Main menu

অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (৪)

।। এক ।। দুই ।। তিন ।।

 

পার্ট ৪: বেদের মেয়ে ছোসনা (১৯৮৯)

 

“রাজা যদি অপরাধী হয়, তাহলে শাস্তি দেন স্বয়ং খোদা”

/বেদের মেয়ে জোসনা

বেদের মেয়ে ছোসনা রিলিজ হইছিল ১৯৮৯ সালে। ২০ লাখ টাকা দিয়া বানানো এই সিনেমা ইনকাম করছিল ২২.৫০ কোটি টাকা। আর মুশকিল হইছিল এই ব্যবসা করাটাই।

১৯৯০ সালে ফরহাদ মজহার এই সিনেমা নিয়া বড় একটা লেখা লেখছিলেন, অইখানে সিনেমার অনেকগুলা আসপেক্ট নিয়া উনি ডিল করছিলেন, সিনেমাটার নেগেটিভ ‘সমালোচনা’র উত্তর দিছিলেন। কিন্তু কেন সমালোচনা হইছিল, সেইটা নিয়া সজাগ হইতে পারেন নাই। মানে, বেদের মেয়ে জোসনা সিনেমা হইছে কি হয় নাই – এইটা কোনভাবেই ‘আসল’ সমালোচনা’টা ছিল না। এই ক্যাটাগরির সিনেমা তখন বছরে ৮/১০টা কইরা রিলিজ হইতো। কিন্তু অন্য কোনটা নিয়া তো ‘সমালোচনা’ হয় নাই! ‘সমালোচনা’ হইছে কারণ এই সিনেমাটা ব্যবসা করছে। বেদের মেয়ে জোসনা দেখায়া দিছে যে, ‘বাংলা সিনেমা’র নামে যেই টাইপের সিনেমা বানানো হয়, সেইগুলা নিয়া পাবলিকের কোন ইন্টারেস্টই নাই; যদি থাকতো তাইলে ২২ কোটি টাকা না হোক, সিনেমাগুলা এটলিস্ট ২/৪/৫ কোটি টাকা হইলেও ইনকাম করতে পারতো। ‘বাংলা সিনেমা’ যে হইতেছে না, এই সত্যিটারে খোলাসা কইরা দিছিলো বেদের মেয়ে জোসনা। আর এইটা তো কিছুটা অশ্লীল ঘটনাই। :p

জনরা বা ক্যাটাগরি হিসাবে ‘রূপবান’ আর ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ একই ঘরানার সিনেমা। দুইটা সিনেমাই হিউজ ব্যবসা করছিল, দর্শক টানছিল, ‘সমালোচকদের’ নিরবতা আর নিন্দা পাইছিল; কিন্তু ‘রূপবান’ যেমন ছিল একটা ব্লেসিং, একটা শুরু; বেদের মেয়ে জোসনা হইতেছে আরেকটা শেষের শুরু। এই কনফার্মেশন যে, সিনেমা খালি আর্ট আর পুরষ্কার পাওয়ার জিনিস না, পাবলিকের দেখার জিনিস। কিন্তু সিনেমার এই ক্লেইমটারে আইডেন্টিফাই করা হইছে এইভাবে যে, বাংলা-সিনেমার ‘রুচি’ নিচে নামাইতে হবে! মানে, ‘বাংলা সিনেমা’ শরীর দিয়া দিবে, তারপরও মন দিবে না; মানবেই না যে, বাণিজ্যিক-সিনেমা, আর্টফিল্ম, মিডলক্লাসের সিনেমা, গরিবের সিনেমা… এই ক্যাটাগরিগুলা এতোটা ফিক্সড কোন জিনিস না।

তো, এই কাহিনি নিয়া আগে যে কোন সিনেমা বানানো হয় নাই – তা কিন্তু না; ১৯৬৯ সালে নুরুল হক বাচ্চু “বেদের মেয়ে” নামে সিনেমা বানাইছিলেন, নায়ক-নায়িকা ছিলেন আজিম আর রোজী সামাদ। এভারেজ আর দশটা সিনেমার মতোই ছিল সেইটা। কিন্তু বিশ বছর পরে আইসা একই কাহিনি নিয়া বাননো সিনেমা এতো হিট হইলো কেমনে!

আমার ধারণা, তিনটা ফ্যাক্টর এইখানে কাজ করছে।

পয়লা ঘটনা তো অবশ্যই একটা সার্টেন অডিয়েন্সের ফিলিংসের লগে অ্যাটাচড হইতে পারা। কিন্তু এইটা হইছে কেমনে! ১৯৮৯ সালেই এর চে পপুলার কাহিনি নিয়া “বীরঙ্গনা সখিনা” আর “নবাব সিরাজউদ্দৌলা” বানানো হয়; ফ্লপ না হইলেও হিট হওয়ার কোন খবর জানা নাই। এমনকি সখিনা’তে তখনকার হিট নায়িকা ববিতা আর দিতি ছিলেন। মানে, বলতে চাইতেছি, কাহিনি ইজ নট দ্য গল্প! পপুলার কাহিনি দিয়া সিনেমা বানাইলেন, হিট নায়ক-নায়িকা নিলেন, নাচা-গানা আর মাইর-পিট রাখলেন, তাইলেই হবে; তা তো না!

তো, অডিয়েন্সের বা দর্শকের ফিলিংসের লগে এটাচড হইতে পারার ঘটনা’টা কি রকম? এইটা নিয়া ফরহাদ মজহার ভালো একটা জায়গা ধরছেন যে, কাহিনিটা কোন ‘প্রাচীনকালে’ ঘটতেছে না, ঘটতেছে বর্তমানকালে। এইটা অতীতের কোন কাহিনি না, এইটা বর্তমানের, বাংলাদেশের কাহিনি। একটু আড়াল করার লাইগা বাংলাদেশরে বঙ্গদেশ বলা হইছে। মানে, এই যে প্রেম, ব্যক্তিগত দুঃখ-দুর্দশা, সামাজিক অন্যায়, অবিচার এইগুলা বর্তমান সময়ের ঘটনা; পুরান একটা কাহিনির ভিতর দিয়া বলা হইতেছে মাত্র। কিন্তু এইটা জাস্ট সারফেইসের ঘটনা; বরং যেই টোনটাতে বলা হইতেছে, সেই ন্যারেটিভ’টা খুবই অ্যাটাচড কাহিনির সাথে। রূপবানের ব্যাপারেও একই জিনিস। আর্টের যেই দরদ, সেইখানে ভান নাই কোন; বা ভানটা এতোটাই যে তারে রিয়েল বইলা ভাবতে কোন সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় না কারণ সত্য হওয়ার চাপাচাপিটা এইখানে নাই। এইটারে ফ্যান্টাসি বলতে চান নাই ফরহাদ মজহার; কিন্তু আমি বলবো, ফ্যান্টাসি আর রিয়েল – এই ক্যাটাগরিটাই এইখানে রিলিভেন্ট না।  আর এটাচমেন্ট বলেন, দরদ বলেন, এইটা তৈরি হইছে, এই জায়গা থিকাই। টেকনিক্যালি বলেন, অ্যাপিয়ারেন্সের দিক দিয়া বলেন, এই সিনেমার আলাদা কোন ‘সিগনেচার’ নাই, অই সময়ের সব সিনেমাতেই কাছাকাছি রকমের জিনিস পাইবেন, কিন্তু একসেপশন এই ‘দরদ’ বা ‘ইমোশন’টা। যেইটারে যাত্রা বা গরিবের বা কৃষকের ইমোশন বইলা ন্যারো করছেন ফরহাদ মজহারও (মানে, ট্রাডিশনাল যেই ‘সমালোচক’, তাদের থিকা আলাদা কোন গ্রাউন্ড থিকা উনি দেখেন নাই)।

