Main menu

ফিকশন: যেই গল্পের নাম নাই (৪)

কিস্তি ১।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।।


৫.০ সোহানার সানি লিওন সিনড্রোম

‘না পারলে তো হইবো না, পয়দা করো।’ বুইড়া রমজান খেইপা যান প্রডাকশন ম্যানেজার বোমকেশ বক্সী’র উপ্রে। ‘আরে ভাই, একটা সেট রেডি করতে দুইদিন লাগলে কেমনে? কলকাতা থিকা আপনারে আনছি বলিউডের লেভেলে যাওয়ার লাইগা; এখন এই এতগুলা আর্টিস্টরে আইনা আমি বসাইয়া রাখবো নাকি!’ এইরকম ঝাড়ি শুইনা বোম্বের বাঙালি অভিনেতা অমিত আর লাবণ্য দুইজনেই থতমত খায়া যান। সেটের মধ্যে এইরকম চিল্লা-পাল্লা করলে শ্যুটিংয়ের অ্যাম্বিয়েন্সটাই তো নষ্ট হয়া যাবে। তখন শেষের কবিতা বাদ দিয়া নষ্টনীড় না বানানো লাগে!

এইসব কিছু যে হবে না, এইটা রমজানও জানেন। কিন্তু মেজাজ কন্ট্রোল করতে পারেন না টাইমলি সবকিছু না হইলে। এই একটা দোষ উনার। এইদিকে আবার মরার উপর খাড়া ঘাঁ হইলো সোহানা। রাহাত খানের স্পেশাল রিকোয়েস্টে মেয়েটারে নিতে হইছে। পুরা একটা ফৃক। মাথার কোন ঠিক নাই। তারপরও এই মেয়েটাই একটু কাজের। চন্দ্রমুখীর মতোই একটু পাগলা। এইজন্য মায়া লাগে উনার। ক্যামেরার সামনে গেলে পুরা অন্যরকম। আর বাকিগুলা একটার চাইতে আরেকটা বড় বলদ। ডাইনে কইলে বামে যায় আর বাম কইলে যাইতেই থাকে; ঠিকমতো কাজই করতে জানে না, ক্রিয়েটিভিটি চুদাইতে আসছে। মনে করে অফ-ট্র্যাক একটাকিছু করতে পারলেই আর্ট হইছে আর কি। আরে ভাই, আর্ট এত শস্তা জিনিস নাকি! আবার সবগুলা হইতেছে ফকিন্নি’র পোলা, এখন এইগুলা তো মুখে বলাও যায় না। ঝাড়ি-টাড়ি দিয়া রমজান দেখেন যে, সোহানা বেতের চেয়ারে দুই পা তুইলা বইসা আছে, একটা কোণায়।

মেয়েটা সারাক্ষণ একলা একলাই বইসা থাকে। তেমন একটা কথা-বার্তা বলে না। অবশ্য কথা কইলে খুবই ফানি, সবাই কথা কইতে চায় ওর সাথে, কিন্তু মুড অফ থাকলে কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। কোন একটা সদমা পার হয়া আসছে হয়তো সে, রমজান ভাবেন। মানে কোন সদমা পার না হইলে মানুষ কি আর  মানুষ হইতে পারে!

রমজান জানেন যে, সোহানা টিভি নাটকে অভিনয় করতো। মাঝখানে কিছু ঝামেলা হইছিল এখন একটা ব্রেক কাটাইয়া আবার অভিনয়ে ফিরতে চাইতেছে। মাসুদ রানা আইনা দিয়া গেছে। এই ছেলেটারেও পছন্দ করেন তিনি। এই বয়সের ছেলেদের মধ্যে এইরকম ম্যাচুরিটি দেখা যায় না। সিনেমার লাইনে এইরকম ট্যালেন্টেড পুলাপাইন যে ক্যান আসে না!

