Main menu

বই: “সবারে নমি আমি” কানন (বালা) দেবী (সিলেক্টেড অংশ) – ২

কানন (বালা) দেবী (১৯১৬ – ১৯৯২) হইতেছেন ইন্ডিয়ান ফিল্মের শুরু’র দিকের নায়িকা, কলকাতার। ১৯২৬ থিকা ১৯৪৯ পর্যন্ত মোটামুটি এক্টিভ ছিলেন, সিনেমায়। তখনকার ইন্ডিয়ার ফিল্ম-স্টুডিওগুলা কলকাতা-বেইজড ছিল। গায়িকা হিসাবেও উনার সুনাম ছিল অনেক। ১৯৭৩ সনে (বাংলা সন ১৩৮০) উনার অটোবায়োগ্রাফি “সবারে নমি আমি” ছাপা হয়। সন্ধ্যা সেন উনার বয়ানে এই বইটা লেখেন। অই বইটা থিকা কিছু অংশ ছাপাইতেছি আমরা এইখানে।

………

ফার্স্ট পার্ট

………

মালিক ভগবান

এও এক অভিজ্ঞতা। দুপুর থেকে স্টুডিওতে গিয়ে বসে আছি ত আছিই। কেউ কথাও বলে না, বার্তাও না। আর সকলের সে কি গর্বিত চালচলন। যেন মাটিতে পা ই পড়ে না। সবসময় যেন গোঁফে তা দেওয়া ভাব। বেয়ারা থেকে শুরু করে হোমরাচোমরা অবধি সকলের। আমরা কি যে সে লোক? এন-টি ব্যানারে কাজ করি। এই ভাবেই ডগমগ। দিন গড়িয়ে বিকেল এল। বিকেলের পর সন্ধ্যা। হঠাৎ যেন ‘সাজ সাজ’ রব উঠল। “কি ব্যাপার?” “না, সাহেব আসছেন।’ ‘সাহেব’?—অবাক হয়ে তাকাতেই এক বেয়ারা আমার অজ্ঞতা দেখে কৃপা পরবশ হয়ে এগিয়ে এসে চুপিচুপি বলল, ‘সাহেব হলেন বি এন সরকার—নিউ থিয়েটার্সের ভগবান, এটা জেনে রাখুন। বলেই শশব্যস্তে কোমরের বেল্ট, মাথার ক্যাপ ঠিক করে মুখে বৈষ্ণবী বিনয়ের গদগদভাব ফুটিয়ে সাহেবের গাড়ির দিকে ছুটল। অন্যান্য সবাইও সাহেবের সম্মুখীন হবার আগে ঠিক ফার্নিচার ঝাড়ার মতই নিজেদের যথাসম্ভব ঝাড়পৌঁছ করে নিলেন। স্যুট পরিহিতরা টাই-এর নটটা একটু টাইট করে রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নিলেন। কেউ বা সার্টের কলারটা একটু সোজা করে নিলেন। আবার ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিতরা হাতের ভাজ টান টান করে কেঁাচাটা ধরে ঠিক খেলার মাঠে দৌড়োনোর প্রতিযোগিতায় নামার মত বেগে ধাবিত হলেন বি এন সরকারের গাড়ির দিকে। তারপর প্রতিযোগিতা হোলো কে সবচেয়ে আগে স্যারের চোখে পড়তে পারেন এবং কার অভিবাদনে আনুগত্যর প্রকাশ স্যারের কতটা বেশী প্রসন্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে? সারাদিন বসে থাকার বিরুক্তি ও ক্লান্তির বাধা ঠেলেও মনটা যেন মুহূর্তের জন্য কৌতুকে নেচে উঠল। নিজের অজ্ঞাতে কখন উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করেছি বুঝতেই পারিনি। হঠাৎই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক