Main menu

অলঙ্কার না Badge of slavery? – রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ( ডিসেম্বর ৯, ১৮৮০ – ডিসেম্বর ৯, ১৯৩২), যিনি বেগম রোকেয়া নামে বেশি পরিচিত, উনার লেখাপত্র অনেক পাবলিশারই বই হিসাবে ছাপাইছেন, অনলাইনেও উনার লেখা এভেইলেবল, খুঁজলে পাওয়া যায়। গল্প-কবিতা-উপন্যাস লেখলেও ‘সুলতানা’স ড্রিম’র বাইরে উনার নন-ফিকশন লেখাগুলাই এখনো পপুলার। সুলতানা’র স্বপ্ন একটা ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক আসলে।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসনের বাপ জহীরউদ্দিন মোহাম্মদ আলী হায়দার সাবের ছিলেন রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ গ্রামের জমিদার। রোকেয়া উনার আম্মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরাণী’র লগে কলকাতায় থাকার সময় একজন ইংরেজ মহিলার কাছে কিছুদিন পড়াশোনা করছিলেন। উনার বাপ উনারে ফরমাল পড়াশোনা করতে দেন নাই। ভাই-বইনের কাছ থিকা এবং নিজের আগ্রহে উনি বাংলা, উর্দু, ফারসি, আরবি এবং ইংরেজি ভাষা শিখছিলেন। উনার লেখাতেও অইসব ভাষার টেক্সটের রেফারেন্স পাইবেন।

১৮৯৮ সালে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখওয়াৎ হোসেনের সাথে উনার বিয়া হয়। বিয়ার পরে সাখওয়াৎ হোসেন রোকেয়ারে উনার পড়াশোনার ব্যাপারে হেল্প করেন। ১৯০২ সালে রোকেয়া’র ফার্স্ট লেখা ছাপা হয়। উনাদের দুইটা বাচ্চা হইলেও অল্প বয়সে দুইজনই মারা যায়। ১৯০৯ সালে সাখায়াৎ হোসেন মারা যাওয়ার পরে উনার রাইখা যাওয়া টাকা দিয়া ভাগলপুরে “‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল” বানাইছিলেন রোকেয়া। কিন্তু ফ্যামিলির চাপে উনারে কলকাতাতে চইলা আসতে হইলে ১৯১১ সালে কলকাতাতে একই নামে একটা স্কুল চালু করেন। মেইনলি এই এক্টিভিজমের কারণেই উনি সমাজে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩২ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত উনি উনার এই সোশ্যাল এক্টিভিজম চালু রাখছিলেন।

উনার চিন্তার একটা ঘটনা হইতেছে, চিন্তা ও কাজের মিল। উনি যেই কাজ করছেন, সেইটার লগে মিলায়া চিন্তা করছেন বা যেই চিন্তা করছেন, সেইটা নিয়া কাজ করছেন। (কোন আইডিওলজির কাছে নিজেরে প্রাকটিক্যালিটিরে বন্ধক রাখেন নাই।)  উনার চিন্তা ও কাজ একটা সময়ে অনেক মানুশরে ইনফ্লুয়েন্স করছে, নতুনভাবে ভাবাইতে পারছে।

এখন যখন ‘নারী-শিক্ষা’ ব্যাপার’টা সমাজে আর ‘অশ্লীল’ বা ‘নাজায়েজ’ কোন জিনিস না, মনে হইতে পারে যে, উনার চিন্তার রিলিভেন্স মেবি কমে আসছে। কিন্তু উনার লেখাগুলা পড়লে সেইটা ভুল মনে হইতে পারবে বইলা আমরা মনে করি। ‘নারী-শিক্ষা’ জিনিসটারে উনি একটা টুল হিসাবে ভাবছেন, অইটারেই মঞ্জিলে মাকসুদ ভাবেন নাই।

২.
উনার এই লেখাটা বাংলা ১৩১০ সনে (ইংরেজি ১৯০৩ সালে) গিরিশচন্দ্র সেন সম্পাদিত “মহিলা” পত্রিকার বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় সংখ্যায় ছাপা হইছিল। ১৩১১-তে নবনূর পত্রিকায় ‘আমাদের অবনতি’ নামে এবং মতিচূর বইয়ে লেখাটা ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামে ছাপা হইছিল। “স্ত্রীজাতির অবনতি” নামে এডিটেড ভার্সনটাই অনেক জায়গায় পাইবেন।

“মহিলা” পত্রিকা শুরু হয় বাংলা ১৩০২ সনে, কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্মসমাজ এর স্পন্সর ছিল, আর এডিটর ছিলেন গিরিশচন্দ্র সেন। ১৩১৭ সনে গিরিশচন্দ্র সেন মারা গেলে বজ্রগোপাল নিয়োগী এর এডিটর হইছিলেন, কিন্তু এরপরে বেশিদিন আর চালু থাকে নাই।

এই লেখা ছাপা হওয়ার পরে রোকেয়ার এই লেখা নিয়া অনেক তর্ক হয়, অনেকেই লেখাটার “প্রতিবাদ” করেন, সম্পাদক গিরিশচন্দ্র সেনও মোটামুটি ব্যালেন্স কইরা একটা “সম্পাদকীয়” লেখেন। “মহিলা” এবং “নবনূর” পত্রিকা’তে ছাপা হওয়া অই লেখাগুলা আমরা খুঁইজা বাইর করতে পারি নাই। (কেউ যদি খুঁইজা দিতে পারেন, তাইলে তো আমাদের উপকারই হয়।) কিন্তু অল্প কিছু অংশ বাংলা একাডেমি’র ছাপা-হওয়া “রোকেয়া রচনাবলী”তে আছে, অংশগুলা লেখার শেষে রাখা হইলো। খেয়াল করলে দেখবেন, রোকেয়াও উনার টাইমে কোন “সেলিব্রেটেট” রাইটার ছিলেন না, বরং একজন “কন্ট্রোভার্সিয়াল” রাইটারই আছিলেন।

৩.
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের চিন্তা ও কাজকাম’রে দুইটা জায়গা থিকা দেখার ধরণ এখন সমাজে চালু আছে। এক হইতেছে, উনি সমাজে “নারী-শিক্ষার” পসার ঘটাইছিলেন, “পিছিয়ে পড়া সমাজে” “নারী-স্বাধীনতার প্রতীক” ছিলেন। এর বিপরীত ঘরানা হইতেছে, “উনি তো ইংরেজ কলোনিয়ালদের খাতিরের লোক ছিলেন”, “কলকাতায় যখন স্বদেশী আন্দোলন চলতেছে তখন ইংরেজদের ডোনেশন নিয়া স্কুল চালাইছেন”। এমনকি এই “বির্তক” মোকাবেলা করতে গিয়া উনারে “পোস্ট-কলোনিয়াল” হিসাবে আইডেন্টিফাই করার আলাপও চালু আছে, স্পেশালি উনার “সুলতানা’র ড্রিম”রে বেইজ কইরা। (এইটা এক ধরণের গ্লোরিফিকেশনের জায়গা থিকাই আসে, যেইটা নিয়া সাবধান থাকাটা দরকার।)

কিন্তু আমরা বলবো, এইরকম “হিরো ভার্সেস ভিলেন” এর ক্যাটাগরি থিকা উনার কাজকামরে বিচার কইরেন না। ভুল হবে সেইটা। বরং একটা নেগোশিয়েশনের জায়গা থিকা দেখেন। দুইটা পক্ষের লগে নেগোশিয়েট করতেছেন উনি। রোকেয়া ইংরেজদের পক্ষের লোক যেমন ছিলেন না, একইরকমভাবে ইংরেজ-বিরোধী ন্যাশনাল-মুভমেন্টে নারীদের রিকগনিশনের কোন জায়গাও যে নাই, এই জিনিস ইন্ডিকেট করার ভিতর দিয়া “স্বরাজ” বা ইনকিলাব-বিরোধী হয়া যান নাই। উনি বরং “নারী-প্রশ্ন”টারে সেন্টার করতে চাইছেন: “পুরুষদিগকেও বলি,—ভ্রাতৃগণ ! আমরা স্বাধীন না হইলে তোমরাও স্বাধীন হইবে না। নিশ্চয় জানিও, আমরা যত দিন নরাধীনা থাকিব তোমরাও তত দিন পরাধীন থাকিবে। তোমরা আমাদের উপর প্রভুত্ব কর বলিয়া তোমাদের উপর আর এক জাতি আধিপত্য করিতেছে।”

