Main menu

আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (৩)

১ ।।  ২ ।।

 

দ্বিতীয় পর্ব

রঙ্গালয়ে

মহাশয়!

আপনার যে এখনও আমার জীবনের  দু:খময়  কাহিনী শুনিতে ধৈর্য্য আছে, ইহা কেবল আমার উপর মহাশয়ের অপরিমিত স্নেহের পরিচয়।

আপনি পত্রে বলিতেছেন যে, প্রতি  চরিত্র অভিনয়ে আমি মানুষের মনে দেবভাব অঙ্কিত করিয়াছি। দর্শক অভিনয় দর্শনে আনন্দ করিয়াছেন ও মনঃসংযোগে দেখিয়াছেন বটে, কিন্তু কিরূপে  তাঁহাদের  হৃদয়ে দেব-ছবি অঙ্কিত করিয়াছি, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। যদি অবকাশ হয় হয় তবে বুঝাইয়া দিবেন। এক্ষণে যদি ধৈর্য্য থাকে তবে আমার নাটকীয় জীবন শুনুন!

আমি যখন প্রথম থিয়েটারে যাই, তখন রসিক নিয়োগীর গঙ্গার ঘাটের উপর যে বাড়ী ছিল, তাঁহাতে থিয়েটারের রিহার্সাল হইত। সে স্থান  যদিও  আমার বিশেষ  স্বরণ নাই, তবুও অল্প অল্প মনে পড়ে।  বড়ই রমণীয় স্থান ছিল, একেবারে গঙ্গার উপরে বাড়ী ও বারান্দা, নীচে গঙ্গার বড় বাঁধান ঘাট;  দুই ধারে অন্তিমপথযাত্রীদিগের বিশ্রাম ঘর।  সেই বালিকা কালের  সেই রমণীয় ছবি দূর স্মৃতির ন্যায় এখনও  আমার মনোমধ্যে জাগিয়া আছে, কেমন গঙ্গা কুল কুল করিয়া বহিয়া যাইত। আমি সেই টানা-বারান্দায় ছুটাছুটি করিয়া খেলিয়া বেড়াইতাম । আমার মনে কত আনন্দ, কত সুখ-স্বপ্ন ফুটিয়া উঠিত। বালিকা বলিয়াই হউক, কিম্বা শিক্ষাকার্য্যে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়াই হউক, সকলে আমাকে বিশেষ  স্নেহ ও যত্ন করিতেন। আমরা যে তখন বড় গরীব ছিলাম,  তাহা পূর্ব্বেই বলিয়াছি;  ঐ নিজের  একটী বসত বাটী ছাড়া  ভাল কাপড়-জামা বা অন্য দ্রব্যাদি কিছুই ছিল না। সেই সময়ে “রাজা”  বলিয়া যে প্রধানা অভিনেত্রী ছিলেন, তিনি আমায় ছোট হাত-কাটা দুটি ছিটের জামা তৈয়ারী করাইয়া দেন। তাহা পাইয়া আমার কত যে আনন্দ সকলে হইয়াছিল,  তাহা বলিতে পারি না। সেই জামা দুইটীই আমার শীতের  সম্বল ছিল। সকলে বলিত যে এই মেয়েটীকে ভাল করিয়া শিক্ষা দিলে বোধ হয় খুব কাজের লোক হইবে। তখন ধর্ম্মদাস সুর মহাশয় ম্যানেজার ছিলেন, অবিনাশচন্দ্র কর মহাশয় আসিস্ট্যাণ্ট ম্যানেজার ছিলেন। আর বোধ হয় বাবু মহেন্দ্রনাথ বসু i শিক্ষা দিতেন। আমার সব মনে পড়ে না। তবে তখন বেলবাবু , মহেন্দ্রবাবু, অর্দ্ধেন্দুবাবু ও গোপালবাবু,  ইহারাই  বুঝি  সব শিক্ষা দিতেন। তখন বাবু রাধামাধব করও  উক্ত থিয়েটারে  অভিনয় কার্য্য  করিতেন এবং বর্ত্তমান সময়ে সম্মানিত  সুপ্রসিদ্ধ ডাক্তার শ্রীযুক্ত রাধাগোবিন্দ কর মহাশয়ও উক্ত ন্যাশনাল থিয়েটারে ii  অবৈতনিক অভিনেতা ছিলেন। ইঁহারা সকলে পরামর্শ করিয়া আমার “বেণী-সংহার” iii পুস্তকে  একটি  ছোট পার্ট দিলেন, সেটি দ্রৌপদীর একটি সখীর পার্ট,  অতি অল্প কথা। তখনই বই প্রস্তুত হইলে, নাট্যমন্দিরে গিয়া ড্রেস-রিহার্সাল দিতে হইত। যে দিন উক্ত বই-এর ড্রেস-রিহার্সাল হয়, সেদিন  আমার তত ভয় হয় নাই, কেননা – রিহার্সাল বাড়ীতেও যাহারা দেখিত, সেখানেও প্রায় তাহারাই সকলে এবং দুই-চারিজন অন্য লোকও থাকিত। কিন্তু যে দিন পার্ট লইয়া জনসাধারণের সম্মুখে  ষ্টেজে বাহির হইতে হইল, যে দিন হৃদয়ভাব ও মনের ব্যাকুলতা কেমন করিয়া বলিব। সেই সকল উজ্জ্বল আলোকমালা, সহস্র সহস্র লোকের উৎসাহপূর্ণ দৃষ্টি,  এই সব দেখিয়া শুনিয়া আমার সমস্ত শরীর ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিল, বুকের ভিতর গুর্ গুর্  করিতে লাগিল, পা দুটিও থর্ থর্ করিয়া কাঁপিয়া উঠিল, আর চক্ষের উপর সেই সকল উজ্জ্বল দৃশ্য যেন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হইয়া গেল বলিয়া মনে হইতে লাগিল।  ভিতর হইতে অধ্যক্ষেরা আমায় আশ্বাস দিতে লাগিলেন। ভয়, ভাবনা ও মনের চঞ্চলতার সহিত কেমন একটা কিসের আগ্রহও যেন মনের মনের ভেতর উথলিয়া উঠিতে লাগিল। তাহা কেমন করিয়া বলিব?  একে আমি অতিশয় বালিকা,  তাহাতে গরীবের কন্যা,  কখন এরূপ সমারোহ স্থানে যাইতে বা কার্য্য করিতে পারি নাই।  বাল্যকালে কতবার মাতার মুখে শুনিতাম ভয় পাইলে হরিকে ডাকিও, আমিও ভয়ে ভয়ে ভগবানকে স্মরণ করিয়া, যে কয়টী কথা বলিবার জন্য প্রেরিত হইয়াছিলাম, প্রাণপণ যত্নে  তাঁহাদের শিক্ষানুযায়ী সুচারুরূপে ও সেইরূপ ভাবভঙ্গীর সহিত বলিয়া চলিয়া আসিলাম। আসিবার সময় সমস্ত দর্শক আনন্দধ্বনি করিয়া করতালি দিতে লাগিলেন। ভয়েই হউক, আর উত্তেজনাতেই হউক, আমার তখনও গা কাঁপিতেছিল। ভিতরে আসিতে অধ্যক্ষেরা কত আদর করিলেন। কিন্তু তখন করতালির কি মর্ম্ম তাহা জানিতাম না। পরে সকলে বুঝাইয়া দিয়াছিলেন, যে কার্য্যে সফলতা লাভ করিলে আনন্দে করতালি দিয়া থাকেন।