সোহানারে একদিন উনি জিগাইলেন, সমস্যা’টা কি হইছিলো? সোহানাও যে খুব ক্লিয়ারলি বলতে পারছিলো সেইটা না। বা হয়তো বলাও যায় না আসলে পুরাটা। ভাষায় আসতে গিয়া কতকিছুই তো হারাইয়া যায়। মানে, আমরা তো নিজেদেরকে বলতে পারি না, ভাষাটা আইসা আমাদের মধ্যে দিয়া তার কথাটাই বইলা যায়।

সোহানাও বলতেছিল যে শে জানে না। শে বুঝতে পারতেছিলো না কি ঘটতেছে। এইটুক শে ফিল করতেছিলো যে শি কুডন্ট মেইক ইট। এই সেলিব্রেটি হওয়াটা। তারপরও জান-প্রাণ দিয়া ট্রাই কইরা যাইতেছিলো। শে ভাবছিলো যে, টিভি-ক্যামেরা’র সামনে যেমনে হাসতো শে মেক-আপ রুমে ফোরপ্লে করার সময়ও একইভাবে হাসতে হবে। কিন্তু চুন্নিলাল আঙ্কেল তারে কইলো যে, ‘সানি লিওনের মতো সাক করো! আমি গোসলের সাবান হইয়া তোমার সারা শরীরের গ্লানি মুইছা দিবো!’ শি ওয়াজ কমপ্লিটলি পাজলড – সাবানের রোমাণ্টিকতা কেন! আর তাইলে ক্যামেরার সামনে কেন শে ইনোসেন্টলি হাসবে সুচিত্রা সেনের মতো? ফেইসবুকের ওয়ালে একরকমের ডিসট্যান্ট আর ইনবক্সে আরেক রকমের ক্লোজ? যতই পাবলিক দূরত্ব বাড়বে, ততই গভীর হবে সেক্স? নাকি যতই পুরান হবে ততই মধু? সুচিত্রা সেনের মতো হাসতে পারলে সে সানি লিওন হিসাবে আরো ডিজায়ারেবল হইতে পারবে? ইজ সেক্স অ্যা টাইম ট্রাভেলিং অফ পাবলিক ইমেজেস অ্যান্ড ফ্যাণ্টাসিস? এইটা শে নিতেই পারতেছিলো না।

শ্যুটিংয়ের সময় একদিন শে সবার সামনে চুন্নিলালরে সে বইলা বসে, আংকেল, সানি লিওনের মতো পোজ দেই। আঙ্কেল কয়, এই মাইয়া তো ক্রাক। কি না কি কয়, ইয়াবা খাইয়া আইছে শ্যুটিং করতে!

আসলেই তো, যে পাবলিক প্রাইভেট বুঝে না, ক্যামেরার পিছনের কথা যে ক্যামেরার সামনে কইতে চায় সে ইয়াবা খাইবো না তো কে খাইবো? বাংলাদেশের তরুণ ফিল্মমেকার’রা? কলকাতার সিনেমার সেক্স সিন দেখতে দেখতেই যাদের মাল আউট হয়া যায় আর যখনই খাড়ায় লাগাইবার লাইগা খালি রবীন্দ্রনাথের পুটকিই খুঁইজা বেড়ায়? নাউ শি ইজ বিকামিং ট্রু সানি লিওন ইন হার অউন টেক্সট।

এইসব সিমটম দেইখা বাড়ির লোকজন তারে গাজীপুর একটা রিহ্যাব সেন্টারে পাঠাইয়া দিছে। যে কিছুদিন এইসব থিকা বাইরে থাকুক, একটু ঠিক হইবো নে। ওইটা আরেকটা আজিব জায়গা। দুনিয়া ভরা শালা গে আর লেসবিয়ানে। এইগুলার ভিত্রে আর কয়দিন থাকা যায়। পাগল ঠিকাছে, কিন্তু শে তো আর এতো বড় পাগল না। ওয়ান উইক পরেই শে অইখান থিকা মাসুদ রানারে ফোন দেয়। বুড়া গার্ডরে একটা লিপকিসের বিনিময়ে এই ফোন কল শে অ্যাচিভ করছিলো। দুনিয়াতে সবকিছুই কতো চিপ! তাই না? তারপরও টাকা কামানোর ধান্দাতেই মানুষ তার লাইফের পুরা সময়টা শেষ করে। মাসুদ রানা তখন রাহাত খানরে দিয়া তারে এই শ্যুটিং স্পটে অ্যাসালাইম দিছে। ছোটখাট পার্ট তার এই সিনেমায়। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোজার আছে। আর মাসুদ রানা তো আজাইরা তারে এইখানে আইনা ফালায় নাই। কি কারণ? – সেইটা সোহানারে বলেই নাই, আর রমজানের তো কোন ধারণাই নাই। শালা মাসুদ রানা হইতেছে একটা ভিলেন! সোহানা ভাবে মাসুদ রানা’র কথা বলতে বলতেই।

