Main menu

তর্ক: রবীন্দ্রনাথের বোঝা রিয়ালিজম

বাছবিচারে প্রচারিত সাহিত্যে রিয়ালিজম বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশগুপ্ত’র পোস্টটার লিংক ফেসবুকে শেয়ার কইরা একটা আলাপের শুরু করেন নাজমুল সুলতান; যেইখানে রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজম নিয়া চিন্তাটা কিভাবে আরো স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব সেই বিষয়ে উনার মতামত দেন। যার প্রেক্ষিতে আমি আমার ভূমিকার জায়গাটা ফারদার ক্ল্যারিফাই করার চেষ্টা করি। নাজমুল সুলতান যে রবীন্দ্র-রিয়ালিজমরে হাজির করেন তার অ্যানালাইসিস করেন রেজাউল করিম। পুরা আলাপটাই আগের পোস্টের একটা এক্সটেনশন হিসাবে এইখানে রাখা হইলো।

–    ইমরুল হাসান।

______________________________

 

নাজমুল সুলতান:

এই  তর্কখানি  পুনর্বার  পরিবেশনের  জন্য  দায়ী  ব্যক্তিদের  অশেষ  ধন্যবাদ।  কৃতজ্ঞতা  স্বীকার  করে, রিয়েলিজম-বিতর্কের  ভূমিকাদাতা  ও  ভাষ্যকারের ঠাকুরপাঠের সাথে একটু  দ্বিমত  পোষণ  করতে হচ্ছে। ইমরুল হাসানের পাঠানুসারে ঠাকুরের বাস্তবতাবাদ-সমালোচনার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে  (১) সমাজে  যা  বিদ্যমান  নাই তা  সাহিত্যে  আনা  অর্থহীন  (২) ঠাকুরমতে সমাজে যা ঘটমান তা যতোটুকু ন্যারেশনের সম্ভাবনা পয়দা করে, সাহিত্যর কাজ হচ্ছে তাকে পুনরোৎপাদন করা। সমান্তরালে, তিনি সম্ভবত এ-ও দাবি করলেন যে ঠাকুরে সাহিত্যের সত্য সমাজের সত্যকে প্রতিস্থাপন করে দেয়। প্রথম দুইটা দাবি ক্লাসিকাল রিয়েলিজমের দাবির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। যেমন, সাহিত্য  সমাজের  আসল  সত্যকে  উপস্থাপন  করব  খালি  এই  দাবি  সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদীদের  ছিল না-  সাথে  সাথে  তারা  এটাও  দাবি  করতেন  যে  সাহিত্য  গাঠনিকভাবে  সমাজের বাস্তবতাকে  অতিক্রম করতে  পারে  না।  তা  যদি  “বুর্জোয়াপক্ষের” ভাবতরঙ্গ হাজির করে, সেই ভাবও সমাজের “বর্ণনা-সম্ভাব্যতার” ভিতরে পড়ে, কেবল সমাজের যে “আসল সত্য”— শ্রমিকশ্রেণির ভাব— তাকে ধরতে পারে না। সে যাই হোক।

জগদীশ গুপ্তের বইটা আমি পড়ি নাই। তাই ঠাকুরের বয়ান ধরেই কথা বলা যাক। ঠাকুরের গুণের মধ্যে মহত্তর একটা হল তার চিন্তার সচেতন কাঠামোবদ্ধ সমগ্রতা। রিয়েলিজম নিয়ে তার অসন্তুষ্টি আমাদের একেবারে তার দর্শনের গোড়ার কথায় নিয়ে যায়– ঠাকুর ছিলেন যাকে ইংরাজিতে বলে ট্রান্সেডেন্টাল রোমান্টিসিস্ট, অর্থাৎ বিষয় ও বিষয়ীর তুমুল ঐক্য তার চিন্তায় (সত্য এক– সেই একের নানা আবির্ভাব), আর সেই ঐক্যজ্ঞান ট্রান্সেডেন্টাল তরিকায় ন্যায্যকৃত। এই কারণে আধুনিক রিয়েলিজমের জন্য সত্য যদি সমাজ-নির্ভর হয়, ঠাকুরের জন্য তা সমাজ-অতিক্রমী ভাবে সত্য।

এখন  কেউ বলতে পারেনঃ তবে কেন ঠাকুর দেশের মধ্য বিদেশ ঢুকানোর দায়ে গুপ্তমশায়কে অভিযুক্ত করলেন, কারণ দেশ আর বিদেশ আদতে দুই-ই তো সমানভাবে সত্য? এই কথার উত্তর দেওয়ার জন্য ঠাকুর কীভাবে অন্তরঙ্গ এবং বহিরঙ্গের (ইংরাজিত বললেঃ এসেন্স ও এপিয়ারেন্স) তফাতজ্ঞান করেন তা দেখতে হবে। ঠাকুর যে অন্তরঙ্গ কে সত্য বলে ধরেন, তাতে সন্দেহ নাই– যেমন এই লেখায়ই তিনি সাহিত্যের গুণ অন্তর্নিহিতে বলে শনাক্ত করেছেন। কিন্তু, অন্তর্নিহিত গুণটা বহিরঙ্গের খোলসের নিচে লুকিয়ে থাকে– এই বিশেষ দাবি ছিল না ঠাকুরের এসেনশিয়ালজিমে। ঘরের পাশের শিশিরবিন্দুতে আর দূর হিমালয়ে একই সত্য, সৌন্দর্য। ঠিক এই কারণেই ঠাকুর দাবি করেন যে বঙ্গদেশের “বাস্তবতাকে” তার আপন পরিচয়ের নিরিখে আসতে হবে, দেশ আর বিদেশ অসমভাবে মিশলে না পাওয়া যাবে হিমালয়ের সত্য, না পাওয়া যাবে শিশিরবিন্দুর সত্য (সংশ্লেষও যে সমান সত্য হইতে পারে সেই র‍্যাডিকাল দাবি ঠাকুর করেন নাই)।– বিদেশি জিনিশে ঠাকুরের সম্ভবত আপত্তি ছিল না, কিন্তু তার দাবি ছিল যে বিদেশিকে মেডিয়েটেড হয়ে আসতে হবে। বেশ্যানারীকে বিয়েটা অবাস্তব নয়, কিন্তু তাকে “বাস্তবসম্মত”ভাবে– বিদ্যমান সামাজিক বাধা, চাপ ইত্যাদির পা মাড়িয়ে– হাজির করতে হবে। যেখানে রিয়েলিস্টরা এই দাবিটা করেন সাহিত্য আর বাস্তবতার সাম্যভাবের দৌলতে, ঠাকুর দাবিটা করেন অন্য জায়গা থেকেঃ বহিরঙ্গকে যথার্থভাবে হাজির করা দরকার অন্তর্গত সত্যের সত্তাকে বহিরঙ্গের মাঝে আবিষ্কারের স্বার্থে। রবীন্দ্রনাথের মতে রিয়েলিজম বর্তমানকে কেবল তার আবির্ভাবের আদলে বুঝে (চিরন্তন সত্য ব্যতিরেকে) বলেই তা সমর্থনযোগ্য নয়। এইকারণে বর্ণনা-সম্ভাব্যতার সূত্রে ঠাকুরের রিয়েলিজম-সমালোচনা পাঠটা ঠিক যথার্থ মনে নয় না। ন্যারেটিভকে সমাজ-নির্ভর স্বতন্ত্র সত্তা আকারে ঠাকুর ভাবেন নাই– যেমনঃ বেশ্যাবিবাহকে সামজিক বাস্তবতায় দেখতে হবে সমাজের সত্তা উপস্থাপন করবার জন্য, কিন্তু লেখক সেই সামাজিক সত্তার সূত্রে আবদ্ধ নন, তিনি বরং সমাজ সত্তাকে বুঝেন সমাজের কোথায় “সত্য” হাজির তা আবিষ্কারের জন্য।