এই জায়গাটারে মেবি আরেকটু খোলাসা কইরা বলা দরকার। ফরহাদ মজহার যাদের সমালোচনার এগেনেস্টে বেদের মেয়ে ছোসনা’রে ‘ভালো’ সিনেমা হিসাবে প্রমাণ করতে চাইতেছেন, উভয়পক্ষ মাইনা নিছেন যে, সিনেমা’টা “ছোটলোকদের”; মানে ফরহাদ মজহার আদর কইরা ‘কৃষক’, ‘গ্রামের মানুষ’ আর ‘শহুরে নিন্মবিত্ত’ কইছেন, কিন্তু লোকজন তো একই। মানে, দুইদলই এগ্রিড যে, এইটা হইতেছে, গরিবের আর্ট, গ্রামের জিনিস। একদল খারাপ বলতেছেন, আর ফরহাদ মজহার বলতেছেন, এই আর্ট মিডলক্লাসের রুচিরে স্যাটিসফাই করে না বইলাই খারাপ না।… তো, আর্ট অবশ্যই ক্লাস কনজামশনের ঘটনা। কিন্তু তাই বইলা পাওয়ারফুল ক্লাসের আর্টরে যে আমরা ‘আসল’ আর্ট বইলা মাইনা নেই, সেইটা তো মিছা কথা না। মিডলক্লাশের আর্টরে তো আলাদা কইরা বলা লাগে না যে, এইটা মিডলক্লাশের সিনেমা, কিন্তু গরিবের সিনেমারে যে বলা লাগে ‘গরিবের সিনেমা’, এইটা অই ‘আসল আর্ট’র ধারণারে কোনভাবেই বাতিল করতে পারে না।

আর এই ধরণের ‘আর্ট’ চিন্তা সবচে বাজে যেই কাজ করে, আর্ট’রে একটা টুল হিসাবে দেখে, যার কাজ হইতেছে, কোন ক্লাসের রুচি’রে স্যাটিসফাই করা। কিন্তু কোন আর্ট যদি কোন ক্লাসের রুচিরে কোন না কোনভাবে অল্টার করতে না পারে, সেইটা আর্টই হইতে পারার কথা না! ইভেন এন্টারটেইনমেন্টেও এই কথা কম-বেশি সত্যি। ঘটনা’টা একটা রুচি’রে স্যাটিসফাই করা না, বরং রুচির জায়গাটারে ক্রিয়েট করা।. তো, বেদের মেয়ে জোসনা ‘গরিবের আর্ট’ বইলা যেই জিনিস আছে, সেইটারে এক তো হইলো গরিবের আর্টের জায়গা তো দেখেই নাই, এমনকি গরিবের রুচি বইলা যেই পারসেপশন চালু আছে (কাহিনি বুঝে না, চিন্তা করতে জানে না, নাচ-গানটাই আসল…) সেইগুলারে মেবি কিছুটা ইনভ্যালিডও করতে পারার কথা, যেই কারণে এটাচমেন্টের জায়গাগুলা তৈরি হইতে পারছে, সিনেমার ভিতরে।

সেকেন্ড জিনিস হইলো, ভাষার জায়গা’টা খেয়াল কইরা দেইখেন, বঙ্গরাজা আর বেদের মেয়ে দুইজনে একই ‘শুদ্ধ’ ভাষাতে কথা বলতেছেন। এখনকার হলিউডি সিনেমাতে যেইরকম দুইটা কালা কারেক্টার থাকা লাগবো, একটা স্ট্রং ফিমেইল… এইরকম ফর্মূলা মানতে হয়, এইরকম বাংলা নাটক-সিনেমাতেও দেখবেন কে কোন ল্যাঙ্গুয়েজে কথা কইবো সেইটা মোটামুটি ফিক্সড কইরা দেয়া আছে, গরিব, অশিক্ষিত লোকজন একটা ‘আঞ্চলিক’ ভাষায় কথা কইবো; এই কারেক্টারগুলা যদি ‘শুদ্ধ’ বা শহরের ভাষায় কথা কয়, আপনার মনে হবে, আন-রিয়েল, বানানো, ফেইক, ফ্যান্টাসির একটা ঘটনা। আদতে ঘটনা হইলো এই যে, রাজাকার মানে টুপি-পরা লোক, মুক্তিযোদ্ধা মানে জোয়ান… এই ন্যারেটিভগুলারে পাত্তা না দেয়ার ঘটনা। যেই গরিব’রা ‘শুদ্ধ’ ভাষা বলে, তারা আবার কেমন গরিব! বা যেই রাজার আলাদা ভাষা নাই, সে আবার কেমন রাজা – এইগুলা তো অ্যাবসার্ড বা ফ্যান্টাসির ঘটনাই! হোয়ার অ্যাজ, আপনি যদি খেয়াল করেন, এতোটা কাল্পনিক ব্যাপার না এইগুলা; কিন্তু কাল্পনিক যে বানায়া রাখা হইছে, এই জায়গাটারে কনফ্রন্ট করে, বাতিল কইরা দেয় সব কারেক্টারের একই ভাষায় কথা বলাটা। ভাষা যে গরিব’রে গরিব বানায়া রাখে সেই গরিবি’তে মেবি সাবস্ক্রাইব করে নাই বেদের মেয়ে জোসনা। সিনেমা ভিজ্যুয়াল জিনিস অবশ্যই, কিন্তু সবসময় কোন না কোন সংলাপ যে পপুলার হয়া উঠে, সেইটা থিকা বুঝতে পারার কথা যে, এইটাও ক্রুশিয়াল একটা ঘটনা।

