Main menu

তর্ক: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলাম-প্রমথ চৌধুরী

এইরকমের একটা ধারণা তো এখনো আছে যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ‘কাল্পনিক’ ঝগড়া লাগানোর চেষ্টা করেন বাংলাদেশের ‘সাম্প্রদায়িক মুসলমানরা’। কিন্তু উনারা দুইজনেই তো ছিলেন ‘অসাম্প্রদায়িক’, অ্যাজ ইফ উনাদের মধ্যে সাহিত্যিক কোন ডিফরেন্সও নাই! তো, এইটা আসলে সত্যি কথা না। একটা সময়ের মানুশ হিসাবে, একই এলাকার এবং একই ইন্টারেস্টের মানুশ হইলে পারসোনাল যোগাযোগ, ভক্তি-শ্রদ্ধা-সম্মান এইসব থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এইটা কখনোই না যে, উনারা একই আইডিওলজির লোক! রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল ইসলাম নিয়া এই ভুল ধারণা বাজারে এখনো কম-বেশি চালু আছে।

তো, এই তর্কের জায়গাটা দিয়া কিছুটা খেয়াল করা যাইতে পারে, উনাদের ডিফরেন্সের জায়গাটা কই ছিল, বা আছে? পয়লা কথা হইতেছে, এইটা খালি সংস্কৃত-শব্দ আর আরবী-ফার্সি শব্দের মামলা না, যেইটা প্রমথ চৌধুরী পরে বুঝাইতে চাইতেছেন, বরং ঘটনা’টা হইতেছে “পাবলিকের ফর-এ” আর “পাবলিকের এগেনেস্টে”। নজরুলরে রবীন্দ্রনাথ কইছেন, “… তোমাকে জনসাধারণ একেবারে খানায় নিয়ে ফেলবে” মানে, পাবলিকের লাইগা লেইখো না! পাবলিকরে কেয়ার কইরো না! পাবলিক তো ‘সাহিত্য’ বুঝে না! এইরকম। রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরীদের এই মত এখনো ডমিনেন্ট যে, ‘সাহিত্য’ করতে চাইলে পাবলিকের চিন্তা বাদ দিতে হবে। এখন এর এগেনেস্টে কাজী নজরুল ইসলাম যে ‘পাবলিক যা খায়’ সেই সাহিত্য করছেন বা করার কথা বলছেন – তা না; কিন্তু উনি ধরে নিছেন, সমাজে মানুশ আছে, মানুশ কবিতা পড়ে, গান শুনে, কবি হিসাবে সমাজের বাইরের মানুশ না উনি। মানুশ যেমনে কথা কয়, যেই জিনিস ভাবে, সেইগুলা আমার সাহিত্যে আসতে পারে, আসলে ভালো। এইরকম। এইটা হইতেছে বেসিক ডিফরেন্সের জায়গা।

সেকেন্ড হইতেছে, ‘সামাজিকতার ঘটনা’টা। সোশ্যাল পজিশনের ঘটনাগুলা আছে সমাজে এবং ‘কবি হওয়া’ ব্যাপারটাও এর বাইরে না। খালি নজরুলের গরিবি নিয়াই রবীন্দ্রনাথ আর উনার এলিট সঙ্গপাঙ্গরা ‘মৃদুহাস্য’ নামে টিটকারি মারছেন – তা না, খুঁজলে এইরকম টিটকারির নমুনা আরো পাওয়া যাবে। মানে, মিনিমাম একটা সোশ্যাল স্ট্যাটাস মেইনটেইন না কইরা ‘কবি’ ‘সাহিত্যিক’ তো হইতে পারবেন না আপনি সমাজে! হইলেও, অইগুলা আপনারে মাইনা নিতে হবে। জগদীশ গুপ্ত’র লগে আলাপেও এই জিনিস পাইবেন, আল মাহমুদের অটোবায়োগ্রাফিতেও এইসব রবীন্দ্র-বান্দরদের দেখা পাইবেন। যে, ‘কবি’ হিসাবে একটা এলিট ক্লাসের (মধ্যবিত্ত সমাজের) লোক আপনারে হইতে হবে, না হইলে অই ক্লাসের ‘রুচি’ মাইনা আপনারে চলতে হবে। কাজী নজরুল ইসলাম যে সেইটা করতে চান নাই – তা না, কিন্তু উনি ঘাড়-তেড়ামি করছেন। কারণ উনি জানেন, কলকাতার এই সাহিত্য-সমাজ উনারে কবি বানায় নাই, পাবলিকের কাছে উনি কবি হইছেন। এতে কইরা উনার কবিতা ভালো হইছে কি খারাপ হইছে – সেইটা ঘটনা না, কিন্তু উনার সিগনিফিকেন্সের জায়গাটা অইখানে। এই যে, সাহিত্য-সমাজ’রে ‘ছোট’ কইরা ফেলা – এইটা উনারা সহজে নিতে পারার কথা না, নেনও নাই উনারা। কাজী নজরুল ইসলামের এগেনেস্টে প্রপাগান্ডাগুলা এই সোশ্যাল পজিশনের জায়গা থিকাই আসছে বেশিরভাগ সময়।

থার্ড বা লাস্ট জিনিসটা হইতেছে যে, এর কোন সরাসরি দাবি আপনি পাইবেন না। বলা হবে, ছন্দ তো মিলে না! শুনতে তো ভালো লাগে না! নিয়ম তো নাই! এইরকম। মানে, ভিতরে ভিতরে, সাবভারসিভ লেবেলে এইটা চালু আছে, থাকতেছে সবসময়। কথা কইতে গেলে, বলা হবে, কই, এইরকম কিছু বলছি নাকি আমরা! বললেও এমনভাবে বলা হবে, যেন লজিক্যাল কিছু বলা হইতেছে, না-মাইনা কোন উপায় নাই, মানুশ যেন বাঁইচা আছে, কিছু নিয়ম মানার লাইগাই। এইরকম ভঙ্গিমাগুলার ভিতর দিয়া বরং বেশি টের পাওয়া যায় অপ্রেশনগুলা। আর যেহেতু কোন ‘প্রমাণ’ নাই বা গোপন কইরা ফেলা হয়, তখন বলাটা সহজ হয় যে, এইগুলা হইতেছে ‘সাম্প্রদায়িক মনোভাবের’ ঘটনা। 

এইটা যে তা না, বাংলা-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের যে আলাদা আলাদা ক্লেইম আছে, এই জায়গাটা এই তর্কের ভিতর দিয়া কিছুটা হইলেও ক্লিয়ার হইতে পারবে বইলা আমরা মনে করি। আর এইটা উনাদের পারসোনাল ভালো-সম্পর্ক বা খারাপ-সম্পর্কের কোন ঘটনা না, বরং সাহিত্যিক পজিশনের ঘটনা। 

আসেন, তিনটা লেখাই পড়ি!

ই.হা.

………………………

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে রবীন্দ্র-পরিষদের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ওয়াজ করেন। পরে সাপ্তাহিক “বাঙ্গলার কথা” পত্রিকাতে ২০ শে ডিসেম্বর ১৯২৭ (পৌষ ৪, ১৩৩৪) সালে এই লেখাটা ছাপা হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অতি-আধুনিক বাঙ্‌লা সাহিত্য

এই পরিষদে i কবির অভ্যর্থনা পূর্বেই হয়ে গেছে। সেই কবি বৈদেহিক; সে বাণীমূর্তিতে ভাবরূপে সম্পূর্ণ। দেহের মধ্যে তার প্রকাশ সংকীর্ণ এবং নানা অপ্রাসঙ্গিক উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত।

আমার বন্ধু ii এইমাত্র যমের সঙ্গে কবির তুলনা ক’রে বলেছেন, যমরাজ আর কবিরাজ দুটি বিপরীত পদার্থ। বোধহয় তিনি বলতে চান, যমরাজ নাশ করে আর কবিরাজ সৃষ্টি করে। কিন্তু, এরা উভয়েই যে এক দলের লোক, একই ব্যবসায়ে নিযুক্ত, সে কথা অমন ক’রে চাপা দিলে চলবে কেন।

নাটকসৃষ্টির সর্বপ্রধান অংশ তার পঞ্চম অঙ্কে। নাটকের মধ্যে যা-কিছু চঞ্চল তা ঝরে পড়ে গিয়ে তার যেটুকু স্থায়ী সেইটুকুই পঞ্চম অঙ্কের চরম তিরস্করণীর ভিতর দিয়ে হৃদয়ের মধ্যে এসে প্রবেশ করে। বিশ্বনাট্যসৃষ্টিতেও পঞ্চম অঙ্কের প্রাধান্য ঋষিরা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন– সেইজন্য সৃষ্টিলীলায় অগ্নি, সূর্য, বৃষ্টিধারা, বায়ুর নাট্যনৈপুণ্য স্বীকার ক’রে সব শেষে বলেছেন, মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ। ইনি না থাকলে যা-কিছু ক্ষণকালের তাই জমে উঠে যেটি চিরকালের তাকে আচ্ছন্ন ক’রে দেয়। যেটা স্থূল, সেটাকে ঠেলে ফেলবার কাজে মৃত্যু নিয়ত ধাবমান। যেটা স্থাবর,

