Main menu

এডিটোরিয়াল: সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা

পথের পাঁচালী – রক মনু

সারভাইভালের আইডিয়া দুঃখের কেমন সুরত বানাইতে পারে সেইটা বুঝতে আপনেরা সত্যজিতের পথের পাঁচালী খেয়াল করতে পারেন। এইখানে বুঝতে সুবিধা পাইবেন আরো; কারণ, বিভূতি আর সত্যজিতের পথের পাঁচালীর তুলনা করতে পারতেছেন! বিভূতির থিকা সত্যজিৎ যুদা হইয়া যাইতেছেন ঐ সারভাইভালের আইডিয়া দিয়া; কেননা, বিভূতিতে ঐটা আসল সুর না, সত্যজিতে যেমন।

সত্যজিতের সিনেমার নাম বরং হওয়া উচিত আর কিছু, বিভূতির পথের বদলে সত্যজিৎ দেখাইতেছেন–এক জায়গা থিকা আরেক জায়গায় যাওয়া, যাওয়াটাই দেখাইতেছেন, সারভাইভালের দরকারে। বিভূতির ফিকশনে জিন্দেগি বা লাইফ একটা সফর, সেই সফরের রাস্তার গপ্পো মারতেছেন উনি, সত্যজিতের জিন্দেগি বা লাইফ মানে টিকে থাকা, সফর সেইখানে টিকে থাকার বা সারভাইভালের দরকারে করতে হয় কখনো, আরাম হইলে সেইখানে শিকড় গজাও। বিভূতিতে পথ/রাস্তার শুরু আরো আগে কোথাও, রাস্তা খতম হয় না কখনো, পথের কোন একটা স্পটে কতখন থাকা মানে বিশ্রাম/খান্তি, খুবই টেম্পোরাল–দুই দিনের ঠিকানা। সত্যজিতে রাস্তার শুরু অপু-দুর্গার বাপের বাড়ি, রাস্তায় নামতে হইতেছে কারণ–সারভাইভ করা যাইতেছেন না, রাস্তা খতম হইতেছে কলোনিয়াল মডার্ন শহরে।

সত্যজিতের সারভাইভাল ন্যারেটিভে সনাতন/পুরানা বামুন আর ভাত পাইতেছে না পুরানা সিস্টেমে, আগে যেইখানে ভাতের উপরি ইটও পাইছিল, সেই ইটেই দালান হইছিল। সেই দিন আর নাই। দালান ভাঙছে, ভাতই জোটে না, দালান মেরামত করবে কেমনে! সেই দালান এখন সাপেরা দখলে নিতেছে, সর্বজয়ারা হারতেছে এইবার! সর্বজয়ার অর্থ আদতে এইখানে সব সইতে পারা, সইয়া যাওয়াই যেন জয় করা :)।

সাপের তুলনায় আনফিট তারা, ফিটনেস পরমাণ করতেই যেন দুর্গা চুরি করে, কিন্তু ভোগ করতে পারে না, আসলে আনফিট, তাই মরে।

টিকতে পারে না তারা, সফরে নামতে বাধ্য হয়, নামে। কলোনিয়াল মডার্ন শহরে বরং ধর্মের রমরমা ব্যবসা, বাজারে এই মাল ভালো বিকায়, সেইখানে যাইতেছে বামুন। আর পোলারে পড়াইতে হবে কলোনিয়াল পড়া, সে যেন পারে পৈতা ছাড়াই ভাত জোটাইতে।

বিভূতির সফরের রাস্তার গপ্পো এইভাবে সত্যজিতে হইয়া ওঠে ইউরোপের কাছে ইন্ডিয়ার হারের দলিল, বিভূতির পথের পাঁচালী সত্যজিতের মুন্সিয়ানায় হইয়া ওঠে মডার্নাইজশন জাস্টিফাই করার প্রোপাগান্ডা লিফলেট। বিভূতির সফরের দুঃখ সত্যজিতে হইলো নিজেরে ইনফিরিয়র হিসাবে জানার ডিপ্রেশন। সত্যজিতের পথে গাড়িতে যাইতে থাকা দুঃখী মুখগুলা মডার্ন অডিয়েন্সকে তাই অতোটা ছুইয়া যায়।

/২০১৮

imbd’তে রাখা পথের পাঁচালী সিনেমার পোস্টার

 

হিরক রাজার দেশে – রক মনু

‘হিরক রাজার দেশে’, এই ছিনামা শত্যজিৎ বানাইতেছেন ১৯৮০ শালের ইনডিয়া নামের একটা মর্ডান রাশ্টে। মর্ডান রাশ্টের কিছু কি বুঝতেন শত্যজিৎ?

