Main menu

“ভাব ও কাজ” এবং “স্বাধীন চিত্ততা” – কাজী নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬) প্রবন্ধ বা নন-ফিকশন লেখাগুলা উনার গান, কবিতা ও গল্পের মতন এতোটা সেলিব্রেটেড জিনিস না। কিন্তু একজন রাইটার-এক্টিভিস্ট হিসাবে উনার আর্টের এবং ইন্টেলেকচুয়াল পজিশনটারে বুঝার জন্য এই লেখাগুলা দরকারি ডকুমেন্ট। 

“ভাব ও কাজ” লেখাটা ১৯২২ সালে উনার “যুগবাণী” বইয়ে এবং “স্বাধীন-চিত্ততা” ১৯২৭ সালে “রুদ্র-মঙ্গল” বইয়ে ছাপা হইছিল। বই দুইটা ছাপা হওয়ার পরেই অই সময়ের গর্ভমেন্ট “বাজেয়াপ্ত” করছিল।

নানান লেখা-পত্রে যা জানা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের লেখালেখি’র শুরুই হইছিল নন-ফিকশন বা গদ্য দিয়া। “বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী” ছিল উনার ফার্স্ট পাবলিশ হওয়া লেখা। তখন উনি মিলিটারিতে চাকরি করতেন। (মাসিক সওগাত পত্রিকায়, ১৯১৯ সালের মে মাসে।) তারপরে লেখালেখিতে উনি যতদিনই এক্টিভ ছিলেন (১৯২২ – ১৯৪২) অন্য লেখালেখির পাশে কলকাতার পত্রিকাগুলাতে কলাম লিখছেন, স্পেশালি শুরুর দিকে অনেক বেশি এনগেইজ ছিলেন। আর ইংরেজ সরকার যে উনারে জেলে নিছিল, তার একটা বড় কারণ ছিল উনার এই এক্টিভিজম। এখন উনি মারা যাওয়ার পরে এই জায়গাটা যে ইগনোর করা হয় তার একটা বড় কারণ মেবি এইটাও যে, উনার এই লেখালেখি যে কোন অথরিটির জন্যই থ্রেট হিসাবে কাজ করে। আর এইটাই উনার লেখাগুলার সিগনিফিকেন্স হিসাবে আমরা হাইলাইট করতে চাই, যেইটা এখনো রিলিভেন্ট। 

আর যে কোন লেখা পড়ার সময়ই, পড়ার সময়ের পাশাপাশি লেখার সময়টারেও মাথায় রাখা ভালো। মানে, যখন ২০২১ সালে এই লেখাগুলা আমরা পড়তেছি, তখন মনে রাখতে পারাটা বেটার যে,  এই লেখাগুলা আজকে থিকা একশ বছর আগে, কলকাতা শহরে বইসা লেখা। এই কারণে না যে, পুরান লেখা বইলা “অনেক কিছু বুঝে নাই” বা “মাফ কইরা দিতে হবে”; বরং অই সময়ের চিন্তা এবং ঘটনাগুলাও এই লেখাগুলার লগে রিলিভেন্ট। আর আজকে আমরা যখন এই লেখাগুলা পড়তেছি, তখন আমাদের সময়ের চিন্তা এবং ঘটনাগুলা দিয়া কানেক্ট করতেছি। এই কনটেক্সট’টা আলাদা হওয়ার ফলে লেখার মানে’গুলা উল্টা-পাল্টা হয়া যাইতেছে না, বরং নতুনভাবে রি-ক্রিয়েট হওয়ার বা পড়তে পারার পসিবিলিটির মধ্যে চইলা আসতেছে আসলে। 

তো, আসেন, কাজী নজরুল ইসলামের লেখাগুলা আমাদের সময়ের কনটেক্সটে আবার পড়ার চেষ্টা করি আমরা। খোশ আমদেদ!

এডিটর, বাছবিচার

……………….