ঠাকুরের দার্শনিক জায়গা থেকে রিয়েলিজমের এই বিচার মর্মভেদী বটে। আমরা কেউ এর সাথে একমত হব না– মূলত ঠাকুরের দার্শনিক পূর্বানুমান আমাদের পক্ষে গ্রহণ করা অসম্ভব বলে। কিন্তু ঠাকুর সমালোচনার পূর্বশর্ত হওয়া উচিত তাকে তার আপন টার্মে নির্মাণ করতে পারা, এবং আমাদের পূর্বানুমান নিয়েও সচেতন হয়ে উঠা।

 

ইমরুল হাসান:

প্রথমত, এই তর্কটাতে আপনার এনগেইজমেন্ট অবশ্যই এনকারেজিং আমার জন্য। এই তর্কটারে বেইজ কইরা বাংলা-সাহিত্যে রিয়ালিজম নিয়া আরো কথা বলা যাইতে পারে। আপনার পয়েন্টগুলার প্রেক্ষিতে আমি বরং আমার বলার জায়গাটারে আরেকটু স্পষ্ট করার চেষ্টা করি।

“বিদেশি জিনিশে ঠাকুরের সম্ভবত আপত্তি ছিল না, কিন্তু তার দাবি ছিল যে বিদেশিকে মেডিয়েটেড হয়ে আসতে হবে। বেশ্যানারীকে বিয়েটা অবাস্তব নয়, কিন্তু তাকে “বাস্তবসম্মত”ভাবে– বিদ্যমান সামাজিক বাধা, চাপ ইত্যাদির পা মাড়িয়ে– হাজির করতে হবে। … বহিরঙ্গকে যথার্থভাবে হাজির করা দরকার অন্তর্গত সত্যের সত্তাকে বহিরঙ্গের মাঝে আবিষ্কারের স্বার্থে। বর্তমানকে কেবল তার আবির্ভাবের আদলে বুঝে (চিরন্তন সত্য ব্যতিরেকে) বলেই ঠাকুর তার অনুমিত রিয়েলিজম সমর্থন করেন নাই। এইকারণে বর্ণনা-সম্ভাব্যতার সূত্রে ঠাকুরের রিয়েলিজম-সমালোচনা পাঠটা ঠিক যথার্থ মনে নয় না।” – নাজমুল সুলতান।

 

‘বিদেশ’ জিনিসটারে খালি দূরবর্তী/অ-পরিচিত/নট-মাই-অউন এইসব অর্থে নিলে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক প্রতিভারে খাটো করা হবে; এইখানে জগদীশ গুপ্তের গরিবি’র প্রতি খোটাটারেও আমি দেখতে পাই; জগদীশ গুপ্তের উত্তরও এই জায়গাটা নিয়াই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হইলো ‘বেশ্যা’ অনুমানটা। ‘বেশ্যা’ মানেই গরিব/নির্যাতিত/খারাপ এই অর্থগুলার ভিতর তার ‘চিরন্তনতা’রে স্থির কইরা রাখা আছে রবীন্দ্রনাথের অনুমানে; কিন্তু বেশ্যা-পেশার ঐতিহাসিকতা এইরকমের লিনিয়ার না বইলাই আমার অনুমান। বাঈজী-পেশার ধ্বংসাবশেষ হিসাবে উপন্যাসে ‘উত্তম’ নামে (নামটা খেয়াল কইরেন, তাইলে জগদীশ গুপ্তের ইনটেনশনটা অনেকটাই স্পষ্ট হওয়ার কথা) বেশ্যা চরিত্র আসছে বইলা অনুমান করা সম্ভব; যার নিজের বাড়ি আছে, টাকা-পয়সা যা আছে সেইটা তার গৃহস্থ জামাইয়ের চাইতেও বেশি। চরিত্র হিসাবে এই বেশ্যা অনেকবেশি স্বাধীন এবং সুপিরিয়র যা রবীন্দ্র-সাহিত্যের সামাজিক সাবমিসিভ নারী-চরিত্রের চাইতে মারাত্মক রকমের অপজিট। রবীন্দ্রনাথ যে এই ‘বেশ্যা’ চরিত্র’রে বাস্তব বলতে নারাজ (সাহিত্যিক টার্মেই), এর কারণ হিসাবে উনারে ঐতিহাসিক হিসাবেও রোমান্টিক ভাবতে পারলে দোষ একটু কম দেয়া সম্ভব! সুতরাং এইটা রিপ্রেজেন্টশনের সমস্যা না; যে কল্পনারে সমাজ-বাস্তবতার ভিতর নিয়া আসা, বরং এইটা ভুল একটা সমাজ-বাস্তবতার কল্পনা। এইভাবেই রবীন্দ্রনাথের সমালোচনারে মোর অ্যাকুরেটভাবে রিফ্লেক্ট করা যায়, কারণ উনার টেক্সটটারে আমি শুধুমাত্র টেক্সটের অর্থ দিয়াই পড়বো না, উনার কনটেক্সটারেও ইনক্লুড কইরা পড়বো।

“…সম্ভবত এ-ও দাবি করলেন যে ঠাকুরের সাহিত্যের সত্য সমাজের সত্যকে প্রতিস্থাপন করে দেয়।” – নাজমুল সুলতান।

এইখানে একটু ভুল রিডিং হইছে; তবে লেখকের (মানে, আমার) দিক থিকা ভাষার সচেতন কাঠামোটারে ইগনোর করার একটা অভ্যাস হয়তো কাজ কইরা থাকবে। যা-ই হোক, আমার কথা হইলো, সমাজ যতোটা না সাহিত্যে বাস্তবতা ইনসার্ট করে, সাহিত্য তার চাইতে অনেকবেশি বাস্তবতার ধারণা সমাজে ইম্পোজ করে। এইটা রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিটি ধারণার প্রায় বিপরীত একটা স্টেটম্যান্ট।

“ঠাকুরের গুণের মধ্যে মহত্তর একটা হল তার চিন্তার সচেতন কাঠামোবদ্ধ সমগ্রতা। …আধুনিক রিয়েলিজমের জন্য সত্য যদি সমাজ-নির্ভর হয়, ঠাকুরের জন্য তা সমাজ-অতিক্রমী ভাবে সত্য।” – নাজমুল সুলতান।

এই জায়গাটারে আপনি হয়তো আরো ইলাবরেট করতে পারেন, রবীন্দ্রনাথের ‘সমগ্রতা’র ধারণাটা। এমনিতে, সমাজ-নির্ভরতা বা সমাজ-অতিক্রমী দুইটা জিনিস একই ধরণের সমাজ-ধারণাটাই এক্সটেনশন হওয়া কথা।

 

নাজমুল সুলতান:

আপনি এই ভাষ্যের অবতারণা করে জরুরি আলাপের সূত্রপাতই করেছেন। কারণ বঙ্গের বিশেষ রিয়েলজিম বুঝাপড়া ব্যতিরেকে বিশ শতকের বাংলা কথাসাহিত্যের মুখ্য কিছু প্রবণতা অধরাই থেকে যাবে।