ভয়াদস্যারিস্তপতি ভয়াত্তপতি সূর্যঃ। ভয়াদিদ্ৰশ্চ বায়ুশ্চ মৃত্যুৰ্ধাবতি পঞ্চমঃ॥

এই যদি হয় যমরাজের কাজ, তবে কবির কাজের সঙ্গে এর মিল আছে বৈকি। ক্ষণকালের তুচ্ছতা থেকে, জীর্ণতা থেকে, নিত্যকালের আনন্দরূপকে আবরণমুক্ত ক’রে দেখাবার ভার কবির। সংসারে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ অঙ্কে নানাপ্রকার কাজের লোক নানাপ্রকার প্রয়োজনসাধনে প্রবেশ করেন; কিন্তু কবি আসেন “পঞ্চমঃ’; আশু প্রয়োজনের সদ্যঃপাতী আয়োজনের যবনিকা সরিয়ে ফেলে অহৈতুকের রসস্বরূপকে বিশুদ্ধ ক’রে দেখাতে।

আনন্দরূপমমৃতং যদ্‌বিভাতি। আনন্দরূপের অমৃতবাণী বিশ্বে প্রকাশ পাচ্ছে, জলে স্থলে, ফুলে ফলে, বর্ণে গন্ধে, রূপে সংগীতে নৃত্যে, জ্ঞানে ভাবে কর্মে। কবির কাব্যেও সেই বাণীরই ধারা। যে চিত্তযন্ত্রের ভিতর দিয়ে সেই বাণী ধ্বনিত, তার প্রকৃতি অনুসারে এই প্রকাশ আপন বিশেষত্ব লাভ করে। এই বিশেষত্বই অসীমকে বিচিত্র সীমা দেয়। এই সীমার সাহায্যেই সীমার অতীতকে আপন ক’রে নিয়ে তার রস পাই। এই আপন ক’রে নেওয়াটি ব্যক্তিভেদে কিছু-না-কিছু ভিন্নতা পায়। তাই একই কাব্য কত লোকে আপন মনে কতরকম ক’রে বুঝেছে। সেই বোঝার সম্পূর্ণতা কোথাও বেশি, কোথাও কম, কোথাও অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ, কোথাও অশুদ্ধ। প্রকাশের উৎকর্ষেও যেমন তারতম্য, উপলব্ধির স্পষ্টতাতেও তেমনি। এইজন্যেই কাব্য বোঝবার আনন্দেরও সাধনা করতে হয়।

এই বোঝবার কাজে কেউ কেউ কবির সাহায্য চেয়ে থাকেন। তাঁরা ভুলে যান যে, যে-কবি কাব্য লেখেন তিনি এক মানুষ, আর যিনি ব্যাখ্যা করেন তিনি আর-এক জন। এই ব্যাখ্যাকর্তা পাঠকদেরই সমশ্রেণীয়। তাঁর মুখে ভুল ব্যাখ্যা অসম্ভব নয়।

আমার কাব্য ঠিক কী কথাটি বলছে, সেটি শোনবার জন্যে আমাকে বাইরে যেতে হবে যাঁরা শুনতে পেয়েছেন তাঁদের কাছে। সম্পূর্ণ ক’রে শোনবার ক্ষমতা সকলের নেই। যেমন অনেক মানুষ আছে যাদের গানের কান থাকে না– তাদের কানে সুরগুলো পৌঁছয়, গান পৌঁছয় না, অর্থাৎ সুরগুলির অবিচ্ছিন্ন ঐক্যটি তারা স্বভাবত ধরতে পারে না। কাব্য সম্বন্ধে সেই ঐক্যবোধের অভাব অনেকেরই আছে। তারা যে একেবারেই কিছু পায় না তা নয়– সন্দেশের মধ্যে তারা খাদ্যকে পায়, সন্দেশকেই পায় না। সন্দেশ চিনি ছানার চেয়ে অনেক বেশি, তার মধ্যে স্বাদের যে সমগ্রতা আছে সেটি পাবার জন্যে রসবোধের শক্তি থাকা চাই। বহু ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার দ্বারা, চর্চার দ্বারা এই সমগ্রতার অনির্বচনীয় রসবোধের শক্তি পরিণতি লাভ করে। যে-ব্যক্তি সেরা যাচনদার এক দিকে তার স্বাভাবিক সূক্ষ্ম অনুভূতি, আর-এক দিকে ব্যাপক অভিজ্ঞতা, দুয়েরই প্রয়োজন।

এই কারণেই এই-যে পরিষদের প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার সার্থকতা আছে। এখানে কয়েকজন যে একত্র হয়েছেন তার একটিমাত্র কারণ, কাব্য থেকে তাঁরা কিছু-না-কিছু শুনতে পেয়েছেন, তাঁরা উদাসীন নন। এই পরস্পরের শোনা নানা দিক থেকে মিলিয়ে নেবার আনন্দ আছে। আর যারা স্বভাবশ্রোতা, যারা সম্পূর্ণকে সহজে উপলব্ধি করেন, তাঁরা এই পরিষদে আপন যোগ্য আসনটি লাভ করতে পারবেন।

এই পরিষদটি যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এতে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। কবির পক্ষে সকলের চেয়ে বড়ো সুযোগ, পাঠকের শ্রদ্ধা। যুক্তিসিদ্ধ বিষয়ের প্রধান সহায় প্রমাণ, রসসৃষ্টি-পদার্থের প্রধান সহায় শ্রদ্ধা। সুন্দরকে দেখবার পক্ষে অশ্রদ্ধার মতো অন্ধতা আর নেই। এই বিশ্বরচনায় সুন্দরের ধৈর্য অপরিসীম। চিত্তে যখন উপেক্ষা, শ্রদ্ধা যখন অসাড়, তখনো প্রভাতে সন্ধ্যায় ঋতুতে ঋতুতে সুন্দর আসেন, কোনো অর্ঘ্য না নিয়ে চলে যান, তাঁকে যে গ্রহণ করতে না পারলে সে জানতেও পারে না যে সে বঞ্চিত। যুগে যুগে মানুষের সৃষ্টিতেও এমন ঘটনা ঘটেছে, অশ্রদ্ধার অন্ধকার রাত্রে সুন্দর অলক্ষ্যে এসেছেন, দীপ জ্বালা হয় নি, অলক্ষ্যে চলে গিয়েছেন। সাহিত্যে ও কলারচনায় আজ আমাদের যে সঞ্চয় তা যুগযুগান্তরের বহু অপচয়ের পরিশিষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। অনেক অতিথি ফিরে যায় রুদ্ধদ্বারে বৃথা আঘাত ক’রে, কেউ-বা দৈবক্রমে এসে পড়ে যখন গৃহস্থ জেগে আছে। কেউ বা অনেক দ্বার থেকে ফিরে গিয়ে হঠাৎ দেখে একটা গৃহের দ্বার খোলা। আমার সৌভাগ্য এই যে, এখানে দ্বার খোলা পেয়েছি আহ্বান শুনতে পাচ্ছি “এসো। এই পরিষদ আমাকে শ্রদ্ধার আসন দেবার জন্য প্রস্তুত; স্বদেশের আতিথ্য এইখানে অকৃপণ; এই সভার সভ্যদের কাছে আমার পরিচয় অত্যন্ত ঔদাসীন্যের দ্বারা ক্ষুণ্ণ হবে না।

দেশবিদেশে আমার সম্মানের বিবরণ আমার বন্ধু এইমাত্র বর্ণনা করেছেন। বাইরের দিক থেকে বিদেশের কাছে আমার পরিচয় পরিমাণ হিসাবে অতি অল্প। আমার লেখার সামান্য এক অংশের তর্জমা তাঁদের কাছে পৌঁচেছে, সে তর্জমারও অনেকখানি যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়। কিন্তু সাহিত্যে, কলারচনায়, পরিমাণের হিসাবটা বড়ো হিসাব নয়, সে ক্ষেত্রে অল্প হয়তো বেশির চেয়ে বেশি হতেও পারে। সাহিত্যকে ঠিকভাবে যে দেখে সে মেপে দেখে না, তলিয়ে দেখে; লম্বা পাড়ি দিয়ে সাঁতার না কাটলেও তার চলে, সে ডুব দিয়ে পরিচয় পায়, সেই পরিচয় অন্তরতর। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা ঐতিহাসিক তথ্যের জন্যে পরিমাণের দরকার, স্বাদের বিচারের জন্যে এক গ্রাসের মূল্য দুই গ্রাসের চেয়ে কম নয়। বস্তুত এই ক্ষেত্রে অধিক অনেক সময়ে স্বল্পের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়; অনেককে দেখতে গিয়ে যে চিত্তবিক্ষেপ ঘটে তাতে এককে দেখবার বাধা ঘটায়। রসসাহিত্যে এই এককে দেখাই আসল দেখা।