ছিনামার রাজা তার পোরজাদের শিক্ষা ঠেকাইতে চায়, নো ইশকুল। এমন রাজার একটা রাশ্টো মেটাফর হিশাবে মর্ডান রাশ্টের কিছু কি ধরতে পারে?

এই ছিনামায় শত্যজিৎ রাজার জেই মগজ ধোলাইখানা দেখাইতেছেন, ইশকুল জেইটার কাউন্টার, মর্ডান রাশ্টে ইশকুলই শেই জন্তর-মন্তর ঘর, ইশকুল দিয়াই মর্ডান রাশ্টো মগজ ধোলাই কইরা থাকে।

এগুলা বুঝতে অনেক অনেক থিয়োরি গিলতে হয় না আর্টিশের, দুনিয়ার দিকে একটু নজর দিলেই হয়; ১৯৮০ শালের ইনডিয়াতেও গনশিক্ষার বেপারে শরকারের নজর আছিল, বাচ্চাদের ইশকুলে নেবার জন্য ভর্তুকি দিতো রাশ্টো; এবং এইটা কেবল ১৯৪৭ শালের পরে শুরু হয় নাই, রাজা/রানির আমল থিকাই শুরু হইছে, শেই ইংরাজ আমলেই! 

এই ইশকুলের ফলও রাজা পাইছে নগদ নগদ; ইশকুলে পড়ুয়ারাই ১৮৫৭ শালের ছিপাই-হুল ঠেকাইয়া দিছে অনেকখানি, তারা কেউ হুলে জয়েন করে নাই, ইংরাজকে জারা খেদাইতে চাইছে, তাগো ডাকাইত-বদমাশ হিশাবে খোদাই করছে নিজেদের খবরের কাগজে!

এখনকার ইনডিয়াতেও দেখেন, বিজেপি-শিবশেনার শবচে রেডিকেল হিন্দুরা শবাই শিক্ষিত, ইশকুলে পয়দা/ধোলাই হওয়া মগজ! ইশকুলের কারিকুলাম দিয়াই দরকারি ধোলাইয়ের কামটা করে বিজেপি। বিজেপি তো খারাপ, কিন্তু মর্ডান রাশ্টের তরিকাই অমন, ইনডিয়ার চাইতে ভালো রাশ্টোগুলা ছেরেফ ভালোর দিকে মগজ ধোলাই করে, ইশকুলের ভিতর দিয়াই!

ছো, শত্যজিৎ-শৌমিত্রের হিরক রাজার দেশের ভিতর দিয়া তখনকার বা এখনকার কোন দেশ-শমাজই খুব ভুল বোঝা হয়, রিভল্ট ধইরা লইয়া আপনে ইশকুলে জাইয়া মগজ ধোলাই হইয়া বাইরাইয়া আশেন! আপনের বাচ্চারা এখন দেশে কেমন কারিকুলামে কোন পোপাগান্ডা মুখস্ত করতেছে, দেইখেন পিলিজ।

/নভেম্বর ১৬, ২০২০

 

হীরক রাজার দেশে সিনেমার পোস্টার

 

সত্যজিৎের “গণশত্রু”রা গণের বন্ধু কিনা – জোবাইরুল হাসান আরিফ

সত্যজিৎ রায়ের ‘গণশত্রু’ মেবি বাঙলা সিনেমার একমাত্র মড়ক লইয়া কাজ। মানে ডকু-ফিকশন বলা যাইতে পারে। তো, করোনা ও বাকশালের ভরে জনজিন্দেগি যখন বিপর্যস্ত তখন ওই সিনেমা নিয়া একটুখানি আলাপ হইতেই তো পারে, যেহেতু ফিল্মটাতেও এক কিসিমের অথরোটেরিয়ান শাসন দেখানো হইছে। দুইটা সিনেমার রিকমেন্ডেশন দিয়া শুরু করি, কন্টেজিয়ন আর চাইনিজ ফ্লু। প্রথমটা বেটার।

