Main menu

বই: “সবারে নমি আমি” কানন (বালা) দেবী (সিলেক্টেড অংশ) – লাস্ট পার্ট

কানন (বালা) দেবী (১৯১৬ – ১৯৯২) হইতেছেন ইন্ডিয়ান ফিল্মের শুরু’র দিকের নায়িকা, কলকাতার। ১৯২৬ থিকা ১৯৪৯ পর্যন্ত মোটামুটি এক্টিভ ছিলেন, সিনেমায়। তখনকার ইন্ডিয়ার ফিল্ম-স্টুডিওগুলা কলকাতা-বেইজড ছিল। গায়িকা হিসাবেও উনার সুনাম ছিল অনেক। ১৯৭৩ সনে (বাংলা সন ১৩৮০) উনার অটোবায়োগ্রাফি “সবারে নমি আমি” ছাপা হয়। সন্ধ্যা সেন উনার বয়ানে এই বইটা লেখেন। অই বইটা থিকা কিছু অংশ ছাপাইতেছি আমরা এইখানে।

আগের দুই পার্টে মোটামুটি কানন (বালা) দেবী’র স্ট্রাগলের কাহিনিই আমরা পাইছি। মজুরি থিকা শুরু কইরা মেন্টাল ও ফিজিক্যাল টর্চারের কাহিনিগুলা। এইখানেও স্ট্রাগলটা কন্টিনিউ করতেছে উনার, কিন্তু সেইটা হইতেছে ইমেজের স্ট্রাগল। এর আগে একটা বাজে রিলেশনের ভিতর দিয়া গেলেও উনার হাজব্যান্ডরে নিয়া উনি হ্যাপি ছিলেন। ফিনান্সিয়ালিও সিকিওরড হইতে পারছিলেন। কিন্তু নায়িকা হিসাবে ‘শ্রদ্ধা-সম্মান’র জায়গাটা মিসিং-ই ছিল মনেহয় সবসময়। নায়িকা হিসাবে ডিজায়ারেবল উইমেন হয়া উঠার যেই সাকসেস, সেইটা থিকা উনারে আলাদা কইরা দেখতে রাজি ছিল না মানুশ-জন। যিনি নায়িকা, ডিজায়ার পয়দা করবেন আমাদের মনে, তারে অন্য কিছু ভাবতে আমাদের এখনো কিছুটা হইলেও তকলিফ তো হওয়ার কথা। মানে, একজন মানুশের অন স্ক্রীন পাবলিক পারফর্মেন্স, ইমেজ, সোশ্যাল পারসেপশনটারেই তো আমরা দেখতেছি, আর যতটুক আমরা দেখি বা জানি ততটুকরেই সত্যি বইলা ভাবার অভ্যাসের কারণে অন্যসব জায়গাগুলারে আমলে নিতে পারার ঘটনা ঘটতে পারে না। এইদিক দিয়া উনার এই অটোবায়োগ্রাফি খালি পারসোনাল লাইফের বয়ান-ই না, একটা পারসপেক্টিভরে হাইলাইট করতে চাওয়াও, যেইটারে আমরা ধইরা নিতে পারি – নায়িকার জীবন।   

কিন্তু এখনো ঘটনাগুলা যে কম-বেশি একইরকম, এইটা মনেহয় একটা চিন্তারই বিষয়। এই কারণে না যে, ‘সমাজ বদলায় নাই’; বরং আমাদের দেখাদেখির জায়গাগুলাতে আমরা খুববেশি নজর দিতে পারি নাই, বা পারতেছিও না মনেহয়।

ই.হা.