ইহার কিছুদিন পরেই সকলে পরামর্শ করিয়া আমার হরলাল রায়ের, “হেমলতা” নাটকে হেমলতার ভূমিকায় অভিনয় করিবার জন্য শিক্ষা দিতে লাগিলেন। আমার পার্ট শিখিবার আগ্রহ দেখিয়া সকলে বলিত যে এই মেয়েটী হেমলতার পার্ট ভাল করিয়া অভিনয় করিতে পারিবে। এই সময় আর একজন অভিনেত্রী আসিলেন ও সেইসঙ্গে মদনমোহন বর্ম্মণ অপেরা মাষ্টার হইয়া থিয়েটারে যোগ দিলেন। উক্ত অভিনেত্রীর নাম কদম্বিনী দাসী। বহুদিন যাবৎ বিশেষ সুখ্যাতির সহিত কাদম্বিনী  অভিনয় কার্য্য করিয়াছেন। এক্ষণে  তিনি অবসরপ্রাপ্তা। এই “হেমলতা” অভিনয় শিক্ষা দিবার সময় আমার হৃদয় যেন উৎসাহ ও আনন্দে উৎফল্ল হইয়া উঠিল। আমি যখন কার্য্য স্থান হইতে বাড়িতে আসিতাম, সেই সকল কার্য্য আমার মনে আঁকা থাকিত। তাঁহারা যেমন করিয়া বলিয়া দিতেন, যেমন করিয়া ভাব ভঙ্গি সকল দেখাইয়া দিতেন সেই সকল যেন আমার খেলার সঙ্গীনিদের ন্যায় চারিদিকে ঘেরিয়া থাকিত। আমি যখন বাড়িতে খেলা করিতাম তখনও যেন একটা অব্যক্ত শক্তি দ্বারা সেই দিকেই আচ্ছন্ন থাকিতাম। বাড়িতে থাকিতে মন সরিত না, কখন আবার গাড়ী আসিবে, কখন আমায় লইয়া যাইবে, তেমনি করিয়া নূতন নূতন সকল শিখিব, এই সকল সদাই মনে হইত। যদিও তখন আমি ছোট ছিলাম, তবুও মনের ভেতর কেমন একটা উৎসাহপূর্ণ  মধুর ভাব ঘুড়িয়া বেড়ইত। ইহার পর যখন আমার শিক্ষা শেষ হইয়া অভিনয়ের দিন আসিল তখন আর প্রথমবারের মত ভয় হইল না বটে, কিন্তু বুকের ভেতর কেমন করিতে লাগিল। সেই দিন আমি রাজকন্যার অভিনয় করিব কিনা – তকতকে ঝকঝকে উজ্জ্বল পোষাক দেখিয়া ভারি আমোদ হইল। তেমন পোষাক পরা দূরে থাক্, কখন চক্ষেও দেখি নাই। যাহা হউক, ঈশ্বরের দয়াতে আমি “হেমলতা”-র পার্ট সুচারু রূপে অভিনয় করিলাম। তখন হইতে লোকে বলিত যে “ইহার উপর ঈশ্বরের দয়া আছে।” আর আমারও এখন বেশ মনে হয়, যে আমার ন্যায় এমন ক্ষুদ্র দূর্ব্বল বালিকা ঈশ্বরের অনুগ্রহ ব্যতিত কেমন করিয়া সেরূপ দূরুহ কার্য সমাপন করিয়াছিল। কেননা আমার কোন গুন ছিল না। তখন ভাল লেখাপড়াও জানিতাম না, গান ভাল জানিতাম না। তবে শিখিবার বড়ই আগ্রহ ছিল।

