Main menu

বাঙ্গালা ভাষা – গ্রাডুএট্ (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী)।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র এই লেখা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছাপাইছিলেন বঙ্গদর্শনে (৮ নাম্বার সংখ্যা, শ্রাবণ, প. ১৮৩ – ১৮৮; বাংলা ১২৮৮ সন, আনুমানিক খৃষ্ট সন ১৮৮১)। পরে হুমাযূন আজাদ উনার ‘বাঙলা ভাষা’ বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে (আগামী প্রকাশনী, ১৯৮৪, নতুন ভার্সন ২০০৯-এ) ‘ভাষা-পরিকল্পনা’ সেকশনে রি-প্রিণ্ট করছেন (পেইজ: ৩৬০ – ৩৬৪)। যেহেতু বঙ্গদর্শনে ‘গ্রাডু্‌এট্‌’ নামে ছাপানো হইছিলো, হুমায়ুন আজাদ লেখক পরিচয়ে লিখছেন যে, “লেখককে শনাক্ত করা যায় নি।” অথচ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র রচনাসংগ্রহ ২য় খন্ডে এই লেখা ইনক্লুডেড হইছে ১৯৮১ সালে। আমাদের চিন্তা’র হিস্ট্রি যে কতোটা আলগা এই একটা ঘটনা দিয়াই  বুঝা যাইতে পারে।

এইখানে শাস্ত্রী সাহেবের আর্গুমেন্ট’টা হইতেছে, যেইটা এখনকার (মানে, তখনকারই) লিখিত বাংলা-ভাষা সেইটা সোসাইটির ভিতর থিকা আসে নাই, কলোনিয়াল আমলে সংস্কৃত কলেজ থিকা ইম্পোজড হইছে এই মাল। তার আগে লিখিত ফর্ম হিসাবে পদ্যই চালু আছিলো বাংলা-ভাষায়, কিন্তু তিন ধরণের গদ্য ডেইলি লাইফে ইউজ হইতো – একটা ছিল ভদ্রসমাজের (মুসলিম নবাব’রা – কাজী নজরুল ইসলাম যাদেরকে ভদ্রলোক বইলা হাসি-ঠাট্টা করছেন উনারা হইতেছেন এই ক্লাসটা, ইউরোপিয়ান মিডল-ক্লাস না) ভাষা, উর্দু শব্দ ইউজ করাটা একটা নবাবি ব্যাপার আছিলো, এখন আবার এই ট্রেন্ড চালু হইতেছে কিছুটা। সেকেন্ড হইলো যারা শাস্ত্র পড়তেন/পড়াইতেন (আমার ধারণা এইটা খুবই ছোট্ট একটা গ্রুপ ছিল), সংস্কৃত শব্দের ভান্ডার নিয়া থাকতেন; যেহেতু রেয়ার জিনিস হইতে পারলে আমাদের সেক্স-চিন্তা আর আর্টে ইর্ম্পটেন্স বাড়ে, এইরকম জায়গা থিকা উনারা্ বেশ এক্সোটিক ছিলেন বা হইতে পারছেন। কিন্তু মোস্টলি যোগাযোগের একটা ব্যাপার তো থাকেই সোসাইটির ভিতরে, নানান পেশার লোকজনের মিলতে হইতো, কথা কওয়া লাগতো, ওইখানে যেই বাংলা-ভাষা সেইখানে উর্দু-সংস্কৃত নানানরকমের শব্দের মিশানিটা থাকতো। কিন্তু শাস্ত্রী সাহেব কনক্লোশনে কোনদিকেই যান নাই, বরং এনার্কি’র প্রপোজাল দিছেন। যেহেতু কনফাইন্ড কোনকিছু নাই, যে কেউ যে কারো মতো লিখতে পারা’র অবস্থা থাকা দরকার। তো, এইটা উনার গ্রাজুয়েট (গ্রাডুএট্‌) হওয়ার প্রাউডই মে বি।