এইদিকে, এইসব শুইনা রমজান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। নিমফোম্যানিয়াক সিনেমার বুইড়াটার কথা ভাবেন। কেন তারে নায়িকাটা খুন করে, শেষে! সেই পাজলসহ-ই উনি সোহানারে বলেন, “আমরা তো আসলে একটা পর্ণগ্রাফিক রিয়ালিতেই বাঁইচা থাকি। এইটা নিয়া বেশি টেনশন নিও না!” সোহানাও হাসে শুইনা, বলে, “ঠিক আছে, সমস্ত সম্পর্ক-ই যৌন, তাই বইলা শারীরিক হইতে হইবো, এইরকম তো কোন কথা নাই, কি বলেন?” বইলা একটা চোখ টিপ দেয়। ফাজিল মেয়ে কোথাকার! এরে সিম্প্যাথি দেখানোও আরেকটা পেইন!

রমজান তারে পারসোনাল রিলেশন থিকা সোশ্যাল রিয়ালিটি’তে নিয়া আসে। বাড়িতে যাইতে চায় না কেন সে? – এইটা জিগাইলে সোহানা বলে বাড়িতে কেউ তারে বুঝতে পারে না, টাইমও দেয় না। বাপ-মার একমাত্র মেয়ে শে। বাপ সারাদিন বিজনেস নিয়া পইড়া থাকে। তার খালি গরিব হয়া যাওয়ার ভয়। কোটি টাকার ব্যবসা, তার চাইতে বেশি ব্যাংক লোন। প্রতিদিন রাইতে দুইটা স্লিপিং পিল খাইয়াও ঘুমাতে পারে না। সারাদিন খালি নিজেরে নিয়া থাকে। আর আম্মা যে কি নিয়া টেনশন করবে সেইটাই ডিসাইড করতে পারে না; আগে জামাইরে নিয়া করতো; কিন্তু এখন যখন বয়স হইছে মেয়েরে নিয়া টেনশন করে। ছোট থিকাই করতো। পড়াশোনা, নাচ, গান কিছুই বাদ রাখে নাই। ও-লেভেলে পড়ার সময় সবকিছু ছাইড়া দিয়া ওর খালাতো ভাই হিমুর সাথে পালাইয়া যাইতে নিছিলো। বিশাল ক্র্যাশ খাইছিলো শে, হিমুভাইয়ের উপ্রে। হিমুভাই হইলো একটা জেনুইন কাপুরুষ। মুখে খালি বড় বড় পন্ডিতি আলাপ, এমনিতে চিরজীবনের সখা, কিন্তু যখনই প্রেম বা বিয়ার কথা আসে তখনই ফুট। কিশোরী বয়সে এইগুলা নিয়া ভাবা যাইতো বা যাঁরা বয়স বাড়লেও কিশোরী-ই থাইকা যাইতে চান, উনারা ফিট আছেন হিমু ভাইয়ের লাইগা। কিন্তু সোহানা মোর স্ট্রেইট, মোর প্রাকটিক্যাল। বিমানবাহিনীতে পরীক্ষা দিতে গেছিলো শে, ওইখান থিকা মেজর রাহাত ওরে পিক করছেন। এইসব অভিনয় বালছাল ওর ভাল্রাগে না। মাসুদ রানা শয়তানটা এই প্যাঁচটা লাগাইছে। সোহানারে সে এড়াইতে চায়। টানে ঠিকই, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না!

অথচ খিজিররে সে ঠিকই জড়াইয়া দিছে এই শ্যুটিং ইউনিটে। মাসুদ রানার জেলাসি টের পায় সোহানা। নিজে কিছু বলবে না, কিন্তু সোহানা যদি অন্য কারো সাথে একটু ইনটিমেট হওয়ার শুরু করে তাইলেই ফুলতে থাকবে। নিজে কখনো কথা বলবে না, কিন্তু সোহানা না বললে, এইটা তাঁর দোষ। এইরকম মাইয়া-মার্কা প্রেমিক সে আর জীবনে দেখে নাই। বাইরে থিকা তাঁর কঠিন ভাব দেইখা বোঝার কোন উপায় নাই যে একটা ফান্দে পড়া ইঁদুরের মতোই সে তড়পাইতেছে।

