Main menu

আমাদের ভাষা ।। আবুল মনসুর আহমেদ ।। ১৯৫৮ ।।

এই লেখাটা আবুল মনসুর আহমদের বাংলাদেশের কালচার বইটা থিকা নেয়া হইছে। বইটা আহমদ পাবলিশিং হাউস পয়লা ছাপাইছিল ১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে, এখন বাজারে সপ্তম মুদ্রণের কপি পাওয়া যায়, যেইটা ২০১১ সালে ছাপা হইছে। বইয়ের ১২৮ থিকা ১৩৯ পেইজে এই লেখাটা আছে। 

আগের দিনে পলিটিক্যাল পার্টিগুলাতে খালি অ্যাক্টিভিস্টই না, থিওরিস্টরাও থাকতেন, আবুল মনসুর আহমেদ পাকিস্তান আমলে আওয়ামী মুসলিম পার্টির পলিটিক্যাল থিওরিস্ট ছিলেন। পলিটিক্যাল জায়গা থিকা বাংলা ভাষা কি রকম হওযা দরকার, সেইটার কিছু সাজেশন উনি রাখছেন, এই লেখায়। উনার সাহিত্যিক বিকাশ কলকাতাতেই, এই কারণে কলকাতার ভাষাচিন্তা বা ভাষা ইউজ করার যেই প্যাটার্ন সেইখান থিকা উনি কমই সরতে পারছেন। উনার সাজেশন মেইনলি ৩টা –

১. কলকাতা আগে যেহেতু রাজধানী ছিল, কলকাতার আশেপাশের অঞ্চলের ভাষা আর কলকাতার মধ্যবিত্তের ভাষাই স্ট্যান্ডার্ড বাংলাভাষা ছিল। এখন ঢাকা যেহেতু রাজধানী, ঢাকার আশেপাশের অঞ্চলের ভাষা আর ঢাকাইয়া মধ্যবিত্তের ভাষাই হবে স্ট্যার্ন্ডাড বাংলা ভাষা। যদিও পরে জনগণের ভাষার কথা উনি বলতেছিলেন, সেইটার জন্য কোন গ্রাউন্ড উনি সাজেস্ট করতে পারেন নাই।

২. সেক্যুলার ঝামেলাটাও উনার ছিল, যে শব্দের কোন ধর্ম নাই। বরং শব্দের ব্যবহারে যে ধর্ম প্রকাশ পায়, এই জায়গাটা থিকা উনি দেখছেন। অথচ দুইটা জায়গাই ভাষার ভিতরে আছে। ধর্মঅভ্যাসের কারণেই অনেক শব্দ আসছে ভাষাতে, এইটাও মিথ্যা না। তখনকার পলিটিক্যাল সিচুয়েশনে একইসাথে মুসলমান হওয়ার রাষ্ট্রীয় চাপ আর সেক্যুলার হওয়ার যেই কালচারাল চাপ আছিলো ঢাকা শহরে, উনি পলিটিক্যালি এই জায়গা দুইটারে আপহোল্ড করার ট্রাই করছেন আসলে। কিন্তু  আমাদের জীবনযাপন বা লাইফস্টাইল যে খালি সাহিত্যে রিফ্লেক্টেড হয় – তা তো না, কলকাতার সাহিত্যের যেই এফেক্ট আমাদের লাইফস্টাইলে, রুচিতে, সাহিত্যে রইয়া গেছে আর থাকতেছে, সেইটা খুবই কনশাসলি লোকেট করতে না পারলে সেইটা থিকা বাইর হইতে পারাটা বা নতুন ক্রিয়েশনের জায়গাগুলারে স্পেইস দিতে পারাটা খুবই মুশকিলের হওয়ার কথা। 

৩. যেই জায়গাটাতে উনি অনেক বেশি ওপেন-আপ হইতে পারছেন, সেইটা হইতেছে, যেই বিদেশি শব্দগুলা অলরেডি বাংলাভাষায় চইলা আসছে, সেইগুলার বাংলা করার দরকার নাই। অথচ উনার সাগরেদরা এইটাই মানতে পারেন নাই, যার ফলে মোবাইল ফোনরে মুঠোফোন বলার মিডলক্লাস প্রাইড উনারা রাখতেই চান এখনো, বাংলাভাষায়।

তো, ভাষা এই নিয়া এই লেখা ১৯৫৮ সনের পলিটিক্যাল সিচুয়েশনটারে মাথায় রাইখা পড়ার  একটা সাজেশন থাকলো। আর ভাষা যে পলিটিক্যাল এইকটা ইন্সট্রুমেন্ট এইটা নতুন কইরা বলার তো কোন দরকার আছে বইলা মনেহয় না। 

ই.হা.

…………………………………………………………

 

আমাদের বাংলা

আমাদের নিজস্ব কালচার বিকাশের ও নিজস্ব সাহিত্য সৃষ্টির জন্য চাই আমাদের নিজস্ব ভাষা। আমাদের নিজস্ব ভাষা বাংলা, এ কথা আজ যথেষ্ট নয়। যথেষ্ট নয় দুই কারণে। এক কারণ ঐতিহাসিক। অপর কারণ রাজনৈতিক।

ঐতিহাসিক কারণ বাংলা ভাষার ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলা ভাষার স্রষ্টা ও বাংলা সাহিত্যের পিতা আসলে বাংলার নবাব-বাদশারাই। সে হিসাবে বাংলা বাংগালী মুসলমানদের নিজস্ব ভাষা। কিন্তু প্রায় দুইশ বছরের ইংরেজি শাসনে বাংলা ভাষার ও সাহিত্যের বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়াছে। সে পরিবর্তন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যেমন উন্নত করিয়াছে, তেমনি মুসলমানদের নিকট হইতে অনেক – অনেক দূরে নিয়াও গিয়াছে। ইতিমধ্যে বাংলা ভাষা একটি আধুনিক উন্নতশীল ভাষাও হইয়াছে। 

অন্যান্য আধুনিক ভাষার মতো বাংলাও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ভাষা। কাজেই অনবরত তার প্রসার বৃদ্ধি ও পরিবর্তন ঘটিতেছে এবং ঘটিতে থাকিবে।

ঊনিশ শতকের হইতে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত বাংলা ভাষা ছিল পণ্ডিতী ভাষা। ঊনিশ শতকের শেষদিক হইতে টেকচাঁদ ঠাকুর দ্বিজেনঠাকুর ও রবিঠাকুরের শক্তিশালী কলমের জোরে ভদ্রলোকের পণ্ডিতী বাংলা জনগনের ভাষায় রূপান্তরিত হয়। হইবার চেষ্টা করে। এমন কি স্বয়ং বংকিমচন্দ্রের লেখাতেও এ চেষ্টা প্রতিফলিত হয়। বংকিমচন্দ্রের প্রথম জীবনের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র ভাষা এবং শেষ দিককার ‘দেবী চৌধুরানী’র ভাষার পার্থক্যই এর প্রমাণ।

পশ্চিম বাংলার বাংলা

যা হউক দ্বিজেনঠাকুর রবিঠাকুর ও শরৎচন্দ্রের চেষ্টায় বাংলা ভাষা বড় জোর পশ্চিম–বাংলার মধ্যবিত্তশ্রেণীর ভাষা হইতে পারিয়াছিল। প্রকৃত জনগনের ভাষা হইতে পারে নাই। কারণ বাংলার আসল জনগন যে মুসলমানরাও এবং তাদের ভাষাও যে জনগনের ভাষা, এ সত্য হয়তো ঐ মনীষীদের নিকট ধরাই পড়ে নাই।