তো, সত্যজিৎ রায়ের সাথে আমার পরিচয় ঘঠে কাকতালীয় এক ব্যাপার দিয়া। মানে, সিনেমা দিয়া না। অর্থাৎ, পুরানা বইয়ের দোকান থেইকা ‘চালঘরে গান’ নামে এক বই কিনা হইছিল। ফার্স্ট এডিশন! রাইটার হলেন বুদ্ধদেব গুহ। চিঠির আশ্রয় লইয়া গড়ে তোলা উপন্যাসের মতো ছিলো বইটা। সেখানে সত্যজিৎ রায়ের এক বক্তৃতার ক্রিটিক হাজির করা হয়। লগে দিয়া চিঠির মাধ্যমে দেয়া রায়ের জবাবও ছাপিয়ে দেয়া। যেহেতু বইটা রায় মরার পর প্রকাশিত হইছিল, ফলে তেনার ফ্যামিলি কপিরাইটের ইস্যু তোলে বইটা আদালতে তোলে। দিনশেষে গুহ তেনার বই থেইকা সত্যজিৎের চিঠি ও নিজের কলাম বাদ দিয়া দিছিলেন। তো, লেখাগুলা ছিলো ক্রিয়েটিভ রাইটিং নিয়া। রায় তেনার বক্তৃতায় বলছিলেন, আধুনিক সাহিত্যের অনেককিছুই চলচ্চিত্রের উপযোগী নয়। কারণ তাতে আছে সমূহ ডিটেলিংয়ের অভাব। বুদ্ধদেব গুহ কলাম লেখছেন এই বইলা যে, আ নভেলিস্ট পেন ইজ নট দ্য লেন্স অব ক্যামেরা। মানে, স্টোরির থ্রি এক্ট স্ট্রাকচার ও লিটারারি ফিকশনের ক্যাচাল লইয়া সেই পুরানা আলাপ আরকি!

গণশত্রু সিনেমাটার ইংরাজি নাম এন এনিমি অব দ্য ইভিল। আমাদের কবীর চৌধুরী জানাইতেছেন তিনি তরজমা কইরা এটার নাম রাখতে চাইছিলেন, জনগণের জনৈক শত্রু। অবশ্য পরে “শত্রু” নাম দিয়াই অনুবাদটা বাজারে ছাড়েন তিনি। তো, সিনেমাটার যেই কাহিনী, তা নেয়া হইছে হেনরিক ইবসেনের ওই একি ইংরাজি নামের এক নাটক থেকে। ১৯৯০ সালের দিকে ফিল্মটা যখন হলে আসে তখন এটার বিরুদ্ধে এক সমালোচনা চাউর হইছিল, যে, এটা আদৌ সিনেমা ফরম্যাটের সাথে গেছে কিনা! নাকি নাটক বা মঞ্চনাটকের মালটরে মুভি নিয়া ফেলছেন উনি! তো, টুয়েলভ এংরি ম্যান ও আরো কয়েকটা সিনেমার রেফারেন্স দিয়া সত্যজিৎ রায় নিশ্চিত করেন যে, এটা যথেষ্ট সিনেমা হইছে। নিউইয়র্ক টাইমে শিরোনাম লিখেন, হোয়াই আই চ্যুজ দ্য প্লে ফর দ্য ফার্স্ট টাইম। এইখানে প্লে বইলা ইবসেনের নাটকরে বোঝানো হইতেছে। যেইটা রায়ের কলেজ পাঠ্য ছিল।

