Main menu

এডিটোরিয়াল: হুমায়ূন আহমেদ

১.
হুমায়ূন আহমেদের নভেল/নভেলাগুলারে ‘সমালোচকদের’ অপছন্দ করার একটা মেজর কারণ হইতেছে, উনার উপন্যাসগুলা’তে খেয়াল কইরা দেখবেন ‘বর্ণনা’র চাইতে ডায়লগ বেশি। আমাদের ‘সমালোচনায়’ উপন্যাসের স্ট্রেংথ হইতেছে বর্ণনায়; মানে ‘বর্ণনা-ই উপন্যাস’ না হইলেও, মেজর একটা জিনিস। তো, হুমায়ূন আহমেদে যে বর্ণনা নাই – তা না, বর্ণনা উনার স্ট্রেংথের জায়গা না; উনার স্ট্রেংথ হইতেছে, কনভারসেশন, ডায়লগ। কিন্তু এইটা তো নাটকের জিনিস! – এইটা মনেহয় ভাবতে পারি আমরা, যার ফলে ‘উপন্যাসের মানদন্ডে’ জিনিসটা বাজে হইতে পারে।…

মানে, খেয়াল কইরা দেখেন, একটা বা কিছু ‘মানদন্ড’ আছে এইখানে, বিচার করার; খালি উপন্যাস না, নাটক-সিনেমা-গান-কবিতা, অনেক জিনিস নিয়াই। সিনেমার মানদন্ড যেমন, একটা ভালো স্টোরি থাকতে হবে, একটা ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ থাকতে হবে, এইরকম; তো, এইগুলা বাজে জিনিস না, কিন্তু আর্টের এই ‘মানদন্ড’গুলাই যে আর্ট না – এইটা মনে রাখাটাও দরকার। মানে, আর্টের বিচার তো আপনি করবেন-ই; কিন্তু যেই বাটখারা দিয়া বিচার করতেছেন, শুধু সেইটা দিয়া মাপতে গেলে ঝামেলা হবে, সবসময়ই।…

/জুলাই ৩১, ২০২০

 

২.
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর হুমায়ূন আহমেদ

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’রে নিয়া হুমায়ূন আহমেদ একটা লেখা লিখছেন ‘যদ্যপি আমার গুরু’ নামে। লেখাটা ছাপা হইছে উনার ‘হিজিবিজি’ নামে একটা বইয়ে (অন্যপ্রকাশ, ২০১৩, পেইজ ৫৫ – ৫৯)।

মানিকের জন্মের একশ বছর হইছে, এইরকম কোন অকেশন ছিলো মনেহয়। তো, হুমায়ূন আহমেদ যেহেতু পপুলার রাইটার বইলাই ভাবতেন নিজেরে, এই জায়গাটা নিয়াই কনসার্নড হইছেন, পয়লা। কোন এক ক্রিটিক লিখছেন যে, মানিক বন্দ্যোপধ্যায় পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব জিনিসপত্র লেখছেন; তো, হুমায়ূন আহমেদ কইতেছেন, মানিক শরৎচন্দ্রের লেখা অনেক পছন্দ করতেন, তারে নিয়া একটা লেখাও লেখছেন।

মানে, উনার ক্লেইমটা হইতেছে যে, পপুলার ভার্সেস সিরিয়াস এইরকম কোন প্রেজুডিস মানিকের ছিলো না। কিন্তু এই যে ছিলো না, এইটা বইলা হুমায়ূন এই ক্যাটাগরিটারে স্পেইসই দিছেন। যেমন, বলতেছিলেন, পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব এইসব নিয়া সিরিয়াস অধ্যাপকরা (এই প্রফেশনটারে ধসায়া দিয়া গেছেন জীবনানন্দ দাশ) লেখবেন। পরে লেখার শেষে, এই লেখাটা লেখার লাইগা উনি যে কিছু বইপত্র পড়ছেন সেইটা মেনশন করছেন কয়েকজনরে কৃতজ্ঞতা জানায়া। 🙂

মানে, এনিমি চুজ করার ব্যাপারে সাবধান থাকা দরকার। উনারে পপুলার বইলা ক্রিটিক করা হইছে আর উনি সিরিয়াসদেরকে নিয়া একটু মশকরাই করছেন। কিন্তু এই ক্যাটাগরিটার কোন ক্রিটিক করেন নাই, উইথইন দ্য ক্যাটাগরিতেই রয়া গেছেন।

সো-কল্ড মার্কসিস্ট সাহিত্য-বিচারের জায়গা থিকাই মেবি এই সিরিয়াস ভার্সেস পপুলার জায়গা’টা তৈরি হইতে পারছে। যেইটা খুবই এলিটিস্ট একটা ভঙ্গিমা, স্নবারি’র জায়গা। তো, এইটার এগেনেস্টে অন্য কোন ক্যাটাগরি উনি সাজেস্ট করতে পারেন নাই, একসেপ্ট যে, পুপলার রাইটার’রাও রাইটার। (মানে, গরিব’রাও তো মানুষ, এইরকম!)