হুটহাট আসে, আর হুটহাট চইলা যায়। এখন যেইরকম আসছে আবার। সবকিছু ৫ মিনিটের মধ্যে সোহানারে বুঝাইয়া দেয় রানা। সোহানাও প্রফেশনালের মতো বুঝে সবকিছু। বুঝতে পারে ডু অ্যন্ড ডাই সিচুয়েশন। রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করতে হইতেছে তারে রাষ্ট্ররে না জানায়া। শত্রুর হাতে পড়লে তো মারা-ই যাবে শে। আর যদি পুলিশের হাতেও পড়ে, বাঁচয়া রাখবে না তারে। রানা’রে কিছু কথা কইতে চাইলো শে। ‘ডু উই হ্যাভ টাইম?’ সোহানা জিগায় রানারে। ‘কিছু কথা বলতে চাই আমি তোমারে।’ রানা যেন শুনেই নাই কিছু, কয়, ‘যাই গা আমি।’ আসলে রানা হয়তো যাইতে চায় নাই। সোহনাও চায় নাই রানারে ধইরা রাখতে। রানা সবসময় চইলাই যাইতে থাকে…

এইরকম ক্রুশিয়াল সাইলেন্সের মোমেন্টে আইসা খিজির তব্দা খায়া যায়। কি কইবো সে? চইলা যাইবো নাকি? নাকি আসছে বইলা থাইকাই যাইবো। খিজির’রে সামনে রাইখাই রানা চইলা যায়। একবার তাকায়ও না ওর দিকে। সোহানার মুখে দিকে তাকায়া খিজির বুঝতে পারে, মামলা বেশ সিরিয়াস।

সিচুয়েশনটারে হাল্কা করার লাইগে সোহানারে জিগায়, ‘ম্যাডাম ফুলি! কিছু লাগবো আপনার?’

সোহানাও ফস কইরা বইলা বসে, “হ, এখন তোমারেই আমি চাই!” বইলাই বুঝে ভুল কইরা ফেলছে শে। যেই চাতুরি রানার লগে করতে চাইছিল সেই চাতুরি সে খিজিরের সাথে কইরা ফেলছে। এইরকম মিসটেক হইতেই পারে। কিন্তু তীর যখন একবার বাইর হয়া গেছে ছিল্যা থিকা তারে ত আর ফিরানো যাইবো না।

খিজির ভিত্রে ভিত্রে পুরা লাফাইতে থাকে, পুরা টু এক্স বাল। অর জিহ্বা ঝুইলা পড়ে। ডিসিশান নিতে পারে না আর, কেমনে আগাবে!

এই কনফিউশনটা পুরা ক্যাপিটালাইজ করে সোহানা, ফর্মে ফিরা আসে, স্ট্রাইক করে। কয়, “শুয়োরের বাচ্চা, তরে এইখানে আনছি কি খাড়ায়া খাড়ায় ধোন হাতানোর লাইগা, যা দেখ গিয়া দেবদাস আর লাবণ্য কি করে…”

খিজির তখন বুঝতে পারে, রিয়েল প্রলেতারিয়েত আসলে কতোটা গরিব।

কিন্তু মধ্যবিত্ত হইতে চায়া রানা-ই বা কি পাইলো? সোহানা ভাবে। ক্যাপিটালিজমের টাইমে যেমন জমিদার’রা মরছিলো, মিডল-ক্লাস লিবারাল হওয়ার চাইতে বিপ্লবী কমিউনিস্ট হইয়া বাঁচছিলো, রানার মতো মিডল-ক্লাস কি সাইলেন্ট মোরালিস্ট হয়া বাঁইচা থাকতে পারবে, এই টেকনোলজির টাইমে? কোনকিছু না কইয়াই চইলা গেছে সে। সোহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শে জানে, রানা ফিরা ফিরা অর কাছেই আসতে চায়, কিন্তু পারে না আসলে। সোহানা যাইতে পারে অনেকের কাছেই, কিন্তু রানার সেই মোরাল ক্যাপাবিলিটি নাই। রানার না-পারা’র ফ্রয়েডীয় সিক্রেট’টা ও আর মেজর রাহাত খান ছাড়া আর কেউ জানে না।