আমরা যখনই রিয়েলজিম বলি তখন “রিয়েল” কী চীজ সেই ধারণাটাকে পূর্বানুমান করে নেই। ধরেন, বিশ শতকে রিয়েলিজমের ধ্বজাধারীদের অন্যতম ছিলেন হাঙ্গেরিয়ান মার্ক্সবাদী দার্শনিক গেওর্গ লুকাচ— লুকাচের রিয়েলিজম-সমর্থনের মর্ম লুকায়ে আছে তার “রিয়েল” ধারণাটাকে বুঝাপড়ায়। ইতিহাসবাদী মার্ক্সবাদের আলোকে লুকাচ সমাজকে “আসল বাস্তবতাকে” প্রগতিশীল ধরে নিয়েছিলেন। সেই হিশাবে রিয়েলিস্ট সাহিত্য — হোক তা অ-কম্যুনিস্ট তলস্তয় বা বালজাকের– সমাজের বিদ্যমানতাকে পুনর্নিমাণ করবার মধ্য দিয়ে জগতের বিপ্লবী সত্তাকে সাহিত্যে সঞ্চালিত করে। আমি লুকাচের কথাটা পাড়লাম রিয়েলিজমের সাথে “রিয়েল”-র সম্পর্কটাকে ধরবার জন্য। অর্থাৎ যা আছে তাই রিয়েল নয়, বরঞ্চ কোন বিশেষ উপাদানকে “আসল বাস্তব” বলে ধরে নেওয়ার মধ্য দিয়ে রিয়েলিজম তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ এই কথাটা বুঝতে পারছিলেন। উপরোক্ত লেখা থেকে বিষয়টি যেহেতু ঠিক ঠিক ধরা নাও যেতে পারে, তাই সাহিত্যের স্বরূপ নামক কিতাবে থেকে তার উদ্ধৃতিটি তুলে দিলামঃ “বাস্তবই হচ্ছে মানুষের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত-সারে নিজের বাছাই-করা জিনিস।” এই বোধের মাহাত্ম্যের দরুনই রবিবাবু রিয়েলিজমের আত্মবয়ানের সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রিয়েলিজমের ক্লাসিকাল সংজ্ঞায়নে তা যা বিদ্যমান ও তার সাহিত্যিক উপস্থাপনের তফাতটা কবুল করতে চায় নাই। কিন্তু রিয়েলিজম যে সবার আগে একটা ধারণা (কনসেপ্ট) এবং সেই ধারণা সাহিত্যের বিষয়কে আপন বিশেষত্ব দিয়ে বাছাই করছে সেই জিনিশটা ঢাকা পড়ে।

এখন আসি পরের কথায়। ঠাকুরের বাস্তবতাবাদ বুঝাপড়ার দুইটা গতিমুখ দ্রষ্টব্য। *প্রথমত এবং কম গুরুত্বপূর্ণভাবে, যা একটা বিশেষ জ্ঞানরাজ্যে স্ব-প্রতীয়মান নয়, তাকে “বাস্তব” করে তোলার দাবি। ধরা যাক, বেশ্যাবিবাহ সামাজিক পর্যায়ে সহজে গৃহীত নয়– এখন তাকে ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণ বিবাহের মতো ন্যাচারালাইজ করে দেখানো নিয়ে ঠাকুরের আপত্তি। নীতির প্রশ্ন এটা মূলত নয়– প্রশ্নটা মেডিয়েশনের। রবীন্দ্রনাথ আরেক জায়গায় বলছেন সুরার আসরের মাঝেও সত্য-সৌন্দর্য ও বাস্তবতা থাকতে পারে। কিন্তু রিয়েলিজমের দোহাই দিয়ে সুরার আসরের উপস্থাপন করলেই তা “বাস্তব” হয়ে যায় না। এই কথাটা বুঝবার জন্য আমাদের খেয়ালে রাখতে হবে বঙ্গে রিয়েলিজমের ঐতিহাসিকতা– রিয়েলিজমের আগমন পূর্ববর্তী বাংলা কথাসাহিত্য মূলত ভদ্রলোকের পরিচিত দুনিয়াদারিকে সাহিত্যের বিষয় আকারে গ্রহণ করত। রিয়েলিজমের পয়লা ধাপে এই বিষয় বিভাজনের একটা বিপর্যাস ঘটল। যা ভদ্রলোকি নয়, তাকে বিষয় করাটাই রিয়েলিজমের রূপ দাঁড়াল। এই প্রেক্ষিতে ঠাকুর বলছেন বিষয়বস্তুর ইনভার্সন করলেই তা বাস্তব হয়ে যায় না। হ্যাঁ, আমরা এখন বলতে পারি ঠাকুরের শ্রেণিবস্থান থেকে মদের আসর তো অপরিচিত ঠেকবেই। তো কোন সাহিত্য যদি ভদ্রলোকের জন্য ঐ জগতটা “বাস্তব” করে তুলতে না চায়, তবে দায়টা ঐ সাহিত্যের থাকে না, কারণ তা অন্য কারো জন্য বাস্তব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সমান্তরালে আরেকটা অনুসিদ্ধান্তও পেশ করেন– সাহিত্য বিদেশকে দেশ করে তোলে, অর্থাৎ অজানাকে জানা করে তোলা সাহিত্যের কাজ। এটা বার্টল্ট ব্রেখটের পরিচিত-কে অপরিচিত করে তোলবার ঠিক উল্টা দাবি। এই দাবির সারসত্তা মাপবার কাজটা আপাতত মুলতবি  রাখছি।

দ্বিতীয়ত– এবং মুখ্যত– রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের বিষয়বস্তুর একটা অর্ডার বা ক্রমও ধরে নেন। সাহিত্যের বিষয় কী হতে পারে এবং কী হতে পারে না, তার একটা (পরিবর্তনশীল) অর্ডার মহাভারত-হোমারের যুগ থেকেই চলে আসছে। ঠাকুর একজায়গায় বলছেন ফুটন্ত ফুল নাকি পচনশীল ফুল কোনটা সাহিত্যের বিষয় হবে তা নিয়ে বুঝ থাকা দরকার। কিংবা ধোপার ময়লাকাপড়ের ফর্দ নিয়ে কবিতা লেখা নিয়েও ঠাকুর ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি। এই কথাগুলো সাহিত্যের বিষয়বস্তুর অর্ডার নিয়ে ঠাকুরধারণার একটা মোক্ষম প্রকাশ বটে। এই অর্ডার থেকে মুক্ত হওয়াই ছিল আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের বাসনার একটা। ইয়ুরোপের ফ্লবেয়ারকে ঠিক এই কারণেই কেউ কেউ সাহিত্যে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রণেতা বলেন, কারণ সাহিত্যবিষয়ের অর্ডারে চিড় ধরানোতে তার কৃতিত্ব। একই কারণে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যখন বলেছিলেন সুকান্ত নয়, বাংলা কাব্যের প্রধান বিপ্লবী কবি জীবনানন্দ দাশ, তিনি ঠিক ছিলেন। ঠাকুরের কথায় ফিরত যাই তাহলে আবার– ঠাকুরমতে সাহিত্যের বিষয়বস্তুর অর্ডার কিন্তু আবার সোজাসাপ্টা ভদ্রলোক-বেশ্যা এই শ্রেণিবিভাজনের নয়। বরঞ্চ, আমি বলবো, ঠাকুরের অর্ডার সত্যসৌন্দর্য/অসত্য-অসুন্দর এই অর্ডারকেন্দ্রিক। তাই বেশ্যার মধ্যে সৌন্দর্য আবিষ্কারের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করতে পারেন না। ভদ্রলোক মাত্রই যেমন সত্যসুন্দর নন, বেশ্যা মাত্রই তাই অসত্য-অসুন্দর নন। রিয়েলিজমের সাথে ঠাকুরের বিরোধের মূলসূত্র নিহিত এই জায়গায়ঃ রিয়েলিজম কেবল বিষয়বস্তুর বহিরঙ্গের রেফারেন্স-অর্ডারটাকে উল্টিয়ে দিয়ে “বাস্তব” নির্মাণ করতে পেরেছে বলে ধরে নেয়। এইকারণে আমি বলব যে রবীন্দ্রদর্শনে বেশ্যা ও ভদ্রলোক কেউই চিরস্থায়ীভাবে সত্য/অসত্য না– ভদ্রলোকের জীবন থেকে যেমন সত্যসুন্দর আবিষ্কার করতে হয়, বেশ্যার জীবন থেকেও তা করা যায় বৈকি। কিন্তু সত্য-অসত্যের যে অর্ডার সেখানে বেশ্যার বৃত্তি ঠাকুরের কাছে অসত্য ও অসুন্দর, যেমন অসত্য ভদ্রলোকের চাকুরিজীবন। আপনার সাথে একটু দ্বিমত পোষণ করে তাই বলবো– “চিরন্তনতা” বেশ্যা-ভদ্রলোকের সামাজিকতায় নয়, বরঞ্চ ঠাকুরানুমিত সত্য-অসত্যের অর্ডারে।