আমরা কোন অতীতে ফিরা যাইতে পারি না, কখনোই। যেইটা করতে পারি, আমাদের ফিউচার’রে তৈরি করতে পারি, বা সেইটাই করতেছি আসলে আমাদের বর্তমানের কাজকামের ভিতর দিয়া। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনও এই কাজটা করছেন, একটা ফিউচার তৈরি করতে চাইছেন, কোন অতীতে ফিরা না গিয়া। এইটা করতে গিয়া ইউরোপিয়ান-চিন্তার লগে এক ধরণের মোকাবেলা করতে চাইছেন। উনার এই মোকাবেলার জায়গাগুলারে রিকগনাইজ করতে পারাটা জরুরি, গ্লোরিফাই বা ভিলিফাই করার চাইতে।…

এই কারণে উনার ইম্পর্টেন্ট টেক্সটগুলারে আমরা এভেইলেবল রাখতে চাই যাতে নতুন কাউরে নতুন চিন্তা করতে এই লেখাগুলা হেল্প করতে পারে।

তো, আসেন, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসনের লগে দেখা হোক, কিছু বাতচিত হোক আমাদের, আবার!

এডিটর, বাছবিচার
…………………………

ভগিনীগণ! i

তোমরা কি কোনদিন আপনার দুর্দশার বিষয় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যসমাজে আমরা কি, দাসী!! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসায় উঠিয়া গিয়াছে শুনিতে পাই, কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কি? আমরা যে নরাধীন সেই নরাধীন! দিদীমাদের মুখে শুনি যে, নারী নরের অধীন থাকিবে, ইহা ঈশ্বরেরই অভিপ্রেত— তিনি প্রথমে পুরুষ সৃষ্টি করিয়াছেন, পরে তাহার সেবা শুশ্রুষার নিমিত্ত রমণীর সৃষ্টি হয়। কিন্তু একথার আমার সন্দেহ আছে। কারণ দিদীমাদের এ জ্ঞান পুরুষের নিকট হইতে গৃহীত। তাহারা ত বলিবেনই যে, রমণী কেবল পুরুষের সুখ শাস্তিদাত্রিরূপে জন্মগ্রহণ করে।

২ আমি আদিম কালের ইতিহাস জানি না বটে, তবু বিশ্বাস করি যে, পুরাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমরা এরূপ দাসী ছিলাম না। মানুষ যেমন ক্রমে সভ্য হইয়াছে— গায়ে রঙ মাখা ছাড়িয়া কাপড় পরিতে শিখিয়াছে, তেমনই ক্রমে বাহুবলে ও বুদ্ধিকৌশলে নারীজাতির উপর আধিপত্য করিতে আরম্ভ করিয়াছে। ঈশ্বর এমন পক্ষপাতী নহেন যে, এক জাতিকে অন্য জাতির অধীন করিবেন। যদি তাই হইত তবে সৃষ্টিকৰ্ত্তা পুরুষের যেমন দুই হস্ত দুই চক্ষু সৃষ্টি করিয়াছেন, রমণীরও সেই প্রকার অবয়ব সৃজন করিলেন কেন? কই দ্বিমস্তক পুরুষ বা নাসাহীনা রমণী কোন্ দেশে আছে? এরূপ ত সৃষ্টিবৈচিত্র্য কোথাও দেখা যায় না। তবে কেমন করিয়া বলিব ঈশ্বর পক্ষপাতী? যে সমাজ রাজা ও প্রজার সৃষ্টি করিয়াছে, পুলিশ প্রভু ও বড়লাট প্রভুর মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টি করিয়াছে, সেই সমাজ নারীকে নরের অধীন করিয়াছে। যে ভূজবলে ও চাতুরী কৌশলে সুচতুর মানুষ বন্য পশুকে করায়ত্ত করিয়াছে- অশ্বের দ্বারা শকট টানাইতেছে, হস্তীকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বাধিয়াছে, পশুরাজকেশরীকে লৌহপিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়াছে, সেই বাহুবলে ও বুদ্ধিবলে নারীকে তাহারা অধীনতাপাশে বাঁধিয়াছে।

৩ আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসীত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। ক্রমে পুরুষেরা আমাদের মনকে পর্য্যন্ত enslaved করিয়া ফেলিয়াছে। স্বাধীনতা ও অধীনতার যে প্রভেদ তাহা বুঝিবার সামর্থটুকুও আমাদের নাই। কি ভীষণ অধঃপাত। তাঁহারা ভূস্বামী গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্রমে আমাদের “স্বামী” হইয়া উঠিয়াছেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশু পক্ষীর ন্যায় আদুরে হইয়া পড়িয়াছি ! এখন আমরা সমাজের বন্দিনী।

৪ আর এই যে, আমাদের অতি প্রিয় অলঙ্কারগুলি— এগুলি badges of slavery! ঐ দেখ কারাগারে বন্দিগণ লৌনিৰ্ম্মিত বেড়ী পায়ে পরিয়াছে, আমরা (আদরের জিনিষ বলিয়া) স্বর্ণ রৌপ্যের বেড়ী পরিয়া বলি “মল পরিয়াছি!” উহাদের হাতকড়ী লৌহনিৰ্ম্মিত, আমাদের হাতকড়ী স্বর্ণ বা রৌপ্যনিৰ্ম্মিত “চুড়ি!” বলা বাহুল্য অনেকে এক হাতে লোহার ‘বালা’ও পরেন ! কুকুরের গলে যে dogcollar দেখি, উহারই অনুকরণে আমাদের জড়োয়া চিক নিৰ্ম্মিত হইয়াছে। অশ্ব হস্তী প্রভৃতি পশু লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে, সেইরূপ আমরা স্বর্ণশৃঙ্খলে কণ্ঠ শোভিত করিয়া বলি “হার পরিয়াছি!” গোস্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া “নাকা দড়ী” পরার, আমাদের স্বামী আমাদের নাকে “নোলক” পরাইয়াছেন !! অতএব দেখিলে ভগিনি, আমাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি badges of slavery ব্যতীত আর কিছুই নহে ! আবার মজা দেখ, যাহার শরীরে badges of slavery যত অধিক, তিনি সমাজে ততোধিক মান্যা গণ্যা।

৫ এই অলঙ্কারের জন্য আমাদের কত আগ্রহ— যেন জীবনের সুখসমৃদ্ধি উহারই উপর নির্ভর করে! তাই দরিদ্রা কামিনীগণ স্বর্ণরৌপ্যের হাতকড়ী না পাইয়া কাচের চুড়ি পরিয়া দাসীজীবন সার্থক করে। যে বিধবা চুড়ি পরিতে অধিকারিণী নহে, তাহার মত হতভাগিনী এ জগতে নাই !! অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূক গহনা ভাল লাগে। অহিফেন তিক্ত হইলেও আফিংচির অতি প্রিয় সামগ্রী। মাদকদ্রব্যে যতই সর্ব্বনাশ হউক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহে না। সেই রূপ আমরা অঙ্গে badges of slavery ধারণ করিয়া আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করি— গর্ব্বে স্ফীতা হই! হায়! আমাদের অধঃপাতের একশেষ হইয়াছে। হিন্দুমতে সধবা স্ত্রীলোকের কেশকর্ত্তন নিষিদ্ধ কেন? তাহা কি একটু চিন্তা করিয়া দেখিয়াছ? সধবানারীর স্বামী ক্রুদ্ধ হইলে স্ত্রীর সুদীর্ঘ কুম্ভলদাম হস্তে জড়াইয়া ধরিয়া তাহাকে সহজে উত্তম মধ্যম দিতে পারিবে ভল্লুকের নৃত্য দেখিয়াছ? সময়ে সময়ে ভল্লুকের সহিত “কুস্তি” করিয়া ভল্লুকস্বামী পরাজিত হইলে তাহার “নাকাদড়ী” ধরিয়া টান দেয়। তখন ভল্লুকবীর অসহ্য যাতনায় অধীর হইয়া জোর কম করে! সেইরূপ সধবা প্রহার তাড়নায় পলায়নতত্পর হইলে স্বামী তাহার কেশপাশ ধরিয়া সবলে আকর্ষণ করে। প্রত্যেক রমণীরই সুদীর্ঘ অলকগুচ্ছ যে ঐরূপে ব্যবহৃত হয়, আমি তাহা বলিতেছি না। তবে কেশবৃদ্ধি দ্বারা সকল স্বামীর জন্য অন্ততঃ ঐ সুবিধাটা প্রস্তুত রাখা হয় !! ধিক্ আমাদিগকে ! আমরা আশৈশব এই চুলের কত যত্ন করি! কি চমৎকার সৌন্দর্য্য্যজ্ঞান !