সেই সময় হইতে আমি প্রায় প্রধান পার্ট অভিনয় করিতে বাধ্য হইতাম। আমার অগ্রবর্তী অভিনেত্রীগণ যদিও আমার অপেক্ষা অধিক বয়স্কা ছিলেন, কিন্তু আমি তাঁহাদের বয়সে সমান না হলেও অল্প দিনে কাজে তাঁহাদের সমান হইয়া ছিলাম। ইহার কয়েকমাস পরেই “গ্রেট ন্যাশনাল” থিয়েটার কোম্পানী পশ্চিম অঞ্চলে থিয়েটার করিতে বাহির হন, এবং আমার আর পাঁচ টাকা মাহিনা বৃদ্ধি করিয়া আমাকে ও আমার মাতাকে সঙ্গে লইয়া যান। তাঁহারা নানা দেশ ভ্রমন করেন। পশ্চিমে থিয়েটার করিবার সময় দু’একটী ঘটনা শুনুন – যদিও সে ঘটনা শুধু আমার সম্বন্ধে নয় তবুও তাহা কৌতুহলকর।

একরাত্রে লক্ষ্ণৌ নগরে ছত্রমন্ডিতে আমাদের ‘নীলদর্পণ’ অভিনয় হইতেছিল, সেই দিন লক্ষ্ণৌ নগরের প্রায় সকল সাহেব থিয়েটার দেখিতে আসিয়া ছিলেন। যে স্থানে রোগসাহেব ক্ষেত্রমণির উপর অবৈধ অত্যাচার করিতে উদ্যত হইল, তোরাপ দরজা ভাঙ্গিয়া রোগ সাহেবকে মারে, সেই সময় নবীন মাধব ক্ষেত্রমণিকে লইয়া চলিয়া যায়। একে ত ‘নীলদর্পণ’ পুস্তকই অতি উৎকৃষ্ট অভিনয় হইতে ছিল;  তাহাতে বাবু মতিলাল সুর-তোরাপ, অবিনাশ কর মহাশয় মিষ্টার রোগ সাহেবের অংশ অতিশয় দক্ষতার সহিত অভিনয় করিতেছিলেন। ইহা দেখিয়া সাহেবেরা বড়ই উত্তেজিত হইয়া উঠিল। একটা গোলযোগ হইয়া পড়িল এবং একজন সাহেব দৌড়িয়া একেবারে স্টেজের উপর উঠিয়া তোরাপ-কে মারিতে উদ্যত! এইরূপ কারণে আমাদের কান্না, অধ্যক্ষদিগের ভয়, আর ম্যানেজার ধর্ম্মদাস সুর মহাশয়ের কাঁপুনি!! তারপর অভিনয় বন্ধ করিয়া, পোষাক আসবাব বাঁধিয়া ছাঁদিয়া বাসায় একরকম পলায়ন!! পরদিন প্রাতেই লক্ষ্ণৌ নগর পরিত্যাগ করিয়া হাঁপ ছাড়েন!!!