তারপর নযরুল ইসলাম তাঁর অসাধারন প্রতিভা নিয়া ধুমকেতুর মতো বাংলা সাহিত্য ও ভাষার আকাশে উদিত হন এবং মুসলিম-বাংলার ভাষাকে বাংলা সাহিত্যের ভাষা করিবার সফল চেষ্টা করেন। নযরুলের এই চেষ্টার যে বিরুদ্ধতা আসে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা হইতে, তাতে শুধু সাম্প্রদায়িক তিক্ততাই বাড়ে না, হিন্দু-বাংলা ও মুসলিম বাংলার কালচারের পার্থক্যও তাতে সুস্পষ্ট হইয়া উঠে। বাংলা ভাগ হইয়া দুই দেশ না হইলে অতঃপত বাংলা কি রূপ নিত, আজ সে আলোচনা করিয়া লাভ নাই।

কিন্তু তাঁর ইশারা হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

বিপ্লবী পরিবর্তন

রাজনৈতিক কারণ একেবারে আধুনিক। আজ বাংলা ভাগ হইয়াছে। এক বাংলা দুইটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের রূপ নিয়াছে। এতে বাংলা সাহিত্য ও ভাষার কি পরিবর্তন হইয়াছে, এইটাই আমাদের ভাল করিয়া বিচার করিতে হইবে। এ বিচার সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে করিতে গেলে আমাদের আগে বিবেচনা করিতে হইবে দুইটা কথাঃ

এক, বংলা ভাগ হওয়ার আগেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে মুসলিম-বাংলার ভাষা ও হিন্দু-বাংলার ভাষার একটা পার্থক্য ছিল। মুসলিম লেখকরা সামাজিক ও সাহিত্যিক খাতিরে প্রচলিত বহুসংখ্যক মুসলমানী শব্দ সাহিত্যে চালু করিয়াছিলেন। হিন্দু লেখকরা তা মানিয়া লন নাই।

দুই, বাটোয়ারার আগে বাংলার রাজধানী সুতরাং সাহিত্যিক কেন্দ্র ছিল কলিকাতা। এখন সে জায়গা দখল করিয়াছে ঢাকা।

পরিবর্তনের তাৎপর্য

এক দুইটা কথার তাৎপর্য আমাদের বুঝিতে হইবে। অবিভক্ত বাংলায় বাংলা সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য ছিল হিন্দুদের। তার মানে বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত এবং প্রধানত হিন্দু কালচারের বাহক। সে সাহিত্য বাংলার মুসলিম কালচারের বাহক ত ছিলই না বরঞ্চ তার প্রতি বিরূপ ছিল। সুতরাং সে সাহিত্যে গোটা-কতক মুসলমানী শব্দ ঢুকাইয়া দিলেই তা মুসলিম কালচারের বাহক সাহিত্য হইয়া যাইত না। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের ভাল-ভাল বই – এর হিন্দু চরিত্রগুলির জায়গায় মুসলমান নাম বসাইয়া দিলেই ওগুলি মুসলিম চরিত্র হইয়া যাইবে না। তাতে মুসলিম-সাহিত্যও হইবে না। বরং রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্রের সৃষ্টিপ্রতিভার তাতে অপমানই করা হইবে।

পক্ষান্তরে ‘বাংগাল’ বা মুসলমান’ বলিয়া নিজেদের বাপ-দাদার আমলের মুখের লফ্‌যগুলি বাদ দিলেই আমরা ‘আধুনিক’ ও ‘প্রগতিশীল’ হইয়া যাইবো না। গোশতের বদলে ‘মাংস’। আন্ডার বদলে ‘ডিম’, জনাবের বদলে ‘সুধী’, আরযের বদলে ‘নিবেদন’, তসলিমবাদ এর বদলে ‘সবিনয়’, দাওয়াত-নামার বদলে ‘নিমন্ত্রণ-পত্র’ , শাদি-মোবারকের বদলে ‘শুভ বিবাহ’ ব্যবহার করিলেই আমরা ‘সভ্য’ ‘কৃষ্টিবান’ ও ‘সুধী বিদগ্ধ’ হইলাম, নইলে হইলাম না, এমন ধারণা হীনমন্যতার পরিচায়ক। কৃষ্টিক চেতনা ও রেনেসাঁর জন্য একটা অশুভ ইংগিত। আমাদের তরুণ ‘প্রগতি’বাদীদের মধ্যে ইদানিং এই বাতিক খুব জোরসে দেখা দিয়াছে। এটা আশংকার কথা।

আমি বলি না যে, গোশতের বদলে ‘মাংস’ আন্ডার বদলে ‘ডিম’ এমন কি পানির বদলে ‘জল’ বলা চলিবে না। বরঞ্চ আমার মত এই যে, এইগুলি সমার্থ-বোধক বাংলা প্রতিশব্দ। সাহিত্যে উভয় শব্দই ব্যবহার করা হইবে প্রয়োজনমতো। কিন্তু এরা একটা ‘ছাড়িয়া’ আরেকটা ‘ধরিতে’ যাওয়াতেই আমার যত আপত্তি। পাক-বাংলার বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ রূপ সম্বন্ধে চিন্তা করিবার সময় ভাষা-বিজ্ঞানের যে কয়টি কথা মনে রাখিতে হইবে, সে-সব কথা আমি একটু পরে বলিতেছি। এখানে শুধু সেই গঠন-রূপায়নের কৃষ্টিক বুনিয়াদ সম্বন্ধে দুই-একটি কথা বলিব।

প্রথমত ‘ছাড়া’ ‘ধরার’ মধ্যে একটা হীনমন্যতা ও পরাজিতের মনোভাব লুকাইয়া আছে। উপরের শব্দ-জোড়াগুলির মধ্যে একটা আরেকটার চেয়ে শ্রেষ্ঠ একথাও যেমন বলা যায় না, একটা মুসলমানের আপরটা হিন্দুর একথাও বলা যায় না। আসলে কোনও শব্দেরই ধর্মীয় কোনও রূপ নাই। উপরের শব্দগুলির ত নাই-ই। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ‘গোশত’ ‘আন্ডা’ ও ‘পানি’ এই তিনটা শব্দের কথাই ধরা যাক। এর একটাও আরবী নয়, ইসলামীও নয়। জোড়ার প্রতিশব্দগুলিও তেমনি ইসলাম-বিরোধী বা হিন্দুয়ানীও নয়।

শব্দের কৃষ্টিক ইমেজ

          তথাপি বাংলাদেশে এইসব শব্দের কৃষ্টিক রূপ বা ইমেজ আছে। সব ভাষাতেই অনেক শব্দের, এমন কি বেশির ভাগ শব্দেরই, এক-একটা ইমেজ থাকে। সে-সব শব্দের সাথে কালচারের অন্তর্নিহিত গভীর ও ঘনিষ্ঠ যোগ থাকে। তেমনি আমাদের বিচার্য তিনটি শব্দের জোড়ার মধ্যেও কালচারের ইমেজ আছে। তার ফলে গোশত আন্ডা ও পানির মধ্যে ‘ইসলামত্ব’ নাই বটে, কিন্তু ‘মুসলমানত্ব’ আছে। অর্থাৎ জোড়ার এক কাতারের শব্দগুলি এক কালচারের লোকেরা অর্থাৎ হিন্দুরা বহু যুগ ধরিয়া ব্যবহার করিয়া আসিতেছে। জোড়ার অপর কাতারের শব্দগুলি অপর কালচারের লোকেরা অর্থাৎ মুসলমানেরা বহু যুগ ধরিয়া ব্যবহার করিয়া আসিতেছে। বহু যুগের ব্যবহারে শব্দগুলি তাই এক-একটা কালচারেল আইডেনটিটি বা কৃষ্টিক শেনাখ্‌তি পাইয়া গিয়াছে। সোজা কথায় একটা হিন্দুর মুখের কথা অপরটা মুসলমানের মুখের কথা, এই তাদের পরিচয়। সুতরাং আমরা যদি ‘পানি’ ‘ছাড়িয়া’ ‘জল’ ‘ধরি’ তবে আমরা ধর্মচ্যুত হইব না সত্য কিন্তু ঐতিহ্যচ্যুত হইব নিশ্চয়ই। এর পরিণাম ও প্রতিক্রিয়া সুদূর-প্রসারী হইবে। সমাজ-বিজ্ঞানের ছাত্ররা তা সহজেই বুঝিতে পারিবেন।