এমনিতে, গ্রামসি’র লেখা ব্রাউজ করলে পাওয়া যাবে সোসাইটিতে ডিফরেন্ট প্রফেশনের ভিতর থিকাই ইন্টেলেকচুয়ালিটির (সেইদিক দিয়া ভাষার) জিনিসটা গ্রো করে, অ্যাক্টিভ থাকে। এখন জিনিসগুলি কমপ্লিকেটেট হইছে আরো। ব্যাপারটা যতোটা না ইন্টার-অ্যাকাশন তার চাইতে ইন্টারভেনশনের জায়গাগুলিতে চইলা আসতেছে আরো।… তো, বাংলা-ভাষা নিয়া এই আলাপগুলি করতে গেলে হিস্ট্রিক্যাল কারণেই এই লেখাটার দরকার পড়তে পারে। এই সিরিজে এইজন্য জোড়া দেয়ার কথা ভাবলাম।

ই..হা.

 

————————————————————————–

 

বাঙ্গালা ভাষায় লিখিতে গেলে প্রথমতঃ রচনাপ্রণালী লইয়া বড়ই গোল বাঁধে। একদল, জনমেজয় যেমন সর্প দেখিলেই আহূতি দিতেন, সেইরূপ পারসী কথা দেখিলেই তাহাকে তাহার আহূতি দেন। আর একদল আছেন, তাঁহারা সংস্কৃত কথার প্রতি সেইরূপ সদয়। কেহ ভাষার মধ্যে সংস্কৃত ভিন্ন অন্য ভাষার কথা দেখিলেই চটিয়া উঠেন, প্রবন্ধের মধ্যে হাজার ভাল জিনিস থাকুক, আর পড়েন না। আবার কেহ আছেন যেই দেখিলেন, দুই পাঁচটি সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার হইয়াছে, অমনি সে গ্রন্থ অপাঠ্য বলিয়া দূরে নিক্ষেপ করেন। এখন আমরা গরীব, দাঁড়াই কোথা? আমরা ইংরেজি পড়ি আমাদের অর্দ্ধেক ভাবনা ইংরেজিতে। আমরা কলম ধরিলেই ইংরেজি কথায় ইংরেজি ভাব আইসে। সংস্কৃত আমরা যা পড়ি, তাতে সে ভাব ব্যক্ত হয় না। বাঙ্গালার বিদ্যা বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস, আর বঙ্কিমবাবুর নবেল কয়খানি। তাতেও ত কুলায় না। নূতন কথা গড়ি এমন ক্ষমতাও নাই। তবে আমাদের কি হইবে। হয় কলম ছাড়িতে হয়, না হয় যেরূপে পারি মনের ভাব ব্যক্ত করিয়া দিতে হয়। নিজের কথায় নিজের ভাব আমি ব্যক্ত করিব, তাহাতে অন্যের কথা কহার স্বত্ব কতদুর আছে জানি না। কিন্তু, পূর্ব্বোক্ত দুই দলের লোক দুইদিক হইতে কুঠার লইয়া তাড়া করেন। সুতরাং এক এক সময়ে বোধ হয় “…তত্র মৌনং হি  শোভতে” কিন্তু আবার যখন অঙ্গুলিকন্ডুরন উপস্থিত হয়, তখন না লিখিয়াও থাকিতে পারি না। বিশেষ এই যে, যখন কর্তব্যবোধে কোন কার্জ্যে প্রবৃত্ত হওয়া যায়, তখন পাঁচজনের কথায় তাহা হইতে নিরস্ত হওয়া নিতান্ত কাপুরুষের কাজ। যে কোন ভাষাই হউক, যে কোন রচনাপ্রণালীতেই হউক, যদি দুটা ভাল কথা বলিতে পারি, পাঁচজনের তরে চুপ করিয়া থাকিব কেন?