ইবসেনের নাটকের প্রোটাগনিস্ট ডাক্তার স্টকম্যান। তারে ফলো কইরা সত্যজিৎ যেই নায়ক বানান, ডাক্তার অশোকগুপ্ত, তিনিও আদর্শবাদী, দেশপ্রেমিক এবং সেই হেতু বিজ্ঞানমনষ্ক। দুইজনেরই ভাই এলাকার মেয়র, ফলে চতুর এবং উচ্চাভিলাষী। ডাক্তার স্টকম্যান চামড়ার কারখানায় শহরটার পানি দূষণের ব্যাপার আবিষ্কার করেন, আমাদের অশোকগুপ্ত সেইটা খোঁজে পান মন্দিরের চরণামৃতে। সো, জনগণকে সতর্ক করার স্বার্থে দুজনই ডেমোক্রেসির ফোর্থ রক্ষক নিউজপেপারে রিপোর্ট করবেন ঠিক করেন, কিন্তু তা তাদের ভাইয়ের পক্ষাবলম্বন করে ছাপাতে অস্বীকার করেন। ফলে জনসভা ডাকা ছাড়া উপায় থাকে না আর। ডাকা হয় জনসভা। কিন্তু যথেষ্ট পলিটিকাল আচরণ করতে না পারার দরুন তাও তাদের হাতছাড়া হয়। কিরকম? স্টকম্যানের ভাই জনসভায় বলে উঠেন, পানি দূষণের ব্যাপারটা সত্য কিন্তু অতিরঞ্জিত, তার চেয়েও বড়ো কথা, ডাক্তারের কথানুযায়ী কাজ করতে হলে পৌরকর বাড়াইতে হবে সিটিজেনদের।” নয়া ট্যাক্সের কথা শুনে পাবলিক ডাক্তারের পক্ষ ত্যাগ করে। ফলে ডাক্তার তাদের আরো কনভিন্সিং করবার পথে না গিয়ে গাইল দিয়া দেন, পচা-অনৈতিক আরো বহুত কিসিমের। এতে জনতার হৈ চৈ আরো বাড়ে। এবার ডাক্তারবাবু তাদের নেড়িকুত্তার সাথে তুলনা করেন। এই অপমান সইতে না পেরে তারা ডাক্তারকে “গণশত্রু” বলে শ্লোগান দেন। এই গালিটারে কয়েন করেই ইবসেন তার নাটকের নাম দেন। এদিকে সত্যজিৎের ডাক্তারও জনসভায় পাবলিক এনিমি বলে ঘোষিত হন। ইবসেনের থেইকা কাহিনী ধার নিলেও সত্যজিৎ সিনেমাটায় নিজের মতো ফিনিশিং টানছেন। নাটকের সমাপ্তিরে সিনেমার সমাপ্তি রাখেন নাই তিনি। নাটকে পরাজিত কান্টীয় নৈতিক আদর্শবাদীতার রেফারেন্স, কিন্তু সত্যজিৎে তার সাথে সাথে আশার বয়ান দেখানো হইছে। যে, বিজ্ঞানমনষ্কদের একদল লোক তেনার অবরুদ্ধ বাড়ির পাশ থেকে তেনার নামে শ্লোগান দেন। এতে ডাক্তার অশোকগুপ্ত ফীল করেন যে, তিনি একা নন।