একজন য়ুরোপীয় আর্টিস্টকে একদিন বলেছিলুম যে, ইচ্ছা করে ছবি আঁকার চর্চা করি, কিন্তু আমার ক্ষীণ দৃষ্টি বলে চেষ্টা করতে সাহস হয় না। তিনি বললেন, “ও ভয়টা কিছুই নয়, ছবি আঁকতে গেলে চোখে একটু কম দেখাই দরকার; পাছে অতিরিক্ত দেখে ফেলি এই আশঙ্কায় চোখের পাতা ইচ্ছা ক’রেই কিছু নামিয়ে দিতে হয়। ছবির কাজ হচ্ছে সার্থক দেখা দেখানো; যারা নিরর্থক অধিক দেখে তারা বস্তু দেখে বেশি, ছবি দেখে কম।’

দেশের লোক কাছের লোক– তাঁদের সম্বন্ধে আমার ভয়ের কথাটা এই যে, তাঁরা আমাকে অনেকখানি দেখে থাকেন, সমগ্রকে সার্থককে দেখা তাঁদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। আমার নানা মত আছে, নানা কর্ম আছে, সংসারে নানা লোকের সঙ্গে আমার নানা সম্বন্ধ আছে; কাছের মানুষের কোনো দাবি আমি রক্ষা করি, কোনো দাবি আমি রক্ষা করতে অক্ষম; কেউ বা আমার কাছ থেকে তাঁদের কাজের ভাবের চিন্তার সম্মতি বা সমর্থন পান কেউ বা পান না, এই সমস্তকে জড়িয়ে আমার পরিচয় তাঁদের কাছে নানাখানা হয়ে ওঠে– নানা লোকের ব্যক্তিগত রুচি, অনভিরুচি ও রাগদ্বেষের ধুলিনিবিড় আকাশে আমি দৃশ্যমান। যে-দূরত্ব দৃশ্যতার অনাবশ্যক আতিশয্য সরিয়ে দিয়ে দৃষ্টিবিষয়ের সত্যতা স্পষ্ট করে তোলে, দেশের লোকের চোখের সামনে সেই দূরত্ব দুর্লভ। মুক্তকালের আকাশের মধ্যে সঞ্চরণশীল যে-সত্যকে দেখা আবশ্যক, নিকটের লোক সেই সত্যকে প্রায়ই একান্ত বর্তমান কালের আলপিন দিয়ে রুদ্ধ ক’রে ধরে; তার পাখার পরিধির পরিমাণ দেখে, কিন্তু ওড়ার মধ্যে সেই পাখার সম্পূর্ণ ও যথার্থ পরিচয় দেখে না। এইরকম দেশের লোকের অতি নিকট দৃষ্টির কাছে নিজের যে খর্বতা তা আমি অনেককাল থেকে অনুভব করে এসেছি। দেশের লোকের সভায় এরই সংকোচ আমি এড়াতে পারি নে। অন্যত্র জগদ্গুবরেণ্য লোকদের সামনে আমাকে কথা বলতে হয়েছে, কিছুমাত্র দ্বিধা আমার মনে কোনোদিন আসে নি; নিশ্চয় জেনেছি, তাঁরা আমাকে স্পষ্ট ক’রে বুঝবেন, একটি নির্মল ও প্রশস্ত ভূমিকার মধ্যে আমার কথাগুলিকে তাঁরা ধ’রে দেখতে পারবেন। এ দেশে, এমন-কি, অল্পবয়স্ক ছাত্রদের সামনেও দাঁড়াতে আমার সংকোচ বোধ হয়– জানি যে, কত কী ঘরাও কারণে ও ঘর-গড়া অসত্যের ভিতর দিয়ে আমার সম্বন্ধে তাঁদের বিচারের আদর্শ উদার হওয়া সম্ভবপর হয় না।

এইজন্যেই যমরাজের নিন্দার প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছি; কারণ, তাঁর উপরে আমার মস্ত ভরসা। তিনি নৈকট্যের অন্তরাল ঘুচিয়ে দেবেন; আমার মধ্যে যা-কিছু অবান্তর নিরর্থক ক্ষণকালীন, আর আমার সম্বন্ধে যা-কিছু মিথ্যা সৃষ্টি, সে সমস্তই তিনি এক অন্তিম নিশ্বাসে উড়িয়ে দেবেন। বাহিরের নৈকট্যকে সরিয়ে ফেলে অন্তরের নৈকট্যকে তিনি সুগম করবেন। কবিরাজদের পরম সুহৃদ যমরাজ। যেদিন তিনি আমাকে তাঁর দরবারে ডেকে নেবেন সেদিন তোমাদের এই রবীন্দ্র পরিষদ খুব জমে উঠবে।

কিন্তু, এ কথা ব’লে বিশেষ কোনো সান্ত্বনা নেই। মানুষ মানুষের নগদ প্রীতি চায়। মৃত্যুর পরে স্মরণসভার সভাপতির গŪগŪ ভাষার করুণ রস যেখানে উচ্ছ্বসিত, সেখানে তৃষার্তের পাত্র পৌঁছয় না। যে জীবলোকে এসেছি এখানে নানা রসের উৎস আছে, সেই সুধারসে মর্তলোকেই আমরা অমৃতের স্বাদ পাই; বুঝতে পারি, এই মাটির পৃথিবীতেও অমরাবতী আছে। মানুষের কাছে মানুষের প্রীতি তারই মধ্যে একটি প্রধান অমৃতরস– মরবার পূর্বে এ যদি অঞ্জলি ভরে পান করতে পাই তা হলে মৃত্যু অপ্রমাণ হয়ে যায়। অনেক দিনের কথা বলছি, তখন আমার অল্প বয়স। একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেম, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের মৃত্যুশয্যার পাশে আমি বসে আছি। তিনি বললেন, “রবি, তোমার হাতটা আমাকে দাও দেখি।’ হাত বাড়িয়ে দিলেম, কিন্তু তাঁর এই অনুরোধের ঠিক মানেটি বুঝতে পারলেম না। অবশেষে তিনি আমার হাত ধরে বললেন, “আমি এই যে জীবলোক থেকে বিদায় নিচ্ছি, তোমার হাতের স্পর্শে তারই শেষস্পর্শ নিয়ে যেতে চাই।’

সেই জীবলোকের স্পর্শের জন্যে মনে আকাঙ্ক্ষা থাকে। কেননা, চলে যেতে হবে। আমার কাছে সেই স্পর্শটি কোথায় স্পষ্ট, কোথায় নিবিড়। যেখান থেকে এই কথাটি আসছে, “তুমি আমাকে খুশি করেছ, তুমি যে জন্মেছ সেটা আমার কাছে সার্থক, তুমি আমাকে যা দিয়েছ তার মূল্য আমি মানি।’ বর্তমানের এই বাণীর মধ্যে ভাবীকালের দানও প্রচ্ছন্ন; যে-প্রীতি, যে শ্রদ্ধা সত্য ও গভীর, সকল কালের সীমা সে অতিক্রম করে; ক্ষণকালের মধ্যে সে চিরকালের সম্পদ দেয়। আমার বিদায়কাল অধিক দূরে নেই; এই সময়ে জীবলোকের আনন্দস্পর্শ তোমাদের এই পরিষদে আমার জন্য তোমরা প্রস্তুত রেখেছ, তোমাদের যা দেয় ভাবীকালের উপরে তার বরাত দাও নি।

ভাবীকালকে অত্যন্ত বেশি করে জুড়ে বসে থাকব, এমন আশাও নেই, আকাঙক্ষাও নেই। ভবিষ্যতের কবি ভবিষ্যতের আসন সগৌরবে গ্রহণ করবে। আমাদের কাজ তাদেরই স্থান প্রশস্ত করে দেওয়া। মেয়াদ ফুরোলে যে গাছ মরে যায় অনেক দিন থেকে ঝরা পাতায় সে মাটি তৈরি করে; সেই মাটিতে খাদ্য জমে থাকে পরবর্তী গাছের জন্যে। ভবিষ্যতের সাহিত্যে আমার জন্যে যদি জায়গার টানাটানিও হয় তবু এ কথা সবাইকে মানতে হবে যে, সাহিত্যের মাটির মধ্যে গোচরে অগোচরে প্রাণের বস্তু কিছু রেখে গেছি। নতুন প্রাণ নতুন রূপ সৃষ্টি করে, কিন্তু পুরাতনের জীবনধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সে প্রাণশক্তি পায় না; আমাদের বাণীর সপ্তকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে তবেই ভবিষ্যতের বাণী উপরের সপ্তকে চড়তে পারে। সে সপ্তকে রাগিণী তখন নূতন হবে, কিন্তু পুরাতনকে অশ্রদ্ধা করবার স্পর্ধা যেন তার না হয়। মনে যেন থাকে, তখনকার কালের পুরাতন এখনকার কালে নূতনের গৌরবেই আবির্ভূত হয়েছিল।