তবে ভাল কথা বলিতে যদি মন্দ কথা বলি, তাহা হইলে পাঁচজনের গালাগালি দিবার বাস্তবিক অধিকার আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পুর্ব্বোক্ত দুই শ্রেনীর সমালোচকগণ কথাটা ভাল কি মন্দ সেদিকে লক্ষ্যও করেন না। নাই করুন, কথাটা ভাল করিয়া বলা হইয়াছে কি না, তাহাও দেখেন না। দেখেন কেবল লেখার মধ্যে বড় বড় সংস্কৃত কথা আছে কি পারসী ও ইংরেজি শব্দ আছে। মারামারি করেন কেবল তাহাই লইয়া। সুতরাং আমার মতো ক্ষুদ্র লেখকবর্গের সেই বিষয়েই দৃষ্টি রাখিয়া চলিতে হয়। তাহাতেও গোলযোগ। যখন দুই দল দুইদিক ধরিয়া টানাটানি করিতেছেন, তখন উভয়দলের মন রক্ষা করা অসম্ভব। অথচ যে দলের মনরক্ষা না হইবে, তিনিই কুঠার উত্তোলন করিয়া লেখকের প্রতি ধাবমান হইবেন। এ অবস্থায় লেখকবেচারা বিষম সমস্যায় পড়িয়া যায়।

 

Bangadarshan

 

এ সমস্যার কি পুরণ হয় না? এ সঙ্কট হইতে কি পরিত্রাণের উপায় নাই? বঙ্গীয়লেখককুল কি এই প্রতিকূল বাত্যায় ভগ্নপোত হইয়া অপার সমুদ্রে ভাসিবেন? তাঁহারা কি কুলে উঠিতে পারিবেন না? সমালোচকদিগের এই বিষম রোগের কি উপশম হইবে না? উপশম নাই হউক ইংরেজিতে বলে রোগের নির্ণয় অর্দ্ধেক উপশম। এ রোগেরকারণনির্ণয়ের কি কিছুই চেষ্টাও হইবে না।

অনেকগুলি সুচিকিৎসকের সহিত বিশেষ পরামর্শ করিয়া আমরা ইহার কতক কারণ ঠিক করিয়াছি। ঠিক করিয়াছি বলিতে পারি না। কতক অনুভব করিয়াছি। যাহা বুদ্ধিস্থ হইয়াছে, তাহা মুক্তকন্ঠে বলিব। এস্থলে কুঠারের ভয় করিলে চলিবে না। যদি আর কেহ অন্যহেতুপ্রদর্শন করিতে পারেন, নিরতিশয় আনন্দসহকারে শ্রবণ করিব।

কথাটি এই’যে, যাঁহারা এ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা ভাষায় লেখনীধারণ করিয়াছেন, তাঁহারা কেহই বাঙ্গালা ভাষা ভাল করিয়া শিক্ষা করেন নাই। হয় ইংরেজি পড়িয়াছেন, না হয় সংস্কৃত পড়িয়াছেন, পড়িয়াই অনুবাদ করিয়াছেন। কতকগুলি অপ্রচলিত সংস্কৃত ও নূতন গড়া চোয়ালভাঙ্গা কথা চলিত করিয়া দিয়াছেন। নিজে ভাবিয়া কেহ বই লেখেন নাই, সুতরাং নিজের ভাষায় কি আছে না আছে তাহাতে তাঁহাদের নজরও পড়ে নাই।

এখন তাঁহাদের বই পড়িয়া যাঁহারা বাঙ্গালা শিখিয়াছেন, তাঁহাদের যথার্থ মাতৃভাষায় জ্ঞান সুদূরপরাহত হইয়াছে। অথচ ইহারাই যখন লেখনীধারণ করেন, তখন মনে করেন যে, আমার বাঙ্গালা সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট। তাঁহার বাঙ্গালা তিনি এবং তাঁহার পারিষদবর্গ বুঝিল, আর কেহ বুঝিল না। কেমন করিয়া বুঝিবে! সে ত দেশীয় ভাষা নহে। সে অনুবাদকদিগের কপোলকল্পিত ভাষার উচ্ছিষ্ট মাত্র। দেশের অধিকাংশ লোকই উচ্ছিষ্টভোজনে জাতিপাতের ভয় করে অথচ লেখকমহাশয়েরা তাহাদিগকে কুসংস্কারাপন্ন মূর্খ বলিয়া উপহাস করেন। এই গেল একদলের কথা :-