দ্বিতীয়ত এ-সব ‘মুসলমানী’ শব্দ এবং ঐ ধরণের আরও অনেক শব্দ এক দিক হইতে হিন্দুদের মুখের ভাষার চেয়ে সত্য-সত্যই শ্রেষ্ঠ বাংলা। এই শ্রেষ্ঠত্ব বোধগম্যতার ভাষিক প্রয়োজন ও প্রসারতার জাতীয় প্রয়োজন উভয় ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। যে প্রয়োজনীয়তা পাকিস্তান হওয়ার আগেও ছিল। এখন আরও বাড়িয়াছে।

আমাদের ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব

‘গোশত’ ‘আন্ডা’ ও ‘পানি’ ইত্যাদি ‘মুসলমানী’ বাংলা শব্দগুলি বাংলার বাইরের গোটা পাক-ভারতের হিন্দু ও মুসলমান সকালেই বুঝে, ব্যবহারও করে। ঐ তিনটি শব্দ এবং চাচা-চাচী ফুফা-ফুফু খালু-খালা ইত্যাদি সম্বন্ধবাচক, লহু রগ রেশা নাশতা বদনা ইত্যাদি হাজারো বস্তু-বাচক শব্দ সম্বন্ধেও এই কথা সত্য। এই বিচারে পাক-বাংলার মুসলমানের মুখের বাংলাকে একরূপ নিখিল পাক-ভারতের ভাষা বলা যাইতে পারে। উনিশশ’ তেতাল্লিশ সালে কলিকাতার এক সাহিত্য-সভার ভাষণে আমি হিন্দু সাহিত্যিক বন্ধুদের মুসলমানদের মুখের বাংলাকে সাহিত্যে বর্জন না করিয়া বরঞ্চ উহাকে স্ট্যাণ্ডার্ড বাংলা ভাষা রূপে গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিয়াছিলাম। আমি বলিয়াছিলাম, মুসলমানদের মুখের বাংলা হিন্দুর মুখের বাংলার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি দুইটি দৃষ্টন্ত দিয়াছিলাম।  মুসলমান বাংগালীর মুখের বাংলার দৃষ্টান্ত ছিল এইরূপঃ ‘ফযরের আউয়াল ওয়াকতে উঠিয়া ফুফু-আম্মা চাচীজীকে কহিলেনঃ আমাকে জলদি এক বদনা পানি দাও। আমি পায়খানা ফিরিয়া গোসল করিয়া নমাজ পড়িয়া নাশতা খাইব।‘ হিন্দু বাংগালীর মুখের বাংলার দৃষ্টান্ত ছিল এইরূপঃ ‘অতি ভোর বেলা উঠিয়া পিসিমা খুড়া মশায়কে বলিলেনঃ আমাকে শীগ্‌গির এক গাড়ু জল দাও। আমি প্রাতঃক্রিয়া সারিয়া চ্যান করার পর সন্ধ্যা করিয়া মাধান্নি খাইব।‘

আমি বলিয়াছিলাম, মুসলমানের মুখের ঐ বাংলা ভাষা বিহার হইতে পেশওয়ার এবং অযোধ্যা হইতে কুমারিকা পর্যন্ত জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভারতবাসী বুঝিবে। পক্ষান্তরে হিন্দুর মুখের ঐ বাংলা বাংলাদেশের বাইরের হিন্দুরাও বুঝিবে না, অন্যরা পরের কথা।

আমি জোরের সাথেই বলিতে পারি আমার পঁচিশ বছরের আগের ঐ কথা আজও তেমনি সত্য রহিয়াছে। পাক-বাংলার তরুণরা আত্মসম্মানী হইলে চিরকাল তা সত্য থাকিবে।

ভাষা সমস্যার অপর দিক

তৃতীয়ত এর আরেকটা দিক আছে। পাকিস্তান হওয়ার পর আমাদের জাতীয় কর্তব্য দাঁড়াইয়াছে দুইটি। এক, পাক-বাংলায় পাকিস্তানী নেশন গড়া। দুই, পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে যথা সম্ভব সাদৃশ্য আনয়ন করা। প্রায় পঞ্চাশ লাখ ভারতীয় মুসলমান মোহাজের পাক-বাংলার-স্থায়ী বাশিন্দা হইয়াছে। কালক্রমে ভাষিক ও কৃষ্টিক সমাজ জীবনে এরা আমাদের মধ্যে মিশিয়া যাইবে। আমাদের ভাষিক ঐতিহ্য এ কাজ সহজ করিবে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের ঐতিহ্য ‘ছাড়িয়া’ শান্তিনিকেতনী ঐতিহ্য ‘ধরিতে’ যাই তবে আমরা পাক-বাংলার জাতীয়তা গঠনের কাজেই বাধা জন্মাইব।

চতুর্থত পাক-জাতীয়তার সংহতির কথা। আমরা বাংলাকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা করিয়া পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষিক ও কৃষ্টিক স্বকীয়তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করিয়াছি। কিন্তু বাংলা ভাষাকে মুসলিম-ঐতিহ্যহীন শান্তিনিকেতনী উৎকলী বাংলায় রূপান্তরিত করিয়া পাকিস্থানের দুই অংশের মধ্যে ভাষিক ব্যবধান আরও না বাড়াই, সেদিকে আমাদিগকে সচেতন থাকিতে হইবে। আমাদের আধুনিক প্রগতিবাদীরা আমাদের ভাষাকে ‘স্নাতকোত্তর, করাইয়া যে গতিকে প্রগতির দিকে নিতেছেন, তাতে আমরা পশিচম বাংলার হিন্দুদের নৈকট্য লাভ করিতেছি সত্য, কিন্তু অবাংগালী পূর্ব-পাকিস্তানীদের নিকট হইতে আমরা বহুদূরে সরিয়া যাইতেছি।

রাজধানীর পরিবর্তন

তারপর ধরুন রাজধানী পরিবর্তনের কথা। অবিভক্ত বাংলার সাহিত্যকেন্দ্র ছিল যেমন কলিকাতা, পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্য-কেন্দ্র হইবে তেমনি ঢাকা। অবিভক্ত বাংলার সাহিত্যকে গণ-সাহিত্য করিবার প্রয়োজনের  তাগিদে যে কারণে কলিকাতার কথ্য ভাষাকে সাহিত্যের ভাষার সম্মান দিতে হইয়াছিল, ঠিক সেই প্রয়োজনের তাগিদে আমাদের রাজধানী ঢাকার কথ্য ভাষাকেও আমাদের সাহিত্যের ভাষার মর্যাদা দিতে হইবে। সাহিত্যে ব্যবহারোপযোগী কোন নিজস্ব ভাষা ঢাকার নাই। তাতে ভয় পাইবার কিছু নাই। গোড়াতে কলিকাতারও ছিল না। জনগনের ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির তাগিদে কলিকাতার পাশ্ববর্তী পশ্চিম-বাংলার জিলাসমূহের কথ্য ভাষার মিশ্রনে ও সমন্বয়ে যেমন একটি ‘কোলকেতেয়ে’ কথ্য ভাষা গড়িয়া উঠিয়াছিল এবং সেই কলিকাতার কথ্য ভাষা পশ্চিম-বাংলার তথা গোটা বাংলার সাহিত্যের ভাষা হইয়া উঠিয়াছিল, পূর্ব-বাংলার সাহিত্যিকদের সমবেত চেষ্টায় তেমনি পূর্ব-বাংলার বিভিন্ন জিলার ভাষার সংমিশ্রণে ও সমন্বয়ে একটি ‘ঢাকাইয়া’ কথ্য বাংলা গড়িয়া উঠিবে এবং সেই ভাষাই পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের ভাষা হইবে। পশ্চিম-বাংলার বিভিন্ন জিলার আঞ্চলিক ডায়লেক্টের মধ্যে বিপুল পার্থক্য থাকায় শান্তিপুরী ডায়লেক্ট যেমন তাদের ভাষিক একতার নিউক্লিয়াস হইয়াছিল, আমাদের বিক্রমপুরী ডায়লেক্টও তেমনি ঢাকাইয়া বাংলার নিউক্লিয়াস হইতে পারিবে।