৬ অলঙ্কারসম্বন্ধে যাহা বলিয়াছি, তাহাতে কোন কোন ভগ্নী বোধ হয় আমাকে পুরুষপক্ষেরই গুপ্তচর মনে করিবেন। অর্থাৎ ভাবিবেন যে, আমি পুরুষের টাকা স্বর্ণকারের হস্ত হইতে রক্ষা করিবার জন্য হয়ত এরূপ কৌশলে ভগ্নীদিগকে অলঙ্কারে বীতশ্রদ্ধ করিতে চেষ্টা করিতেছি। না ভগিনি, তাহা নয়। আমি তোমাদেরই এক জন, এবং তোমাদেরই মঙ্গলাকাঙ্ক্ষিণী। পুরুষের টাকার শ্রাদ্ধ করিবার অনেক উপায় আছে। দুই একটি উপায় বলিয়া দিতেছি।

৭ তোমার ঐ জড়োয়া চিকটা বাড়ীর আদুরে কুকুরটির কণ্ঠে পরাও, এবং যাহাতে চিকটা চুরি না যাইতে পারে, সেজন্য বেশী বেতনে একজন চাকর নিযুক্ত কর, সে ঐ কুকুরের সঙ্গে সঙ্গে থাকিবে। চিক হারাইলে ঐ চাকর দণ্ডিত হইবে। তুমি যখন শকটারোহণে বেড়াইতে যাও, তখন সেই শকটাবাহী অশ্বের গলে তোমার বহুমূল্য হার পরাইও। তোমার বালা ও চুড়িগুলি drawing room এর curtainring রূপে ব্যবহার করিও। তবেই “স্বামী” নামধারী নরবর বেশ জব্দ হইবেন!! অলঙ্কারের উদ্দেশ্য ঐশ্বর্য্য দেখান বইত নয়? তবে ঐরূপে ঐশ্বর্য্য দেখাইও। নিজের শরীরে badges of slavery ধারণ করিবে কেন? উক্ত প্রকারে অলঙ্কারের সদ্ব্যবহার করিলে প্রথম প্রথম লোকে তোমায় পাগল বলিবে, কিন্তু গ্রাহ্য করিও না। এ পোড়া সংসারে কোন্ ভাল কাজটা বিনা ক্লেশে সম্পাদিত হইয়াছে? “পৃথিবীর গতি আছে” এই কথা বলাতে মহাত্মা Galileoকে বাতুলাগারে যাইতে হইয়াছিল। কোন্ সাধু লোকটি অনায়াসে নিজ বক্তব্য বলিতে পারিয়াছেন? তাই বলি, সমাজের কথায় কর্ণপাত করিও না। এ জগতে ভাল কথা বা ভাল কাজের বর্তমানে আদর হয় না।

৮ বাস্তবিক অলঙ্কার আমাদের badges of slavery ভিন্ন আর কিছুই নহে। পুরুষগণ কোন বিষয়ে তর্ক করিতে গেলে বলেন “আমার কথা প্রমাণিত করিতে না পারিলে আমি চুড়ি পরিব!” কবিবর সাদী পুরুষদিগকে উৎসাহিত করিবার জন্য বলিয়াছেন, “আয় মর্দা, বকুশিদ জায়া এ জানা না পুষিদ!” (অর্থাৎ হে বীরগণ ! চেষ্টা কর, রমণীর পোষাক পরিও না)। আমাদের পোষাক পরিলে তাঁহাদের অপমান হয়। দেখা যাউক সে পোষাকটা কি? কাপড় ত তাঁহাদের ও আমাদের প্রায়ই একই প্রকার। এক খণ্ড ধুতিতে ও এক খণ্ড সাড়ীতে লম্বাই চৌড়াই এর কিছু তারতম্য আছে কি? একই বস্ত্র খণ্ড তিনি পারিলে ধুতি হয়, আমি পারিলে শাড়ী। যে দেশে পুরুষে পাজামা পরে, সে দেশে নারীও পাজামা পরে” Ladies jacket” শুনা যায় ; “gentlemen’s jacket” ও শুনিতে পাই! তবে “জামা এ জনা।” বলিলে কাপড় না বুঝাইয়া অলঙ্কারই বুঝায়। পুরুষ অলঙ্কার পরে না, যেহেতু ইহা দাসত্বের নিদর্শন। ২ (পুরুষগণ অলঙ্কার না পরিয়া ভিন্ন প্রকারের Badges of slavery ধারণ করেন!)

৯ পুরুষগণ বলেন যে, তাঁহারা আমাদিগকে “বুকের ভিতর বুক পাতিয়া বুক দিয়া ঢাকিয়া অন্তঃপুরে রাখিয়াছেন।” এবং আমরা এরূপ সোহাগ সংসারে পাইব না বলিয়া ভয় প্রদর্শন করিয়া থাকেন। আমরা তাই সোহাগে গলিয়া মোমের পুতুল হইয়াছি। তাঁহারা যে অনুগ্রহ করিতেছেন, তাহাতেই আমাদের সর্ব্বনাশ হইতেছে। আমাদিগকে তাঁহারা হৃদয়পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া জ্ঞানসূর্যালোক ও বিশুদ্ধ বায়ু হইতে বঞ্চিতা রাখিয়াছেন, তাহাতেই আমরা ক্রমশঃ (inch by inch) মরিতেছি! অতএব এখন মিনতি করিয়া বলিতে চাই—

‘অনুগ্রহ করে এই কর, অনুগ্রহ কর না মোদের।”

বাস্তবিক অত্যধিক যত্নে অনেক জিনিষ নষ্ট হইয়া যায়। যে কাপড় বহু যত্নে বন্ধ করিয়া রাখা যায়, তাহা উইয়ের ভোগ্য হয়। পুরুষ কবিই ত বলিয়াছেন—

“কেন নিবে গেল বাতি ?
অধিক যতনে আমি ঢেকেছিনু তারে
জাগিয়া বাসর রাতি,
তাই নিবে গেল বাতি।

সুতরাং দেখা যায়, তাঁদের অধিক যত্নই আমাদের সর্বনাশের কারণ।

১০ বিপৎসঙ্কুল সংসার হইতে সর্ব্বদা সুরক্ষিতা আছি বলিয়া আমরা সাহস, ভরসা বল একেবারে হারাইয়াছি, আত্মনির্ভর ছাড়িয়া স্বামীদের নিতান্ত “আঁচলধরা” হইয়া পড়িয়াছি। সামান্য হইতে সামান্যতর বিপদে পড়িলে আমরা গৃহকোণে লুকাইয়া গগনভেদী আৰ্ত্তনাদ রোদন করিয়া থাকি!! ভ্রাতৃ মহোদয়গণ আবার আমাদের “নাকিকান্নার” কথা তুলিয়া কেমন বিদ্রূপ করেন, তাহা জান না কি? আর সে বিদ্রুপ আমরা নীরবে সহ্য করি। বুক ফাটিলেও মুখ ফোটে না। আমরা কেমন শোচনীয়রূপে ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, তাহা ভাবিলে ঘৃণায় লজ্জায় মৃতপ্রায় হই।