তামাশা শুরু করেছি বুন্টুতেই পারিনি। হঠাৎই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক তামাশা দেখা মতই উপভোগ করলাম অবস্থা বিশেষে বয়স্ক মানুষও কেমন ছেলেমানুষের মত হয়ে যায়। এন-টির পদস্থ ব্যক্তিরা পরস্পরকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় পাঁচজনে মিলে স্যারের গাড়ির দরজা খুললেন। স্যার গাড়ি থেকে মাটিতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে দু-পাশের অনুগতের দল তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেন। তার আগে অবশ্য দুহাত জোড় করে প্রায় মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করা হয়ে গেছে। আমি তারই প্রোডাকশনের একজন শিল্পী, সেইদিনই প্রথম কাজে যোগ দিয়েছি, সারাদিন বসে আছি। অথচ আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করানোরও একটা প্রয়োজন আছে একথা কারো চিন্তাতেও স্থান পেয়েছে বলে মনে হোলো না। যে যার নিজের ভাবনাতেই বিভোর। আমার মত সামান্য মানুষের দিকে তাকাবার তাঁদের সময় কই? আমি ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই বুঝতে পারলাম তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকাটা বিড়ম্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। গরজ করে একাজ সম্পন্ন করার মত কোনো মধ্যস্থা ব্যক্তি এতবড় প্রতিষ্ঠানেও নেই, এ অভিজ্ঞতা যেমন বিস্ময়ের তেমনই বেদনার। যাই হোক, দূর থেকে দুহাত জোড় করে তাঁকে নমস্কার জানিয়ে অন্য ঘরে চলে এলাম। সে নমস্কার সহস্র ভক্তের ভীড়ের আড়াল অতিক্রম করে স্যার বি এন সরকারের চোখে পড়েছিলো কিনা জানি না। কিন্তু তাঁরই প্রতিষ্ঠানের শিল্পী হয়ে যখন সেইদিনই প্রথম প্রবেশ করলাম এ কর্তব্য না করলে সে অ-সৌজন্য নিজেকেই পীড়া দিত। যাই হোক, আরো ঘণ্টা দুয়েক বসে মিঃ পি এন রায়কে ‘আমি এখন যেতে পারি?”—বলতেই খুব অবাক হয়ে তিনি বললেন, ‘সে কি! আপনি এখনও বসে?’- মনটা খুবই দমে গেল।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানানো দরকার। আমার নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেবার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনার কাহিনীর মধ্যে যেন স্যার বি এন সরকারের প্রতি বিন্দুমাত্র কটাক্ষ বা শ্লেষ আছে ভেবে নিয়ে আমার প্রতি অবিচার না করেন। কারণ এখানে আমার আলোচ্য তাঁর পরিপার্শ্বিক, তিনি নন।