সায়েন্সের এক্টিভিস্টগণ পলিটিক্সে দুর্বল বইলা রিলিজিয়নের যারা ভোক্তা তেনাদের বোঝাইতে পারেন না, বা কম পারেন। বাইনারির খেলাটা কিন্তু তেনারাই শুরু করেন, অথচ বিরতির সময়টাতে একটু আউটসাইড দ্য বক্স ভাবাভাবিতে টাইম দিলেই কিন্তু ব্যাপারটা চুকে যায়! মানে, রিলেজিয়ন আর সায়েন্সের মাঝামাঝি গ্রে এরিয়া খোঁজে বের করা আর্টিস্টদের জন্য আরাধ্য কিছুই তো, না?, কারণ আমজনতা তো আর শ্রেণিশত্রু হবার মতো এন্টিটিই না। কিন্তু নাহ, তেনারা ইবসেনের ‘শহুরে নৈতিকতার দোষ’রে নেড়িকুত্তার (পাবলিক) ধর্মীয় ডগমা’তে রিপ্লেস করবেন! পজিশন হিসাবে যদি রায়ের এক্টিভিজমরে আজকেও কাউন্টে ধরেন করোনার প্রতিরোধ কি সম্ভব? ডগমারে ধরতে গিয়া আরেকটা ডগমাতেই ডুকলেন সত্যজিৎ। অথচ চাইলে পারতেন কিন্তু! কিভাবে? ইনফেকটিভ হেপাটাইটিস লিখবে নাকি জন্ডিস? সিনেমার শুরুর সীনে জনবার্তা পত্রিকার ওই কিসিমের প্রশ্নের উত্তরে হবু ‘গণশত্রু’ কিন্তু ঠিকই পাবলিকের বুঝাবুঝির দাম দিলেন! ডাক্তার কইলেন, “জন্ডিস লেখলেই চন্ডিপুরের লোকে ভালো বুঝবে।” এভাবে কতো কতো ভাবে পাবলিকরে মড়কের ব্যাপারে সতর্ক করা যায়! ধর্মের পর্যালোচনা করা সত্যজিৎের মিথ্যার ডীলিংস লইয়া জানা থাকবার কথা। তিন সময়ে মিথ্যা বলা জায়েজ দিছে খোদা। যুদ্ধ এর একটা। ব্রাহ্ম সত্যজিৎে লুকানো ক্রিশ্চিয়ান রিদয় কষ্ট পেলে পুরের লোকদের হিন্দু (একমাত্র) ধর্মীয়,মহাভারত তো ছিলই! যুধিষ্ঠিরের কুরুক্ষেত্র জয় কি মিথ্যা ছাড়া হইছিল? তাইলে কি বলবো, বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ বান্দা হইতে গিয়াই কি সত্যজিৎ (সৌমিত্র) পলিটিক্স ভুইলা বসছেন! অবশ্য বিজ্ঞানবাদীদের একটুখানি (রুহানি) পলিটিক্সে ক্যামনে ক্যামনে যেন সৌমিত্র আবার “একা নন”..! অথচ ওই পলিটিক্স আরেকটু আগেকার সভাটায় করলে “সৎ” ডাক্তারবাবুর মেয়র ইলেকশনের সাপোর্টও পাইয়া যাওয়া হইতে পারতো কিন্তু, হায়! সত্যজিৎের ব্রিটিশ এড ফার্মে চাকরি করা মাথায় তা না খেললোই বা ক্যামনে কই! গড়পড়তা বিজ্ঞানবাদের স্রোত রায়রে এলিট বানায়াই থুইছে, বিজ্ঞাপনের মৌলিক জিনিসটারেই মিস কইরা গেলেন তিনি। ফলে জিনিসটা যেই জায়গায় গিয়া দাঁড়াইলো, নিউ টেস্টামেন্টের বনি ইসরাইলদের খোদা (বিজ্ঞান) অবাধ্যতার জন্য মানুশকে শাস্তি দিতেছেন। সো, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনষ্কতার আরো অনুগত হওয়া ছাড়া ওই শাস্তি থেইকা রেহাই নেই, মানুশের, অন্যান্য মাখলুকাত লইয়া ভাবার টাইম পান নাই সত্যজিৎ ।

ভুবনেশ্বর পল্লীতে গিয়া ডাক্তার যখন দেখেন যে, লোকজন ভার্গবের মন্দির থেইকা চরণামৃত খাইতেছেন, তখন তেনার চেহারার এক্সপ্রেশনের দিকে ক্লোজ হইয়া থাকে সত্যজিৎের ক্যামেরা। তো, কি কইতে চায় ওই শট? কলোনিয়াল বসদের ভিতরের কোন এক দরদী বস যেন করুণা করতে করতে বিষিয়ে উঠতেছেন মতো! এনলাইটেনমেন্টের আলো দিতে গিয়া যেন বলবান আন্ধারের লগে ধাক্কা খাইলো নেটিভ ইনফরমেন্টের এক চেরাগী চোখ! এবং সাথে সাথে আরেকটা ডিসিশনও চোখে পড়ে, এই আন্ধার নিভাইতেই হবে, জোর করবার মতো পেয়াদাও যেহেতু নাই, পত্রিকা-সভা’ই তো করতে হয় এনলাইটেন্ড ডাক্তারের। অথচ মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যানরে দেখেন, ব্যাকটেরিয়ার খবর পাওয়া মাত্রই ডাক্তারের চেম্বারে হাজির! কিন্তু ডাক্তার ও তাহার গিন্নী তাতে পাবলিকের খোঁজখবর নেয়া দেখেন না, বিজনেস ও স্বার্থপরতায় দেখেন শুধু! যেন পাবলিক নিয়া এনলাইটেন্ড ছাড়া যারা ভাবে তারা তো ভন্ডই হবে। তা না হলে কারো সন্তান কি বিদেশে সেটেল্ড হয়! নিজেদের মাইয়ার স্কুলে জয়েনিংও যেন বাধ্য হওয়া মতো কোন দরকারে, অথচ চেয়ারম্যানেই দেখি আমরা কনসেন্টে ইজ্জত! খেয়াল না করলে, ড্রয়িংরুমের ওই আলাপগুলো অগুরুত্বপূর্ণ মনে হবে, কিন্তু ওইগুলাতেই বিদ্যমান ফ্যামিলি এন্ড ফ্রেন্ডসদের আনকনশাস, সাবকনশাসের বহু চাবি, মেয়রের ছেলের বিদেশে সেটেল্ড হওয়াটার আলাপ ও সিনেমাটিক মুড দিয়া সত্যজিৎ ইবসেনের গল্পের জটকে আরো ইন্ডিয়ান করতে গিয়া নয়া আরেকটা তালা মারেন জাস্ট।

