Main menu

ফিকশন: মেমোন্তো মরি (Memento mori) – ৫

কিস্তি ১।। কিস্তি ২ ।। কিস্তি ৩ ।। কিস্তি ৪ ।।

 

৭.০ থ্রি মার্স্কেটিয়ার

ইহুদিরা তখন মুসলমানদের মারতেছিলো প্যালেস্টাইনে, গাজা উপত্যকায়। আর এর লাইগা নিউইয়র্কে মিছিল করতেছিলো কয়েক হাজার মানুষ – কালা, ধলা, মিশ্রবর্ণের এশীয়, আরো অনেকে; সবাই আমরা মানুষ; মানুষ মারার এগেনেইস্টে আছি। কিশোর, মুসা আর রবিনও সেইখানে, মানুষদের সাথে। কিন্তু ওরা মুসলমানও, এই কারণে কিছুটা পাজলড। বাঙালি আইডেন্টিটি’র চাইতে মুসলমান তো মোর গ্লোবাল। কিন্তু খোকাভাই আবার কি যে বোঝায় ওরা ক্লিয়ার হইতে পারে না। উনি শাহবাগের পক্ষে, যদিও হেফাজতরে গালিগালাজ করেন না, কিন্তু প্রি-মর্ডান একটা ফোর্স বইলা এক্সপ্লেইন করেন আর বলেন প্রি-মর্ডান বইলা এইটারে মর্ডানিটি’র বিপক্ষে দাঁড়া করাইও না; তাইলে সেইটা মর্ডানিটিরই একটা তর্ক হইবো। কিশোরও পুরাটা বুঝতে পারে না, কনফিউজড থাকে; এইজন্য খোকাভাই’রে হেল্প করতে চায় তারা। কারণ আর যা-ই হোক, মানুষ হিসাবে উনি ভালো। আর যেহেতু উনি ভালো মানুষ উনি তো কোন খারাপ কাজ করতে পারেন না। ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটগুলা হ্যাক করতে গিয়া খোকা ভাইয়ের সাথে পরিচয় হইছিলো। আর খোকা ভাই-ই দেখাইলো যে, বাঁশের কেল্লার একটা বড় ফান্ড আসে বিজেপি’র কাছ থিকা, মিডলইস্ট থিকাও আসে। সব শালা ডাবল এজেন্ট!

এই মিছিলের শেষ কইরাই ওদেরকে গ্যারাজে ঢুকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হোক আর ইসলামের পক্ষেরই হোক সবগুলা সাইট আজকের রাতের জন্য ডাউন করতে হবে। তিনজনরেই থাকতে হবে। মুসা তো নাচতে নাচতে রাজি। রবিন একটু কাচুঁমাচু করতেছিলো। পরে জানা গেলো, নতুন স্কাইপ-ফ্রেন্ড হইছে ওর, ওই মাইয়ার আওয়াজ না শুনলে নাকি ঘুমাইতে পারে না; মানে, সারারাত ঘুমায়ই না আর কি। ওরে আলাদা রুম দেয়ার কনফার্মশেন দেয়ার পরেই রাজি হইলো আর কন্ডিশন হইলো মুসারে বলা যাবে না। মুসার কোন গার্লফ্রেন্ড নাই। বেচারা কষ্টেই আছে। এই ইনফর্মেশন জানলে মুসা কথা বলার লাইগা পীড়াপীড়ি করবে আর রবিন না করতে পারবে না; আর ও তো মুসার মতো এগ্রিসিভ না; সে খালি সারাজীবন আপুটার সাথে কথা-ই বলতে চায়। অদের এইসব ফিলিংস কিশোরের কাছে অনেক দূরের জিনিস মনেহয়। মনেহয় বড় হয়া সে হয়তো মাসুদ রানা-ই হবে। হয়তো সে মাসুদ রানা’র মতো চুম্বক হবে না; টানবেও না। টানাটানি ভাল্লাগে না। একলা থাকতে চায় সে। খোকাভাইয়ের মতো। লোনলি; বাট নট  লুজার।