এই জায়গা থেকে দেখলে বলতে হবে যে সেই সাহিত্যই ঠাকুরের পুলিশিকে (বিষয়বস্তুর অর্ডার রক্ষাকর্তা হিশাবে) অতিক্রম করে যে বহিরঙ্গের বিষয়ের অর্ডারকে শুধু উল্টানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেবল বিনয়-সুচরিতার বদলে বেশ্যার কাহিনি বলবার মধ্য দিয়ে ঠাকুরকে অতিক্রম করা সম্ভব হবে না (তার দরকার আছে যদিও)।– বরঞ্চ সত্য-অসত্যের যে অর্ডার ঠাকুর তৈরি করেন সেটাকে আক্রমণ করাই ঠাকুরের অর্ডার থেকে মুক্ত হবার মুখ্য পন্থা।

[অবশিষ্টঃ রবীন্দ্রনাথের দর্শনের ভাগীদার আমি নই– চাইলেও হতে পারব না, তার জন্য ভালোবাসা নির্বিশেষে। কিন্তু চিন্তক হিশাবে রবীন্দ্রনাথের আত্ম-সচেতনতাটা আমলে নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-রাজনীতি-নীতিশাস্ত্র সবকিছুই একটা মৌলিক যুক্তি দ্বারা চালিত। গান্ধীর সাথে তার তর্ক একটা সহি নজির। ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির কলাকৌশল নিয়ে তাদের বাহাসের একপর্যায়ে ঠাকুর বলেছিলেন– বেদের পয়লা বাক্যঃ ওম। ইংরাজিতে বললে এফার্মেশন– সত্যের সর্বত্র বিরাজমানতার নিশ্চয়তাজ্ঞান। বিপরীতে গান্ধী বলেছিলেন উপনিষদের আদিশব্দঃ নেতি। এই এক শব্দ থেকে ঠাকুরের দর্শনের নাড়িতে হাত দেওয়া সম্ভব। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অন্যায্যতা ও অসত্যতা নিয়ে ঠাকুরের হয়তো শেষমেষ সন্দেহ ছিল না, কিন্তু ব্রিটিশদের খেদানোর জন্য যদি ভারতীয়রা এখন জাতিভেদে তাদের বিরোধিতা করে, তবে “নেতি”-র মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে না। এক অসত্য দিয়ে আরেক অসত্যের বিতাড়ন হবে। ন্যাশনকে ঠাকুর অসত্য মনে করতেন জাতিধারণার অন্তর্গত নেতি-কেন্দ্রিকতার জন্যই। সে যাই হোক– ঠাকুরের চিন্তায় বরাবর এই মৌলিক যুক্তিচালিত সমগ্রতা দেখা যায়। নিজের চিন্তাকে নিয়ে চিন্তা করা দার্শনিকের কাজ– সেটা তিনি কিছুটা করতে পারছিলেন। এই জায়গা থেকে তার চিন্তার সামগ্রিকতার কথা বলেছিলাম।

আধুনিক রিয়েলিজমে “রিয়েল”-র ধারণাটা সমাজের ঐতিহাসিকতা নির্ভর। লুকাচ যেমন সামন্তসমাজের আর বুর্জোয়া সমাজের “বাস্তবতা”কে তাদের সামাজিক ঐতিহাসিকতার রেফারেন্সে বুঝতেন। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে প্রকৃত “বাস্তবতা”– সত্যসুন্দর–সমাজের মধ্যে আবির্ভূত হলেও তাদের সত্তা সমাজ-অতিক্রমী। এই কারণে রবীন্দ্রনাথকে ট্রান্সেডেন্ট রোমান্টিসিস্ট বলা। আর শেষমেষ, আপনার কথাটার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। উত্তরটা দীর্ঘায়িত হল বলে দুঃখিত। এই আলাপের পূর্বানুমানগুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে সংক্ষেপে কথা সারা গেল না।]

 

ইমরুল হাসান:

সংক্ষিপ্ততা আলাপের লক্ষ্য না হইলেই ভালো আর আপনি যে সেইটা করেন নাই তার জন্য কৃতজ্ঞতা। কিন্তু ফর্ম হিসাবে ফেসবুকের কমেন্টে এইরকমের একটা চাপ থাকে।

আমি যদ্দূর বুঝতে পারছি, আপনার প্রসঙ্গটা সমালোচনার ফ্রেমওয়ার্কটা নিয়া।

“”চিরন্তনতা” বেশ্যা-ভদ্রলোকের সামাজিকতায় নয়, বরঞ্চ ঠাকুরানুমিত সত্য-অসত্যের অর্ডারে।… এই জায়গা থেকে দেখলে বলতে হবে যে সেই সাহিত্যই ঠাকুরের পুলিশিকে (বিষয়বস্তুর অর্ডার রক্ষাকর্তা হিশাবে) অতিক্রম করে যে বহিরঙ্গের বিষয়ের অর্ডারকে শুধু উল্টানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেবল বিনয়-সুচরিতার বদলে বেশ্যার কাহিনি বলবার মধ্য দিয়ে ঠাকুরকে অতিক্রম করা সম্ভব হবে না (তার দরকার আছে যদিও)।– বরঞ্চ সত্য-অসত্যের যে অর্ডার ঠাকুর তৈরি করেন সেটাকে আক্রমণ করাই ঠাকুরের অর্ডার থেকে মুক্ত হবার মুখ্য পন্থা।” – নাজমুল সুলতান।

আপনার এই প্রস্তাব রবীন্দ্রনাথরে সাথে নিয়াই রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজম’রে মোকাবিলা করার, যাতে ‘প্রকৃত’ রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কারের একটা ব্যাপার আছে, কিন্তু আমার বলার বিষয়টা ঠিক রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজম-ভাবনা না যারে আমি মোকাবিলা করতে চাইছি, বরং বলার চেষ্টা করছি লঘু-গুরু উপন্যাস বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বয়ানটারে, যার মূল ভাবনাটা সাহিত্যে রিয়ালিজম নিয়া। এখন সেইটারে রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজম-ভাবনা পর্যন্ত এক্সটেন্ট ত করাই যায়, তখন আপনার বিষয়গুলারে মোকাবিলা করাটা জরুরি। আমার বলার ক্ষেত্রে এতোটা জরুরি ছিল না; কারণ রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজমরে মোকাবিলা করতে গিয়া জগদীশগুপ্ত এই উপন্যাস লিখেন নাই, বরং রবীন্দ্রনাথ এইটা পড়তে গিয়া তার নিজের অর্ডারের বিচ্যুতি বা এক ধরণের অতি-রিয়ালিজম দেখতে পাইছেন।

আরেক দিক দিয়া, আপনার কনসার্ন উনার (রবীন্দ্র্রনাথের) এই রিয়ালিজমের আইডিয়া কিভাবে তৈরি হইছে। আর আমার কনসার্ন এই আইডিয়াটা কিভাবে অপারেট করতেছে। বিষয় দুইটা আলাদা না হইলেও উদ্দেশ্যের দিক দিয়া ভিন্ন ত অবশ্যই। কিন্তু তার মানে এই না যে, এরা পরস্পরের সাথে ইন্টার-অ্যাক্ট করতে পারে না, বরং বিরোধিতার মাধ্যমে এক ধরণের কাছাকাছি রকমের যোগাযোগই হয়তো সম্ভব হইতে পারে।

 

রেজাউল করিম:

১. ‘ট্রান্সেডেন্ট রোমান্টিসিজম’-এর মানে করা মুশকিলের, কারণ রোমান্টিসিজমের দাবিটা ইটসেল্ফ ট্রান্সেডেন্ট; কেন? কারণ, ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’-কে ঐতিহাসিক হিসাবে মানে না রোমান্টিসিজম। রোমান্টিসিস্ট হিসাবে সেই অনৈতিহাসিক ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ই গাইছেন রবীন্দ্রনাথ; ফলে ওনার রোমান্টিসিজমরে ‘ট্রান্সেডেন্ট’ হিসাবে বলার মধ্য দিয়া একটা অযথা ‘অনন্যতা’ দেওয়া হয় মাত্র; যেইটারে ওনার কৃতিত্ব হিসাবে বললেন সেইটা ওনার ধার করা জিনিসটার (রোমান্টিসিজম) মধ্যে আদ্যোপান্তই আছে!