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী সাহেবের উল্লেখ না করলে ‘বিদ্যাপতি’র অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আগেই বলেছি ‘বিদ্যাপতি’ চিত্রে অনুরাধা চরিত্র-যোজনা কাজী সাহেবেরই পরিকল্পনা।

বোধহয় ‘বিদ্যাপতিতে কাজ করারও অনেক আগে মেগাফোনের রিহাস্যাল রুমে জে এন ঘোষ আমার সঙ্গে নজরুলের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। এর আগে তাঁর খ্যাতির সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু মানুষটির সঙ্গে পরিচয় সেইদিনই। প্রথমটায় তাকাতেই ভয় করছিলো। উনি কত বড় কবি, আর আমি সামান্য একটি মেয়ে। কিন্তু ভয়ের যে সত্যিকার কোনো কারণ ছিলো না, সে-কথা বুঝতে পারলাম কয়েক মুহূর্তেই। চেয়ে দেখি পাঞ্জাবি পরা বাবরী-চুল এক ভদ্রলোক আস্তে আস্তে হার্মোনিয়াম বাজাতে বাজাতে গুন-গুন করে সুর ভাঁজছেন চোখদুটি বুজে। মাঝে মাঝে চোখ খুলে এদিক-ওদিক অন্যমনস্কভাবে তাকাচ্ছেন, কিন্তু মনটা যে অন্য জগতে, চাউনি দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। এক সময় হার্মোনিয়ম থামিয়ে আমাদের দিকে যখন তাকালেন, বিরাট দুটি চোখের উজ্জ্বলতা যেন তার অন্তরটি মেলে ধরল। আমায় সঙ্কুচিত দেখে পরিবেশ সহজ করে তোলবার জন্যই বোধহয় উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার গান গলা ও চেহারার প্রশংসা শুরু করে হাসির হুল্লোড়ে সারা ঘর মাতিয়ে দিলেন। অপরিচয়ের কুণ্ঠা মুহূর্তেই যেন উড়ে গেল। তারপর জে এন ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ত খিদে পেয়েইছে— মুখ দেখে মনে হচ্ছে কাননেরও খিদে পেয়েছে। দাদা, এ-বিষয়ে একটু তৎপর হন।’ কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই হাসি। জে এন ঘোষ ব্যস্তসমস্তভাবে উঠে গিয়ে মস্তবড় থালাভর্তি খাবার, মিষ্টি, আর একটা বড় প্লেটে পান জর্দার স্তূপ এনে হাজির করতেই ‘খাও’ বলে আমার হাতে গোটা দশ-বারো তুলে দিয়ে নিমেষের মধ্যে সব খাবার নিঃশেষ করে শুধু থালাটিই বাকী রাখলেন। আনন্দময় মানুষটি হৈ-চৈ করে যেমন বিস্ময়কর পরিমাণ খেতে পারতেন ঠিক তেমনই বিস্ময়করভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধুমাত্র গান রচনা নিয়েই মেতে থাকতে পারতেন। আর সে কি আশ্চর্যভাবে মেতে থাকা! কখনও যদি কোনো সুর মনে এল সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে কথা বসানো, আবার কখনও বা কথার তাগিদে সুর। রাগরাগিণীর সম্বন্ধে প্রগাঢ় জ্ঞান হয়ত আমার ছিল না, কিন্তু লক্ষ্য না করে উপায় ছিলো না, কি ব্যাকুল আবেগে তিনি কথার ভাবের সঙ্গে মেলাবার জন্য হার্মোনিয়ম তোলপাড় করে সুর খুঁজে বেড়াতেন। এ যেন ঠিক রাগের মর্ম থেকে কথার উপযুক্ত দোসর অন্বেষণ।

 

আমায় অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে বলতেন, ডাগর চোখে দেখছ কি? আমি হলাম ঘটক, তা জানো? এক দেশে থাকে সুর, অন্য দেশে কথা। এই দুই দেশের বর-কনেকে এক করতে হবে। কিন্তু দুটির জাত আলাদা হলেই বে-বনতি। বুঝলে কিছু?’ বলে হাসিমুখে আমার দিকে তাকাতেন। আমি মাথা নেড়ে স্পষ্টই বলতাম, ‘না বুঝিনি।’ বলতেন, ‘পরে বুঝবে।’ পরে ঠিক বুঝেছি কিনা জানি না, তবে বারবার একটা অচেনা অনুভূতির ঝাপসা আলোয় এইটুকু উপলব্ধিই ঘটেছে যে কথার মত অতি-বাস্তব বস্তুর বুকেও অসীমে ব্যাপ্ত হবার দুরাশা জাগানো এবং সুরের মত অ ধরাকেও কথার মাধুর্যে বন্দী করার মিলন উৎসবে যিনি আত্মহারা তাঁর কবিকৃতিকে উপভোগ করা যতখানি সহজ, ব্যক্তিত্বকে বোঝাটা ঠিক ততখানি সহজ নয়।

