর পরের – খুব বেশি সিগনিফিকেন্ট গান আমার পাই নাই এইরকম। ১৯৯০-এ এরশাদ ফল করার পরে ‘দেশপ্রেমের’ একটা ছোটখাট ঢেউ উঠছিল মনেহয়। জেমস, আইয়ুব বাচ্চু’রা গাইছিলেন কিছু গান। কিন্তু নতুন কোন টেস্টের জন্ম দিতে পারেন নাই আসলে।

মানে, ‘দেশের গান’ আসলে নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনাই ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের ১০/১২ বছর। এর আগেও ছিল, এখনো গাওয়া হইতেছে, কিন্তু অইটা ছিল গোল্ডেন পিরিওড। গানগুলার মধ্যে টেনডেন্সির দিক দিয়াও কয়েকটা ইমোশনরে হাইলাইট করার ব্যাপার আছে –

১. যুদ্ধের গান, ইন্সপারেশনাল, দেশের জন্য আমরা জীবন দিয়া দিবো। “একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে মোরা যুদ্ধ করি…” “তীর হারা অই ঢেউ সাগর পাড়ি দিবো রে…”

২. যুদ্ধের পরের গান, শোকের, কষ্ট ও বেদনার। “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না…” “আমায় গেঁথে দাও না মাগো…” “রেললাইনের ধারে, মেঠোপথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে…”

৩. “বাংলাদেশ” ধারণার গান; “চাষাদের, মজুরের, মুটেদের…” “প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ…”

৪. প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের গান; “একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল…” “ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা…” “আমার সোনার বাংলা…”

৫. ট্রিবিউট সং; “সালাম সালাম হাজার সালাম…” “শোনো একটি মুজিবুরের কন্ঠ থেকে…”

৬. সমাজ-বাস্তবতার গান; “হায় আমার বাংলাদেশ…” (আজম খান) “আমার সোনার বাংলা…” (জেমস) “আমার বাংলাদেশ…” (আইয়ুর বাচ্চু)

এইরকম আরো ৫/৭টা ক্যাটাগরি আইডেন্টিফাই করা যাবে। ও, আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র গানও কিন্তু আছে। যেমন, “প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ…” হইতেছে বিএনপির গান; টিভিতে এই গানটা এখন এক রকমের ‘নিষিদ্ধ’।…

 

কিন্তু এইখানেও তিনটা ক্যাটাগরি প্রমিনেন্ট বইলা আমি মনে করি – মুক্তিযুদ্ধ, দেশের সৌন্দর্য্য আর সমাজ-বাস্তবতা।

অবভিয়াসলি দেখবেন মুক্তিযুদ্ধের গানগুলাই হইতেছে দেশের গান; কারণ এইখানে পাবলিক মেমোরি জড়িত, যারা শুনছেন, নিজেদের লাইফের ইমোশনের লগে রিলেট করতে পারছেন; আর যারা লেখছেন, সুর দিছেন, গাইছেন, উনাদের আর্টিস্টিক ব্রিলিয়ান্স বা পলিটিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের বাইরে ইমোশনাল সততার জায়গাটা একটা কি-রোল প্লে করতে পারছে। এই ক্যাটাগরির কিছু গান, অলরেডি দুই-তিনটা জেনারেশন সারভাইব কইরা টিইকা আছে। আমার ধারণা, আরো অনেকদিন অই ইমোশনটারে ট্রান্সমিট করতে পারবে, বাংলাদেশের মানুশের মনে।

সবচে ভারনারেবল লাগে আসলে দেশের সৌন্দর্য্য বিষয়ের গানগুলা। এখনই ফেইক-ফেইক লাগে। বুঝা যায়, আলগা-পিরিতের গান অইগুলা। মোস্টলি একটা সময়ের ফ্যাশন, যখন ‘দেশপ্রেমিক’ বা ‘ন্যাশনালিস্ট’ হওয়াটা ‘ভালো মানুশ’ হওয়ার একটা রিকোয়ারমেন্ট ছিল। এর মধ্যে যে ‘ভালো’ গান নাই – তা না; কিন্তু আমরা তো বুঝতে পারি এখন, ‘দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য’ দেখার লাইগা ‘দেশপ্রেমিক’ হওয়ার দরকার নাই এতোটা।

আর সমাজ-বাস্তবতার জায়গাটাতে বরং আমার আক্ষেপ আছে। খুব বেশি গান পাই নাই আমরা এইখানে। কারণ এই জায়গাটারে নতুন একটা ট্রাডিশন হিসাবে আসলে তৈরি করা লাগবে, যেইটা এক ধরণের পলিটিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং শিল্পী-প্রতিভার ঘটনা। তবে আমার মনেহয়, জাতীয়তাবাদী জায়গা থিকা না, বরং সোশ্যাল-পারসপেক্টিভ থিকা এই জায়গাটা আরো এক্সপ্লোরড হবে, বা হইতে পারবে।

২.
ছোটখাট একটা লিস্টং করতে পারলে ভালো হইতো। করবো হয়তো। ঠিক অমরত্বের দিক থিকা না, ভ্যারিয়েশন, রিলিভেন্স বা পারসোনাল চয়েসের দিক থিকা মেবি।

৩.
আর যে কোন জনরা-ই স্ট্যাটিক কোন ঘটনা না; কোর কিছু জিনিস নিয়া কন্সটেন্টলি চেইঞ্জ হইতে পারলেই বরং জনরা’টা টিইকা থাকে। দুনিয়াতে দেশ না থাকলেও গ্রেটার সেন্সে ‘দেশের গান’ ব্যাপারটা টিইকা থাকার একটা সম্ভাবনার মধ্যে আছে বইলা আমার মনেহয়। মানে, দেশ মানে একটা জিওগ্রাফিক্যাল বাউন্ডারিই না; একটা ইউনিটির সেন্স, একটা স্থানের মায়াও, যেইটা মানুশের মন থিকা কমপ্লিটলি হারায়া ফেলাটা মুশকিল হবে মনেহয়।

The following two tabs change content below.
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য