লাস্টলি, সিনেমা গানের এই জিনিসটারে মেবি খেয়াল করা হয় না যে, গান মানে একটা ফিলিংসরে অ্যামপ্লিফাই করার ঘটনা না, যে নায়ক-নায়িকার প্রেম হইছে, এখন একটা গান দিয়া দেই; বরং ফিলিংস এতোটাই বেশি যে, সুর ছাড়া, গান ছাড়া বলা যাইতেছে না! কাছের কোন মানুশ যখন মারা যায় তখন কেউ বিলাপ কইরা কানতে থাকলে সেইটা যে একটা সুরের মতো হয়া যায়, এইরকম পারসোনাল কোন এক্সপিরেয়েন্স থাকলে বুঝতে পারবেন ব্যাপারটা। বঙ্গরাজা যখন জোসনা’রে জিগায় রাজপুত্র’রে ভালো করার লাইগা কি চায় শে, জোসনা তখন গান না গাইয়া বলতে পারে না। গানের এই সিগনিফিকেন্সটা এখন বেশ ডেড একটা ঘটনাই মনেহয়, কিন্তু বেদের মেয়ে জোসনা’তে এই ট্রাডিশন’টারে ফলো করা হইছে। এইটা স্মুথ একটা জিনিস।

এর বাইরে, সিনেমার পপুলারিটির জায়গাতে ফরহাদ মজহারের উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট নিয়া যে আলাপ, সেইটা পুরাপুরি আলাদা একটা ফেনোমেনা; ইরিলিভেন্ট না অবশ্যই, কিন্তু এইটারে ‘নারীবাদ’ বা ‘ফেমিনিস্ট’ থিওরির জায়গা থিকা লোকেট করতে গেলে ভুল-ই হবে আসলে। উইমেন পাওয়ারের একটা সেলিব্রেশন আমাদের কালচারের মধ্যে এমনিতেই আছে, সেইটা সিনেমাতেও রূপবান, বেহুলা, সাত ভাই চম্পা, কাজলরেখা থিকা শুরু কইরা সুন্দরী, ম্যাডাম ফুলি, বস্তির রাণী সুরিয়া তক আছে।  মানে, যতোটা না থিওরি, তার চাইতে কালচারাল হিস্ট্রির লগে মিলায়া দেখতে পারলে বরং মোর রিলিভেন্ট হইতে পারার কথা।

 

……………………………….

বাঈজী ও বেশ্যা

বাঈজী ও বেশ্যা – এই দুইটা আইডেন্টিটি হিসাবে সবসময়ই ডিফরেন্ট; বাঈজী একটা এলিট আইডেন্টিটি, যে কারোরই বাঈজী’র কুঠি’তে যাওয়ার পারমিশন ছিল না, এমনকি টাকা-পয়সা থাকলেও। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সোসাইটির পুরান ফরম্যাট’টা ভাইঙ্গা গেল, আমরা যখন ইউরোপিয়ান সোসাইটির নাগরিক হইলাম, তখন এইসব নাচ-গান’রে হেইট করতে শিখলাম। কারণ, এইটা তো কোন দরকারি জিনিস না! তার উপরে, “কেউ পাবে, কেউ পাবে না” – তা তো হইতে পারে না! বাঈজীদের মেইন পেশা যেহেতু তার কাস্টমার’রে খুশি করা, তাঁর নাচ-গান দিয়া, এরে আইডেন্টিটি হিসাবে এটাচ করা হইলো বেশ্যা’র সাথে; কারণ তাঁর কাজও কাস্টমার’রে খুশি করা। হিস্ট্রিক্যালি ইভেন্টগুলারে ফলো করলে হয়তো দেখা যাবে, ৫০/৬০ বছরের মধ্যে এই ঘটনা’টা ঘটছে; যে বাঈজী আইডেন্টিটি’টারে বেশ্যা হিসাবে ট্রিট করা হইতেছে। পেশা হিসাবে বাঈজী তখন নন-এগজিসটেন্ট হয়া উঠতেছে। একইরকম না হইলেও কাছাকাছি একটা রকম হইতেছে, বাইদানি’রে আন্ডারমাইন করার একটা ব্যাপার আছে; সেই মৈমনসিংহ গীতিকা’র মহুয়া থিকাই। এইখানে আমার ধারণা দুইটা ব্যাপার কাজ করে। এক তো হইতেছে, বাঈজী এবং বাইদানি পাবলিক ডিসপ্লের জায়গাতে কাজ করেন, উনারা প্রাইভেট স্পেইসে আটকায়া থাকেন না; সেকেন্ড হইলো, যেহেতু উনারা সোসাইটির স্ট্রাকচারের বাইরে থাকেন, এক ধরণের ফ্রিডমের জায়গাটারে ধইরা রাখেন, যেইটা প্রব্লেমেটিক একটা ঘটনা। এই কারণে বাঈজী’রে বেশ্যা বলতে না পারলে যেমন তার ফ্রিডমের জায়গাটারে আন্ডারমাইন করা যায় না, একইভাবে বাইদানি’রেও একটা লোয়ার ক্লাস হিসাবে না দেখাইতে পারলে মুশকিল।

(বেদের মেয়ে ছোসনা’তে এই আলাপ’টা মেবি খুব বেশি রিলিভেন্ট না; কিন্তু বইলা রাখা হয়তো দোষের কিছু হবে না আর কি!)

……………………………….

 

এমনিতে, বেদের মেয়ে জোসনা হিট হওয়ার কারণ হিসাবে, এই সিনেমা দেখতে না পাইরা একজন মহিলা সুইসাইড করছিল – এই ব্যাপারটারে খুব হাইলাইট করা হয়। যে, সিনেমা এতো ভালো কিছু না, কিন্তু কিছু হাইপ তুইলা ব্যবসা কইরা ফেলছে। পপুলার একটা কিছুর জন্য হাইপ লাগেই, কিন্তু হাইপ তুইলা যদি বিজনেস করা যাইতো, তাইলে তো সব সিনেমাই সেইটা ট্রাই করতো। এইগুলা হইতেছে ঘটনাটারে মানতে না পারার অজুহাত। রূপবানের সাকসেসরে যেমন বলা হয় ১৯৬৫ সালের ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের যুদ্ধের বেনিফিট।…

তো, বেদের মেয়ে জোসনা যেইটা করছিল, ব্যবসা করার ক্রেভিংটারে বাড়ায়া দিছিল। বেদের মেয়ে জোসনার ৯ বছর আগে ১৯৮০ সালে “ছুটির ঘন্টা” ছিল “ব্যবসা সফল” সিনেমা, যার ইনকাম ছিল ৪ কোটি টাকা। রূপবানের পরে সিনেমা অইরকম ক্রেইজ তৈরি করতে না পারলেও টাকা তুইলা নিয়া আসতে পারতো। আর বেদের মেয়ে জোসনা একটা অডিয়েন্সরে ক্রিয়েট করে,  এর পরপরেই বেশ কয়েকটা সিনেমা হিট হইতে পারছিল – কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩, সাড়ে ৮ কোটি), স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৫, ১৯ কোটি), সত্যের মৃত্যু নাই (১৯৯৬, সাড়ে ১১ কোটি), শান্ত কেনো মাস্তান (১৯৯৮, ৮ কোটি), আম্মাজান (১৯৯৯, ১১ কোটি)। ২০০০ সালের পর থিকা প্রতি বছরে না হইলেও, দুয়েক বছরে একেকটা ছবি পাওয়া যায় যেইটা ৪/৫ কোটি টাকার ব্যবসা করতে পারে। আর খেয়াল করলে দেখবেন, এই সিনেমাগুলার কোনটাই কিন্তু ‘গ্রামের সিনেমা’, ‘গরিবের সিনেমা’ বা ‘কৃষকের সিনেমা’ না; বরং ‘বাংলা সিনেমা’।