ইহার পরে আমরা যদিও অনেক স্থানে গিয়াছিলাম কিন্তু সব কথা আমার মনে নেই, তবে দিল্লীতে মাছির ঘর, বিছানা ব্যতীত কিছুই দেখা যাইত না! এবং সেই প্রথম ভিস্তির জলে স্নান করিতে আমার আপত্তি, মাতার ক্রমাগত রোদন দেখিয়া, আমার মাকে একটি ইঁদারার জল নিজ হাতে তুলিয়া স্নান আহার করিবার সুবিধা করিয়া দেওয়ায় সন্তুষ্ট হইলেন। আর তাদের ভিস্তির জলই বন্দোবস্ত। দিল্লীতে আর একটি ঘটনা হয় তাহা ক্ষুদ্র হইলেও আমার বেশ মনে আছে। দিল্লীর বাড়ির খোলা ছাদে আমি একদিন ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিতেছিলাম। কি কারণে মনে নেই, কাদম্বিনীর তাহা অসহ্য হওয়ায় আমার হাত ধরিয়া আমার গালে দুই চড় মারেন, সেই দিন আমরা মায়ে-ঝীয়ে সারাদিন কাঁদিয়া ছিলাম। মা আমার মনের দুঃখে কিছু খান নাই, আমিও মায়ের কাছে সমস্ত দিন বসিয়া ছিলাম, শেষে বৈকালে থিয়েটারের বাবুরা আমায় জোর করিয়া আহার করান। আমার মা কিন্তু সেই দিন কিছুই আহার করিলেন না। একে ত দিল্লী সহরে মুসলমানের বাড়াবাড়ি দেখিয়া মা আমার ক্রমাগতই কাঁদিতেন, কি করিবেন, একে আমরা গরীব তাহাতে আমি বালিকা, যদিও কর্তৃপক্ষরা যত্ন করিতেন, তবুও বড় অভিনেত্রীরা নিজের গন্ডা নিজে বুঝিয়া লইতেন,  আমায় দয়ার উপর নির্ভর করিতে হইত। আর কি কারণে জানিনা, সকলের অপেক্ষা কাদম্বিনী যেন কিছু অহঙ্কৃতা ছিলেন, আমার উপর কেমন তার দ্বেষ ছিল, প্রায় দূরছাই করিতেন। তার পর বোধ হয় আমাদের লাহোরে যাইতে হয়। লাহোরের আমাদের বেশী দিন থাকিত হয়। সেখানে অনেকগুলি বই অভিনয় হইয়াছিল। আমি নানা রকম পার্ট অভিনয় করিয়া ছিলাম। “সতী কি কলঙ্কীনি” তে রাধীকা, “নবীন তপস্বিনী’ তে কামিনী, “সধবার একাদশী” তে কাঞ্চন, “বিয়ে পাগলা বুড়ো” তে ফতি, কত বলিব। তবে বলিয়া রাখি যে, সে সময় আমার এত অল্প বয়স ছিল যে বেশ করিবার সময় বেশকারীদের বড় ঝঞ্ঝাটে পরিতে হইত। আমার মত একটি বালিকা কে কিশোর বয়স্কা বা সময় সময় প্রায় যুবতীর বেশে সজ্জিত করিতে তাহারা সময়ে সময়ে বিরক্ত হইত – তাহা বুঝিতাম। আবার কখন কখন সকলে তামাশা করিয়া বলিত যে তোকে কামার দোকানে পাঠাইয়া দিয়া পিটিয়া একটু বড় করিয়া আনিব। লাহোরে যখন আমরা অভিনয় করি, তখন আমার সম্বন্ধে একটি অদ্ভতু ঘটনা ঘটে। সেখানে গোলাপ সিংহ বলিয়া একজন বড় জমিদার মহাশয়ের খেয়াল উঠিল যে তিনি আমায় বিবাহ করিবেন এবং যত টাকা লইয়া আমার মাতা সন্তুষ্ট হন তাহা দিবেন। পূর্ব্বোক্ত জমিদার মহাশয় অর্দ্ধেন্দুবাবু ও ধর্ম্মদাস বাবুকে বড়ই পিড়াপীড়ি করিয়া ধরিলেন। যখন উঁহারা বড়ই মুস্কিলে পড়িলেন। তিনি নাকি সেখানকার একটী বিশেষ বড়লোক। একে বিদেশ-উপরান্ত এই সকল কথা শুনিয়া আমার মা তো কাঁদিয়াই আকুল! আমিও ভয়ে একেবারে কাঁটা। এই উপলক্ষে আমাদের শীঘ্রই লাহোরে ছাড়িতে হয়। ফিরিবার সময় আমরা শ্রী শ্রী বৃন্দাবন ধাম দিয়া আসিয়া ছিলাম। শ্রী বৃন্দাবন ধামে আবার আমি একটী বিশেষ ছেলে- মানষি করিয়াছিলাম। তাহা এই : –