শিল্পী

একবার বন্যার জন্য একটি চ্যারিটি শো হয়েছিল। এই উপলক্ষ্যে নানান ঘটনার মধ্যে পঙ্কজবাবুর একটি কথা আজও আমার মনের অতলে মূল্যবান রত্নের মতই সঞ্চিত আছে। অনুষ্ঠানে গাইবার জন্য পঙ্কজবাবু সবাইকে গান শেখাচ্ছিলেন। “আমায় বললেন, তোমার পছন্দমত কয়েকটা গান ঠিক করে নাও। আমি ত ভয়ে সঙ্কোচে দিশেহারা। বললাম, ‘সে, কিন্তু এখানে আমি কি গাইব? এসব আসরে গাইবার মত গান ত আমি জানি না।’ পঙ্কজবাবু উঠে দাঁড়িয়ে ‘সাবাস’ বলে আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন। তারপর উজ্জ্বল চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘তোমার ঐ একটি কথাতেই যথার্থ শিল্পী মনটি প্রকাশ পেয়েছে। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। এতবড় আসরে এবং এই উপলক্ষে গাইবার উপযুক্ত গান আমি জানি না এইটুকুই ছিল আমার বক্তব্য। এর মধ্যে অতবড় সম্মানের কথা আসে কি করে? আমার মতই অন্য সবাইও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। উনি বললেন, ‘বুঝতে পারলে না?’ তারপর অন্য সবাই-এর দিকে চেয়ে বললেন, “দেখ, ফিল্মের এমন নাম করা গাইয়ে মেয়ে, এ ত অনায়াসেই কোনো হিট্ পিকচারের পপুলার গান গেয়ে হাততালি নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ওর চিন্তা সেদিক দিয়ে গেলই না। ওর ভাবনা হোলো এই সময়ের উপযুক্ত গান ও জানে না। এই একটি কথার মধ্যেই ওর শিল্পী হয়ে উঠেছে। তাই বলছি, কানন আমাদের সত্যিকারের শিল্পী হয়ে উঠেছে। ওর সাধনা সার্থক।’ এতবড় গুণীর মুখে এই প্রশংসা শুনে সেদিন চোখের জলকে আর রুখতে পারিনি। সবার সামনেই এই প্রথম অঝোর ধারায় আমার চোখের ধারা গড়িয়ে পড়েছিল।

আজ বুঝতে পারি সেদিন কেন এত সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছিলাম। ছোটবেলা থেকেই চারিদিক থেকে দুর্দশার পীড়নে মনটা বড় স্পর্শকাতর আর ভীতু হয়ে পড়েছিল। কারো সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে এমন কি নিজের কোনো মতামত প্রকাশ করতেও ভয় পেতাম। কাজে নামতে না নামতে আশাতীত নাম, যশ পেয়েছি। আবার এরই কারণে অপযশও কম পাইনি।

আমার ব্যথাদগ্ধ অন্তরের এই নীরবতাকে সবাই অহঙ্কার বলেই ভাবত। আর তাদের কল্পিত এ অহঙ্কারকে আঘাত করবার জন্যই আমার ত্রুটি-খোঁজা ও বিরুদ্ধ সমালোচনায় মেতে ওঠাতেই তারা যেন নিষ্ঠুর আনন্দ পেত। নিজের সম্বন্ধে সেইসব অপবাদ ও নিন্দায় অভ্যস্ত অন্তরই বোধহয় পঙ্কজবাবুর এতবড় অপ্রত্যাশিত কমপ্লিমেন্টে এমন বিহ্বল হয়ে পড়েছিল।

বেতন

কবীর রোডে বাড়ি তোলার কথা আগেই বলেছি। এই বাড়ির জমি কেনবার সময় নিউ থিয়েটার্সের কাছে পাঁচ হাজার টাকা অ্যাডভান্স নিয়েছিলাম। তাছড়া বাস্তব জগৎ সম্বন্ধে অনভিজ্ঞতার কারণেই আমার এতদিনের অর্জিত অর্থের প্রায় সমপ্লটাই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এই বাড়ি তৈরীর ব্যাপারে। নিউ থিয়েটার্সের টাকা শোধ হয়ে গেলেও বাড়ি তোলার সময় নানা কারণে অপব্যয় এবং অপচয়ও যথেষ্ট হয়েছিল। এছাড়াও নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গে আমার চুক্তিও শেষ হয়ে যায়।

কনট্রাক্ট রিনিউ করবার সময় আমি তাই কোম্পানীর কাছে প্রস্তাব করলাম আমার মাস মাইনে হাজার থেকে ১৪০০ টাকা অন্ততঃ করা হোক যাতে এই অর্থসঙ্কট থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পেতে পারি।