রানার যখন তিনবছর বয়স তখন ওর মা আরেকজনের সাথে ভাইগা যায়। রানার বাপ সেই ‘শোক’ সামাইলতে না পাইরা কয়দিন পরে সুইসাইড করে। রানা মানুষ হয় ওর নানীর কাছে। ওর নানী ছিল খুবই শক্ত মহিলা। রানা’র মা ওরে নিয়া যাইতে চাইছে কিন্তু নানী নিতে দেন নাই। বলছেন, ‘তুমি তোমার সুখের সংসার নিয়া থাকো!’ নতুন সংসারে সুখী-ই  ছিলেন বেগম রোকেয়া। কিন্তু সেকেন্ড বিয়ার চার-পাঁচবছর পরে কক্সবাজার থিকা চিটাগাং আসার পথে রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা যান উনি।… ফ্যামিলি জায়গাটা জাস্ট রানার মধ্যে নাই। কেউ ইনটিমেট হইতে চাইলেই সে ডরায়।

সোহানা ভাবে, মা হইতে পারে শে রানার, কিন্তু নানী কেমনে হবে! আর এই মা’র জায়গাটাই ভাবতে পারে না রানা। একটা অডিপাস কমপ্লেক্সের ভিতর খাবি খাইতে থাকে। রানার ইগোটাই হইয়া থাকে আসল রানা। সোহানা টাইনাও তারে বাইর করতে পারে না।

অনেক ভাইবা-চিন্তা সে রানা’রে চিঠি’টা লিখলো –

রানা,

[তুই মর শুয়োরের বাচ্চা]
তুমি মরো;
আমার প্রতারণাগুলি
আমি তারপরও করবো
তোমার লগেই।

ইতি,
সোহানা।

তারপরে ছিঁড়া ফালায়া দিলো। কাগজের টুকরাগুলি বৃষ্টির পানিতে ভিইজা কুঁচকাইয়া যাইতেছিলো। সোহানা তাকায়া রইলো। রানা আর সোহানা জড়াজড়ি কইরা শুইয়া আছে যেন ওই কাগজের টুকরাগুলাতে। এইরকম মায়া নিয়া চোখে তাকায়া থাকলো শে। মিসাইলেরর মতো বৃষ্টির ফোঁটায় ছিঁইড়া-খুঁইড়া যাইতেছে অরা, মিইশা যাইতেছে সবুজ দুর্বাঘাসে।…

…………………..

শেষের কবিতা টু’র শ্যুটিং আবারো শুরু হইতে যাইতেছে। অমিত আর লাবণ্যরে রেডি হইতে বললেন রমজান। কিন্তু একটা মাঝবয়েসী হ্যান্ডসাম লোক লাবণ্য’র পাশের চেয়ারে বইসা আছে। লোকটারে চিনতে পারেন না উনি। লাবণ্যরে জিগাইলে বললো যে, আমার ফ্রেন্ড, দেবদাস চ্যার্টাজী। তারপর হাসে। বোঝা যায় আসলে ফ্রেন্ডের চাইতে একটু বেশি-ই, হয়তো বয়ফ্রেন্ড। কিন্তু তাঁর বয়ফ্রেন্ডের এইখানে কি বিজনেস?

 

৬.০ বিজনেসের কালার লাল

রেভিউলেশন হইলো মূল বিজনেস। মিডিয়া বলেন আর মুদির ব্যবসাই বলেন রেভিউলেশনের ফিলিংস দিয়াই অপারেট করে।

বিজনেস করতে গেলে নানান রকমের পুঁজি লাগে। খালি টাকা-পয়সাই সবকিছু না। মজিদ এইটা জানে। আইডিয়াও একটা পুঁজি, শিক্ষা-দীক্ষা তো তারচে বড় পুঁজি। কিন্তু গরিবের পুঁজি হইলো তার সততা। ধনী মানুষের, যাদের টাকা পয়সা আছে, তাদের সততা না থাকলেও চলে, উনারা এইটা ম্যানেজ কইরা নিতে পারেন। কিন্তু যে গরিব, সে ভাবে যে এই সততা দিয়াই টাকা-পয়সা কামাই কইরা ফেলবে সে। এই চিন্তার কারণেই গরিব আসলে গরিব, যেহেতু সে গরিব, সে ভাবে যে সে আর চিন্তা করতে পারে না। মজিদ গরিব ছিলো, কিন্তু সে গরিবের মতো ভাবে নাই। সে নিজেরে দেখাইছে গরিব, কিন্তু ভাবছে ধনী মানুষদের মতোই। নোয়াখালীর এতিমখানা মাদ্রাসাতে পড়াশোনা শেষ কইরাই সে ঢাকায় চইলা আসছে। পড়াশোনা শেষ করার লাইগা তারে বিয়াও করা লাগছে।