কিন্তু একটা বা দুইটা হিট সিনেমা দিয়া তো ইন্ড্রাষ্ট্রি চলতে পারে না, বাংলা সিনেমা শুরুর দিকে (১৯৫৬-১৯৬৫) যেমন ইম্পোর্ট-বেইজড একটা ব্যবসা ছিল, ব্যবসার জন্য তখন সেইদিকে টার্ন করে, হংকংয়ের ছবির ভিতরে ব্লু-ফিল্মের কাটপিস ঢুকায়া সিনেমাহলগুলা বরং বাংলা সিনেমার চে বেশি ব্যবসা করতে পারে। এই ক্রাইসিস থিকাই ২০০০ সালের দিকে ঢাকার সিনেমা’তে একটা ট্রেন্ড চালু হয় ‘অশ্লীল সিনেমা’ নামে, যেইটা ৫/৭ বছর হয়তো টিকছিল, কিন্তু হিস্ট্রিক্যালি সিগনিফিকেন্ট একটা ঘটনা। এই কারণে পরের আলাপটা এই ‘অশ্লীল সিনেমা’র যুগ নিয়া।

 

পার্ট ৫: “অশ্লীল সিনেমা”

 

অশ্লীল সিনেমার পোস্টার

তোমারে দেখছি আমি

রেলওয়ে হাইস্কুলের পাশে

ব্রীজের নিচের দেয়ালে

হাসতেছো তুমি আমারে দেইখা

একলা, একলাই…

/অশ্লীল সিনেমার পোস্টার, ২০১৫

 

“অশ্লীল সিনেমা” নিয়া কথা বলার আগে একটা ডিফরেন্সের জায়গা মার্ক কইরা রাখাটা দরকার। এইখানে দুইটা জিনিস ছিল, একটা হইতেছে ‘কাটপিস’ আরেকটা হইতেছে ‘অশ্লীল সিনেমা’। কাটপিস হইতেছে সিনেমার মধ্যে বাড়তি একটা জিনিস, সেন্সর বোর্ডে না দেখায়া পরে ডিস্ট্রিবিউটদের কাছে সিনেমার রিল দেয়ার সময় কাটপিসগুলা ঢুকায়া দেয়া, বেশিরভাগ সময়ই কোন গান, ‘খেমটা নাচ’ বলা হয় যেইটারে, অই জিনিস অনেকটা। এইটা বাংলা সিনেমাতে যেমন ঢুকায়া দেয়া হইতো, ইম্পোর্ট করা ইংলিশ সিনেমার ভিতরেও ঢুকায়া দেয়া হইতো। বাংলা সিনেমায় এই ঘটনা ফার্স্ট ঘটে মেবি “জন্মদাতা“ সিনেমায়, ১৯৯২ সালে (https://bit.ly/39i1kaH)।

মানে, কাটপিস জিনিসটা যতোটা না সিনেমা বানানোর লগে রিলেটেড তার চাইতে অনেক বেশি ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের ঘটনা। সিনেমা যারা বানান উনারা কইতে পারতেন যে, এইগুলা ডিস্ট্রবিউটরদের কাম, আমরা করি নাই। কারণ সিনেমা বানায়া উনারা ডিস্ট্রিবিউদেরকে দিয়া দেন, সিনেমাহল মালিকরা কিন্তু সরাসরি ডিরেক্টরদের কাছ থিকা সিনেমা নিয়া যান না, নেন ডিস্ট্রিবিউদের কাছ থিকা। এই ডিস্ট্রিবিউটররা খালি বাংলাদেশি সিনেমাই কিনেন না, বিদেশ থিকা সিনেমা ইম্পোর্টও করেন। এই হিস্ট্রিটা মনে রাখলে মেবি ভালো যে, বাংলাদেশে সিনেমা বানানোর কোম্পানির আগে সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ছিল। ১৯৪৮-১৯৫৫ পর্যন্ত কোন বাংলা সিনেমা বানানো হয় নাই, কিন্তু ইম্পোর্ট করা হইছিল ১৭১৫টা সিনেমার প্রিন্ট; মানে ইন্ডিভিজ্যুয়াল সিনেমা হয়তো না, হইতে পারে একেকটা সিনেমার ৮/১০টা কইরা প্রিন্ট ইর্ম্পোট করা হইছিল; নাম্বারটা যেহেতু অনেকবেশি, এই কারণে একটু সন্দেহও হইতেছে অবশ্য। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিকথা বইয়ে অনুপম হায়াৎ ৫৪ নাম্বার পেইজে এই  হিসাবটা দিছেন। তো, শুরু থিকাই সিনেমা ছিল ইম্পোর্ট-বেইজড একটা বিজনেস; পয়লা ইন্ডিয়া, পরে আম্রিকান সিনেমা ছিল মেইন সোর্স। বাংলা সিনেমা হিট হওয়া শুরু হইলে সিনেমা ইম্পোর্ট করা কমতে থাকে মেবি। (হিসাবটা দেখতে পারলে আরো কনফিডেন্টলি বলা যাবে। আলাদা একটা চ্যাপ্টার কইরাই আলাপ করা উচিত ঘটনাটা। হয়তো ডেটা-টেটা নিয়া এই জায়গাটাতে  আরো কনক্লুসিভ কয়েকটা ডিসিশান নিতে পারবেন কেউ। ) তো, ধারণা থিকা বলতেছি, ১৯৬৫ সালে  ইন্ডিয়া থিকা সিনেমা ইম্পোর্ট করা বন্ধ হয়া যাওয়ার পরে দেশি সিনেমার বাজার আরো ব্রডার হইতে পারে। কিন্তু আমদানি করা কখনোই বন্ধ হওয়ার কথা। তবে ১৯৮০’র দিকে ইম্পোর্ট আবার বাইড়া যাওয়ার কথা, তখন হংকংয়ের সিনেমা একটা সোর্স ছিল মনেহয়।