থিয়েটার কোম্পানী সেই দিন শ্রী ধামে পৌছিয়া চল্লিশ জন লোকের জল খাবার ইত্যাদি প্রস্তুত করিয়া রাখিয়া তাঁহার শ্রীজীউদিগের দর্শন করিতে গেলেন এবং আমাকে বলিয়া যান যে, “তুমি ছেলে মানুষ, এখনই এই গাড়ীতে আসিলে, এখন জল খাইয়া ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া থাক। আমরা দেবতা দর্শন করিয়া আসি।” আমি বাসায় দরজা বন্ধ করিয়া রহিলাম। তাঁহারা সকলে শ্রী শ্রী গোবিন্দজীউর দর্শন জন্য চলিয়া গেলেন। আমার একটু রাগ ও দু:খ হইল বটে, কিন্তু কি করিব? মনের ক্ষোভ মনেই চাপিয়া রহিলাম। ঘরের দরজা দিয়া বসিয়া আছি, এমন সময় একটা বাঁদর আসিয়া জানালার কাঠ ধরিয়া বসিল। আমি বালিকা- সুলভ চপলতা বসত: তাহাকে একটী কাঁকড়ি খাইতে দিলাম, সে খাইতেছে এমন সময় আর দুইটা আসিল, আমি তাহাদেরও কিছু খাবার দিলাম, আবার গোটাদুই আসিল, আমি মনে ভাবিলাম যে ইহাদের কিছু কিছু খাবার দিলে সকলে চলিয়া যাইবে। সেই ঘরের চার পাঁচটী জানালা, আমি যত আহার দিই, ততই জানালায়, ছাদে, বারান্দায় বাঁদরে বাঁদরে ভরিয়া যাইতে লাগিল। তখন আমার বড় ভয় হইল, আমি কাঁদিতে কাঁদিতে যত খাবার ছিল প্রায় তার সকলই তাহাদের দিতে লাগিলাম। আর মনে করিতে লাগিলাম যে এই বারেই তারা চলিয়া যাইবে। কিন্তু যত খাবার পাইতে লাগিল, বানরের দল তত বাড়িতে লাগিল। আর আমি কাঁদিতে কাঁদিতে তাদের ক্রমাগত আহার দিতে লাগিলাম। ইতিমধ্যো কোম্পানীর লোক ফিরিয়া আসিয়া দেখিল- ছাদ, বারান্দা, জানালা সব বানরে ভরিয়া গিয়াছে। তাঁহারা লাঠি ইহ্যাদি লইয়া তাহাদের তাড়াইয়া দিয়া আমায় দরজা খুলিতে বলিলেন। আমি কাঁদিতে কাঁদিতে দরজা কুলিয়া দিলাম। তাঁহারা আমায় জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি সকল কথা তাঁহাদের বলিলাম। আমার কথা শুনিয়া আমার মা আমায় দুইটী চড় মারিলেন ও কত বকিতে লাগিলেন। কিন্তু আমি যে অত ক্ষতি করিয়াছিলাম, তবু কোম্পানীর সকলে হাসিয়া মাকে মারিতে নিষেধ করিলেন;  বলিলেন যে “মারিও না, ছেলে মানুষ ও কি জানে? আমাদের দোষ, সঙ্গে করিয়া লইয়া গেলেই হইত!” অর্দ্ধেন্দুবাবু বলিলেন “বোকা মেয়ে আমাদের সকল খাবার বিলাইয়া ব্রজবাসীদিগের ভোজন করাইলি, এখন আমরা কি খাই বল্ দেখি?” আবার জল খাবার খরিদ করিয়া আনা হইল, তবে তাঁহারা জল খাইলেন। ঐ কথা লইয়া নীলমাধববাবু আমায় দেখা হইলেই এখনও তামামা করিয়া বলিতেন যে, “বৃন্দাবনে গিয়া বাঁদর ভোজন করাবি বিনোদ!” নীলমাধব চক্রবর্তী বঙ্গীয় নাট্য জগতে বিশেষ সুপরিচিত! সকলেই তাঁহার নাম জানেন। তিনিও আমাদের সঙ্গে পশ্চিমে ছিলেন, তিনিও আমায় অতিশয় যত্ন করিতেন। দিল্লিতে যখন সব এক্ট্রেসরা