বড় বউরে নিয়া তার সমস্যা নাই। মাটির মানুশ শে। কিন্তু জমিলা হইলো একটা মাগি। তাও হইলো খিজিরের ভাড়া করা মাগি। ভাড়া খাটা মাগির সাথে তো আমি প্রেম করবো না – মজিদ ভাবছিল এইরকম। যখন জমিলা একদিন তারে কইলো যে, বিয়া করেন আমারে! জমিলার এই উদারতায় দিশা হারায়া ফেলে মজিদ। তার একটা বউ থাকার পরেও তারে বিয়া করতে চায় জমিলা! মজিদ তখন বুঝতে পারে নাই। সে সবসময় দুই তিনটা ভাতার রাখতে চায়। অবশ্য সব ভাতারের কাছ থিকা ভাত চায় না শে। একটা মাইয়া মাইনষের যে ডিজায়ার সেইটার কাছে যে কোন মরদই বাচ্চা আসলে; খুববেশি হইলে বুকের দুধ খাওয়ার সময় একটা কামড়ই দিতে পারে; তাও দাঁত না উঠা মাড়ি দিয়া। পুরুষ হিসাবে এইটা আমাদেরকে মাইনা নিতে হবে যে, মেয়েদের বানানো হইছে পুরুষের বুকের সবচে বাঁকা হাড়’টা দিয়া, আর সেই বাঁকা হাড়’টারে কোনদিন-ই সোজা করার কথা ভাবা যাবে না, তাইলে শে ভাইঙ্গা যাবে, নারী-ই থাকতে পারবে না; এই কারণে সেই বাঁকা’র সাথে, ছল-চাতুরির সাথে মিইলা-মিইশা থাকতে হবে।… জমিলারে সে বিয়া করছে বড় বউয়ের পারমিশন নিয়াই, কিন্তু আলাদা রাখছে; যত পারমিশনই থাকুক, দুই সতীনের এক ঘর রাখা ঠিক না। আর খিজির তো তার ফ্রেন্ড। মাদ্রাসায় এক সাথে পড়তো। লেখাপড়া শেষ না কইরাই খিজির পালাইয়া আসছিল। এইসব নিয়া আর মাথা ঘামায় না মজিদ। তার কাম হইতেছে বিজনেস।…

জমিলার কেইসটাও ইন্টারেস্টিং । একদিন খিজির তারে কয়, মজিদ যে তোরে ইউজ করতেছে এইটা তুই বুঝিস না! এইকথা শোনার পরে শে বুঝতে পারে যে, মজিদেরই তার বিয়া করা লাগবো। কারণ একমাত্র সে-ই তারে ইউজ করতে রাজি আছে। আর মজিদ যেহেতু তারে ইউজ করবে, শেও মজিদ’রে ইউজ করার ভিতর দিয়া তার নিজের ফ্রিডমের একটা স্পেইস পাইতে পারবে। খিজিরের মতো এইরকম কঠিন প্রেমিকরে তার না চুদলেও চলবো। যার নিজের ইউজ করার সামর্থ্য নাই, খুববেশি হইলে হোসেন আলী’র ঘরে তারে পৌঁছাইয়া দিতে পারবো। এইটা শে এমনিতেই যাইতে পারে। কিন্তু কেন যাবে! শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা না পইড়াও এইরকম শে তো ভাবতেই পারে তো!…

আগের ঘরের দুইটা ছেলে আছে মজিদের। ওরা বনশ্রীতে থাকে। আইডিয়াল স্কুলে পড়ে, ইংলিশ ভার্সনে। মসজিদের চিফ ইমাম সে; শুক্রবারে জুম্মার নামাজ পড়ায় আর রোজার সময় খতমে তারাবী। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সামনে দোকান। দুইজন লোক কাজ করে। আগের মতন নানান জায়গায় ওয়াজ করতে গিয়া সময় নষ্ট করে না আর, টাকা আছে, সম্মানও, কিন্তু সে এই দুইদিনের দুনিয়ায় এইগুলা দিয়া কি করবে সে; বরং ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারগুলাতে পেপার পড়তে যাওয়াটা বেটার। যা করছে সে সবই নিজের চেষ্টায়। বিজনেসটাই দাঁড়া করাইতে পারতেছেন না এখনো পুরাপুরি।