#

লাস্ট মোমেন্টে এমন একটা প্যাঁচে পড়লো যে, কেউই ছুটাইতে পারতেছে না। তখন কিশোরের মনে পড়লো জিনা’র কথা। এই জিনিস জিনা ছাড়া আর কেউ পারবো না।

জিনার মা বাংলাদেশ থিকা আসছিলো জিনা’র বাপের সাথে তার ফোনে বিয়া হইছিলো। কিন্তু ৩ বছরের মধ্যেই উনাদের ডির্ভোস হয়া যায়। জিনার মা খুব বিপদে পড়ছিলো, তার জামাইয়ের ফ্যামিলি তারে দেখে নাই।  তখন তার সপুারস্টোরের ম্যানেজার জন তারে বিয়া করে। জন ছিল নিগ্রো…

কিশোর ওরে দলে নিতে চায় না। কিন্তু কিছু জিনিস আছে যেইটা জিনাই জানে। আর জিনাও জানে যে শে জানে। এই কারণে ওর কোন টেনশন নাই। শে জানে, শি ইজ পার্ট অফ দ্য গেইম।

কিশোর মুসারে কইলো জিনারে ফোন দেয়ার লাইগা। মুসা অবাক হয়া তাকাইলো। ‘ফোন ধরবো আমার?’ কিশোর রাগী চোখে তাকাইলো মুসার দিকে। মুসা একবারের জায়াগায় দুইবার ট্রাই করলো। প্রায় এক মিনিট ধইরা রিঙ্গার বাজলো, কিন্তু কলটা কেউ রিসিভ করলো না। মুসা তাকাইলো কিশোরের দিকে। কিশোর বুঝলো আর কোন উপায় নাই। নিজের মোবাইল হাতে নিয়া জিনারে ফোন দিলো। এইটা যে পারসোনাল কোন জিনিস না সেই সাহস দেখানোর লাইগা স্পিকারে রাখলো ফোনটা।

একটা রিং বাজতে না বাজতেই জিনা আদুরে গলায় বইলা উঠলো, ‘হেলাউ! বস কেমন আছেন?’

কিশোর কোন ইন্ট্রো না দিয়াই কমান্ড করলো। ‘জিনা, আপনারে গ্যারাজে আসতে হবে।’

জিনা জাস্ট এই ডাকটার লাইগাই ওয়েট করতেছিলো, কিন্তু প্যাঁচাইতে লাগলো কিশোররে। ‘এখনই বস? এতো রাতে! একলাই আসবো? কেন বস?’

‘আই নিড ইউ।’ বলার পরেই বুঝলো কিশোর, কি ধরাটা সে খাইছে।

‘এই কথাটা বলতে এতোদিন লাগলো আপনার! সন্ধ্যায় বললেই পারতেন। এতো রাতে মেকাপ কেমনে নিবো?’ জিনা সমানে হাসতে থাকে।

‘দশ মিনিটের মধ্যে আসেন আপনি। আমি ঘড়ি দেখতেছি।’ বইলা ফোনটা কাইটা দেয় কিশোর। মেজাজটাই পুরা খ্রাপ হয়া গেলো।

এতোক্ষণ হাসি ধইরা রাখছিল মুসা। ফোনটা রাখার পরে গড়াগড়ি দিয়া হাসতে লাগলো। রবিন পর্যন্ত পাশের রুম থিকা বইলা উঠলো, ‘থাম ব্যাটা!’ রবিন তো আর শুনে নাই কথাগুলা। সকালে রসাইয়া রসাইয়া বলতে হবে রবিনরে। মুসা ভাবলো।

নয় মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ডের মাথায় জিনা আইসা পৌঁছাইলো। খুবই সিরিয়াস শে। তাঁর ল্যাপটপে বইসা কাজগুলি বুইঝা নিলো কিশোরের কাছ থিকা। চেহারা দেইখা বুঝার উপায় নাই এই মাইয়া কি ফাইজলামিটা করছে।