আবার যখন অনুবাদকদিগের এইরূপ দীর্ঘ ছন্দ সংস্কৃতের “নিবিড় ঘনঘটাচ্ছন্দের” নদ, নদী, পর্বত, কন্দরের অসম্ভব বাড়াবাড়ি হইয়া উঠিল, যখন সংস্কৃত, ইংরেজি পড়া অপেক্ষা বাঙ্গালা পড়ার অভিধানের অধিক প্রয়োজন হইয়া পড়িল, তখন কতকগুলি লোক চটিয়া বলিলেন, এ বাঙ্গালা নয়। বলিয়া তাঁহারা যত চলিত কথা পাইলেন, তাহাই লইয়া লিখিতে আরম্ভ করিলেন। ইহাঁদের সংখ্যা অল্প, কিন্তু ইহাঁরা সংস্কৃতের সং পর্য্যন্ত শুনিলে চটিয়া উঠেন। এমন কি ইহাঁরা সংস্কৃতমূলক শব্দ ব্যবহার করিতে রাজি নন। অপভ্রংশ শব্দ, ইংরেজিশব্দ, পারসীশব্দ ও দেশীয়শব্দের দ্বারা লিখিতে পারিলে সংস্কৃতশব্দ প্রাণান্তেও ব্যবহার করেন না। এই গেল আর এক দলের কথা। সুতরাং এই উভয় দল যে পরস্পর বিরোধী হইবেন, এবং বঙ্গীয় লেখকগণকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিবেন, আপত্তি কি।

আমরা যে পূর্ব্বে লিখিয়াছি বাঙ্গালা ভাষায় যাঁহারা এ পর্য্যন্ত লেখনীধারণ করিয়াছেন, তাঁহারা কেহই বাঙ্গালা ভাষা ভাল করিয়া শিক্ষা করেন নাই, ইহা অতি সত্য কথা। আমরা ইতিহাস দ্বারা এইটি সমর্থন করিব।

সকলেই জানেন অতি অল্পদিন পূর্বে বাঙ্গালা ভাষার গদ্যগ্রন্থ ছিল না, কিন্তু পদ্য প্রচুর ছিল। ইংরেজি শিক্ষা আরম্ভ হইবার পূর্ব্বে যে সকল পদ্য লিখিত হইয়াছিল, তাহা বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষায় লিখিত। কৃত্তিবাস, কাশীদাস, অনুবাদ করিয়াছেন, সেজন্য তাঁহাদের গ্রন্থে দু পাঁচটি অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দ থাকিলেও উহা প্রধানতঃ বিশুদ্ধ বাঙ্গালা। কৃত্তিবাস, কাশীদাস, অনুবাদ করিয়াছেন, সে জন্য তাঁহাদের গ্রন্থে দু পাঁচটি অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দ থাকিলেও উহা প্রধানতঃ বিশুদ্ধ বাঙ্গালা।কবিকঙ্কণ, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ সেন প্রভৃতি কবিগণের লেখা বিশুদ্ধ বাঙ্গালা। গদ্য না থাকিলেও ভদ্রসমাজে যে ভাষা প্রচলিত থাকে তাহাকেই বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষা কহে। আমাদের দেশে সেকালে ভদ্রসমাজে তিনপ্রকার বাঙ্গালা ভাষা চলিত ছিল। মুসলমান নবাব ও ওমরাহদিগের সহিত যে সকল ভদ্রলোকের ব্যবহার করিতে হইত, তাঁহাদের বাঙ্গালায় অনেক উর্দ্দূ শব্দ মিশান থাকিত। যাঁহারা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতেন, তাঁহাদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হইত। এই দুই ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ভিন্ন বহুসংখ্যক বিষয়ী লোক ছিলেন। তাঁহাদের বাঙ্গালায় উর্দ্দূ ও সংস্কৃত দুই মিশান থাকিত। কবি ও পাঁচালীওয়ালারা এই ভাষার গীত বাঁধিত। মোটামুটি ব্রাহ্মণপণ্ডিত, বিষয়ী লোক, ও আদালতের লোক এই তিন দল লোকের তিন রকম বাঙ্গালা ছিল। বিষয়ী লোকের যে বাঙ্গালা তাহাই পত্রাদিতে লিখিত হইত, এবং নিম্নশ্রেণীর লোকেরা ঐরূপ বাঙ্গালা শিখিলেই যথেষ্ট জ্ঞান করিত।