সূত্রাপুরের বাসাটাতে জমিলা থাকে নিজের মতন। মাঝে মধ্যে কাজ না থাকলে মজিদ দুপুরেই চইলা যায়। বেশিরভাগ সময় এখন জমিলার লগেই থাকে। কিন্তু যেইদিন ঘটনাটা ঘটলো, কর্মচারীদেরকে ছুটি দিয়া অনেকক্ষণ দোকানে বইসা থাকলো সে। এইরকমও সম্ভব! নিজের উপর ঘেণ্না ধইরা গেলো তার। মনে হইলো এখনই আফগানিস্তানে চইলা যাই, পাকিস্তান হইয়া। এই বর্বরদের দেশে কেমনে থাকে মানুষ! যারা মানুষরে মানুষই মনে করে না; মনে করে দাড়িওলা ছাগল। আরে বেটা দেখ গিয়া, বিদেশে কোন ইয়াং পোলাপাইন পাইবি নাকি দাড়ি ছাড়া! অনেক কষ্টে নিজেরে ঠেইলা নিয়া বাসায় আসে মজিদ।

******************

ছিঁড়া শাদা পাঞ্জাবি আর পিঠে রক্তের দাগ নিয়া দুইহাত টেবিলে রাইখা প্লাস্টিকের চেয়ারটাতে বইসা আছে মজিদ। টেবিলে রাখা ছোট আয়নার দিকে তাকায়া আছে। আয়নাতে নিজেরেই দেখা যায়, কিন্তু মজিদ নিজেরে দেখতেছে না। আসলে সে কিছুই দেখতেছে না, নিজের ভাবনাটারেই ভিজিবল করতে চাইতেছে সে আয়নার ভিতরে। একটা সময় না পাইরা উইঠা পড়ে সে। বাথরুমে যায়। ফিরা আসে কাঁচি, রেজার, ব্লেড এইসবকিছু হাতে নিয়া। টেবিলে রাইখা আয়নার দিকে তাকায়া থাকে আবার। তার চোখ দিয়া পানি নামতে থাকে। কোন আওয়াজ বাইর হয় না। এইসময় ঘরে ঢুকে জমিলা। মজিদের পিঠের দিকে তাকায়া সে চিৎকার দিয়া উঠে – ‘কি হইছে আপনার!’ উত্তরের লাইগা সে আর অপেক্ষা করে না। বাথরুমে গিয়া মগে পানি ঢালে, ডেটল মেশায়, আলমিরা থিকা তুলা, স্যাভলন বাইর করে। তারপরে মজিদের কাছে গিয়া বলে, “পাঞ্জাবিটা খুলেন…” বইলা নিজেই খুইলা দিতে থাকে আর রাগে গজগজ কইরা কথা কইতে থাকে, “কে কইছে আপনারে হেফাজতের মিছিলে যাইতে, এইসব ঝামেলার মধ্যে! নিজে বাঁচলে বাপের নাম, আর নিজের তো সাহস নাই একফোঁটা, উল্টা মাইর খায়া আসছেন… এইগুলা আমি না থাকলে দেখবো কে…” এইসব হাবিজাবি বলতে থাকে। জমিলা সবসময়ই ভোকাল। রাতে বিছনায় আদর করার সময়ও এমনে চিল্লায় যে মজিদেরই শরম লাগে, মনেহয় দুই তিন ঘরের মানুষ শুনতে পায়। কিন্তু জমিলার এইগুলা নিয়া কোন শরম নাই। জমিলার আদরটা সে টের পায়, এইজন্য কিছু কইতে পারে না।