আমাদের দুইটি কাজ

আজ স্বাধীন করিতে হইবে দুইটি কাজ। প্রথমত পূর্ব-বাংলার প্রাচীন সভ্য মানুষের নয়া রাষ্ট্র ও নয়া জাতি গঠনে সাহায্য করার জন্য তাদের নয়া যিন্দিগির ও নয়া কালচারের ধারক ও বাহক নয়া সাহিত্য সৃষ্টি করিতে হইবে। দ্বিতীয়ত সেই সাহিত্যের মিডিয়াম রূপে পূর্ব-পাকিস্তানের সমস্ত অঞ্চলের বোধগম্য ও ব্যবহারোপযোগী একটি ঢাকাইয়া কথ্য বাংলা গড়িয়া তুলিতে হইবে। এ উভয় কাজ চলিবে স্বভাবতই এক সাথে।

এ কাজটি খুবই সোজা, আবার খুবই কঠিন। সোজা এই জন্য যে, এ কাজের নযির আছে। পশ্চিম-বাংলার সাহিত্যিকরা যেমন পশিচম-বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাধারণ কথ্য ভাষাকেই সাহিত্যের ভাষা করিয়াছেন, আমরাও যদি তেমনি পূর্ব-পাকিস্থানী মধ্যবিত্তের সাধারণের কথ্য ভাষাকেই আমাদের সাহিত্যের ভাষা করিতে পারি, তবেই আমাদের কাজ সারা হইল। মধ্যবিত্তের ভাষা মানে শিক্ষিত সমাজের সফিস্টিকেটেড উচ্চারণ-ভংগি। কথ্য ভাষাকে দেশের সর্বত্র জনগনের বোধগম্য করার জন্যই এটা দরকার।

পক্ষান্তরে এক কাজটিই কঠিন এই জন্য যে, সাহিত্যিকরাও সাধারণ মানুষের মতোই অভ্যাসের দাস। এঁরাও অনুকরণে গৌরব বোধ করেন। এঁরাও হীনমন্যতায়র ব্যারামে ভুগিতেছেন। কথাটা একটু খোলাখুলি বলা যাক। বাংলাদেশ অখণ্ড থাকিতে কলিকাতা রাজধানী থাকাকালে আমরা কথায় ও লেখায় পশ্চিম-বাংলার ভালমন্দ সবই অনুকরণ করিতাম। এটা ছিল স্বাভাবিক। এই কারণে ততদিন আমরা ‘খাইছি’র বদলে ‘খেয়েছি’ খাইতেছি’র বদলে ‘খাচ্ছি’ ‘করি নাই’র বদলে ‘করি নি’ লিখতাম এবং বলিবার চেষ্টা করিতাম। তার উপর ক্রিয়াপদ ছাড়াও বিশেষ্যের বেলাতে তা করিতে গিয়া ‘ইচ্ছা’র বদলে ‘ইচ্ছে’ ‘হিসাবে’র বদলে ‘হিসেব’, ‘নিকাশে’র বদলে ‘নিকেশ’ ‘মিঠা’র জায়গায় ‘মিঠে’, ‘তুলা’র জায়গায় ‘তুলো’, ‘সুতা’র জায়গায় ‘সুতো’ লিখিতাম ও বলিবার চেষ্টা করিতাম।

এটা তখন দোষের ছিল না। কিন্তু এখন দোষের। লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় এই যে, আজো আমরা তাই করি। আমরা ভুলিয়া যাই যে, যে-স্বাভাবিকতা সাহিত্যের প্রাণ, আমাদের এই বিবেক-বুদ্ধিহীন অন্ধ অনুকরণ-প্রিয়তা সেই স্বাভাবিকতাকেই বিদ্রূপ করিয়া থাকে। রাষ্ট্রীয় কারণে আমাদের তখনকার ভাষা ছিল কলিকাতার বাংলা। সেই কারণেই এখনকার ভাষা আমাদের ঢাকাইয়া বাংলা।

ঢাকাইয়া বাংলা

পশ্চিম ও পূর্ব-বাংলার কথ্য ভাষার পার্থক্যের অনেকখানিই ক্রিয়াপদে সীমাবদ্ধ। তবে ক্রিয়াপদ ছাড়াও অনেক বিশেষ্য প্রভৃতি পদেও আঞ্চলিক পার্থক্য আছে। আবার মুসলীম শব্দ ছাড়াও নিছক দেশী শব্দেও বেশ কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। উচ্চারণেই সে পার্থক্য বেশি প্রকট। ‘তুলো’ ‘ইচ্ছে’ প্রভৃতি শব্দের কথা আগেই কহিয়াছি। এগুলি একান্তই উচ্চারণ-বিকৃতি এবং স্থানিক। এগুলির অনুকরণ শুধু অনাবশ্যক নয়, অবৈজ্ঞানিকও। পশ্চিম-বাংলার যে-সব ভাই হিজরত করিয়া পূর্ব-পাকিস্তানে আসিয়াছেন, তাঁরা এক পুরুষ বা আরও কিছুকাল এই বিকৃত উচ্চারণ করিয়া যাইবেন। কিন্তু তাই বলিয়া আমরা বাংগালরাও তাঁদের অনুকরণ করিয়া শব্দ বিকৃতি করিব, এর কোন মানে নাই। সুতরাং আমাদের সাহিত্যকে স্বাভাবিক ও আমাদের জনগনের সাহিত্য করিতে হইলে জনগনের স্বাভাবিক ভাষায় লিখিতে হইবে। স্বাভাবিক ভাষা কি, কিভাবে তা গঠিক হইবে, কি তার রূপ হইবে, এসব কথার নির্ভুল বিচার করিতে গেলে আমাদের এই কয়টা কথা মনে রাখিতে হইবেঃ

১। ভাষা ও সাহিত্যের উপর প্রভাব কলিকাতার বদলে এখন ঢাকা হইতে হইবে।

২। পদ্মার পশ্চিম পারের আমাদের যে-সব জিলা এতদিন রাষ্ট্রীয় কারণে নিজেদের ‘বাংগাল’ হইতে স্বতন্ত্র ভাবিত, ‘অধিকতর ভদ্র’ পশ্চিম-বাংলার অন্তরভুক্ত মনে করিয়া গৌরব বোধ করিতে এবং প্রেরণার জন্য স্বভাবতই কলিকাতার দিকে চাহিয়া থাকিত, তাঁরা এখন ঢাকার দিকে নযর দিতে শুরু করিয়াছে স্বাভাবিক কারণেই।

৩। প্রায় চল্লিশ লাখের মতো পশ্চিম-বাংগালী মুসলমান পূর্ব-পাকিস্তানের স্থায়ী বাশেন্দা হাইয়াছেন। সমাজ সাহিত্য ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এঁদের অনেকেই প্রভাব-প্রতিপত্তির স্থান দখল করিয়া আছেন। পূর্ব-পাকিস্তানের কথ্য ভাষায়, সুতরাং সাহিত্যে, এঁদের প্রভাবের ছাপ থাকিবেই।