১১ বাঘ ভল্লুক ত দূরে থাকুক, আর্মুলা জলৌকা প্রভৃতি ক্ষুদ্র কীট পতঙ্গ দেখিয়া আমরা ভীতি বিহ্বল হই! একটি নয় দশ বৎসরের বালক বোতলে আবদ্ধ একটি জলৌকা লইয়া বাড়ী শুদ্ধ স্ত্রীলোকদের ভীতি উৎপাদন করিয়া আমোদ ভোগ করে। অবলাগণ চিৎকার করিয়া দৌড়িতে থাকেন, আর বালকটি সহাস্যে বোতল হস্তে তাঁহাদের পশ্চাদ্ধাবিত হয়। এমন তামাসা তোমরা দেখ নাই কি? আমরা দেখিয়াছি, আর সে কথা ভাবিয়া ঘৃণায় লজ্জায় মরমে মরিতেছি। সত্য কথা বলিতে কি, সে সময় বরং আমোদ বোধ কয়িাছিলাম, কিন্তু এখন সে কথা ভাবিলে শোণিত উত্তপ্ত হয়। আমরা শারীরিক বল মানসিক সাহস সব পুরুষের চরণে উৎসর্গ করিয়াছি আর এই দারুণ শোচনীয় অবস্থা চিন্তা করিবারও আমাদের অবসর নাই।

১২ ভীরুতার চিত্র ত দেখাইলাম, এখন শারীরিক দুর্ব্বলতার চিত্র দেখাইব। আমরা এমন জড় অচেতন পদার্থ হইয়া গিয়াছি যে, তাঁহাদের drawing room এর Ornament বই আর কিছু নহি। ভগিনিগণ! তোমরা কখনও বিহারের কোন ধনী মুসলমান ঘরের বউ ঝী নাম্নী অদ্ভূত জড়পদার্থ দেখিয়াছ কি? আমি দেখিয়াছি। একটী বধূ বেগমের প্রতিকৃতি দেখাই। ইহাকে কোন প্রসিদ্ধ museum এ বসাইয়া রাখিলে রমণী জাতির প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা হইত! একটি অন্ধকার কক্ষে দুইটি মাত্র দ্বার আছে, তাহার একটি রুদ্ধ এবং একটি মুক্ত থাকে। সুতরাং সেখানে (পর্দ্দার অনুরোধে) বিশুদ্ধ বায়ু ও সূর্য্যরশ্মির প্রবেশ নিষেধ। ঐ কুঠুরীতে পর্য্যঙ্কের পার্শ্বে যে রক্তবর্ণ বনাত মণ্ডিত তক্তপোষ আছে, তাহার উপর বহুবিধ স্বর্ণালঙ্কারে বিভূষিতা, তাম্বুলরা রঞ্জিতাধরা প্রসন্নোননা যে একটী জড় পুত্তলিকা দেখিতেছ, উহাই বধূ বেগম ( অর্থাৎ বেগমের পুত্রবধূ)। ইহার সর্ব্বাঙ্গে ১০২০০ টাকার অলঙ্কার। শরীরের কোন অংশে কয় ভরি সোণা বিরাজমান, তাহা সুস্পষ্ট রূপে বলিয়া দেওয়া আবশ্যক। মাথার (সিথির) অলঙ্কার দেড় পোয়া (৩২ ভরি) ; কর্ণে কিঞ্চিৎ অধিক এক পোয়া (২৪ ভরি) ; কণ্ঠে সওয়া সের (১২০ তোলা) সুকোমল বাহুলতায় প্রায় দেড় সের (১৩৬ ভরি) ; এবং চরণযুগলে সার্দ্ধ দুই সের স্বর্ণের বোঝা। আমরা প্রতি ভরি স্বর্ণ ২৫ হিসাবে ধরিয়াছি ; ঐ হিসাবে ১০, ২০০ টাকায় পঁাচ সের আট তোলা স্বর্ণ হয়। প্রতি ভরি ২০ ধরিলে সাত সের আটচল্লিশ তোলা হয়। বলিতে ভুলিয়াছি ঐ অলঙ্কারের অধিকাংশ ২৫ বৎসর পূর্ব্বে প্রস্তুত হইয়াছে। শুনিতে পাই তখন স্বর্ণ সুলভ ছিল। তবে ১৬ ভরি হিসাবে প্রতি সহস্র টাকায় ৬২৫ তোলা স্বর্ণ ক্রীত হইয়াছিল। বেগমের নাকে যে নথ দুলিতেছে, উহার ব্যাস সার্দ্ধ চারি ইঞ্চ! ৩ (কোন কোন নথের ব্যাস ছয় ইঞ্চ এবং পরিধি ন্যূনাধিক ১৮ ইঞ্চি হয়! ওজন এক ছটাক !!) পরিহিত পা-জামা বেচারা সলমাচুমকির কারুকার্য্য ও বিবিধ প্রকারের জরির (গোটাপাট্টার) ভারে অবনত! আর পাজামা ও দোপাট্টার (চাদরের) ভারে বেচারী বধূ ক্লান্ত।

১৩ প্রায় আট সের স্বর্ণের বোঝা লইয়া নড়াচড়া অসম্ভব, সুতরাং হতভাগী বধূ বেগম জড় পদার্থ না হইয়া কি হইবেন? সর্ব্বদাই তাঁহার মাথা ধরে। ইহার কারণ ত্রিবিধ; (১) সুচিক্কণ পাটী বসাইয়া কসিয়া কেশবিন্যাস, (২) বেণী ও সিঁথির উপর অলঙ্কারের বোঝা, (৩) অৰ্দ্ধেক মাথায় আটাসংযোগে আরশা (রৌপ্য চূর্ণ) ও চুমকি বসান হইয়াছে; ভ্রূযুগল চুমকি দ্বারা আচ্ছাদিত, এবং কপালে রাঙ্গের বিচিত্র বর্ণের চাঁদ ও তারা আটাসংযোগে বসান হইয়াছে। শরীর যেমন জড়পিণ্ড মন ততোধিক জড়।

১৪ এই প্রকার জড়পিণ্ড হইয়া জীবন ধারণ করা বিড়ম্বনামাত্র। কারণ কোন রূপ শারীরিক পরিশ্রম না করায় বেগমের স্বাস্থ্য একেবারে মাটী হয়েছে। কক্ষ হইতে কক্ষান্তরে যাইতে তাঁহার চরণদ্বয় শ্রান্ত ক্লান্ত ও ব্যথিত হয়। বাহুদ্বয় সম্পূর্ণ কাৰ্য্যাক্ষম। অজীর্ণ, ক্ষুধামান্দ্য এসব রোগ তাঁহার চির সহচর। এরূপ স্বাস্থ্য লইয়া চির-রোগীর জীবন বহন করা কেমন কষ্টকর, তাহা অনেকে বুঝেন। সুতরাং ইহাদের নন মস্তিষ্ক সকলই চির রোগী। শরীরে স্ফূর্ত্তি না থাকিলে মনেও স্ফূর্ত্তি থাকে না।