সত্যজিৎ বড়ো মাপের ডিরেক্টর, কিন্তু বাঙলা ভাষার ডায়লগ ছাড়া দুনিয়ার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি কি লোকাল কোন সিগনেচার বানাইতে পারছেন? মিউজিকে তিনি ক্ল্যাসিকাল য়ুরোপীয়, স্টুডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর কোন হেল্প তিনি নেন নাই। গল্প বলাতে তিনি জিনিয়াস, তাও লিনিয়ার, বাইসাইকেল থিবস বা টুয়েলভ এংরি ম্যানের স্বীকারোক্তি তারে বরবাদ করছে সিগনেচারের জায়গাটায়। ন্যারেটিভ স্টাইলেও একি, নন্দলাল বসু বা বিনোদবিহারিদের প্রাচ্য শিল্পরে গোনায় ধরেন নাই তিনি। তার মানে, তেনার জিন্দেগিটারে ওয়েস্টার্ন ফিল্ম-মেকিংয়ের জায়গা থেইকা দেখা ছাড়া উপায় নাই, তারে আরো পাকাপোক্ত কইরা দিছে অক্সফোর্ডের অনারেরি ডিগ্রি, যেইটা তার আগে পাইছিল হলিউডের চার্লি চ্যাপলিন মাত্র!

আশীষ নন্দী হাইপোথিসিস দিতেছেন, সত্যজিৎের নন্দনতত্ত্ব এবং তার জিন্দেগির যেই কোর ভ্যালু তার উৎপত্তি ১৭-১৮ শতকের য়ুরোপীয়ান এনলাইটেনমেন্ট। ব্রিটিশ কলোনির সিভিলাইজিং প্রজেক্ট এবং ওয়েস্টার্ন রেশনালিজম ছিলো তেনার বুঝজ্ঞানের গোড়া। ওইসব জিনিসের মোকাবেলা তো বহু আগেই শুরু হইছে, খোদ কলোনির সাথেও যেহেতু এগুলা রিলেটেড। আলবেয়ার কাম্যুর “প্লেগ” দিয়া তুলনায়ও আসা যায়, যে, পাবলিকের “কুসংস্কার” সমাধান দিয়া মড়ক কতটুকুন উতরানো যায়? তেনায় প্রতীকী ব্যঞ্জনা দিয়া কলোনিয়াল শাসনে আলজেরিয়ার অবস্থা কিম্বা নাজি রেজিমের ভয়াবহতা দিয়া ক্ষমতার ক্রটিক হাজির হওয়ানি দেখি আমরা। অথচ আমদার সত্যজিৎ থাকেন পাবলিক শেমিংয়ে, এনলাইটেন্ড করবার জায়গাগুলা ক্লিয়ার করতেছিল তেনার ক্যামেরা, খোদ মহামারি মোকাবেলায়ও!