ভাব ও কাজ

ভাবে আর কাজে সম্বন্ধটা খুব নিকট বোধ হইলেও আদতে এ-জিনিস দুইটায় কিন্তু আসমান-জমিন তফাৎ।

ভাব জিনিসটা হইতেছে পুষ্পবিহীন সৌরভের মত, একটা অবাস্তব উচ্ছ্বাস মাত্র। তাই বলিয়া কাজ মানে যে সৌরভবিহীন পুষ্প, ইহা যেন কেহ মনে করিয়া না বসেন। কাজ জিনিসটাই ভাবকে রূপ দেয়, ইহা সম্পূর্ণভাবে বস্তুজগতের।

তাই বলিয়া ভাবকে যে আমরা মন্দ বলিতেছি বা নিন্দা করিতেছি, তাহা নহে; ভাব জিনিসটা খুবই ভাল। মানুষকে কব্জায় আনিবার জন্য তাহার সর্বাপেক্ষা কোমল জায়গায় ছোঁওয়া দিয়া তাহাকে মাতাইয়া না তুলিতে পারিলে তাহার দ্বারা কোন কাজ করানো যায় না, বিশেষ করিয়া আমাদের এই ভাব-পাগল দেশে। কিন্তু শুধু ভাব লইয়াই থাকিব, লোককে শুধু কথায় মাতাইয়া মশগুল করিয়াই রাখিব, এও একটা মস্ত বদ-খেয়াল ৷ এই ‘ভাব’কে কার্যের দাসরূপে নিয়োগ করিতে না পারিলে ভাবের কোন সার্থকতাই থাকে না। তাহা ছাড়া ভাব দিয়া লোককে মাতাইয়া তুলিয়া যদি সেই সময় গরমা গরম কার্যসিদ্ধি করাইয়া লওয়া না হয়, তাহা হইলে পরে সে ভাবাবেশ কর্পূরের মত উড়িয়া যায়। অবশ্য এখানে কার্যসিদ্ধি মানে স্বার্থসিদ্ধি নয়। যিনি ভাবের বাঁশি বাজাইয়া জনসাধারণকে নাচাইবেন, তাঁহাকে নিঃস্বার্থ ত্যাগী ঋষি হইতে হইবে। তিনি লোকদিগের সূক্ষ্ম অনুভূতি ব্য ভাবকে জাগাইয়া তুলিবেন মানুষের কল্যাণের জন্য নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়। তাঁহাকে একটা খুব মহত্তম উদ্দেশ্য ও কল্যাণ কামনা লইয়া ভাবের বন্যা বহাইতে হইবে, নতুবা বানভাসির পর পলিপড়ার মত সাধারণের সমস্ত উৎসাহ ও প্রাণ একেবারে কাদা ঢাকা পড়িয়া যাইবে। এই জন্য কেহ কেহ বলেন যে, লোকের কোমল অনুভূতিতে ঘা দেওয়া পাপ। কেননা অনেক সময় অনুপযুক্ততা প্রযুক্ত ইহা হইতে সুফল না ফলিয়া কুফলই ফলে। আগে হইতে সমস্ত কার্যের বন্দোবস্ত করিয়া বা কার্যক্ষেত্র তৈয়ার রাখিয়া তবে লোকদিগকে সোনার কাঠির ছোঁওয়া দিয়া জাগাইয়া তুলিতে হইবে। নতুবা তাহারা যখন জাগিয়া দেখিবে যে, তাহারা অনর্থক জাগিয়াছে, কোন কার্য করিবার নাই, তখন মহা বিরক্ত হইয়া আবার ঘুমাইয়া পড়িবে এবং তখন আর জাগাইলেও জাগিবে না। কেননা, তখন যে তাহারা জাগিয়া ঘুমাইবে এবং জাগিয়া ঘুমাইলে তাহাকে কেহই তুলিতে পারে না। তাহা অপেক্ষা বরং কুম্ভকর্ণের নিদ্রা ভালো, সে-ঘুম ঢোল কাঁসি বাজাইয়া ভাঙানো বিচিত্র নয়।