………

ফার্স্ট পার্ট ।। সেকেন্ড পার্ট ।।

………

 

অশোক কুমার

এ ছবিতেই (চন্দ্রশেখর) প্রথম অশোককুমারের সংস্পর্শে এলাম। শিল্পী হিসাবে উনি অত্যন্ত কোঅপারেটিং। মানুষ হিসাবে ভদ্র মার্জিত কিন্তু বড্ড বেশী কায়দাদুরস্ত, যাকে বলে ফর্মাল—বাংলাদেশের নায়কদের মত অনাড়ম্বর ও আত্মীয়তাধর্মী নয়। অনেক পরে বোম্বেতে অবশ্য অশোককুমার দম্পতির সঙ্গে আমার ও আমার স্বামীর যথেষ্ট হৃদ্যতা হয়, এবং তারপর সস্ত্রীক কোলকাতায় এসে দু-একবার আমাদের আতিথ্য গ্রহণও তিনি করেছেন। এ দূরত্ববোধ তখন অনেকটাই অপসারিত হয়ে গেছে; এবং আজও আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্পর্কই আছে।

 

হিন্দুপ্রথার বিবাহডোরে

এই সময় টালিগঞ্জে নৃপেন্দ্রনারায়ণ স্কুলের থেকে আমার কাছে কিছু ডোনেশন দেবার আবেদন এল। আর ঐ প্রতিষ্ঠানেরই পুরস্কার বিতরণী সভায় তৎকালীন রাজ্যপাল ডঃ কাটজু এলেন সভায় পুরস্কার বিতরণ ও উদ্বোধন করার জন্যে। ডোনেশনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সভায় প্রধান অতিথি হবার আর রাজ্যপালকে অভ্যর্থনার দায়িত্বভার গ্রহণের সম্মতিও দিতে হোলো।

‘অনন্যা’র স্যুটিং-এর পর গেলাম। ডঃ কাটজুর সঙ্গে আলাপ তো হোলোই, আলাপ হোলো তার Naval A. D. C. হরিদাস ভট্টাচার্যের সঙ্গেও। নিয়মমাফিক পরিচয়ের আগেই তাঁর দিকে চোখ পড়েছিল। না পড়ে পারে? কি বলব তাঁকে। রূপবান? পরম রূপবান? অসাধারণ সুন্দর? না, কোনো গতানুগতিক বিশেষণই এ ক্ষেত্রে ঠিক লাগসই হয় না। দেখলাম সকলের মাথা ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। ঋজু, সরল, ছিপছিপে। যৌবনের প্রাণবন্ত সৌন্দর্য সমৃদ্ধে ভরপুর। জমকালো ইউনিফর্ম ছাপিয়েও ফেটে পড়ছে তাঁর রঙের জৌলুষ। প্রশস্ত ললাট, চোখ দুটি খুব বড় নয় কিন্তু ভারী উজ্জ্বল আর বুদ্ধিদীপ্ত তাঁর সপ্রতিভ চাউনী। আর এই রূপকে শাণিত করে তুলেছে তাঁর অসাধারণ স্মার্টনেস। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা এক টুকরো মিষ্টি হাসি কি সেই স্মার্টনেসকেই অলঙ্কৃত করে? চুম্বকের মত আকর্ষণী শক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে? না রূপে? বলতে পারি না?

তবে ফর্মালিটি অথবা লৌকিক শালীনতা বোধের বিধি-নিষেধ অগ্রাহ্য করেও অবাধ্য চোখ দুটির দৃষ্টি বার বার যেন ওঁরই ওপর পড়ছিলো। আর কি আশ্চর্য? যতবার তাকাচ্ছি দেখি উনিও আমার দিকেই চেয়ে আছেন। চোখাচোখি হতে উনি চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আমিও। বেশ কয়েকবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে গেল। আর সকলের অলক্ষ্যে দুজনের চুরি করে দেখাটা দুজনের কাছেই বারবার ধরা পড়ে যাচ্ছিল। লজ্জার মধ্যেও এক অনামা পুলকে মন যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল। অপরাধটা তাহলে আমার একার নয়। এ অপরাধের আর একজন ভাগীদারও আছেন। একথাটা মনে হতেই কবিগুরুর ভাষায় বলা যায়—’বাজিল বুকে সুখের মত ব্যথা।’ নাটকীয় মনে হলেও আরও একটি অকপট সত্যকথা না বলে পারছি না, ঠিক এই মুহূর্তেই রবীন্দ্রনাথের ‘ওগো সুন্দর চোর’ চরণটি মনের মধ্যে গুন-গুন করে ফিরছিল।