পারসোনাল মিথের জায়গাটাতে গিয়াও হুমায়ূন আহমেদ থতমত খাইছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন ফ্রেন্ড ছিলো না, কাউরে উনি বই ‘উৎসর্গ’ করতে পারেন নাই… এইরকম পারসোনাল ফেইলিওরের কথাগুলি কইতে গিয়া আবার ভাবছেন, মিথ বানাইতেছেন না তো? তো, সেইটা এক ঘটনা। আরেকটা জিনিস হইলো, এক রকমের ইলিসিট প্লেজার কি পান নাই উনি? যেমন, আজকেই কইতেছিলাম, ধরেন কোন প্রোগ্রামে মেয়েদেরকে দিয়া  গেস্টদেরকে যে ফুল দেয়া হয়, এইটা তো মিনিংলেস কোন ঘটনা না! মানিক গরিব আছিলেন, এইটা একদিক দিয়া যেমন উনার পারসোনাল লাইফের মিথ হিসাবে কাজ করে, আবার মিথ হিসাবে না মানলে সোশ্যালি ‘অসহায় মুক্তিযোদ্ধা’ ক্যাটাগরিতেই ভাবতে পারার কথা, যখন ইনফরমেশন’টা আমাদের জানা আছে যে, শেষ লাইফে বস্তি’তে থাকতে হইতো উনারে।

 

বইয়ের কাভার

 

লাস্টলি, মানিকের মদ খাওয়ার ঘটনাটা যে, মদ খাইলে কিছুটা স্ট্যামিনা পাইতেন, লিখতে পারতেন একরাত, যদিও লং টার্মে এইটা ক্ষতি-ই করতেছে, এইটা জানতেন। তো, এইটা ঠিক আমার কাছে রেন্ডম পারসোনাল চয়েসের ব্যাপার বইলাও মনেহয় না পুরাপুরি। লাইফের ছোটখাট ডিসিশানগুলি আমাদের লেখালেখিতে কন্ট্রিবিউট করে – এইরকম না, বরং আমাদের লেখালেখি’র যে পারসপেক্টিভ সেইটা লাইফের ক্ষেত্রে অনেকবেশি রিলিভেন্ট হয়া উঠে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর হুমায়ূন আহমেদ আর্টের যেই সো-কল্ড মার্কিস্টিট ইথিকস সেইটাতেই সাবস্ক্রাইব কইরা গেছেন, মেবি একজন মাইনা নিয়া আর আরেকজন না মানতে চাইয়া; কিন্তু একই পেরিফেরি’র ঘটনা।

জুলাই ১৮, ২০১৮

৩.
….হুমায়ূন আহমেদও এই কাজ করছেন উনার লিটারেচারে; দেখবেন উনার বেশিরভাগ জিনিসই কোন না কোন ফ্যামিলির কাহিনি। উনি তো অনেক একসাইটিং কইরা বলছেন; কিন্তু নরমালি আপনার ফ্যামিলির কথাই বলেন আপনি, যেইটা ফ্যামিলির বাইরের কেউ জানার কথা না, তখন এইটা ‘লাইকেবল’ হইতে পারবে বেশি অন্য যে কোন কাহিনির চাইতে। এইটা একটা প্যার্টান।

পারসোনাল বইলা যা কিছু আছে সেইটারে একভাবে বানাইতে পারেন আপনার সাহিত্যের ম্যাটেরিয়াল।… আর  পাবলিকের ইন্টারেস্ট গেইন করতে পারেন এইভাবে যে, যা তাদের জানার কথা না, তাদেরকে আপনি জানাইলেন, আপনার পারসোনাল লাইফে একসেস দেয়ার ভিতর দিয়া যেন “আপন“ কইরা নিলেন!

এইটা আরো ডাবলড হইতেছে যখন ফ্যামিলির মধ্যে না-বলা জিনিসগুলিরেও কাহিনির মধ্যে বইলা দিতে পারতেছেন। ধরেন, একটা রাতের লুডুখেলা নিয়া লিখলেন আপনি, তখন অনেকেই লুডুখেলার (লুডুখেলাই, অন্য মানে কইরেন না আর) কথা মনে কইরা এসোসিয়েট করতে পারবে…

এইগুলি বাজে লিটারেচার বা ভালো, এইরকম না। জাস্ট এতটুকই যে, কেন বা কি কারণে এইটা আমাদের ভাল্লাগে বা লাগতে পারে। ভয়ারিজমের প্লেজার দিতে পারাটা বা পাইতে পারাটা তো সাহিত্যের ঘটনাই।

আপনি গোপনে একটা জিনিস দেখতেছেন – ব্যাপারটা এইটা না; বরং একটা গোপন জিনিস আমি আপনারে দেখতে দিতেছি। আপনারে অডিয়েন্স হিসাবে চূড়ান্ত মর্যাদাটা দিতেছি আসলে এইভাবে। তো কেউ যদি এইটা করেন, এইটাতে অ্যাজ অ্যা রিডার আমি কি হ্যাপি হবো না?