২. নিজের চিন্তা নিয়া দার্শনিকের চিন্তা করার যেই নেক্সট জেনারেশন কৃতিত্ব নাজমুল সুলতান রবীন্দ্রনাথকে দিলেন সেটা ভুল; ওনার ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’কে চিরন্তন তথা অনৈতিহাসিক ধরবার মধ্য দিয়াই উনি নিজের চিন্তা নিয়া চিন্তা করার দরকারটা স্থগিত করে রাখছেন আমরণ।

৩. বাস্তবতারে স্রেফ মানবিক সত্তার (আমি’র) একটা কর্ম (যেমন, বাছাই) হিসাবে দেখাটা পান্নার সবুজের মধ্যে ওনার চেতনার রঙ দেখতে পাবার মধ্যেই আছে; এর ফলে উনি রিয়েলিটিরে আদৌ দ্যাখেন না, উনি নিজেরেই মাত্র দ্যাখেন। চিরন্তন মানবিক সত্তা নামের একটা রোমান্টিক আইডিয়া দিয়া মানুষরে বুঝবার কারণে বেশ্যার ভিতর থেকে সেই ‘সত্যসুন্দর’কে এক্সট্রাক্ট করেন—অশরীরী মানবতা পুনর্বার উদ্ভাবন করেন; বেশ্যার বৃত্তিটা ওনার কাছে ‘সুন্দর তথা সত্য’ নয় আদৌ। জগদীশের কাছে বেশ্যা তাঁর বৃত্তিসমেতই ‘সত্য’; রবীন্দ্রনাথ ঝামেলায় পড়েন তখন; কেননা, ওনাকে তখন বেশ্যার বৃত্তিটাকেও সুন্দর হিসাবে মানতে হয়! কারণ, ওনার কাছে তো ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ অভিন্ন।

৪. এসব ক্ষেত্রে উষ্মা প্রকাশ ছাড়া খুব উপায় ছিলো কি ওনার? যুক্তি দিয়া আগানো কঠিন; কারণ, তাইলে রিয়েলিটি নিয়া ওনার মহা ঝামেলায় পড়তে হবে; পান্নার সবুজের বদলে যেইখানে কদর্যতা দ্যাখেন সেইটারে ওনার নিজেরই চৈতন্যের কদর্যতা হিসাবে মানতে হবে; ওনার চেতনায় কদর্যতা না থাকলে কোথাও কদর্যতা দেখতে পাবার কারণ থাকে না তো তখন!

৫. ফলে জগদীশের রিয়েলিটি (বেশ্যার বৃত্তির কদর্যতা) দেখতে না চাইবারই কথা রবীন্দ্রনাথের, অস্বস্তির হবারই কথা। তখন নিরাপদ রাস্তায় যাওয়া ভালো; এই রিয়েলিটিকে রবীন্দ্রনাথ তখন ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’-এর বিচ্যূতি/বিকৃতি হিসাবে আবিষ্কার করেন; রিয়েলিটির মানুষগুলি সবাই পল্যুটেড ওনার কাছে! ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ থেকে রিয়েলিটির মানুষগুলির এই বিচ্যূতি/বিকৃতি ওনার কাব্যিক পেইনের উৎস। এই পেইনের কারণেই উনি হয়তো ব্রহ্মরে গীতাঞ্জলি দিয়া আত্মশুদ্ধির জন্য পূজা করতে থাকেন।

৬. এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যরে কিছু দায়িত্ব দেন; ওনার কাছে সাহিত্যের দায়িত্ব হচ্ছে ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’ থেকে বিচ্যূতি/বিকৃতির মাধ্যমে ‘রিয়েলিটি’ নামে যেই জিনিসটা পয়দা হইলো, সেইটা থেকে ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’কে এক্সট্রাক্ট করা, করে করে সমাজকে ‘সত্য’ ও ‘সুন্দর’-এর দিকে নিয়া চলা।

জগদীশ সম্ভবত রিয়েলিটিকে অন্য কিছুর বিচ্যূত/বিকৃত রূপ হিসাবে দ্যাখেন নাই; তিনি রিয়েলিটিকে পাইছেন, সেইখানে সত্য, সুন্দর, উত্তম—সবই পাইছেন, বৃত্তির সাথে সাথেই, এক্সট্রাক্ট না করেই! চৈতন্যের সাথে অনপেক্ষভাবে রিয়েলিটিকে কদ্দূর পাওয়া যায়—সেইটা ভিন্ন আলাপ; এই আলাপ রবীন্দ্রনাথে নাই; কেননা, রিয়েলিটিকে সাবজেক্টিভ বলায় থামেন নাই রবীন্দ্রনাথ, রিয়েলিটিরে উনি নিতান্ত চৈতন্যের ফল হিসাবে দেখছেন।

৭. কিন্তু আমি বা নাজমুল সুলতান—আমাদের আলাপে ইমরুলের কয়েকটা অবজার্ভেশনকে প্রায় পাত্তাই দিলাম না; যেমন? শিক্ষাসহ কিছু ‘উচ্চতর’ গুণ বেশ্যার থাকাটা অবিশ্বাস্য রবীন্দ্রনাথের বিবেচনায়, ফলে বেশ্যাকে ‘উত্তম’ বলে নাম দেওয়াটাও জগদীশের সাহিত্যিক অপরাধ একটা! ইমরুলের এইসব অবজার্ভেশন/দাবিকে মানা বা না মানার জন্য এই বিরাট আলাপটা একদমই অদরকারি আসলে!

 

নাজমুল সুলতান:

আপনার মন্তব্যগুলা মূলবিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহকে পুনরাত্থপন করেছে বলে ধন্যবাদ। সংখ্যা ধরে ধরেই আমার সাফাইটা গাই তবে। এইভাবে কথা-উন্মোচনের সমস্যা হচ্ছে তাতে করে সকল কথাকে পলেমিকের অংশ মনে হয়। যদিও সবকথাকে পলেমিকে পর্যবসিত করা হয়তো আমাদের লক্ষ্য থাকে না।