সবকিছু শেষ হওয়ার পরে খোকা ভাই-ই মেসেজ পাঠাইলো ভাইবারে, কিশোররে – ‘ওয়েল ডান, বয়েস!’ কিশোর জিনার দিকে তাকায়া মনে মনে কইলো, ‘অ্যান্ড দ্য গার্ল…’। মুখ হা কইরা জিনা ঘুমাইতেছিল তখন। লালা পড়তেছিল ঠোঁটের কিনার দিয়া। নাক ডাকতেছিল। ঘর্‌ঘর্‌রররর…। কিশোরেরও ঘুম পাইলো তখন।

৮.০ খিজির লাইভ ইন শাহবাগ

শাহবাগের ঝিম মারানি ঘুম ভাঙায়া দিলো খিজির।

নাটকের জায়গা তো এইটা এখন।

বাস থিকা নাইমাই একটা দৌড় দিলো। দুই তিনটা রিকশা উল্টাইয়া দিয়া পাবলিক লাইব্রেরি’র সামনের জায়গাটাতে গিয়া খাড়ায়। চিৎকার কইরা নিজের নামেই শ্লোগান দেয়া শুরু করে:

যেই খিজির জনতার, সেই খিজির মরে নাই

যেই খিজির সাব-অর্ল্টানের, সেই খিজির মরে নাই

যেই খিজির মরে নাই, সেই খিজির সাব-অর্ল্টানের

যেই খিজির মরে নাই, সেই খিজির কালচার ষ্টাডিজের

যেই খিজির মরে নাই, সেই খিজির ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া ষ্টাডিজের

সেই খিজির চুদুরবুদুর, যেই খিজির মরে নাই

যেই খিজির মাসুদ রানার, সেই খিজির হিমু ভাইয়ের…

শালা খাইছে! রানা তাঁর ট্যাবে লাইভ দেখতে পায় খিজির’রে। খিজির ত পুরা ফর্মে। কন্টিনিউ করতেছে উইথাউট এনি পজ –

যেই খিজির গণ জাগরণের, সেই খিজির হেফাজতের

যেই খিজির মতিঝিলের, সেই্ খিজির পুরান ঢাকার, আইছে অহন শাহবাগে

যেই খিজির প্যাকেজ নাটকের, সেই খিজির টক শো’র

যেই খিজির বিজ্ঞাপণের, সেই খিজির সিনেমার

যেই খিজির নতুন ফিল্মের, সেই খিজির এফডিসি’র

যেই খিজির মৌসুমি’র, সেই খিজির ময়ূরী’র

যেই খিজির শাবনূরের, সেই খিজির মুনমুনের

নুরুল আলম আতিকের মতো দাড়ি-মুখের একজন বইলা ওঠেন, জয়া’র নামও নিতে হবে। ফারুকী চেহারা’র একজন বলেন, কেন তিশা কি দোষ করছে? অমিতাভ রেজা’র মতো ভারী গ্লাসের চশমা-পড়া একজন ভাবলেন, আমি তাইলে কার নাম নিবো? মানে, এটলিস্ট একটা সিনেমা ত আমার নায়িকারা করতে পারতো! সিনেমার নায়িকাদের পর্ব শেষ কইরা খিজির পলিটিক্সে ঢুইকা পড়ছে তখন। আর এর মধ্যে পাবলিকরাও বুঝতে পারে যে, সিনেমার নায়িকারাই আসলে সত্যিকারের নায়িকা!