৪। কথ্য ভাষার দিক হইতে পূর্ব-পাকিস্তানের বিভিন্ন জিলার আঞ্চলিক বাংলার মধ্যে যে প্রকট পার্থক্য দেখা যায়, তার বেশির ভাগই উচ্চারণে সীমাবদ্ধ।

৫। প্রায় দশ লাখের মত উর্দ্দু-ভাষী অবাংগালী পূর্ব-পাকিস্তানের স্থায়ী বাশেন্দা বনিয়া গিয়াছেন। তাঁদেরও প্রভাব আমাদের কথ্য ভাষায় পড়িবে।

৬। রাজধানী ঢাকার বাটোয়ারার আগের মুদ্দতে কলিকাতার ঠাকুর পরিবারের মতো বাংলা-ভাষী কোন প্রভাবশালী উচ্ছ মধ্যবিত্ত শ্রেণী ছিল না।

৭। ঢাকা শহরে বাটোয়ারার প্রাক্কালের যুগের বাংলা-সাহিত্যে পূর্ব-বাংলাবাসী প্রভাবশালী কোন সাহিত্যিক গোষ্ঠী ছিল না।

সুতরাং পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যের বাহন যেমন হইবে স্বাভাবিক কথ্য ভাষা তেমনি সেটা হইবে উপরোক্ত সমস্ত পরিস্থিতি-পরিবেশের সৃষ্ট ও হরেক ভাষার সংমিশ্রেওণের ফল এক নয়া ভাষা। সে ভাষার সৃষ্টিকার্য ইতিমধ্যেই শুরু হইয়াছে। দুর্ভাগ্যবশত শুধু আমাদের সাহিত্যিকদের নযরেই সে বিপুল নির্মান-কার্য আজো ধরা পড়ে নাই।

 

ফর্মেটিভ স্তর

অথচ সাহিত্যিকদের কাজ এই সৃষ্টি-কার্যে এই গ্রোথে সকল  শক্তি ও মনীষা দিয়া সাহায্য করা। আমাদের পাড়াগাঁয়ে প্রচলিত হাজার-হাজার শব্দ অবহেলিত এবং অজ্ঞাত অবস্থায় পড়িয়া আছে। এই সব শব্দ আমাদের সাহিত্যের সম্পদ হইতে পারে। এই সমস্ত শব্দের সংযোগে আমাদের ভাষা হইবে সম্পদশালী। তার গতি হইবে চঞ্চল ও বেগবান। তার প্রাণ-শক্তি হইবে প্রচুর। জীবন্ত ভাষার গ্রোথ ও প্রসারের শেষ নেই। শুনা যায়, গত পঞ্চাশ বছরে ইংরেজী ভাষার প্রায় পঁচিশ হাজার নতুন শব্দ প্রবেশ করিয়াছে। ইংরেজ লেখক ও সাহিত্যিকরা দুই বাহু মেলাইয়া ঐসব শব্দ নিজস্ব ভাষায় গ্রহণ করিয়াছেন। ইংরেজি ভাষার এই ইলাস্টিসিটি এই প্রসারণ ক্ষমতা আছে বলিয়াই ইংরাজের রাষ্ট্রীয় সাম্রাজ্যের অবসান হওয়ার পরেও দুনিয়ায় ইংরেজি ভাষার সাম্রাজ্য একটুকুও সংকীর্ণ হয় নাই।

আমাদের নয়া ভাষা গঠনে অমনি উদার বাস্তুবাদী হইতে হইবে আমাদের। আমি আগেই বলিয়াছি আমাদের রাজধানী তথা অন্যান্য শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাংগালী ভদ্রোলোকের কথ্য ভাষাই হইবে আমাদের সাহিত্যের ভাষা। তাঁর তাঁদের অফিসে-আদালতে, ক্লাবে-বৈঠকখানায় স্কুলে-কলেজে যে ভাষায় কথা কন, সে-সব শব্দ ও ক্রিয়াপদ যে স্বর-ভংগিতে যে বাক্‌-প্রণালীতে ব্যবহার করেন সেইটাই হইবে আমাদের সাহিত্যের ভাষা। এ ভাষা এখনও ফর্মেটিভ স্তরে। একটা মডেল বাক্য নেওয়া যাক।

কেতাবী বাংলা – তুলার বাজার এমন মহার্ঘ আর দেখি নাই। তুলার অভাবে সূতার কলগুলি বন্ধ গিয়াছে। সুতার অভাবে পাল বোনা হইতেছে না। পালের অভাবে নৌকার ক্ষেপ দেওয়া যাইতেছে না। ফলে হাঁড়ি-পাতিল বেচা-কেনা বন্ধ। কুমারদের তাতে বড়ই অসুবিধা হইয়াছে। দুই মুঠা ভাতের জন্য তারা পৈত্রিক জীবিকা হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছে। তবে ভিক্ষা করিয়া খাইবার ইচ্ছা তাদের নাই। স্ত্রী-পুত্রকে খাওয়াইয়া-পরাইয়া বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য তারা লাকড়ির ব্যবসা ধরিয়াছে। কাঠ কুড়াইবার উদ্দেশ্যে তারা কুড়াল-হাতে নদী পার হইয়া সুন্দরবনে যায় খুব সকাল বেলা। সারাদিন পরে বিকাল-সন্ধ্যায় কাঠ লইয়া ঘরে ফিরিয়া আসে।

পশ্চিম বাংলার বাংলা – তুলোর বাজার এমন মাগ্‌গি আর দেখি নি। তুলোর অভাবে সূতোর কলগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সূতোর অভাবে পাল বোনা হচ্ছে না। পাল ছাড়া নৌকার ক্ষেপ দেয়া যাচ্ছে না। ফলে হাঁড়ি-পাতিল বেচা-কেনা বন্ধ। কুমোরদের তাতে বড্ড অসুবিধে হয়েছে। দুমুঠো ভাতের আশায় তারা পৈত্রিক ব্যবসা থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে ভিক্ষে করে খাবার ইচ্ছে তাদের নেই। মাগ-ছেলেকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যে তারা লাকড়ির ব্যবসা ধরিয়াছে। কাঠ কুড়োবার উদ্দেশ্যে তারা কুড়োল হাতে নদী পেরিয়ে সুন্দরবনে যায় খুব সকালে। সারাদিন পরে বিকেল-সন্ধ্যেয় কাঠ নিয়ে ঘরে ফিরে আসে।

পূর্ব বাংলার বাংলা – তুলার বাজার এমন মাংগা দেখি নাই। তুলার অভাবে সূতার কলগুলি বন্ধ হৈয়া গেছে। সূতার অভাবে পাল বোনা হৈতেছে না। পাল ছাড়া নৌকার ক্ষেপ দেওয়া যা’তেছে না। ফলে হাড়ি-পাতিল বেচা-কিনা বন্ধ। কুমারদের তাতে খুবই অসুবিধা হৈছে। দুই মুঠা ভাতের আশায় তারা খান্দানী পেশা থনে বার হৈয়া আসছে। তবে ভিক্ষা কৈরা খাবার ইচ্ছা তাদের নাই। জরু-কবিলারে খাওয়া’য়া-পরা’য়া বাঁচা’য়া রাখবার লাগি তারা লাকড়ির ব্যবসা ধরছে। কাঠ কুড়াবার মতলবে তারা নদী পার হৈয়া সুন্দরবনে যায় খুব সকালে। সারাদিন পরে বিকাল-সন্ধ্যায় কাঠ লৈয়া ঘরে ফি’রা আসে।