নবযুগ একটা কথা মাঝে মাঝে ভুলে যায় তার বুঝতে সময় লাগে যে, নূতনত্বে আর নবীনত্বে প্রভেদ আছে। নূতনত্ব কালের ধর্ম, নবীনত্ব কালের অতীত। মহারাজাবাহাদুর আকাশে যে জয়ধ্বজা ওড়ান আজ সে নতুন, কাল সে পুরনো। কিন্তু সূর্যের রথে যে অরুণধ্বজা ওড়ে কোটি কোটি যুগ ধরে প্রতিদিনই সে নবীন। একটি বালিকা তার স্বাক্ষরখাতায় আমার কাছ থেকে একটি বাংলা শ্লোক চেয়েছিল। আমি লিখে দিয়েছিলুম —

নূতন সে পলে পলে অতীতে বিলীন, যুগে যুগে বর্তমান সেই তো নবীন। তৃষ্ণা বাড়াইয়া তোলে নূতনের সুরা, নবীনের নিত্যসুধা তৃপ্তি করে পুরা।

সৃষ্টিশক্তিতে যখন দৈন্য ঘটে তখনই মানুষ তাল ঠুকে নূতনত্বের আস্ফালন করে। পুরাতনের পাত্রে নবীনতার অমৃতরস পরিবেশন করবার শক্তি তাদের নেই, তারা শক্তির অপূর্বতা চড়া গলায় প্রমাণ করবার জন্যে সৃষ্টিছাড়া অদ্ভুতের সন্ধান করতে থাকে। সেদিন কোনো একজন বাঙালি হিন্দু কবির কাব্যে দেখলুম, তিনি রক্ত শব্দের জায়গায় ব্যবহার করেছেন “খুন। পুরাতন “রক্ত’ শব্দে তাঁর কাব্যে রাঙা রঙ যদি না ধরে তা হলে বুঝব, সেটাতে তাঁরই অকৃতিত্ব। তিনি রঙ লাগাতে পারেন না বলেই তাক লাগাতে চান। নতুন আসে অকস্মাতের খোঁচা দিতে, নবীন আসে চিরদিনের আনন্দ দিতে।

সাহিত্যে এইরকম নতুন হয়ে উঠবার জন্যে যাদের প্রাণপণ চেষ্টা তাঁরাই উচ্চৈঃস্বরে নিজেদের তরুণ বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু, আমি তরুণ বলব তাঁদেরই যাঁদের কল্পনার আকাশ চিরপুরাতন রক্তরাগে অরুণবর্ণে সহজে নবীন, চরণ রাঙাবার জন্যে যাদের উষাকে নিয়ুমার্কেটে “খুন” ফরমাস করতে হয় না। আমি সেই তরুণদের বন্ধু, তাঁদের বয়স যতই প্রাচীন হোক। আর যে-বৃদ্ধদের মর্。চে-ধরা চিত্তবীণায় পুরাতনের স্পর্শে নবীন রাগিণী বেজে ওঠে না তাঁদের সঙ্গে আমার মিল হবে না, তাঁদের বয়স নিতান্ত কাঁচা হলেও। এই পরিষদ সকল বয়সের সেই তরুণদের পরিষদ হোক। পুরাতনের নবীনতা বুঝতে তাঁদের যেন কোনো বাধা না থাকে।

১৩৩৪

………………………

কাজী নজরুল ইসলামের এই লেখাটা ছাপা হইছিল সাপ্তাহিক “আত্মশক্তি” পত্রিকার সেকেন্ড ইয়ারের ৩৭ নাম্বার সংখ্যায়, ৩০ শে ডিসেম্বর, ১৯২৭ তারিখে। 

কাজী নজরুল ইসলাম
বড়র পিরীতি বালির বাঁধ

তখন আমি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে রাজ-কয়েদি। অপরাধ, ছেলে খাওয়ার ঘটা দেখে রাজার মাকে একদিন রাগের চোটে ডাইনী বলে ফেলেছিলাম।…

এরি মধ্যে একদিন এসিস্ট্যান্ট জেলার এসে খবর দিলেন, “আবার কি মশাই, আপনি ত নোবেল প্রাইজ পেয়ে গেলেন, আপনাকে রবিঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করেছেন।”

আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আরো দু’একটি কাব্য-বাতিকগ্রস্ত রাজকয়েদি। আমার চেয়েও চেশি হেসেছিলেন সেদিন তাঁরা। আনন্দে নয়, যা নয় তাই শুনে।

কিন্তু ঐ আজগুবি গল্পও সত্য হয়ে গেল। বিশ্বকবি সত্যিসত্যিই আমার ললাটে “অলক্ষণের তিলক-রেখা” এঁকে দিলেন।

অলক্ষণের তিলক-রেখাই বটে, কারণ, এর পর থেকে আমার অতি অন্তরঙ্গ রাজবন্দী বন্ধুরাও আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন। যাঁরা এতদিন আমার এক লেখাকে দশবার করে প্রশংসা করেছেন, তাঁরাই পরে সেই লেখার পনের বার করে নিন্দা করলেন। আমার হয়ে গেল ‘বরে শাপ।”

জেলের ভিতর থেকেই শুনতে পেলাম, বাইরেও একটা বিপুল ঈর্ষা-সিন্ধু ফেনায়িত হয়ে উঠেছে। বিশ্বাস হল না। বিশেষ করে যখন শুনলাম, আমারই অগ্রজ-প্রতিম কোনো কবি-বন্ধু, সেই সিন্ধু-মন্থনের অসুর-পক্ষ ‘লীড়’ করছেন। আমার প্রতি তাঁর অফুরন্ত স্নেহ, অপরিসীম ভালবাসার কথা শুধু যে আমরা দু’জনেই জানতাম, তা নয়, দেশের সকলেই জানত তাঁর পদ্যে পদ্যে কীর্তিত আমার মহিমা গানের ঘটা দেখে।

সত্য-সুন্দরের পূজারী বলে যাঁরা হেঁইয়ো করে বেড়ান, তাঁদের মনও ঈর্ষায় কালো হয়ে ওঠে,— শুনলে আর দুঃখ রাখবার জায়গা থাকে না।

এ-খবর শুনে চোখের জল আমার চোখেই শুকিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম শুধু আমি, বাইরের এই লাভে অন্তরের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার! মনে মনে কেঁদে বললাম, “হায় গুরুদেব! কেন আমার এত বড় ক্ষতিটা করলে?”

বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইষ্টদেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করেছি। এ নিয়ে কত লোকে কত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে। এমনকি আমার এই ভক্তির নির্মম প্রকাশ রবীন্দ্রবিদ্বেষী কোনো একজনের মাথার চাঁদিতে আজো অক্ষয় হয়ে লেখা আছে ! এবং এই ভক্তির বিচারের ভার একদিন আদালতের ধর্মাধিকরণের ওপরেই পড়েছিল।

আমার পরম শ্রদ্ধেয় কবি ও কথাশিল্পী মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন কবির সামনেই এ-কথা ফাঁস করে দিলেন। কবি হেসে বললেন, “যাক, আমার আর ভয় নেই তাহলে!”

তারপর কতদিন দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে। নিজের লেখা দু’চারটে কবিতা-গানও শুনিয়েছি… অবশ্য কবির অনুরোধেই। এবং আমার অতি

সৌভাগ্যবশত তার অতি প্রশংসা লাভও করেছি কবির কাছ থেকে। সে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় কোনদিন এতটুকু প্রাণের দৈন্য বা মন-রাখা ভাল বলবার চেষ্টা দেখিনি।

সঙ্কোচে দূরে গিয়ে বসলে সস্নেহে কাছে ডেকে বসিয়েছেন। মনে হয়েছে, আমার পূজা সার্থক হল, আমি বর পেয়ে গেলাম।

অনেকদিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে গিয়ে থাকবার কথা বলেছেন। হতভাগা আমি, তাঁর পায়ের তলায় মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না, বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।

এই নিয়ে কতদিন তিনি আমায় কতভাবে অনুযোগ করেছেন—“তুমি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচ্ছ—তোমাকে জনসাধারণ একেবারে খানায় নিয়ে ফেলবে”—ইত্যাদি।

আমি দেখছি, এ-গৌরবে আমার মুখ যত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কোনো কোনো নাম-করা কবির মুখে কে যেন তত কালি ঢেলে দিয়েছে। ক্রমে ক্রমে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীরাই এমনি করে শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন। আজ তিন চার বছর ধরে এই ‘শুভানুধ্যায়ী’রা গালি-গালাজ করেছেন আমায়, তবু তাঁদের মনের ঝাল বা প্রাণের খেদ মিটল না। বাপরে বাপ! মানুষের গাল দেবার ভাষা ও তার এত কর্তবও থাকতে পারে, এ আমার জানা ছিল না।