এ-কথাটা যে একটা মস্ত সত্যি, তাহা এতদিনে আমরা ঠেকিয়া শিখিয়াছি। এই যে সেদিন একটা হুজুগে মাতিয়া হুড়হুড় করিয়া হাজার কতক স্কুল-কলেজের ছাত্রদল বাহির হইয়া আসিল, কই তাহারা তো তাহাদের এই সৎ সঙ্কল্প, এই মহৎ ত্যাগকে স্থায়ীরূপে বরণ করিয়া লইতে পারিল না। কেন এমন হইল? একটা সাময়িক উত্তেজনার মুখে এই ত্যাগের অভিনয় করিতে গিয়া “স্পিরিট”কে কি বিশ্রী ভাবেই না মুখ ভ্যাঙচানো হইল! যাহারা শুধু ভাবের চোটে না বুঝিয়া না শুনিয়া শুধু একটু নামের জন্য বা বদনামের ভয়ে এমন করিয়া তাহাদের “স্পিরিট” বা আত্মার শক্তির পবিত্রতা নষ্ট করিল, তাহারা কি দরকার পড়িলে আবার কা’ল এমনি করিয়া বাহির হইয়া আসিতে পারিবে? আজ যাহারা মুখে চাদর জড়াইয়া কল্যকার ত্যক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার মুখটি চুন করিয়া ঢুকিল, কা’ল দেশের সত্যিকার ডাক আসিলে তাহারা কি আর তাহাতে সাড়া দিতে পারিবে? হঠকারিতা করিয়া একবার যে ভোগটা ভুগিল বা ভ্রম করিল, তাহারই অনুশোচনাটা তাহারা কিছুতেই মন হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিবে না—বাহিরে যতই কেন লা-পরওয়া ভাব দেখাক না। এখন সত্যিকার ডাক শুনিয়া প্রাণ চাহিলেও সে লজ্জায় তাহাতে আসিয়া যোগদান করিতে পারিবে না। এইরূপে আমরা আমাদের দেশের প্রাণশক্তি এই তরুণদের “স্পিরিট”টাকে কুব্যবহারে আনিয়া মঙ্গলের নামে দেশের মহা শত্রুতা সাধনই করিতেছি না কি? রাগিবার কথা। নয়, এখন ইহা রীতিমত বিবেচনা-সাপেক্ষ। আমাদের এই আশা-ভরসাস্থল যুবকগণ এত দুর্বল হইল কিরূপে বা এমন কাপুরুষের মত ব্যবহারই বা করিল কেন? সে কি আমাদেরই দোষে নয়? সাপ লইয়া খেলা করিতে গেলে তাহাকে দস্তুরমত সাপুড়ে হওয়া চাই, শুধু একটু বাঁশি বাজাইতে পারিলেই চলিবে না। আজ যদি সত্যিকার কর্মী থাকিত দেশে, তাহা হইলে এমন সুবর্ণ সুযোগ মাঝ-মাঠে মারা যাইত না। ত্যাগী অনেক আছেন দেশে, কিন্তু কর্মীর অভাবে বা তথাকথিত কর্মী নামে অভিহিত লোকদের সত্য সাধনার অভাবে তাঁহারা কোন ভাল কাজে আর কোন অর্থ দিতে চাহেন না, বা অন্য কোনরূপ ত্যাগ স্বীকার করিতেও রাজী নন। কি করিয়া হইবেন? তাঁহারা তাঁহাদের চোখের সামনে দেখিতেছেন যে, কত লোকের কত মাথার ঘাম পায়ে ফেলার ধন দেশের নামে, কল্যাণের নামে আদায় করিয়া বাজে লোকে নিজেদের উদর পূর্ণ করিতেছে। যাঁহারা সত্যিকার দেশকর্মী–সে বেচারারা সত্যি কথা স্পষ্টভাবে বলিতে গিয়া এই সব কর্মীদের কারচুপিতে পুয়ালচাপা পড়িয়া গিয়াছে। বেচারারা এখন ভালো বলিতে গেলেও এই সব মুখোশ-পরা ত্যাগী মহাপুরুষগণ হট্টগোল বাধাইয়া লোককে সম্পূর্ণ উল্টা বুঝাইয়া দিয়া তাহাকে একদম খেলো, ঝুটা ইত্যাদি প্রমাণ করিয়া দেন। সহজ জনসাধারণের সরল মন এ-সব না ধরিতে পারার দরুন তাহাদের মত অতি অল্পেই ঐ সত্যিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষাইয়া উঠে। ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ কথাটা মস্ত সত্যি কথা।