ইংরেজরা এদেশ দখল করিয়া ভাষার কিছুমাত্র পরিবর্তন করিতে পারেন নাই। কিন্তু তাঁহারা বহুসংখ্যক আদালত স্থাপন করায় এবং আদালতে উর্দু ভাষা প্রচলিত রাখায় বাঙ্গালাময় পারসী শব্দের কিছু অধিক প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল মাত্র। সাহেবেরা পারসী শিখিতেন, বাঙ্গালা শিখিতেন। দেশীয়েরা দেশীয় ভাষায় তাঁহাদের সহিত কথা কহিতেন। সুতরাং ইংরেজি কথা বাঙ্গালার মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে পারে নাই। যাঁহারা ইংরেজি শিখিতেন বা ইংরেজের সহিত অধিক মিশিতেন দেশের মধ্যে প্রায়ই তাঁহাদের কিছুমাত্র প্রভুত্ব থাকিত না।

কথক মহাশয়েরা বহুকালাবধি বাঙ্গালায় কথা কহিয়া আসিতেছেন। তাঁহারা সংস্কৃতব্যবসায়ী কিন্তু তাঁহারা যে ভাষায় কথা কহিতেন তাহা প্রায়ই বিশুদ্ধ বিষয়ী লোকের ভাষা। কেবল জনকাল বর্ণনাস্থলে ও সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাখ্যা স্থলে ব্রাহ্মণপণ্ডিতী ভাষার অনুসরণ করিতেন।

আমাদিগের দুর্ভাগ্যক্রমে যে সময়ে ইংরেজ মহাপুরুষেরা বাঙ্গালীদিগকে বাঙ্গালা শিখাইবার জন্য উদ্যোগী হইলেন, সেই সময়ে যে সকল পণ্ডিতের সহিত তাঁহাদের আলাপ ছিল তাঁহারা সংস্কৃত কালেজের ছাত্র। তখন সংস্কৃত কালেজ বাঙ্গালায় একঘরে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা তাহাদিগকে যবনের দাস বলিয়া সঙ্গে মিশিতে দিতেন না। তাঁহারা যে সকল গ্রন্থাদি পড়িতেন তাহা এ দেশমধ্যে চলিত ছিল না। এমন কি দেশীয় ভদ্রসমাজে তাঁহাদের কিছুমাত্র আদর ছিল না। সুতরাং তাঁহারা দেশে কোন্‌ ভাষা চলিত কোন্‌ ভাষা অচলিত, তাহার কিছুই বুঝিতেন না। হঠাৎ তাঁহাদিগের উপর বাঙ্গালা পুস্তক প্রণয়নের ভার হইল। তাঁহারাও পণ্ডিতস্বভাবসুলভ দাম্ভিকতাসহকারে বিষয়ের গুরুত্ব কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া লেখনীধারণ করিলেন।