ফি শনিবারে চিঠি! এবং তাতে সে কী গাড়োয়ানি রসিকতা, আর সে মেছোহাটা থেকে টুকে-আনা গালি! এই গালির গালিচাতে বোধহয় আমি এ কালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাহানশাহ্।

বাংলায় ‘রেকর্ড’ হয়ে রইলো আমায় দেওয়া এই গালির স্তূপ। কোথায় লাগে ধাপার মাঠ! ফি হপ্তায় মেল (ধাপা-মেল) বোঝাই। কিন্তু এত নিন্দাও সয়েছিল। এতদিন তবু সান্ত্বনা ছিল যে, এ হচ্ছে তন্তুবায়ের বলীবর্দ ক্রয়ের অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া। বাবা, তুই নখদন্তহীন নিরামিষাশী কবি, তোর কেন এ ঘোড়া-রোগ—এ স্বদেশ প্রেমের বাই উঠল? কোথায় তুই হাঁ করে খাবি গুল বদনীর গুলিস্তানে মলয়-হাওয়া, দেখবি ফুলের হাই তোলা, গাইবি, “আয়লো অলি কুসুম-কলি” গান, —তা না করে দিতে গেলি রাজার পেছনে খোঁচা! গেলি জেলে, টান্‌লি ঘানি, করলি প্রায়োপবেশন, পরলি শিকল—বেড়ি, ডাণ্ডাবেড়ি, বইগুলোকে একধার থেকে করাতে লাগলি বাজেয়াপ্ত, এ কোন্ রকম রসিকতা তোর? কেনই বা এ হ্যাঙ্গামা-হুজ্জুৎ?

হঠাৎ একদিন দেখি ঝড় উঠেছে। সাহিত্যের বেণু-বনে। এবং দেখতে দেখতে সুরের বাঁশি অসুরের কোঁৎকা হয়ে উঠেছে। ছুট ছুট! যত মোলায়েম করেই বেণু-বন বলি না কেন, তাতে ঝড় উঠলে যে তা চিরন্তন বাঁশবনই হয়ে ওঠে তা কোন্ পাষণ্ড অবিশ্বাস করবে?

বেচারি তরুণ সাহিত্য! যেন বালক অভিমন্যুকে মারতে সপ্তমহারথীর সমাবেশ । বাইরে ছেলেমেয়ের ভিড় জমে গেল। ঘন ঘন হাততালি! বলে, “বাঁশ-বাজি দেখতে যাবি, দৌড়ে আয় !” কিন্তু শুধুই কি সপ্তমহারথীর মার? তাঁদের পেছনের পদাতিকগুলি যে আরো ভীষণ। ধুলো-কাদা-গোবর-মাটি—কোনো রুচির বাচ-বিচার নাই, বেপরোয়া ছুঁড়ে চলেছে!

মহারথীদের মারে অমর্যাদা নেই, কিন্তু বাইরে থেকে আসা ঐ ভাড়াটে গুণ্ডাগুলোর নোংরামিতে সাহিত্যের বেণু-বন যে পুকুর পাড়ের বাঁশবাগান হয়ে উঠল।

পুলিশের জুলুম আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। ওদের জুলুমের তবু একটা সীমারেখা আছে। কিন্তু সাহিত্যিক যদি জুলুম করতে শুরু করে, তার… আর পারাপার নেই। এরা তখন হয়ে ওঠে টিক্‌টিকে পুলিশের চেয়েও ক্রূর, অভদ্র । যেন চাক-ভাঙা ভীমরুল। জলে ডুবেও নিষ্কৃতি নেই, সেখানে গিয়েও দংশন করবে।

পলিটিক্সের পাঁকের ভয়ে পালিয়ে গেলাম নাগালের বাইরে। মনে করলাম, যাক, এতদিনে একবার প্রাণ ভরে সাহিত্যের নির্মল বায়ু সেবন করে অতীতের গণ্ডানি কাটিয়ে উঠব। ও বাবা! সাহিত্যের আসর যে পলিটিক্যাল আখড়ার চেয়েও নোংরা, তা কে জানত !

কপাল! কপাল! পালিয়েও কি পার আছে? হঠাৎ একদিন সপ্তরথীর সপ্ত প্রহরণে চকিত হয়ে উঠলাম। ব্যাপার কি? জানতে পারলাম, আমার অপরাধ আমি তরুণ। তরুণেরা নাকি আমায় ভালবাসে, তারা আমার লেখার ভক্ত!

সভয়ে প্রশ্ন করলাম, আজ্ঞে, এতে আমার অপরাধটা কিসের হল?–বহু কণ্ঠের হুঙ্কার উঠলো, ঐটেই তোমার অপরাধ, তুমি তরুণ এবং তরুণেরা তোমায় নিয়ে নাচে।

বললাম, আপাতত আপনাদের ভয়ে আজই ত বুড়ো হয়ে যেতে পারছিনে। ওর জন্য দু’-দশ বছর মার খেয়েই অপেক্ষা করতে হবে ! আর, যারা আমায় নিয়ে নাচে, আপনারাও তাদের নাচিয়ে ছেড়ে দিন। গোল ঢুকে যাবে। আমায় নিয়ে কেন টানাটানি?

আবার নেপথ্যে শোনা গেল, তুমি এই জ্যাঠা অভিমন্যুর পৃষ্ঠরক্ষী। তোমাকে মারতে পারলেই একে কবুল করতে দেরি লাগবে না।

দেখাই যাক…

এতদিন আমি উপেক্ষাবশতই এ ধোঁয়া-বাণের প্রত্যুত্তরে ধোঁয়া ছাড়িনি—না উনুনের, না সিগারেটের! ভেবেছিলাম সম্রাটে-সম্রাটে যুদ্ধ, দূরে দাঁড়িয়ে থাকাই ভাল। কিন্তু হাতিতে-হাতিতে লড়াই হলেও নল-খাগড়ার নিস্তার নাই দেখছি। কাজেই, আমাদেরও এবার আত্মরক্ষা করতে হবে। পড়ে পড়ে মার খাওয়ার কোন পৌরুষ নেই।…

পলিটিক্সের পক্ষকে যাঁরা এতদিন ঘৃণা করে এসেছেন, বেণু-বনের বাঁশের প্রতি তাঁদের এই আকস্মিক আসক্তি দেখে আমারই লজ্জা করছে-বাইরের লোক কি বলছে তা না-ই বললাম।

এ বাঁশ ছোঁড়ারও তারিফ করতে হবে। কোনো বিশেষ একজনের শির লক্ষ্য করে না ছুঁড়ে এঁরা ছুঁড়ছেন একেবারে দল লক্ষ্য করে। কারণ তাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার লজ্জা নেই। বীর বটে! এতদিন তাই পরাস্ত মেনেই চুপ করে ছিলাম। কিন্তু ঐ চুপ করে থাকি বলেই ও-পক্ষ মনে করেন, আমরা জিতে গেলাম। তাই এবার মাথা বেছে বেছেই বাঁশ ছোঁড়া হচ্ছে—বাণ নয়!

অবশ্য, সে-বাঁশে বাঁশির মত গোটাকতক ফুটো করে সুর ফোটাবার আয়াসেরও প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তবু তার খোঁচা আর স্থূলত্বই বলে, ও বাঁশি নয়—বাঁশ।

বীণাই শোভা পায় যাঁর হাতে, তাঁকেও লাঠি ঘুরাতে দেখলে, দুঃখও হয়, হাসিও পায়। পালোয়ানি মাতামাতিতে কে যে কম যান, তা ত বলা দুস্কর…

আজকের “বাঙ্গলার কথা”য় দেখলাম, যিনি অন্ধ ধৃতরাষ্টের শতপুত্রের পক্ষ হয়ে পঞ্চপাণ্ডবকে লাঞ্ছিত করবার সৈনাপত্য গ্রহণ করেছেন, আমাদের উভয় পক্ষের পূজ্য পিতামহ ভীষ্ম-সম সেই মহারথী কবিগুরু এই অভিমন্যু বধে সায় দিয়েছেন—এইটেই এ যুগের পক্ষে সবচেয়ে পীড়াদায়ক।

এই অভিমন্যুর রক্ষী মনে করে কবিগুরু আমায়ও বাণ নিক্ষেপ করতে ছাড়েননি। তিনি বলেছেন, আমি কথায় কথায় রক্তকে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি।

কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপি-পায়জামা পরেন, অথচ, আমরা পরলেই তাঁর এত আক্রোশের কারণ হয়ে উঠি কেন, বুঝতে পারিনে।

এই আরবি-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।

আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি। সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমনকি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ‘ওরিয়েন্টাল’। কিন্তু ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তারা হয়ে যায় ‘মিয়া সাহেব’! মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুশকিল; তবুও নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপের আর অন্ত নেই।

আমি ত টুপি-পায়জামা শেরওয়ানি-দাড়িকে বর্জন করে চলেছি শুধু ঐ ‘মিয়া সাহেব’ বিদ্রূপের ভয়েই—তবুও নিস্তার নেই।

এইবার থেকে আদালতকে না হয় বিচারালয় বলব, কিন্তু নাজির পেশকার-উকিল-মোক্তারকে কী বলব?