ক্রিয়াপদে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব

এই মডেল বাক্যটিতে আপনারা লক্ষ্য করিবেন ‘তুলা’ ‘সূতা’ ‘নৌকা’ ‘মুঠা’ ‘দেওয়া’ ‘অসুবিধা’ ‘কুড়াইবার’ ‘বিকাল’ ‘সন্ধ্যা’ ‘ইচ্ছা’ ‘কুড়াল’ ‘গুলি’ ‘নাই’ ইত্যাদি শব্দগুলির ব্যাপারে কেতাবী বাংলা ও পূর্ব-বাংলার বাংলার মধ্যে হুবহু মিল আছে। পশ্চিম-বাংলা এখনে অনর্থক শব্দগুলিকে বিকৃত করিয়াছে। সুতরাং এই শব্দগুলির বেলায় এবং অনুরূপ আরও অনেক শব্দের বেলায় পূর্ব-বাংলায় প্রচলিত ভাষা অধিকতর ‘সাধু’ সভ্য ও সাহিত্যে গ্রহণযোগ্য। এ-সব শব্দের ব্যবহারে পশ্চিম-বাংলার অনুকরণ করা অর্থহীন নকল-নবিসি মাত্র।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়াছে ক্রিয়াপদ নিয়া। ‘ছাইড়া’ ও ‘ছেড়ে’, ‘হৈয়া’ ও ‘হয়ে’, ‘খাইছি’ ও ‘খেয়েছি’ ও ‘খাইতেছি’ ‘খাচ্ছি’ ইত্যাদি ক্রিয়াপদ ও অনুরূপ হাজারো ক্রিয়াপদের কোনটা লেখায় ইস্তেমাল করিব, সেটা ঠিক করা বাস্তবিকই কঠিন কাজ। কারণ শুধু ‘হৈয়া’ ‘কৈরা’ই পূর্ব-পাকিস্তানের শব্দ, ‘হয়ে’ ‘করে’ পূর্ব-পাকিস্তানের শব্দ নয়, এ কথা কওয়া চলে না। পদ্মার পশ্চিম পারের, বিশেষত খুলনা যশোর ও কুষ্টিয়ার, লোকেরা ঐ-সব ক্রিয়াপদ ব্যবহার করিয়া থাকেন। পূর্ব-পাকিস্তানের কথ্য ভাষায় এঁদের প্রভাব ও প্রাক-পাকিস্তানী বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য এই দুই-এর সমন্বয় আমাদের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের কথ্য ভাষায় যে শক্ত মোচড় দিতেছে এবং আরও দিবে, তাতে সন্দেহ নাই। আপত্তি থাকিবার কারণও নাই। শুধু সেটা জগা-খিচুড়ি না হইলেই হইল। সে ভাষা নিশ্চয়ই জগা-খিচুড়ি না হইয়া ভূনি-খিচুড়ি হইবে যদি আমরা নিম্নলিখিত সাবধানতা অবলম্বন করিঃ

জগা বনাম ভূনি খিচুড়ি

১। ভাষায় নতুন জটিলতার আমদানি না করা, যথাঃ

‘করিতেছি’ অর্থ ‘করতেছি’ না বলিয়া ‘করছি’ বা ‘কচ্ছি’ বলা, ‘দেখিতেছি’ অর্থে ‘দেখতেছি’ না বলিয়া ‘দেখছি’ বলা, ‘বলিতেছি’ অর্থে ‘বলতেছি’ না বলিয়া ‘বলছি’ বলা ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে ভাষায় অনাবশ্যক জটিলতা বাড়িতেছে। কারণ ‘করছি’ ‘দেখছি’ পূর্ব-পাকিস্তানের অধিকাংশ জিলায় ‘সম্পন্ন বর্তমান কালে’র ক্রিয়া বুঝায় অর্থাৎ কাজগুলি হইয়া গিয়াছে। যদিও ঐ প্রকার ব্যবহারে পশ্চিম বাংলায় শব্দের প্রথম হরফে এবং পূর্ব-বাংলায় শেষ হরফে জোর বা এক্সন্ট্‌ দেওয়া হয়, তবু শুধু এ এক্সেন্টের পার্থক্য দিয়া পূর্ব-বাংলার জনগনকে অর্থের পার্থক্য বুঝান যাইবে না। সে চেষ্টাও অনাবশ্যক। কারণ পূর্ব-বাংলার প্রচলিত ‘করতেছি’ ‘দেখতেছি’ শব্দগুলি পশ্চিম-বাংলার লোকেরাও বলিতে ও বুঝিতে পারে।

২। বিভিন্ন আঞ্চলিক উচ্চারণকে  হুবহু ভাষায় ফুটাইবার চেষ্টা না করা, যথাঃ

শুনাকে ‘শোনা’, ‘ইচ্ছাকে ‘ইচ্ছে’, করবেনকে ‘কোরবেনা’ করবকে ‘কোরবো’, হলকে ‘হলো’, দেইকে ‘দি’, নাইকে ‘নি’, করতেকে ‘কত্তে’ পারতেকে ‘পাত্তে’, ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও বলিবার সময় আমরা অনেকেই ঐ রকমই উচ্চারণ করিয়া থাকি, তবু বানানের সময় ঐ উচ্চারণকে হরফে ফুটাইয়া তুলিবার দরকার নাই। ওটা উচ্চারকের উপরই ছাড়িয়া দেওয়া উচিত। যেমন ধরুন কোন কোন অঞ্চলের লোক লেখে ‘প্রথম’ ‘প্রস্তাব’, কিন্তু বলিবার সময় বলে ‘পেরথম’ ‘পেরেস্তাব’ ইত্যাদি। এইভাবে উচ্চারণের ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া নিলে আমরা ‘করব’ লিখিয়াও ‘করবো’ বা ‘কোরবো’ ‘করে’ লিখিয়াও ‘কোরে’ বা ‘কৈরা’, ‘হয়ে’ লিখিয়াও ‘হোয়ে’ বা ‘হৈয়া’ উচ্চারণ করিতে পারিব এবং জটিলতা এড়াইয়াও  আমরা পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ কথ্য ভাষা সৃষ্টি করিতে পারিব।

৩। পশ্চিম-বাংলার অনুকরণে ‘ইয়া’ যুক্ত ক্রিয়াপদকে অতিরিক্ত মোচড়াইবার চেষ্টা না করা যথাঃ

সরাইয়া স্থলে ‘সরায়ে’র বদলে ‘সরিয়ে’, পরাইয়া স্থলে ‘পরায়ে’র বদলে ‘পরিয়ে’, পড়াইয়া স্থলে ‘পড়ায়ে’র বদলে ‘পড়িয়ে’, বেড়াইয়া স্থলে ‘বেড়ায়ে’র বদলে ‘বেড়িয়ে’, বাহির হইয়া স্থলে ‘বার হয়ে’র বদলে ‘বেরিয়ে’, পার হইয়া স্থলে ‘পার হয়ে’র বদলে ‘পেরিয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব বিকৃতিতে ক্রিয়াপদকে অনাবশ্যকভাবে মূল ধাতু হইতে এতদূর সরাইয়া দেওয়া হয় যে, চিনিবার উপায় থাকে না।

পক্ষান্তরে উক্ত ‘সরায়ে’ ‘পড়ায়ে’ ‘বেড়ায়ে’ ‘খাওয়ায়ে’ ‘পরায়ে’ বলিলে পূর্ব-ও পশ্চিম বাংলার কথ্য ভাষার মধ্যে একটি সুন্দর আপোসরক্ষা হয়। অবশ্য পূর্ব-বাংলায় ‘সরায়ে’ ‘বাড়ায়ে’ ইত্যাদি বলা হয় না। এখানে ‘সরাইয়া’ ‘বাড়াইয়া’ ইত্যাদি কেতাবী শব্দই উচ্চারণ করা হয়, শুধু হ্রস্ব ‘ই’ কে আরও একটু খাট করা হয় মাত্র। যেমন সরা’য়া বাড়া’য়া ইত্যাদি। শেষের ‘য়া’কে এখানে ‘য়ে’ করা হয় না। তবু পূর্ব-ও পশ্চিম-বাংলা-ভাষাভাষীদের নয়া মিশ্রণে পূর্ব-পাকিস্তানে যে নয়া যবান গড়িয়া উঠিবে, তাতে পূর্ব-ও পশ্চিম-বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের এই ভাষিক আপোষ আমাদের ভাষার উন্নতি বিধান করিবে বলিয়াই মনে হয়।