এই হোলো আমাদের প্রথম দেখার অধ্যায়।


বাড়ি ফিরলাম। কাজ-কর্ম সবই চলছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে মনে ভেসে উঠছে একটি রূপ। রাজবেশের মত জমকালো পোশাকের এতটুকু অবকাশে ফুটে ওঠা গোলাপী আভার রং, মিষ্টি হাসি, ক্ষিপ্র সপ্রতিভ গতিভঙ্গি—আর সেই ‘চুরি করে দেখা।’ সব কাজেই কেমন একটা অন্যমনস্কতা এসে যাচ্ছে, আর মনের অতলে উঁকি দিচ্ছে একটা প্রশ্ন, ‘আর একবার দেখা হয় না?’ কি আশ্চর্য যোগাযোগ! বিধাতা যেন আমার মনের ইচ্ছেটা পূর্ণ করবার জন্যই হঠাৎ কল্পতরু হয়ে উঠেলেন।

কারণ, ঘটনার কিছুদিন বাদেই উনি একদিন এলেন গভর্নমেন্ট হাউসেরই একটা ফাংশনে গান গাইবার অনুরোধ নিয়ে—আমারই মত হৃদয়ের গোপন তাগিদে নয় ত—যাই হোক, তখন চোখে দেখার সূচনাটা বিলম্বিত লয়ের আলাপে পৌঁছল।

তারপর ‘অনন্যা’রই স্যুটিং-এর একটা লোকেশন ছিল পলতায়। কিন্তু তার জন্য গভর্নমেন্টের কোনো পদস্থ কর্মচারীর পারমিশন দরকার। তখন আমায় সবাই ধরলেন হবিদাস ভট্টাচার্য এ বিষয়ে যথাযোগ্য সাহায্য করতে পারেন কারণ তিনি স্বয়ং গভর্নরের এ-ডি-সি আর তাঁর সঙ্গে ত সেদিন আলাপই হয়েছে। অতএব এ সুযোগ… ইত্যাদি ইত্যাদি। মুখে বললাম ‘দেখি চেষ্টা করে। কিন্তু কাউকে জানতে দিইনি এই রকম কোনো সুযোগের প্রতীক্ষায় মনটা কিভাবে উৎকণ্ঠিত রয়েছে, আর–এ সুযোগ পেয়ে মনের ভেতর কি দ্রুতলয়ের নৃত্যের মাতন শুরু হয়েছে।

সুযোগের যথাযোগ্য সদ্ব্যবহার করতে একটুও দেরি হোলো না। মিঃ ভট্টাচার্য শুধু ব্যবস্থাই নয়, সব কিছুরই অত্যন্ত সুব্যবস্থা করে দিলেন, নির্বিঘ্নেই সকল কাজ সুসম্পন্ন হোলো।

এরপর হঠাৎই একদিন ফোন বেজে উঠল—একটি মধুর কণ্ঠের প্রশ্ন ‘কেমন আছেন? চিনতে পারছেন?’ ওকে বললাম, ‘বোধহয় পারছি’—কিন্তু মনে মনে বললাম, ‘ও কণ্ঠ আমি লক্ষ লোকের মধ্যেও চিনে নিতে পারি।’

এরপর আস্তে আস্তে ফোনের মাত্রাও বেড়ে চলল। প্রথমে মাঝে মাঝে, তারপর • প্রতিদিন—–ক্রমশঃ একদিনে অনেকবার। আসা-যাওয়াও চলতে থাকে সমান ছন্দে। এর ধ্যতিক্রম হলেই মনটা উদাস হয়ে যেত ঐ গভর্নমেন্ট হাউসের পথেই। দেখা হলে খুব একটা আবেগভরা রোমান্টিক কথাবার্তা হোতো—তা নয়। কিন্তু ওঁকে দেখলেই কর্মক্লান্ত মনের বিরসতা উবে গিয়ে সে কোন এক মধুরতায় সারা মন ভরে যেত। ঐ

কয়েকটি মুহূর্তের জন্যই তৃষিত মন যেন উন্মুখ হয়ে থাকত।

কি একটা কারণে একদিন দুজনেই ব্যস্ত থাকায় পুরো একদিন ফোন যোগে কথা বা দেখা হয়নি। পরদিন উনি ফোন করতেই বললাম, ‘কাল মনটা বড্ড খারাপ হয়েছিল। অনেক রাত অবধি ঘুম আসেনি।’ ও প্রান্ত থেকে উত্তর এল ‘আমারও’।

‘সত্যিই’?