কবি-গুরুর চিরন্তনের দোহাই নিতান্ত অচল। তিনি ইটালিকে উদ্দেশ করে এক কবিতা লিখেছেন। তাতে—“উতারো ঘোমটা” তাঁকেও ব্যবহার করতে দেখেছি। ‘ঘোমটা খোলা’ শোনাই আমাদের চিরন্তন অভ্যাস। “উতারো ঘোমটা’ আমি লিখলে হয়ত সাহিত্যিকদের কাছে অপরাধীই হতাম। কিন্তু “উতারো” কথাটা যে জাতেরই হোক, ওতে এক অপূর্ব সঙ্গীত ও শ্রীর উদ্বোধন হয়েছে ও জায়গাটায়, তা’ ত কেউ অস্বীকার করবে না। ঐ একটু ভালো শোনাবার লোভেই ঐ একটি ভিন্-দেশী কথার প্রয়োগ অপূর্ব রূপ ও গতি দেওয়ার আনন্দেই আমিও আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করি। কবিগুরুও কতদিন আলাপ-আলোচনায় এর সার্থকতার প্রশংসা করেছেন।

আজ আমাদেরও মনে হচ্ছে, আজকের রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই চির চেনা রবীন্দ্রনাথ নন। তাঁর পিছনের বৈয়াকরণ পণ্ডিত এসব বলাচ্ছে তাঁকে।

‘খুন’ আমি ব্যবহার করি আমার কবিতায় মুসলমানি বা বলশেভিকি রং দেওয়ার জন্য নয়। হয়ত কবি ও দু’টোর একটারও রং আজকাল পছন্দ করছেন না, তাই এত আক্ষেপ তাঁর ।

আমি শুধু “খুন” নয়– বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেছি আমার লেখায়। আমার দিক থেকে ওর একটা জবাবদিহি আছে। আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীর একটা মুসলমানি ঢং আছে। ও সাজে তাঁর শ্রীর হানি হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। স্বর্গীয় অজিত চক্রবর্তীও ও-ঢং-এর ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন।

বাঙলা কাব্য-লক্ষ্মীকে দুটো ইরানি ‘জেওর’ পরালে তার জাত যায় না, বরং তাঁকে আরও খুবসুরতই দেখায়।

আজকের কলা-লক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই ত মুসলমানি ঢং-এর। বাইরের এ-ফর্মের প্রয়োজন ও সৌকুমার্য সকল শিল্পীই স্বীকার করেন। পণ্ডিত মালবিয়া স্বীকার করতে না পারেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ স্বীকার করবেন।

তাছাড়া যে “খুনে”র জন্য কবি-গুরু রাগ করেছেন, তা দিনরাত ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের কথায় ‘কালার-বক্সে’ (Colour box) এবং তা “খুন করা”, “খুন হওয়া” ইত্যাদি খুনোখুনি ব্যাপারেই নয়। হৃদয়েরও খুন-খারাবি হতে দেখি আজো । এবং তা শুধু মুসলমান পাড়া লেনেই হয় না।

আমার একটা গান আছে—

“উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।”

এই গানটি সেদিন কবি-গুরুকে দুর্ভাগ্যক্রমে শুনিয়ে ফেলেছিলাম এবং এতেই হয়তো তাঁর ও-কথার উল্লেখ। তিনি রক্তের পক্ষপাতী। অর্থাৎ ও লাইনটাকে—“উদিবে সে রবি মোদেরই রক্তে রাঙিয়া পুনর্বার”ও করা চন্ত। চলত কিন্তু ওতে ওর অর্ধেক ফোর্স কমে যেত। আমি যেখানে “খুন” শব্দ ব্যবহার করেছি, সে ঐ রকম ন্যাশনাল সঙ্গীতে বা রুদ্ররসের কবিতায়। যেখানে “রক্তধারা” লিখবার, সেখানে জোর করে “খুনধারা” লিখি নাই। তাই বলে “রক্ত খারাবি”ও লিখি নাই, হয় “রক্তারক্তি” না হয় “খুন-খারাবি” লিখেছি।

কবিগুরু মনে করেন, রক্তের মানেটা আরো ব্যাপক। ওটা প্রেমের কবিতাতেও চলে। চলে, কিন্তু ওতে “রাগ” মেশাতে হয়। প্রিয়ার গালে যেমন
“খুন” ফোটে না তেমনি “রক্ত”ও ফোটে না-নেহাৎ দাঁত না ফুটালে। প্রিয়ার সাথে “খুন-খুনী” খেলি না, কিন্তু “খুন-সুড়ি” হয়ত করি।

কবি-গুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্য-লক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর চাপকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে, ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।

এতেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল যাঁরা মনে করেন, তাঁরা সাহিত্য সভায় ভিড় না করে হিন্দু সভারই মেম্বার হন গিয়ে।

যে কবিগুরু অভিধান ছাড়া নূতন নূতন শব্দ সৃষ্টি করে ভাবীকালের জন্য আরো তিনটে অভিধানের সঞ্চয় রেখে গেলেন, তাঁর এই নতুন শব্দ-ভীতি দেখে বিস্মিত হই। মনে হয়, তাঁর এই আক্রোশের পেছনে অনেক কেহ এবং অনেক কিছু আছে। আরো মনে হয়, আমার শত্রু-সাহিত্যিকগণের অনেক দিনের অনেক মিথ্যা অভিযোগ জমে জমে ও’র মনকে বিষিয়ে তুলেছে। নৈলে আরবি-ফার্সি শব্দের মোহ ত আমার আজকের নয় এবং কবিগুরুর সাথে আমার বা আমার কবিতার পরিচয়ও আজকের নয়। কই, এতদিন ত কোনো কথা উঠল না এ নিয়ে!

সবচেয়ে দুঃখ হয়, যখন দেখি কতকগুলো জোনাকিপোকা রবিলোকের বহু নিম্নে থেকেও কবিত্বের আস্ফালন করে। ভক্ত কি শুধু ঐ নোংরা লোকগুলোই, যারা রাতদিন তাঁর কানের কাছে অন্যের কুৎসা গেয়ে তাঁর শান্ত-সুন্দর মনকে নিরন্তর বিক্ষুব্ধ করে তুলছে ? আর আমরা তাঁর কাছে ঘন ঘন যাইনে বলেই হয়ে গেলাম তাঁর শত্রু?

কবি-গুরুর কাছে প্রার্থনা, ঐ ধৃতরাষ্ট্রের সেনাপতিত্ব তিনি করুন, দুঃখ নাই। কিন্তু ওদের প্ররোচনায় আমাদের প্রতি অহেতুক সন্দেহ পোষণ করে যেন তাঁর মহিমাকে খর্ব না করেন।

সবচেয়ে কাছে যারা থাকে, দেব-মন্দিরের সেই পাণ্ডারাই দেবতার সবচেয়ে বড় ভক্ত নয়।

আরো একটা কথা। যেটা সম্বন্ধে কবিগুরুর একটা খোলা কথা শুনতে চাই।

ওর আমাদের উদ্দেশ্য করে আজকালকার লেখাগুলোর সুর শুনে মনে হয়, আমাদের অভিশপ্ত জীবনের দারিদ্র্য নিয়েও যেন তিনি বিদ্রুপ করতে শুরু করেছেন।

আমাদের এই দুঃখকে কৃত্রিম বলে সন্দেহ করবার প্রচুর ঐশ্বর্য তাঁর আছে, জানি। এবং এও জানি, তিনি জগতের সবচেয়ে বড় দুঃখ ঐ দারিদ্র্য ব্যতীত হয়ত আর সব দুঃখের সাথেই অল্প-বিস্তর পরিচিত। তাই এতে ব্যথা পেলেও রাগ করিনি।

কি ভীষণ দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে অনশনে অর্ধাশনে দিন কাটিয়ে আমাদের নতুন লেখকদের বেঁচে থাকতে হয়—লক্ষ্মীর কৃপায় কবি-গুরুর তা জানা নেই। ভগবান করুন, তাঁকে যেন জানতে না হয়। কবি গুরু কোনদিন আমাদের মত সাহিত্যিকের কুটিরে পদার্পণ করেননি—হয়ত তাঁর মহিমা ক্ষণ্ণ হত না তাতে—নৈলে দেখতে পেতেন, আমাদের জীবন-যাত্রার দৈন্য কত ভীষণ ! এই দীন-মলিন বেশ নিয়ে আমরা আছি দেশের একটেরে আত্মগোপন করে। দেশে দেশে প্রোপাগাণ্ডা করা ত দূরের কথা, বাড়ি ছেড়ে পথে দাঁড়াতে লজ্জা করে। কিছুতেই ছেঁড়া জামার তালিগুলোকে লুকাতে পারিনে। ভদ্র শিক্ষিতদের মাঝে বসে সর্বদাই মন খুঁতখুঁত করে, যেন কত বড় অপরাধ করে ফেলেছি। বাইরের দৈন্য-অভাব যত ভিতর ভিতরে চাবকাতে থাকে, তত মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে।

কবি-গুরুর কাছেও শুধু ঐ দীনতার লজ্জাতেই যেতে পারিনে। ভয় হয়, এ-লক্ষ্মীছাড়া মূর্তি দেখে তাঁর দারোয়ানেরাই ঐ সুর-সভায় প্রবেশ করতে দেবে না।

দীনভক্ত তীর্থযাত্রা করতে পারল না বলে দেবতা যদি অভিশাপ দেন, তাহলে এই পোড়া-কপালকে দোষ দেওয়া ছাড়া কীই বা বলবার আছে !