পিঠের রক্ত ঘাম মুইছা স্যাভলন ক্রিম লাগাইয়া দেয়ার পরে জমিলা কাঁচি আর রেজার দেখতে পায় টেবিলে, বলে, “এইগুলা এইখানে ক্যান!” তখন সে মজিদের মুখের দিকে তাকায় আর বুঝতে পারে তার পেইনটা। মজিদ যে এতোক্ষণ কোন কথা বলে নাই এইটা সে খেয়ালই করে নাই। মজিদের চোখের দিকে তাকায়া জমিলা তারে জড়াইয়া ধরে। মজিদের মাথাটা তার বুকে রাখে আর মাথার চুলে চুমা দিতে থাকে। এই আদর পাইয়া মজিদের কান্দা বাইর হয়া আসে। নিজেরে আর সে আটকাইতে পারে না। মজিদ গোঙাইয়া গোঙাইয়া বলতে থাকে, “এই দাড়ি আমি কাইটা ফেলবো বউ!” জমিলা তখন তারে আরো জোরে জড়াইয়া ধরে, যেন কোন ছোট বাচ্চারে বুঝাইতেছে এইরকমভাবে বলে, “দেখবেন, আমাদের পোলা-মাইয়া’রা সাচ্চা মুসলমান হইবো!” মজিদ তখন আরো কান্দতে থাকে; বলে, “তারে তুমি মুসলমান বানাইও না, মানুষ বানাইও, বাঙালি বানাইও, মুসলমান বানাইও না…”।

যেন মজিদ মইরা গেছে, সে আর বাঁইচা নাই। যতোটা না শরীরের ব্যথা তারচে এইরকম অপমান তারে মাইরা ফেলছে। পুরুষের গ্লানি খুবই মারাত্মক জিনিস, নিজের দিকে আর তাকানো যায় না, নিজেরে মনেহয় কুত্তা বিলাই। নিজের শরীরটারেই মজিদ আর ফিল করতে পারতেছে না, জমিলা বুঝতে পারে। তখন সে হাইসা ফেলে। কয়, “আমি একলা একলা কেমনে বানামু, বানাইবেন তো আপনি, আমি তারে যতন কইরা রাখমু, পাইলা দিমু…” এইসব কথা কয় শে। তারপরে কাঁচিটা নিয়া মজিদের দাড়িগুলা ছাইটা দিতে থাকে। একটু জায়গা কাঁচি দিয়া ছাইটা ফেলে, তারপরে হাত দিয়া পরিষ্কার করে আর চুমা খায়।

একটা সময় পরে শে মজিদরে নিয়া খাটের দিকে চইলা যায়। মজিদের শরীরও জাগতে থাকে তখন। জমিলারে সে এইরকম কইরা অনেকদিন ভালোবাসে নাই। তার এতোটাই ভাল্লাগে যে সে অনেকক্ষণ শুয়া থাকে জমিলার উপরে। আর জমিলা তার পিঠের ব্যথার জায়গাগুলাতে হাত বুলাইয়া দিতে থাকে। জমিলারও ভাল্লাগে; অনেককিছুই ভাবতে থাকে সে। আর ভাবতে ভাবতে তার মুখে হালকা হাসি চইলা আসে, মজিদ দেখে না সেইটা। জমিলার উপরে শুইয়া ওর ঘাড়ে মাথা গুঁইজা রইছে বইলা।

জমিলা তখন মজিদ’রে বলে, “আপনারে দাড়ি কাটতে দেই নাই কেন জানেন?” মজিদ বুঝতে পারে না, এইটা জিগানোর কি হইলো, ভালোবাসে বইলাই দেয় নাই; তারপরও জিগায়, “ক্যান?” জমিলা হাসতে হাসতেই বলে, “চাপদাড়ি’তে আপনারে পুরা এমরান হাশমি’র মতো লাগে, ওই যে হিন্দি সিনেমার নায়কটা, নায়িকা পাইলেই যে খালি চুম্মায়…” বইলা হো হো কইরা হাসতে থাকে। মজিদ তার শরীরের উপর বইলা মজিদের শরীরটাও কাঁপতে থাকে একটু, জমিলার পেটের ঢেউয়ে। মজিদের বুঝতে একটু টাইম লাগে; প্রথমে খেইপা যাইতে নিছিলো সে, পরে চাতুরিটা বুঝতে পারে সে। জমিলারে আরো জোরে জড়াইয়া ধরে সে, কয়, “খাড়াও, তোমার হিন্দি সিনামার নায়করে দেখাইতেছি আমি…” মজিদের শরীর জাইগা উঠে আবার। জমিলারে চুম্মাইতে থাকে ইচ্ছা মতন। জমিলারও যে কি ভালো লাগে। তার শরীর জাইগা উঠতে থাকে; কয়, “আসেন, আমরা আরো কয়েকটা ইহুদি মারি!”

 

The following two tabs change content below.
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য