মানে, সিনেমার আমদানি আর ডিস্ট্রিবিউশন সবসময় একটা ক্রুশিয়াল ঘটনা। হিসাব কইরা দেখা দরকার, একটা সিনেমা ইম্পোর্ট করলে ডিস্ট্রিবিউদের লাভ বেশি থাকে নাকি বাংলাদেশি সিনেমা বেচলে। তবে এইটা অনুমান করা যায়, ১৯৬৫ সালের পরে রূপবানের জোশে আর স্বাধীনতার পরে একটা দেশি জোশে চললেও, ১৯৮০’র দিক থিকা সিনেমা ডিস্ট্রিবিউট কইরা লাভ কমতে থাকার কথা। মানে, সিনেমা হিট হইলেই না সিনেমামালিকদের কাছ কেমনে থিকা বেশি টাকা নেয়া যাবে! তো, বেদের মেয়ে জোসনা’র ব্যবসাটারে প্রফিটেবল কইরা তোলার কথা। অইরকম হিট সিনেমা যেহেতু বানানো হয় না, এই কারণে ইম্পোর্ট বাড়তে থাকার কথা বা ইম্পোর্ট করা ছবি ডিস্ট্রিবিউট হওয়ার নাম্বারটা। (বারো, ডেটা পাইলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হইতে পারবে আরো।) তখন হংকংয়ের ছবি দেখানো হইতে থাকে বাংলাদেশে সিনেমা হলগুলাতে ‘এক টিকেটে দুই সিনেমা’ হিসাবে। যেহেতু দুইটা সিনেমা মিইলা লেংথ বেশি হয়া যায়, কিছু সিন কাটা হইতো; এমনিতে কালচারাল কারণেই কিছু ‘অ্যাডাল্ট সিন’ থাকতো অইসব সিনেমায়; না থাকলে বা এনাফ না থাকলে, তখন হংকংয়ের বা ইংলিশ সিনেমাগুলাতে ‘কাটপিস’ ঢুকানো হইতো। মানে, আমি বলতে চাইতেছি কাটপিস পরে “অশ্লীল সিনেমা”তেও ঢুকানো হইছে, কিন্তু কাটপিস “অশ্লীল সিনেমা”র আগের ঘটনা।

বাংলাদেশের সিনেমার বাজেট এতো কম কেন, আর তারপরেও টাকা তুইলা আনতে পারে না আর ইউরোপে-আম্রিকাতে এতো বেশি বাজেটের সিনেমা বানায়া কোটি কোটি টাকা কেমনে কামায়? মেধা বেশি, জানে-বুঝে বেশি, বা টেকনিক্যালি আপগ্রেডেটেড… এইগুলার বাইরেও স্ট্রং একটা ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম যে হেল্প করে, এইটা মাথায় রাখতে পারলে ভালো।  কিন্তু এইটা নিয়া কখনো কোন আলাপ দেখি নাই; ব্যাপারটা ঠিক আর্টের আলাপ না, বা বিজনেসের আলাপ – এইরকম না, বরং সিনেমার আলাপের লগে রিলিভেন্ট একটা আলাপ, এইভাবে দেখতে পারলে জিনিসটারে ইনক্লুড করাটা মেবি পসিবল।

কিন্তু তার মানে যদি করা হয়, “অশ্লীল সিনেমা” সিনেমার ডিস্ট্রিবিউদের কারসাজি – এইভাবে দেখলে খুবই বড় ভুল হবে। যেইরকম ভুল হবে “পাবলিক খায় বইলাই” এইসব সিনেমা বানানো হইছিল – এইভাবে আইডেন্টিফাই করলে। ২০০১ সালে মানস চৌধুরী উনার একটা লেখায় (https://bit.ly/32BRIX5) “অশ্লীল সিনেমা” নিয়া আলাপ করতে গিয়া এই ডিস্ট্রিবিউটদের কন্ট্রিবিউশনের জায়গাটারে আরো ক্লাইমেক্স দিয়া বলছিলেন যে, জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পিছনে এরা দায়ী থাকতে পারেন: “জহির রায়হান যে কারণেই নিখোঁজ হোন না কেন, তাঁর অপসারণ পর্নোব্যবসাকে সহজ করে দিয়েছে। তিনি একে মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন এবং শুরু করেছিলেন।” এই ‘দেশি সিনেমা ভার্সেস আমদানি করা সিনেমার’ কনফ্লিক্টটটা যে ছিলো না – তা না, কিন্তু এতদূর পর্যন্ত ধারণাটারে এক্সটেন্ড করতে পারাটা মোস্টলি একটা “কন্সপিরেসি থিওরি”ই না, “বিকল্প ধারার সিনেমার” ন্যারেটিভটার প্রতি বিপ্লবী-জোশের ঘটনাও। যে, শেখ মুজিবর রহমান বাঁইচা থাকলে অন্যরকম কিছু হইতো, এইরকম জহির রায়হানরে বাংলা সিনেমার বাইরে ‘শেখ মুজিবর রহমান’ বানানোই। (জাতীয়তাবাদী আইকনের চিন্তার একরকমের এক্সটেনশন।)

আর “বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরপরই বাইরে থেকে পর্নোগ্রাফি আমদানি করার ব্যবস্থা হয়েছে” – উনার এই কথাও কতোটা সত্যি আমি জানি না, আমি যদ্দূর জানি, বিদেশি ছবি ইম্পোর্ট করার  পারমিশন ছিল, পর্ণোগ্রাফি না মনেহয়; তো ইর্ম্পোটার’রা হয়তো কিছু ‘সেক্স সিন’ আছে এইরকম সিনেমাই আনতেন, কিন্তু ১৯৯০’র আগে এই আমদানি করা সিনেমা সিনেমাহল দখল করতে পারে নাই। বরং “বাংলা সিনেমা” বানাইতে না পারাই আমদানি করা সিনেমারে স্পেইস দিতে পারছে। আর অই আমদানি করা সিনেমাগুলাতে পরে পর্ণ-সিনেমার সিন ঢুকায়া দেয়া হইতো, আর তারওপরে দেশি কাটপিস ঢুকানো হইতো, দ্যান “অশ্লীল সিনেমা” বানানো শুরু হইলো। প্রসেসটারে এইভাবে দেখলে “অশ্লীল সিনেমার” জায়গাটারে ভালোভাবে বুঝা যাবে মনেহয়।

“অশ্লীল সিনেমা”র মেইন সিগনেচার ছিল – কম টাকায় বানানো যায়। লস হইলেও কম লস হবে, আর এই নায়ক-নায়িকাদের যেহেতু তেমন কোন ইমেজ নাই, ফ্লপ হইলেও তেমন কোন ক্ষতি নাই, আর লাভ হইলে তো পুরাটাই লাভ, সবারই লাভ। এইভাবে, “কাটপিস” জিনিসটারেই “অশ্লীল সিনেমা” বানানোর একটা ঘটনা ঘটে বইলাই আমার ধারণা।