তাঁর কাছে নিবেদন, তিনি যত ইচ্ছা বাণ নিক্ষেপ করুন, তা হয়ত সইবে, কিন্তু আমাদের একান্ত আপনার এই দারিদ্র্য-যন্ত্রণাকে উপহাস করে যেন আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে না দেন। শুধু ঐ নির্মমতাটাই সইবে না।

কবি-গুরুর চরণে, ভক্তের আর একটি সশ্রদ্ধা আবেদন—যদি আমাদের দোষত্রুটি হয়েই থাকে, গুরুর অধিকারে সস্নেহে তা দেখিয়ে দিন, আমরা শ্রদ্ধাবনত শিরে তাকে মেনে নিব। কিন্তু যারা শুধু কুৎসিত বিদ্রূপ আর গালিগালাজই করতে শিখেছে তাঁকে তাদেরি বাহন হতে দেখলে আমাদের মাথা লজ্জায়, বেদনায় আপনি হেঁট হয়ে যায় বিশ্বকবি-সম্রাটের আসন—রবিলোক—কাদা-ছোঁড়াছুঁড়ির বহু ঊর্ধ্বে।

কথাসাহিত্য-সম্রাট শরৎচন্দ্র “শনিবারের চিঠি”-ওয়ালাদের কাছে আমায় গালিই দিন আর যাই করুন (জানি না এ সংবাদ সত্য কি-না) দারিদ্র্যটুকুর অসম্মান তিনি করতে পারেননি। অসহায় মানুষের দুঃখ বেদনাকে তিনি এত বড় করে দেখেছেন বলেই আজ তাঁর আসন রবি লোকের কাছাকাছি গিয়ে উঠেছে।

একদিন কথা-শিল্পী সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে গল্প শুনেছিলাম যে, শরৎচন্দ্র তাঁর বই-এর সমস্ত আয় দিয়ে “পথের কুকুর”দের জন্য একটা মঠ তৈরি করে যাবেন। খেতে না পেয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায় যে-সব হন্যে কুকুর, তারা আহার ও বাসস্থান পাবে ঐ মঠে—ফ্রি অব চার্জ। শরৎচন্দ্র নাকি জানতে পেরেছেন, ঐ সমস্ত পথের কুকুর পূর্বজন্মে সাহিত্যিক ছিল, মরে কুকুর হয়েছে। শুনলাম ঐ মর্মে নাকি উইলও হয়ে গেছে !

গল্প শুনে আমি বারংবার শরৎচন্দ্রের উদ্দেশে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে বলেছিলাম, “শরৎ-দা সত্যিই একজন মহাপুরুষ । সত্যিই আমরা সাহিত্যিকরা কুকুরের জাত। কুকুরের মতই আমরা না খেয়ে এবং কামড়াকামড়ি করে মরি। তাঁর সত্যিকার অতীন্দ্রিয় দৃষ্টি আছে, তিনি সাহিত্যিকদের অবতার রূপ দেখতে পেয়েছেন।

আজ তাই একটিমাত্র প্রার্থনা, যদি পরজন্ম থাকেই, তবে আর যেন এদেশে কবি হয়ে না জন্মাই। যদি আসি, বরং শরৎচন্দ্রের মঠের কুকুর হয়েই আসি যেন নিশ্চিন্তে দুমুঠো খেয়ে বাঁচব।

…………

কাজী নজরুল ইসলামের লেখার জবাবে প্রমথ চৌধুরী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি-জামাই ছিলেন উনি। এই রিলেশনগুলা দেখবেন গোপন করা হয়, বলা হয় না। এই পরিচয়ের আলাদা কোন সিগনিফিকেন্স যদি না থাকে, বলতেও তো কোন দোষ নাই!) ‘বীরবল’ নামে এই লেখাটা লেখেন। “আত্মশক্তি” পত্রিকার সেকেন্ড ইয়ারের ৪২ নাম্বার সংখ্যায়, ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখে ছাপা হয়।

বীরবল
বঙ্গ-সাহিত্যে খুনের মামলা

গত শনিবারের চিঠি খুলে দেখি যে, আমার বর্তমান অবস্থা সম্বন্ধে একটা জিজ্ঞাসা আছে। শ্রীযুক্ত বলাহক নন্দী লিখেছেন :

“আমাদের লিখিত ভাষায় যে একটা বিপ্লব চলিতেছে তাহা ত প্রত্যক্ষ দেখিতেছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কথিত ভাষায়ও যে এর চেয়ে অনেক বড় একটা বিপ্লব হইয়া গিয়াছে তাহা এই প্রথম শুনিলাম। বীরবল যখন এই পরিবর্তনের খবর রাখেন না (তিনি কি রিপভ্যান উইঙ্কলের মত ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন?) তখন আর কাহার কাছে দাঁড়াই?”

এ প্রশ্নের প্রথম উত্তর—বাংলার গল্প-সাহিত্যের নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে আমার মৌখিক আলাপ নেই, সুতরাং তাদের কথিত ভাষাও যে কতদূর বীরবলী হয়ে পড়েছে তা আমাদের অবিদিত। দ্বিতীয় উত্তর—আমি বঙ্গ সরস্বতীর মন্দিরে সত্যসত্যই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। কারণ সে মন্দিরে ইতিমধ্যে যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, সপ্তরথী মিলে যে বঙ্গ-সাহিত্যের অভিমন্যুকে বধ করেছেন, ভীষ্ম যে এখন শরশয্যায় শয়ান, এসব কথা জেগে থাকলে আমি নিশ্চয় জানতে পেতুম। এসব ঘটনা যে ঘটেছে তার সন্ধান পেলুম আত্মশক্তিতে প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের “বড়র পিরীতি বালির বাঁধ” নামক ট্র্যাজেডিতে। অবশ্য বঙ্গসাহিত্যের ক্ষেত্রে অভিমন্যু যে কে এবং সপ্তরথীরা যে কারা, তা বুঝতে পারলুম না। কিন্তু অভিমন্যু যিনিই হোন, তিনি যে মরেছেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কারণ এই অপমৃত্যুর জন্য “উত্তরা” শুনেছি তার স্বরে রোদন করছেন। কিন্তু তার জন্য ভীষ্মের উপর চারিধার থেকে যে কেন শরবর্ষণ হচ্ছে তার হদিস পাচ্ছিনে।

অভিমন্যু-বধের পূর্বেই ত ভীষ্ম-বধ হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রে যিনি শিশুবধ করেছিলেন, তার নাম অশ্বত্থামা। সে মতিচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ যে বঙ্গ-সাহিত্যের ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছেন তা ত জানিনে—আর যদি না হয়েই থাকেন ত তার অঙ্গে শর নিক্ষেপ করা বৃথা, কেননা পাপ অমর ।

সে যাই হোক, আমি জেগে থাকলেও এ খুনাখুনির ব্যাপারে যোগ দিতুম না, কারণ আমি জানি, আমার হাতে আলপিনের চাইতে বেশি মারাত্মক অস্ত্র নেই। তবে এই সূত্রে কাজি সাহেব এমন একটি তর্ক তুলেছেন যে তর্কে যোগদান করবার লোভ আমি সম্বরণ করতে পারছিনে—কারণ সে তর্ক হচ্ছে ভাষার তর্ক, আর বৃথা ভাষার তর্ক করেই আমার জীবনটা বৃথায় গেল। কাজি সাহেব বলেছেন যে, “কবিগুরু বলেছেন আমি কথায় কথায় রক্তকে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি।”

কবিগুরু হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ যে কাজি সাহেবকে লক্ষ্য করে একথা বলেছেন,–এ সন্দেহ আমার মনে উদয় হয়নি, যদিচ যে সভায় তিনি ও-কথা বলেন সে-সভায় আমি উপস্থিত ছিলুম। যতদূর মনে পড়ে, কোনও উদীয়মান তরুণ কবির নবীন ভাষার উদাহরণ স্বরূপ তিনি “খুনের” কথা বলেন। কোনও উদিত কবির প্রতি তিনি কটাক্ষ করেন নি ।

(২)