যেই খিজির মদিনার, সেই খিজির আর্যদের, অনার্যদের পুটকি মারে

ব্যথা পাইলে কুতকুত খেলে, কবিতা লেখে, তর্ক করে

খিজির ভাইয়ের বেদনা, সর্বজনে বোঝে না

ওগো মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ, ধষর্ণকারীরা আইতাছে

জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রলীগ জেগেছে

যেই খিজির মার্ক্সবাদী, সেই খিজির ইসলামী

রবীন্দ্রনাথরে ফ্ল্যাশ কইরা কয় চুইদালাইসিরে চুইদালাইসি

যেই খিজির হাগে না, সেই খিজির নজরুল ইসলাম

চলো গিয়া মদ খাই জসীমউদ্দিনের-বারে,

সায়েন্স-ল্যাবের মাজারে

খালি হাতে কেউ ফিরে না

যাদুঘরের সামনে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-পড়া তরুণ কবি’রা তখন তারে নোটিস করতে শুরু করছে। হায় হায়! রেভিউলেশন ত টিভি ফাইট্টা বাইর হয়া আসছে। তারাও দৌড়ায়া গিয়া খিজির পাশে গিয়া চিৎকার করতে শুরু করে। ফেসবুকের নিউজ ফিড সয়লাব হয়া যায়। খিজির লাইভ ইন শাহবাগ! টিভি’র পুরা স্ক্রীণে এই ছবি স্ট্রিমিং হওয়ার পরেও স্ক্রলে এই বাক্য বাংলা হরফে দেখা যায়।

যেই খিজির ব্লগারের, সেই খিজির মাদ্রাসার

যেই খিজির লালনের, সেই খিজির লাদেনের

যেই খিজির ওয়েষ্টার্ণ, সেই খিজির ইন্ডিয়ার

দুনিয়ার ঠাকুরেরা এক হও লড়াই করো

দুনিয়ার জীবনানন্দ এক হও লড়াই করো

একটা দুইটা লিবারাল ধরো, সকাল বিকাল জবাই করো

পুতুপুতু উপন্যাস লেখো, মানিক বন্দোপাধ্যায়রে ধইরা আনো

লিটলম্যাগ করি না, দৈনিকেও লিখি না

ফেসবুকের চামড়া তুলে নিবো আমরা

ঠুগঠুগি বাজাবো, ডলার-পাউন্ড কামাবো

তিরষ্কারই পুরষ্কার, পুরষ্কারে পুংসার

জয় হো ভাই জয় হো

খিজির ভাইয়ের জয় হো

ডোরেমন দেখবো না হিন্দি কথা বলবো না

এপার বাংলা ওপার বাংলা, আলাদা আলাদা

একই মা’র দুই পুত, আছে অহন দৌড়ের উপ্রে

ভাষা গেলো ভাইঙ্গা কবি দিলো কাইন্দা

যেই ডালটাতে পা রাখলো রানা, সেইটাও ভাইঙ্গা যাইতে নিলো। কি সব বলতেছে খিজির আর মানুষজনও মাতালের মতো হাততালি দিতেছে। পাঁচ-ছয়টা টিভি’র মাইক্রোফোন এখন তার সামনে।

ততক্ষণে রানার কাজ শেষ। বটগাছের মাথায় ট্রান্সফর্মারে পিট পিট কইরা পুটকিতে আলো নিয়া একটা জোনাক পোকা জ্বলতেছে তখন। দুপুরবেলায়।

 

৯.০ রিয়ালিটি হাঁইটা যায়, কনশাসনেস ফাইট্টা যায়… 

জ্বলজ্বল করতেছিলো সন্ধ্যার লাইটগুলি তারার মতো, শাহবাগে। খিজিরের এই ঘটনার পরে ২৪ ঘন্টার পাহারা বসাইছে র‌্যাব।