আমার এ প্রার্থনা অন্যায্য অথবা অন্যায় সুযোগ গ্রহণ বলে সেদিনও যেমন মনে করিনি আজও করি না। বরং আজকের বক্তব্যে আমি আরো নিঃসংশয়। তখন এত সিনেমা পত্রিকা অথবা খবরের কাগজের নিয়মিত সিনেমা বিভাগের মাধ্যমে দর্শকের অভিমতের সঙ্গে শিল্পীদের এমন প্রত্যক্ষ যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা ছিল না। কোন পাবলিক ফাংশনে চিত্র জগতের নায়ক নায়িকাদের প্রধান অথবা বিশেষ অতিথিরূপে উপস্থিত করে তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে অবহিত করবার অবকাশও ছিলো না। কোনো সভায় শিল্পী সংবর্ধনারও এমন ঘনঘটা ছিল না। এখনকার দিনের মত এতসব উবশী পুরস্কার, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার, পদ্মশ্রী পদ্মভূষণের ঘটা কিংবা বিদেশের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবি পাঠাবার প্রথাও চালু হয় নি।

তবু বাইরের জগতের বিপুল জনপ্রিয়তার খবরের ছিটোফোটাও কি কানে এসে পৌঁছত না? রেকর্ড কোম্পানীর রয়ালটি, ভক্তদের অজস্র চিঠি আর স্টুডিওর হঠাৎ কানে আসা গালগল্প থেকেই জেনেছিলাম জনপ্রিয়তায় আমি কারো নীচে ছিলাম না। বরং যাকে বলে ‘টপমোস্ট’ সেই পোজিশনেই ছিলাম। আমার একান্ত অনুরোধ সহৃদয় পাঠক আমার এ উক্তিকে যেন অহংকার ভেবে ভুল না বোঝেন। প্রকৃত সত্য প্রকাশের দায়িত্বেই এ প্রসঙ্গের অবতারণা করছি।)

তারপর যা বলছিলাম। ওঁরা ১২০০ টাকা অবধি উঠলেন। তবু মাত্র ২০০ টাকা বাড়িয়ে কোম্পানীর এতদিনের শিল্পীর আবেদনের মর্যাদা রাখলেন না, সেই নিউ থিয়েটার্স যে নিউ থিয়েটার্সকে আমি একান্ত আপনার করে দেখেছি, আর আমার শিল্পীসত্ত্বার সমস্ত নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা ও একাগ্রতা দিয়ে যাঁদের প্রয়োজনকে শ্রেষ্ঠ করে তোলবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছি।

তবু হয়ত এঁদের সিদ্ধান্তকেই মেনে নিতাম যদি না দেখতাম আমারই সমান অথবা আমার চেয়েও কম জনপ্রিয় শিল্পীকে সেই মাইনেই দেওয়া হচ্ছে যা আমাকে দিতে এঁরা কুণ্ঠিত।

তখন বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে নিউ থিয়েটার্স ছাড়া অবসর সময়ে অন্য একটি কোম্পানীর ব্যানারে একখানা মাত্র ছবিতে কাজ করবার অনুমতি চাইলাম। তাতে আমিও সাত হাজার টাকা পেতাম। কোম্পানীরও মাইনে বাড়াবার দরকার হোতো না, আমার অর্থাভাবেরও খানিকটা সুরাহা হোতো। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাতেও আপত্তি জানালেন।

যখন দেখলাম যে দুটি সুযোগ থেকে আমায় বঞ্চিত করা হচ্ছে তার প্রত্যেকটিই অন্যান্য শিল্পীরা পাচ্ছেন—নিজেকে অত্যন্ত হীন ও অপমানিত মনে হোল। মনে হোল আত্মমর্যাদাই যদি না থাকল তবে এ শিল্পীখ্যাতির মূল্য কতটুকু?


রুচি, খ্যাতি, গ্লানি

এখানেই দেখেছি কত মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের অসুন্দর কামনার বিকৃত রূপ। সেটা কেমন? ধরুন কাজের ফাকে ভাবছি একটু জিরিয়ে নিয়ে পরের পর্বের জন্য প্রস্তুত হব। হঠাৎ ডাক পড়ল পরিচালকের ঘরে। (শুধু পরিচালকই নয়, রীতিমত নামকরা পরিচালক) কথা আছে, বোস’, বলে গম্ভীরভাবে বসতে বললেন। তারপরই সকল গাম্ভীর্য পরিণত হোল লোলুপ কৌতুহলে—স্বামীর সঙ্গে গত রাত্রিযাপনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানতে চাওয়া। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, প্রশ্নের পর প্রশ্নে আমায় বিব্রত, বিরক্ত ও তিক্ত করে সহিষ্ণুতার শেষপ্রান্তে পৌঁছে দিয়ে হয়ত বা এক সময থামত তার সীমাহীন জিজ্ঞাসা। কিন্তু মুখে চোখে ফেটে পড়া সেই অভিব্যক্তি সহজে মিলতো যা চোখের সামনে চর্ব্যচোষ্য ভোজনরত কাউকে দেখলে ক্ষুধার্তের চোখেমুখে সেদৃষ্টি ফুটে ওঠে। ঘৃণ্য পিচ্ছিল এই প্রবৃত্তি যেন তার নির্লজ্জ স্থূলরূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াত। সে ভয়াবহ মুহূর্তের অসহ্যতা আজ দুঃস্বপ্ন বলেই মনে হয়।