পণ্ডিতদিগের উপর পুস্তক লিখিবার ভার হইলে তাঁহারা প্রায়ই অনুবাদ করেন। সংস্কৃত কালেজের পণ্ডিতেরাও তাহাই করিলেন। তাঁহারা যে সকল অপ্রচলিত গ্রন্থ পাঠ করিয়াছিলেন তাহারই তর্জ্জমা আরম্ভ করিলেন। রাশি রাশি সংস্কৃত শব্দ বিভক্তি পরিবর্জিত হইয়া বাঙ্গালা অক্ষরে উত্তম কাগজে উত্তমরূপে মুদ্রিত হইয়া পুস্তকমধ্যে বিরাজ করিতে লাগিল। যিনি কাদম্বরী তর্জমা করিয়াছিলেন, তিনি লিখিলেন, “একদা প্রভাতকালে চন্দ্রমা অস্তগত হইলে, পক্ষিগণের কলরবে অরণ্যানী কোলাহলময় হইলে, নবোদিত রবির আতপে গগনমণ্ডল লোহিতবর্ণ হইলে, গগনাঙ্গনবিক্ষিপ্ত অন্ধকাররূপ ভস্মরাশি দিনকরের কিরণরূপ সম্মার্জ্জনী দ্বারা দূরীভূত হইলে, সপ্তর্ষিমণ্ডল অবগাহনমানসে মানসসরোবরতীরে অবতীর্ণ হইলে, শাল্মলীবৃক্ষস্থিত পক্ষিগণ আহারের অন্বেষণে অভিমত প্রদেশে প্রস্থান করিল।” আমরা পূর্ব্বে যে তিন ভাষার উল্লেখ করিয়াছি, ইহার সহিত তাহার একটিরও সম্পর্ক নাই।

এ ত গেল সংস্কৃত হইতে অনুবাদ। ইংরেজি হইতে অনুবাদ একবার দেখুন, “পাঠশালার সকল বালকই বিরামের অবসর পাইলে, খেলায় আসক্ত হইত ; কিন্তু তিনি সেই সময়ে নিবিষ্টমনা হইয়া, ঘরট্ট প্রভৃতি যন্ত্রের প্রতিরূপ নির্ম্মাণ করিতেন। একদা, তিনি একটা পুরান বাক্স লইয়া জলের ঘড়ী নির্ম্মান করিয়াছিলেন। ঐ ঘড়ীর শঙ্কু বাক্সমধ্য হইতে অনবরত বিনির্গত জলবিন্দুপাতের দ্বারা নিমগ্ন কাঠখণ্ডপ্রতিঘাতে পরিচালিত হইত ; বেলাবোধনার্থ তাহাতে একটি প্রকৃত শঙ্কুপট্ট ব্যবস্থাপিত ছিল।” ইংরেজি পড়িলে বরং ইহা অপেক্ষা সহজে বুঝা যাইতে পারে।

এই শ্রেণীর লেখকের হস্তে বাঙ্গালা ভাষার উন্নতির ভার অর্পিত হইল। লিখিত ভাষা ক্রমেই সাধারণের দুর্বোধ ও দুষ্পাঠ্য হইয়া উঠিল। অথচ এডুকেশন ডেস্প্যাচের কল্যাণে সমস্ত বঙ্গবাসী বালক এই প্রকারের পুস্তক পড়িয়া বাঙ্গালা ভাষা শিখিতে আরম্ভ করিল। বাঙ্গালা ভাষার পরিপুষ্টির দফা একেবারে রফা হইয়া গেল।