‘সত্যিই’। তারপর কিছুক্ষণের নীরবতার পরই কানে এল সেই পরিচিত মিষ্টি কণ্ঠের সুস্পষ্ট উচ্চারিত কটি কথা, ‘তাই ভাবছিলাম এত কষ্ট করবার কি দরকার??

‘তার মানে??

‘দেখাশোনার ব্যবস্থাটা ত’ পাকাপাকি করে নিলেই হয়।’

একটা অনির্ণেয় আবেগে সারা শরীর কেঁপে উঠল—গলাও খুঁজে এল। কোনো রকমে শুধু বলতে পারলাম, ‘সেই ভালো।’

এ আলোচনার পর কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বিবাহ হয়ে গেল। কিন্তু তাও কি বিনাবাধায়? রেজিস্ট্রেশনপর্ব নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হোলো। কিন্তু আমাদের দুজনের, বিশেষ করে মিঃ ভট্টাচার্যের মত ছিল—’কালির স্বাক্ষরে ক্ষতি নেই। কিন্তু দুটি উঁ, বনের মহামিলনের এই পুণ্যল্মটি বাঁধা থাক হিন্দুপ্রথার বিবাহডোরে।

সৈত্যি কথা বলতে কি, একটি ইচ্ছের মধ্যেই যেন আমাদের কাছে মানুষটির অন্তর চকিতদ্যুতির মতই উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, বর্ষারাতে নিকষ কালো আকাশের বুকে আলোর চমক লাগানো বিদ্যুতের মতই। আগেই বলেছি মধুর আলাপের কোনো প্রকাশ্য ছন্দে আমাদের মধ্যে হৃদয়বিনিময় হয়নি। তার কারণ হোলো ওঁর অনুচ্ছ্বাসী চাপা স্বভাব, যার ফলে বাইরের লোকেরা খুব সহজেই ওঁকে ভুল বুঝতেও পারে, ভারতেও পারে উন্নাসিক, ফর্মাল—এমন কি বেরসিকও।

কিন্তু ওঁর একটু কাছে যে এসেছে তার কাছে ভেতরটা স্বচ্ছ হতে দেরি হয় না! সবাই ওঁকে বলত ‘সাহেব’ – শুধু রং ও চেহারার জন্যই নয়। কেতাদুরন্ত নিখুঁত আদবকায়দার চালচলনের জন্যও। এটা ওঁর স্বভাবগত তো বটেই, মজ্জাগতও। পদস্থ সরকারী কর্মচারী হওয়ার দরুন সাহেবমহলে কর্মক্ষেত্রের অনেকটাই প্রসারিত ছিল। বলে মানুষটা চলতি কথায় যাকে বলে এমন সাহেবী চালচলনসম্পন্ন হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু আপন দেশ ও ধর্মের প্রতি ওঁর কত অবিচল নিষ্ঠা আর ঐকান্তিক অনুরাগ সেটা বোঝা গেল ঐ একটি কথায়—’অগ্নিসাক্ষী করে নারায়ণশিলা সাক্ষ্য রেখে যদি দুটি হৃদয় পরস্পরকে গ্রহণ না করে তাহলে বিবাহ কথাটার কোনো মানেই হয় না।’ গহন বনের ঘন ঝোপের আড়ালে সবার অলক্ষ্যে ফুটে-ওঠা, নাম-না-জানা এক ঝলক ফুলের গন্ধের মতই ঐ কটি কথার সৌরভে যেন মনটা ভরে উঠল।…