আবার পুরুষমানুষকেই দেখেছি শ্রীহীন জ্বালায় শুচিবায়ুগ্রস্ত সঙ্কীর্ণমনা জটিলা কুটিলা হয়ে উঠতে। একটু রুচিসম্মত সাজে (শিল্পীর পক্ষে সেইটেই কি স্বাভাবিক নয়?) স্টুডিওতে গেলেই চোখরাঙানীর শাসন ‘এতবড় টিপ পরে আস কেন? শাড়ি ব্লাউজ আর একটু সিম্পল পরতে পার না? এত সেজে আসা স্টুডিও মালিক পছন্দ করেন না। বলা বাহুল্য স্টুডিও মালিকের জবানীতে এটা বক্তারই মনের কথা।

আবার এঁদেরই কাউকে (তিনি হয়ত কোম্পানীর ব্যবস্থাপকদেরই অন্যতম কর্ণধার) দেখেছি তারই বিশেষভাবে পছন্দ করা কোন হিরোইনের ওপর কাণ্ডজ্ঞানহীন পক্ষপাতিত্ব দেখাতে। আমার জন্য হয়ত থাকত নিউ থিয়েটার্সের বরাদ্দমাফিক সজ্জা, শাড়ি, ব্লাউজ মেক-আপ। বেশীর ভাগ সময়ই আমার নিজের খরচেই ভূমিকার উপযোগী পাশাক করিয়ে নিতে হোত। কিন্তু ঐ বিশেষ নায়িকার জন্য ঐ বিশেষ কর্তাব্যক্তির আদেশে কোম্পানীর খরচেই আসত বাহারী পোশাক, নতুন ডিজাইনের শাড়ি। নির্বাক হয়ে দেখে যাওয়া ছাড়া এক্ষেত্রে কিই বা করার ছিল?

অত্যন্ত বেদনা জেগেছে যখন দেখেছি আমার তখনকার খ্যাতিকে শুধু মেয়েরাই নন, পুরুষের দলও যেন প্রীতির চোখে দেখতে পারতেন না। একটা অযোগ্য, অপদার্থ মানুষ হঠাৎ যেন মাথা ছাপিয়ে বড্ড বেশী উঠে যাচ্ছে। এ অসহ্য। এইরকমই একটা ভাব দেখেছি সবারই মধ্যে।

কোনো কোনো পরিচালকের পিঠচাপড়ানো ভাব দেখে রাগও হোতো আবার হাসিও পেত। কথায়বার্তায়, হাসিতে ইঙ্গিতে এমনই একটা ভাব প্রকাশ করতেন যেন আমায় তিনিই তৈরী করে দিয়েছেন।

এসবের গ্লানিতে মন বিদ্রোহ করেছে, জীবনে ধিক্কার এসেছে অসংখ্যবার। কিন্তু কোন গ্লানিই চিত্তকে বেশীক্ষণ আচ্ছন্ন রাখতে পারেনি। থেকে থেকে কেবল এই প্রশ্নই জেগেছে মানুষের মধ্যে কেন পশুত্বের উপাদানই বড় হয়ে ওঠে, তার মানবত্ব এমন কি দেবত্বকেও ছাপিয়ে? যে শিল্পজগৎ সাধনার তীর্থভূমি হয়ে উঠতে পারত কেন বাঁধভাঙা বাসনার নির্লজ্জ লোলুপতায় তা হয়ে ওঠে পঙ্কিল নরক।

 

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য