শালার রাজাকারে পুরা দেশ ভইরা গেছে। এর লাইগাই কি আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করছিলাম! মেজর বনহুরের প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হইলেই এই কথাটা মনে হয়। মানে, উনি তো আর মুক্তিযুদ্ধ করেন নাই, কিন্তু উনার ইমিডিয়েট আগের প্রজন্মই তো কইরা গেছে। আগের প্রজন্ম মানে তার বাপ; মেজাজ খারাপ হইলেই তার মা’রে পিটাইতো, কিন্তু যুদ্ধের সময় জীবন বাজি রাইখা গ্রেনেড ছুঁড়ছে; ওই একসাইটেমেন্টের লাইগাই পুতেরে মিলাটারিতে ঢুকাইছে। বুঝছে যে, সিলিভিয়ানদের কোন লাইফ নাই। তারপরও কি রকম একটা ধরা খাওয়াইলো শালার সিভিলিয়ান হলুদ পাঞ্জাবিওলা। শুয়োরের বাচ্চা পাঞ্জাবি পরে! ডেফিনেটলি পাকিস্তানের দালাল। মিডলইস্ট দুবাই গিয়া ঘুইরা আসে দুই তিনমাস পরে পরে। আর বাল আমাদের এখনো পইড়া থাকতে হইতেছে বাংলাদেশে, প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যাম ফেইস করতে হইতেছে। কোন ডাটাবেইজই নাই। আজকে যদি এফবিআই’তে জব করতাম, এই ধরা তো তাঁর খাওয়া লাগতো না! তখনই আরো মেজাজ খারাপ হয় মেজর বনহুরের, শালার এর লাইগাই কি আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করছিলাম!

মেজর বনহুর গেছিলেন পুরান ঢাকায়। উনার চাওয়া-পাওয়া তো সামান্য। একটা গ্রীণ ফ্ল্যাট-ই উনি চান। বউ তার টবে টবে ফুলের চাষ করবো। সারা বাড়ি লতায় পাতায় ভইরা থাকবো। নির্জন গ্রাম থাকবো তার একটা, এই শহরে। কিন্তু এর লাইগা এতদিন কেন তারে ওয়েট করা লাগবো? কত সম্বন্ধী’র পুতে কতো কি করে, তার খালি একটা গ্রীণ ফ্ল্যাট, সেইটাও হইতে হইতে গিয়া হয় না।…

তখন উনার মনে হইলো যে একটু ইউনির্ভাসিটি দিয়াই ঘুইরা যাই। একসময় যখন কণ্ঠশীলনে আবৃত্তি শিখতে আসতেন; সিটি কলেজে পড়ার সময়, সেই দিনগুলির কথা মনে হইলো তাঁর। শহরের স্মার্ট মেয়েদের তো আর বিয়া করা হইলো না; এমন না যে উনি চাইলে বিয়া করতে পারতেন না, কিন্তু শেষে মনে হইলো বউ হিসাবে মফস্বলের সুন্দরীরাই বেটার। ফিফটি পারসেইনটেইজের বেশি দিতে হয় না নিজেরে। তারপরও আর্বান বিউটিদের ফ্রিডম দেখলে মনেহয় আমিও কি হইতে পারতাম না ওদের খেলার সাথী? এখন খেলার সাথী মনেহয় বলে না আর, মে বি গেইম পার্টনার বলে। যা-ই হোক, আমরা তো বলতাম। মেজর বনহুর ভাবেন। তো, সেই খেলার সাথীদের কথা ভাইবাই মনে হইলো, কার্জন হলের সামনে দিয়া দোয়েল চত্তর হইয়া টিএসসি’টারে একটু দেইখা যাই।

আবেগে পইড়া গেছিলেন উনি, এইজন্য মনে নাই ওইখানে উনার পরের তৃতীয় প্রজন্ম’রা জাইগা উঠছে আর ঘুমাইতেছে না। তাঁদের উপর দিয়া ক্রস কইরা কেমনে যাইবেন সেই ভাবনাটা আর আসেই নাই উনার মনে। ড্রাইভার’রে বললেন, স্লো কইরা যাইতে। যেন কোন ক্লু খুঁজবেন রাস্তায় – এইরকম সিরিয়াস একটা ব্যাপার। আছেন তো অফিসিয়াল ড্রেসেই। চাইলে নামতেও পারেন। নামবেন কিনা এইরকমও ভাবতে ছিলেন।