আরও একটি বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট বোঝাপড়া ছিল। সেটি হোলো এই যে কোনোদিন অতীতের কোনো প্রসঙ্গ তুলে আমরা কেউই বর্তমানের শান্তধীর জীবনে চাঞ্চল্য বা অশান্তির আবর্ত সৃষ্টি হতে দেব না। এ শর্ত উনি কোনোদিন, কোনো কারণে ভাঙেননি। ওঁর শালীনতামার্জিত মনের এই সংযমকে আমি শ্রদ্ধা করি।

 

সুচিত্রা সেন

নানান নানান গল্পগুজব করতে করতে একবার ওকে বলেছিলাম, ‘সুচিত্রা, তুমি নাম করেছ। আরও অনেক নাম করবে। অনেক বড় হবে। কিন্তু প্লীজ, টাকার জন্য আজেবাজে রোল এ্যাকসেপ্ট করে নিজের প্রতিভার অপচয় ঘটতে দিও না। এ কাজ আমাদের করতে হয়েছে এবং তার জন্য চিত্তগ্লানির হাত থেকে রেহাই পাইনি। কারণ ওতে নিজের শিল্পীসত্তাকে বিড়ম্বিত করা হয়, সে অধিকার আমাদের একেবারেই নেই। সে সত্য তখন বুঝিনি, আজ বুঝেছি।’ ওর মনও একথায় সায় দিয়েছিলো।

তারপর কত বছর কেটে গেছে। আজ স্থির নক্ষত্রের মতই আপন স্বাতন্ত্র্যে ও আপনি উজ্জ্বল। নিজেকে দুর্লভ রাখতে জানে বলেই আজও ও ফুরিয়ে যায়নি।

আরো একটা কারণে বয়সে ছোট হলেও সুচিত্রার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আমাদের যুগ ছিল ডিকটেটরশিপের যুগ। মন সায় না দিলেও ডিরেকটর, প্রোডিউসরদের অনেক অন্যায় জুলুম আমাদের মানতে হয়েছে। কারণ সে অধ্যায় শিল্পীদের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র নয়, কর্তৃপক্ষের অহমিকা বিকাশের যুগ। কিন্তু সুচিত্রা সে যুগ উল্টে দিয়েছে। প্রথম যুগের সকল অবিচার, অত্যাচার, অন্যায়ের প্রতিবাদ, —এক কথায় একটা যুগের বিদ্রোহ ওর মধ্য দিয়ে কথা বলে উঠেছে।

অনেকসময়ই ওর উগ্রতা হয়ত অনেককে অসহিষ্ণু করে তোলে। কিন্তু অনেক পর্বতের বাধা, খাদ, গহ্বর, অসমতল পথ অতিক্রম করে আসা নদীর বেগ দুর্বার দুর্দমনীয়। সুচিত্রাও তাই। প্রচলিত সংস্কার, প্রথার বেড়া ভাঙার বিদ্রোহে উগ্রতা ত থাকবেই। পরে যখন ব্যালান্সড হবে সবই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। যে প্রতিবাদ জানানো নানান কারণে আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি, তা এসেছে ওরই মাঝ দিয়ে। এইখানেই ও অনন্যা। এ সত্য মানতেই হবে।

 

প্রযোজিকা

প্রযোজিকা জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে এক কৌতুকবহ অভিজ্ঞতার কথা আজও ভুলতে পারিনি। কোন এক হিরোইন, প্রতিদিন সকালে সাঙ্গপাঙ্গসহ সেটে এসেই অর্ডার করতেন ছ’টা হাফ বয়েলড ডিম, এক পাউণ্ড রুটি আর এক টিন মাখন। লাঞ্চে চাইনীজ হোটেলের ফ্রায়েড রাইস, আমজাদিয়ার চিকেন রোল, আমীনীয়ার চাঁপ, স্কাইরুমের চিকেন টেট্রাজেনী; বিকেলে চাই মুড়ি, গরম তেলেভাজা সমেত দু’পট চা, আঙ্গুর, আপেল, কমলালেবু, কলা, পেঁপে এবং সম্ভব হলে আরো রকমারী ফল।