১৫ ঐ চিত্র দেখিলে কি মনে হয়? আমি বধূ বেগমের জন্য বড় দুঃখিত হইলাম, ভাবিলাম, “অভাগার ইহলোক পরলোক উভয় লোকই নষ্ট।” যদি ঈশ্বর হিসাব নিকাশ লয়েন যে, তোমার মন, মস্তিষ্ক, চক্ষুঃ প্রভৃতির কি সদ্ব্যবহার করিয়াছ? তাহার উত্তরে বেগম কি বলিবেন? আমরা নিজের ও অপর মানুষের অবস্থা দেখিয়া শুনিয়া যে শিক্ষালাভ করি, ইহাই ধৰ্ম্মোপদেশ। সময় সময় আমরা পাখী শাখী হইতে যে সদুপদেশ ও জ্ঞানলাভ করি, তাহা পুঁথিগত বিদ্যা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। একটী আতাপতন দর্শনে মহাত্মা নিউটন যে জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন, সে জ্ঞান তৎকালীন কোন পুস্তকে ছিল না। আমি সেই বাড়ীর একটী মেয়েকে বলিলাম, তুমি যে হস্ত পদ দ্বারা কোন পরিশ্রম কর না, এজন্য খোদার নিকট কি জওয়াবদিহি (explanation) দিবে? সে বলিল, “আপ্‌ক্কা কনা ঠিক হ্যায়।” এবং সে যে সময় নষ্ট করে না, সর্ব্বদা চলাফেরা করে, আমাকে ইহাও জানাইল। আমি পুনরায় বলিলাম, শুধু ঘুর ফির করিলেই ব্যারাম হয় না। তুমি প্রতিদিন অন্ততঃ আধ ঘণ্টা দৌড়া দৌড়ি করিও। দৌড়া দৌড়ি কথাটার উপরে হাসির একটা গর্া উঠিল। আমি কিন্তু ব্যথিত হইলাম, ভাবিলাম “উল্টা বুঝিলি রাম !” কোন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করিবার শক্তিটুকুও ইহাদের নাই। আমাদের উন্নতির আশা বহুদূর—ভরসা কেবল পতিতপাবন।

১৬ আমাদের শয়নকক্ষে যেমন সূৰ্য্যালোক প্রবেশ করে না, তদ্রূপ মনঃকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না। যেহেতু আমাদের জন্য স্কুল কলেজের দ্বার এক প্রকার রুদ্ধ। পুরুষ যত ইচ্ছা অধ্যয়ন করিবেন, কিন্তু আমাদের নিমিত্ত জ্ঞানরূপ সুধাভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত হইবে না। যদি এক জন উদার পুরুষ দয়া করিয়া আমাদের হাত ধরিয়া অগ্রসর করিতে চাহেন, তাহাতে সহস্র জনে বাধা দেন।

১৭ এখন প্রশ্ন হইতে পারে যে “কেন ধরা দিলে, কেন দাসী হইলে?” ইহার উত্তরে এই মাত্র বলি, “পুরুষগণ ! তোমরা কেন ভারতবর্ষের সিংহাসনে বিদেশীর রাজন্যবর্গকে বসিতে দিলে?” যে কারণে তাহারা পরাধীন হইয়াছেন, সেই কারণে আমরাও নরাধীন হইয়াছি।

১৮ এখন ভগিনীগণ, আপন স্বত্ব বুঝিতে চেষ্টা কর। স্বীকার করি যে, বহু বহু শতাব্দী হইতে নারী যে দাসত্বশৃঙ্খল পরিতেছে, তাহা এক দিনে মোচন হইবে না। কিন্তু বহু শ্রমে নিৰ্ম্মিত অট্টালিকা যেমন এক দিনের ভূকম্পনে ভূমিসাৎ হয়, বহুকালে নিৰ্ম্মিত দুর্গ এক দিনে কামানের গোলাবর্ষণে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়। আশা করি সেই রূপ বলপ্রয়োগে এ বহুশতাব্দী ব্যাপী দাসত্বের সুদৃঢ় দুর্গ অন্ততঃ ত্রিশ বৎসরে ধ্বংস হইবে। আমরা কি এক দিনে বশ্যতা স্বীকার করিয়াছিলাম? অবশ্যই না।

১৯ দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনও মাথা তুলিতে পারি নাই, তাহার প্রধান কারণ এই যে, যখনই কোনো ভগিনী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনি ধর্ম্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে! আমরা প্রথমতঃ যাহা সহজে মানি নাই, তাহা পরে ধৰ্ম্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য্য করিয়াছি। এখন ত অবস্থা এই যে, ভূমিষ্ট হওয়ামাত্রই শুনিতে পাই, “প্যাট্! তুই জন্মেছিস গোলাম, থাক্‌বি গোলাম!” সুতরাং আমাদের আত্মা পৰ্য্যন্ত গোলাম হইয়াছে।

২০ শিশুকে মাতা বলপূর্ব্বক ঘুম পাড়াইতে বসিলে, ঘুম না পাওয়ায় শিশু যখন মাথা তুলিয়া ইতস্ততঃ দেখে, তখনই মাতা বলেন “ঘুমা শিগ্‌গির ঘুমা! ঐ দেখ জুজু !” ঘুম না পাইলেও শিশু অন্ততঃ চোখ বুঝিয়া পড়িয়া থাকে। সেই রূপ আমরা যখনই উন্নত মস্তকে অতীত ও বর্তমানের প্রতি দৃষ্টিপাত করি, অমনই সমাজ বলে “ঘুমাও, ঘুমাও, ঐ দেখ নরক !” মনে বিশ্বাস না হইলেও অন্ততঃ মুখে কিছু না বলিয়া আমরা নীরব থাকি। (ক্রমশঃ)

২১ আমাদিগকে প্রতারণা করিবার নিমিত্ত পুরুষগণ ঐ ধৰ্ম্মগ্রন্থগুলিকে “ঈশ্বরের আদেশপত্র” বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। কোন বিশেষ ধর্ম্মের নিগূঢ় মৰ্ম্ম বা আধ্যাত্মিক বিষয় আমরা আলোচ্য নহে—ধৰ্ম্মে যে সামাজিক আইনকানুন বিধিবদ্ধ আছে, আমি কেবল তাহারই আলোচনা করিব, সুতরাং ধাৰ্ম্মিকগণ নিশ্চিন্ত থাকুন। পুরাকালে যে ব্যক্তি প্রতিভাবলে দশজনের মধ্যে পরিচিত হইয়াছেন, তিনিই আপনাকে ঈশ্বরপ্রেরিত দূত কিংবা দেবতা বলিয়া প্রকাশ করিয়া অসভ্য বর্বরদিগকে শাসন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। ক্রমে যেমন পৃথিবীর অধিবাসীদের বুদ্ধি বিবেচনা বৃদ্ধি হইয়াছে, সেইরূপ পয়গম্বরদিগকে (ঈশ্বরপ্রেরিত মহোদয়দিগকে) এবং দেবতাদিগকেও বুদ্ধিমান হইতে বুদ্ধিমত্তর দেখা যায় !

২২ একবার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ দেবতাটী সংস্কৃত ভাষায় সনাতন ধৰ্ম্মসম্বন্ধীয় গ্রন্থ রচনা করিলেন। তাই হিন্দু রমণীকে শিক্ষা দিলেন, –

“স্বামী বনিতার পতি, স্বামী বনিতার গতি,
স্বামী বনিতার যে বিধাতা।
স্বামী বনিতার ধন, স্বামী বিনে অন্য জন,
কভু নহে সুখ মোক্ষদাতা৷৷’

আর হতভাগী মূর্খ নারী তাই মানিয়া লইল।

২৩ ক্রমে জগতের বুদ্ধি বেশী হওয়ায় সুচতুর প্রতিভাশালী পুরুষ দেখিলেন যে, “পয়গম্বর” বলিলে আর লোকে বিশ্বাস করে না। তখন মহাত্মা ঈশা আপনাকে দেবতার অংশবিশেষ (ঈশ্বরপুত্র !) বলিয়া পরিচিত করিয়া ইঞ্জিল গ্রন্থ রচনা করিলেন। তাহাতে লেখা হইল, “নারী পুরুষের সম্পূর্ণ অধীনা— নারীর সম্পত্তিতে স্বামী সম্পূর্ণ অধিকারা।” আর বুদ্ধি-বিবেকহীনা নারী তাই মানিয়া লইল।

২৪ তারপর মহাত্মা মহম্মদ আইন প্রস্তুত করিলেন যে, “রমণী সর্ব্বদাই নরের অধীনা থাকিবে, বিবাহের পূর্ব্বে পিতা কিংবা ভ্রাতার অধীনা, বিবাহের পর স্বামীর অধীনা, স্বামী অভাবে পুত্রের অধীনা থাকিবে।” আর মূর্খ নারী নত মস্তকে ঐ বিধান মানিয়া লইল।