সংস্কৃত কালেজের ছাত্রদিগের দেখাদেখি ইংরেজিওয়ালারাও লেখনীধারণ করিলেন। বাঙ্গালায় সংস্কৃত কালেজের ছাত্রেরা যেমন একঘরে ছিলেন, ইংরেজিওয়ালারাও তাহা অপেক্ষা অল্প ছিলেন না। তাঁহারাও পূর্ব্বোক্ত ত্রিবিধ বাঙ্গালা ভাষার কিছুমাত্র অবগত ছিলেন না। অধিকন্তু তাঁহাদের ভাব ইংরেজিতে মনোমধ্যে উদিত হইত, হজম করিয়া নিজ কথায় তাহা ব্যক্ত করিতে পারিতেন না। নূতন কথা তাঁহাদের পড়ার প্রয়োজন হইত। পড়িতে হইলে নিজ ভাষায় ও সংস্কৃতে যেটুকু দখল থাকা আবশ্যক তাহা না থাকায় সময়ে সময়ে বড়ই বিপন্ন হইতে হইত। উৎপিপীড়িষা, জিজীবিষা, জিঘাংসা, প্রভৃতি কথার সৃষ্টি হইত। “তুষারমণ্ডিত হিমালয়, গিরি-নিঃসৃত নির্ঝর, আবর্ত্তময়ী বেগবতী নদী, চিত্তচমৎকারক ভয়ানক জলপ্রপাত, অযত্নসন্তুত উষ্ণপ্রস্রবণ,দিক্‌দাহকারী দাবদাহ, বসুমতীর তেজঃপ্রকাশিনী সুচঞ্চলশিখানিঃসারিণী লোলায়মানা জ্বালামুখী, বিংশতিসহস্র জনের সন্তাপনাশক বিস্তৃতশাখাপ্রসারক বিশাল বটবৃক্ষ, শ্বাপদনাদে নিনাদিত বিবিধ বিভীষিকাসংযুক্ত জনশূন্য মহারণ্য, পর্ব্বতাকার তরঙ্গবিশিষ্ট প্রসারিত সমুদ্র, প্রবল ঝঞ্ঝাবাত, ঘোরতর শিলাবৃষ্টি, জীবিতাশাসংহারক হৃৎকম্পকারক বজ্রধ্বনি, প্রলয়শঙ্কাসমুদ্ভাবক ভীতিজনক ভূমিকম্প, প্রখররশ্মি প্রদীপ্ত নিদাঘমধ্যাহ্ন, মনঃপ্রফুল্লকরী সুধাময়ী শারদীয় পূর্ণিমা, অসংখ্য তারকামন্ডিত তিমিরাকৃত বিশুদ্ধ গগনমণ্ডল ইত্যাদি ভারতভূমি সম্বন্ধীয় নৈসর্গিক বস্তু ও নৈসর্গিক ব্যাপার অচিরাগত কৌতুহলাক্রান্ত হিন্দুজাতীয়দিগের অন্তঃকরণ এরূপ ভীত, চমৎকৃত ও অভিভুত করিয়া ফেলিল যে, তাঁহারা প্রভাবশালী প্রাকৃত পদার্থ সমুদয়কে সচেতন দেবতা জ্ঞান করিয়া সর্ব্বাপেক্ষা তদীয় উপাসনাতেই প্রবৃত্ত থাকিলেন।” এ ভাষার মন্তব্যপ্রকাশ নিষ্প্রয়োজন। আমরা বিশেষ যত্নপূর্ব্বক দেখিয়াছি যে, যে বালকেরা এই সকল গ্রন্থপাঠ করে, তাহারা অতি সত্বরেই এই সকল কথা ভুলিয়া যায়। কারণ, এরূপ শব্দ তাহাদিগকে কখনই ব্যবহার করিতে হয় না। আমাদের এক পুরুষপূর্ব্বে লোকের সংস্কার এই ছিল যে, চলিত শব্দ পুস্তকে ব্যবহার করিলে সে পুস্তকের গৌরব থাকে না। সেই জন্য তাঁহারা বরফের পরিবর্তে তুষার, ফোয়ারার পরিবর্তে প্রস্রবণ, ঘুর্ণীর পরিবর্তে আবর্ত্ত, গ্রীষ্মের পরিবর্তে নিদাঘ প্রভৃতি আভাঙ্গা সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিয়া, গ্রন্থের গৌরবরক্ষা করিতেন। অনেক সময়ে তাঁহাদের ব্যবহৃত সংস্কৃত শব্দ সংস্কৃতেও তত চলিত নহে, কেবল সংস্কৃত অভিধানে দেখিতে পাওয়া যায় মাত্র। ভট্টাচার্য্যদিগের মধ্যে যে সকল সংস্কৃত শব্দ প্রচলিত ছিল, তাহা গ্রন্থকারেরা জানিতেন না, সুতরাং তাঁহাদের গ্রন্থে সে সকল কথা মিলেও না। শুনিয়াছি গ্রন্থকারদিগের মধ্যে দুই পাঁচ জন হয়, একখানি অভিধান, না হয় একজন পন্ডিত সঙ্গে লইয়া লিখিতে বসিতেন।