বলা বাহুল্য, এ সকল চাহিদাই পূর্ণ করতে হয়েছে বিনা বাক্যব্যয়ে, আর মনের পটে ভেসে উঠেছে পাশাপাশি দুটি ছবি। দুটি যুগের। এক যুগের নায়িকাকে সেটে এসে অবধি আপন আসনে ত্রস্ত হয়ে বসে থাকতে হয়েছে প্রতিমুহূর্তে পরিচালক ও কর্তৃবৃন্দের নির্দেশ ও আদেশ তামিলের প্রতীক্ষায়। সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রমের পর লাঞ্চ হিসাবে কপালে জুটত ডাল, ভাত, একটুকরো মাছ, আর স্পেশ্যাল লাঞ্চ যেদিন থাকত, পাওয়া যেত দু-এক টুকরো মাংস ও এক টুকরো আলু।

পরের যুগ। চর্বচুষলহাপেয় দিয়ে কর্তৃপক্ষ হিরোইনদের সেবায় রত, তাঁর তুষ্টি বিধানে ব্যগ্র। তাঁর মুড যাতে নষ্ট হয়ে না যায় তার জন্য সদাসন্ত্রস্ত।

নিস্পৃহ দর্শকের দৃষ্টিতে দেখলে এও এক উপভোগ্য অভিজ্ঞতা বইকি।

 

কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা

রাত বারটায় আমার বাড়িতে ঢুকতে চেয়ে যাদের গেট থেকেই ফিরে যেতো হয়েছে, নানান কাগজে সেইসব নীতিবাদীদের প্রচারিত কুৎসার হলাহলও আমি নির্বিকার চিত্তে পান করেছি! জীবন ভরে এমনই কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধ্যায় চলেছে। কিন্তু সকলকে ছাপিয়ে উঠেছিলো একটি সীমাহীন নীচতার কাহিনী। এ কাহিনী যেমন নির্দয় তেমনই মর্মস্তুদ। বহুদিন আগের ঘটনা। আমি নিয়মিত পেট্রোল কিনতে যেতাম একটি দোকানে। বিক্রেতার আসনে দেখতাম এক তরুণকে। যেদিন লোক না থাকত নিজেই ছুটে এসে পেট্রোল ভরে দিয়ে যেত। চেহারাটা ভারী মিষ্টি। হাসি মুখ, নম্রস্বভাব, স্বল্পভাষী ছেলেটি প্রথম থেকেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। কথা বলার খুব বেশী দরকার হোতো না। কিন্তু সামান্য কথাবার্তার মধ্যেও তার মুখে ‘মা’ সম্ভাষণ আমার ভারী ভালো লাগত। অজান্তে তার ওপর একটা মায়াও পড়ে গিয়েছিলো।

এমনি ভাবেই চলছিলো। হঠাৎ একদিন গিয়ে তাকে দেখতে পেলাম না। সেদিন মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। এরপর বেশ কয়েকদিন উপরি-উপরি গিয়ে তাকে দেখতে না পেয়ে খবর নিয়ে জানলাম, অরুণ খুব অসুস্থ। টাইফয়েড হয়েছে। বাড়ি কোথায়? খোঁজ নিয়ে জানলাম, এখানে তার বাড়িঘর বলতে যা বোঝায় তা নেই। সেবা বা দেখাশোনা করবার মত আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউই কাছে নেই। মনটা বড় চঞ্চল হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই খবর করে সে যেখানে থাকে চলে গিয়ে দেখি প্রবল জ্বরে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। ওষুধ-পথ্য ত দূরের কথা, তেষ্টা পেলে একফোঁটা জল মুখে দেবারও কেউ নেই। আমি লোকজন দিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে একেবারে বাড়ি নিয়ে এলাম। দু-চারদিন চিকিৎসা, সেবা-শুশ্রূষার পর জ্ঞান হতে তারই কাছে ঠিকানা নিয়ে বাড়িতে খবর দিলাম।