তাহা হইলে এখন উপায় কি? এক সহজ উপায় এই যে, এখন হইতে জনসাধারণের বা শিক্ষিত কেন্দ্রের উচিত, ভাবের আবেগে অতিমাত্রায় বিহ্বল হইয়া কাণ্ডাকাণ্ড ভালমন্দ জ্ঞান হারাইয়া না ফেলা। ভাব জিনিসটা মদের নেশার চেয়েও গাঢ় পাঁড়-মাতালরা বলে, “মদ খাও, কিন্তু তোমায় যেন মদে না খায়।” আমরাও বলিব, ভাবের সুরা পান কর ভাই, কিন্তু জ্ঞান হারাইও না। তাহা হইলে তোমার পতন, তোমার দেশের পতন, তোমার ধর্মের পতন, মনুষ্যত্বের পতন! ভাবের দাস হইও না, ভাবকে তোমার দাস করিয়া লও। কর্মে শক্তি আনিবার জন্য ভাব-সাধনা কর। “স্পিরিট” বা আত্মার শক্তিকে জাগাইয়া তোল, কিন্তু তাই বলিয়া কর্মকে হারাইও না। অন্ধের মত কিছু না বুঝিয়া না শুনিয়া ভেড়ার মত পেছন ধরিয়া চলিও না। নিজের বুদ্ধি, নিজের কর্মশক্তিকে জাগাইয়া তোল। তোমার এই ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যই দেশকে উন্নতির দিকে, মুক্তির দিকে আগাইয়া লইয়া যাইবে। এ-সব জিনিস ভাব আবিষ্ট হইয়া চক্ষু বুজিয়া হয় না। কোমর বাঁধিয়া কার্যে নামিয়া পড়িতে হইবে এবং নামিবার পূর্বে ভাল করিয়া বুঝিয়া-সুঝিয়া লইতে হইবে, ইহার ফল কি। শুধু হোড়ের মত বা উদ্‌মো ষাঁড়ের মত দেওয়ালের সঙ্গে গা ঘেঁসড়াইয়া নিজের চামড়া তুলিয়া ফেলা হয় মাত্র। দেওয়াল প্রভু কিন্তু দিব্যি দাঁড়াইয়া থাকেন। তোমার বন্ধন ওই সামনের দেওয়ালকে ভাঙ্গিতে হইলে একেবারে তাহার ভিত্তিমূলে শাবল মারিতে হইবে।

আবার বলিতেছি, আর ভাবের ঘরে চুরি করিও না। আগে ভাল করিয়া চোখ মেলিয়া দেখ। কার্যের সম্ভাবনা-অসম্ভাবনার কথা অগ্রে বিবেচনা করিয়া পরে কার্যে নামিলে তোমার উৎসাহ অনর্থক নষ্ট হইবে না। মনে রাখিও, তোমার “স্পিরিট” বা আত্মার শক্তিকে অন্যের প্ররোচনায় নষ্ট করিতে তোমার কোন অধিকার নাই। তাহা পাপ—মহাপাপ!

 

স্বাধীন-চিত্ততা


আজকের ঈদ-সম্মেলনে আমাকে আপনারা সভাপতি নির্বাচিত করে গৌরব দান করেছেন, এজন্য আমি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি আপনাদিগকে ‘ঈদ মোবারক হো’ বলে প্রথমেই অভিনন্দিত করছি। ঈদের উৎসব আনন্দের উৎসব, ত্যাগের উৎসব। আল্লার রাহে সব কিছু কোরবানি করার ইঙ্গিতই এই উৎসব বয়ে এনেছে। কোরআনের ছুরে বকরায় এই কোরবানির কথা রয়েছে এবং ছুরে নূরের ভিতর উল্লেখিত জয়তুন ও রওগণের যে সব কথা রয়েছে, তার অর্থ সকলকে আমি অনুধাবন করতে অনুরোধ জানাচ্ছি। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লার নামে সকল ঐশ্বর্য, সকল সম্পদ কোরবানি করতে হবে। একটা গরু কোরবানি করেই সকলকে ফাঁকি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু আল্লাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভবপর নয়।

সকল ঐশ্বর্য, সকল বিভূতি আল্লার রাহে বিলিয়ে দিতে হবে। ধনীর দৌলতে, জ্ঞানীর জ্ঞানভাণ্ডারে সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। এই নীতি স্বীকার করেই ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে। আজ জগতের রাজনীতির বিপ্লবী আন্দোলনগুলির যদি ইতিহাস আলোচনা করে দেখা যায় তবে বেশ বুঝা যায় যে, সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রবাদের উৎসমূল ইসলামেই নিহিত রয়েছে। আমার ক্ষুধার অন্নে তোমার অধিকার না থাকতে পারে, কিন্তু আমার উদ্বৃত্ত অর্থে তোমার নিশ্চয়ই দাবি আছে—এ শিক্ষাই ইসলামের জগতের আর কোন ধর্ম এত বড় শিক্ষা মানুষের জন্য নিয়ে আসেনি। ঈদের শিক্ষার ইহাই সত্যিকার অর্থ।