সর্বসাকুল্যে বলা যায়, সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন জিনিয়াস বাঙালি বাবু। বাঙলার রেনেসন্স নিশ্চিত করছিলেন যেনারা। পাবলিক যাদের গণশত্রু বইলা ভাবে তাদের গণবন্ধু হবার মতো কার্যকরী পথ বাতলাইতে পারেন নাই তিনি। অথবা তাতে তেনার এলিটি অবস্থান হারানোর ভয় ছিল। কিন্তু সিনেমাটার শেষে তিনি আশা দেখাইতেছেন আমাদের, কিন্তু ওই আশার চিত্রায়নটা স্যুরিয়াল ব্যাপারস্যাপারের মতোই। থাকার ভিতর ওইটাই মনে হয় সত্যজিৎের সিগনেচার! কিন্তু তার বেশিরভাগ সিগনেচার দিয়া কামাই সারে কলোনিয়াল য়ুরোপ, এতে সেই সুযোগ অন্তত একটু কম। সুবহানআল্লাহ!

এপ্রিল ০১, ২০২১

 

গণশত্রু সিনেমার পোস্টার

 

 

সত্যজিৎ রায়: আইকনের ক্রিটিক – ইমরুল হাসান

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা আমি দেখি নাই। মানে, দুয়েক্টা জিনিস তো চোখে পড়ছেই, পথের পাঁচালীও দেখা লাগছিল একবার। কিন্তু উনার সিনেমা দেখার ইন্টারেস্ট আমার হয় নাই। এই না-হওয়াটা তো মোটামুটি কালচারাল একটা ক্রাইম 🙂 কারণ কিছু জিনিসরে যখন ‘গ্রেট’ বইলা ভাবা হয় সোসাইটিতে, একটা ক্লাসে, যেইটার কম-বেশি পার্ট আমি, তখন সেইটারে ‘ভাল্লাগে না’ বলতে পারাটা খালি কঠিন-ই না, বরং বেশিরভাগ সময় ট্যাবু একটা জিনিস। 

এইটা নিয়া কথা কইতে গেলে, দুইটা ঘটনা ঘটে। এক হইলো ধারণা করা হয়, চাপাবাজি করতে চাইতেছে, একসেপশনাল হইতে চাইতেছে, ট্রেন্ডের এগেনেস্টে কথা কইয়া এটেনশন চাইতেছে, এই-সেই। (এইগুলা তো থাকে সমাজে, আছেই।) মানে, আসলে পছন্দ করে, কিন্তু ‘বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা’ করতেছে। আমি যে দেখি নাই, দেখার ইচ্ছা হয় নাই, এইটা হইতেছে, একটা মিথ্যা কথা! সেকেন্ড হইতেছে, যদি সত্যি সত্যি আমার ভালো না লাগে এবং আমি দেখতে না চাই, সেইটা হইতেছে আমার ‘পারসোনাল সমস্যা’, কোন আর্টের বিচার না! 

কিন্তু এই দুইটা জায়গার বাইরেই আমি বলতে চাইতেছি যে, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা আমারে কখনোই টানে নাই, দেখতে হবে – এইরকম আর্জ দুয়েকবার হইছে, আশেপাশের অনেক যেহেতু বলাবলি করে, দেখা তো দরকার! কিন্তু আমার কখনোই মনেহয় নাই যে, উনার সিনেমা না দেইখা কিছু মিস করতেছি আমি। (এমনিতেও দুনিয়ার সব আর্ট দেইখা তো শেষ করতে পারবেন না আপনি।)

তো, উনার কোন জিনিসটা পছন্দ হয় নাই আমার? এক নাম্বার জিনিস হইলো, আইডিওলজিক্যাল জায়গা থিকা রবীন্দ্রনাথের কলোনিয়াল যেই প্রজেক্ট সতজিৎ সেইটারই একটা এক্সটেনশন মনে হইছে। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উনার অন্য সব রাইটিংয়ের মতই সুন্দর একটা এথনোগ্রাফি, কিন্তু সিনেমাতে সতজিৎ এইটারে ‘পুরান ঘুণে ধরা সমাজের ভেঙ্গে-যাওয়ারে’ দেখাইছেন একটা ‘পরাজয়’ হিসাবে। যেন একটা নতুন শুরুর দিকে যাইতেছে সমাজ! এইটা কমপ্লিট কলোনিয়াল একটা বয়ান। 

হুমায়ুন আজাদরে নিয়া কয়দিন আগে দেখছি যে, লোকজন এইরকম যুক্তি দিতেছেন যে, উনার টাইমে ইন্টেলেকচুয়ালদের কলোনিয়াল-ই তো হওয়ার কথা; তো, যা নরমালি হওয়ার কথা উনি যদি সেইটাই হন, তাইলে উনারে কেন একসেপশনাল হিসাবে নিবো আমি! হোয়াই!   