বেশ কিছুদিন বাদে আত্মীয়স্বজনরা এলেন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত হয়ে। কারণ? মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে অরুণকে বাড়ি নিয়ে এলাম–এ দায়িত্ব গ্রহণ আমার অধিকারের এলাকায় পড়ে না। এতবড় অন্যায় করার দুঃসাহস শাস্তির যোগ্য।

যাই হোক, একটু সুস্থ হতেই অরুণকে তাঁরা নিয়ে গেলেন। কিন্তু কদিন যেতে না-যেতেই টাইফয়েড রিল্যাপস্ করে বাঁকা দিকে মোড় নিল। রোগী ডিলিরিয়ম-এর স্টেজে চলে গিয়ে সর্বক্ষণই কেবল ‘মা’ ‘মা’ করে আমাকেই দেখতে চাইত (অরুণের মা ছিলো না)। যে ডাক্তার দেখছিলেন তিনিই তখন বললেন, ‘রোগী’ যাকে দেখতে চাইছে শীগ্‌গির তাকে খবর দিয়ে আনান, নইলে একে বাঁচানো মুস্কিল হবে।

তখন তারা এসে পূর্ণকৃত ব্যবহারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আমায় নিয়ে গেলেন। আমি ভাবলাম, যাক, এঁদের মন যদি গ্লানিমুক্ত হয়ে থাকে, তবে সেইটাই পরম লাভ। অরুণকে আমি সারিয়ে তুলবই। তারপর দিনের বিশ্রাম, রাতের ঘুম ত্যাগ করে আমি ওর রোগশয্যার পাশে জেগে থেকেছি।

একদিন রাতের ঘটনা বলছি। অরুণ ঘুমোচ্ছে। আমি খাটের ওপর ওর কাছেই আধশোওয়া হয়ে আছি। হঠাৎ মনে হোলো খাটের তলায় কারা যেন নড়ে ওঠায় খাটটা দুলে উঠল। মানুষের নীচতা সম্বন্ধে তখনও পুরোপুরি অভিজ্ঞতা না থাকায় ভাবলাম আমারই ভুল। খাটের তলায় আবার কে থাকবে? কিন্তু Truth is stranger than fiction. পরে জেনেছিলাম, অরুণের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সম্বন্ধে ওরা কদর্য সন্দেহমুক্ত নয়। এবং রাতের পর রাত দুরন্ত কৌতূহলে ওরাই খাটের তলায় লুকিয়ে থেকেছে। কেন—সে কথা বলতেও প্রবৃত্তি হয় না।

যাই হোক, অরুণ সুস্থ হয়ে উঠলো। বলতে ভুলেছি, এই অরুণ হোলো বোম্বাই এর নায়ক অশোককুমারের মাসতুতো ভাই। এমন উঁচু মন, নির্মল চরিত্র ও মধুর স্বভাবের ছেলে আমি খুব বেশী দেখিনি। শুধু মুখেই সে আমায় ‘মা’ বলেনি। অন্তরের সবটুকু স্নেহ ও শ্রদ্ধা দিয়েই ‘মা’র আসনেই বসিয়েছে। ওর স্ত্রীকে (মেরী মুখার্জি নামেই বোম্বাই ও কোলকাতা শিল্পীমহলে জনপ্রিয়) আমি ‘বৌমা’ বলি। তার কাছেও আমি ঠিক সেই শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছি যা আশা করতে পারি আমার আপন পুত্রবধূর কাছে রাণার পৈতে, বিয়ে আরো কত দুর্দিনে ও যেভাবে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আমার সংসার সামলেছে, সে সহৃদয়তা নিকট আত্মীয়ের কাছেও মেলে না। অরুণ খুব অল্প বয়সেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বোম্বেতে ও বহু ছবির সঙ্গীত পরিচালকরূপে নাম করেছিল। একদিন ওর দুটি মেয়েকে নিয়ে দাদা অশোককুমারের সঙ্গে কোথায় যেন গিয়েছিলো। ফেরবার পথে গাড়িতেই দাদার কোলে মাথা রেখে চিরদিনের জন্যই চোখ বুজল। হঠাৎ হার্টফেলের ব্যাপার।