হিন্দি সিনেমায় যেইটা ‘আইটেম সং’, এইরকম কিছু জিনিসও মেবি ট্রাই করা হইছিল, আগে থিকাই। পরে ফুল লেংথ সিনেমার দিকে যাওয়া হয়। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকে দুয়েকটা সিনেমা বানানো হইলেও, ১৯৯৯ সালে মুনমুনের “রাণী কেন ডাকাত” মেবি “অশ্লীল সিনেমা”র প্রথম হিট সিনেমা। এইখানে একটা জিনিস খেয়াল করতে পারেন, নায়িকারাই কিন্তু মেইন; মানে, নায়করা “অশ্লীলতা” করেন নাই – তা না, নায়কদের “অশ্লীলতা” কিন্তু বেচা হয় নাই। আর সিনেমার নামগুলা দেখেন “মেয়েরাও মানুষ” “মহিলা হোস্টেল” “লেডি র‌্যাম্বো”… যা যা নাম আছে, বেশিরভাগই নায়িকা-বেইজড। আমরা চিনিও নায়িকাদেরকেই – মুনমুন, ময়ূরী, পলি… উনাদেরকেই। নায়ক যারা ছিলেন, তারা বরং এনাফ নায়ক না; আমিন খান বা আলেকজেন্ডার বো’রে আমরা চিনি মুনমুন বা ময়ূরীর নায়ক হিসাবে; যেইরকম শাবানা ছিলেন রাজ্জাকের নায়িকা, শাবনুর সালমান খানের। মানে, রোল’টা চেইঞ্জ হয়া গেছিল। কিন্তু এইটা কোনভাবেই “নারীবাদের” বিজয় ছিল না।

মানস চৌধুরী খুব রাইটলি এই জায়গাটারে মার্ক করছিলেন উনার লেখাটাতে যে, “অশ্লীল সিনেমার” নায়িকাদেরকেই এফডিসি’তে নিষিদ্ধ কইরা খালি ভিক্টিমই বানানো হইতেছে না, ইন্ড্রাষ্ট্রির সমস্যাগুলারেও হাইড করা হইতেছে। দেখেন, “নারীবাদ” আমাদের কতো কাজে লাগে! “অশ্লীল সিনেমা” বানাইতে লাগে, “অশ্লীল সিনেমা বন্ধ করতেও লাগে! এই কারণে “অশ্লীল” কিনা বা কেমনে “অশ্লীল” সেই আলাপে না গিয়া বরং “অশ্লীলতা” ব্যাপারটারে একটা পলিটিক্যাল ক্যাটাগরি হিসাবে কন্সিডার করতে পারাটা দরকার, সেই জায়গাটাতেই আমি জোর দিতে চাই। (সিনেমা’তে নারীর ইমেজ, বা মুসলমান রিপ্রেজেন্টেশন, মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ – এইগুলা যে ইর্ম্পটেন্ট না, তা না; কিন্তু এই আলাপগুলা আমি ততটুকই রাখতে চাইতেছি, যতটুক এই হিস্ট্রি রিডিংয়ের সাথে রিলিভেন্ট। যেহেতু আমার আলাপ ব্রিফ, ডিটেইল না। র এই আলাপগুলা অনেক বেশি ডিটেইলিং ডিমান্ড করে বইলাই আমার ধারণা।)

গ্রামে-মফস্বলে যাত্রার আয়োজন বন্ধ হওয়ার সময়ও কিন্তু এই “অশ্লীলতা” ধারণাটারে ইউজ করা হইছিল। ব্যাপারটা এইরকম না যে, “অশ্লীলতা” ছিল না, যাত্রা’তে  ‘প্রিন্সেস’ রাখাই হইতো, স্ট্রিপ-ড্যান্স দেখানোর লাইগা। আর এই প্রিন্সেসদের দিয়াই শুরুর দিকে কাটপিসগুলা বানানো হইতো। যুক্তিটা ছিল এইরকম যে, যাত্রাপালা দেখতে যেহেতু লোকজন আসে না, নাচ দেখতে হইলেও তো আসবে; একইভাবে সিনেমাহলে সিনেমা দেখতে যেহেতু আসে না লোকজন, এই কারণে “অশ্লীলতা” হেল্প করবে। কিন্তু মূল সমস্যাটা খেয়াল না কইরা এইরকম টোটকা দিয়া তো সমস্যার সমাধান হয়-ই না, বরং এইটা একটা লক্ষণ যে, ইটস ডাইয়িং। (তত্ত্বাবধায় সরকার দিয়া যেইরকম পলিটিক্যাল সিস্টেমটারে বাঁচানো যায় নাই; এইখানে মার সাজেশন অবশ্যই ‘তত্ত্ববধায়ক সরকার’রে একটা পলিটিক্যাল ‘অশ্লীলতা’ হিসাবে রিড করার।…) এইটা অ্যাজ অ্যা আর্ট-ফর্ম বা এন্টারটেইনিং মিডিয়াম হিসাবে তার এক্সপেক্টশনের জায়গাটারে ফুলফিল করতে পারতেছে না,  সেইটা যে কোন কারণেই হোক, সেইটারে এর অতিরিক্ত কিছু দিয়া তো বাঁচায়া রাখতে পারবেন না, বরং কোন জায়গাটাতে এইটা ফেইলওর, সেইটারে যদি আইডেন্টিফাই না করতে পারেন। তো, এই চেষ্টাটা না হওয়াটাই “অশ্লীল সিনেমা” এমার্জ করার মেইন কারণ।

……………………………….

“যাত্রা-শিল্পে অশ্লীলতা”

 ১৯৮০ দশকেও যাত্রা চলতো অনেক; মানে, এন্টারটেইনমেন্ট তো ছিলই, আর্ট হিসাবে দেখা যাইতো মনেহয়; আর খালি গ্রামে গঞ্জে না, ঢাকার গাবতলি, যাত্রাবাড়ি বা গুলিস্তানের দিকে, মানে পেরিফেরিগুলাতেও যাত্রাপালার চল থাকার কথা। মানে, আরবান কালচারের ঘটনা না হইলেও, লোক-সঙ্গীত বা ফোক-সং 🙂 এর মতন বাঁইচা ছিল।

এইরকম ধারণা চালু আছে যে, ঘরে ঘরে যখন টিভি আসা শুরু হইলো, যাত্রা দেখতে কেউ আর যাইতো না, তখন যাত্রা-শিল্প’রে 🙂 বাঁচানোর লাইগা একটা জিনিস আমদানি হইলো, সেইটা হইলো, ‘প্রিসেন্স’… প্রথমদিকে যাত্রার বিরতিতে আর শেষে স্টেইজে উঠতেন এই প্রিন্সেস, ‘ড্যান্স’ করার জন্য; গরিবের স্ট্রিপ ড্যান্স ছিল এই ‘ড্যান্স’। (ঢাকাই সিনেমার কাটপিস অই জায়গা থিকাই আসার কথা।) কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা গেলো, যাত্রাপালার চাইতে প্রিন্সেসের ড্যান্সই মেইন আকর্ষণ হয়া উঠলো। যাত্রাপালা তো গেলোই, প্রিন্সেসের ড্যান্সও ‘অশ্লীল’ বইলা থানা-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট আইসা বন্ধ কইরা দিতে থাকলো। এই যাত্রাপালা এখনো ‘ডায়িং আর্ট’ হিসাবে এনজিওদের শিক্ষা-মূলক ‘পথ-নাটক’ হিসাবে একভাবে টিইকা আছে মনেহয়।…