আজ মুশায়েরার সম্মেলন। কবি ও সাহিত্যিকদের আজ সমাবেশ হয়েছে। কবি, সাহিত্যিক, সুরশিল্পী মানুষের আনন্দলোকের, সৌন্দর্যলোকের বাণী বয়ে আনে। এজন্য সাহিত্যিক, কবি, শিল্পীরা মানব-সভ্যতার গৌরব আনন্দ ও সৌন্দর্যের তৃষ্ণা মানুষের চিরন্তন। মানুষ অন্নের জন্য ক্ষুধা অনুভব করে, তেমনি করে সৌন্দর্য-পিপাসাকে অনুভব। মানুষের এই সৌন্দর্য-ক্ষুধা থেকেই কাব্যের সৃষ্টি, কবির জন্ম। মানুষের আনন্দ ও সৌন্দর্য পরিবেশন করার জন্যই কবিরা এসে থাকেন। জল কমল ফুটায়; জল না থাকলে কমল ফুটত কী? অকবির সৌন্দর্য-ক্ষুধা মিটাবার জন্যই কবির আগমন। সকল মানুষের আটপৌরে জীবনের সাথে চলে এই সৌন্দর্য—জীবনের দাবি। আমি একদিন একজন লোককে বাজার থেকে ফিরে আসবার সময় লক্ষ্য করলাম তার এক হাতে মুরগি ও আর এক হাতে রজনীগন্ধা ফুল। আমি তাকে আদাব জানিয়ে বললাম, এমন Fair and Foul এর সমাবেশ একত্রে কোথাও দেখিনি।

এই সৌন্দর্যের অমৃত পরিবেশনের ভার কবি ও সাহিত্যিকদের হাতে। এ পথে সাহিত্যিকদের হয়তো দুঃখ-কষ্ট আছে অনেক, কিন্তু তাদের ভীতু হলে চলবে না। মানুষ ক্ষুধার অন্ন মিটিয়েই অবকাশ পায় না। ধান গাছ জন্মিয়ে মানুষ মাঠের পর মাঠকে অরণ্য করে তোলে, কিন্তু গোলাপের চাষের আয়োজন এদেশে করে ক’জন? আরও দুর্ভাগ্য এই যে, এদেশের শিক্ষিতদের মধ্যে সৌন্দর্যের পিপাসা কম। এজন্য বহু দুঃখ-কষ্ট আমাদের দেশের সাহিত্যিকদিগকে ভোগ করতে হয় জীবনে। এজন্য বিচলিত হলে চলবে না। দুঃখের আঘাতকে আনন্দের আহ্বানের মতই বরণ করে নিতে হবে। কবি ও সাহিত্যিকের জীবন ও তাঁর সৃষ্টি যেন শতদল। তার এক একটি দল জন্ম নিয়েছে এই দুঃখ-বেদনার আঘাত পেয়ে।

আমার আজ বেশ মনে পড়ছে—একদিন আমার জীবনে এই সহানুভূতির কথা। আমার ছেলে মরেছে, আমার মন তীব্র পুত্র-শোকে যখন ভেঙে পড়ছে, ঠিক সেদিন সে সময়ে আমার বাড়িতে হাস্নাহেনা ফুটেছে আমি প্রাণ ভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। এভাবেই জীবনকে উপভোগ করতে হবে—এই-ই হল পূর্ণ জীবন। এই জীবনের অভিজ্ঞতা আমি অর্জন করতে চেয়েছি। আমার কাব্য, আমার গান আমার জীবনের ছন্দে গেয়ে চলেছি—এসব তারই প্রকাশ। আমার কাব্য ও গান বড় হয়েছে কি ছোট হয়েছে, তা আমার জানা নেই। কিন্তু এ-কথা আমি জোর দিয়ে বলতে চাই—আমি জীবনকে উপভোগ করেছি, পরিপূর্ণভাবে। দুঃখকে, বিপদকে দেখে আমি ভয় পাইনি। আমি জীবনের তরঙ্গে তরঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। ক্লাসে ছিলাম আমি ফার্স্ট বয়। হেডমাস্টারের বড় আশা ছিল—আমি স্কুলের গৌরব বাড়াব, কিন্তু এ সময় এল ইউরোপের মহাযুদ্ধ । একদিন দেখলাম, এদেশ থেকে পল্টন যাচ্ছে যুদ্ধে । আমিও যোগ দিলাম এই পল্টন দলে।