১. আমার বুঝাপড়ায় ট্রান্সেডেন্স ও রোমান্টিসিজম আবশ্যিকভাবে এক নয়। ট্রান্সেডেন্স ও রোমান্টিসিজমের এক হওয়াটাকে তাই আমি ট্রান্সেডেন্ট রোমান্টিসিজম বলে শনাক্ত করি। রোমান্টিসিজমের দার্শনিক স্বরূপ হচ্ছে বিষয় ও বিষয়ীকে একত্বের মধ্যে নিয়ে আসা। তাদের ব্যবধান ও বেসুরকে এক সুরে গাঁথার বাসনা। এখন ট্রান্সেডেন্ট রোমান্টিসজমের বিশেষত্ব হচ্ছে তা বিষয় ও বিষয়ীকে সুপারসেন্সিবলের (ইন্দ্রিয়-ঊর্ধ্ব) রেফারেন্সে এক করে দেখে। এই কথার ব্যাখ্যানের জন্য আমাদের রোমান্টিসিজমের দার্শনিক জন্মস্থান– সাহিত্যিক জন্মস্থান বলব না, কারণ রোমান্টিসিজমের চর্চা পূর্বে-পশ্চিমে নানাভাবে তাকে “রোমান্টিক” নাম দেওয়ার আগেই হয়েছে– অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানদেশের দিকে একটু যেতে হবে। কান্ট-পরবর্তী দার্শনিক পরিমণ্ডলে রোমান্টিসিজমের আবির্ভাব। কান্ট নিজেই একার্থে বিষয় ও বিষয়ীর ট্রাডিশনাল দ্বিত্ব ভেঙ্গে দিয়েছিলেন, যখন তিনি দাবি করলেন যে বিষয়ী যা জানে তা তার বিশুদ্ধ স্বজ্ঞা দ্বারা কন্ডিশন্ড। অর্থাৎ জ্ঞানতত্ত্বে—“জানা”-র ক্ষেত্রে—  বিষয় ও বিষয়ীকে দুই আলাদা সত্তা আকারে আর আগের মতো দেখা যাচ্ছিল না। রোমান্টিসিস্টরা কান্ট থেকে এককাঠি এগিয়ে যেতে চাইলেন– দর্শনের ভাষায়, তার এপিস্টেমোলজি তথা জ্ঞানতত্ত্ব থেকে অন্টোলজি তথা সত্তাতত্ত্বে যাইতে চাইলেন। রোমান্টিসিস্টদের অন্যতম পুরোধা হোল্ডারলিন বললেন যখনই আমরা বলি আমরা “conscious of” কোনকিছু, আমরা বিষয় ও বিষয়ীকে আলাদা করে দিই, তাদের মৌলিক ঐক্য ধরতে পারি না। এই জন্য তিনি প্রস্তাব করলেন যে জ্ঞানতত্ত্বের আগেই এক সত্তাগত ঐক্য ধরে নেওয়া দরকার। বিষয় ও বিষয়ীর ঐক্য রোমান্টিসিস্টদের কাছে ইতিহাস থেকে আসে না– আসে জ্ঞানোর্ধ্ব সত্তার জগত থেকে। রবীন্দ্রনাথেও ঠিক তাই। তার “সত্য ও বাস্তব” নামে ছোট একটা লেখা আছে, সেখানে তিনি দাবি করছেন যে “যা অবাস্তব”– অর্থাৎ যা আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বস্তুগত অংশ নয়– তা-ই সত্য। ঠিক এইকারণে ঠাকুরকে ট্রান্সেডেন্টাল রোমান্টিসিস্ট বলা। রোমান্টিসিস্ট–অর্থাৎ জগতের ঐক্য– অ-ট্রান্সেডেন্টাল পন্থায় হওয়াও সম্ভব।কাজী নজরুল ইসলাম একটা উদাহরণ। নজরুলের জগত বিরহ, বেদনা ও বিদ্রোহে প্লাবিত বলে তাকে হয়তো সহসা রোমান্টিসিস্ট মনে হয় না। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে নজরুল বিষয় ও বিষয়ীর সম্পর্ক এক মৌলিক সমতান দ্বারা গঠিত। বিদ্রোহী কবিতার সর্ববিনাশী কর্তা শেষাবধি “উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল” রোধ করাকে তার ভিত্তি আকারে ধরে নেয়, যে ভিত্তিতে জগত সমতানময়। নজরুলের এই সমতানময়তা– যা আদতে রোমান্টিসিজমই বটে– ট্রান্সেডেন্স থেকে আসছে না আবশ্যিকভাবে। এই ঐক্যসূত্র তার (রাজ)নৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিমূল থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। ট্রান্সেডেন্ট কায়দায় আহরিত ঐক্যজ্ঞান যেমন ভিত্তিপ্রস্তর, তেমনি নজরুলীয় ঐক্যজ্ঞানও ভিত্তিপ্রস্থর– কিন্তু তারা ঠিক এক কিসিমের নয়। তাই আমি বলব যে “ট্রান্সেডেন্টাল রোমান্টিসিজম” অত্যুক্তি বা রিডানডেন্সি নয়।

২. চিন্তা-নিয়ে-চিন্তা করাটাকে যদি আপনি কেবল চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তরকে হিস্টরিসাইজেশন করা আকারে বুঝেন, তবে আমার কথা ভুল বলে প্রতিভাত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই তার চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তরগুলোকে (সত্য, সুন্দর, ঐক্য ইত্যাদি) চিরন্তন আকারে দেখেছেন, এবং তাদের ইতিহাসের উপজাত আকারে দেখেন নাই। এই হিশাবে বিচার করলে বলতে হবে কেবল উত্তর-ভিত্তিপ্রস্তরবাদীরাই চিন্তা নিয়ে চিন্তা করতে পারেন, যেহেতু তারা তাদের ভিত্তিপ্রস্তরসমূহকে জুডিথ বাটলারের ভাষায় “কন্টিনজেন্ট ফাউন্ডেশন” বলে শনাক্ত করতে পারেন। এই যদি আপনার ক্রাইটেরিয়া হয়, তবে আমার কথা ভুল বলে আবির্ভূত হতে পারে বৈকি। আমার ক্রাইটেরিয়া আরো প্রশস্ত ছিল– আমি মনে করি ঠাকুর তার চিন্তার মৌলিক ভিত্তিপ্রস্তর গুলোকে শনাক্ত করতে পারছিলেন—সেই ভিত্তিগুলোকে হিস্টরিসাইজেশন করতে অপারগ হইলেও। এবং সেই ভিত্তিপ্রস্তরের রাজনৈতিক, পাঠশাস্ত্রীয়, সামাজিক, নীতিশাস্ত্রীয় ইত্যাকার বিন্যাস বুঝতে পারছিলেন। এটাও চিন্তা বটে। ঠিক এই কারণে ঠাকুরের বহুবিধ চিন্তাভাবনা এতো সংবদ্ধ এবং একই যুক্তিতে যুক্ত।

৩. রবীন্দ্রনাথের গন্তব্য নিয়ে আমাদের মতামত যাই থাকুক, আমি বলব যে তার বাস্তবতাবাদ বুঝাপড়া একটা মৌলিক জায়গায় সঠিক ছিল। তথাকথিত রিয়েলিটিতে আমাদের সরাসরি একসেস নাই। রিয়েল নামক কনসেপ্টের বদৌলতে আমরা রিয়েলিজম নির্মাণ করি। তা মোস্ট সফিস্টিকেটেড রিয়েলিজমের জন্যও সত্য। ঠাকুর নিজের “অবাস্তব” সত্যকে এর ঊর্ধ্বে মনে করাটা ভুল, তবে রিয়েলিজমের “বাছাইকরণ” নিয়ে তার ভাবনাটা সঠিক। আপনার মূল দাবি হচ্ছে– রবীন্দ্রনাথ রিয়েলিটিকে চৈতন্যের ফল হিশাবে দেখেন। কথাটা ঠিক, তবে আমি আরেকটু অন্যভাবে বলব। রিয়েলিটিকে চৈতন্যের আকারে হিশাবে যেসব ভাববাদ দেখে (বার্কলি যেমন), তারা বস্তুর সত্তাকে মানবমনের মধ্যে শনাক্ত করে। রবীন্দ্রনাথে বিষয়টা ঠিক সেরকম না। যে কবিতায় তিনি “আমার চেতনার রঙ্গে পান্না হল সবুজ” বলছেন, সেই একই কবিতায়ই তিনি অসীম সত্তাকে “বিশ্ব-আমি” বলে চিহ্নিত করেছেন। সেই বিশ্ব-আমি পান্নায় যেমন আছে, ব্যক্তি ঠাকুরেও তেমনি আছে। এই যুক্তিমতে বেশ্যায়ও তা থাকবার কথা। কিন্তু “আছে” বললেই প্রাপ্তি হয় না– সত্যজ্ঞানের উসিলায় কর্তাকে দৃশ্যমান “বাস্তব” থেকে “অবাস্তব সত্য”কে আলাদা করা জানতে হবে।

৪. এই জায়গায় আপনার চিন্তাপদ্ধতি আমার বিশেষ পছন্দ হইছে। কারণ আপনি ঠাকুরের রিয়েলিজম-সমালোচনাকে তার চিন্তাপদ্ধতিতে ইমানেন্টলি তথা অন্তর্নিহিতভাবে বসিয়ে তার সীমাবদ্ধতাকে বুঝার চেষ্টা করছেন। যা শুধু দৃশ্যমান বাস্তবে বন্দি, তা বেশ্যা-ভদ্রলোক দুইক্ষেত্রেই বাস্তবের কদর্যতার বাইরে বের হতে পারবে না। ঠাকুরে বাস্তবকে নেগেইট করেও সত্য পাওয়া যাবে না– বাস্তবতাকে চেতনার রঙ্গে দেখে সত্যসুন্দর আবিষ্কার করতে হবে। রবীন্দ্রনাথে আবার বাস্তব ও চৈতন্য দুই-ই সত্তাগতভাবে সত্যসৌন্দর্যকে ধারণ করে।