তো, পথের পাঁচালী’র খারাপ এক্সপেরিয়েন্সটা সবসময়ই মনে ছিল মেবি। সেই জায়গা থিকা উনার সিনেমাগুলা খুবই সিরিয়াস মনে হইছে আমার, হিউমার দেখি নাই কোন। [‘হীরক রাজার দেশে’ মনেহয় হইছে ফার্স একটা, টর্চার। মানে, যতটুক ফুটেজই দেখতে হইছে, একদম ল্যাংটা হয়া কলোনিয়ালিজমরে প্রণাম করার ঘটনা।] স্ত্রিস্তফ কিরোলস্কি’র সিনেমাতেও মেবি হিউমার কম, বা নাই; কিন্তু সেইটাতে সিরিয়াস হইতে হবে – এই চাপ’টা ফিল করি নাই। কুরোশাওয়া’র ন্যারেটিভ সত্যজিৎ’র কাছাকাছি বইলা আমার ধারণা, কিন্তু কুরোশাওয়াতে হিউমার আছে, অইটা পার্ট অফ লাইফ। সত্যজিৎ’র গানও, জলসাঘর, রাগ-প্রধান, এক্সপেরিমেন্টাল।… কিন্তু উনার সিনেমা মেবি ওয়েল-মেইড। ক্রাফটস উনি জানতেন। এইরকম ভালো জিনিসও আছে মেবি। কিন্তু আর্টের বিচারে এইগুলারে কম সিগনিফিকেন্ট জিনিস বইলাই মনে করি আমি। 

মানে, সত্যজিৎ অ্যাভারেজ ফিল্ম-মেকার ছিলেন, উনি গ্রেট ছিলেন না – এইগুলা কোন আলাপ না। 

আমার কথা দুইটা জায়গাতে। এক হইতেছে, উনার ফিল্ম যতোটা না এন্টারটেইনমেন্ট তার চাইতে অনেক বেশি আর্ট ম্যাটেরিয়াল; তো, এই আর্টের বিচার আমি করতে চাই কোন আইডিওলজিক্যাল জায়গাগুলারে উনি উনার আর্টে রিলিভেন্ট কইরা তোলেন, তার বেসিসে। উনার আর্ট নতুন কোন চিন্তা বা আর্টের সিগনেচার রাখতে পারছে – এইরকম কোন দাবি আমি দেখি নাই। দুয়েক্টা সিনেমা দেইখা সেইটা ফিলও করি নাই। যারা উনারে গ্রেট মনে করেন, আমি মনে করি, উনাদের সত্যজিৎ’র কোর সিগনিফিকেন্সের জায়গাগুলারে বলতে পারা দরকার, জাস্ট পারসোনাল মেমোরি দিয়া উনারে একটা সেন্টার-ফিগার কইরা তোলার চাইতে।… 

সেকেন্ড জিনিসটা হইতেছে, সমাজে কাউরেই এতো গ্রেট বানায়া ফেইলেন না, যার এগেনেস্টে কথা-বলাটারে ‘পাপ’ বইলা মনে হইতে পারে। আমার ধারণা, সত্যজিৎ’রে নিয়া এইরকম একটা সিচুয়েশন তৈরি হইছে। এটলিস্ট আমি কথা বলতে গিয়া এই অস্বস্তিটা ফিল করছি। আর এইটা হইছে, উনার আর্ট বিচার করার চাইতে প্রশংসা করতে পারার একটা সোশ্যাল প্রেশারের জায়গা থিকা। মুশকিল হইলো, প্রশংসা দিয়া একজন আর্টিস্টরে বেশিদিন বাঁচায়া রাখা যায় না। নিন্দা কইরাও মাইরা ফেলা যায় না। আর্টের বিচার কইরা এই জিনিস হয়। এই আর কি…

এপ্রিল ২, ২০২১

সতজিৎ রায়। ছবি – গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য