২৫ ভগিনি, তোমরা দেখিতেছ এই ধৰ্ম্মশাস্ত্রগুলি পুরুষরচিত বিধি ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পাও, কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়ত তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতে। ধৰ্ম্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বরপ্রেরিত বা ঈশ্বরাদিষ্ট নহে। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমণীশাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত কেবল এসিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। দূতগণ ইউরোপে যান নাই কেন? আমেরিকা এবং সুমেরু হইতে কুমেরু পর্যন্ত যাইয়া “রমণীজাতিকে নরের অধীন থাকিতে হইবে” ঈশ্বরের এই আদেশ শুনান নাই কেন? ঈশ্বর কি কেবল এসিয়ারই ঈশ্বর? আমেরিকার কি তাঁহার রাজত্ব ছিল না? ঈশ্বরদত্ত জল বায়ু ত সকল দেশেই আছে—কেবল দূতগণ সৰ্ব্বদেশময় ব্যাপ্ত হন নাই কেন? যে কথা পুরাকালে অসভ্য বর্ধরগণ বিশ্বাস করিয়াছিল, তাহা বর্ত্তমান কালের সুসভ্যগণ যদি বিশ্বাস করেন, তবে সভ্যতায় ও অসভ্যতায় প্রভেদ কি? যাহা হউক এখন আমরা আর ধৰ্ম্মের নামে নতমস্তকে নরের প্রভুত্ব সহিব না। আরও দেখ যেখানে ধর্ম্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। প্রমাণ—সতীদাহ। যেখানে ধৰ্ম্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী অপেক্ষাকৃত স্বাধীনা অর্থাৎ পুরুষের সমতুল্যা। এস্থলে ধর্ম্ম অর্থে ধর্ম্মের সামাজিক বিধান বুঝাইতেছে।

কেহ বলিতে পারেন যে, “তুমি সামাজিক কথা বলিতে গিয়া ধৰ্ম্ম লইয়া টানাটানি কর কেন?” তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, “ধৰ্ম্ম”ই আমাদের দাসত্ববন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে ; “ধর্ম্মের” দোহাই দিয়া পুরুষ রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন। তাই “ধৰ্ম্ম” লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। এজন্য ধাৰ্ম্মিকগণ আমায় ক্ষমা করিতে পারেন!

২৬ আমাদের উচিত যে, স্বহস্তে স্বাধীনতার দ্বার উন্মুক্ত করি, সংসারে আপন সম্ভাব্য পথ খুঁজিয়া লই। একস্থানে আমি বলিয়াছি, “ভরসা কেবল পতিতপাবন।” কিন্তু ইহাও স্মরণ রাখা উচিত যে, ঊর্দ্ধে হস্ত উত্তোলন না করিলে পতিতপাবনও হাত ধরিয়া তুলিবেন না। “God helps those that help themselves.” তাই বলি আমাদের অবস্থা আমরা চিন্তা না করিলে, আর কেহ আমাদের জন্য ভাবিবে না। ভাবিলেও তাহাতে আমাদের ষোল আনা উপকার হইবে না।

২৭ অনেকে মনে করেন যে, পুরুষের উপার্জ্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া রমণী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করে। কথাটা কতক পরিমাণে ঠিক। ব্রহ্মদেশে স্ত্রীলোক উপার্জ্জন করে, সেখানে তাহারা পুরুষের ষোল আনা দাসী নহে। কিন্তু যে স্থলে দরিদ্রা স্ত্রীলোকেরা সূচিকৰ্ম্ম বা দাসীবৃত্তি দ্বারা উপার্জ্জন করিয়া পতি ও সন্তান পালন করে, সেখানে ও ত ঐ অকৰ্ম্মণ্য পুরুষেরাই “স্বামী” থাকে। আবার যিনি স্বয়ং উপার্জ্জন না করিয়া প্রভুত সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণীকে (heiress) বিবাহ করেন, তিনিও তন্ত্রীর উপর প্রভুত্ব করেন, এবং লেডীডাক্তার প্রমুখ সমাজের মান্যাগণ্যা কামিনীগণ স্বয়ং জীবিকা উপার্জ্জন করিয়াও “স্বামী” নামক ব্যক্তির বশ্যতা স্বীকার করেন। স্বামীটি যাহা ইচ্ছা তাই করিবেন; স্ত্রী তাঁহার বিনা অনুমতিতে কোথাও যাইবেন না কেন? ইহার কারণ এই যে, নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই “দাসী” হইয়া পড়িয়াছে। এখন আমাদের স্বাধীনতার প্রবৃত্তি পৰ্য্যন্ত লক্ষিত হয় না! আমরা একেবারে গোল্লায় গিয়াছি! তাই বলি—

“অতএব জাগ জাগগো ভগিনি !”

প্রথমে জাগিয়া উঠা সহজ নহে, জানি; সমাজ মহাগোলমাল বাধাইবে, জানি; মুসলমান আমাদের জন্য “কল” (অর্থাৎ প্রাণদণ্ড) এর বিধান দিবেন, এবং হিন্দু চিতানল বা তৃষানলের ব্যবস্থা দিবেন, জানি। কিন্তু জাগিতে হইবেই! বলিয়াছি ত কোন ভাল কাজ অনায়াসে করা যায় না। কারামুক্ত হইয়াও Galileu বলিয়াছিলেন, “but nevertheless it (Earth) does move”!! আমাদিগকে ঐরূপ বিবিধ নির্যাতন সহ্য করিয়া জাগিতে হইবে। এ স্থলে পাসী নারীদের একটী উদাহরণ দিতেছি। নিম্নলিখিত প্যারাটী এক খণ্ড উর্দু সংবাদপত্র হইতে অনুবাদিত হইল :—–

“এই পঞ্চাশ বর্ষের মধ্যে পার্সীলেডীদের অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। বিলাতী সভ্যতা যাহা, তাঁহারা এখন লাভ করিয়াছেন, পূর্ব্বে ইহার নামমাত্র জানিতেন না। মুসলমানদের ন্যায় তাঁহারাও পদায় অর্থাৎ অন্তঃপুরে অবরুদ্ধা থাকিতেন। রৌদ্র ও বৃষ্টি হইতে রক্ষা পাইবার নিমিত্ত তাঁহারা ছত্র ব্যবহারে অধীকারিণী ছিলেন না। প্রখর রবির উত্তাপ সহিতে না পারিলে জুতাই ছত্ররূপে ব্যবহার করিতেন !! গাড়ীর ভিতর বসিলেও তাহাতে পর্দ্দা থাকিত। অন্যের সম্মুখে স্বামীর সহিত আলাপ করিতে পাইতেন না। কিন্তু আজি কালি পার্সী লেডীগণ পৰ্দ্দা ছাড়িয়াছেন ; খোলাগাড়ীতে বেড়াইয়া থাকেন; অন্যান্য পুরুষের সহিত আলাপ করেন। নিজেরা ব্যবসায় (দোকানদারী) করেন। প্রথমে যখন কতিপয় ভদ্রলোক তাঁহাদের স্ত্রীকে (পর্দ্দার) বাহির করিয়াছিলেন, তখন চারি দিকে ভীষণ কলরব উঠিয়াছিল। ধবলকেশ বুদ্ধিমানেরা বলিয়াছিলেন, “পৃথিবীর ধ্বংসকাল উপস্থিত হইল !”