৫. ঠাকুরমতে জগদীশ গুপ্তের বাস্তবতাবাদের একটা ত্রুটি হচ্ছে তা বেশ্যাবিবাহকে তার অনুমিত সংকটে-কদর্যতায় দেখাতে পারে নাই। এই জায়গায় ঠাকুর জগদীশ গুপ্তকে বাস্তবতাবাদের নামে বাস্তব-বিচ্যুত হওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। ঠাকুর কদর্যতাকে বাস্তবিকতায় দেখতে চান কারণ তাতে করে তার “অন্তর্নিহিত” সত্য/অসত্য দৃশ্যমান হয়। কদর্যতাকে ঘাঁটলে গভীরতর সত্য পাবার আশা ঠাকুর ঠিক ছাড়েন নাই। রিয়েলিজমের সাথে ঠাকুরের দ্বন্দ্ব মূলত নিহিত রিয়েলিজম কী করে প্রচলিত সাহিত্যের বিষয়বস্তুর “অবাস্তব-কিন্তু-সত্য” অর্ডারকে মাথার উপর খাড়া করিয়ে দেয় তার মধ্যে। ভদ্রলোকের গৃহী গল্প ছেড়ে তা বেশ্যার, স্খলিতের কাহিনি বলার মধ্যে এক “বাস্তবতার” ধারণ নির্মাণ করে। জগদীশ গুপ্ত পড়া না থাকবার কারণে তার বাস্তবতা-ধারণা নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। ধরেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষদিকের উপন্যাসগুলাতে বিদ্যমান বাস্তবতাবাদের উদাহরণ। তাতে হয়তো সামাজিক ভাবে বিদ্যমান সুখ, দুঃখ, যৌনবাসনা, রিপু ইত্যাদি সবকিছুই আছে (ঠাকুর আপত্তি করেন না তাতে– গল্পগুচ্ছের বাস্তবতাসান্নিধ্য নিয়ে রবিবাবুর গর্বের অন্ত ছিল না)।– কিন্তু সেই ন্যারেটিভগুলো যখন নিজেদের অর্গানাইজ করে, তখন শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রেণিমনস্তত্ত্ব বয়ানের বিষয়বস্তু হয়ে উঠছে। এইজায়গায় রিয়েলিটি ক্যামেরার মতো আর হাজির নাই, বরঞ্চ মানিকের “বাছাইকরণ” পদ্ধতি ঠিক করে দিচ্ছে কোন উপাদানগুলো কীভাবে বাস্তবতার সাহিত্যিক নির্মাণ করবে।

 

ইমরুল হাসান:

আর আমার বলার জায়গাটাও এইখানেই। বাংলা-সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের রিয়ালিজমের ধারণা যে আর ব্যবহারযোগ্যতার মধ্যে নাই।

সেইটা বোঝার জন্য জগদীশগুপ্তের সাহিত্যের ইন্টারপ্রিটেশনটা জরুরি। এতে কইরা খালি রবীন্দ্র-সমালোচনাই হয় না, নতুন কিছু এভিনিউও আবিষ্কার করা যাইতে পারে যেইটার কেন্দ্রে থাকে, বাংলা-সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-ভাবনার প্রেক্ষিতেও এইটা করা যাইতে পারে, আপনি যেমনটা প্রপোজ করছেন; এতে আমার আপত্তি নাই, কিন্তু আগ্রহ কম; কারণ এতে কইরা রবীন্দ্রনাথই মূল বিষয় হয়া উঠেন। রবীন্দ্রনাথরে কেন্দ্রচ্যুত করা বা বাদ দেয়াটা আমার উদ্দেশ্য না, বরং বাংলা-সাহিত্যরে কেন্দ্র করার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথরে সেইখানে ইনক্লুড করা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররেই বাংলা-সাহিত্য ভাবার ইল্যুশনটা ঠেকানোও, এক দিক দিয়া।
এইভাবে আমার বলার জায়গাটা সামারাইজ করা যায়।

 

নাজমুল সুলতান:

আপনি আগে বলেছিলেন যে আপনি দেখতে চান রবীন্দ্রভাবাদর্শ ক্যামনে অপারেট করছে, আর আমি দেখছি রবীন্দ্রনাথের রিয়েলজম-ভাবনা বা “প্রকৃত রবীন্দ্রনাথ।” দেখেন–আপনার কথা সাদা চোখে ঠিক, তবে এটাও মাথায় রাখা দরকার এই দুই মুহূর্তই রবীন্দ্রডিসকোর্স বোঝার অপরিহার্য অংশ। অর্থাৎ কনটেক্সট এবং টেক্সট-র পৃথকভাব বুঝবার পাশাপাশি এটাও খেয়ালে আনতে হবে কনটেক্সট কীভাবে টেক্সটে পর্যবসিত হয় আর টেক্সট কীভাবে কনটেক্সট নির্মাণ করে। আমি রবীন্দ্রনাথের টেক্সচুয়ালিটিকে পুননির্মাণ করতেছি জগদীশ গুপ্তের সাথে তার এনকাউন্টারের প্রেক্ষিতে।

ইতিহাসকে টেক্সটে নামিয়ে আনা যায় না, ঠিক। তবে আমি এটাও দাবি করব যে সামাজিক-ঐতিহাসিক উপাদানসমূহকে টেক্সটের অন্তর্গত লজিকে আবিষ্কার করতে হবে– ইতিহাসের সরাসরি রেফারেন্সে টেক্সটকে বিচার করা আমার কাছে বিশেষ অর্থবহ মনে হয় না। যেমন ধরেন, রবীন্দ্রনাথের সাথে জগদীশ গুপ্তের শ্রেণিব্যবধানের কথা যদি আমরা বলতে চাই, আমি তাহলে কেবল রবীন্দ্রনাথের কনটেন্ট ধরে সোজাসাপ্টা সেটা বুঝতে তেমন আগ্রহী না। আমি বরঞ্চ তার চরিত্রটাকে রাবীন্দ্রিক ফর্মের অন্তর্গত লজিকেই শনাক্ত করতে চাই। এই জায়গায় আমি এডর্নোপন্থী।

বাংলা সাহিত্য বলে সাফ সাফ, ধরা যায় ছোঁয়া যায়, এরকম কোন জিনিশ নাই। রবীন্দ্রনাথ এবং আরো যারা তাদের দোষগুণে এই সাহিত্যে ঘটনা আকারে জ্ঞাত, তাদের পাঠ করবার মধ্য দিয়ে আমরা বাংলা সাহিত্যের বন্দরে পৌঁছাতে পারি। ইতিহাসের অবিচার সংশোধনের জন্য ইতিহাসে যাদের নাম নাই রিডিস্ট্রিবিউটিভ কায়দায় তাদের পুনর্কেন্দ্রিকরণ ঠিক ফলবহ নয়। ইতিহাসকে তার ঘটনার কন্ডিশনে পাঠ করতে হয়, এ আমাদের ইচ্ছার উপরের নিয়ম। রবীন্দ্রনাথ নামক ঘটনার রেফারেন্সকে অবজ্ঞা করে আমরা রবীন্দ্রপরিমণ্ডলের বাইরে থাকা উপাদান সমূহ বুঝতে পারব না। এর সাথে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্রীভূত অথবা কেন্দ্রচ্যুত করবার বিশেষ কোন সম্পর্ক নাই। রবীন্দ্রনাথকে বাংলা সাহিত্যের সাথে একীভূত কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না– কন্সট্যাটিভলি বলতে পারে, কিন্তু পার্ফরমেটিভলি দেখানোটা সম্ভব নয়। কথাসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের গেছে-যুগ সেই মানিক-তারাশঙ্কর থেকে। কবিতায় রবীন্দ্রযুগও অনেক আগেই শেষ। রাবীন্দ্রিকতা বলে যে প্র্যাকটিস এবং ডিসকোর্স ইন্সটিট্যুশনালাইজড অবস্থায় ক্রিয়াশীল, তার যুক্তি এবং অপারেশন রবীন্দ্রনাথে রিডিউসিবল নয়। রবীন্দ্রনাথের সাথে রাবীন্দ্রিক পাহারাদারদের সম্পর্ক জটিল অর্থাৎ ওয়ান-টু-ওয়ান নয়।