তো, এই যে ‘অশ্লীলতা’ দিয়া যাত্রাপালা আর বাংলা সিনেমারে ‘বাঁচায়া’ রাখার চেষ্টা করা হইছিল, সেইটা ভাবতে গিয়া মনে হইতেছিল; এন্টারটেইনমেন্ট তো আসলে দিতে পারতেছিল না ফর্মগুলা, বুঝতেও পারতেছিল না যে, দোষটা কার? ভাবতেছিল, দুশমন হইতেছে, টিভি-সিনেমা! তখন কম্পিট করতে গিয়া, যা সে করতো, তার বাইরে আরো কিছু অফার করতে গিয়া, অইখানেই ধরাটা খাইলো। তো, আমার কথা এইটা না যে, প্রিন্সেসের ড্যান্স না ঢুকাইলে যাত্রা বাঁইচা যাইতো, বরং ‘অডিয়েন্স যা চায়’ তার কাছে সারেন্ডার করার ভিতর দিয়াই এইটা মারা গেল আসলে!

ব্যাপারটা এমন না যে, আপনার রিডার বা অডিয়েন্স ‘কোন চুদির ভাই’ বা উনারা কাস্টমার বা দেবতা; বরং আমি বলতে চাইতেছি, এই ট্রাপটার ভিতরে পইড়েন না!

 ……………………………….

 

বাংলাদেশের এই “অশ্লীল সিনেমার” কাছাকাছি একটা ঘটনা মনে হইছে জাপানি “পিংক মুভি”। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পরে যখন ইন্ড্রাষ্ট্রিটা নাই হয়া গেছে তখন অল্প বাজেটের, ইনডোর লোকেশন-বেইজড, কম কারেক্টারঅলা কাহিনি দিয়া সেক্সুয়াল ইস্যুর উপ্রে বেইজ কইরা সিনেমা বানানো হইতো। সারভাইবালের একটা ইস্যু ছিল তখন জাপানি সিনেমার। কিন্তু বাংলাদেশের সিনেমার এই ক্রাইসিসটা জাপানের মতো এক্সাটার্নাল কোন ঘটনা ছিল না, পুরাপুরি ইনটার্নাল একটা ক্রাইসিস। মানে, “অশ্লীল সিনেমার” কারণে বাংলা সিনেমা ‘নষ্ট’ হয়া যায় নাই, বরং আমরা এমন একটা ধারণা তৈরি কইরা রাখছি বাংলা সিনেমার যেইটা পাবলিকের লগে কানেক্ট করতে পারে না, আর এই ভ্যাকুয়ামটারে ফুলফিল করার একটা মরিয়া এবং সুইসাইডাল চেষ্টা ছিল হইতেছে “অশ্লীল সিনেমা”।

মানে, “অশ্লীল সিনেমা” অশ্লীল কিনা এইটা কোন কাজের আলাপ না, বরং “অশ্লীলতা” কেন আসছিল আর কেমনে ইউজ হইলো, এইটাই হইতেছে ঘটনা। বাংলা সিনেমা তো হয় না, আর পাবলিকে ‘ভালো’ সিনেমা চিনে না, বুঝে না… দোষ হইলো পাবলিকের! কিন্তু বিজনেস তো বাঁচায়া রাখতে হবে, ইন্ড্রাষ্ট্রিরে তো টিকায়া রাখতে হবে! ডিস্ট্রিবিউটর, সিনেমাহল মালিকেরা কি করবে! – এইটা ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড “অশ্লীল সিনেমা” বানানোর। একটা জিনিস খোঁজ করা দরকার, এই “অশ্লীল সিনেমার” বেশিরভাগ প্রডিউসারও সিনেমা হল মালিক আর ডিস্ট্রিবিউটর’রা ছিলেন কিনা। (ডিপজল তো সিনেমা হলের মালিকই ছিলেন, সিনেমার প্রডিউসারও। উনি বিএনপিও করতেন। ডেমোনাইজ করাটা সহজ হইতে পারে এখন, ২০২০ সালে। :p )

র এফডিসি ভার্সেস ‘চলচ্চিত্র সংসদ’ আন্দোলনের একটা গ্যাঞ্জামও এইখানে আছে মনেহয়, যেইটা এইটিইজেই আলমগীর কবিরের লগে এহতেশাম, খান আতা’দের কিছুটা ছিল। কিন্তু এইটা কোন চর-দখলের ঘটনার চাইতে  আইডিওলজির জায়গা থিকাই দেখতে চাইতেছি।…

তো, এফডিসির লোকজন  ‘অশ্লীল সিনেমা’  বানানো শুরু করার পরেই মাদের ‘রুচিশীল মিডিয়া’ ‘ভালো সিনেমা’র লোকরা,খপ কইরা ধরলো যে, কইছিলাম না! বাংলা সিনেমা অশ্লীল! এই দেখেন, এরা অশ্লীল! এদের কারণেই ‘ভালো সিনেমা’ বানানো যায় না! এইটা ‘বিকল্প ধারা’র সিনেমারে এইভাবে একটা মোরাল বুস্ট দিতে পারছিল। যে, এদের সিনেমা তো হয় না! কিন্তু এইটা ভালো সিনেমা বা খারাপ সিনেমার মামলা কখনোই ছিল না। এইখানে একটা কালচারের, এন্টারটেইনমেন্টের মার্কেট আছে, যেইটা বাংলা সিনেমা ফুলফিল করতে পারতেছে না।  মাঝখান দিয়া যা হইলো, যেই লাউ সেই কদু! বাংলা সিনেমা বাংলা সিনেমাই হয়া থাকলো।

আর সিনেমাহলে যে যাওয়ার মতো ‘পরিবেশ’ নাই – এই ‘সত্য’টারে উদাহারণসহ প্রমাণ করা গেছিল। একটু কস্টলি হইলেও মিডলক্লাসের সিনেপ্লেক্সে যাওয়াটা জাস্টিফাইড হয় তখন। টেকনোলজির কারণেই ট্রাডিশন্যাল সিনেমা হলগুলার বিজনেসে টিইকা থাকাটা মুশকিলের ছিল, সেইটা ‘অশ্লীল সিনেমা’ দিয়া জাস্টিফাই হইলো আরেকটু, এর বেশি কিছু না মনেহয়। মানে, সিনেমা হল ব্যবসা এবং বাংলা সিনেমা অলরেডি ডেড একটা সিচুয়েশনে পৌঁছায়া গেছিল। বছরে যদি ১০০টা সিনেমাও বানানো হয়, আর সিনেমার বাজেট যদি ৫০ লাখ টাকাও হয়, মার্কেট ৫০ কোটি টাকার বেশি না! ৫,৬৮,০০০ কোটি টাকার বাজেটের দেশে ৫০ কোটি টাকার একটা মার্কেট! মানে, এইটা নিয়া কথা বলাও সময় নষ্ট করা না! 🙂

একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস খেয়াল কইরা দেখবেন, সিনেমা হলে যেই ‘জঙ্গি হামলা’ আর সেক্যুলার যেই নাক সিটকানি ‘অশ্লীল’ বইলা আইডেন্টিফাই করা, দুইটা কাছাকাছি রকমেরই ঘটনা। মানে, ‘বিকল্প ধারার’ লোকজন এই সিনেমার পোস্টারে আলকাতরা মাখাইছেন, আর ‘জঙ্গিরা’ বোমা হামলা করছে, দুইদলই কিন্তু একমত যে, এই সিনেমা চলতে দেয়া উচিত না! এই ঐক্য কোন কো-ইন্সিডেন্স না আর কি! বরং একটা আইডিওলজির জায়গা দিয়া পাবলিকের লাইফরে ঢাইকা দিতে চাওয়ার অভ্যাসের ঘটনাই কম-বেশি।

তো, মানস চৌধুরী যেমন বলছেন এইরকম ৫০টা টিভি চ্যানেল আসার কারণে এই ‘অশ্লীল সিনেমা’ বন্ধ হয়া যায় নাই। যারা ৫০টা টিভি চ্যানেলে কাস্টমার তারা ‘অশ্লীল সিনেমা’র কাস্টমার কখনোই ছিলেন না। মাঝে-মধ্যে উঁকি-ঝুঁকি দিতেন হয়তো, আর তাছাড়া তখন ভিসিআর এর যুগ পার হয়া সিডি-ডিভিডি’রও যুগ চইলা আসছে। অই গ্রুপটা প্রাইভেটলি পর্ণোগ্রাফি কনজামশনের দিকে আরো আগায়া যাইতে পারার কথা তখন। মানে, যারা সিনেমাহলে গিয়া দেখতেন তাদের সবাই সিডি-ডিভিডি এফোর্ড করতে পারতেন – এইটা আমার ক্লেইম না; বরং যারা বাংলা সিনেমার দর্শক তারা খালি ‘অশ্লীল’ জিনিসই দেখতে চান, এই আইডেন্টিফেকশনটাই ঠিক না! যেই লোকটা পর্নোগ্রাফি দেখে, সে আর্ট-ফিল্ম দেখতে পারবে না, বা যেই আর্ট বুঝে, সেই লোক এন্টারটেইনমেন্ট খুঁজে না – চয়েসের ব্যাপারগুলা তো এইরকম কম্পার্টমেন্টাল না, বরং মাল্টিপল!

পাবলিক যতো না ভালগার তার চাইতে পাবলিক ‘অশ্লীল’ জিনিসই দেখতে চায় – এই অনুমান তার চাইতে বেশি ভালগার। যারা ‘অশ্লীল সিনেমা’ বানাইছিলেন আর যারা এর এগেনেস্টে লেখালেখি করছেন, অ্যাক্টিভিজম করছেন, তারা এই ‘অশ্লীল’ জায়গাটাতেই সাবস্ক্রাইব করছেন। যে, পাবলিক এইটাই চায়! বা পাবলিক তো বুঝে না! সব দোষ পাবলিকের! এইরকম।

তো, এখনো উইকিপিডিয়া বা অন্য অনেক জায়গায় এই ‘অশ্লীল সিনেমাগুলার’ হদিস পাইবেন না। অ্যাজ ইফ, এইগুলা কোনদিন ঘটে নাই। এই সিনেমাগুলারে বাতিল না কইরা এর সিগনিফিকেন্স বুঝার ট্রাই করতে পারাটা বরং বেটার। যেমন, হুমায়ূন ফরিদী, এই ‘অশ্লীল’ যুগের লোক, ডিপজল তো এখন “কাল্ট” হওয়ার পথে; নাসরিন নামে একজন ছিলেন, দিলদারের নায়িকা, লিড রোল পান নাই কখনো, কিন্তু শি ওয়াজ অ্যামেজিং সামটাইমস!… মানে, শুধু ‘অশ্লীল সিনেমা’ এই ট্যাগ কোন কাজের জিনিস না, কখনোই, এই টাইমটারে বুঝার লাইগা, বরং পলিটিক্যালি এবং ইন্টেলেকচুয়ালি মিসলিডিং একটা এপ্রোচ।

তো, ‘অশ্লীল সিনেমা’-ই বাংলা সিনেমার শেষ না, এর পরে আরো ১০/১৫ বছর টাইম পার হইছে; অনেক সিনেমাই বানানোই হইছে। কিন্তু ‘অশ্লীল সিনেমা’ বন্ধ হওয়ার পরে ধীরে ধীরে সিনেমা হলগুলা বন্ধ হইতে শুরু করে, ১২০০/১৩০০ থিকা একটা সময় ৭০/৮০টা নাইমা আসে মনেহয়। নতুন জায়গাগুলা, যেমন সিনেপ্লেক্স, টিভি চ্যানেল, ইউটিউব, স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলা’তে বাংলা সিনেমার প্রেজেন্স নাই থিকা আরো নাই এর দিকেই যাইতেছে। এর কারণ আমরা ধইরা নিছি যে, এইগুলাতে ‘গরিব’ লোকজনের কোন একসেস নাই, এইগুলা খুব ‘উচ্চ রুচি’র জায়গা; আর ‘বাংলা-সিনেমা’ এইখানে ফিট-ইন করে না। এই কারণে হিরো আলমের হিট দেখলে আমরা টাশকি খায়া যাই, টিকটকের অপুভাই’রে দেখলে ভাবি, এরা এই দুনিয়াতে কেমনে আইলো! তো, এইগুলা খুবই ভুল ধারণা আসলে। মেবি, আরেকটা রূপবান, ছুটির ঘন্টা, বেদের মেয়ে ছোসনা’র পরে আবার কিছুটা বুঝতে পারবো আমরা। কিন্তু সেই সিনেমাগুলারে আমরা আইডেন্টিফাই করতে যাতে রাজি থাকতে পারি, এই কারণেই এই আমার এই ব্রিফ হিস্ট্রিটা লিখতে চাওয়া। কারণ আমি মনে করি, বাংলা সিনেমার এই যে পাবলিক-অরিয়েন্টেড না হইতে পারা, এইটা খালি সিনেমা-রিলেটেড লোকজনের না-পারা না, যারা সিনেমা নিয়া কাজ-বাজ করেন, আলাপ-আলোচনা করেন, তাদের বাংলা সিনেমার জায়গাটারে ধরতে না পারার (বা চাওয়ার?) একটা ইন্টেলেকচুয়াল ফেইলওরেরও ঘটনা।

তো, পরের চ্যাপ্টার’টা আমি লিখতে চাই এই পর্যন্ত বাংলা সিনেমা নিয়া যেই লেখালেখি হইছে, সেইটার রিপ্রেজেন্টেটিভ বা লোকজন বলাবলি করেন এইরকম লেখালেখিগুলা নিয়া।

 

The following two tabs change content below.
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য