কই, পৃথিবীরত ধ্বংস হয় নাই। তাই বলি, একবার একই সঙ্গে সকলে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হও—— সময়ে সবই সহিয়া যাইবে। স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের Equality বুঝিতে হইবে।

২৮ এখন প্রশ্ন হইতে পারে, কি করিলে লুপ্ত রত্ন উদ্ধার হইবে? কি করিলে আমরা পুরুষের সমকক্ষা হইতে পারি? প্রথমতঃ পুরুষের সমতুল্যা হইতে ইচ্ছা অথবা দৃঢ় সঙ্কল্প আবশ্যক, সুশিক্ষা বিস্তার করা আবশ্যক, এবং আমরা যে “গোলাম নই” এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইবে। তাহা হইলে ক্রমে দুর্গম পথ সুগম হইবে।

২৯ পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব, যদি স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জ্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাই করিব— আমরা লেডীকেরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডীমাজিষ্ট্রেট, লেডীব্যারিষ্টার, লেডীজজ— সবই পঞ্চাশ বৎসর পরে লেডী viceroy দেখিয়া পুরুষের চক্ষে ধা ধা লাগিবে। উপার্জ্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা (কলুর বলদের মত!) “স্বামীর” গৃহকার্য্যে ব্যয় করি,― (যাহার কোন মূল্য নাই, বেতন নাই) সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?

৩০ আমরা যদি রাজকীয় কার্য্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। ভারতে বর দুৰ্ল্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাঁদিয়া মরি কেন? কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কার্য্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও – নিজের অন্ন বস্ত্র উপার্জ্জন করুক। হিন্দু কন্যার বিবাহ না হইলে জাতি যায়, একথাও পুরুষের কথিত। আবার পক্ষপাতিতা দেখ, কার্য্যক্ষেত্রে পুরুষের পরিশ্রমের মূল্য বেশি, নারীর কাজ সস্তায় বিক্রয় হয়। নিম্নশ্রেণীর পুরুষ যে কাজ করিলে মাসে ২ বেতন পায়, ঠিক সেই কাজে স্ত্রীলোকে ১ পায়। চাকরের খোরাকী মাসিক ৩ আর চাকরাণীর খোরাকি ২। যদি বল, আমরা দুর্ব্বলভুজা, মূর্খ, হীনবুদ্ধি নারী। সে দোষ কাহার? আমাদের। আমরা বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন করি না বলিয়া তাহা হীনতেজা হইয়াছে। এখন অনুশীলন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তিকে সতেজ করিব। যে বাহুলতা পরিশ্রম না করায় হীনবল হইয়াছে, তাহাকে খাটাইয়া সবল করিব। এখন একবার জ্ঞানচর্চ্চা করিয়া দেখি তো এ dull head সুতীক্ষ্ণ হয় কি না।

৩১ বাস্তবিক আমাদের দুঃখের কথা বলিলে ফুরায় না। এত বড় সংসারে আমরা নিরাশ্রয়া। এই পৃথিবী ঈশ্বরের, ইহাতে বাস করিবার অধিকার সকল প্রাণীরই সমান। বুদ্ধিমান মানব ধরাখানা আপনাদের মধ্যে বিভাগ করিয়া লইয়াছেন। উনি কাবুলেশ্বর— তিনি সে দেশের স্বামী— যেন ধরিত্রী তাঁহাদের বাবার সম্পত্তি! কিন্তু মানুষে ভূগোলখানা ভাগ করিয়া লইয়াছেন বলিয়া ইহার অন্যান্য অধিবাসিগণ (বন্য পশুপক্ষী) আপন আপন স্বত্ব ত্যাগ করে নাই। পশুরাজ সিংহ হইতে ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র কীট পৰ্য্যন্ত সকলেই ইহাতে বাস করিতেছে। পৃথিবীর উপর দাবী ছাড়িয়াছি কেবল আমরা আমাদেরই “আপন” বলিতে একটি পর্ণকুটীর নাই। “আমাদের বাড়ী” বলিলে পিত্রালয়, স্বামিগৃহ বা পুত্রের ভবন বুঝায়। পিতৃভবন কিংবা স্বামিগৃহ ত্যাগ করিলে এ বিশাল ধরণীতে আমাদের দঁাড়াইবার একটু স্থান থাকে না। পিতা কুপুত্রকে তাড়াইয়া দিলে, পুত্র কোন প্রকারে নিজের জন্য সংসারে স্থান করিয়া লয়, কিন্তু কন্যা অভিভাবক কর্তৃক গৃহবহিষ্কৃতা হইলে সূর্য্যকরোজ্জ্বল দিবসেও দশদিক্ অন্ধকার দেখে। ভাবে, “বসুধা বিদীর্ণ হউক, তাহাতে প্রবেশ করি।” কেন? বসুমতীর পৃষ্ঠের উপর কি স্থান নাই? এই রূপে পদে পদে লাঞ্ছিত হইয়াও যে বাচিয়া আছি, ইহাই আশ্চর্য্য।

৩২ পুরুষদিগকেও বলি,—ভ্রাতৃগণ ! আমরা স্বাধীন না হইলে তোমরাও স্বাধীন হইবে না। নিশ্চয় জানিও, আমরা যত দিন নরাধীনা থাকিব তোমরাও তত দিন পরাধীন থাকিবে। তোমরা আমাদের উপর প্রভুত্ব কর বলিয়া তোমাদের উপর আর এক জাতি আধিপত্য করিতেছে। কারণ ঈশ্বর ন্যায়বিচারক। তোমরা যে ঈশ্বরের দোহাই দিয়া ধৰ্ম্মগ্রন্থে রমণী শাসনের ব্যবস্থা লিখিয়াছ, সেই ঈশ্বর ঈদৃশ পক্ষপাতী নহেন যে, আমাদের উপর তোমাদের প্রভুত্ব সহিবেন। যাহা আমরা বিনা বাক্যব্যয়ে সহিতেছি, তাহা তিনি সহেন নাই! তাঁহার করুণা সকলের প্রতি সমান। তোমরা তাঁহার নাম লইয়া জগতে অত্যাচার করিতেছ; আমরা তাহার নামে জগতে প্রেম বিতরণ করিতেছি। তোমরা তপস্যা বলে তাঁহাকে প্রসন্ন করিয়াছ সত্য, কিন্তু আমাদের প্রতি তাঁহাকে অপ্রসন্ন করিতে পার নাই। তোমরা যে ঈশ্বরের সম্পত্তি, আমরাও সেই পরমেশ্বরের সম্পত্তি। অতএব বৃথা অহঙ্কার ত্যাগ কর ; আমাদের স্বত্ব আমাদিগকে ফিরাইয়া দাও। আমরা তোমাদের নিকট জায়গীর কিম্বা লা-খেরাজ (নিষ্কর) ভূমি চাহি না। কেবল তোমাদের equal হইতে চাই। যদি বল, তোমরা নারী জাতিকে যথেষ্ট সম্মান করিয়া থাক—যথা সীতাপ্রমুখ দেবীদের পুজা কর, পয়গম্বর তনয়া হজরতা ফাতেমাকে অসামান্যা নারী জ্ঞানে ভক্তি কর, এবং পয়গম্বর ঈসার মাতা মরিয়মকেও আদর কর ; কিন্তু তাহাতে আমরা তৃপ্ত হইতে পারি না, কারণ তোমরা যে, “পুরুষ” একথাটী তোমরা ভুলিয়া যাও না। ঐ “পুরুষ” শব্দেই অহঙ্কার ঝরে! গৌরাঙ্গ যে ভাবে “নেটীভ” ভদ্র লোকের সম্মান করেন, তোমরাও সেইভাবে আমাদের সম্মান করিয়া থাক !! আমরা কি এতই বোকা যে তোমাদের tone বুঝি না? তোমরা পদে পদে আমাদের নরকের ভয় প্রদর্শন কর, সেই অনুকরণে আমরাও বালকদিগকে জুজুর ভয় দেখাইয়া ভীরু কাপুরুষ করিয়া তুলিতেছি ! তাই তোমরা পরাধীনতার বিরুদ্ধে মাথা তুলিতে পারিতেছ না। বেশ ! যেমন কৰ্ম্ম তেমন ফল!