এই সকল কারণবশতঃ বলিয়াছিলাম যে, যাঁহারা বাঙ্গালা গ্রন্থ লিখিয়াছেন, তাঁহারা ভাল বাঙ্গালা শিখেন নাই। লিখিত বাঙ্গালা ও কথিত বাঙ্গালা এত তফাৎ হইয়া পড়িয়াছে যে, দুইটিকে এক ভাষা বলিয়াই বোধ হয় না। দেশের অধিকাংশ লোকেই লিখিত ভাষা বুঝিতে পারে না। এ জন্যই সাধারণ লোকের মধ্যে আজও পাঠকের সংখ্যা এত অল্প। এ জন্যই বহুসংখ্যক সম্বাদপত্র ও সাময়িকপত্রিকা জলবুদ্বুদের ন্যায় উৎপন্ন হইয়াই আবার জলে মিশিয়া যায়।

গ্রন্থকারেরা বাঙ্গালা ভাষা না শিখিয়া বাঙ্গালা লিখিতে বসিয়া এবং চলিত শব্দ সকল পরিত্যাগ করিয়া অপ্রচলিত শব্দের আশ্রয় লইয়া ভাষার যে অপকার করিয়াছেন, তাহার প্রতিকার করা শক্ত। যদি তাঁহাদের সময়ে ইংরেজি ও বাঙ্গালার বহুল চর্চা না হইত, তাহা হইলে অসংখ্য ক্ষুদ্র গ্রন্থকারদিগের ন্যায় তাঁহাদের নামও কেহ জানিত না। কিন্তু তাঁহাদের সময়ে শিক্ষাবিভাগ স্থাপিত হওয়ায়, তাঁহাদিগের প্রভাব কিছু অতিরিক্ত পরিমাণে বৃদ্ধি হইয়াছে। এবং এই কয়বৎসরের মধ্যে ইংরেজির অতিরিক্ত চর্চ্চা হওয়ায় বহুসংখ্যক ইংরেজি শব্দ ও ভাব, বাঙ্গালাময় ছড়াইয়া পড়ায় বিষয়ী লোকের মধ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল, তাহার এত পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে যে, পূর্ব্বে উহা কিরূপ ছিল, তাহা আর নির্ণয় করিবার যো নাই।

ভট্টাচার্য্য ও কথকদিগের মধ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল, তাহা এখনও কতক কতক নির্ণীত হইতে পারে। কিন্তু এই দুই শ্রেনীর লোক এত অল্প হইয়া আসিয়াছে যে, সেরূপ নির্ণয় করাও সহজ নহে। গ্রন্থকারদিগের বাঙ্গালা বাঙ্গালা নহে। বিশুদ্ধ বাঙ্গালা কি ছিল, তাহা জানিবার উপায় নাই। এ অবস্থায় আমাদের মত লেখকের গতি কি? হয়, ইংরেজি, পারসী, বাঙ্গালা, ও সংস্কৃতময় যে ভাষার ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েসনাদি প্রসিদ্ধ ভদ্রসমাজে কথা বার্তা চলে সেই ভাষার লেখা, না হয়, যাহার যেমন ভাষা যোগায় সেই ভাষায় নিজের ভাব ব্যক্ত করা। এই সিদ্ধান্তের প্রতি যাঁহাদের আপত্তি আছে, তাঁহারা কিরূপ ভাষাকে বিশুদ্ধ বাঙ্গালা ভাষা বলেন, প্রকাশ করিয়া বলিলে গরীব লোকের যথেষ্ট উপকার করা হয়। যতদিন না বলিতে পারেন, ততদিন কুঠার আঘাত বিষয়ে তাঁহাদের কিছুমাত্র অধিকার নাই।

গ্রাডুএট-

বঙ্গদর্শন
শ্রাবণ, ১২৮৮।।

আগের/পরের পর্ব<< বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন: ভাষিক ঔপনিবেশিকতা অথবা উপনিবেশিত ভাষা
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.