ওই হলুদ পাঞ্জাবিওলা তো কনফার্ম গাঞ্জাখোর। এই এলাকায় থাকতেও পারে। ছবির হাটের সামনে আইসা মনে হইলো দেখলেনও শুয়োরের বাচ্চাটারে। কিন্তু একটা তো না, দুইটা। কিছুক্ষণ পরে দেখলেন আরো কয়েকটা। আরে, এতগুলি কি করে এইখানে! মেজাজ গেলো টং হইয়া। জিপ থিকা নাইমা দিলেন দৌড়, ফাঁকা গুলি ছাড়লেন দুইটা। আর সাথে সাথে সব দৌড়। হলুদ পাঞ্জাবিওলাগুলাও। আরে, ওইগুলি দৌড়ায় ক্যান! আর সাথে সাথে আরো গুলির আওয়াজ। কি হইলো?

মেজর বনহুর বিভ্রান্ত হয়া গেলেন। পাল্টা গুলি মারে কারা! এইটা কি হইলো! হিমুগুলা আবার সব মেজর বনহুর হয়া যাইতেছে কেনো! কেনো! কেনো! সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের মরা গাছগুলা সব তার মনের হাহাকারের ভিতর দিয়া একসাথে চিল্লায়া উঠলো যেন! এই দেখেন টুপি, এই দেখেন রিভলবার, এই দেখেন হলুদ পাঞ্জাবি! সবকিছু যেন প্যারডক্সিক্যাল হয়া উঠতেছে! বনহুর এইটা কেমনে সামলাইবেন! উনি নিজে তো এইটা করেন নাই! কে এই প্যাঁচ লাগাইছে! কেমনে এই প্যাঁচের ভিত্রে চইলা আসছে সে! হোয়াট টু ডু? কি করিতে হইবে? রেভুউলেশন কি আমরা কইরাই ফেলবো?

ততক্ষণে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়া গেছে। সব দৌড়ায়া ছুটতেছে টিএসসি’র দিকে। ভাবতেছে, মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমান্ডের বুইড়া ইয়াং লিডারগুলি জানি উনাদেরকে বাঁচায়া ফেলতে পারবে। আছে না, এইরকম একটা ভাব যে, যার বয়স বেশি সে মনেহয় বেশি জানে! অথচ মেজর বনহুর জানেন এইটা  আসল ঘটনা না – কোথাও কিছু ঘটতেছে, আর সেইটা আমাদের রাডার দিয়া, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দিয়া, ফ্রেঞ্চ ফিলোসফি দিয়া ধরা যাইতেছে না!

কিন্তু মানুশ দৌড়াইতেছে, মানুশ দৌড়াইতেছে, নিজের কাছ থিকা, নিজের কাছ থিকা দূরে, যেন দৌড়াইলেই বাঁইচা থাকতে পারবে তারা, একসাথে থাকলেই, একজন আরেকজনের কাছ থিকা একটু দূরে থাকতে পারলেই, অথচ, অথচ এরা জানেই না এরা বাঁইচা আছে কিনা… নাকি কেউ কোন কালেক্টিভ কনশাসনেসের ভিতর দিয়া আমাদেরকে চালাইতেছে… আমরা ঘড়ির কাঁটা, ঘড়ির জুয়েল দেখতেছি না, ঘড়িটারে চিনতেছি না, গাঞ্জা খায়া লালন লালন করতেছি, গাঞ্জা না খায়া যেন বুইঝা ফেলতেছি, অথচ দৌড়াইতেছি…

মেজর বনহুরও দৌড়াইতেছেন, আর একটু পরে পরেই মনে হইতেছে, যাহ্, শালা! আরেকটা গুলি মারি… একটু পরে পরেই গুলি করতেছেন উনি, যেন ভেড়ার পাল চালায়া নিয়া যাইতেছে কোন মিথ্যাবাদী রাখাল, একটা কল্পিত বাঘের কাছ থিকা…