এপ্রিল ১০, ২০১৬

৪.
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের মেইন সিগনিফিকেন্স এইটাই যে, গল্প লেখার লাইগা বা ‘সাহিত্য’ করার লাইগা ‘সাহিত্য ভাষা’ ইউজ করাটা যে মাস্ট ছিল সেইটারে অ-দরকারি বানায়া দিছেন উনি। মানে, ভারী ভারী শব্দ দিয়া, জটিল সব বর্ণনা দিয়া গল্প তো আপনি লিখতেই পারেন, লেখা তো হইছে, আর হইতেছেই; কিন্তু ডেইলি লাইফের ‘নন-সিরিয়াস’ ভাষা দিয়া লেখলে সেইটাও গল্প হইতে পারে। এইটা হুমায়ূন আহমেদের ক্রেডিট।  (পপুলার শরৎচন্দ্রও ‘সাহিত্য-ভাষা’রই রাইটার।) এইটা মানতে আমাদের সময় লাগছে। আর মানতে পারার পরে দেখবেন, ‘সাহিত্য-ভাষা’ না মানলেই সেইটারে ‘হুমায়ূন আহমেদ’ ট্যাগ লাগায়া দেয়া হয়।

কিন্তু ভাষা ইজ নট সাহিত্য। 🙂 ‘সাহিত্য-ভাষা’ দিয়া লেখলে যেমন ‘সাহিত্য’ হয় না, একইরকমভাবে চালু ভাষা দিয়া লেখলেই ফিকশন হয়া যাবে, এইরকম না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের কারণেই যে ‘সাহিত্য-ভাষা’ বাতিল হইতে পারছে, আমাদের এই ফেসবুক জমানায় আইসা এই খেয়াল করতে পারাটা হয়তো একটু মুশকিলই। এইজন্য বইলা রাখা।

হুমায়ূন আহমেদ নিজেও এইটার ক্রেডিট নিতে পারতেন না, উনি নিজেরেও ‘বাজারি-সাহিত্যিক’-ই মনে করতেন হয়তো, এই কারণে ‘সিরিয়াস রাইটার’ যেমন, মানিক বন্দোপাধ্যায়রে অনেক প্রেইজ করতেন। কাজী নজরুলও আক্ষেপ করছিলেন কোথাও যে, অই সময়ের রুচি উনি ধইরা রাখতে পারেন নাই উনার লেখায়, এইরকম।…

জুলাই ১৯, ২০২০

৫.
“হুমায়ূন আহমেদ তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবিতেই মানুষকে একটা ধাক্কা দেন। তিনি আওয়াজ দেন, তিনি আর সবার মত না। এসেই জাতীয় চলচ্চিত্রের প্রায় সব পুরস্কার জিতেন।… তিনি বিএনপির সময়ে বানানো ছবিতে প্রথম দিকের দৃশ্যেই শোনান শেখ মুজিবের ভাষণের অংশ, সেই ছবির প্রিমিয়ার শোতে উপস্থিত করান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে!“ (পুরা লেখার লিংক: https://bit.ly/2Iz8Rcu)

এই যে বিএনপির আমলে সরকারি অনুদানের টাকা দিয়া বানানো সিনেমাতে শেখ মুজিবের ভাষণ দিয়া শুরু করা আর খালেদা জিয়ারে প্রিমিয়ার শো তে নিয়া আসাটারে (খালেদা জিয়ার নিজে নিজে আসা না কিন্তু 🙂 ) হুমায়ূন আহমেদেরই ক্রেডিট হিসাবে দেখলেন, কিন্তু বিএনপির বা খালেদা জিয়ার কোন পলিটিক্যাল উদারতাও দেখতে পাইলেন না, কেন এমনটা হইলো?

সময় পাইলে একটু ভাইবেন, তাইলে আওয়ামী লীগ গর্ভমেন্টের পলিটিক্যাল এবং কালচারাল গোঁড়ামিটা আরেকটু ক্লিয়ারলি আমাদের চোখে পড়তে পারবে।

/জুলাই ২৩, ২০২০

৬.
একজন গ্রেট রাইটার ইতিহাস’রে ‘ধারণ’ করেন না আসলে; ইতিহাসরে কোন না কোনভাবে ‘তৈরি’ করেন।

 

The following two tabs change content below.
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য