 

আপোষ ফর্মূলা

          এই আপোস-ফরমূলা গ্রহণ করিলে উপরের ঐ মডেল বাক্যটি এইরূপ ধারণ করিবেঃ

          তুলার বাজার এমন মাংগা দেখি নাই। তুলার অভাবে সূতার কলগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। সূতার অভাবে পাল বোনা হচ্ছে না। পাল ছাড়া নৌকার ক্ষেপ দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে হাড়ি-পাতিল বেচা-কেনা বন্ধ। কুমারদের তাতে খুবই অসুবিধা হয়েছে। দু’মুঠা ভাতের আশায় তারা খান্দানী পেশা থনে বার হয়ে এসেছে। তবে ভিক্ষা করে খাবার ইচ্ছা তাদের নাই। জরু-কবিলারে খাওয়ায়ে-পরায়ে বাঁচায়ে রাখবার জন্য তারা লাকড়ির পেশা ধরেছে। কাঠ কুড়াবার মতলবে তারা কুড়াল হাতে নদী পার হয়ে সুন্দরবনে যায় খুব সকালে। সারাদিন বাদে বিকাল-সন্ধ্যায় কাঠ নিয়া ঘরে ফিরে আসে।

বলা বাহুল্য উপরের মডেল বাক্যটি আমার সাজেসশান মাত্র। এ সাজেসশানের আসল মতলব এই যে, সাধারণ শব্দই হউক আর ক্রিয়াপদই হউক কথা বলিবার সময় শিক্ষিত বক্তার মুখে সহজে বিনা চেষ্টায় বিনা-কৃত্রিমতায় আপনা-আপনি যা আসিয়া পড়ে তাই শুদ্ধ ভাষা। বিদেশী শব্দ সম্বন্ধে যা সত্য, পশ্চিম-বাংলার ক্রিয়াপদ সম্বন্ধেও অবিকল তাই সত্য। আমি অনেক শিক্ষিত লোক ও কবিসাহিত্যিকের মুখে একই বাক্যে একবার ‘খেয়েছি’ আবার ‘খাইছি’ ইত্যাদি দুমিশালী ক্রিয়াপদের ব্যবহার দেখিয়াছি। এটাকে আমি দোষের মনে করি না। আমাদের মুখের কথ্য বংলা বোধ হয় এইভাবেই তার ফর্মেটিভ মুদ্দত পার হইবে এবং হয়তো এই রূপের স্ট্যাণ্ডার্ডাইযড হইবে।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই যে, রাজধানীর বাংগালী শিক্ষিত সম্প্রদায় তাঁদের বৈঠকখানায় স্কুলে-কলেজে ও অফিস-আদালতে মোটামুটি এই ধরণের দুমিশালী ভাষাতেই কথা বলেন এবং চট্টগ্রাম হইতে রাজশাহী ও সিলেট হইতে খুলনা পর্যন্ত সারা পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নির্বিশেষে সকলে এই ভাষা বুঝেন।

পরিভাষা-সমস্যা

আমাদের ভাষা-সমস্যার আরেক দিক পরিভাষা সম্বন্ধে আমাদের সুধী সমাজের একাংশের ধারণা। আমরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত হইবার চেষ্টা করিতেছি। মাতৃভাষার মারফতে ছাত্রদের আমরা সকল শাখার জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখাইবার সংকল্প নিয়াছি। তা করিতে গেলে ক্লাসে বাংলায় ঐ ঐ বিষয়ে লেকচার দিতে হইবে এবং বই-পুস্তক লিখিতে হইবে। কাজেই প্রশ্ন উঠিয়াছে আমাদের পরিভাষা সৃষ্টি করিতে হইবে। ইহাই তাঁদের অভিমত। সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করিয়াছেন। কিছু-কিছু পরিভাষা তাঁরা সৃষ্টিও করিয়াছেন।

আমার ব্যক্তিগত মত এই যে, পরিভাষার প্রশ্ন আসলে একটা সমস্যাই নয়। আমাদের ভাষার ইংরেজী বা বিদেশী যে-সব শব্দ চালু হইয়া গিয়াছে, ওগুলির বাংলা প্রতিশব্দ বাহির করিবার চেষ্টা নিছক পাগলামি। এমন শক্ত কথা বলার অপরাধ আমার মাফ করিবেন আপনারা। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোন শব্দও আমি খুঁজিয়া পাই না। ‘কাগয’ ‘কলম’ ‘দোয়াত’ ইত্যাদি শব্দ আরবী এ অজুহাতে এক সময়ে হিন্দু পণ্ডিতরা এ-সব শব্দ বাংলায় ব্যবহার করিবেন না বলিয়া যিদ করিয়াছিলেন এবং পরিভাষা সৃষ্টি করিবার চেষ্টায় ‘ভূর্জ-পত্র’ ‘লেখনী’ ও ‘মস্যাধার’ আবিষ্কার করিয়াছিলেন। আপনারা কি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করিতে চান? আপনারা কি ট্রেন স্টিমার টিকেট রেল ইউনিয়ন বোর্ড ইলেকশন ভোট প্রেসিডেন্ট মেম্বর জজ কোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদি শব্দের প্রতিশব্দ বাহির করিতে চান? নিশ্চয়ই চান না। তবে আবার পরিভাষা কি? যা আমাদের ভাষায় চলিয়া গিয়াছে, যে-সব শব্দ আমরা দিনরাত নিজেদের কথাবার্তায় ব্যবহার করি বুঝি এবং বুঝাই, সে সবই বাংলা শব্দ। একটি দৃষ্টান্ত দেইঃ

‘আগামী মার্চ মাসে আমাদের ইউনিয়ন বোর্ডের জেনারেল ইলেকশন হইবে। আমার বাবা প্রেসিডেন্টির ক্যানডিডেট হইয়াছেন। কাজেই ভোটারদেরে ক্যানভাস করিতে আমাকে কয়েকটা মিটিং করিতে হইবে। সেজন্য আমি স্কুলে কয়েক দিনের ছুটি চাহিয়া হেডমাস্টারের নিকট এপ্লাই করিয়াছি।‘

এটা কি বাংলা ভাষা না? পূর্ব-পাকিস্তানের এমন কোনো শিক্ষিত অশিক্ষিত লোক আছে কি যে এটা বলে না বুঝে, না?

চলতি শব্দই বাংলা শব্দ

স্কুল-কলেজের বাহিরে যেটা চলে ভিতরে তা চলিবে না কেন? কলেজের ভিতরের একটা দৃষ্টান্ত নেন।

‘আমাদের কলেজের ইকনমিকসের প্রফেসার গতকাল ক্লাসে খুব স্টাডি করিয়াই দিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। ওটা এত ইন্টারেস্টিং হইয়াছিল যে, আমরা সবাই তাঁর ডিটেলড নোট নিয়াছি। তাতে প্রিটেস্টে পাশ করা আমাদের অনেকের পক্ষেই খুব ইযি হইবে।‘

এটা কি বাংলা ভাষা নয়? এই ভাষায় যদি প্রফেসররা লেকচার দেন, তবে কার কি অসুবিধা হইবে? যেমন করিয়া কলেজ ক্লাস হসপিটাল প্রেসক্রিপশন অপারেশন মেডিসিন ট্রিটমেন্ট ইন্সট্রুমেন্ট এক্সরে রেডিওলজি কার্ডিওগ্রাফ থার্মোমিটার স্টেথিসকোপ ইত্যাদি টার্ম আমাদের কথাবার্তায় ও লেখাপড়ায় ইস্তেমাল করি, তেমনি করিয়া আমরা যদি সমস্ত মেডিকেল লজিক্যাল বোটানিক্যাল ফিযিওলজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল টার্ম লেখায় ও কথায় ব্যবহার করি, তবে তাতে দোষ কি? অসুবিধা কোথায়?