এমনিতে স্বল্পভাষী হলেও অরুণ ছোটোখাটো রসিকতার আবহাওয়া তৈরি করতে পারত চমৎকার। কর্মজীবনে ওকে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। বৌমা ওর শুধু সহধর্মিণীই ছিলো না, ছিলো সহমর্মিণী। হাসিতে, খুশিতে, অক্লান্ত সংসারের কাজে, সেবার সকল দুঃখদৈন্যকে এক ঝটকায় উড়িয়ে দেবার ক্ষমতা যেন ওর হাতের মুঠোয়। ওদের সংসারে তাই শান্তির অভাব কোনোদিন ঘটেনি। জীবনে কোনো কাজের জন্যই আমি কারোর ওপরই নির্ভর করিনি। একমাত্র ‘বৌমা’ যখন আসে ওর ওপর সংসারের ভার ছেড়ে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি। তাই ওকে বলি আমার ডান হাত’।

তারপর যা বলছিলাম। দুঃখকে নিয়ে হা-হুতাশ করা ওদের দুজনেরই ধাতবিরুদ্ধ। রঙ্গ-রহস্যে দুঃখকে ওরা এমন মধুর করে ভুলভ যেটা উঁচুদরের আর্টের পর্যায়ে পড়ে।

বৌমার কাছে শুনেছি একবার বহুকাল একটানা সংগ্রামের অধ্যায়ে অরুণ ওকে হাসতে হাসতে বলেছে, ‘ভালই ত চল্‌ছে। এইবেলা প্রাণভরে দুঃখ-টুকুক্থো যা করবার করে নাও, নইলে পরে আবার আমায় দোষ দেবে জীবনে দুঃখ কাকে বলে তোমায় জানতেই দিলাম না বলে।’ বৌমাই বলে, ‘মা’, তোমাকে মা বলার জন্য বোম্বের আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধুমহল ওকে কিভাবে যে ক্ষ্যাপাত কি বলব। অনেকেই মুখ টিপে হেসে অনুযোগ করত, এত মেয়ে থাকতে বেছে বেছে তোমার সঙ্গেই এ সম্পর্ক গড়ার এত আগ্রহ কেন? ওর মুখখানা যে তখন কি হয়ে যেত তোমায় কি বলব মা। শুম্ হয়ে বসে থাকত। তারপর একটি কথারও জবাব না দিয়ে উঠে চলে যেত। এত শ্রদ্ধা ছিলো তোমার ওপর। এই প্রসঙ্গে বলি—— অরুণ কোনো সাংসারিক অথবা ব্যবহারিক কারণে আমার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো না। নামের মোহেও না। ওর সঙ্গে যখন পরিচয় তখন আমি ‘মাননীয় গার্লস স্কুলের ও নায়িকাও নই। আমার সঙ্গে ওদের সম্পর্ক একেবারে নিখাদ এবং নির্ভেজাল স্নেহের। তাই ওর আত্মীয়-স্বজনের কটূক্তির মুহূর্তেও মনে পড়ে যেত দিলীপদার মুখে শোনা তারই অনুবাদ কোনো এক বিদেশী সিনিকের উক্তি:

‘আত্মীয় কারে কয় জানো হায়,
রটায় যে উল্লাসে,
সেই অপবাদ শুনে যাহা,
চিরশত্রুও লাজ বাসে।’

তাই ত মাঝে মাঝে সকল নীচতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা মন প্রশ্ন করে, মানুষের সঙ্গে মানুষের গুচি-শুভ্র সম্পর্কে মানুষই কেন এমন করে কালি ঢেলে দেয়? আমাদের মনের কিরণবিলাসী কুঁড়িগুলিকে যদি অনাদরের আওতায় শুকিয়ে যেতে হয়, তাতে করে জীবনে সুষমার অপচয়ই ঘটে না কি?

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য