চাদর, জামা, কাপড় নিজ নিজ পয়সায় খরিদ করেন, আমার পয়সা ছিলনা বলিয়া কিনিতে না পারায় তিনি আমায় একখানা ফুল দেওয়া চাদর ও কাপড় কিনিয়া দেন। সেই তখনকার স্মৃতি চিহ্ন তাঁহার স্নেহের জিনিষ আমার কতদিন ছিল। আর একটী প্রথম উপহার, একটী অকৃত্রিম স্নেহময় বন্ধুর প্রদত্ত আমার বড় আদরের হইয়াছিল। মাননীয় শ্রীযুক্ত রাধাগোবিন্দ কর ডাক্তার মহাশয় তিনি একটী ঢাকার গঠিত রূপার ফুল ও খেলিবার একটী কাঁচের ফুলের খেলনা আমায় দিয়াছিলেন। তাঁহার সেই স্নেহময় উপহার আমার সেই বালিকা কালে বড়ই আনন্দপ্রদ হইয়াছিল। নিস্বার্থ স্নেহে বশীভূত হইয়া আমি এখনও তাঁর দয়া অনুগ্রহ দ্বারা ও দ্বায় বিদায়ে রোগে শোকে সান্তনা পাইয়া থাকি। তাঁহার অকৃত্রিম অনুগ্রহ আমি তাঁহার নিকট চিরঋণী। এই বহু সম্মানীত ডাক্তার বাবু মহাশয় এই অভাগীনির চির ভক্তির পাত্র! এই রূপেই আমার বাল্যকালের নাট্য জীবন। ইহার পর আমরা কলিকাতা চলিয়া আসি। তারপর বোধহয় পাঁচ-ছয় মাস পর “গ্রেট ন্যাশনাল” থিয়েটার বন্ধ হইয়া যায়। তৎপরে আমি মাননীয় ঁশরৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের বেঙ্গল থিয়েটারের প্রথমে পঁচিশ টাকা বেতনে নিযুক্ত হই তখনও যদিচ আমি বালিকা কিন্তু পূর্ব্বাপেক্ষা অনেক কার্যতৎপরা এবং চালাক চটপটে হইয়া ছিলাম । শরৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের নিকট আমি চিরঋণে আবদ্ধ। এইখান হইতে আমার অভিনয় কার্য শ্রীবৃদ্ধি এবং উন্নতির প্রথম সোপান। সকলের মধ্য উল্লেখযোগ্য মাননীয় শরৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের অতুলনীয় স্নেহ মমতা। তিনি আমায় এত অধীক যত্ন  করিতেন, বোধহয় নিজ কন্যা তাকিলেও এর অধীক স্নেহ পাইত না।

মহাশয়ের আমার উপর অসীম করুণা ছিল, সেই কারণে বলিতে সাহস করিতেছি। যদি অনুমতি করেন তবে বেঙ্গল থিয়েটারে যে কয়েক বৎসর অভিনয় কার্য্য করিয়া ছিলাম, সেই সময়ের ঘটনাগুলি বিবৃত করি।

 

আগের/পরের পর্ব<< আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (২)আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (৪) >>
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
বিনোদিনী দাসী

বিনোদিনী দাসী

বিনোদিনী দাসী (১৮৬২/৩ - ১৯৪১): থিয়েটার অভিনেত্রী, রাইটার। ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ এই ১২ বছর তিনি কলকাতার বিভিন্ন থিয়েটারে অভিনয় করেন। কবিতার বই – বাসনা এবং কনক ও নলিনী। আত্মজীবনী - ‘আমার কথা’ (১৯২০)।
বিনোদিনী দাসী

লেটেস্ট ।। বিনোদিনী দাসী (সবগুলি)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.