 

ইমরুল হাসান:

আলাপ চালাইতে আমার অনাগ্রহ নাই। কিন্তু ‘রিয়েল’ পলিমিকসের দিকেই যাইতেছে এখন এই আলাপ। আপনার লাস্ট কমেন্টে ব্যাপারটা রিপিটেটিভ হয়া উঠছে; আগের জায়গাতেই ফিরা আসতেছে। দুইটা জায়গার কথা বলি।

প্রথম প্যারাগ্রাফে আপনি বলছেন,

“…তবে এটাও মাথায় রাখা দরকার এই দুই মুহূর্তই রবীন্দ্রডিসকোর্স বোঝার অপরিহার্য অংশ।”

আর আমি বলছিলাম,

“বিষয় দুইটা আলাদা না… এরা পরস্পরের সাথে ইন্টার-অ্যাক্ট করতে পারে… বিরোধিতার মাধ্যমে এক ধরণের কাছাকাছি রকমের যোগাযোগই হয়তো সম্ভব হইতে পারে।”

 

যদিও রবীন্দ্র-ডিসকোর্স বোঝা’টা আমার আলাপের উদ্দেশ্য না, কিন্তু এইটা যে ‘অপরিহার্য’ তা একভাবে এমবেডেড আছে আমার বক্তব্যে।

একইভাবে দেখতে পারেন; আপনার বক্তব্য,

“এর সাথে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্রীভূত অথবা কেন্দ্রচ্যুত করবার বিশেষ কোন সম্পর্ক নাই। রবীন্দ্রনাথকে বাংলা সাহিত্যের সাথে একীভূত কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না …রাবীন্দ্রিকতা বলে যে প্র্যাকটিস এবং ডিসকোর্স ইন্সটিট্যুশনালাইজড অবস্থায় ক্রিয়াশীল, তার যুক্তি এবং অপারেশন রবীন্দ্রনাথে রিডিউসিবল নয়।”

আমার বলা,

“রবীন্দ্রনাথরে কেন্দ্রচ্যুত করা বা বাদ দেয়াটা আমার উদ্দেশ্য না … রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররেই বাংলা-সাহিত্য ভাবার ইল্যুশন ঠেকানোও…” (ইল্যুশন শব্দটা আছে এইখানে!)

আমি বলতেছি না, আমি যা বলতেছি আপনি সেইটাই বলতেছেন; বরং এই বলাগুলি ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থিকা আসতেছে; সুতরাং ভিন্ন হইতে বাধ্য, আলাপ যত আগাইবো। কারণ আমি বলছিলাম, “আপনার প্রসঙ্গটা সমালোচনার ফ্রেমওয়ার্কটা নিয়া”। আর আপনিও বলছেন যে, “…তার চরিত্রটাকে রাবীন্দ্রিক ফর্মের অন্তর্গত লজিকেই শনাক্ত করতে চাই।”; আপনার আপত্তির জায়গাটা হইলো যে, আমার এই সমালোচনা অ্যাকুরেট হইতে পারে না, কারণ লজিক বিল্ডিংটা আপনার এক্সপেক্টেড ফ্রেমওয়ার্কের ভিতর দিয়া ঘটে না বা যেইভাবে ঘটে তারে আপনি যথার্থ মনে করতে পারেন না। আপনার ফ্রেমওয়ার্কটা আপনি বেশ কয়েকবার ব্যাখ্যাও করছেন, নানানদিক দিয়া। কিন্তু মিসিং যে পার্টটা, সেইটা হইলো, জগদীশগুপ্ত এইখানে কোন ঘটনাই না!

আমার কথা এইটুকুই যে, জগদীশগুপ্তের রিয়ালিজমরে আমি আগে বুঝতে চাই (যেহেতু টেক্সট আমি পড়ছি কিছু) এবং তার প্রেক্ষিতেই রবীন্দ্রনাথের ভুল বোঝাটারে বলার চেষ্টা করি; এমন না যে, রবীন্দ্রনাথ আমি পড়ছি এবং তার আন্ডারস্ট্যান্ডিং দিয়া আমি জগদীশগুপ্তরে পড়তেছি। আর এই কথাটা যদি স্পষ্ট না করতে পারি তাইলে সম্ভবত আলাপটা বারবার আটকাইতেই থাকবো।

এইটা ছাড়াও আপনার কমেন্টে বলা ‘বাংলা সাহিত্য’, ‘রাবীন্দ্রিকতা’, ‘ইতিহাস’ ও ‘এডোর্নপন্থা’ বিষয়ে কোন আলাপে গেলাম না; এই কারণে না যে এইগুলা অ-গুরুত্বপূর্ণ, বরং এই প্রসঙ্গগুলা মুলতবি রাইখাও কথা বলা গেলো।

 

নাজমুল সুলতান:

পুনরাবৃত্তিকে পাশ কাটানো সহজ নয়। বিশেষ করে ফেইসবুকের ফর্মে– যেখানে আগের কথাটা লিপিবদ্ধ থাকে কিন্তু পরের কথাটা আবার আরেকটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়– মুখোমুখি সংলাপের বাধ্যতামূলকতার কারণে আমরা একটা সংকটে পড়িঃ একদিকে একরৈখিক প্রগতির দায়, আরেকদিকে কথার আপন অ-একরৈখিক গতি। আমার কথাগুলো যে আপনার কথাকে গ্রহণ করতেছে কোন কোন জায়গায় তা নিয়ে আমি অসচেতন ছিলাম না। কিন্তু চিন্তার সমাপতন গুলোকে আমাদের আপন জায়গা থেকে পুনরোচ্চারিত করবার দরকারটাও ফেলনা নয়। আপনার শেষ মন্তব্যে সে কথাটা আপনিও জানান দিয়েছেন। তাই এই পুনরাবৃত্তিকে পলেমিকসে গমন আকারে না দেখে (পলেমিকস কিছু থাকবেই– তাকে নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি করাটা আমাদের কাজ) তাকে একটা উৎপাদনশীল মুহূর্ত আকারেও দেখা যায় বৈকি। আমরা সেটার চেষ্টা করতে পারি অন্তত।

জগদীশ গুপ্ত যে এই আলাপে মিসিং তা আমিও বুঝতে পারছি। আমাদের আলাপে যে গুপ্ত হাজির আছেন তা ঠাকুরের নির্মিত গুপ্ত– এবং ঠাকুর নিজেও বলেছেন তার সবকথা গুপ্তের তরে প্রযোজ্য নয়, বরঞ্চ বাস্তবতাবাদি প্রবণতাকে মাথায় রেখেই কথাগুলো বলছেন। আমি যা কথা বলেছি তা সেই বাস্তবতাবাদের নিরিখে– জগদীশ গুপ্ত না পড়া থাকলেও বাংলা সাহিত্যের বাস্তবতাবাদ ঘরানার সাথে আমার পরিচয় যেহেতু আছে। এখন আমি যেহেতু সহসা গুপ্ত পড়তে পারবো না (মার্কিন মুল্লুকে থাকবার কারণে তাঁর কিতাব জোগাড় করাটা কঠিন হবে)– তাই আমরা বাঙলার বাস্তবতাবাদকে মাথায় রেখে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। অথবা আপাতত তা সাসপেন্ড করতে পারি। সেটা আপনার ইচ্ছা। আর আপনাদের সাথে আলাপ করে ভালো লাগলো। সামনে আর কথা চালাচালি হবে আশা করি।

 

ডিসেম্বর ২৮ – ৩১, ২০১৩

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.