চাঁটগায়ে গিয়েছি—সমুদ্র দেখেছি—তাতে ঝাঁপ দিয়ে জীবনকে করেছি পরিপূর্ণভাবে উপভোগ। একদিন একজন পুলিশ আমার মাথার সম্মুখে পিস্তল উঠিয়ে বললে, “তোমাকে আমি মেরে ফেলতে পারি।” আমি বল্লাম, “বন্ধু ! মৃত্যুকেই ত আমি চিরদিন খুঁজে বেড়াই।”

তরুণদের কাছে আমি চাই—তারা যেন জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে অগ্রসর হয়। আজ আমার সম্মুখে যে তরুণ সমাজকে দেখছি, তাতে আমাকে নিরাশ হতে হয়েছে। তারা যেন জরায় আবৃত। জীবনের উজ্জ্বলতা ও প্রাণৈশ্বর্য আজ তাদের মধ্যে দেখতে পাই না। দু’কূলপ্লাবী জীবন ও যৌবনের জোয়ার তাদের জীবনে আসুক এটাই আজ তাদের নিকট আমি চাই । সকল প্রকারের ভীরুতা হতে জীবনকে মুক্তি দিতে হবে। এই সৃষ্টির সকল কিছুকে বুঝতে হবে, জানতে হবে, এবং পরিপূর্ণ মুক্তি দিতে হবে। এই সৃষ্টির সকল কিছুকে বুঝতে হবে, জানতে হবে এবং পরিপূর্ণভাবে তাকে উপভোগ করতে হবে। এই জন্যই শ্রদ্ধা হয় এ-যুগের বৈজ্ঞানিকদের প্রতি। তাঁরা চেয়েছেন সৃষ্টির রহস্য আবিষ্কার করতে। কি দুর্জয় তাঁদের প্রতিজ্ঞা ও আত্মশক্তিতে বিশ্বাস। সকল বিশ্বকে, সকল সৃষ্টিকে জানব, বুঝব ও উপলব্ধি করব—এই আত্মবিশ্বাস আমাদের তরুণদের জীবনে রূপায়িত হোক। এই-ই আমরা চাই। জীবনের পাত্র আমরা আবর্জনা দিয়ে বোঝাই করে রেখেছি, এই আবর্জনা হতে আমাদের জীবনকে মহতের উপযুক্ত আধার করতে হবে। নদীতে নুড়ি থাকে, এক ফোঁটা জল সে পায় না। কারণ, অন্তর তার শূন্য নয়। এমন করে আমাদের অন্তর মুক্ত করে বৃহৎকে জীবনে বরণ করে আনতে হবে। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ স্রষ্টা। প্রকাণ্ড তাঁর সৃষ্টি। সে সৃষ্টির পশ্চাৎ-ভূমিতেই জন্ম নিয়েছে চন্দ্র-সূর্য-তারকার সৃষ্টির ঐশ্বর্য। এই বৃহৎকে বুঝবার সাধনাই জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা। এ-জন্যই চাই সেই মুক্ত ও বিরাট জীবন।

সকল ভীরুতা, দুর্বলতা, কাপুরুষতা বিসর্জন দিতে হবে। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে নয়, ন্যায়ের অধিকারের দাবিতেই আমাদিগকে বাঁচতে হবে। আমরা কারও নিকট মাথা নত করব না—রাস্তায় বসে জুতা সেলাই করব, নিজের শ্রমার্জিত অর্থে জীবন যাপন করব, কিন্তু কারো দয়ার মুখাপেক্ষী হব না । এই স্বাধীন-চিত্ততার জাগরণ আজ বাঙলার মুসলমান তরুণদের মধ্যে দেখতে চাই। ইহাই ইসলামের শিক্ষা; এ শিক্ষা সকলকে গ্রহণ করতে বলি। আমি আমার জীবনে এ-শিক্ষাকেই গ্রহণ করেছি। দুঃখ সয়েছি, আঘাতকে হাসিমুখে বরণ করেছি, কিন্তু আত্মার অবমাননা কখনও করিনি। নিজের স্বাধীনতাকে কখনও বিসর্জন দেইনি। “বল বীর, চির উন্নত মম শির”–এ গান আমি আমার এ-শিক্ষার অনুভূতি হতেই পেয়েছি। এই আজাদ-চিত্তের জন্ম আমি চাই ইসলামের ইহাই সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী—ইসলামের ইহাই মর্মকথা ৷

 

[১৩৪৭ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির ঈদ-অনুষ্ঠানে দেয়া সভাপতির ভাষণ।]

The following two tabs change content below.
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য