৩৩ আমাদিগকে নখদন্ত ভাঙ্গা পোষা বাঘটির মত জীবিত না রাখিয়া যদি নরগণ প্রাণদণ্ডের সাহায্যে সেই (কল্পিত) নরকে প্রেরণ করেন, তাও সহ্য করিতে প্রস্তুত আছি ! তাহা হইলে এ enslaved প্রাণের বোঝা বহন করিতে হইবে না। আশা করি, ধর্ম্ম গ্রন্থসমূহে বিধান আছে যে, “পুরুষের বশ্যতা স্বীকার না করিলে নারীকে দণ্ড ভোগের নিমিত্ত নরকে প্রেরণ কর।”

ভরসা করি, আমার সুযোগ্যা বিদূষী ভগ্নীগণ এ বিষয়ে আলোচনা করিবেন, আন্দোলনের ভূমিকম্পে দাসত্বের সুকঠিন দুর্গ ভূমিসাৎ করিবেন। আন্দোলন না করিলেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিবেন।

ইতি
(MRS.) R. S. Hossein

…………………….

রিলিভেন্ট টেক্সট:

অলঙ্কার না Badge of Slavery এবং অর্দ্ধাঙ্গী
গিরিশচন্দ্র সেন

প্রবন্ধ রচয়িত্রীর প্রতি আমাদের আন্তরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা আছে। তিনি মোসলমান সম্ভ্রান্ত লোকের পত্নী।… তিনি বেশ বুদ্ধিমতী। চিন্তাশীল মনস্বিনী কন্যা। বঙ্গীয় মোসলমান কুলে অসামান্যা নারী বলিয়া আমরা তাকে শ্রদ্ধা, আদর ও সম্মান করি। মোসলমান পরিবারের বধূদিগকে ও কন্যাদিগকে নানা কারণে পুরুষগণ কর্তৃক অনেক প্রকার নিপীড়ন ও ক্লেশ সহ্য করিতে হয়, তিনি ব্যথিত হৃদয়ে সেই ভগিনীদের কল্যাণোদ্দেশ্যে উপরিউক্ত প্রবন্ধ ও ‘অৰ্দ্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। এজন্য পুরুষদিগের প্রতি তাঁহার আক্রমণ কিছু সীমা অতিক্রম করিয়াছে, স্ত্রী স্বাধীনতা বিষয়েও তাহার কিছু ভ্রান্ত মত প্রকাশ পাইয়াছে।

সকল পুরুষ সমান নহে। সকলেই স্ত্রী জাতির প্রতি অত্যাচারী বলিয়া অনুযোগভাজন ও নিন্দার্হ হইতে পারেন না। অবরোধমুক্ত হইয়া যথেচ্ছ বিচরণ করিতে পারিলেই নারীগণ স্বাধীন হন না; তাহাতে অনেক স্থলে যথেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি ও বিপদ বিড়ম্বনার সম্ভাবনা। ইউরোপীয় মহিলাগণ রাজজাতীয় কন্যা বলিয়া সকলে তাহাদিগকে ভয় ও সম্মান করে। তাঁহারা যথা তথা নিঃশঙ্কভাবে বিচরণ করিতে পারেন। তাঁহাদিগকে কেহ অপমান করিলে তৎক্ষণাৎ তাহার সমুচিৎ শাসন হয়। বঙ্গললনাগণের অবস্থা সেরূপ নিরাপদ নহে।

‘অলঙ্কার’ প্রবন্ধের রচয়িত্রী স্ত্রীর নাকে দড়ির উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু তদ্বিপরীত আমরা দেখিয়াছি যে, মূর্খ পত্নীও নাকে দড়ি লাগাইয়া সুবক্তা ও সুবিদ্বান পতিকেও পশুর ন্যায় অপনার ইচ্ছানুসারে টানিয়া লইয়া যায়, তাহার ধর্ম, কর্ম, গুরুত্ব ও মনুষ্যত্বের বিলোপ সাধন

দম্পতির পরস্পর অধীনতা ও বাধ্যতা সুখ শান্তির কারণ। স্বামী স্ত্রী পশুভাব অন্তরে পোষণ করিয়া কখনও পরস্পরকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করিতে পারে না; উভয়ে উভয়ের দেবত্ব দর্শন করিলে স্বভাবতঃ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রীতির সঞ্চার হয়।

[সম্পাদকীয়, মহিলা, ভাদ্র ১৩১০]

অলঙ্কার না Badge of Slavery
(জনৈক পাঠিকার লেখা)

তিনি যেরূপভাবে যথেচ্ছাচারিণী রমণী মূর্তি অঙ্কিত করিয়াছেন ও পুরুষ জাতিকে আক্রমণ করিয়াছেন তাহা একজন সম্ভ্ৰাস্তব নীয় রমণীয় পক্ষে অত্যন্ত নিন্দনীয় হইয়াছে।

আমি পূর্বেও বলিয়াছি, এখনও বলিতেছি, স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য গৃহে। স্বামী সন্তান— সন্ততি, পরিবার-পরিজনের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি ও তাহাদের সুখ স্বচ্ছন্দতা দেখাই আমাদের প্রধান কর্ত্তব্য। কি করিয়া কোর্টে Plead করিব, তাহা না ভাবিয়া কি করিয়া সস্তানগণকে প্রকৃত মানুষ করিব, কি করিয়া স্বামীর সহধম্মিণী, আরাম দায়িনী গৃহলক্ষ্মী হইব, তাহার চিন্তা করা উচিত।

[মহিলা, ভাদ্র ১৩১০-তে ছাপা-হওয়া লেখার অংশ]

দুটি কথা
ফাতেমা

ভগিনী হোসেন ‘নবনূরে’র একজন উল্লেখযোগ্য লেখিকা। অনেক দিন হইতেই তাঁহার প্রবন্ধগুলি মনোযোগের সহিত নিরীক্ষণ করিয়া আসিতেছি। তাঁহার আন্তরিক উদ্দেশ্য মহৎ তাহাতে সন্দেহ নাই, কিন্তু তদীয় লেখনী প্রসূত প্রবন্ধগুলি পাঠে তাহার নিরপেক্ষতা ও উদ্দেশ্যের প্রতি ঘোর সন্দেহের হয়। বোধ হয় যেন তিনি ‘ভ্রড্‌নির্যাতন’ মূলমন্ত্র লইয়াই লেখিকার আসন গ্রহণ করিয়াছেন।

[কোহিনূর, ভাদ্র ১৩১২–তে ছাপা-হওয়া লেখার অংশ]

অবনতি প্রসঙ্গে
এস. এ. আল মুসাডী

ভগ্মী মিসেস আর. এস. হোসেন নবনূরের একজন সুযোগ্য লেখিকা লেখিকাকে অজস্র ধন্যবাদ দিতে হয়। নারী কখনও সমস্ত বিষয়ে পুরুষের সমতুল্য হইতে পারে না—তাহা হইলে স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণ করা হইবে।

[নবনূর, আশ্বিন ১৩১১-তে ছাপা-হওয়া লেখার অংশ]

একেই কি বলে অবনতি
নওশের আলি খান ইউসফজী

মিসেস্ আর. এস. হোসেন সাহেবার লিখিত ‘আমাদের অবনতি’ পড়িয়া সুখী হইলাম, কিন্তু সকল বিষয়ে একমত হইতে পারিলাম না।…

অলঙ্কারগুলি যেন ছিঁড়িয়া ফেলিবেন, কিন্তু (মেয়েলী) পোষাকগুলি ছিড়িয়া ফেলিয়া বিবসনা না সাজিলে কি প্রকৃত উন্নত হইতে পারিবেন না ?…..

স্বর্গোদ্যানে আপনারাই আমাদের পতনের পথ প্রদর্শক ছিলেন, ট্রয় সমরের আপনারাই নায়িকা ছিলেন, লঙ্কাকাণ্ড আপনাদেরই পদানুসারে ঘটিয়াছিল, কারবালার সে ভীষণ কাণ্ডেও আপনারই অভিনেত্রী ছিলেন। তাই ভয়, হয় আপনারার আবার জাগিলে না জানি কি কাণ্ড সংঘটিত হয়। আপনারা স্বাধীন হউন ভাল কথা, কিন্তু স্বাধীনতার অপব্যবহার না করেন, ইহাই প্ৰাৰ্থনীয় ।

[নবনূর, কার্তিক ১৩১১-তে ছাপা-হওয়া লেখার অংশ]

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য