সাহিত্য-জগতের তরুণ বলতে কাকে বোঝায়, তার সন্ধান আমি আজও পেলুম না। যদি আমি ও পদবাচ্য না হই তা হলে কাজি সাহেবও তা নন্। কারণ, সাহিত্যিক ঠিকুজি অনুসারে আমার বয়েস ষোল- আর কাজি সাহেবের দশ। সাহিত্যিকরা ত আর বিয়ের কনে নন যে, দশে ও ষোলোয় বেশি তফাৎ করে। গত পরশু একটি সারস্বত সমাজে আমাকে কেউ কেউ প্রবীণ সাহিত্যিক বলে আর পাঁচজনের সঙ্গে পরিচিত করে দিলেন, আমি যদি প্রবীণ হই তা হলে কাজি সাহেব কি করে নবীন হন? এ ক্ষেত্রে নবীনে প্রবীণে কি এত কম ব্যবধান? সত্য কথা এই যে, এক্ষেত্রে কোনই প্রভেদ নেই। যে নবীন-সাহিত্যিক প্রবীণ নন—তিনিও তদ্রূপ সাহিত্যিক, যে প্রবীণ সাহিত্যিক নবীন নন তিনি যদ্রূপ সাহিত্যিক। সাহিত্য হচ্ছে চির-নবীন ও চির-পুরাতন, সাহিত্যিকরাও তাই। সরস্বতীর নকরি গভর্নমেন্টের চাকরি নয় যে, আপিসে Senior-junior-এর কোনও অর্থের প্রভেদ আছে। কার কত বয়স সে খোঁজ সরস্বতী রাখেন না।

(৩)

বাংলা কবিতায় যে “খুন” চলছে না, এমন কথা আর যেই বলুন রবীন্দ্রনাথ বলতে পারেন না, কারণ, কাজি সাহেব এ পৃথিবীতে আসবার বহু পূর্বে নাবালক ওরফে বালক রবীন্দ্রনাথ ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ নামক যে কাব্য রচনা করেছিলেন, তার পাতা উল্টে গেলে “খুনের সাক্ষাৎ পাবেন। কিন্তু এ সব খুন এত বেমালুম খুন যে, হঠাৎ তা কারও চোখে পড়ে না।

তারপর কাজী সাহেব এই বলে দুঃখ করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার অন্তরে আরবি ফার্সি শব্দের প্রবেশের দ্বার রুদ্ধ করতে চান। কাজি সাহেবের এ বিলাপ প্রলাপ মাত্র। কেননা, যদি তাঁর ও-রকম কোনও কুমতলব থাকত তাহলে তিনি বহু পূর্বে আমার ভাষার উপর খড়গহস্ত হতেন। বীরবল ভাষা যে সাহিত্যে একঘরে, এমনকি সংবাদপত্রেও আর পাঁচজনের ভাষার সঙ্গে এক পংক্তিতে তা বসতে পারে না, তার প্রধান কারণ যে সে ভাষা শব্দ সম্বন্ধে untouchability মানে না।

বীরবলী ভাষা চলে শুধু বীরবলের সইয়ের উপর, অর্থাৎ স্বনামে, অনামে নয়। বীরবল সাহিত্য-সমাজ শুধু ‘আমি’ বলতে পারেন, ‘আমরা’ বলবার তার অধিকার নেই, গৌরবে বহু-বচন ব্যবহার করবার অধিকারে তিনি বঞ্চিত। যাক্ সে সব কথা । বাংলা সাহিত্য থেকে আরবি ও ফার্সি শব্দ বহিষ্কৃত করতে সেই জাতীয় সাহিত্যিকরাই উৎসুক যাঁরা বাংলা ভাষা জানেন না। আর রবীন্দ্রনাথ যে বাংলাভাষা জানেন না এমন কথা বোধ হয় কোনও অকরুণ তরুণ সাহিত্যিকও বলতে চান না। আরবি-ফার্সি শব্দ যদি ত্যাগ করতে হয়, তাহলে আমাদের সর্বাগ্রে “কলম” ছাড়তে হয়। কারণ ও-শব্দটি শুধু আরবি নয়, এমন অনির্বচনীয় আরবি যে ও শব্দ হা করে কণ্ঠমূল থেকে উদগিরণ করতে হয়। ও “ক” হিন্দু জবানে বেরয় না এক কাশি ছাড়া। এই সূত্রে কাজি সাহেব আমাদের বেশের উপর মুসলমান বেশের প্রভাবের কথা যা বলেছেন তা সবই সত্য, কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের বেশের অনুরূপ সরস্বতীর বেশে গোঁজামিল দিলে তার শ্রীবৃদ্ধি হয় না। আমরা হ্যাটকোটও পরি। কিন্তু তৎসত্ত্বেও আমার অভিন্নহৃদয় সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী যখন কবিতা লিখতে গিয়ে, মিলের খাতিরে লিখে বসলেন, “সরস্বতী দেখা দিবে পরিয়া বনেট”—তখন দেশ-সুদ্ধ লোকে উঠেছিল। সুতরাং ‘সরস্বতী যদি এখন চুড়িদার পায়জামা পরে গায়ে কাবা ও মাথায় শেরওয়ানি টুপি চড়িয়ে হাতে রুমাল ঘোরাতে ঘোরাতে রাজপথে দেখা দেন, তাহলে সকলে একবাক্যে বলে উঠবেন—“ওঁকে বোরখা পরাও, বোরখা পরাও।” এ হচ্ছে যুক্তির কথা নয়, রুচির কথা।

“কথায় কথায় রক্তকে খুন বলাটা” যে সাহিত্যিক অপরাধ, তার কারণ, কথায় কথায় খুনকে রক্ত বলাটাও সমান অপরাধ অদ্যাবধি ফৌজদারী আদালতে কোনও উকিলই “রক্তের মামলা” করেন নি, কারণ অদ্যাবধি কোনও বাঙ্গালী ‘রক্তের আসামী হয়নি। অশ্বত্থামার মত যার মাথায় খুন চড়ে যায়, তাঁকেও রক্তের দায়ে কোন বিচারালয়ই ফেলতে পারে না। এর কারণও স্পষ্ট। কথায় বলে, ‘যার নাম ভাজা চাল তার নাম মুড়ি!” কথা সত্য, কিন্তু তাই বলে বঙ্গ-সাহিত্যে মুড়ি ও চাল-ভাজার অদ্বৈতবাদ অচল। ন্যায়সঙ্গত খুন ও রক্তেরও অদ্বৈতবাদ অচল। মা কালীর খুনে অরুচি নেই, তাই বলে শ্রীমান দিলীপকুমার যদি ভক্তিভরে তাঁর সুমুখে গান ধরে যে—“কে দিয়েছে খুন জবা পায়”, তাহলে লট্ট লট্ট বশিনী তন্মুহূর্তে অট্ট অট্ট হাসিনী হয়ে উঠবেন।

অভিধানে খুন আর রক্ত এক হতে পারে, কিন্তু ব্যাকরণে তা নয়। রক্তও বিশেষ্য, খুনও তাই। কিন্তু রক্ত উপরন্তু বিশেষণ, খুন তা নয়। অপরপক্ষে খুন ক্রিয়া, রক্ত তা নয়। আর আমরা যাকে “পদ” বলি, তার দুকূল আছে, এ অভিধান-কূল আর এক ব্যাকরণ-কূল। শব্দের এই দুকূল রক্ষা করে ব্যবহার করাই সাহিত্যের ধর্ম।

সর্বশেষে খুনের একটি গুণের উল্লেখ করব—যেটি রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেন নি। কবিতা লিখতে মিলের প্রয়োজন—অন্তত বাংলা কবিতাতে তা তাই৷ এখন বাংলা ভাষায় খুনের যত মিল খুঁজে পাওয়া যায়, রক্তের তার শতাংশের একাংশও পাওয়া যায় না। ক চ ট ত প বর্গের ভিতর ভক্ত শুধু রক্তের সঙ্গে মেলে, তারপর শক্ত বাস্, ওইখানেই খতম্। অপরপক্ষে খুনের মিলের আর অন্ত নেই। পঞ্চবর্গের প্রায় অক্ষরে খুনের মিল পাওয়া যায়, পুঁথি বেড়ে যায়, এই ভয়ে তার আর ফর্দ দিলুম না। আপনারা এই সব অক্ষরের গায়ে “উন” চড়িয়ে দেখবেন মেলে কি না মেলে। এমন কি বর্ণমালার শেষ অক্ষরজাত হুনের সঙ্গে খুনের সম্বন্ধ অতি নিকট। অতএব কবিতায় যদি খুন বাদ দিতে হয় তাহলে reason-এর খাতিরে rhyme-কে তালাক দিতে হয়ে। আর কে না জানে rhyme-এর খাতিরে reason-এর সাত খুন মাপ।

[ আত্মশক্তি, ২০শে মাঘ ১৩৩৪, শুক্রবার]

The following two tabs change content below.
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য