মেজর বনহুর দৌড়াইতে দৌড়াইতে দেখতেছিলেন তার লগে হিমুও দৌড়াইতেছে, তার দুই বগলে দুইটা মাইয়া, তারা হাসতে হাসতে দৌড়াইতে দৌড়াইতে যেন করতেছে লীলাখেলা… আর ব্যাকগ্রাউন্ডে মমতাজ গান গাইতেছেন, আহাজারি করতেছেন; কিন্তু এই গান কনসার্ট ছাড়া একলা তার মনে বাজতেছে, যেন লোককাহিনির কোন সিনেমা… মেজর বনহুর নিজের আর কন্টিনিউ করতে পারতেছিলেন না।…ফাক! আবারও গুলি করতে থাকলো রেব অফিসার মেজর বনহুর!

প্রি-মর্ডান একটা গলি দিয়া বাইর হয়া যাইতে চাইতেছে সে। বাইরও হইতে পারতেছে না। ক্যাসেট প্লেয়ারে ফিতা আটকায়া গেলে যেমন ফ্যাস ফ্যাস করে, ইন্টারনেট কানেকশন স্লো হয়া গেলে যেমন কোন ওয়েব পেইজ আর ওপেন হইতে পারে না, এইরকম মেজর বনহুরও একটা রিয়ালিটি থিকা বাইর হইতে পারতেছেন না। হিমুও সারাজীবন ধইরা দৌড়াইতেছেই যেন, ছবির হাট এলাকায়। মাসুদ রানাও যেন কোন মিশনেই আটকায়া আছে, বাইর হইতে পারতেছে না। সব নায়করাই ডামি এখন। আর ভিলেন কে – তারে আমরা চিনি না, জানি না। একটা ‘রাশোমন’ গল্পের প্লটে আটকায়া আছি আমরা সবাই। কেউ কাউরে বিশ্বাস করতে পারতেছি না।

…………………………..

কিন্তু বিশ্বাস ছিল সুপারম্যানের, স্পাইডারম্যানের, টারজানের, মাইকেল কর্লিয়নি’র যে ‘আমরা করবো জয়!’

একেকজন একেক স্পেইসে বইসা ওয়েব মিটিংয়ে বসলো সবাই।

: হোয়াট দ্য ফাক! গুলি করার কথা তো মোতিবাগে, শাহঝিলে ক্যান!

: মোতিবাগে মানুষ তো আইতেই পারে নাই এখনো। ওরা তো চিটাগাংয়ে, ওয়াসার মোড়ে।

: তো, কালকের ঘটনা আজকে ঘটাইতাছো ক্যান?

: টাইমলাইনে কোন ঝামেলা হইছে তাইলে?

: ফাক, ম্যান! কি করতেছো এইটা তুমরা!! (যেহেতু ব্রিটিশ অরা, বাংলা-ভাষা তো জানে না, এই কারণে, তুমরা, নট তোমরা)

মিশন এবর্ট! মিশন এবর্ট!

ইন্টার‌ন্যাশনাল ফোর্স লাগবে এখন! জিও-পলিটিক্যাল রিয়ালিটি ইন্সটল করো এখন। খালি কন্সিপিরেসি থিওরি দিয়া হবে না। মনে রাখবা, অল থিঙ্কস আর কানেক্টেড। অল থিঙ্কস আর কানেক্টেড। ৩বার কইরা বলো সবাই!

: ওকে।

: ওকে।

: ওকে।

রিয়ালিটির কালার চেইঞ্জ হয়া যাইতে থাকলো। ঝাপসা লাল থিকা ব্রাইট হলুদে…

[পার্ট ১ সমাপ্ত]

আগের/পরের পর্ব<< ফিকশন: মেমোন্তো মরি (Memento mori) – ৪
The following two tabs change content below.
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য