দেশী ভাষার প্রতিশব্দের তালাসে মানুষ গোড়ামির কোন স্তরে যাইতে পারে, তা দেখিয়াছিলাম আমি কলিকাতায়। আপনাদের হয়তো অনেকেই জানেন যে, ‘ইত্তেহাদ’ সম্পাদন উপলক্ষে পাকিস্তান হওয়ার পরেও প্রায় তিন বৎসর কাল আমার কলিকাতায় থাকিতে হইয়াছিল। সেই সময় পশ্চিম-বাংলা সরকার ডাক্তার সুনীতি চাটার্জীর নেতৃত্বে একটি পরিভাষা কমিটি নিয়োগ করেন। ঐ কমিটির রিপোর্ট বিবেচনার জন্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ্‌গণের এক সভা হইয়াছিল। তাতে আমারেও ডাকা হইয়াছিল। কমিটি রিপোর্ট শুনিয়া আমাদের চক্ষু একদম চড়ক গাছ। তাঁরা মিউনিসিপ্যালিটি কর্পোরেশন হাইকোর্ট এডভোকেট সেক্রেটারিয়েট মিনিস্টার সেক্রেটারি মিলিটারি ক্যাবিনেট এসেম্বলি হোস্টেল রেস্টুরেন্ট টুর্নামেন্ট ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদি সুপ্রচলিত শব্দগুলির সংস্কৃত প্রতিশব্দ বাহির করিয়াছিলেন। আমিই ঐ রিপোর্টের প্রতিবাদে বক্তৃতা করি প্রথম। সভায় সমবেত শিক্ষাবিদগণ ঐ রিপোর্টের বিরুদ্ধে এত চটিয়া গিয়াছিলেন যে, আমার মতো পাকিস্তানী বাংগালীর সমর্থনে অধিকাংশ বক্তা বক্তৃতা করিয়াছিলেন। ঐ রিপোর্ট সে সভায় গৃহীত হইতে পারে নাই।

কিন্তু দেশ-প্রেমের উদ্দীপনা ও কৃত্রিম জাতীয়তবোধের গোড়ামি সেখানে এতদূর অগ্রসর হইয়াছিল যে, জনমতের রাজনৈতিক চাপে পশ্চিম-বাংলায় এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশে ঐ রিপোর্ট বা অনুরূপ অন্যান্য রিপোর্ট গ্রহণ করিতে সরকার বাধ্য হইয়াছিলেন। ফলে আজ ভারতে, কাগযে-কলমে চীফ মিনিস্টারকে মুখ্যমন্ত্রী, আইন পরিষদকে বিধান সভা, কর্পোরেশনকে পৌরসভা, ভ্যানিটি ব্যাগকে ‘ফুটানি কি ডিবিয়া’, অল-ইণ্ডিয়া রেডিওকে ‘অখিল ভারত আকাশবাণী’, অল-ইণ্ডিয়া টেনিস টুর্নামেন্টকে ‘অখিল ভারত ঘেচুগেণ্ডু ঝাপট’ বলবার চেষ্টা চলিতেছে। কিন্তু এসব অস্বাভাবিকতা কিছুতেই স্থায়ী হইতে পারে না। ভারতের জনগণ তাঁদের কথায় এবং লেখায় কিছুতেই এসব কষ্ট-কল্পিত কৃত্রিমতা মানিয়া নিতে পারে নাই।

আমাদের ভাষায়ও যদি আমরা অমন কোন কৃত্রিমতার আমদানি করি, তবে কালের স্রোতে তা ধুইয়া-মুছিয়া এবং জনমতের চাপে তা পিষিয়া যাইবেই। সুতরাং আমাদের কর্তব্য অতি সোজা। পরিভাষা সৃষ্টির চেষ্টায় সাহিত্যিকদের প্রতিভার অপচয় না করিয়া যে-সব বিদেশী শব্দ আমাদের কথাবার্তায় চলিয়া গিয়াছে, সেগুলি অকাতরে বই-পুস্তকে ও গোটা সাহিত্যে চালু করিয়া দেওয়া উচিত। আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এবং অফিস-আদালতের অফিসাররা তাঁদের যাঁর-তাঁর এলাকায় কথা বলিবার সময় যে-সব বিদেশী শব্দ ব্যবহার করেন, লিখিবার সময়ও বাংলা হরফে সেইসব শব্দ ব্যবহার করিবেন। এতে গৌরব হানি হইবে না। ভাষার বিন্দুমাত্র অবনতি ঘটিবে না। বরঞ্চ তাতে আমাদের ভাষার শব্দ-সম্পদ বাড়িয়া যাইবে। এই ইলাস্টিসিটি ভাষাকে দ্রুত আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাষায় পরিণত করিবে।

আমার বক্তব্য শেষ হইয়াছে। আমি উপসংহারে এই আরয করিব যে, আপনারা বিশাল ঐতিহ্যের অধিকারী এক নয়া জাতির কালচারেল রিনেসাঁর আর্কিটেক্ট ও ইন্‌জিনিয়ার। আপনাদের দৃষ্টির স্বচ্ছতা, বুকের বল, প্রাণের সাহস, মনের উদারতা ও চিন্তার সবলতা আপনাদের দায়িত্বের উপযোগী হইতে হইবে। অতীতের ভুল শুধরাইবার সংকল্পে দৃঢ়তা, নয়া পথে পা বাড়াইবার বিপদকে বরণ করিয়া নিবার দুর্বার যিদ, ব্যক্তিগত সুখ-সম্পদ ও আরাম-আয়াসে উপেক্ষা, যদি আমরা আয়ত্ত করিতে না পারি, তবে নয়া জাতি গড়িবার অধিকারী আমরা নই, মাথা হেট করিয়া সে সত্য আমাদের মানিয়া নেওয়া উচিত। নয়া কালচার ও নয়া ভাষা উভয় ক্ষেত্রেই এটা সত্য।

আপনার দৃষ্টির সেই স্বচ্ছতা, চিন্তার সেই সবলতা এবং প্রাণের সেই সাহস নিয়া আগুয়ান হন, আপনাদের হাতে নয়া কৃষ্টি ফলে-ফুলে মঞ্জরিত হইয়া উঠুক, আমাদের রাষ্ট্র দুনিয়ার সভ্য রাষ্ট্রপুঞ্জের দরবারে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হউক, আমাদের মাতৃভাষা সম্পদশালী ইলাস্টিক ও বৈজ্ঞানিক ভাষায় রূপান্তরিত হইয়া একদিকে আমাদের জনগণের মুখের কথা ও মনের ভাবের বাহক হউক, অপরদিকে সে ভাষা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রকাশ ও প্রসারের উপযোগী মিডিয়াম হউক, সে ভাষা আধুনিক ও উন্নত পাক-বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব-সাহিত্যের আসরে শ্রদ্ধা ও সম্মানের অধিকারী করুক, আল্লার দরগায় এই মুনাজাত করিয়া আমি বক্তৃতার উপসংহার করিলাম। *

  • ১৯৫৮ সালের ৩রা মে চাটগাঁয় অনুষ্ঠিত পূর্ব-পাক সাহিত্য সম্মিলনীর কালচার ও ভাষা শাখায় সভাপতির ভাষণের (বর্ধিত ও সংশোধিত) অংশ।
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য